অসাম্প্রদায়িকতার শ্রেষ্ঠ কবি নজরুল

লেখক:

কমরুদ্দিন আহমদ

 

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বুদ্ধিনির্ভর কবি নন; স্বভাবকবি, হৃদয়নির্ভর রোমান্টিক কবি। আমাদের ক্লেদাক্ত বর্তমানের মধ্যে আশ্বাসদীপ্ত ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখার রোমান্টিক চিমত্মায় তিনি সফল কবি-পুরুষ; যার ফলে বাঙালি মুসলমানরা পেল বাংলা সাহিত্যের যোগ্য অংশীদারিত্ব। বাঙালি পেল সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব।

কবি যখন জগৎ ও জীবনের ভাবচিমত্মাকে নিয়মের মধ্যে ধীরস্থিরভাবে প্রত্যক্ষ করেন, তখন তাঁর দৃষ্টি ক্ল্যাসিক। কিন্তু তিনি যখন স্বকীয়
ব্যক্তি-কল্পনার আলোকে জগৎ ও জীবনের চিমত্মাকে বিশোধিত করে গ্রহণ করেন, তখন তাঁর দৃষ্টি রোমান্টিক (শ্রীশচন্দ্র দাশ)। বাসত্মব সুষমাম–ত নজরুলের রোমান্টিক দৃষ্টি নিপতিত হলো সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে, আকাশের নির্বাক তারায়, সত্মব্ধ নীলিমার ভাষাহারা সংগীতে, শিশুপ্রকৃতির অপূর্ব বিস্ময়ে, অতীতের অন্ধকার মস্নান সৌন্দর্যের সীমাহীন ক্লামিত্মতে, পতিত ও ব্যথিতজনের হৃদয়বন্দরের স্বর্গীয় মাধুর্যে, প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দের অপূর্ব আমন্ত্রণে। নজরুল-প্রতিভার ব্যবহারিক পরিচয় তিনি বিদ্রোহী। উপলব্ধির আর একটু গভীরে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের চারণকবি, যুগযন্ত্রণার পথিকৃৎ। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার প্রচ- বিস্ফোরণের আর্তনাদ :

বল বীর –

বল উন্নত মম শির!

শির নেহারি’ আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!

বল বীর –

বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’

চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’

ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া

খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া

উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!

তাঁর বিদ্রোহের রণহুংকারে সবাই বিস্মিত, অভিভূত। তাঁর বিদ্রোহীসত্তার ভেতর যুগপৎ সমামত্মরাল প্রেমিকসত্তা। তাই কবি বলেন, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য’।

ইংরেজি ১৯২১ এবং বাংলা ১৩২৮ সালের কার্তিক সংখ্যায় মোসলেম ভারত পত্রিকায় নজরুল-প্রতিভার ব্যবহারিক পরিচয়ে ভাস্বর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রথম মুদ্রিত হয়। কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পর নজরুল রাতারাতি বিদ্রোহী কবি হিসেবে ভারতবর্ষে পরিচিত হয়ে পড়েন। তার দুমাস পর বিজলী এবং তিন মাস পর প্রবাসী পত্রিকায় কবিতাটি সংকলিত হয়। কবিতাটির সমসাময়িক জনপ্রিয়তা এ থেকে পরিমাপযোগ্য। সমকালীন সমাজমানসে রাজনীতি, অর্থনীতির কারণে যে অস্থিরতা, উত্তাপ ও অসহিষ্ণুতা উত্তাল হয়ে উঠেছিল কবিতাটি তারই শৈল্পিক প্রকাশ।

কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণাঅগ্নিবীণার কেন্দ্রীয় পরিচয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। কারণ তা কবির জীবনবেদ। অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩২৯-এর কার্তিকে। এতে সর্বমোট ২২টি কবিতা স্থান পেয়েছে। কাব্যটি এক ঐতিহাসিক মর্যাদা লাভ করে। এর অদ্বিতীয় কারণ রবীন্দ্র-ভাবানুভূতি ও দার্শনিকতার নাগপাশ ছিন্ন করার যে-প্রবল আবেগ তৎকালে পুঞ্জীভূত হয়েছিল অগ্নিবীণাই তার সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন। বিশ শতকের তৃতীয় দশকে কবিকণ্ঠে এমন সরল ও সার্থক ঘোষণা আর একটিও শোনা যায়নি।

সমসাময়িক অগ্রজ কবি মোহিতলাল মজুমদারের প্রত্যাশা ছিল : ‘আনো বীণা সপ্তস্বরা স্বর্গতন্ত্রী তন্দ্রাবিনাশিনী, উদার উদাত্ত গীতি গাও বসি হৃৎপদ্মাসনে’ – সে-প্রত্যাশার পথে অনেকেই ভিড় জমিয়েছিলেন। কিন্তু সে-ভিড়ের মধ্যে পৌরুষ-মদমত্তে একজনই সার্থকতা লাভ করেন, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। অগ্নিবীণা তাঁরই হাতের ‘তন্দ্রাবিনাশিনী’ সপ্তস্বরাবীণা।

মহৎ শিল্পী মাত্রই শাশ্বত জীবনসত্যের প্রত্যয়নিষ্ঠ ভাষক। কিন্তু চিরমত্মন কোনো সত্যই ভাসমান কোনো অশরীরী আত্মা নয়, যুগের চৌহদ্দিতেই তা একটা বিশেষ রূপ পায়। শিল্পী সেই যুগ-জিজ্ঞাসাকে প্রশমন করেই মহাকালে পাড়ি জমাতে পারেন। বিশিষ্ট কোনো যুগকে আত্মস্থ করে তাকে অতিক্রম করাই হচ্ছে পারঙ্গম শিল্পীর লক্ষণ। নজরুল যদিও বলেন – ‘পরোয়া করি না বাঁচি বা না বাঁচি-যুগের হুজুগ কেটে গেলে’, তবু তাঁর কাব্য যুগ-অতিক্রমী পারঙ্গমতার লক্ষণ-আক্রামত্ম। তিনিই সর্বপ্রথম আধুনিক বাংলা কাব্যে চড়াসুর আমদানি করেন। যার কোনো যোগ্য উত্তরসূরির আবির্ভাব ঘটেনি। বলা বাহুল্য, নজরুল যুগ-যন্ত্রণার বিপ্লবী মহাপুরুষ। সে-কালের যুগ-যন্ত্রণার মর্মকথা হলো – ‘একটা কিছু দাও হাতে একবার মরে বাঁচি’ – তারই সার্থক রূপকার নজরুল। তিনি কবিকর্মী, এক নতুন যুগের দিশারি, যাঁর কণ্ঠেই আমরা শুনতে পেলাম :

আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নবসৃষ্টির

মহানন্দে!…

মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লামত্ম,

আমি সেই দিন হব শামত্ম

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না।

অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –

বিদ্রোহী রণ-ক্লামত্ম

আমি সেই দিন হব শামত্ম।

(‘বিদ্রোহী’)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার সবচেয়ে স্বাভাবিক কবি। সেজন্য তিনি আশি বছর ধরে কবিতার নতুন-নতুন দেশ দখল করে যা সাধন করেন তা হচ্ছে নীরব বিপ্লব। বাংলা সাহিত্যে তিনজন প্রধান কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁরা বাংলা ভাষার মূল স্বভাবকেই বদলে দিয়েছেন। এ-তিনজন কবি হয়েছেন অস্বাভাবিক পথে। কিন্তু তাঁদের বিরাট সৌজন্যে ও কৃতিত্বে ওই অস্বভাবও বাংলা ভাষার স্বভাবের অমত্মর্গত হয়ে গেছে। উলেস্নখ্য যে, এঁরা তিনজন বাংলা ভাষার সম্পূর্ণ নতুন ও অজ্ঞাতপূর্ব শক্তি এবং সম্ভাবনা আবিষ্কার করেন। বাঙালির খণ্ডিত জীবনের মধ্যে মহাকাব্যিক প্রতীতি জাগ্রত করেন মাইকেল। নজরুল শামত্ম রসের দেশে আনয়ন করেন রৌদ্র-রসের অসহ্য দহন ও দীপ্তি। শিথিল ও অতিভাষী বাংলা ভাষাকে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত দান করেন নির্মেদ ও নির্বহুল এক টান টান ছিলার সংহতি। নজরুল বিদ্রোহী কবিতা ও কোনো-কোনো গদ্য রচনায় নিয়ে আসেন তেজ-জোশ-আলো-তাপ, যা তাঁর পূর্বে বাংলা ভাষায় কল্পনা করা যেত না। মাইকেলের ‘মেঘনাদ বধ’, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘অর্কেস্ট্রা’ বিষয় ও বিন্যাসে দিয়েছে নতুনত্বের সন্ধান।

রবীন্দ্রোত্তর সুরের প্রধান সাধক নজরুল। প্রথমে রবীন্দ্রনাথকে বিদীর্ণ করে বেজে উঠেছিলেন তিনজন – মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ও কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁদের মধ্যে নজরুল সবচেয়ে সোচ্চার। তিনি স্বতন্ত্র সুরে বেজে উঠতে পেরেছেন। অন্য দুজন অনেকটা হারিয়ে গেছেন। মোহিতলাল ও যতীন্দ্রনাথকে নজরুল খানিকটা প্রভাবিতও করেন। নজরুলই রবীন্দ্রবলয় ভাঙার সফল বংশীবাদক। বাংলা সাহিত্যে সেরা দশজন দ্রষ্টা কবির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রশ্নাতীতভাবেই শ্রেষ্ঠ। তাঁর পরেই কবিতার বহুমুখী প্রতিভার উজ্জ্বল দ্রষ্টা হচ্ছেন নজরুল। বাকি আটজন – মধুসূদন দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে-র কেউই বিদ্রোহ, প্রেম ও জাতধর্মের বৈপরীত্যকে একসঙ্গে আমন্ত্রণ জানাতে পারেননি। স্বরূপ সময়ের নজরুল সাহিত্যজীবন কবিতাকে এক বিরাট অর্কেস্ট্রার মধ্যে ধারণ করেছেন।

মূলত নজরুলই তিরিশোত্তর আধুনিক বাংলা কাব্যের দ্বার উন্মোচন করেন। তিনিই বিশ শতকের রঙিন ও রংরিক্ত, দ্রোহী ও আনত, সুখকর ও সুখহর, সমকাল মগ্ন ও মহাকাল লুব্ধ, ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক, বিশ্বমুখী ও স্বদেশলগ্ন, জ্ঞানী ও মেধাবী আধুনিক কবিতার পথপ্রদর্শক। ব্যাপকহারে পাশ্চাত্যের দিকে দৃষ্টিপাত না করলেও বিশ্বসাহিত্যে অন্যতম ঐতিহ্য সৃষ্টিকারী মধ্যপ্রাচ্যের ভাবরস নিমগ্নতা বাংলা কাব্যে আমদানি করে নজরুল বাংলা কাব্যের পরিধি ব্যাপকতর করার মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বাংলা কাব্যে সহনীয় পর্যায়ে উন্নীত করেন।

মধ্যযুগ থেকে বিশ শতকের প্রথম দশক পর্যমত্ম অসংখ্য কবি-যশোপ্রার্থী মুসলমান বাংলা কবিতার সঙ্গে অচ্ছেদ্য সম্পর্কে যুক্ত হতে চেয়েছেন। কিন্তু নজরুল ইসলামই সত্যিকার অর্থে প্রথম বাঙালি মুসলমান কবি। নজরুল-পূর্ব মুসলমানদের বাংলা কাব্যসাধনা ঐতিহাসিক ও সমাজতত্ত্ববিদদের গবেষণাস্বর্গ; কিন্তু উন্নত কাব্যভোগীর জন্যে এক অন্ধকার এলাকা। আর নজরুল সেই অন্ধকারে উজ্জ্বল বাতিঘর।

বাংলা কাব্যে নজরুল তিনটি ধারার জন্ম দিয়েছেন। এক. রোমান্টিক চেতনায় ইন্দ্রিয় ঘনত্ব, পরবর্তীকালে যাঁরা এ-ধারা অব্যাহত রেখেছেন তাঁরা হলেন – জীবনানন্দ দাশ, ফররুখ আহমদ প্রমুখ। দুই. লোকায়ত উন্মেষ : যার উত্তরাধিকারী প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, সুকামত্ম ভট্টাচার্য, বেনজীর আহমদ, সমর সেন, সিকান্দার আবু জাফর প্রমুখ। তিন. ইসলামি ধারার উচ্চারণ : এ-ধারায় গোলাম মোসত্মফা, শাহাদাৎ হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ আলী আশরাফ, তালিম হোসেন প্রমুখ। বাংলা কাব্যে এ-তিনটি ধারা এখনো প্রবহমান, ভবিষ্যতেও ধারা তিনটি বাংলা সাহিত্য থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কা নেই।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প–তদের প্রয়াসের ফলে সত্মব্ধ হয়ে যাওয়া একটি ভাষারীতিকে নজরুল বাংলা সাহিত্যে স্বাভাবিক প্রবাহে প্রবাহিত করে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সত্যিকারের ভাষায় রূপামত্মর করেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের তত্ত্বাবধানে বাংলা গদ্যের যে-সূচনা হয়, পরে সংস্কৃতপ–তদের হাতে যার পরিণতি, তাতে বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা ছিল উপেক্ষিত। পরবর্তীকালে নদিয়া, শামিত্মপুর, কৃষ্ণনগরের মুখের ভাষাকে কেন্দ্র করে যে চলিত গদ্যের যাত্রা তাও ছিল মুসলমানদের জন্য কৃত্রিম। সেই কৃত্রিম ভাষায় নজরুল বাঙালি মুসলমানদের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এ-সম্পর্কে ড. হুমায়ুন আজাদ বলেন, ‘নজরুল বাংলা ভাষায় পুঁথিসাহিত্যের প্রাণের আগুনটুকু গ্রহণ করেছেন, তার জীর্ণ কঙ্কাল বহন করেননি।’

নজরুল স্বাতন্ত্র্য প্রয়াসী মুসলিম সমাজকে বাঙালি সমাজেরই একটি অংশ হিসেবে প্রমাণ করেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন – আমরা বাঙালি, তবে বাঙালি মুসলমান। বাংলা ভাষায় আমাদেরও অধিকার সমান। একটি কারণে বাঙালি মুসলমান সমাজ নজরুলের কাছে ঋণী, কারণটি হলো, নজরুল তাদের ভাষায় দীন পরিচয় ঘুচিয়ে তাদের সামাজিক ভাষাকে সাহিত্যসৃষ্টির ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। নজরুল কাব্য ও গদ্যে মুসলমানদের ঘরসংসারে ব্যবহৃত শব্দসমূহ ব্যবহার করে এমন একটা প্রক্রিয়ার সূচনা করেন, যার ফলে বাংলা ভাষার ‘অভিধান’ সংকলকদের নতুন সংস্করণে নতুন নতুন শব্দ-সংযোজনের একটা বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়। এটা বাংলা ভাষায় নজরুল ইসলামের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। এ-কৃতিত্ব কবি মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত বা রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের নয়। অন্য কোনো মুসলিম কবি-সাহিত্যিকেরও নয়।

আধুনিক বাংলা কাব্যের জনক মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা কাব্যে প্রথম পরিশ্রম্নতির সাধক। দ্বিতীয় পরিশ্রম্নতির সাধক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যাঁর হাতে বাংলা কাব্য অর্জন করে আমত্মর্জাতিক স্বীকৃতি। ধূমকেতুর মতো বাংলা কাব্যে তৃতীয় পরিশ্রম্নতি নিয়ে উপস্থিত হন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। হাজার বছরের বাংলা কাব্যের আবহমান ধারায় তিনি বাঙালি মুসলমানদের প্রথম সুযোগ্য প্রতিনিধি। ইন্দ্রিয়ঘন রোমান্টিকতা, লোকায়ত ভাবনার উন্মেষ, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অংশীদারিত্বে ভাস্বর ভাষাশৈলী বাংলা সাহিত্যে তাঁর মৌলিক পুঁজি। কবিতা, নাটক, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, শিশুতোষ ছড়া ছাড়াও নজরুলের রয়েছে প্রায় তিন হাজার বাংলা গান। অপরাপর সব সৃষ্টি বাদ দিলেও শুধু আধুনিক বাংলা গানের বৈচিত্রেই তিনি লাভ করেন অমরত্ব। আর ইসলামি সংগীতে তিনি এখনো অতুলনীয়। নজরুল সেই কবি, যিনি ‘বিদ্রোহী’ শীর্ষক একটা কবিতা লিখে সমগ্র ভারতবর্ষকে নাড়া দিয়েছেন। রাতারাতি হয়ে উঠেছেন জনপ্রিয়। যার কারণে ভীতসন্ত্রসত্ম হয়ে পড়ে ব্রিটিশ রাজশক্তি। এ রকম ঘটনা শুধু বাংলা সাহিত্য কেন, বিশ্বের কোনো সাহিত্যের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রাচ্যের রানী চট্টগ্রামের একটি আত্মিক সম্পর্ক ছিল। তিনি বেশ কবার চট্টগ্রামে এসেছেন। চট্টগ্রামের রেয়াজউদ্দিন বাজারের এক বাসায় বসে কবি লিখেন বিখ্যাত ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ কবিতা। এখানের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতেই নজরুলের হাতে সৃষ্টি হয় ‘সিন্ধু’ শিরোনামে তিন তরঙ্গে বিভক্ত দীর্ঘ কবিতা, যা মানব-বিরহের অসাধারণ অভিব্যক্তি। এমনি বিখ্যাত কিছু প্রেমের কবিতা চট্টগ্রামে বসেই তিনি রচনা করেছেন। চট্টগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত নজরুলের প্রেম বিরহের কবিতাসমূহ এখনো বাংলা কাব্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।