আত্মচেতনায় হানা-দেওয়া শব্দমালা

আলম খোলশেদ

তলকুঠুরির গান  ওয়াসি আহমেদ  প্রথমা প্রকাশন
ঢাকা, ২০১৫  ৪৫০ টাকা

ও আমার নানকারি জিন্দেগি
এমন জিন্দেগি ভবে আর না মিলে …

কোনো এক শীতের সাতসকালে, হবিগঞ্জগামী লঞ্চের খোল, কিংবা, গ্রন্থকারের ভাষায়, ‘তলকুঠুরি’র ভেতর থেকে ভেসে আসা, এক প্রবীণ অন্ধ গায়কের কণ্ঠচ্যুত গানের উপর্যুক্ত কথাগুলো, বিশেষত তাতে ব্যবহৃত ‘নানকারি’ শব্দটি, সেই লঞ্চেরই যাত্রী, রাজধানীর এক ওষুধ কোম্পানির কর্মচারী, চল্লিশোর্ধ্ব শরীফউদ্দীনকে মুহূর্তে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সুদূর শৈশবের দিনগুলোতে; যখন তার ‘নানকার’ বাবা শুকুর চানের গলায় প্রায়শই বেজে উঠত এই বিষণœ ও বেদনার্ত গানখানি। বহুদিন বাদে শ্রুত এই গান তাকে শুধু স্মৃতিকাতরই করে তোলে না, তার ভেতরে জাগিয়ে তোলে তুমুল আত্মপরিচয়ের সংকট ও সংঘাত-তরঙ্গ, এতটাই যে, লঞ্চ থেকে প্রস্থানোদ্যত সেই গায়ক যখন শরীফের শহুরে মুখের দিকে তাকিয়ে তার নানকার পরিচয়কে অস্বীকারের ছলে বলে ওঠে, ‘নানকার কই সাব? নানকার নাই, আছে নানকারি।’ তখন সে রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে লঞ্চসুদ্ধ মানুষকে চিৎকার করে জানান দিতে দ্বিধা করে না যে, সে নিজে তো বটেই, তার বাপ-দাদা, তার চোদ্দোপুরুষ নানকার। শুধু তা-ই নয়, পরদিন কাজে ফিরে, সে সজ্ঞানে, রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে, নিজের নামের সঙ্গে ‘নানকার’ পদবি জুড়ে দিয়ে রাতারাতি বনে যায় শরীফউদ্দীন নানকার। তলকুঠুরির গান গ্রন্থের নায়ক শরীফের এই আচমকা নাম-বদলের পটভূমিতেই দীর্ঘপরিসরে, প্রায় আড়াইশো পৃষ্ঠার আখ্যান অবয়বে, আমাদের মূলধারার ইতিহাসে যথারীতি উপেক্ষিত, অখ্যাত নিম্নবর্গের নানকার জনগোষ্ঠীর একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের দাসত্ব, বঞ্চনা, পীড়ন ও সংগ্রামের মহাকাব্যিক গদ্যগাথা রচনা করেন নিপুণ, নিষ্ঠাবান ও এই সময়ের অন্যতম প্রাজ্ঞ কথাকার ওয়াসি আহমেদ।
বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে ওয়াসি আহমেদ একটি পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি লিখছেনও প্রায় চার দশককাল ধরে। মূলত ছোটগল্পকার, গল্পগ্রন্থের সংখ্যা তাঁর দুই অংকের কাছাকাছি। পাশাপাশি উপন্যাসও লিখেছেন খানপাঁচেক। তবু, কী এক দুর্জ্ঞেয় কারণে তাঁকে ও তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে তেমন আলাপ-আলোচনা কিংবা লেখালেখি হতে দেখা যায় না এখানে। এমনকি বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষও এই গুণী কথাসাহিত্যিকের সঠিক মূল্যায়নে আগ্রহী হয়নি এই কিছুকাল আগ পর্যন্ত। অথচ তাঁর অন্যান্য অনেক রচনার মতো আমাদের আজকের আলোচ্য উপন্যাস, তলকুঠুরির গানও অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সাহিত্যকর্ম, যা, যে-কোনো বিচারেই স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রণিধানযোগ্য উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত তালিকার ওপরের দিকেই স্থান পাবে বলে আমাদের দৃঢ় প্রতীতি। একটি মহৎ উপন্যাস আমরা জানি একই সঙ্গে কোনো জাতি, জনগোষ্ঠী বা জনপদের অতীত ইতিহাস, বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের স্বপ্নকে ধারণ করে; তার হৃদয়ের স্পন্দন, মননের ঐশ^র্য ও বোধের বিস্তারকে ভাষা দেয়; তার নিজস্ব মনীষা, মনস্তত্ত্ব, ধর্ম, লোকাচার, সংস্কৃতি ও সংগ্রামের এক অখণ্ড পরিচয় উপস্থাপন করে পাঠকসমক্ষে। বিশ^সাহিত্যের অঙ্গনে সেরবান্তেসের দন কিহোতে, তলস্তয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস, টমাসমানের ম্যাজিক মাউন্টেন, মার্কেসের হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড, কি হালের অরুন্ধতী রায়ের মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস থেকে শুরু করে বাংলাসাহিত্যের সুদীর্ঘ পরিসরে হাঁসুলিবাঁকের উপকথা, আরণ্যক, পুতুলনাচের ইতিকথা, ঢোঁড়াই চরিত মানস, গড় শ্রীখণ্ড, তিস্তাপারের বৃত্তান্ত, রহু চ-ালের হাড়, খোয়াবনামার মতো শক্তিশালী, চিরায়ত উপন্যাসগুলোর প্রতিটি ঠিক এসব চারিত্র্যলক্ষণেরই প্রতিনিধিত্ব করে কোনো-না-কোনোভাবে। ওয়াসি আহমেদের তলকুঠুরির গানকে বাংলাদেশি সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে এই ধারারই সাম্প্রতিকতম সংযোজন বললে অত্যুক্তি হয় না মোটেও।
ওয়াসি আহমেদ এই গ্রন্থের পটভূমি হিসেবে বেছে নেন তাঁর নিজের জন্মজেলা সিলেটের প্রত্যন্ত পল্লি অঞ্চল জুড়ে, গত শতকের গোড়ার আমল থেকে শুরু করে পাঁচের দশক অবধি বিদ্যমান, ‘নানকারি’ নামক নির্মম, নিষ্ঠুর, অমানবিক দাসত্বপ্রথার শিকার এক অভিশপ্ত জনপদের ততোধিক অভিশপ্ত জনগোষ্ঠীর জীবনের করুণ গল্পকে। গ্রন্থটি তিনি উৎসর্গও করেন তাঁর আখ্যানের উপজীব্য সেই নানকারদেরকেই, মর্মস্পর্শী এই বাক্যটি লিখে : ‘প্রাচীন সিলেট অঞ্চলে নানকার পরিচয়ে বংশপরম্পরায় আমৃত্যু হদবেগারিতে বন্দী অগণিত মানুষের স্মৃতিতে।’ বস্তুত দুবেলা দুটি নান, তথা রুটি আর সামান্য মাথাগোঁজার ঠাঁইয়ের বিনিময়ে আমৃত্যু ‘হদবেগারি’, অর্থাৎ জমিদারের সেবায় বেহদ্দ বেগার খেটে জীবন সাঙ্গ করার বিষাদময় কাহিনি, আর সেই দাসত্বশৃঙ্খল ছিন্ন করার গৌরবময় দ্রোহ-সংগ্রামের গল্পকেই ইতিহাসের গোপন কুঠুরি থেকে তুলে আনেন গ্রন্থকার, পরিশ্রমী গবেষকের অনুসন্ধানী তৎপরতা আর প্রকৃত ঔপন্যাসিকের সংবেদনা, সংহতিবোধ ও সৃজনশীলতার শক্তিতে। ইতিহাসের মনোযোগী ছাত্রদের জন্য অবশ্য ইতোপূর্বে নানকার বিদ্রোহ নামে একটি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করে গেছেন এই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, উপমহাদেশের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা অজয় ভট্টাচার্য। কিন্তু এর বাইরে বাংলা সাহিত্যে অদ্যাবধি এই অনালোকিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কোনো উল্লেখ কিংবা উপস্থাপনার কথা জানা নেই এই আলোচকের। ইতিহাসমনস্ক, সমাজলিপ্ত ও চিন্তাশীল লেখক ওয়াসি আহমেদ শেষ পর্যন্ত সেই অভাব ও শূন্যতাটুকু পূরণে এগিয়ে এলেন। তিনি অবশ্য ভূমিকায় উল্লিখিত বইটির প্রভূত ঋণও স্বীকার করেছেন। তবে এখানে বলে রাখা ভালো, ওয়াসি আহমেদের এই বইটি কোনোক্রমেই গল্পের ছলে ইতিহাসের পুনঃপাঠ নয়। বরং সত্যিকার অর্থেই এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও যথার্থ উপন্যাস, যেখানে ঐতিহাসিক কাহিনি ও কালপর্বের কিছু বাস্তব চরিত্র ও ঘটনাপঞ্জির পাশাপাশি তিনি অসংখ্য, বলতে গেলে, সিংহভাগ চরিত্র এবং তাদের কর্মকা- ও কথাবার্তা, আচার ও আচরণের প্রায় সবটুকুই নির্মাণ করেন তাঁর নিজস্ব গবেষণা, অনুসন্ধান ও কল্পনার কাদামাটি দিয়ে। শুধু তা-ই নয়, গ্রন্থের প্রধান চরিত্র, শরীফউদ্দীন নানকারকে স্থাপন করেন একেবারে বর্তমানের পাটাতনে; অপর এক আধুনিক, নাগরিক, করপোরেট দাসত্ব-আখ্যানের কেন্দ্রবিন্দুতে। সত্যি বলতে কি, শরীফউদ্দীন যে একদিন আচমকা তার নামের পেছনে এই নানকার পদবি জুড়ে দেয় সেটি যতটা তার বংশপরিচয় ও পূর্বপুরুষের সঙ্গে সংহতিবোধ থেকে, ঠিক ততটাই তার বর্তমান পেশাজীবনের দাসত্ববেদনা ও সাংসারিকতার গ্লানি-উৎসারিত ক্ষোভ ও প্রতিবাদ থেকেও। আর এভাবেই একটি ঐতিহাসিক আখ্যানকে লেখক তাঁর আঙ্গিকশৈলী ও সৃজন-কুশলতায় অনায়াসে সমকালীন ও প্রাসঙ্গিক করে তোলেন। নানকারদের বঞ্চনা ও বিক্ষোভের গল্প বলতে গিয়ে গ্রন্থকার কিন্তু সে-সম্প্রদায়ের অন্দরমহলের ব্যক্তি-কাহিনি বর্ণনা করেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেন না; গভীর নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে তুলে আনেন সেই ঐতিহাসিক কালপর্বে সংঘটিত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় যাবতীয় সমসাময়িক ঘটনাপুঞ্জকেও। জমিদারি ব্যবস্থার অমানবিক শোষণ, ব্রিটিশ শাসনের দুঃসহ নিপীড়ন, আসাম বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের রাজনৈতিক জটিলতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পূর্বাপর, বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির উত্থান ও তৎপরতা, ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির নাটকীয়তা ও উত্তেজনা, দেশভাগের বিপুল ট্র্যাজেডি, নানকার বিদ্রোহ দমন, প্রজাস্বত্ব আইনের প্রচলন ও অবশেষে জমিদারিপ্রথার বিলুপ্তি; কিছুই বাদ যায় না গ্রন্থকারের সানুুপুঙ্খ অভিনিবেশের বিস্তৃত পরিধিসীমা থেকে।
তবে নানকার প্রথা ও বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত এসব নানাবিধ ঐতিহাসিক ঘটনাপরম্পরার শরীরে সত্যিকার রক্তসঞ্চালন ও প্রাণসঞ্চার হয় মূলত লেখকের নিজস্ব কল্পনা থেকে উৎসারিত চরিত্রসমূহ, তথা শরীফের দাদা তকবির চান, দাদি মতিজান, বাবা শুকুর চান, ফুপু আম্বিয়া খাতুন, তার স্বামী তৈয়ব আলী, চাচা ধলু, প্রতিবেশী তোরাব প্রমুখের জীবনের হাসিকান্না ও স্বপ্ন-সংগ্রামের বিশ্বস্ত বর্ণনা, প্রাণবন্ত সংলাপ রচনা ও বিশদ উপস্থাপনার গুণেই। প্রজাদের সুখণ্ডসমৃদ্ধির বিষয়ে
ইচ্ছাকৃতভাবে উদাসীন সাহেব প্রশাসক তথা ‘কানা রাজা’র চক্ষু উন্মীলনের নিমিত্তে দিনদুপুরে নানকার মেয়েদের হারিকেন মিছিলের সপ্রাণ বয়ান; শুকুর চানের বাবা নানকার তকদির চানের বিলের পানিতে বড় মাছ ধরার রোমাঞ্চকর বয়ান; লোভে পড়ে সেই মাছ বিধিমতো জমিদারকে না দিয়ে হাটে বিক্রি করে দেওয়া ও পরিবারের সদস্যদের জন্য তার কয়েক টুকরো নিয়ে যাওয়ার মানবিক বিবরণ; তার মাশুলস্বরূপ জমিদারের বাড়িতে জরুরি তলব ও উঠোনভর্তি প্রজার সামনে ‘তক্তাউড়া’র (অভিযুক্তকে দুই খণ্ড তক্তার মাঝখানে শুইয়ে তার বুকের ওপর উঠে প্রবল চাপে পিষ্ট করা) মতো মধ্যযুগীয় শাস্তির আঘাতে পিতা-পুত্রের রক্তাক্ত হওয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা – এ সবই উপন্যাসের প্রকৃত ভাবসম্পদ নির্মাণ ও তার অন্তর্গত আত্মার স্পন্দনটিকে পাঠকচিত্তে সমূলে চারিয়ে দিতে সহায়তা করে। তদুপরি নানা স্থানীয় রেওয়াজ ও রীতিপ্রথার উল্লেখ; উপন্যাসের গোটা কলেবরজুড়ে গ্রামীণ গীত, প্রবাদ, শ্লোক ও ধাঁধার অবিরল যোজনা; আবিয়াতি, দেওলা, ছিলক, কেওড়, রোজনা, লালচ, গরদিশ, আড়–য়ানি, কিরান, রিশতা, মিরাশদার ইত্যাদি আরবি, ফারসি ও আঞ্চলিক শব্দের অকুণ্ঠ, অমোঘ প্রয়োগে এটি একটি জনপদের প্রাত্যহিক জীবনচর্যার প্রামাণ্য দলিল হয়ে ওঠে অক্লেশে।
ওয়াসি আহমেদের গদ্যভাষা ও আঙ্গিক-ভাবনায় অবশ্য তেমন একটা অভিনবত্ব কিংবা নিরীক্ষাধর্মিতা নেই। তাঁকে এদিক দিয়ে ক্লাসিসিস্ট বা মূলধারার অনুবর্তী লেখকই বলা চলে। কিন্তু তারপরও তাঁর ভাষাভঙ্গি ও বাচনশৈলীতে এমন এক স্বাতন্ত্র্য ও সূক্ষ্ম সিগনেচার রয়েছে যে, চক্ষুষ্মান পাঠকের পক্ষে তাঁকে আলাদা করে চিনে নিতেও তেমন বেগ পাওয়ার কথা নয়। সেইসঙ্গে তাঁর রয়েছে প্রবল কৌতুকবোধ; আয়রনির প্রতি পক্ষপাত; ব্যঙ্গোক্তি ও কূটাভাষের প্রবণতা, নিরেট গদ্যের জমিনেও অন্তর্লীন কাব্যসৃজনের সামর্থ্য – যা তাঁর লেখাকে সপ্রতিভ করে তোলে এবং একধরনের চাপা, চোরা আকর্ষণ তৈরি করে দেয় পাঠকের মনে। এই উক্তির সপক্ষে, গ্রামীণ ও নাগরিক দুই প্রেক্ষাপট থেকে দুটো দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক তা হলে।
নানকার মেয়েদের জমিদারের লালসার বলি হওয়া প্রসঙ্গে একটি উদ্ধৃতি : ‘নানকারঘরের সুন্দরী মেয়েদের পাখি হওয়ার ঘটনা আকসার ঘটে আসছে। মায়ের বুকে মেয়েরা আর ফেরে না, পাখি হওয়া মেয়ের অদেখা ডানার ঝাপটায় জীবনভর মায়েদের বুক মোচড়ায়। নানকারঘরের দেখতে-শুনতে ভালো মেয়েরা মিরাশদার-জমিদার পরিবারের মেয়েদের বিয়ের সময় বাঁদী হয়ে সেই যে সঙ্গে পাড়ি জমায় আর তাদের ফেরার পথ থাকে না। কাছাকাছি বসতির ডেফল বেওয়ার মেয়ে আজিনা গেছে বছর কয়েক আগে, আলিমুদ্দির পরির মতো মেয়ে রুশনি গেছে, আর মতিজানের একই বসতির কালাইর মেয়ে তরক্কি গেছে। কাছে-দূরে এমন বসতি পাওয়া যাবে না, যেখান থেকে বাছা-বাছা মেয়েগুলো এভাবে হারিয়ে যায়নি। মেয়ে হারিয়ে মায়েরা বুক চাপড়ে সান্ত¡না খোঁজে মেয়েরা পাখি হয়ে গেছে বলে। খুব গরমকালে পাখি-মেয়েরা নাকি মায়েদের চোখে-মুখে ঠান্ডা ডানার হাওয়া বুলিয়ে যায়। ডেফল বেওয়া মেয়ে খুইয়ে রাতের পর রাত আহাজারি করত। বাঁদী হয়ে, পাখি হয়ে তার মেয়ে কোন মুল্লুকে গেছে সে খবরও সে পায়নি। কালাইয়ের বউ আহাজারি করেনি, চুপেচাপে গলায় দড়ি দিয়েছে। কালাই এখন বউ না মেয়ের দুঃখে কে বলবে, পুঁথির পদে আল্লা-রসুলের নাম গেয়ে কী শান্তি খোঁজে কে জানে।’
অন্যদিকে শরীফের স্ত্রী মুনিরার বিবাহ-পূর্ব দারিদ্র্যলাঞ্ছিত জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্তের বর্ণনায় এই আশ্চর্য স্তবকটির দেখা পাই আমরা : ‘ঘরে ফেরার পথে জোরে হেঁটে ঘেমে ওঠার কারণেই হবে, মাথাটা যেন একটু একটু হালকা হচ্ছিল। বুঝতে পারছিল, এই টাকাটা অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। তার নিজের খরচ মেটানো ছাড়াও ঘরের খাই-খাই এতে অনেকটা মিটবে। মায়ের মুখে টাকা ছুড়ে কি ঝালটা সে মেটাবে! মা যা করে সেটা হয়তো দীর্ঘদিনের পরিবেশের প্রভাব, যদিও একই পরিবেশে থেকে মায়ের মতো মূর্খ হয়েও চাচিজি অন্যরকম। মায়ের প্রতি সহানুভূতি জাগানো তার পক্ষে কঠিনই নয়, অসম্ভবও। পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপেই যদি মা এমন হয়ে গিয়ে থাকে, মুনিরা বড়জোর তাকে দয়া করতে পারে। ঘরের কাছাকাছি যত এগোচ্ছিল, পা দুটোর বেগ সামলাতে গিয়ে খেয়াল করছিল জোরে হাঁটার সুবিধা, চিন্তাভাবনাগুলোর টুঁটি চেপে ধরা যায়। এখন থেকে জোরেই বরং হাঁটবে, আর পেরেক-ঠাসা স্যান্ডেলের মায়া ছেড়ে নতুন স্যান্ডেল কিনবে। হাঁটাটা সাবলীল হবে।’
ওয়াসি আহমেদের আরেকটি আঙ্গিকগত অর্জনও এখানে সপ্রশংস উল্লেখের দাবি রাখে। নানকারদের জীবনাখ্যানের সমান্তরালে আরো যে-তিনটি পার্শ্ব উপাখ্যান এখানে বহমান, যেমন – শরীফের স্ত্রী মনিরার দারিদ্র্যলাঞ্ছিত বিবাহ-পূর্ব জীবনের লড়াই-সংগ্রামের গল্প; মনিরা ও শরীফের দাম্পত্যজীবনের
প্রেম-অপ্রেম আর সুখণ্ডঅসুখের গল্প এবং শরীফের নিরীহ চাকুরে জীবনের সঙ্গে নির্লজ্জ, অমানবিক করপোরেট কালচার ও অফিস পলিটিক্সের অনিবার্য বিরোধের বয়ান, এর প্রত্যেকটির উপস্থাপনাতেই ঔপন্যাসিক বিস্ময়কর জীবনঘনিষ্ঠতা, প্রগাঢ় পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, মানব-মনস্তত্ত্বের কুশলী বিশ্লেষণ, বাংলাদেশের সমকালীন
আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়া পুরো গ্রন্থে ফাদার পিটার, অনিমা গোমেজ, বিহারি চাচি, ফণীভূষণ, ইন্দিরা, মামুন, আবজল, অমল ভট, নইমউল্লাহ, সুভাষ, সোনামিয়া, শরীফাসহ আরো যে অজস্র বাস্তব ও কল্পিত ছোট-বড় চরিত্রের বিচরণ রয়েছে, তাদের প্রত্যেককেই লেখক অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য, জীবন্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে আঁকতে সমর্থ হন, একজন বড় ঔপন্যাসিকের যা প্রকৃত চরিত্রলক্ষণ। সংলাপ রচনাতেও ঈর্ষণীয় দক্ষতা ও জীবনসম্পৃক্ততার নিদর্শন রাখেন ওয়াসি আহমেদ, যা তাঁর এই আখ্যানটিকে সুখপাঠ্য হয়ে উঠতে প্রভূত সাহায্য করে।
শেষের আগে, গ্রন্থটির অসাধারণ শিরোনাম নিয়ে কয়েকটি বাক্যব্যয় অনুচিত হবে না বলেই মনে করি। কেননা এই নামের মধ্যেই রয়েছে উপন্যাসটির বহুমাত্রিকতার ইঙ্গিত। প্রথমত, আক্ষরিকভাবেই এটি একটি লঞ্চের নিচতলা তথা তলকুঠুরি (এই প্রতিশব্দটিও সম্ভবত ওয়াসি আহমেদের উদ্ভাবনায় বাংলা শব্দভা-ারের একটি নতুন সংযোজন) থেকে ভেসে আসা গানের অব্যবহিত অভিঘাতের গল্প। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিককালের বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় যে সাব-অল্টার্ন বা প্রান্তবর্গীয় জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সাহিত্যের কথা শুনতে পাই আমরা, এটিও সেই, গোর্কি-কথিত লোয়ার ডেপ্থ, তথা আমাদের নিজস্ব ইতিহাসের অন্য এক অনালোকিত তলকুঠুুরির গল্প এবং সবশেষে, আমাদের প্রত্যেকের হৃৎপি-ের তলায় যে এক গভীর, গোপন ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠ রয়েছে, এটি সেই আবছায়া অঞ্চলেরও এক সুন্দর, সাহিত্যিক প্রতিবেদন। একটি গ্রন্থের দুই মলাটের মাঝখানে এত বর্ণিকাভঙ্গ আর এমন বহুমাত্রিকতাকে ধারণ করাটা মোটেও সহজ কথা কথা নয়, কিন্তু কথাজাদুকর ওয়াসি আহমেদ সেই অসাধ্যকেই সাধন করেন এখানে অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে।
উপসংহারে এটাই বলার যে, ওয়াসি আহমেদের আরো বেশি করে পঠিত, আলোচিত ও চর্চিত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে, এই উপন্যাসটি প্রত্যেক তরুণ কথাসাহিত্যিকেরই অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত তাঁদের নিজেরই গরজে। কেননা এই একটি গ্রন্থ থেকেই তারা পেতে পারে সার্থক ও শিল্পিত উপন্যাস রচনার যাবতীয় শুলুকসন্ধানও মূল্যবান পথনির্দেশনা। আরো একটি কথা, বাংলাদেশের যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি ভাষান্তরের কাজ করে থাকেন, তাদের কাছেও এ-আলোচকের সনির্বন্ধ অনুরোধ রইল এটিকে তাঁদের আশু অনুবাদ্য-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার। কেননা আমাদের বিশ্বাস, সমকালীন বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এই অনন্য গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হবে। ওয়াসি আহমেদের জন্য রইল আমাদের উষ্ণতম অভিনন্দন ও শুভকামনা। সেইসঙ্গে, ধন্যবাদ প্রথমা প্রকাশনকেও, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ও তার মেধাবী লেখককে যথাসময়ে চিহ্নিত করে প্রকাশ ও পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসার জন্য।

Leave a Reply

%d bloggers like this: