অধ্যাপক সুনীতিভূষণ কানুনগো চট্টগ্রামের প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগকে অভিনবপন্থায় উপস্থাপন করেছেন নানা নামে, মাত্রায় ও আঙ্গিকে।
কথায় আর লেখায় তো বটেই, প্রাণেও ধারণ করেছিলেন তিনি চট্টগ্রামকে। নিকটাত্মীয়দের অনেকেই একে একে চট্টগ্রাম, এমনকি দেশ ছেড়ে গেলেও তিনি থেকে গিয়েছেন চট্টগ্রামে। আর তাই তাঁকে ‘চট্টগ্রামের ইতিহাসের বরপুত্র’ নামে ডাকা হলেও বোধ করি বাড়িয়ে বলা হয় না। সুনীতিভূষণ কানুনগো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ভূতপূর্ব অধ্যাপক ও সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব প্রভাষক, গবেষক ও ইতিহাসবিদ এবং চল্লিশের অধিক গ্রন্থের রচয়িতা। তিনি ৪ঠা অক্টোবর ২০২৫, রোববার বিকালে, শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। নিভৃতচারী এই ইতিহাসবিদ চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত বোয়ালখালী থানার কানুনগোপাড়া গ্রামের সন্তান।
নবতিপর হিসেবে তাঁর চলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। এক দশক আগে চলে গেলেও অসময় বলে যেত না। কিন্তু বড় মর্মন্তুদ পীড়াদায়ক ছিল তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা। নিঃসঙ্গতা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল তাঁকে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। ফিরিঙ্গিবাজারের কাঠঘর এলাকার ‘এগারো তলা’ ভবনের তৃতীয় তলায় তিন কামরার ভাড়া ঘরে তাঁর আহার-নিদ্রার ঠিকঠিকানা ছিল না। তাই বলে কলম থেমে থাকেনি। ঘরময় ধুলোবালি, মাকড়সার জাল আর পোকামাকড়ের ঘরবসতি। একলা ঘরে কতবার হোঁচট খেয়ে পড়তেন, আবার উঠে দাঁড়াতেন। এরই মাঝে নির্বিবাদে চলে তাঁর লেখাপড়া। বই লিখে যান একের পর এক। পাণ্ডুলিপি লুফে নেন প্রকাশকরা। বিনিদ্র রজনীর সেই ফসল আলোর মুখ দেখলো কি না জানতে পারেন না তিনি, অর্থযোগের কথা বলাই বাহুল্য। আজো একাধিক ছাপাখানার হিমঘরে পড়ে আছে তাঁর সর্বশেষ রচনাবলি। তাদের ভাগ্যে কী আছে তা সময়ই বলে দেবে।
বছর দুয়েক আগে একেবারেই চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলেন। নিকটাত্মীয়ের সহায়তায় ফিরে যান নিজ গ্রাম কানুনগোপাড়ায়। পারিবারিক উপাধিই যখন গাঁয়ের নাম হয়, তখন বুঝে নিতে হয় কেমন পরিবারে তাঁর জন্ম। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানা শত বিপ্লবীর জন্মভূমি। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁর এক পিতৃব্য, যিনি অস্ত্রচালনা শিখতে গিয়ে অসাবধানতাবশত মৃত্যুবরণ করেন। আরেক পিতৃব্য খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ কালিকারঞ্জন কানুনগোর জীবন ও কর্ম নিয়ে রচিত গ্রন্থে কানুনগোপাড়ার বর্ণনা দিতে সুনীতিভূষণ কানুনগো লেখেন, ‘কালিকারঞ্জনের স্বগ্রাম কানুনগোপাড়া একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত গ্রাম। এই গ্রামে এত বেশী খ্যাতিমান বক্তির জন্ম হয়েছিল যে তার সমতুল্য গ্রামের সংখ্যা বাংলাদেশে খুব বেশী দেখা যায় না।’ নিজেকে তিনি সেইসব খ্যাতিমানের সারির একজন বলে মনে করতেন না।
চলনে-বলনে, ভাবনা-চিন্তায় তাঁর মতো সাদাসিধে মানুষ দেখা যায় না।
কালিকারঞ্জন কানুনগো : জীবন ও কর্ম গ্রন্থটি থেকেই জানা যায়, তাঁদের পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন। ইংরেজ আমলের সরকারি দলিলপত্রে ‘আনন্দীরাম কানুনগো’র নামের উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি ছিলেন কালিকারঞ্জন কানুনগোর অষ্টম পিতৃপুরুষ। বংশলতিকার হিসাবে অষ্টাদশ শতকের সেই জমিদারের নবম অধস্তন পুরুষ অধ্যাপক সুনীতিভূষণ কানুনগো। কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী
বন্দোবস্ত-পরবর্তী সময়ে সেই জমিদারি হস্তচ্যুত হলে তাঁর পূর্বপুরুষদের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও আভিজাত্যবোধ বজায় থাকে। কালিকারঞ্জন সম্ভবত সেই আভিজাত্য অটুট রেখেছিলেন। নাম, যশ, বিত্তবৈভবের কমতি ছিল না তাঁর জীবনে। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সমাপ্তিতেও কর্মক্ষম ও নীরোগ ছিলেন। শুভ বৈশাখী পূর্ণিমার আলোভরা রাতে শেষবারের মতো ঘুমাতে যাওয়ার সময় পাশে পেয়েছিলেন নিজ দৌহিত্রকে, যা নিঃসন্দেহে তাঁর ভরা সংসার ও সুখী গৃহকোণের সাক্ষ্য বহন করে।
কিন্তু সুনীতিভূষণের মাঝে আভিজাত্যের লেশমাত্র ছিল না। একেবারে মাটির মানুষ ছিলেন তিনি। দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি মেলে তাঁর ৪ঠা অক্টোবর (১৯২৫), শেষ বিকালে। তবে গাঁয়ের বাড়ির আত্মীয়রা, দু-বছর ধরে যাঁরা তাঁকে আগলে রেখেছিলেন, শেষ চেষ্টায় ত্রুটি রাখেননি। বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করলেও মহাকালের মতো প্রাচীন কালুরঘাট সেতুর দুর্বিষহ যানজটের মুখে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে পটিয়া হাসপাতালে। এই ছোটাছুটির মধ্যেই তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী ও তত্ত্বাবধায়ক সুজিত দে-র কাঁধে মাথা রেখে সবার অলক্ষ্যে অন্যলোকে যাত্রা করেন সুনীতিভূষণ কানুনগো।
১৯৩৪ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি। মাঘের শেষে বসন্ত আসি আসি করছে। ভারম্ভা নদীর (এখন যা খালের আকার ধারণ করেছে) নিকটবর্তী গড়, ঝিল, দিঘি, পুকুর আর পারিবারিক শ্মশান ঘেরা ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িটিতে মা সুচারুপ্রভার কোলজুড়ে আসে একটি শিশু, এই পরিবারের প্রথম সন্তান। মা ডাকেন ‘নিতাই’ বলে। বাবা পুলিনবিহারী কানুনগো প্রথম পুত্রের নাম দেন সুনীতিভূষণ। এই শিশুটি বড় হয়ে নামের প্রতি কোনোদিন অবিচার করেছিল বলে শোনা যায়নি, বরং জগৎ-সংসারই তাঁর প্রতি অবিচার করে গিয়েছে বারংবার।
বাল্যকাল থেকেই লেখাপড়ায় তাঁর অদম্য নেশা। স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবার তত্ত্বাবধানে কানুনগোপাড়া গ্রামে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করেন উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে। জ্যাঠা কালিকারঞ্জন কানুনগোকেই জীবনের নায়ক ও আদর্শ মানেন তিনি। ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। তবে ১৯৬০ সালে এমএ সম্পন্ন করার পর সেখানে থিতু হতে মন তাঁর সায় দেয়নি, যদিও নিকটাত্মীয়দের অনেকেই তখন স্থায়ীভাবে বসত গড়েছেন সে-কালের আনন্দনগরী কলকাতায়। দেশে ফিরে এলেও জ্যাঠার আদেশ পালন করে যান অক্ষরে অক্ষরে। কানুনগোপাড়ার স্যার আশুতোষ কলেজে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর কলকাতা থেকে নির্দেশনা আসে ডাকযোগে। শিশুর মতো অনুসন্ধিৎসা আর থুকিডাইডিসের মতো বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নিয়ে চারপাশের জগৎ থেকে লেখার উপাদান খুঁজে নেওয়ার আদেশ দেন তাঁকে। পত্রের সঙ্গে গবেষণার বিষয়বস্তু ও সারসংক্ষেপের একটি খসড়াও যুক্ত করেন তিনি। জ্যাঠার কথা মাথায় তুলে নিয়ে পথচলা শুরু করেন সুনীতিভূষণ কানুনগো। কলেজের ছুটিছাটায় চলে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড তরুণ সুনীতির জন্য অনেক চমক নিয়ে যেন অপেক্ষায় ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক কালিকারঞ্জনের প্রিয় ছাত্র ও শিক্ষকতার পদে উত্তরাধিকারী অধ্যাপক আবদুল হালিমের তত্ত্বাবধানে সুনীতিভূষণের গবেষণাকর্মের হাতেখড়ি হলেও অধ্যাপক হালিম পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ায় প্রথমেই হোঁচট খেতে হয় তাঁকে। এমন সময় লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় পিএইচ.ডি অর্জন করে দেশে ফিরে আসেন চট্টগ্রামেরই কৃতী সন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (রিডার) ড. আবদুল করিম, কালিকারঞ্জনের শিক্ষকজীবনের শেষ বছরের ছাত্র। কালিকারঞ্জনের ভ্রাতুষ্পুত্র সুনীতিভূষণকে সানন্দে স্বাগত জানান তিনি। তাঁরই তত্ত্বাবধানে ‘A History of the Muslim Rule in Chittagong’ শিরোনামে অভিসন্দর্ভ রচনায় মন দেন নবাগত এই গবেষক।
একমাত্র সহোদর সুকৃতিভূষণ কানুনগো (নিমাই) তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী। কয়েক বছর ঢাকায় অবস্থানকালে ছোটভাইয়ের সঙ্গেই আবাসন ভাগাভাগি করে নেন সুনীতিভূষণ। কিন্তু উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে ভাই দেশত্যাগ করলে ঢাকায় থাকা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ততদিনে অভিসন্দর্ভের প্রথম খসড়ার কাজ শেষ হয়। ড. করিমের পরামর্শমতো সংশোধনী কাজ সম্পন্ন করার প্রয়োজনে তাঁর ঢাকায় অবস্থান করা আবশ্যক। গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক অনেকটা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই তাঁকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন। এক সুন্দর সকালে তিনি তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক পদে নিযুক্ত করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন, যা ছিল তাঁর কাছে মেঘ না চাইতে জলের মতো। এ-ও কী সম্ভব! তিনি নিজেকে একজন সামান্য কলেজশিক্ষক বলে মনে করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান, যেখানে কেবল উচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ পণ্ডিতরাই শিক্ষকতা করতেন, সেখানে তাঁর মতো একজন নবিশ গবেষক ও অনভিজ্ঞ তরুণ শিক্ষকতা করবেন – এই ভেবে সংকুচিত বোধ করতেন তিনি। তবে অচিরেই ড. করিমের উৎসাহ ও সহযোগিতায় নতুন কাজে যোগদান করেন। এরপর আবাসন সংকট সমাধানেও এগিয়ে আসেন ড. করিম। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্যদের বসবাসের জন্য ফুলবাগানে ঘেরা সরকারি বাসভবনে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়। প্রতিবেলা খাবার আসে জগন্নাথ হলের হেঁসেল থেকে। রীতিমতো রাজকীয় কায়দায় জীবনযাপন। ঢাকার সেই দিনগুলোকে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বলে মনে করতেন তিনি। ভাবনাহীন জীবনে প্রাণভরে লেখাপড়া করাই হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র সাধনা।
কিন্তু ড. করিম বড়ই কঠিন নির্দেশক। কোনো কিছুতেই তাঁর মন ভরে না। অভিসন্দর্ভের চতুর্থ খসড়ার ওপরও অনেক সংশোধনী দেন। এরই মধ্যে ড. করিম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিশাল কর্মযজ্ঞে জড়িয়ে পড়লে সুনীতিভূষণও ঢাকার জীবন (যেখানে জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় উপভোগ করেছিলেন), সর্বোপরি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মোহ ত্যাগ করে, তাঁর অনুবর্তী হয়ে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। ১৯৭০-এ অবশেষে সম্পন্ন হয় তাঁর পিএইচ.ডি অভিযান। ড. করিমের হাতে গড়া যেমন প্রথম পিএইচ.ডি, তেমনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও প্রথম পিএইচ.ডি এই অভিসন্দর্ভ। প্রাণ দিয়েই কাজ করেছিলেন দুই নিবেদিতপ্রাণ গবেষক। অবাক হতে হয় জেনে যে, এই গ্রন্থ রচনায় কোনো অর্থের লেনদেন হয়নি। এই প্রসঙ্গে কানুনগো স্বয়ং বলেছেন, ‘গবেষণাকর্মের জন্য আমি কোনো বৃত্তি বা আর্থিক সাহায্য পাইনি, আর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে প্রফেসর করিম কোনো পারিশ্রমিক পাননি, কিংবা কর্তৃপক্ষের নিকট দাবি করেননি।’ এমন নিঃস্বার্থ গবেষণা দ্বিতীয়টি হয়েছে বলে শোনা যায়নি।
বলতে বাধা নেই, ড. করিমের নির্দেশনায় প্রায় এক দশকের নিরলস গবেষণা ড. সুনীতিভূষণ কানুনগোকে এক ক্লান্তিহীন লেখকে পরিণত করে। ড. করিমেরই সহযোগিতায় এরপর তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। প্রায় তিন দশক অধ্যাপনা শেষে অবসর গ্রহণ করেন ১৯৯৯ সালে। গবেষণা ও পেশাগত ব্যাপারে ড. করিমের উদাত্ত সহযোগিতাকে আনুকূল্য বলতে দ্বিধা করেননি ড. কানুনগো, যদিও ‘রতনে রতন চেনে’ কথাটাকেই এক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে মনে হয়। তবে যাঁরাই ড. কানুনগোর সংস্পর্শে এসেছেন তাঁরাই জানেন, আমৃত্যু তিনি ড. করিমের বন্দনা করেছেন, তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করেছেন।
সুনীতিভূষণ কানুনগো ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক এবং চট্টগ্রাম বেতারের নজরুল গীতির নিয়মিত শিল্পী লীনা কানুনগোর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই পুত্র; জ্যেষ্ঠ পুত্র পার্থসারথী কানুনগো কর্কটরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৪ বছর বয়সে মারা যায়। কনিষ্ঠ পুত্র ড. দীপঙ্কর কানুনগো যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। বড় ছেলের মৃত্যু, ছোট ছেলের দেশত্যাগ আর সাড়ে চার দশকের জীবনসঙ্গীর তিরোধানে জগৎ-সংসারে বড় একা হয়ে পড়েন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সুনীতিভূষণ কানুনগো। নিঃসঙ্গ জীবনে সখ্য গড়েছিলেন তিনি বই-খাতা আর কলমের সঙ্গে। লিখে গেছেন বিরতিহীনভাবে।
অধ্যাপক কানুনগো ড. করিমের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামে মুসলিম শাসনামল শিরোনামে পিএইচ.ডি অভিসন্দর্ভ রচনা করলেও চট্টগ্রামের ইতিহাসের আদ্যোপান্ত নিয়ে তিনি রচনা করেন দুই খণ্ডের আকরগ্রন্থ A History of Chittagong, vol. 1, Ges A History of Chittagong, vol. 2., যদিও বর্তমানে দুটি গ্রন্থই দুষ্প্রাপ্য। চট্টগ্রামের ইতিহাসকে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য ও আনন্দময় করে তোলার জন্য তিনি রচনা করেন The Chittagong Revolt (1930-34), ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম, Chakma Resistance to British Domination, চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাস, প্রাচীন হরিকেল রাজ্য ও মধ্য চট্টগ্রামের ইতিবৃত্ত, পার্বত্য চট্টগ্রাম : ইতিহাস, সমাজ ও
সংস্কৃতি। চট্টগ্রামের শত মনীষার সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে সম্পাদনা করেন চট্টগ্রাম চরিতাভিধান। উপরন্তু কালিকারঞ্জন কানুনগো ছাড়াও চট্টগ্রামের আরো কয়েকজন মনীষীর জীবন ও কর্ম নিয়ে রচনা করেন একাধিক গ্রন্থ। মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী : জীবন ও কর্ম, শরচ্চন্দ্র দাশ : জীবন ও কর্ম, নবীন চন্দ্র দাশ : জীবন ও কাব্যচর্চা গ্রন্থসমূহ জন্মভূমির কীর্তিমান মানুষদের প্রতি তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ড. করিমের বিচরণক্ষেত্র বাংলার ইতিহাসেও প্রবেশ করেছেন তিনি অনন্য দক্ষতায়। সুলতানি ও মোগল আমলের বাংলা ছাড়াও দুই খণ্ডে রচনা করেন বাংলার শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস। বৈষ্ণব আন্দোলন, বাংলায় ভক্তিবাদ ও প্রাচ্যের রাষ্ট্রদর্শন ধর্ম ও দর্শনে তাঁর পাণ্ডিত্যের সাক্ষ্য বহন করে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এমনকি ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের কাছেও বিশেষভাবে পরিচিত তিনি ইংলন্ডের ইতিহাস গ্রন্থের জন্য।
সব্যসাচী লেখক সুনীতিভূষণ কানুনগো বাংলার রেনেসাঁস এবং চট্টগ্রামের রেনেসাঁস আন্দোলনে মুসলিম সমাজের ভূমিকা শিরোনামে দুটি গ্রন্থ রচনা শেষ করেছিলেন বছর চারেক আগে। কথায় কথায় বলেছিলেন, এই দুটি বই তাঁর ‘উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট’। সাতাশি বছর বয়সী কোনো গবেষক যখন ‘উচ্চাভিলাষী’ কথাটি উচ্চারণ করেন তখন বুঝে নিতে হয়, জাগতিক চাওয়া-পাওয়া নয়, কাজই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, স্বপ্ন দেখিয়েছিল এতটা কাল। হাত-দুটো অচল হয়ে পড়ার পর তিনি অসহায়বোধ করতে শুরু করেন। লিখতে না পেরে অসুস্থ বোধ করেন। নিকটাত্মীয়ের সহায়তায় নিজ গাঁয়ে ফিরে গেলেও মন পড়ে থাকে তাঁর বই-খাতায় ঠাসা পড়ার ঘরে। বারকয়েক শহর-গ্রাম করে দু-বছর আগে পাকাপাকি ফিরে যান জন্মভূমিতে।
চল্লিশের মতো গ্রন্থের প্রণেতা অধ্যাপক সুনীতিভূষণ কানুনগো কখনো তারকা শিক্ষক ছিলেন না। তাঁর কোনো গ্রন্থ নিয়ে ধুমধাম করে মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব হয়নি। আয়োজিত হয়নি আলোচনা সভা। গণমাধ্যমে আলোচিত হয়নি, প্রশংসা তেমন জোটেনি। জোটেনি পদক কিংবা সম্মাননা। অনেক আগেই তাঁকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিলাম আমরা। তাঁর নীরব প্রস্থান তেমন করে নাড়া দেয়নি আমাদের। ষাটোর্ধ্ব খুড়তুতো বোন রানী দে-র ঘোলাটে চোখের জলের ভাষা পড়ার সাধ্য তাই আমাদের নেই। অতঃপর অন্তরাল থেকে অনন্তলোকে যাত্রা করেন মায়ের আদরের নিতাই, বাবার সুপুত্র ক্লান্তিহীন গবেষক অধ্যাপক সুনীতি ভূষণ কানুনগো।
অধ্যাপক সুনীতিভূষণ কানুনগোর কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : A History of Chittagong (দুই খণ্ড); বাংলার ইতিহাস (তিন খণ্ড); বাংলার শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস (দুই খণ্ড); The Chittagong Revolt; ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম; A History of the Chittagong Hill Tracts; Chakma Resistance to British Domination; ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চাকমা জাতির সংগ্রাম; বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলন; বাংলায় ভক্তিবাদ; প্রাচ্যের রাষ্ট্রদর্শন; কালিকারঞ্জন কানুনগো : জীবন ও কর্ম; মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী : জীবন ও কর্ম; শরচ্চন্দ্র দাশ : জীবন ও কর্ম; নবীনচন্দ্র দাশ : জীবন ও কাব্যচর্চা; চট্টগ্রাম চরিতাভিধান; ইংলন্ডের ইতিহাস; চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাস।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.