কাতারের মনোলোভা এয়ারপোর্টটি চোখ মেলে ভালো করে দেখার মতো সময় রুদ্রের হাতে নেই। সকাল দশটা ত্রিশ মিনিটের এয়ার মরক্কোর সংযোগ বিমানটি ধরার জন্য তার হাতে আর মাত্র সতেরো মিনিট সময় আছে। এমেরিটাস এয়ারলাইন্স  ঢাকা থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে যাত্রা শুরু করায় এই বিপত্তি। পরবর্তী ফ্লাইটের নিরাপত্তা ক্লিয়ারেন্স নিয়ে ৪৬ নাম্বার দ্বারের দিকে এক দৌড় দিলো সে। বোর্ডিং পাস এগিয়ে দিতেই বিমানকর্মী ছেলেটা বিনয়ের সঙ্গে জানাল, সরি স্যার, এয়ার মরক্কো হ্যাজ জাস্ট লেফট। বিফোর টেন মিনিটস ….।

রুদ্রকে সে নতুন বোর্ডিং পাস দিয়ে বলল, টুমরো ইউ উইল গো টু কাসাব্লাঙ্কা বাই এয়ার ফ্রান্স থ্রু প্যারিস। নাউ রিপোর্ট টু আওয়ার ম্যানেজমেন্ট টিম।

এমেরিটাস ব্যবস্থাপনা বিভাগে কর্মরত শ্রীলংকার জয়শান্ত হয়তো রুদ্রকে দেখে দয়াপরবশ হলেন। শ্রীলংকা তো বটেই বাংলাদেশ অথবা ভারত থেকে আসা যাত্রীদের স্বদেশভূমির মানুষ বলেই মনে হয় তার। তার ওপর রুদ্রের চেহারায় কেমন এক মায়ার স্পর্শ জেগে আছে যে জয়শান্তের বনপ্রান্তের পাশে কাটানো গ্রামে কৈশোরের স্মৃতিগুলো তাকে আনমনা করে চলল। রুদ্রকে কেন তিনি বিশেষ কিছু সুবিধা দেওয়ার তাড়না ও প্রয়োজন বোধ করছেন তা তিনি জানেন না। তার ভোগান্তির কারণে দুঃখ প্রকাশ করে জয়শান্ত বললেন, আমাদের এয়ারলাইন্সের সাথে সংযোগ বিমানের যাত্রী দিয়ে সব হোটেল ভর্তি। হজের মৌসুমে এমন জট বাঁধে। কী যে বাজে অবস্থা! আমি দেখছি, আপনাকে ভালো একটা হোটেল দেওয়া যায় কি না।

পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি তাকে দোহার ওরিক্স রোটানা নামের এক পাঁচতারকা হোটেলে থাকার কার্ড তো দিলেনই, বিএমডব্লিউ গাড়িতে তাকে হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করে দিলেন। সঙ্গে দিলেন হোটেলটিতে একশ পঁচিশ দিরহাম পর্যন্ত বিনামূল্যে খাবারের কুপন।

রুদ্রের পকেটের অবস্থা ভালো নয়। তার পকেটে আছে মাত্র একশ পঁচিশ ডলার। অবশ্য তার অন্য কোনো খরচ নেই। বিকেলে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে ছোট্ট শহরটা এক চক্কর দিয়ে দেখার ইচ্ছা তার অবশ্য আছে।

ওরিক্স রোটানার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ আর আতিথেয়তা মন এবং নজর দুই-ই কাড়ল রুদ্রের। তাকে বসানো হলো নরম এক সোফাতে এবং ঠিক এই মুহূর্তে এমন একটা সোফাতেই বসতে ইচ্ছা করছিল তার। যেখানে শরীর এলিয়ে কাচসদৃশ অভ্যর্থনার সুপরিসর কক্ষটি থেকে থরে থরে সাজানো সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। এ-মুহূর্তে সংযোগ বিমান ধরতে না পারার ঘটনা রুদ্রের কাছে বরং সাপে বর বলেই মনে হলো। এখানে-সেখানে ছোট ছোট পানির ফোয়ারা এবং কৃত্রিমভাবে সাজানো হলেও জ্যান্ত সবুজ চত্বরের মাঝে নির্বাচিত গাছ-ঘাস এবং ফুলের পরিচর্যা মরুর এক শহরে হোটেলটিকে অনন্যতার বিশেষত্ব দিয়ে থাকবে, এ-ব্যাপারে রুদ্র নিশ্চিত।

লবিতেই ঠান্ডা তোয়ালে আর এক গ্লাস ফলের রসের পানীয় নিয়ে যে পরিচারিকা রুদ্রকে স্বাগত জানাতে এলো তাকে দেখে রুদ্রের ভেতর কেমন শীতল অথচ প্রাণময়, শান্ত তবু হৃৎস্পন্দনময় অনুভূতি হলো তা তার কাছে স্পষ্ট নয়। এই নারীর চেহারায় মধ্যপ্রাচ্যের সৌন্দর্য থাকলেও তার মেদহীন শরীরের ঋজুতায়, চোখের তাকানোয় স্পষ্টতায় মেক্সিকান নারীর উপস্থিতি। তার কর্তব্যের খাতিরেই হয়তো মেয়েটি মিষ্টি করে হাসল,

ওয়েলকাম টু দিজ চার্মিং প্যারাডাইস, স্যার।

থ্যাংক ইউ।

ওয়েট অ্যা মোমেন্ট প্লিজ। অ্যা’ম ব্রিংগিং ইয়োর রিজার্ভেশন কার্ড। ক্যান আই গেট ইয়োর পাসপোর্ট।

পাসপোর্ট নিয়ে বাইশ অথবা চব্বিশ বছরের মেয়েটি অভ্যর্থনা ডেস্কে সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে রুদ্রকে চোখের ইশারায় ডেস্কের কাছে ডাকল। তরুণীর বয়স আন্দাজ করতে গিয়ে কেন বেজোড় সংখ্যা ব্যতীত শুধু জোড় সংখ্যা তার মাথায় খেলা করছে তা রুদ্রের বোধের বাইরে। তার চোখের ইশারায় রুদ্র জাপানি-বিনয় আবিষ্কার করল। মায়াকাড়া এই চাউনিটা মেক্সিকান শরীরের ধারালো ধাঁচে গড়া তরুণীর অভিব্যক্তিতে যেন ঠিক মানাল না। কিন্তু সমস্যা সেখানে নয়, সমস্যা হলো –    তরুণীর হরিণী চোখের এই চাউনির মাঝে যে-চকিত ভাষা তা আবার আনমনা করে দিলো রুদ্রকে। সে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ভ্যানিলার সঙ্গে বুনো বেরি এবং জেসমিনের, আদিম কোনো বনস্পতির চটুল সুবাসের সঙ্গে কিসমিস, গোলাপের কুঁড়ির সঙ্গে পদ্মরাগের ঘ্রাণ রুদ্রের আনমনা ভাবকে তাড়া করল।

অ্যানিথিং এক্সট্রা ইউ উড লাইক টু হ্যাভ ইন ইয়োর রুম, স্যার? এই প্রশ্নে রুদ্র পকেট নিয়ে খুব সচেতন হয়ে উঠল। দ্রুত উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। সে বলল,

নো থ্যাংকস।

ইয়োর সিগনেচার, প্লিজ।

স্বাক্ষরপর্ব শেষ হলে রুদ্রকে নিয়ে মেয়েটি হোটেলকক্ষে যাওয়ার জন্য লিফটের সামনে এসে দাঁড়াল। ছয়তলা ভবনটির চতুর্থতলায় তার কক্ষ। কাচের লিফটে উঠে অভ্যর্থনাকেন্দ্রের আনুভূমিক হয়ে ক্রমশ উঁচুর দিকে সাজানো রেস্টুরেন্টটা রুদ্রের কাছে  সিনেমার ক্যামেরায় যেভাবে উন্মোচিত হয়, ঠিক সেভাবেই উন্মোচিত হলো। সহজ ভঙ্গিতে রুদ্র মেয়েটার দিকে তাকাল। সে নিশ্চিত দোহারের স্থানীয় মেয়ে সে নয়। তার সাদা শার্টের শেষাংশ স্কার্টের নিচে তো প্রবেশ করেইনি, নাভির ওপরেই তার প্রান্তটা শেষ হয়েছে, যেন স্কার্ট আর শার্ট মিলে শরীরের উদ্ভিন্ন অংশকে স্পষ্ট করার জন্য একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বড় বড় চোখের ভিতরে নিরীহ ভঙ্গিমার মেয়েটির ভাঁজময় শরীরটা রুদ্রকে আকৃষ্ট করার পরিবর্তে কেন যে মেয়েটির প্রতি তাকে এত দয়াপরবশ করে তুলছে তা সে জানে না। জয়শান্তের উদারতা কি সংক্রামক রোগ হয়ে তাড়া করে ফিরছে তাকে! তার প্রভাবে সে-ও কি এখন ‘মানুষ’ শব্দটার প্রতিই উদার হয়ে উঠছে? সে আগপিছ কিছু চিন্তা না করেই ইংরেজিতে বলে বসল, অ্যা’ম রুদ্র। নামটা ধাতস্থ করার জন্য তরুণী রুদ্রের দিকে এমনভাবে তাকাল যে লিফটের ভেতর সামান্য এই ক্ষণকে তার যুগ-যুগান্তরের সমান বলে মনে হলো। মেয়েটি পরিচিত হওয়ার ভদ্রতা সারতেই হয়তো ডান হাত বাড়াল। তার কোমল আর লম্বা আঙুলগুলো রুদ্রের ডান হাতের মাঝে সেই পর্বের স্নিগ্ধতা ছড়াল,

মি অ্যামেলিয়া। অ্যামেলিয়া অ্যান্দ্রিয়া ফ্রম তিউনিশিয়া।

অ্যামেলিয়ার শরীরে ভ্যানিলার সঙ্গে বুনো বেরি এবং জেসমিনের, আদিম কোনো বনস্পতির চটুল সুবাসের সঙ্গে কিসমিস, গোলাপের কুঁড়ির সঙ্গে পদ্মরাগের ঘ্রাণ এইটুকু সময়ে এতো চেনা মনে হচ্ছে যেন এই ঘ্রাণটার সঙ্গে তার জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক। ঠিক তখনই আবার রুদ্রের মনে হলো তার ম্যানিব্যাগে মাত্র একশ পঁচিশ ডলার অবশিষ্ট আছে। এতো তেজহীন ওয়ালেট নিয়ে এমন মনোলোভা সৌরভে মগ্ন হওয়াটা অতিমাত্রায় বিলাসিতা নিঃসন্দেহে।

তবু তিনতলার কক্ষটিতে ঢুকে মন ভরে গেল রুদ্রের। বিরাট পালঙ্কের সাদা বিছানা, প্রাচীন আভিজাত্যের আসবাবপত্রের সঙ্গে সোনাঝরা আলো বিচ্ছুরণকারী মার্বেল পাথরের এই পুরীতে ‘একা’ থাকার ভাবনা তার কাছে বাহুল্য বলেই মনে হলো। কী অদ্ভুত! অ্যান্দ্রিয়া যেন তার মনের কথা ধরেই ফেলল। নাকি এই মেয়েটা সঙ্গীবিহীন সব অতিথিকে এই বাক্য শুনিয়ে তার হৃদয়কে অতৃপ্ত করে তোলে?

আমি খুব দুঃখিত যে, এমন সুন্দর ঘর আর বিছানায় তোমাকে একা কাটাতে হবে। এসব বাক্যের প্রত্যুত্তর দিতে অনভ্যস্ত রুদ্র অ্যান্দ্রিয়ার কথায় আজ কোথা থেকে ভাষা পেয়ে গেল। হয়তো এমন অনিন্দ্যতায় অ্যামেলিয়ার মতো কোনো কল্পনানারী তার জীবনসঙ্গী হলে সে ধন্য হতো – এমনটা সেও ভাবছিল বলেই তার মুখ ফসকে বের হয়ে গেল,

কাউকে কল্পনা করে তার সঙ্গে হাসব, কথা বলব …

অ্যামেলিয়া আগ্রহভরে রুদ্রকে দেখল। বুকের কাছে আড়াআড়ি দুই হাত রেখে তার সামনে এসে দাঁড়াল এবং তার চোখের মনির ভেতর নিজের দৃষ্টিকে প্রসারিত করল। দৃষ্টিসীমায় প্রশ্নবোধক চিহ্ন তার চোখকে সংকুচিত করল,

তারপর …?

দোহার তাপদাহটুকু লিফট থেকে বের হওয়ার পর রুদ্র টের পেয়েছিল। লম্বা করিডোর পেরিয়ে হেঁটে আসায় অ্যামেলিয়ার ত্বকে স্বেদ দেখা না গেলেও রুদ্র তবু ভ্যানিলার সঙ্গে বুনো বেরি এবং আদিম কোনো বনস্পতির চটুল সুবাসের অস্তিত্ব টের পেয়েছিল। এখন এই শীতল শান্তির রাজ্য তার নাসারন্ধ্রকে সতেজতার সঙ্গে সচেতনও করে তুলেছে। রুদ্র নিশ্চিত, অ্যামেলিয়ার ত্বকের নিজস্ব গোপনঘ্রাণের সঙ্গে শরীরে ছড়ানো সৌরভের দারুণ প্রতিযোগিতা চলছে। আর জগতের এইসব গোপন ব্যাপারের সঙ্গে নারী-পুরুষের শারীরবৃত্তীয় হরমোন কী অদ্ভুত খেলায় মেতে ওঠে যে, একজন অচেনা পুরুষ অথবা নারী না বলেও কত কিছু বলে যায়। বলতে না পারলেও কত স্মৃতিক্ষত রেখে যায়। তারই আবেশে রুদ্র বলে বসল,

তারপর আর কী? তুমি তো এখন চলে যাবে। আর আমার এই হৃদয়জুড়ে আলো ছড়ানো সুখের ইঙ্গিত ছড়িয়ে পড়বে এই ঘরের আনাচে-কানাচে। তারপর … তারা ফিরে ফিরে আসবে আমারই শূন্য হৃদয়ের ডানা ধরে ধরে।

এই কথায় অ্যামেলিয়া উদাসীন তো হলোই না বরং উচ্ছলতা তাকে প্রাণময় করে তুলল। সে দ্রুত রুদ্রকে কক্ষটির সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সব ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দিয়ে প্রয়োজনের সময় করণীয়গুলো সংক্ষেপে বলে মিষ্টি হেসে ঘর থেকে বের হতে গিয়ে বলল,

তোমার জন্য একশ পঁচিশ দিরহাম মূল্যের খাবার ফ্রি। ফোন করে অর্ডার দিও।

দুই

নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ভেতরটা দমে গেল রুদ্রের। সে সোফায় চুপ করে বসে নিজের বোকামিকে ধিক্কার দিলো কতক্ষণ। সময়ের তালে দ্রুত ধাবমান এক বিশ্বে সে এখনো পড়ে আছে অনেক পেছনে বলে তার মনে হলো। কথাগুলো ভাবতে গিয়ে তার উচ্ছ্বাসহীনতার স্থানটুকু দখল করল এক ধরনের লজ্জা। তা কাটিয়ে ওঠার পর গোসল সেরে সে খাবারের মেনু হাতে নিয়ে দেখল একশ পঁচিশ দিরহাম মূল্যের মধ্যে মাত্র একটাই ভারতীয় খাবার আছে – খাসির মাংসের বিরিয়ানি। সঙ্গে একটা ঠান্ডা পানীয়। সুতরাং শহরটা ঘুরে বেড়ানোর স্বার্থে আপাতত দুপুরের খাবার বাদ দিয়ে রুদ্র তার কক্ষে রাতে মেনুর ওই খাবারটিই সরবরাহের আদেশ দিলো।

বিশ্রামের জন্য বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই অতল ঘুমে তলিয়ে গেল রুদ্র। ঘণ্টাদুয়েক পর কারো হাতের স্পর্শে ঘুম ভেঙে গেল তার। চোখ মেলেই তার বিছানার পাশে বসা তরুণীর দিকে সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকাল। হোটেলের অভ্যর্থনার জন্য পরিধেয় পোশাক ছাড়া শার্ট আর ঢিলেঢালা প্যান্টে অ্যামেলিয়াকে একেবারেই অন্যরকম লাগছে।  স্নানশেষের চোখেমুখ যেন গোলাপের কুঁড়ির মতো স্নিগ্ধ, পবিত্র, তবু চোখের ভাষায় অদ্ভুত একধরনের আশাহীনতা। অ্যামেলিয়ার এতো সুন্দর চোখদুটোতে এই স্বপ্নহীনতার ভাষা যেন তাকে ঠিক মানাচ্ছে না। এবং মেয়েটার অমন অভিব্যক্তি তাকে অসাড় করে রেখেছে। শরীরের অসাড়তা কাটিয়ে রুদ্র উঠে বসতে চাইলেও সে নড়ল না। অ্যামেলিয়াই এবার  তার ঘুমঘোর কাটাল,

লাঞ্চটাইম ইজ গোয়িং টু বি ওভার। ইউ স্লেপ্ট অ্যা লট। মোর দ্যান টু আওয়ারস …

অ্যান্দ্রিয়া!

সবাই আমাকে অ্যামেলিয়া বলে সম্বোধন করে। হোটেল ইউনিফর্মের নেমপ্লেটেও তাই-ই লেখা। তুমি কেন ‘অ্যান্দ্রিয়া’ ডাকলে? এ-প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রুদ্র জানতে চাইল,

বিকেলেই তোমার আট ঘণ্টা ডিউটি শেষ হওয়ার কথা। হ্যাঁ, তোমার পোশাকও বদলেছে। কিন্তু …

অ্যামেলিয়াও এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে বলল,

রুম সার্ভিস ৫০৭ নাম্বারে ফোন করে খাবার পাঠাতে বলো। ওরা তোমার কাছে জানতে চাইবে, ‘অ্যানি এক্সট্রা চয়েস, স্যার?’ তুমি বলবে, ‘ইয়েস। অ্যামেলিয়া। দ্যাটস অল।’

রুদ্র যেন একটা পুতুল। কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। শুধু সে তার আদেশমতো বিছানার পাশের ছোট্ট টি-টেবিলের দিকে হাত বাড়াতেই অ্যামেলিয়া হ্যান্ডসেটটা তার দিকে এগিয়ে ধরল। ভ্যানিলার সঙ্গে বুনো বেরি এবং জেসমিনের, বনস্পতির চটুল সুবাসের সঙ্গে কিসমিস, গোলাপের কুঁড়ির সঙ্গে পদ্মরাগের সৌরভে এবার নারীর ভেজা ত্বকের ঘ্রাণটুকু আরো স্পষ্টভাবে টের পেল রুদ্র। পৃথিবীজুড়েই অনেক সুন্দরী মেয়ে দেহব্যবসায় নেমে পড়েছে। রুদ্রের মনে একবার অ্যামেলিয়াকে নিয়ে তেমন নেতিবাচক ধারণা জন্মাতে গেলেও নিজের ভেতর সে তীব্র প্রতিবাদ উপলব্ধি করল। অ্যামেলিয়াকে তার কিছু বলতে মন চাইল। তার আগেই অ্যামেলিয়া ফোনের বাটনগুলো চেপে দিয়েছে এবং দ্রুতভঙ্গিতে উঠে সে চপল পায়ে রুদ্রের কক্ষ ত্যাগ করল। ফোনে অ্যামেলিয়ার শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো বলার পর উঠে বসল। তার মনে হাজার প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। ব্যাপারটা রহস্যজনক মনে হচ্ছে। কী চায় মেয়েটা? এই ধরনের মেয়েরা টাকা ছাড়া অন্য কিছুকে খুব বেশি পাত্তা দেয় বলে তার মনে হয় না। তাহলে অ্যামেলিয়ার কি ধারণা রুদ্রের কাছে অনেক ডলার আছে?

এই বিএমডব্লিউ কারটাই তার এমন সর্বনাশ করল কি না কে জানে। মনে মনে বলল সে, ‘শ্রীলংকার ভদ্রলোক খাতির দেখাতে গিয়ে বেশ ফ্যাসাদে ফেলল দেখছি।’ এতোক্ষণ পর তার মনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রশ্নটা জাগল। ভেতর থেকে না খুলে দেওয়া পর্যন্ত এসব তারকা হোটেলের কক্ষে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। তাহলে? সে ধীর পায়ে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গেল এবং অবাক হয়ে লক্ষ করল, তার কক্ষের আভিজাত্যময় কপাটটি একটু খোলা। দরজার হুকটা আন্দ্রিয়া এমনভাবে নামিয়ে রেখেছে যেন তা লক না হয়ে যায়। তার মানে এই কক্ষে সে গত দুই ঘণ্টা এমন নিরাপত্তাহীনতার মাঝে অ্যান্দ্রিয়ার নিয়ন্ত্রণে ঘুমিয়েছে? মেজাজটা বিগড়ে যেতে নিয়েও শেষে অ্যামেলিয়ার পক্ষ নিল। তার কারণ শুধু তার সৌন্দর্য নয়; গভীর ধারালো চোখের স্বপ্নহীন ভাষা।

বাথরুম সেরে আলতো আর অলস ভঙ্গিতে রুদ্র তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আনমনা হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখন দরজাটা পুরো খুলে যেতেই চমকে রুদ্র সেদিকে তাকাল। অ্যামেলিয়া খাবারভর্তি ট্রে হাতে ঢুকতেই দরজাটা ভেতর থেকে লকড হয়ে গেল। ট্রেতে একটা মাটির হাঁড়ি। অ্যামেলিয়া পাতিলের মুখটা খুলতেই তা থেকে ধোঁয়া এবং খাবারের সুঘ্রাণ বেরিয়ে এসে রুদ্রের ক্ষুধা বাড়িয়ে দিলো। সোফার সামনে ছোট্ট টেবিলটায় খাসির বিরিয়ানির সঙ্গে সালাদ আর হোটেলের সৌজন্যমূলক অন্যান্য কয়েক পদের খাবার নামিয়ে রাখতে রাখতে অ্যামেলিয়া বলল,

খাবারগুলো ঠান্ডা হওয়ার আগেই তোমার খেতে বসা উচিত।

হ্যাঁ, ঠিক তাই। রুদ্রের পেট চো-চো করছে। কিন্তু খেতে বসে সে থেমে গেল,

তুমি খেয়েছ?

হ্যাঁ, খেয়েছি তো।

ওকে। কিন্তু তোমাদের স্টাফদের খাবার কোথায় এবং কীভাবে মানে আমি আসলে বলতে চাইছি …

ইট’স ওকে। তুমি খেয়ে নাও।

অ্যামেলিয়ার সামনে খেতে তার অস্বস্তি লাগছিল। খাবার দিয়ে পরিচারিকার চলে যাওয়ার কথা। অথচ সে চলে যাক –    তাও তার মন চাইছে না। অ্যামেলিয়ার জীবনেতিহাসে কী এক রহস্যময় ব্যাপার আছে যা তার খুব জানতে ইচ্ছা করছে। খাবার প্লেটে নিতে নিতে সে দেখল অ্যামেলিয়া পড়ার টেবিলের ওপর বসে চেয়ারে পা আর থুঁতনিতে হাত রেখে রেখে গভীর মনোযোগের সঙ্গে রুদ্রকে দেখছে। তার চোখের ভাষার আশাহীনতায় একরাশ উচ্ছ্বাস। কী জানি, কিছুটা হয়তো স্বপ্নও দুলছে। তার পালাজ্জো তার পা-দুটো আবৃত করার কথা ভুলে গিয়ে তার দুধে-আলতায় আভাময় মসৃণতা একেবারে নিতম্বের ভাঁজ পর্যন্ত উন্মুক্ত করে রেখেছে। সেদিকে মোটেও খেয়াল না থাকলেও একবার তাকিয়েই রুদ্র লজ্জা-পাওয়া চোখ দুটো যথাসম্ভব অ্যামেলিয়ার চোখে রেখে বলল,

তুমি কি কিছু মনে করবে, যদি আমি তোমাকে আমার সঙ্গে খাবার অফার করি। আসলে … আমার দেশে কাউকে সামনে রেখে একা একা খাওয়ার সংস্কৃতি নেই তো! আর এতো খাবার, আমার পক্ষে এর অর্ধেকটুকুও খাওয়া সম্ভব নয় …

আমি এখন এক পরিচারিকা মাত্র। হোটেলের সামান্য এক পরিচারিকাকে একজন অতিথি খাবার অফার করছেন, খুব একান্তভাবে তারই কক্ষে …    

তুমি তো চাকরির পোশাকে নেই!

হুম, তুমি অবশ্য অ্যামেলিয়াকে চেয়েছ। পরিচারিকাকে নও। আমি তোমার সঙ্গে খেতেই পারি …

বাক্যটা শেষ করে কী যেন ভাবল সে। কিছু একটা বলতে গিয়ে তার চোখ-মুখ লাজুক হয়ে উঠল। নিজের পক্ষাবলম্বন করার চেয়ে রুদ্রের মন খারাপ হলো। মেয়েটার অমন অভিব্যক্তি দেখে তার জন্য হৃদয় দয়ার্দ্র হয়ে উঠল। অ্যান্দ্রিয়া তার লাজুক দুই অক্ষিগোলক মেলে ধরল রুদ্রের চোখের দিকে। কিন্তু তার দৃষ্টির মাঝে লুকানো ভাষাটুকু বেশিক্ষণ ওভাবে তাকিয়ে থাকার ভার সহ্য করতে পারল না। রুদ্রকে অবাক করে সে বলল,

আমি জানতাম, তুমি আমাকে খেতে বলবে।

জানতে!

এশিয়ার কিছু তরুণ এখনো শরীরের বাইরে নারীর মনের ভেতর উঁকি দেওয়ার মতো মানবিকতা ধারণ করে। তোমাকে দেখেই আমার তাই মনে হয়েছিল। খাবার কিনে খেয়ে আমি আমার হাতের পয়সা শেষ করতে চাই না। পরিচারিকার পোশাকে লবিতে বসে আমি তখন মনে মনে এমন একজন কাস্টমারকে কল্পনা করছিলাম যার সঙ্গে বসে খেতে আমার নিজের ভেতরটা আপত্তি তুলবে না, অস্বস্তি বোধ হবে না। তার এই কথায় আগপিছ কিছু না ভেবেই রুদ্র বলল, আমি ভাগ্যবান নিঃসন্দেহে।

গরম খাবারগুলো কাচের টি-টেবিলে গুছিয়ে রাখতে রাখতে অ্যান্দ্রিয়া চমকে আড়চোখে রুদ্রের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ তাকিয়েই থাকল।

… তাই আমি খাবার বেশি তুলে এনেছি। দুজন খাব বলে … গতকাল লাঞ্চের পর আমার ভাগ্যে খাবার জোটেনি। কোনো ভণিতা ছাড়াই অ্যামেলিয়া ক্ষুধার্ত মানুষের মতো খেতে আরম্ভ করে বলল,

আমার খাবার এখানে ফ্রি নয়। আর আমি হোটেলের কোনো কর্মচারীও নই।

অ্যামেলিয়ার কথায় চমকে নতুন এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল রুদ্র। অ্যান্দ্রিয়ার বলার ধরনে রাখঢাক না থাকলেও তার স্পষ্ট বাক্যের মাঝে নতুন এক জীবন আর তার আকুতি রুদ্রের ভেতরটা সমূলে কাঁপিয়ে দিলো। তবু সে স্পষ্ট করেই প্রশ্ন তুলল,

তাহলে? তুমি খাওনি কেন? এই হোটেলে তাহলে তুমি কী করছ?

সে এক লম্বা গল্প। যা উপার্জন করি তা দিয়ে পেট চললেও, ইউ নো রুদ্র, আই নিড অ্যা লটস অব মানি টু রিটার্ন হোম …

তাহলে এখানে এলেই বা কেন?

খাবারের গ্রাস মুখের মধ্যে সামলে নিয়ে অ্যামেলিয়া বলল, আমি তো আসতে চাইনি। আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে।

অ্যামেলিয়ার জীবনের চারপাশে ঘনীভূত রহস্যটুকুর গন্ধ পেয়ে রুদ্রের স্নায়ু সজাগ হয়ে উঠল। বাক্যদুটো বলে অ্যামেলিয়া বড় বড় মায়াবী অথচ স্বপ্ন হারিয়ে ফেলা চোখ দুটোকে অক্ষিগোলকের চারপাশে ঘুরিয়ে অর্থহীনভাবে আবার বলল, বলতে পারো আমাকে বাধ্য করা হয়েছে।

কে বা কারা করল, কেন করল?

কারা করল তা আমিও জানি না। তবে মিস তিউনিশিয়া প্রতিযোগিতায় রানারআপ হওয়ার পর আমার জীবন এলোমেলো হয়ে গেল। এই পৃথিবী এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, চ্যাম্পিয়ন না হলে কেউ তোমার ধার ধারবে না। একজন তরুণী যদি রানারআপ হয়, তাহলে তার স্থান হবে কোনো ম্যাগাজিনের ভেতরের পাতায় অথবা কোনো সিনেমার আইটেম সংয়ের যৌনাবেদনময়ী নর্তকীর ভূমিকায়। সে হবে মানুষ নিয়ে জুয়াড়িদের ধান্দাবাজির বস্তু। কাভার পেজ অথবা নায়িকার ভাগ্য যে সুপ্রসন্ন তাও নয়। মিডিয়ার লাফঝাঁপ শেষ হলে তাকেও ভাঙানোর জন্য জুয়াড়িরা তৈরি হয়েই থাকে।

কিন্তু তুমি বাধ্য হলে কেন?

আমাকে একটা ভালো চাকরির কথা বলা হলো। তাও এখানে।

হ্যাঁ, তা তো করছই। রুদ্রের কথা শুনে বেদনাহত তবু রাগ ফুটে ওঠা কালো পাপড়ির ভেতর বড় বড় চোখ দুটো মেলে অ্যান্দ্রিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে

থাকল। রোষানলের সঙ্গে বেদনামিশ্রিত সেই দৃষ্টিতে একসময় শিশির জাগল যেন। শান্ত ভঙ্গিতে, ধরে আসা কণ্ঠে সে বলল,

না, করছি না।

তাহলে?

আমাকে বেতন দেওয়া হয় না। কাস্টমারের সঙ্গে বিছানায় গেলে কিছু বখশিশ দেওয়া হয়।

এই বাক্য শুনে বজ্রাহত রুদ্র তালগোল হারিয়ে রাগ-বিরাগ, ঘৃণা-ভালোবাসার ঊর্ধ্বে সামনে বসা অ্যান্দ্রিয়া নামের তরুণীকে নতুন করে দেখতেই থাকল। সেই দেখায় যত না আগ্রহ তার চেয়ে বেশি প্রশ্নের যন্ত্রণা। অ্যামেলিয়া তখন বলেই চলেছে –

যদিও কাস্টমার নির্বাচনে আমাকে স্বাধীনতা দেওয়া আছে। আর না খেয়ে মরার মতো পরিস্থিতি না হলে আমি আসলে …

তার সঙ্গে রুদ্রও ভাষা হারিয়ে ফেলল। ভাষা-হারানো চোখে দুজন দুজনের চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে। 

যদি তুমি ভাবো, আমি আনন্দের সঙ্গে এই কাজ করছি … তাহলে সত্যি আমি তোমার সঙ্গে খাওয়ার জন্য লজ্জিত। আমি এখান থেকে পালানোর জন্য সারাক্ষণ একটা পথ খুঁজছি। খুঁজছি একজনকে যার সঙ্গে আমি পাড়ি দেবো। সাগর এবং মরুভূমি পাড়ি দিয়ে আমি পৌঁছে যাব আমার নিজের ঘরে।

তোমার বাবা-মা?

ভাইবোনও আছে। ফোনে ওদের প্রতিবার বলি আমি ভালো আছি, ভালো জব করছি। আর প্রতিবার আমি মিথ্যাগুলো বলে কান্না করি। যতক্ষণ শাওয়ারের ঝরনা আমাকে শান্ত না করে ততক্ষণ আমার কান্না চলতেই থাকে।

প্লেটে খাবার রেখেই অ্যান্দ্রিয়া উঠল। দ্রুত বাথরুমের দিকে গেল। সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেকে ধিক্কার দিলো রুদ্র। খাবারের সময় ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে সে মেয়েটাকে কী কষ্টটাই না দিলো! স্নানঘর থেকে বেরিয়ে হাত-মুখ মুছতে মুছতে অ্যান্দ্রিয়া বলল,

না, তুমি নিজেকে অপরাধী ভেবো না। খাওয়ার সময় প্রশ্নগুলো করে তুমি কোনো অন্যায় করোনি। বরং মুখের সামনে অন্ন নিয়ে বলা আমার প্রতিটা কথায় তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা ছিল।

তবু আমি দুঃখিত অ্যান্দ্রিয়া।

কী আশ্চর্য, মা-বাবা ছাড়া আর কেউ আমাকে আমাকে এই নামে ডাকে না। তুমি ডাকলে? তাই-ই বলে ডেকো। আমাকে কখন বিছানায় পাবে – এমন চিন্তা তোমার মাথায় একবারও আসছে না দেখে আমি স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে উঠছিলাম।

তোমাকে নিয়ে আমি চিন্তিত।

আমার দুর্ভাগ্য বলতে পারো। যাদেরই নির্বাচন করি … কেন যেন তাদের ম্যানিব্যাগ অথবা ক্রেডিট কার্ড দুই-ই দুর্বল। এতো দুর্বল যে, পাঁচশ ডলার বিল দিতে নিজের হাতের দামি ঘড়িটা … আরে বাবা, পয়সা নাই তো ওরিক্স রোটানায় কেন আসো? বেগার!

রুদ্রের বুক কেঁপে উঠল। তার পকেটে পয়সা নেই। ছুটিতে গিয়ে কেনাকাটা করতে করতে সে ক্রেডিট কার্ডের লিমিট শেষ করেছে। এখন!

আমাকে এখান থেকে কেউ-ই নিয়ে যাওয়ার মতো দুঃসাহস দেখাল না। তবে তুমি একমাত্র তরুণ যে কি না বিএমডব্লিউ নিয়ে এলো। আমি নিশ্চিত তুমি ওদের দলের নও এবং আমি একই সঙ্গে নিজ দেশে ফেরার ব্যাপারে আশাবাদী।

তিন

বুক ঢিপঢিপ করলেও রুদ্র হাত ধুয়ে-মুছে অ্যামেলিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। অ্যামেলিয়াকে সব খুলে বলা দরকার। মেয়েটা অযাচিতভাবে অনেক স্বপ্নঘোরে তলিয়ে যাচ্ছে। তাকে জড়িয়ে ফেলছে এমন কোনো অনাগত ঘটনার সঙ্গে যার জন্য তার নিশ্চিত একটা গোছানো জীবন, ভালো একটা চাকরি এবং বাঙালি এক তরুণীকে বিয়ের স্বপ্ন – সবই ভেস্তে যেতে বসেছে। রুদ্রকে ভিক্ষুক ভাবলে তার কিছু এসে-যায় না। পৃথিবীর অনেক তারকা হোটেলে হয়তো অনেক অ্যামেলিয়ার গল্প একইভাবে জন্ম হয়েই হারিয়ে যাচ্ছে।

জন্ম-মৃত্যুর এমন এক গোলার্ধে সব ভোগান্তি থেকে যে নিজেকে রক্ষা করতে পারে সে-ই সফল। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মে রুদ্র এতদূর এসেছে তার কর্মফল দিয়ে। এখন সে এমন কোনো ভুল করতে চায় না যার জন্য তার জীবনের সঙ্গে ভোগান্তি শব্দটা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়। সে আফ্রিকায় বসেও বুকভরে বাংলাদেশের শিশিরভেজা ঘাসের সকাল অনুভব করতে চায়। মননে ঋদ্ধ তবু সুন্দরী এক বাঙালি হবু বঁধুর কল্পনায় আফ্রিকার রাতের জোছনাতেও বাংলার রুপালি আলোয় প্লাবিত এক পাহাড়ি বাংলোয় তার কানে ফিসফিস স্বরে প্রেমের কবিতা ঢালতে চায়। যতই সুন্দরী হোক তিউনিশিয়া থেকে আসা তরুণীর মননে বাংলার নারীর মতো নদীর তরঙ্গিত ঢেউয়ের মায়া নেই। তার  নির্মেদ, ঋজু এবং ভাঁজময় শরীর যতই আকর্ষণীয় হোক সেখানে বাংলার নারীর মতো নিশ্চিতভাবে কচুপাতার টলমল জলের মতো কোমলতা এবং বৃষ্টিরাতের জবুথবু অলসতা নেই। যার সঙ্গে আজীবন কল্পনার রঙের কোনো মিল নেই … তার ভাবনায় কিছুই এসে-যায় না।

অ্যান্দ্রিয়াকে এড়ানোর জন্য সত্য কথাগুলো সে মেয়েটাকে বলতে সংকল্পবদ্ধ হলো। হাত মোছার তোয়ালে সে গোলাপের আভামিশ্রিত বিছানার চাদরের ওপর ফেলে দিয়ে অ্যান্দ্রিয়ার মুখোমুখি দাঁড়াল। খালি পায়ের অ্যান্দ্রিয়ার উচ্চতা তার মাথা বরাবর। ওভাবে রুদ্রকে কাছে আসতে দেখে অ্যান্দ্রিয়া কী ভুল অথবা সঠিক সংকেত পেল, অথবা তার নারীহৃদয় কী অনুভবে আন্দোলিত হলো যে, সে দ্বিধাহীন হয়ে তার লম্বা দুই বাহু রুদ্রের কাঁধে প্রসারিত করে, নিজের বুকটা সযত্নে দূরত্বে রেখেও তাকে জড়িয়ে নিল। অ্যান্দ্রিয়া তার কপালে নিজের কপাল ছোঁয়াল। চিরপরিচিত বন্ধুর মতো রক্তাভ, নরম গাল দিয়ে রুদ্রের গাল স্পর্শ করল। অ্যান্দ্রিয়ার শরীরে ভ্যানিলার সঙ্গে বুনো বেরি এবং জেসমিনের, আদিম কোনো বনস্পতির চটুল সুবাসের সঙ্গে কিসমিস, গোলাপের কুঁড়ির সঙ্গে পদ্মরাগের সেই সৌরভ! এই সৌরভের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে তার মেঘের মতো কালো কেশগুচ্ছে ব্যবহার করা কোনো এক শ্যাম্পুর সৌরভ। একে অন্যের মাঝে বিলীন এইসব সৌরভে তলিয়ে, নিজেকে হারিয়ে রুদ্রের মনে হলো, বৃষ্টিরাতের জবুথবু অলসতা নিয়ে কোনো এক নারী তার বুকে আসছি আসছি করেও আসছে না। যৌবনের আগমনে চৈত্রের তেজি এবং নির্জন দুপুরে সে যখন কোনো এক পরির মতো সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে কল্পনায় একা একা কথা বলত … মনে হলো ফাগুনের উচ্ছ্বাস নিয়ে তেমনই একজন তার কানের কাছে শ্বাস ফেলছে। ঘন, নিবিড় সেই প্রশ্বাস! তার খুব ইচ্ছা করল, তাকে আরো কাছে টানতে। কিন্তু কাজটা করতে গিয়ে দুই বাহু দিয়ে অজান্তে অ্যান্দ্রিয়ার কোমর আলতো জড়িয়ে ধরলেও তাকে নিজের দিকে নিবিড় করার শক্তি কোনোভাবেই তার দুই বাহুতে এলো না। কাজটা অ্যামেলিয়াই করল। আরো নিবিড় হয়ে সে বলল,

আমি কাল রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নটা শোনার নেশায় রুদ্র প্রশ্ন করল,

কী দেখেছ?

আমাদের হাতের ডানপাশে, অনেক দূরে নাইজার নদীর কিনার ধরে শস্য আর গাছের প্রবাহ। আমাদের হাতের বামদিকে মরুভূমি। জনমানবশূন্য সেই প্রান্তরে অনেক দূরে রাখাল তার পাল নিয়ে নদীর দিকে যাচ্ছে।

আমাদের?

আমার সঙ্গে সুদর্শন এক তরুণ। তাকে না চিনলেও স্বপ্ন যেন ওরই ভেতর দিয়ে আমার নিজকে চিনিয়ে দিচ্ছিল। আমি ছেলেটাকে এতো ভালোবাসি যে, আমি তাকে এবং আমাকে আর ভালো করেই চিনতেই পারি না। তার প্রতি আমার ভালোবাসা আমার ভেতরকে উন্মোচন করল এমনভাবে যে, আমিও সেই রাখাল হওয়ার মতো অনুভবকে কল্পনাতেই ধরতে পারলাম। তবে বুঝতে পারলাম আমরা দুজনই খুব পিপাসার্ত।

আমরা কোথায় যাচ্ছিলাম?

আমরা? হ্যাঁ, আমরাই তো! তোমাকে দেখার পর আমার মনে হলো … তুমি ছাড়া স্বপ্নের সেই তরুণটা আর কেউ ছিল না।

নিজেদের চেনার পর আর দূরত্ব যেন থাকে না। তারা নিবিড় হয় একে অন্যের মাঝে নিবিড় হয়,

আমরা কোথায় যাচ্ছি?

তিউনিশিয়া। আমাদের বাড়িতে।

সঙ্গে সঙ্গে রুদ্রের যেন একটু ঘোর কাটে। মায়ের কথা মনে পড়ে। মাকে সে যদি বলে, তিউনিশিয়াতে সে খুঁজে পেয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে কচুপাতার মতো নিবিড় এক সবুজকন্যাকে। যার গোলাপি ত্বকে খেলা করে টলমল বৃষ্টিফোঁটার কোমল এক স্মৃতি। যার হাসিতে, চোখের কোণে সে খুঁজে পেয়েছে তেজি এবং নির্জন চৈত্রদুপুরের মন উদাস সময়ের ফিসফিস গল্পকথার সেই পরিকে যার ডানা নেই বলে মরুভূমিতে হাঁটতে গিয়ে সে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছে।

পকেটের মাত্র একশ পঁচিশ ডলারের শেষ সম্বলের কথা তার মনে পড়ে। দেশে একটা ফোন করা দরকার। ক্রেডিট কার্ডের অ্যাকাউন্টে টাকা যদি যোগ করা যায়। কিন্তু কারো কাছ থেকে তা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যে-দেশে অর্থ-বিত্তের মালিক অবিশ্বস্ত পথ ছাড়া অর্থ উপার্জন করতে পারে না, সে-দেশের বিত্তশালীরা রুদ্রদের কথাতেও আস্থা রাখতে পারে না। রুদ্র দ্বিধাহীন কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

তোমাকে এখান থেকে কীভাবে বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? তোমার পাসপোর্ট?

আমার পাসপোর্টটা ক্লায়েন্ট নামধারী সেই মাফিয়ার কাছে। আমার পাসপোর্ট তার প্রয়োজনেই বেশি ব্যবহৃত হয়। একটা উপায়েই এখান থেকে আমি বের হতে পারি। কাস্টমার যদি আমাকে ঘণ্টাভিত্তিক ভাড়া নেয়, মানে ঘোরাফেরার প্রয়োজনে কেউ যদি আমাকে স্কর্ট হিসেবে ব্যবহার করে।

ঘণ্টায় কত ডলার?

ফিফটি। তবে গাড়ি এবং ঘণ্টা ভাড়া অগ্রিম পরিশোধ করলেই তা অনুমোদিত হয়।

এই মুহূর্তে তোমার কাছে কত ডলার আছে? রুদ্রের প্রশ্নে সন্দেহের চোখে তাকায় অ্যান্দ্রিয়া। যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না –    রুদ্র সত্যিই এক ‘বেগার’ নাকি প্রতারক? তবু সে বিরক্ত না হয়ে বলল, মাত্র দুশো।

রুদ্র এবার সত্যিই শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অ্যান্দ্রিয়াকে। ফিসফিস করে তার কানে কানে বলে চলল তার একরাশ গোপন ইচ্ছা –

সত্যি বলতে কি আমার হাতেও আছে মাত্র একশ পঁচিশ ডলার। তবে, দোহা থেকে সাগর পারি দিয়ে আফ্রিকায় পালিয়ে যাওয়ার গোপন পথটা আমি জানি। আমি চার ঘণ্টার জন্য তোমাকে স্কর্ট হিসেবে নিচ্ছি। যেন তারা সন্দেহ না করে। বাইরে গিয়ে আমার রাডো ঘড়িটা বিক্রি করে দেবো। আমার ক্রেডিট কার্ডে …

থামে রুদ্র। আবার ফিসফিস করে বলে,

আমার হৃদয়টা ভিক্ষুক নয় বলে তোমাকে নিয়ে সেডানে নাইজার আর বামে এক মরুভূমি পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর। পথে থাকবে মরুর কাঁটাগাছ

এবং বালুতে ছলকে-পড়া জোছনার

মোহনীয় আলো। লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে, সিনাই পর্বতমালা পেছনে ফেলে, তুমি রাজি?

ছলছল অশ্রুতে ভরে ওঠে অ্যামেলিয়ার দুই চোখ। এই কারাগার এবং বেশ্যাবৃত্তির জীবন থেকে সে মুক্তি চায়। এতোক্ষণ রুদ্র তাকে বিছানায় না নিয়ে কল্পনায় তাকে জীবনযুদ্ধের সঙ্গী বানিয়েছে। তা ভাবতেই ওরিক্স রোটানায় কাটানো বিগত কয়েক সপ্তাহ মুছে গেল। হঠাৎ সে তার কিশোরী সব অনুভব আর স্বপ্নকে ফিরে পেল। আলো-ছায়ায় খেলা করা একটা রোদেলা দুপুর। বিকেলবেলা। নিঝুম রাত। তার ঘরের জানালা থেকে দেখা দিগন্ত এবং আকাশের নীলে ডানা মেলে থাকা একটা পরি!  স্কুল অথবা কলেজ থেকে বেরিয়ে বান্ধবীদের সঙ্গে চেরি-ব্লজমে ভরে থাকা সারিবদ্ধ গাছের নিচে সুপরিসর রাস্তা ধরে হাঁটার সুখস্মৃতি তাকে তাড়া করল।

সেই স্মৃতি ক্রমশ একটা দৃশ্যকল্প হয়ে উঠল। সে রুদ্রের হাত ধরে বড় লেকটার পাশের সেই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে খুলে ফেলছে তার প্রিয় খাবারের কোনো প্যাকেট। একটু পরেই তারা ঢুকবে একটা চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাগৃহে। একটা আধো আলো-আঁধারির ভোর। তাদের শহরতলির বাড়ি থেকে বের হয়ে নির্জন পথে খালি পায়ে শিশির মাখতে মাখতে, বিচিত্র ফুলের ঘ্রাণে আপ্লুত হতে হতে সে নিজের হাত থেকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে সারারাতের দেখা সব স্বপ্ন। কিন্তু এবার সে স্বপ্নগুলো বাতাসে ছড়িয়ে দেয় না। অ্যান্দ্রিয়ার চোখে খেলা করা অবারিত সুখের ঢেউ এবং রাতের আবেশগুলো সে ছড়িয়ে দেয় তার পাশে খালি পায়ে হাঁটা রুদ্রের চোখে, অপার সুখের দোলায় এলায়িত তার জীবনসঙ্গীর শরীরে।

দৃশ্যকল্প থেকে অ্যান্দ্রিয়া বাস্তবে ফেরে। সামনে তার কঠিন সময়। তার জন্য মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করতে করতে শক্ত করে সে রুদ্রকে জড়িয়ে ধরে। এমন কঠিন সময়কে অতিক্রম করে সে তার যৌবন এবং জীবনকে অর্থবহ করতে চায়। সুখের নিশ্চিত জীবন হলেও অপমান এবং গ্লানির চেয়ে সে বরং ভালোবাসা এবং সম্মানকে আলিঙ্গন করার জন্য মরে যেতেও এখন প্রস্তুত। সে আরো শক্ত করে রুদ্রকে জড়িয়ে ধরে। মায়াবী চোখে শাণিত প্রত্যয় জাগিয়ে বলে –    ইয়েস নট অনলি অ্যাগ্রিড … অ্যা’ম রেডি। রেডি টু ইভেন ডাই উইথ ইউ …

Leave a Reply