অ-ফেরা

লেখক:

ইকতিয়ার চৌধুরী

Imtiar Chow
Imtiar Chow

 

তুষার যখন ঝরতে শুরু করল তখন ফোনকলটি এলো। রিসিভার ওঠাতে ওঠাতে দোতলায় বেডরুমের জানালা দিয়ে আসমা দেখলো পেছনের বাগানের হোয়াইট বার্চ আর লরেলের পাতা সাদা তুষারে দ্রুত ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
: হ্যালো ?
: কে ভাবি¬? আফজাল বাসায় নেই?
আসমা ওপাশ থেকে মিজানের গলা শুনলো। মিজান-আফজাল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই দুজন প্রায় একই সময়ে বিলেত এসেছিল। পেশায় তারা এমবিবিএস চিকিৎসক। বিলেতে পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্য ছিল পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন করে আবার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ফিরে যাওয়া।
: না ভাই ও তো বাসায় নেই।
শনিবার সকাল। মিজান প্রত্যাশা করেছিল উইকেন্ডে বন্ধুকে বাসায় পাওয়া যাবে। বললো
: ছুটির দিনেও কাজ। আপনাদের এত পয়সা কে খাবে ভাবি?
: আফজালের কোন দোষ নেই ভাই। আসলে এশিয়ানদের অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। সাদারা যেখানে বউ-বাচ্চা নিয়ে অবকাশে সেখানে আপনাদের  কাটে একস্ট্রা ডিউটি করে। ছুটিছাটা পরিবার বুঝতেই আপনাদের জীবন শেষ হয়ে গেল।
আফজাল জেনারেল প্র্যাকটিশনার। মিজানও। পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন তাদের হয়নি। অর্থের নেশা তাদের উচ্চশিক্ষার উদ্যম খেয়ে ফেলেছে। বিলেতের প্রথম জীবনে টাকার টানাটানি ছিল। সুযোগ পেলেই ওভারটাইম করতো। ওভারটাইম থেকে হলিডে-উইকেন্ডে ডিউটি। দ্বিগুণ পারিশ্রমিকে ওইদিনগুলোয় কাজ করতে করতে এখন এক প্রকার ভুলেই গেছে তাদের জীবনেও ছুটি আছে।
: হ্যাঁ অভ্যাস আমাদের সবার খারাপ হয়ে গেছে ঠিক  তবে আপনার স্বামীর  খাসলতটা একটু বেশি। বাসা-ক্লিনিক,  ক্লিনিক-বাসা। ডানে-বাঁয়ে তাকানোর সময় তার নেই। ওকে থামান ভাবি। তা না হলে দেখবেন, চেম্বারে একদিন চিৎপটাং হয়ে আছে।
আফজাল মিজানের সম্পর্ক পঁয়ত্রিশ বছরের ওপরে। আসমা মিজানকে চেনে তার নিজের পান-চিনির দিন থেকে। এত বছরের মেলামেশায় সে আর এখন শুধু বন্ধুপতœী নয়, বন্ধুও বটে। আফজাল যে-ভাষায় মিজানের সঙ্গে কথা বলে তার সঙ্গেও ওইরকম পনেরো আনা।
: খাসলত আপনাদের সবারই একরকম। আফজালের আর দোষ কি? সে তো আপনাদেরই উপযুক্ত বন্ধু।
: উপযুক্ত না হলে তো আপনারা ম্যাডামরা আবার গ্রাহ্যে নেন না।
: আবার সেই পুরোনো কেচ্ছা। এবার বলেন আফজালের জন্য কোনো বাণী আছে কিনা।
: বাণী না, হুকুম আছে।
: বলুন, পৌঁছে দেব।
: না, দরকার হবে না। মোবাইলে কল করছি ওকে।
: ও আচ্ছা।
: আপনার জন্যও একটা খবর আছে।
: খবর?
: কতকটা ওই রকমই। আপনার ভাবি কাল দুপুরে আপনাদের আসতে বললো। ওর কিচেনে নাকি ভালো রান্না হবে।
: কী, খিচুড়ি।
: হ্যাঁ, খিচুড়ি-ইলিশ।
: ওহ! আবার খিচুড়ি-ফ্রোজেন ইলিশ।
: ফ্রোজেন না, ফ্রেশ। দেশ থেকে গেস্ট এসেছে। তাদের আনা ইলিশ বাসি হওয়ার আগেই আপনাদের জরুরি তলবের দায়িত্ব পেয়েছি।
রেবেকা মিজানের বউ। গতকাল ঢাকা থেকে ওর ছোট বোনের স্বামী এসেছে। আসার আগে ফোন করলে রেবেকা বোনকে বললো
: বাচ্চুর হাতে বড় সাইজের এক হালি ইলিশ পাঠাবি। ফ্লাইটের এক দুদিন আগে ডিপে রাখবি। লাগেজে দিয়ে দিবি Ñ যেটুকু ফ্রোজেন হবে তাতে দিব্যি পৌঁছে যাবে।
: বড় সাইজ পাওয়া যায় না আপা।
: কেন?
: সব তো তোমাদের লন্ডন, নিউইয়র্ক, প্যারিসে চলে যায়। ঢাকার বাজারে যা পড়ে থাকে তা জাটকা বই কিছু নয়।
: বাচ্চুকে কারওয়ান বাজারে পাঠাবি।
: কারওয়ান বাজার কেন Ñ মাওয়া পাঠালেও হবে না। এক কেজি, বেশি হলে বারো-তেরোশো গ্রামের পাওয়া যেতে পারে।
বাচ্চুর হাতে আসা সেই মাছের চালানে রেবেকা-মিজানের এখন বন্ধু-বান্ধবী সৎকারের প্রস্তুতি চলছে। আসমা উত্তর দিলো
: ওই একই কথা। চাঁদপুরের জেলে ডিঙি থেকে তুলে আনা হতো তাহলে বুঝতাম ফ্রেশ।
: চাঁদপুরের মেঘনার না ভাবি। বাচ্চুর আনা ইলিশ পদ্মার।
: রাখেন আপনার পদ্মার। এবার বাড়ি গিয়ে মাকে বললাম পটলের ঝোলে ইলিশ খাব। অনেক দিন খাই না। মা বললেন পদ্মায় ইলিশ নেই Ñ যাওবা আছে তাতে নাকি গন্ধ নেই।
আসমা রাজশাহীর মেয়ে। মিজান তর্কে গেল না। বললো
: আফজালকে নিয়ে আসুন কালকে, তখন বোঝা যাবে পদ্মার না মেঘনার।
: দেখি।
: দেখি না। রেবেকার তো শরাফত, বজলুর, সিদ্দিকীদেরও বলা হয়ে গেছে।
: ওহ! সেই একই মুখ Ñ একই পাত। আর কত?
: যতদিন এদেশে আছি এভাবেই চলবে।
: যতদিন এদেশে আছেন মানে। এটিই তো এখন আমাদের দেশ।
: আপনাদের আগেও বলেছি Ñ এখনো বলছি, এই দেশ  মিজানের না। কোনোদিন দেখবেন বিমানে চেপে বসেছি।
: এ ঘোষণা তো ত্রিশ বছর হলো শুনছি।
: না এবার আমরা সিরিয়াস।
আসমা হাসতে হাসতে বললো
: না, না আপনি তো বরাবরই সিরিয়াস। সে-কথা আমরা কে-না জানি। আফজালও তো আপনার মতো। পারলে কালকেই বাংলাদেশে ফিরে যায়।
আসমার মতো মিজানও হাসতে হাসতে জবাব দিলো
: ও গেলে একদিন পরে যাক। কালকের লাঞ্চে আসতেই হবে। তা না হলে রেবেকা মাইন্ড করবে। বোনের পাঠানো ইলিশ বলে কথা। আমি আফজালকে ধরছি।
: আচ্ছা।
আসমা ফোন রাখে। তুষারপাতকে তার বেশিই মনে হচ্ছে। বাগানের ঘাস এখন ঢাকা পড়ে পুরো চত্বর সাদা হয়ে গেছে। অনেক বছর পর এবার বেশ কবার তুষারপাত হলো।
খ্রিষ্টমাসের দিনটিতে নাকি বিশ বছর পর এবার তুষার পড়লো। বিশ বছর পর সাদা খ্রিষ্টমাস। তারা যে-পাড়ায় থাকে সেই এজবাস্টন Ñ শুধু এজবাস্টন কেন, সারা বার্মিংহাম সাদা হয়ে ছিল। বড়দিনে বরফ ঝরলেই না উৎসবের আনন্দ। ইংরেজরা খুব মজা করল। বিশেষ করে ওদের কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েরা। হোয়াইট খ্রিষ্টমাসে বরফের মাঝে ওদের হুল্লোড় অনেক বছর পর ফিরে এসেছিল। সাদারা বলাবলি করছিল যেভাবে পৃথিবীতে উষ্ণতার মাত্রা বাড়ছে তাতে আগামীবার তুষার আবৃত প্রান্তরে সান্তা ক্লজরূপী কাউকে দেখার সৌভাগ্য ঈশ্বর  তাদের দেবে কিনা কে জানে।
আসমা জানালা সামনে রেখে দাঁড়ায়। স্বচ্ছ কাচের মাঝ দিয়ে তুষারপাত দেখতে থাকে। কদিন হলো খুব শীত পড়েছে। সবে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ। মার্চ অবধি এই শীত থাকবে। মাঝে মাঝে এই  ঠান্ডা এত প্রবল হয়ে ওঠে যে হিটিং ও দুস্তর কাচের জানালায়ও শীত মানে না। তবে তুষার যখন ঝরছে Ñ এবার শীত নেমে যাবে। সাধারণত তুষারপাতের পরপরই প্রকৃতি ঈষৎ উষ্ণ হয়ে ওঠে।
আসমা আফজালের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটি বড়, বন্দনা। ছেলেটির নাম চন্দন। মিজানদের মতো তারাও বহু বছর হলো ভাবছে দেশে ফিরবে। একটু গুছিয়েই ফিরবে Ñ সেই গোছগাছও শেষ হচ্ছে না Ñ হচ্ছে না ফেরাও। ঢাকায় বারিধারায় ফ্ল্যাট শেষ হওয়ার পরই ভেবেছিল ফিরবে। ইতালিয়ান ফিটিংস, টাইলসে করা ৩২০০ স্কয়ার ফিটের বাসা এখন এক প্রকার খালিই পড়ে আছে। আফজালের দূরসম্পর্কের ভাগ্নে মাখন বউ নিয়ে ভালোই আছে সেখানে। তবে নিজে তা স্বীকার করে না। বলে কেয়ারটেকারের কাজ খুব দায়িত্বের। এত বড় ফ্ল্যাট সাফ-ছুতরো রাখতে বউ তার কাঠি হয়ে যাচ্ছে। তবে বড় কথা হচ্ছে, এক দুবছরে তারা ঢাকায় গেলে সার্ভিসটা ভালোই দেয়। বাজার-রান্না সব মাখন আর ওর বউয়ের। আসমারা অতিথির মতো সময়টা কাটিয়ে দেয়। আর তা না করেই বা বিকল্প কী? এতদিন পরপর যাওয়া। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, জরুরি কাজ করতে করতেই কত কিছু বাকি থেকে যায়। বারিধারার ফ্ল্যাট শেষ হওয়ার পর একদিন রাতের খাবারের টেবিলে আফজাল বললো
: দু-কোটি টাকার মতো পড়লো। এত টাকার বাসায় না-ই যদি থাকি তবে করা কেন?
: তার মানে কী বাবা?
জিজ্ঞেস করল চন্দন।
: এবার দেশে ফিরব। অনেক কর্ম অনেক আয় তো হলো Ñ এবার নিজের ভালো লাগাগুলো।
আফজালের ভালো লাগার পরিচয় বহু বছর হলো তার মুখে জেনে আসছে চন্দনেরা। তার শখ দেশের বাড়ি পঞ্চবটিতে সে যে পনেরো একর জায়গা কিনেছে সেখানে একটি ফার্ম  হাউস করে বাকি জীবন চাষাবাদ, মৎস্য পালন আর বিনে পয়সায় রোগী দেখে পার করে দেবে।
: তাতে কি সবার দিন সমান যাবে?
: বিস্তর যাবে। আমরা তো থাকব বারিধারায়। বছরের সিকি সময়টা দেশে থাকলেই সই।
: পোষাবে না বাবা, আকাশ-কুসুম ছাড়ো।
চন্দনের মন্তব্যে একটু জোর গলায় আফজাল জবাব দিলো
: আকাশ-কুসুম কিরে? গ্রীন রোড আর ধানমণ্ডির বাসা ভাড়া ওইসঙ্গে পঞ্চবটির আয় থেকে সংসার চলবে না।
: চলবে কিন্তু সবার যে দেশে থাকা চলবে না বাবা।
: কেন?
: মায়ের কথা জানি না কিন্তু বন্দনা আর আমি তোমার দেশে ফিরছি না।
চন্দন আর বন্দনা পিঠাপিঠি। বড়বোনকে সে নাম ধরে ডাকে। তার কথায় আসমা বললো
: আমার আবার নিজের কথা কী Ñ এত বছর হলো পাশ্চাত্যে আছি, তাও তোমার বাবা কিছু শিখল না। সে তো তার মতোই সবসময় আমার ওপর চাপিয়ে দেয়। তোমরা তো Ñ
কথা শেষ হলো না তাকে থামিয়ে দিয়ে আফজাল চন্দনকে ধমকে বললো
: তোমার দেশ এই কথাটার মানে কী?
: কথাটার মানে হচ্ছে তোমার দেশ যা আমাদের দেশ নয়।
: কেন নয়?
: বাংলাদেশ তোমার দেশ। আমাদের দেশ ইংল্যান্ড Ñ যেখানে আমরা জন্মেছি।
: কী বললে?
: হ্যাঁ বাবা, তোমার সেখানে শৈশব আছে, স্মৃতি আছে, আছে পরিচিতজনেরা। আমাদের তো তেমন কিছু নেই।
: এই যে এত বছর ধরে সেখানে যাচ্ছ-জানছ সেসব কিছু নয়?
: কিছু নয় তা নয় Ÿাবা। কিন্তু তাতে তো আমার পিতার দেশ আমার দেশ হয়ে যাবে না।
: বাজে বকো না চন্দন । ইংল্যান্ডে আমরা অভিবাসী। সোজা কথায় সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন। সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন হয়ে কখনই আমি জীবন শেষ করব না।
: তা কী করতে চাও?
: কী আবার Ñ সবাই দেশে ফিরে যাব। দিস ইজ ফাইনাল।
কিছুটা উত্তেজিতভাবে কথা শেষ করলো আফজাল।  বাবা-ভাইয়ের তর্কে টেবিলে উপস্থিত বন্দনার কোনো আগ্রহ ছিল না। কারণ এটি তাদের পরিবারে অনেক পুরনো ডিবেট। একসময় চন্দনের মতো সেও খানিকটা তর্কে যেত  কিন্তু  যেদিন  বুঝেছে  দেশে  ফেরাটা  বাবার জন্য  খুবই স্পর্শকাতর সেদিন থেকে তাকে আর কষ্ট দিতে চায়নি। একজন মানুষ একটি স্বপ্ন নিয়ে জীবন পাড়ি দিচ্ছে, দিক না। মা আর চন্দন বাবাকে যতটা বাস্তববাদী হতে বুঝিয়ে যাচ্ছে, তিনিও ততই দেশমুখী হয়ে উঠেছেন। বাড়িয়ে চলেছেন স্থাবর বিষয়সংগ্রহ। বন্দনা তাই আস্তে করে শুধু বললো
: এখন দেশে ফিরলে আমাদের পড়াশোনার কী হবে বাŸা। আধাপথ পর্যন্ত এসে গুটিয়ে নেব।
বন্দনা লিডস ইউনিভার্সিটিতে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট। নিউট্রিশন নিয়ে পড়াশোনা করছে। চন্দন পড়ছে পলিটেকনিকে Ñ ডিপ্লোমা ইন অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং।
আফজাল উত্তর দিলো
: আমি তো তা বলিনি মা। হ্যাঁ বলেছিলাম একবার, যখন তোমরা এ লেভেলস শেষ করলে। তোমার মা বললো দেশের চাইতে এখানে বেটার এডুকেশন। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শেষ করলে তখন ফেরা যাবে। আমি তো সে ভরসায় আছি Ñ আর এখন শুনছি অন্যরকম।
: পড়াশোনা শেষ করলে আমাদের চাকরির প্রশ্ন আসবে। ইউরোপে অনেক ভালো জব অপরচুনিটি। আমাদের জব হওয়ার আগে তোমরা ফিরতে পারবে না।
: সারাজীবন আমি এই করতে থাকি Ñ
এবার রীতিমতো অসহিষ্ণু আফজাল। মেয়ের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এবার বললো
: আমাকে শেখাও কোথায় জব অপরচুনিটি। ইউরোপে এশীয়দের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এদের ন্যাচারাল রিসোর্সেস যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। দু-চারটি মাইনিং যাওবা সচল তাও বন্ধ হওয়ার পথে। এই শতাব্দী হচ্ছে আমাদের Ñ মানে এশিয়ার। এশিয়া এখন বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র।
আফজালের দীপ্তস্বর তার পরিবারকে প্রভাবিত করতে পারল বলে মনে হলো না যখন আসমা বলে উঠল
: শুধু পড়াশোনা শেষ করে জবে ঢোকা নয়। ছেলেমেয়েদের বিয়েশাদি না দিয়ে আমি এখান থেকে যাব না।
: কেন দেশে বিয়েশাদির সুযোগ নেই?
: না নেই, বিদেশে জন্ম-মানুষ হওয়া ছেলেমেয়ের সঙ্গে দেশের পাত্রপাত্রীর মত মিলবে না।
: ওনাকে বলেছে মিলবে না। কতজন দেশ থেকে ছেলেমেয়েকে বিয়ে করিয়ে আনছে। শোন আসমা, এই দেশে তুমি নিজেদের জন্য শিক্ষিত ছেলেমেয়ে পাবে না। বাঙালি প্রফেশনাল আর কয়জন Ñ সবাই তো রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। দেখলে না নজিবুর সাহেব এক পাকিস্তানির সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দিলেন। কী সাংঘাতিক, একাত্তরের ঘাতকদের সঙ্গে আত্মীয়তা।
: তুমি জানো না – ছেলেমেয়ের অ্যাফেয়ার ছিল।
: তাই বলে পাকিস্তানির সঙ্গে – আমার মেয়ে হলে –
আফজাল শব্দ খুঁজতে থাকলে চন্দন বললো
: আমাদের বিয়ে নিয়ে কোনো কথা বলবে না। তোমাদের কোনো রাইট নেই এ বিষয়ে ঝগড়া করার। কারো চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত আমরা মানব ভেবেছ?
: ভালোই তো। আমি না হয় বুঝলাম – এবার তোমার মাকে বোঝাও। তিনি তো মনে করেছেন এই দায়িত্ব একান্তই তার।
আফজাল রসিকতার সুরে বললেন।
: হ্যাঁ আমার, মেয়ের মা হলে বুঝতে –
খানিকটা তীব্র শোনাল আসমার কণ্ঠস্বর, যা বোধহয় চলমান তর্ক ছিন্নের জন্য যথেষ্ট ছিল।
তুষার পড়ছে আর তাতে নিমগ্ন হয়ে আছে আসমা। আফজাল ক্লিনিক থেকে ফিরবে অপরাহ্ণে। তিরিশ বছরে খুব কম শনিবার তাকে বাসায় পেয়েছে সে।
মিজান-রেবেকার মাঝারি ড্রয়িংরুমে দু-সেট সোফা। সেইসঙ্গে চেয়ার বসিয়ে আরো কিছু বাড়তি আসন। রোববারের খিচুড়ি-ইলিশে আমন্ত্রিতরা সেখানে জড়ো হতে থাকল। এশীয় নারী-পুরুষের মেলামেশা বসাবসি এখনো অবাধ হয়ে ওঠেনি। আমন্ত্রিতরা পরিচিত-ঘনিষ্ঠ হলেও একসময় মহিলারা ভেতরের ঘরে পৃথক হয়ে গেলেন। প্রকাশ্য ব্যাখ্যায় কারণ যদিও স্থান সঙ্কুলান আসলে তা সূক্ষ্ম রক্ষণশীলতা। মিজান এবার তৃতীয়বারের মতো হজ করেছে। বললো
: মন খুলে কথা বলার জন্যে ভাবিসাবদের স্বাধীন করে দিলাম।
পাশ্চাত্য হলেই বা কি, মনে হলো মিজানের কথিত স্বাধীনতায় সবারই  কম-বেশি সমর্থন রয়েছে। ডা. বজলুর তো বলেই ফেললেন
: তাদের নিজেদের মধ্যে বেশি বেশি করে স্বাধীন করে দেন তাতে ভালো থাকবে।
: তুমি বলছ বজলুর?
: হ্যাঁ বলছি। স্বাধীনভাবে শাড়ি-গয়নার গপ্পের চেয়ে ভালো  কি আছে।
বজলুর হালকা রসিকতায় সবাই হাসল না। তিন দশক আগে বজলুর যখন ইংল্যান্ডে এলো তখন বেশ প্রগতিশীল। বাম রাজনীতি তখনও তার মগজে। চীনের মাও সে তুংয়ের দর্শন তার আদর্শ। সেসবের প্রাধান্য বর্তমানে অবশ্য নেই। মাছের মাথায় পচন ধরার মতো বজলুর মাথায়ও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গরমিল দেখা যাচ্ছে। তার ভাষায়, এই গরমিল অবশ্য চিন্তা বা সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা। বজলুরের সিদ্ধান্তে বউ তার বর্তমানে হিজাব পরে। প্রথম হজের পর থেকেই ইশারাতের জন্য এই ব্যবস্থা। একসময় ইশরাত হারমোনিয়ামে চার-পাঁচখানা গণসংগীত তুলতে পারত। গাইতও। বজলুরদের সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের সামনের সারির কর্মী ছিল সে। সেই ইশরাতও আজ যখন রেবেকা-মিজানদের বাসায় ঢুকল বললো
: হিজাব ছিল বলে তবেই না রক্ষে তা না হলে এই শীত আর পার করা যেত না।
তার মন্তব্যে বুঝতে অসুবিধা হয় না বজলুরের যোগ্য সঙ্গিনী হিসেবে তার মধ্যেও গরমিল প্রবল হয়ে উঠেছে। রেবেকা জবাব দিলো
: পর্দা করা, না করা যার যার স্বাধীনতা। তাই বলে অত যুক্তি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই।
: না আপা তা নয়। দেখেন না মাথা থেকে পা অবধি কেমন ঢাকা পড়ে যায় Ñ শীত বাতাস ঢুকতেই পারে না।
রেবেকা কোনো উত্তর দিলো না। সে তখন ইশরাতের শরীর থেকে হিজাব খুলতে সাহায্য করছে। রেবেকাও পর্দা করে তবে এখন অবধি বোরখা ধরেনি কিংবা মিজান এ-বিষয়ে এখনও মনোযোগী হয়ে ওঠেনি। বজলুরের মতো তারও তো মনোযোগী হওয়ার কথা। তিনবার হজব্রত পালনের পর স্ত্রীকে উন্মুক্ত রাখা একটু ধন্ধের বইকি। শুধু মিজান নয়। তার মতো আরো অনেকেই হজ করেছেন। পরম করুণাময় স্রষ্টা সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য হজকে ফরজ করেছেন। মিজান আফজালদের মতো একটু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য বিলেতে পড়ে থাকাদের সামর্থ্য একটু বেশি বলেই হয়তো একাধিকবার এই হজব্রত। আবার বর্তমানের মতো পরজাগতিক জীবনটাকেও নিশ্চিত করার হেতু যে এতে নেই তাও তো বলা যাবে না। তবে দুমাস আগে ডা. বজলুরের বাসায় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ বিল্লাল হুসেনের একটি অনুসন্ধিৎসার কারণে একাধিকবার হজের বিষয়ে তারা অস্পষ্টতায় রয়েছে। বিল্লালের জিজ্ঞাসা Ñ ‘আল্লাহতায়ালা হজকে ফরজ করেছেন বলে তা অবশ্য  পালনীয়; কিন্তু তা দ্বিতীয় বা তৃতীয় দফা আদায় ফরজ কিনা?’
বিল্লাল নিরীহ কিন্তু বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি তো বটেই। কিন্তু বড় দোষ যতটা সম্ভব ট্যাক্স ফাঁকি দেয়। বহুমূত্র ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত কার্ডিও স্পেশালিস্ট ডা. শরাফত সাদিক যার জীবন দর্শন ‘খেতেই যদি না পারি তবে বেঁচে থাকার মানে কী’ খোঁচা দেওয়ার জন্য যখন তাকে বললো, রেস্টুরেন্টে মদ বিক্রির উপার্জন হালাল কিনা, তখন কিছুটা আত্মরক্ষার্থে বিল্লাল প্রশ্নটি ছেড়েছিল।
শরাফত উত্তর দিলো
: তৃতীয়বারের হজ ফরজ কিনা জানি না তবে তা পালনে যে বাধা নেই তা বলতে পারি। কিন্তু মদ বিক্রির উপার্জন যে হালাল নয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যাই হোক যার যার রুজি তার তার। এ বিষয়ে আমাদের অগ্রসর না হওয়াই ভালো, কী বলেন বিল্লাল।
বিল্লাল শুধু বলতে পারল, ‘আল্লাহতায়ালা কার রুজি যে কীভাবে রেখেছেন কে জানে।’
রেবেকা-মিজানের বাসায় আলাপচারিতা, গল্প নানামুখী হতে থাকে আর একসময় সেখানে ভেসে আসে আঁচে দেওয়া সরষে ইলিশের গন্ধ। আমন্ত্রিতদের একজন বিল্লাল হুসেন নাকে ইলিশ-খিচুড়ির গন্ধ ধরে  বললো
: রান্না ভালোই মনে হচ্ছে, তবে ইলিশে আগের সেই গন্ধ নেই।
তার কথায় কেউ মন্তব্য করে না। বিল্লাল বহু বছর হলো রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়। ব্যবসায় সে ভালো করছে কারণ বিল্লাল ভালো বাবুর্চিও। কেউ যখন কোনো মন্তব্য করল না তখন সে আবার বললো
: ইলিশ-খিচুড়ির সমঝদার এনায়েত ভাই থাকলে তিনি আরো ভালো বলতে পারতেন। মিজান তুমি এনায়েত ভাইকে বলো নাই।
মিজান রান্নাঘরে ছিল খাবারের তদারকিতে। তদারকিও ঠিক নয়, সে আসলে হাত লাগিয়েছে বউয়ের সঙ্গে। এতজনের  রান্না রেবেকা কুলিয়ে উঠতে পারছে না। পারার কথাও নয়। এই দেশে তাদের কোনো কাজের মানুষ নেই। তারা নিজেরা একাধারে তাই ক্লিনার, বাবুর্চি, বাজার সরকার সবই। বিল্লালকে উত্তর দিলো আফজাল
: এনায়েত ভাবিকে নিয়ে দেশে গেছে। জমি নিয়ে কী যেন একটা ঝামেলা হয়েছে।
এনায়েতের বাড়ি সিলেট। সিলেটের কলারোয়ায়। তার কাছের আত্মীয়স্বজনের প্রায় সবাই এখন ইংল্যান্ডে।
: কী ঝামেলা?
জানতে চাইল বিল্লাল।
: পুরোপুরি জানি না। তবে শুনেছি বাড়ির লাগোয়া আমবাগানের অর্ধেক বেদখল হয়ে গেছে।
জমিজমা, ভিটেমাটি কেনা এনায়েতের নেশা। এই দেশে মর্টগেজ নেওয়া বাড়ি ছাড়া তার আর কিছু নেই। দেশের ওইসব জমিজমার তত্ত্বাবধান করতেন দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই। বহু বছর হলো এই ব্যবস্থা বহাল ছিল। সে-ই এখন ঝামেলা করছে। এনায়েত প্রতিকার চেয়ে অনেকবার বাংলাদেশ হাই কমিশনের মাধ্যমে ডিসি, এসপিকে লিখেছেন; কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তদবির, দানাপানি খরচ ছাড়া কোনো কালে কোনো কাজ হয়নি আর সে তো প্রবাসী। তদুপরি বর্তমানে এ-ধরনের কেসের সংখ্যা অসংখ্য। জেলা কিংবা উপজেলা প্রশাসনের লোকবল, সময়, আগ্রহ কোনোটাই নেই এইসব জবরদখলের প্রতিকারের।
: তো এখন কী করবেন?
: গেছেন থানা-পুলিশ করতে, দেখা যাক কতদূর কী হয় Ñ
জবাব দেয় আফজাল।
: কেন যে তোমরা মূর্খের মতো দেশে মাটি কিনছ আমি বুঝতে পারি না আফজাল। যেখানে বাস করছ সেই দেশটাকে আপন ভাবতে শেখ। যত্তসব অকৃতজ্ঞ। আর বিষয়-সম্পত্তি দিয়ে করবেটা কী শুনি। আমাদের কি কখনো আর দেশে ফেরা হবে?
আফজালের দিকে তাকিয়ে বজলুর প্রশ্নটি রাখল মিজানের অতিথিদের উদ্দেশে। সে বরাবরই চরমপন্থী। যখন কমিউনিস্ট ভাবদর্শনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল তখন ওই রাজনীতিতে ছিল বেপরোয়া। যুক্তরাজ্যে আসার পর ওই বিশ্বাস হতে যখন স্খলন ঘটেছে এখন নিজের দেশ, মাটি, মানুষ ভুলে চরম আত্মকেন্দ্রিক হয়ে আছে। ইংল্যান্ডই হয়ে উঠেছে তার দেশ। প্রবাসী স্বদেশিদের অনেকের মতো দেশে প্রত্যাবর্তনের চিন্তা বজলুর আনতেই পারে না।
আফজাল জবাব দেয়
: জন্মভূমির আবেদন তুমি আর বুঝবে না বজলুর। তুমি তো একটা রটেন এগ। তোমার মতো আমরা কোনোকালে বিপ্লবীও ছিলাম না আর লাল ঝাণ্ডা নামিয়ে সবুজ নিশানও ওড়াইনি। আমরা নিতান্তই ছাপোষা মানুষ।
আফজালের কথা আংশিক সত্য। ছেলেমেয়ে যখন আছে তখন সে ছাপোষা অভিভাবক তো বটেই। তবে এনায়েতের মতো সেও দেশে ক্রমাগত স্থাবর সম্পত্তি বাড়িয়ে চলছে। তার স্বপ্ন Ñ সম্পত্তির গোছগাছ, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বিয়েশাদি ইত্যাদি শেষ হলেই দেশে ফিরবে। আহা তারপর তো শ্যামল জন্মভূমিতে শুধুই শান্তিময় শৈশবের  অবগাহন। যদিও আফজাল জানে তা আর তার শৈশবের কিংবা আগের মতো নেই। তাতেই বা কী? সে মিজান-রেবেকার কিচেন থেকে ভেসে আসা ইলিশ-খিচুড়ির সুবাস অন্য অতিথিদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে করতে ভুলে যাওয়া একটি গানের কলি মনে করতে থাকে ‘নদীর পাড়ে ঘর ছিল, লাউয়ের মাচায় বোল ছিল Ñ ছোট্ট ছিল বঁধু, ইলিশ মাছে গন্ধ ছিল Ñ এখন তো আর নাইরে।’ আফজাল এখন তো আর নাইরের জায়গায় এখানে তো আর নাইরে ভাবতে থাকে।
সেবারের হোয়াইট খ্রিষ্টমাসের পর বহু বছর হলো আফজাল-আসমারা আর হোয়াইট খ্রিষ্টমাস দেখেনি। অতিরিক্ত কার্বন নির্গমনে জলবায়ু ক্রমশ চরমভাবাপন্ন হয়ে উঠছে। পৃথিবী হয়ে উঠছে উষ্ণ। ছেলে চন্দন ইতিমধ্যে বিয়ে করেছে। সে তো দেশে ফিরতে ঘোরতর অরাজি। প্রেম করে বিয়ে করলো। তাও আবার তাদের মৌসুমি গার্ডেনার সেবাস্টিনের মেয়ে লিন্ডাকে। লিন্ডা কোনোমতে মাধ্যমিক শেষ করার পর পড়াশোনায় আর আগ্রহ দেখায়নি। যদিও কী একটা ভোকেশনাল কোর্সে ভর্তি হয়েছিল। সেবাস্টিনকে সাহায্য করার জন্য মেয়েটি কয়েকবার এসেছে তাদের এজবাস্টনের বাসায়। বিশেষ করে তারা যখন এজবাস্টনের বাসাটি কেনে তখন বাগানের ল্যান্ড স্কেপিং করে দেয় সেবাস্টিন। ওই সময় কয়েকদিন ধরে লিন্ডা বাবাকে সাহায্য করে। সেখান থেকেই মনে হয় ছেলে তাদের  জড়িয়ে গেল। চন্দন লিন্ডা সংসার পেতেছে কভেন্ট্রিতে। মাঝে মধ্যে আসে। সাদা মেয়ে বিয়ে করেছে তাতে আসমার কোনো অখুশি নেই। তবে শিক্ষিত কোনো পরিবার হলে ভালো হতো যদিও এশীয়দের জন্য সেরকম কোনো ইংরেজ পরিবার পাওয়া সহজ নয়। আত্মীয়তা দূরে থাক, ছোটখাটো সামাজিকতায়ই তারা মূলস্রোতের মানুষদের থেকে এত বছরেও কোনো আমন্ত্রণ পায় না।
মেয়েটার বিয়ে হলে হয়তো দেশেই ফিরে যাবে তারা। কিন্তু যেভাবে তাকে বাতটা ভোগাচ্ছে আর আফজালেরও ডায়াবেটিস Ñ দেশে ফিরতে ভরসা হয় না। এখানকার মতো সুযোগ-সুবিধা সেখানে কী আর আছে। তারচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা বন্দনার বিয়ে। প্রবাসে উপযুক্ত মেয়ের যোগ্য বর পাওয়া কতটা যে কঠিন তা আসমার মতো আর কে বোঝে। গত বছর পাঁচ সপ্তাহ তারা বন্দনাসহ দেশে কাটিয়ে এলো।  যদিও ছুটি কাটানো কিন্তু তা তো ছিল মেয়ের জন্য পাত্র সন্ধান। তখন দেশের ছেলেদের মন-মানসিকতা জেনে তার ঘেন্না ধরে গেছে।
রেবেকা ভাবির ছোট বোন নিরালার বাসায় ‘বেড়াতে এসে হঠাৎ দেখা’ এমনভাবে একটি ছেলে সে-সময় বন্দনাকে দেখল। ছেলেটি উচ্চশিক্ষিত। এমবিএ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভালো চাকুরে। বিয়ে করে দেশেই থাকবে তবে সুযোগ পেলে বিদেশে সেটেলড্ হতেও আপত্তি নেই। তারা ভাবল ভালোই তো। উপযুক্ত ছেলে যা সিদ্ধান্ত নেবে তা-ই হবে। মেয়ে দেখার কদিন পর বিয়ের ঘটক ছেলেটির কলিগ মিসেস রুবাইয়াত নিরালার বাসা থেকে তাদের সামনেই তাকে ফোন দিলেন। কথাবার্তা থেকে রুবাইয়াতের বিশ্বাস জন্মেছিল ছেলেটি বন্দনাকে পছন্দ করবে। হয়তোবা সে-বিশ্বাস থেকেই তিনি রিসিভার অন করে বললেন,
: হ্যালো, তকদির শুনতে পাচ্ছ –  রুবাইয়াত আপা বলছি।
: হ্যাঁ আপা, স্লামালাইকুম। কেমন আছেন?
: আর কেমন আছি। থাকবা তো তুমি। তুমি কেমন আছ?
: ভালো।
: ভালো তো থাকতেই হবে। এই সময় কেউ ভালো না থেকে পারে।
রুবাইয়াতের গলায় হালকা রসিকতা। ছেলেটিও সমঝদার। উত্তর দিলো
: ভালো থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি আপা। তবে একা একা ভালো থাকাটা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
হেসে ফেললেন রুবাইয়াত। বললেন
: তাহলে সিদ্ধান্তে আর দেরি কেন। তুমি মনস্থির করলেই রণ দামামা মানে বিয়ের বাদ্য বেজে উঠতে পারে।
: ভাবছি আপা।
: ভাবনার কী আছে?
: জীবনে প্রথম বিয়ে তো।
রুবাইয়াত তকদিরকে মৃদু ধমক দিয়ে বললেন
: কী বলছ যা-তা। বিয়ে মানুষ কটা করে বলো তো। শোন কনেদের কিন্তু ফেরার সময় এগিয়ে আসছে। ওদের আরো প্রস্তাব আছে। হ্যাঁ-না যাই বলো Ñ তাড়াতাড়ি।
: কীভাবে কথাটা আপনাকে বলি আপা – মেয়েটি মনে হয় ড্রিংক করে।
: কী বললে?
মনে হলো রুবাইয়াত তকদিরের কথা বুঝতে পারেনি কিংবা বুঝলেও বিশ্বাস করতে পারছে না।
: বিদেশে জন্ম, বড় হয়েছে, আমার ধারণা পান করার অভ্যাস আছে। এমন মেয়ে নিয়ে সংসার –
রুবাইয়াত বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন
: কী করে বুঝলে তুমি?
: আপনি খেয়াল করেননি আপা Ñ আলাপের সময় লক্ষ করেছি ওর দাঁতের ভেতরের পিঠে কালো দাগ পড়ে গেছে।
কনে বন্দনার মা রুবাইয়াতের পাশে। তার শুধু ক্রোধ নয়, লজ্জাও করছে। এই মন-মানসিকতার ছেলেকে সে উপস্থাপিত করেছে – ওনারা ভাবছেন কী। আর তকদিরকেও তার এ-মুহূর্তে অজানা মনে হচ্ছে। রুবাইয়াত বুঝতে পারছেন কথা বাড়ানো সমীচীন নয়। বললেন
: তোমার সঙ্গে পরে কথা হবে তকদির।
রুবাইয়াতের হাত ফসকে রিসিভারটি ঠাস করে ক্রাডালে পড়লো।
আসমা এখন ভাবেন ভালোই হয়েছে। ওই ধরনের ছেলের সঙ্গে বন্দনার বিয়ে হলে মেয়েটি জীবনে সুখ পেত না। এখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভালোমন্দ যা-ই জুটুক বন্দনার বিয়ে বিলেতেই দেবে।
তকদিরের মতো গোঁড়ামি অন্তত এখানকার ছেলেদের থাকবে না। সিদ্ধান্তের সময় আফজাল বললো
: তাহলে তো চন্দনের মতো বন্দনারও দেশে ফেরা অনিশ্চিত।
: তুমি আছ তোমার দেশ নিয়ে। শোন, যার যার জীবন তার তার মতো। তোমার মাপে ওদের ফেল না।
: তাহলে এত পরিশ্রম করছি কেন?
: তা তুমি জান ।
আসমার জবাবে আফজাল কথা বলে না। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলে
: ওরা ভাইবোন যদি না ফেরে তবে পঞ্চবটির খামার আর বারিধারার ফ্ল্যাটই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
: যথেষ্ট মনে করলে যথেষ্ট। কেন, তুমি কি এখন ধানমণ্ডি আর গ্রীন রোডের বাসা বিক্রি করতে চাও।
: ঠিক তা না। তবে ভাবছি Ñ আমাদের দুজনের জন্য তো আর তিনখানা বাড়ির প্রয়োজন নেই।
: তারচেয়ে বরং পঞ্চবটির জায়গাজমি ছাড়িয়ে দাও, ওই গ্রাম-সমাজ আমার চলবে না।
আসমা তার মতামত দিলো।
: আরে গ্রামসমাজ তুমি কোথায় পাচ্ছ? গ্রাম আর আগের মতো নেই। পঞ্চবটিতে বিদ্যুৎ, পাকারাস্তা, স্যাটেলাইট টিভি সব আছে।
: থাকুক, আমাদের বুড়ো বয়সের জন্য ডাক্তার তো নেই।
: আমি আছি না?
বললো আফজাল।
: থাক তাহলেই হয়েছে। তুমি কি আর ডাক্তার আছ। তুমি তো এখন হাতুড়ে।
: পঞ্চবটি আমার ড্রিম। তুমি ও নিয়ে কথা বলবে না। তারচেয়ে বরং গ্রীন রোডের ফ্ল্যাটটি ছেড়ে দেওয়া যায়। চন্দন-বন্দনা যখন ফিরতেই চায় না। আর বন্দনার বিয়েই বা আল্লাহ কতদিনে রেখেছেন। তার আগে তো ফেরা নয়। আরেকটি খ্রিষ্টমাস এসে গেল।
আসমা  কিছু বলে না। সত্যিই তো সময় দ্রুত পেরিয়ে আরেকটি খ্রিষ্টমাস সমাগত। এবার কি তারা হোয়াইট খ্রিষ্টমাস পাবে? অনেক বছর হলো খ্রিষ্টমাসে তুষার পড়ছে না। পৃথিবী যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বদলে যাচ্ছে কতকিছু। সে চুপ করে থাকে। ভাবে,  চন্দন-বন্দনা ফিরছে না Ñ আফজাল আর সেও কি ফিরতে পারবে?

১ thought on “অ-ফেরা