সংগ্রহ ও ভূমিকা : মুহিত হাসান
বিদেশি কবিতার অনুবাদেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন কবি শহীদ কাদরী ((১৪ আগস্ট ১৯৪২-২৮ আগস্ট ২০১৬) । ভিনভাষার খুব বেশি কবিতার অনুবাদ তাঁর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি, এ কথা সত্য। কিন্তু যে অল্প হলেও যে-কটি কবিতার অনুবাদ তিনি করেছেন, তাতেই কাব্যানুবাদক হিসেবে কাদরীর দক্ষতা ও গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমান সংকলকের সম্পাদনায় প্রকাশিত শহীদ কাদরীর কবিতাসমগ্র-তে (ডিসেম্বর ২০২৪) তাঁর হাতে অনূদিত তেরোজন বিদেশি কবির বিশটি কবিতা সংকলিত হয়েছে। এরপরেও সম্প্রতি আমরা তাঁর করা এমন তিনটি বিদেশি কবিতার অনুবাদের সন্ধান পেয়েছি, যেগুলি পূর্বোক্ত সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। চিলির পাবলো নেরুদা, ফ্রান্সের জাক প্রেভের ও সোভিয়েত রাশিয়ার কায়সিন কুলিয়েভ – তিন দেশের এই তিন কবির একটি করে কবিতার কাদরীকৃত অদ্যাবধি অগ্রন্থিত বঙ্গানুবাদ এখানে পত্রস্থ হলো।
চৌরাস্তার মোড়ে মৃতদেহ
পাবলো নেরুদা
[অংশবিশেষ]
যেখানে তাদের পতন ঘটেছিল
আমি সেখানে কাঁদতে আসিনি।
এখনো যারা বেঁচে আছো আমি
তাদের কাছে কিছু বলতে এসেছি;
আমি আমার কথাগুলো তোমাদের
লক্ষ্য করে বলছি এবং আমাকেও।
অন্য সকলে আগেই মারা গেছে।
মনে রাখো? হ্যাঁ, তুমি মনে রাখো
তাঁদের, অন্য সবার মতো তোমার
নিজের মতো একই পদবিসহ।
বর্ষণসিক্ত লংকুইসারি, সান গ্রেগোরিও,
এবং বন্ধ্যা রাংকুইলের মধ্য দিয়ে,
বেহিসেবি খরচে পটু, সমুদ্র ও
মরুভূমির কিনার থেকে ধেয়ে আসা
বালুকারাশি দ্বারা অর্থ সমাধিস্থ ও শ্বাসরুদ্ধ ইকু ইকু,
ধোঁয়ার রেখা থেকে শুরু করে বর্ষণ রেখা,
পামপাসের শীর্ষ থেকে এজিয়ান সাগর,
অন্য সকলে খুন হয়েছে,
অন্য সকলেই যাদের নাম অ্যান্টনিও
কিংবা তোমার নামের মতো,
জেলে, কামার এবং তোমার মতো খেটে খাওয়া মানুষ :
আমাদের পিতৃভূমির সারাটা দুর্গপ্রাকার জুড়ে
তৃণাচ্ছাদিত উন্মুক্ত প্রান্তরের ঝিকমিক বরফে
সবুজ প্রশাখা সমন্বিত নদীর বিস্তৃতির পশ্চাতে লুকানো,
নাইট্রেটের মধ্যে, এবং ফেটে পড়া শস্যদানায় বিলীন
আমি দেখি আমার ভাইয়ের দানাবাঁধা ছড়ানো-ছিটানো রক্ত
আমার ভাইয়ের ফোঁটা ফোঁটা রক্ত।
দৈনিক জনপদ, ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩
পারিবারিক
জাক প্রেভের
মা উল বোনে
ছেলে যুদ্ধ করে
মা-র কাছে এটাই স্বাভাবিক মনে হয়।
এবং বাবা কী করেন? বাবা?
বাবা করেন ব্যবসা
মা বোনেন উল,
ছেলে করে যুদ্ধ
এটাই স্বাভাবিক মনে হয় বাবার কাছে স্বভাবিক
আর ছেলেটা সেই ছেলেটা
কী পায় সেই ছেলেটার কাছ থেকে?
সে এক্কেবারে কিছুই পায় না সেই ছেলেটার কাছ থেকে
তার মা উল বোনে তার বাবা ব্যবসা করে সে যুদ্ধ করে
তার যুদ্ধ যখন শেষ হয়ে
সে ব্যবসা ধরবে তার বাবার সঙ্গে
যুদ্ধ চলতে থাকে মা চলতে থাকে উল চলতে থাকে
বাবা চলতে থাকে ব্যবসা চলতে থাকে যুদ্ধ চলতে থাকে
ছেলেটা যুদ্ধে মারা পড়ে
ছেলেটা যুদ্ধে মারা পড়ে
ছেলেটা চলতে পারে না
বাবা চলতে থাকে মা চলতে থাকে কবরখানায় চলতে থাকে
মা-র কাছে এটাই স্বাভাবিক মনে হয়
বাবার কাছে এটাই স্বাভাবিক মনে হয়
স্বাভাবিক চলতে থাকে ব্যবসা চলতে থাকে
জীবন চলতে থাকে উল চলতে থাকে যুদ্ধ চলতে থাকে
ব্যবসা ব্যবসা ব্যবসা
চলতে থাকে চলতে থাকে চলতে থাকে
জীবন চলতে থাকে
কবরখানা চলতে থাকে।
দৈনিক সংবাদ, ১৫ই মে ১৯৭৭
স্নান
কায়সিন কুলিয়েভ
ঝরনার স্রোতে স্নান করছে এক মেয়ে,
আকাশে তখনও জ্বলজ্বল করছে সূর্য…
তার সূক্ষ্ম সোনালি আলোর রেখা মেয়েটার কাঁধে
আদরমাখা হাতের মতো পড়ে আছে নরম মসৃণতায়।
জলের ধারার ওপর খুব সতর্কভাবে নুয়ে আছে উইলোর সারি,
ঝরনাস্রোতে প্রবাহিত কুন্তলরাজিকে ছুঁয়ে আছে তার ছায়া।
উপকূলের ঝোপগুলো এমন নিঃশব্দ যেন নিদ্রায় ডুবে আছে,
চতুর্দিকের ঘাসগুলো ঢলে পড়েছে তাদের নরম শয্যায়
ঝরনার স্রোতে স্নান করছে এক মেয়ে…
চরাচর থেকে মৃত্যু উধাও, যেন ছিল না কোনোদিন,
যেন রোগ, শোক, বেদনা ত্রিলোকে আর নেই,
থেমে গেছে রক্তপাত, যুদ্ধ, কলহ, উধাও যা কিছু অশুভ
এখন কেবল শান্তি, সৌন্দর্য, আর প্রাণের রাজত্ব অপার
একটি মেয়ে স্নান করছে ঝরনার স্রোতে নিঃশব্দ নির্বিকার।
উদয়ন পত্রিকা, ১৯৭৩


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.