আত্মপরিচয়-সংকটের সাহিত্য

লেখক: আবুল কাশেম

২০১৪ সালে প্রকাশিত দুটি উপন্যাস পাশ্চাত্য বিশ্বে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে, যার ঢেউ বাংলাদেশে এসেও লাগে। তার একটি জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির কালারলেস সুকুরু তাজাকি অ্যান্ড হিজ ইয়ার্স অব পিলগ্রিমেজ, অপরটি জিয়া হায়দার রহমানের ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো। জিয়া হায়দার রহমান বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। সিলেটের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁর জন্ম।

মুরাকামি তাঁর নিজের দেশ জাপান তো বটেই, সারাবিশ্বে প্রচ-ভাবে জনপ্রিয় লেখক। পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় তাঁর বই অনূদিত হয়। এখন বেশিরভাগ সময় কাটে তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে। মুরাকামির বেশ কয়েকটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। তবে তিনি আমাদের জনপ্রিয় (?) লেখকদের মতো বছরে ছয়-সাতটি উপন্যাস লেখেন না, তিন-চার বছরে তাঁর একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। তিনি পরাবাস্তববাদী লেখক। সাহিত্য সম্পর্কে যাঁরা খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন কয়েক বছর ধরে প্রতিবছরই গুঞ্জন ওঠে যে, হারুকি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন।

ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো জিয়া হায়দার রহমানের প্রথম উপন্যাস। ২০১৪-এর মে মাসে বইটি প্রকাশের পরপর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার ঝড় ওঠে। দ্য গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য নিউইয়র্কার, দ্য টেলিগ্রাফ প্রভৃতি বড় বড় পত্রপত্রিকায় জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ছাপা হয়। দ্য নিউইয়র্কারে জেমস উড যে-আলোচনা করেন তা চার হাজারের বেশি শব্দে রচিত। প্রথম উপন্যাসের এতবড় আলোচনা রীতিমতো বিস্ময়কর ঘটনা। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, এটি ‘একুশ শতকের প্রথম ক্ল্যাসিক’। কারো কারো মতে, ‘জিয়া হায়দার রহমান জর্জ অরওয়েল এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত নোবেলবিজয়ী ব্রিটিশ লেখক বিদ্যাধর সুরুজপ্রসাদ নাইপলের সম্ভাব্য উত্তরসূরি।’

 

দুই

কালারলেস সুকুরু তাজাকি অ্যান্ড হিজ ইয়ার্স অব পিলগ্রিমেজ মুরাকামির পরাবাস্তববাদী উপন্যাস। এই উপন্যাসে আত্মপরিচয়ের সংকট আছে। সংকটটা ভিন্নধর্মী, বাস্তবিক ক্ষেত্রে অনেকটা অন্তর্জাগতিক। সুকুরুর চারজন বন্ধু রয়েছে। তাদের নামের বাইরেও বর্ণ বা রঙিন কিছু পরিচয় আছে। তার চার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অর্থগত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত চারটি নাম আছে; যেমন : মি. লাল, মি. নীল, মিস সাদা ও মিস কালো। সুকুরুর এরকম কোনো নাম নেই। সেরকম পরিচয় নেই। সে ক্রমে উপলব্ধি করতে পারে, সে একজন বর্ণহীন মানুষ, যার নামের বর্ণপ্রতীকে কোনো অর্থরহস্য লুকায়িত নেই। বর্ণময় যেসব ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার, এরা সবাই তাকে ত্যাগ করে চলে গেছে। সে এখন নিঃসঙ্গ, পরিচয়হীন। আগামী বছর তার বয়স বিশ হবে। কিন্তু এই জলবিভাজন, যৌবনে পা রাখা – এসব তার কাছে অর্থহীন। তাই সে সিরিয়াসলি আত্মহত্যার কথা ভাবছে। গভীর হতাশার মধ্যে এখন মৃত্যুটাই তার কাছে মনে হচ্ছে মনোহর ও মনোমুগ্ধকর।

রংটা নিঃসন্দেহে একটি বিশেষণ। এ-বিশেষণটি একটি পরিচয়ও। এরকম বিশেষণ সুকুরুর নেই। সুকুরু নিজের দেশে যেন অভিবাসী। বন্ধুদের মধ্যে সম্পূর্ণ একা, প্রবাসী। নিঃসঙ্গ সুকুরু পরিণত বয়সে শিনজিকু রেলস্টেশনে একজন নকশাকার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। মানসিক একটা নির্বাসনও তার আছে। তার জীবনটা রেলস্টেশনের আদেশবাহী অভিসন্ধিকের মতো। তার যে মনস্তাত্ত্বিক পরিচয়, বাস্তবতার ভেতরে বাস্তবতা, তা সংবেদনশীল পাঠককে নাড়া দেবেই। ভাবতে হবে, কোন পরিচয়ের মধ্য দিয়ে সে যাচ্ছে। সে একজন কল্পনাপ্রবণ মানুষ। বাবা তাকে সহযোগিতা দিয়ে প্রকৌশলী বানিয়েছেন। এটিই তার পরিচয় হতে পারত। কিন্তু অনেক রীতি-নিয়ন্ত্রিত সম্পর্ক এবং একাধিক নারীর প্রতি ভালোবাসার স্বপ্ন-কল্পনায় তিনি আবদ্ধ ও আচ্ছন্ন। ছাত্রজীবনের নির্দিষ্ট কোনো রং-পরিচয় – যা তার বন্ধুদের ছিল, না থাকায় যেন সবকিছুই এলোমেলো। আগ্রহের আতিশয্যে পরিণামে বিস্ময়কর নির্লিপ্ত। একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একসময় তার জীবনে আসে সারা কিমোতোর মতো মোহময় কিন্তু নির্ভরযোগ্য এক নারী। সে হতে পারত সুকুরুর জীবনে পরিবর্তনের অনুঘটক। সুকুরুর কর্মোদ্যমের অভাব এবং বিদ্ঘুটে অতীত তা হতে দেয়নি। সারা তিনদিন সময় নেয় তার মতামত জানানোর জন্য। ততক্ষণে সুকুরুর আগ্রহ হারিয়ে গেছে। তিনদিন পর গভীর রাতে সারার ফোন আসে। একসময় কাক্সিক্ষত এই ফোনের জন্য যে উৎকর্ণ হয়ে থাকত; কিন্তু আজ সে ফোন ধরে না। এক ধরনের নির্লিপ্ততা তাকে অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। সবই কি অর্থহীন মনে হয় তার কাছে?

প্রথমে মুরাকামি সুকুরুকে নিয়ে একটি ছোটগল্প লিখতে চেয়েছিলেন। দ্য গার্ডিয়ানের স্টিভেন পুলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘৩৬ বৎসর বয়সী একজন ব্যক্তি, খুব একা। গল্পে তার জীবনের রহস্যগুলো অনোন্মোচিত থাকবে। কিন্তু সারা (সুকুরুর গার্লফ্রেন্ড) এসে বলল, তোমার নাগোয়ায় ফিরে গিয়ে দেখা উচিত সেখানে কী ঘটছে। যখন আমি বই লিখছি আমার চরিত্র আমাকে বলছে আমার কী করা উচিত। এভাবে গল্পটা উপন্যাস হয়ে গেল।’

মুরাকামি প্রায়ই সুকুরুর ওপর ভর করেছেন। স্টিভেন পুলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেই বলেন, ‘আমি জানি না (কেন) সুরুকুর সঙ্গে আমার এত মিল। আমি আমাকে একজন সাধারণ ব্যক্তির মতোই দেখি। শিল্পীর মতো দেখি না। সুকুরুর মতো (নিঃসঙ্গ?) নির্মাতা।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের কিয়োটোয় জন্মগ্রহণ করেন মুরাকামি। পিতা জাপানি সাহিত্যের শিক্ষক হলেও মুরাকামির জাপানি সাহিত্য ভালো লাগেনি, তিনি পাশ্চাত্য সংগীত ও সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। আমেরিকান লেখক কুর্ট ভনেগুট, রিচার্ড ব্রাউটিগান, জ্যাক কেরক এবং ফরাসি লেখক কাফকার লেখা গোগ্রাসে গিলতে থাকেন। ফলে তার মানসিকতা তৈরি হয়েছে পাশ্চাত্য ধাঁচে। লিখতে গিয়েও বস্তুত পাশ্চাত্যে-বিচরণ মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুরাকামির চরিত্রের মধ্যে তাই জাপানি বৈশিষ্ট্য খুঁজে পান না তাঁর স্বদেশি নোবেলবিজয়ী লেখক ক্যানজাবুরো ওয়ে। এই অভিমানেই কিনা মুরাকামি সাক্ষাৎকারে স্টিভেন পুলকে বলেন, ‘জাপানি লেখকেরা আমাকে সমাজচ্যুত (কাস্ট আউট) করেছে।’ কিন্তু পাশ্চাত্যের লেখকরাও কি সুকুরুর মতো তাঁকে কোনো রঙের পরিচয়ে রঙিন করে তুলেছেন – নাকি সুকুরুর মতোই তিনি ‘নিঃসঙ্গ (একাকী) নির্মাতা’?

এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর মেলা ভার। উত্তর চাওয়াও বোধহয় ঠিক নয়। মুরাকামির উপন্যাসে এমন এক স্বপ্ন ও বাস্তবতার অবতারণা করা হয় যে, উপলব্ধি করা মুশকিল কোনটি স্বপ্ন আর কোনটি বাস্তব। এই উপন্যাসেও একটি মনোগ্রাহী যৌনস্বপ্ন আছে, চরম সীমায় পৌঁছে পাঠক বুঝতে পারে না, সুকুরু স্বপ্নটা জেগে দেখেছিল, না ঘুমিয়ে। এমনকি মুরাকামি নিজেও স্মরণ করতে পারছেন না, স্বপ্নটা তাঁর নিজের কিনা। সত্যিটা হচ্ছে এই, আন্ত্রিক চেতনার স্বপ্ন-কল্পনায়ও দৈবানুগ মানসিক এবং আত্মিক স্বচ্ছ ও সত্যোচারণ অদ্ভুত সব যৌন গর্ভাভিনয়ে পরাবাস্তব চিন্তার প্রসারতা ঘটায়। এজন্যই কি স্টিভেন পুল বলেছেন, উপন্যাসটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য যে-সংবাদ দেয় তা প্রাচ্যের জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাছে যিশুর আবির্ভাবের মতো?

হারুকি মুরাকামিদের আদর্শ ফ্রাঞ্চ কাফকা তাঁর ডায়েরিতে একটি সিরিয়াস কথা লিখেছেন, ‘চার দেয়ালের মধ্যে আমি আমার নিজেকে পেলাম যেন একজন বিদেশি অভিবাসী কারারুদ্ধ অবস্থায় আছে। আমি দেখলাম আমার পরিবার (বাবা? তাঁর সঙ্গেই বিরোধটা ছিল প্রচ-, যার জন্য বাবাকে ১০০ পৃষ্ঠার এক ক্ষোভ বিস্ফোরণের পত্র লিখেছিলেন কাফকা) যেন এক অদ্ভুত অ্যালিয়েন (ভিনগ্রহের প্রাণী) যাদের রীতিনীতি, ধর্ম, ভাষা এবং উপলব্ধি আমাকে ঘিরে রেখেছে। আমি তা চাইনি, এরা আমাকে তাদের উদ্ভট আচারানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে জোর করল, আমি বাধা দিতে পারলাম  না।’

এই অবস্থা কাফকাকে সুকুরুর মতো পারিপার্শ্বিকতা, এমনকি নিজের থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

 

তিন

জিয়া হায়দার রহমানের উপন্যাসের বিষয় ও পটভূমি ব্যাপক বিস্তৃত। জেমস উড্ বলেন, ‘ইটস অ্যা নভেল আনএসেমড বাই মেনি ভ্যারাইটিজ অব নলেজ, ইটস ক্যারেকটারস টক ব্রিলিয়ান্টলি অ্যাবাউট ম্যাথামেটিক্স, ফিলোসফি, এক্সাইল অ্যান্ড ইমিগ্রেশন, ওয়ারফেয়ার, ওয়ালস্ট্রিট অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল ট্রেডিং, কনটেমপোরারি জিও পলিটিক্স, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইংলিশ অ্যান্ড আমেরিকান সোসাইটি, ইসলামি টেররিজম, ওয়েস্টার্ন পেটানালিজ, অক্সফোর্ড অ্যান্ড ইয়েল।’

তবে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে অভিবাসন-সংক্রান্ত নানা জটিলতা এবং যন্ত্রণা। উপনিবেশ-উত্তর সাহিত্যে অভিবাসন বিষয়টা বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। অভিবাসন নিয়ে বিখ্যাত সব উপন্যাস লেখা হয়েছে। অভিবাসন নিয়ে লেখার ইস্যুগুলো হচ্ছে ‘হোমলেসনেস’ এবং ‘বিলঙ্গিংলেসনেস’। অতীতকালের ‘নির্বাসন সাজা’, ‘নিজের নির্বাচিত অভিবাসন’ এবং ‘পার্থিব বাস্তুহীনতা’ বিষয়গুলোও আলোচনা কিংবা ফিকশনে অনুষঙ্গ হিসেবে আসে। তবে লেখকরা যেহেতু সংবেদনশীল, তাঁদের লেখায় বড় মর্মস্পর্শী হয়ে প্রবলভাবে এসেছে মর্যাদাবোধ ও আত্মপরিচয়ের সংকট। জিয়া হায়দার রহমানের উপন্যাসে তা যেন টগবগ করে ফুটছে, দ্রোহে ফেটে পড়ছে। উপন্যাসের এক জায়গায় জাফর বলছে, ‘আই হ্যাভ বিন কিকড অ্যান্ড স্প্যাট অ্যাট বিকজ অব মাই রেস। আই হ্যাভ হেড টিচার্স সেন্ড মি টু বিমেডিয়াল ক্লাসেস বিকজ দে থট আই ওয়াজ স্টুপিড হোয়েন আই ওয়াজ জাস্ট সাইলেন্ট, আই হ্যাভ বিন ব্রিটেন, ব্ল্যাক অ্যান্ড ব্লু মাই হোল শার্ট লাইফ, অ্যান্ড আই হ্যাভ মেড ইট হিয়ার। হ্যাভ আই গট দ্য ফাইট?’

যৌবনে এক ব্রিটিশ তরুণীকে ভালোবেসে মর্মান্তিক প্রতারণার শিকার হয় জাফর। এমিলির সঙ্গে জাফরের পরিচয় হয় অক্সফোর্ডে লেখাপড়াকালে। সে এবং জাফর একটি জুটিতে পরিণত হয়। তবে এমিলি তার কমসংখ্যক বন্ধুর সঙ্গেই জাফরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। সম্পর্কের দুমাস পর জাফর যখন বিয়ের প্রস্তাব করে, সে শুধু মৃদু হাসে, ‘রমণীদের মতোই স্বভাবসুলভ সে-হাসি’। হাসি থেকেই জাফর যা বোঝার বুঝে গেছে। জাফর তার বন্ধুদের বলেছে, এমিলি কখনো তাকে ‘সরি’ বলেনি। বিলাতে নির্বাসন এবং আত্মপরিচয়ের যে-সংকট, বর্ণবিরোধ ও শিকড়স্বত্বের ঘাটতি-ভাব জাফর তা স্পষ্টতই উপলব্ধি করতে পারে। বিলাত যেমন তার দেশ হয়নি, হিথরো বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন অফিসার যেমন তাকে বলেনি, ‘তোমার দেশে স্বাগতম’, তেমনি এমিলির আচরণে দেখেছে ‘ইংলিশনেস’। উদার প্রাচ্যবাদী (?) এই নারীর পেছন পেছন সে (জাফর) আমেরিকা, এমনকি বিপজ্জনক আফগানিস্তানে গেছে। ভালোবাসার ক্লান্তি, অবসাদ আর অবজ্ঞার মধ্যে সে উপলব্ধি করেছে অক্সফোর্ড, এমিলি,

ইংল্যান্ড-পশ্চিমা দেশ ও ব্যক্তিদের আফগানিস্তানে রাখা ভূমিকা সবই মেকি ও লোক-দেখানো। এমিলি এবং তার সহকর্মীরা যেন গ্রেট ব্রিটেনের রাজকীয় অহমিকা নিয়ে দয়া দেখানোর খেলা খেলছে। পশ্চিম সবকিছু তার পশ্চিমের চোখে দেখে, তাদের উদার প্রাচ্যবাদ চোখে ধুলো দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। জাফরের প্রাচ্যশ্রদ্ধা, প্রেম ও আন্তরিক ভক্তি এমিলির ‘ইরোটিক অক্সিডেন্টালিজমে’র কাছে মর্মান্তিকভাবে পরাজিত হয়েছে। এজন্যই জাফর বলছে, ‘আই হ্যাটেড এমিলি, ফর দ্য সেইম রিজন্স আই লাভড হার।’

উপন্যাসের নায়ক জাফর কি আসলেই জিয়া হায়দার রহমান – এরকম মনোভাব অনেকেরই। তার কারণও আছে। জিয়া হায়দার রহমানের জন্ম সিলেটের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বালক বয়সে পিতা-মাতার সঙ্গে ইংল্যান্ড চলে যান। বাস কন্ডাক্টর বাবার পরিবার নিয়ে স্থান হয় দুস্থদের জন্য সরকার-পরিচালিত লন্ডন শহরের ভাঙাচোরা এক আবাসন প্রকল্পে। ভাগ্য তাঁর সুপ্রসন্ন ছিল। অক্সফোর্ডের সুপ্রসিদ্ধ ব্যালিওন পেরিয়ে ক্যামব্রিজ, মিউনিখ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। প্রথমে নিউইয়র্কের ওয়ালস্ট্রিটে একজন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার এবং পরে কাজ করেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে।

উপন্যাসের নায়ক জাফর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক ব্রিটিশ নাগরিক। তার জন্মও সিলেটের কোনো এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। লেখকের ভাষায়, ‘অ্যা কর্নার অব দ্যাট কর্নার অব দ্য ওয়ার্ল্ড – ইফ অ্যা কর্নার হ্যাভ অ্যা কর্নার।’

প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জিয়া হায়দার রহমান বলেন, ‘স্থানচ্যুতি একটা বড় বিষয়। কেবল ভৌগোলিক তো নয়ই, শ্রেণির প্রশ্নেও।… আমাদের ছিল শ্রমিক শ্রেণির জীবন। দারিদ্র্যের জীবন, কাউন্সিল হাউসে জীবনযাপন। স্থানচ্যুতি যেমন ভৌগোলিক, তেমনি শ্রেণিগত অবস্থান পরিবর্তনের কারণেও ঘটে। এই উপন্যাসে আমি তা দেখাতে চেয়েছি। উপন্যাসের প্রধান দুই চরিত্রই অভিবাসী।’

জাফরের মতো জিয়া হায়দার রহমানেরও আত্মপরিচয়ের সংকট প্রবল। তিনি বলেন, ‘২০০১-০২ সালে আমি বাংলাদেশে ছিলাম। তখন উপলব্ধি করেছি যে, আমি বাংলাদেশি নই। বাংলাদেশের সঙ্গে আমার গভীর আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। তারপরও বুঝতে পারি তারা আমাকে বাংলাদেশি মনে করেন না।’ ব্রিটিশ পরিচয়ের ব্যাপারেও দ্বিধান্বিত, ‘আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি এ-প্রশ্ন করার প্রয়োজন বোধ করি না যে, জিয়া তুমি ব্রিটিশ কিনা? আপনি নিজেকে কী ভাবলেন তাতে এ বিতর্কের (ব্রিটিশ পরিচয়ের সংজ্ঞা বিতর্ক) ইতি ঘটবে না।’

তাই মনে করতে বাধা নেই যে, ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো বহুলাংশেই একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস, যার কেন্দ্রে আছে আত্মপরিচয়-সংকট।

 

চার

উপনিবেশ-উত্তর সাহিত্যের ইতিহাসে অভিবাসন নিয়ে উপন্যাস লিখে প্রথম পশ্চিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ভি এস নাইপল। ভৌগোলিক স্থানচ্যুতি, হোমলেসনেস বিলঙ্গিংলেসনেস এবং আত্মপরিচয়হীনতা নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাস অ্যা হাউস ফর মি. বিশ্বাস এক বিখ্যাত বই। তাঁর ভ্রমণকাহিনিভিত্তিক লেখাগুলোয়ও অভিবাসন ব্যাপকভাবে এসেছে, যদিও বইগুলোর সমালোচনা হয়েছে প্রচুর। প্রথমবার ভারত ভ্রমণের পর লেখা বই অ্যান অ্যারিয়া অব ডার্কনেস প্রকাশিত হওয়ার পরপর ভারত সরকার তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

বিদ্যাধর সুরুজপ্রসাদ নাইপলের পূর্বপুরুষেরা দারিদ্র্যের কশাঘাতে ভারত ছেড়ে ক্যারিবীয় দ্বীপদেশ ত্রিনিদাদ ও টোবাগোয় পাড়ি জমান। তাঁর মাতামহ সেখানে আখ চাষের মজুরের কাজ নেন। সেটি উনিশ শতকের আশির দশকের কথা। সেখানে নাইপল জন্মেছেন। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ত্রিনিদাদে ছিলেন। ওই বয়সেই তিনি সরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান অক্সফোর্ডে। তারপর মাঝেমধ্যে ত্রিনিদাদে বেড়াতে আসতেন, পরে তো ইংল্যান্ডই তাঁর দেশ (?) হয়ে যায়।

দেশান্তর এবং অভিবাসনের দুর্ভোগচিত্র তিনি শৈশবে খুব কাছে থেকেই দেখেছেন। অভিবাসী জীবনের নানা বিড়ম্বনা এবং তিক্ততার করুণসব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। ‘অ্যা হাউস ফর মি. বিশ্বাস উপন্যাসে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার সমস্যা, হতাশা এবং ব্যক্তির তাৎপর্যহীনতা ব্যাখ্যা করেছেন। ব্যক্তির আত্মপরিচয়হীনতা এবং তৎপরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত সমস্যা চিহ্নিত করার ফলে পাঠকের সহানুভূতির পাশাপাশি মিস্টার বিশ্বাসের প্রতি লেখকের যে-অনুকম্পা তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। নাইপলের এ-উপন্যাসটি আত্মজৈবনিক বলে মনে করা হয়। তাঁর বাবার জীবনের অনেক কথাই মিস্টার বিশ্বাসের চরিত্রে এসে গেছে – এ-কথা তিনি নিজেও বলেছেন। মিস্টার বিশ্বাস শুধু অভিবাসীই নন, অভিবাসী একটি পরিবারের ঘরজামাইও। তাই তার বিড়ম্বনা নানামুখী। নাইপলের বাবারও ত্রিনিদাদে শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান বা সেখানে তিনি বসবাস করছিলেন। মিস্টার বিশ্বাসের হোমলেসনেস তাঁর পরাধীনতার প্রতীক। আর বাড়ি হচ্ছে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক। পাশাপাশি মর্যাদার প্রতীকও বলতে হবে।

মি. মোহন বিশ্বাস তার স্ত্রী শামা এবং এদের প্রভুত্বপরায়ণ পরিবারে শুধু অসুখী নন, ক্ষুব্ধও ছিলেন। তাদের বাড়ির তুলসী সাম্প্রদায়িকতারও প্রতীক। জীবনের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিনিধিত্ব করে, যা বরাবরই আফ্রিকা এবং এশিয়ায় দেখা যায়।

স্রোতে কচুরিপানার মতো রুটলেসলি ঘুরে বেড়ানোয় জিয়া হায়দার রহমানের মতোই নাইপলের অবস্থা। ১৯৬২ সালে নাইপল এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী পেট ভারতে যান। ভারত নাইপলের পূর্বপুরুষদের আবাসস্থল। সে-সময়েই লেখেন অ্যান অ্যারিয়া অব ডার্কনেস। জীবনে এই প্রথম তিনি অনুভব করলেন যে, তিনি আত্মপরিচয়হীন এমনকি অজ্ঞাতপরিচয় একজন। পূর্বপুরুষদের ভূমিতে পেটের সামনে তাঁর হয়তো প্রত্যাশাটাও বেশি ছিল। তাঁর মনে হলো, ভারতীয়দের কাছে তিনি কেউ নন, তাঁকে কেউ স্বীকারও করছে না। যেন এক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর লোক, ত্রিনিদাদে যেমন ছিলেন এবং ইংল্যান্ডে যেমন আছেন – বিচ্ছিন্ন, মূলহীন এবং ভাসমান। তা তাঁকে খুবই উদ্বিগ্ন করে তোলে। অ্যান অ্যারিয়া অব ডার্কনেসে লেখেন, ‘আই হ্যাড লার্ন মাই সেপারেটনেস ফ্রম ইন্ডিয়া, অ্যান্ড ওয়াজ কনটেন্ট টু বি অ্যা কলোনিয়াল, উইথআউট অ্যা পাস্ট, উইথআউট এনসেস্টরস।’

শুধু ভারতবর্ষে নয়, ত্রিনিদাদের মতো অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ইংল্যান্ডেও ঘটেছে। তাঁর বহু লেখায় সে-প্রমাণ রয়েছে। তাঁকে বিষিয়ে তুলেছে এশীয় বা আফ্রিকান, এমনকি ইউরোপীয়দের আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করা শব্দ ‘ড়িম’, যা ফধৎশরবং বা কৃষ্ণাঙ্গ নর-নারীদের লক্ষ্যে পরিণত করেছে। এসব কটুকাটব্য নিশ্চয়ই সচেতন কাউকেই স্বস্তি দেয় না। তাঁর সময়ের ‘অরিয়েন্টালিজমে’র প্রবক্তা এডওয়ার্ড সাঈদ যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘নাইপল সম্পূর্ণ সচেতনভাবেই নিজেকে পশ্চিমের মোকদ্দমায় সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।’

ঔপনিবেশিক পুরাণতত্ত্বের কৃষ্ণাঙ্গ নর-নারী বর্ণগত (ৎধপপরধষ) পরিচয়ের কারণে কটুকাটব্যের শিকার। ক্যারিবিয়া থেকে আসার পর ইংল্যান্ডে নির্বাসনকালে লব্ধ এই বিশ্বদৃষ্টি ‘দ্য মিডল প্যাসেজ’ প্রবন্ধে বেশি মূর্ত।

আফ্রোক্যারিবিয়ান লেখকদের সম্পর্কে ক্যারল ভয়েস ডেভিস সুনির্দিষ্টভাবেই বলেছেন, ‘অভিবাসন জীবনের অভিজ্ঞতা নিশ্চিতভাবেই তাঁদের সামনে ঠেলে দিয়েছে, উদাহরণ ভি এস নাইপল। তেজো-কোলের ওপেন সিটি উপন্যাসের নায়ক জুলিয়াস নিউইয়র্ক থেকে নাইজেরিয়া, নাইজেরিয়া থেকে বেলজিয়ামে ভেসে বেড়াচ্ছে, কোথাও তাঁর স্থিতি হচ্ছে না, বিচ্ছিন্ন, আত্মপরিচয়শূন্য।’

‘ইমেজারি হোমল্যান্ডসে’ সালমান রুশদি লিখেছেন, ‘বম্বে শহরটা বিদেশিদের তৈরি, জমি অধিগ্রহণ করে বসবাসের উপযুক্ত করে ওরা শহরটা বানিয়েছিল। এতদিন দূরে দূরে থেকে প্রায় ওই অভিধা আমাকেও দেওয়া যায় এবং দৃঢ়ভাবে আমি বিশ্বাস করি, আমারও একটা শহর আছে, একটা ইতিহাস আছে, যা আমি পুনরায় অধিগ্রহণ করতে পারি। যেসব লেখকের অবস্থা আমার মতো, দেশান্তরিত, হয় পাড়ি জমিয়েছে, নতুবা সেখানকার অভিবাসী, তাদের হয়ত মাঝে-মধ্যেই কিছু একটা হারানোর বোধ ফিরে ফিরে আসে, কিছু একটা ফিরে পাওয়ার ইচ্ছে হয়।’

 

পাঁচ

সাম্প্রতিককালে সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে ক্যাপ্টেন কক্স নামে একটি উপন্যাস। ক্যাপ্টেন কক্স অষ্টাদশ শতকের একেবারে শেষের দিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামে এসেছিলেন আরাকানি উদ্বাস্তু রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকদের পুনর্বাসন করতে। তখন ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলের শুরু।

তখনকার বর্মি রাজা বোধপায়া স্বাধীন আরাকান রাজ্য দখল করে নেওয়ার পর আরাকানি উদ্বাস্তু সমস্যার সৃষ্টি হয়। ভিন্ন আঙ্গিক ও পরিচয়ে এ-সমস্যা আজো প্রবলভাবে বিদ্যমান।

আরাকানি উদ্বাস্তু সমস্যার কারণ রাজনৈতিক। এ-সমস্যা সমাধানে তাই আরাকানের ক্ষমতাচ্যুত শাসনকর্তার পুত্র চিনপিয়ান লড়াইয়ে নেমেছিলেন। কোম্পানির ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কক্স তাঁকে সমর্থন জুগিয়েছেন এবং উদ্বাস্তুদের রামুর আশপাশে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

উপমহাদেশে রাজনৈতিক কারণে উদ্বাস্তু বা অভিবাসন-সমস্যার প্রথম পরিচয় মেলে গ্রিক দিগি¦জয়ী আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণকালে। তক্ষশীলায় তখন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন করা হয়েছিল রাজা অম্বীর ইচ্ছার বাইরেই। কক্সবাজারেও স্থানীয় জমিদাররা উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে বিরোধিতা করেন। ডা. ফ্রান্সিস বুকানন কক্সসহ কোম্পানিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন এদের জন্য স্থানীয় জনবিচ্ছিন্ন একটি জনপদ সৃষ্টি করে একে জেলা হিসেবে ঘোষণা দিতে। সেটি অবশ্য কোম্পানি করেনি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, প্রায় আড়াইশো বছর পরও স্থানীয় জনগণ থেকে এরা বিচ্ছিন্নই আছে। এদের নিজেদের অবশ্য আলাদা একটি সমাজ তৈরি হয়েছে। এই সমাজের লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষ আরাকানের রাখাইনদের সঙ্গে সম্বন্ধ স্বীকার করলেও তাদের চারপাশের কাউকে ব্যক্তি বা সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ করেনি। স্থানীয় লোকজনও তাদের গ্রহণ করেনি। রেসিজম এখানে দেয়ালটা তৈরি করেছে; বর্ণ এবং নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ই তার অন্যতম কারণ।

ক্যাপ্টেন কক্স উপন্যাসে বিষয়গুলো এসেছে নিবিড়ভাবে। এ-সম্পর্কে নাট্যকার এবং শিল্প-সমালোচক সাঈদ আহমেদ লিখেছেন, ‘দ্য স্টোরি অব ক্যাপ্টেন কক্স এজ রিলেটেড বাই কাসেম ইজ ইউনিক বিকজ নো ওয়ান হ্যাজ লুকড ইন টু দিজ পাস্ট অব বাংলাদেশ’জ পাস্ট বাট রিসেন্ট হিস্টরি ক্যাপ্টেন কক্স উই আর টোল্ড প্লেড অ্যান ইমপরট্যান্ট রোল ইন রিহ্যাবিলিট্যাটিং দ্য আরাকানি রিফিউজিস ইন সাউথ চিটাগাং উইথ সাকসেস ইন অ্যা শর্টটাইম। ম্যালেরিয়া টুক হিম টু হিজ আনটাইমলি ডেথ ইন ১৭৯৯। দ্য রিডার ক্যান গেদার মাচ ইনফরমেশন অ্যাবাউট দ্য আরাকানি কমিউনিটি, দেয়ার সোসাইটি অ্যান্ড দেয়ার স্ট্রাগল অ্যাগেনস্ট দ্য কোম্পানি অথরিটিজ, লোকাল ল্যান্ডেড জেনট্রি, পর্তুগিজ বিজনেসম্যান, বার্মিজ কিং বোধপায়া অ্যান্ড দ্য সান অব আরাকান রুলার চিনপিয়ান।’

দেশত্যাগ বা স্থানত্যাগ মানুষদের থেকে-যাওয়া অতিথিপাখিদের মতোই অস্থির করে রাখে। পরিচয়-সংকট, আস্তিত্বিক অভিঘাত      প্রভৃতি তাদের ফিরে যাওয়ার পরও পিছু ছাড়ে না। তার মনে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন জাগে, ‘আমি আসলে কে?’ কারণ ফিরে যাওয়ার পর কেউ তাকে আগের মতো গ্রহণ করে না।

 

ছয়

গত বছর (২০১৭) সাহিত্যে নোবেল পান ইংল্যান্ড প্রবাসী জাপানি লেখক ইশিগুরো। প্যারিস রিভিউ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বর্তমানে ইংল্যান্ডই আমার দেশ, কিন্তু আমার মা বাবা এখনো সুস্থভাবে জাপানে বেঁচে আছেন। যখনই ফোনে জাপানি ভাষায় তাদের সঙ্গে কথা বলি, শুনলে মনে হবে সদ্য কথা বলতে শিখেছি। এখন এই ভাষাটাই একমাত্র অবলম্বন  যা দিয়ে তাদের সঙ্গে আজো আমার সম্পর্ক অটুট আছে।’ এটা হয়েছে তাঁর স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে। জাপানের পাঠকরাও তাঁকে তাদের লেখক বলে মনে করেন না। ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তমকি মাসুকা বলেন, ‘আমরা এই ধরনের সাহিত্যিকের নাম এবারই (নোবেল পাওয়ার পর) প্রথম শুনলাম।’ ওমেডা ‘নিহোন বুক  সেন্টারের’ নিশিচি ওগামি তেতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা এখানে পঞ্চাশ বছর যাবত বই বিক্রি করছি, কোনো দিন ইশিগুরো নামের কোনো লেখকের বই পাইনি।’ স্বদেশি লেখক মুরাকামি নোবেল না পাওয়ায় এরা অসন্তুষ্ট।

অথচ ১৯৮২ সালে প্রকাশিত ইশিগুরোর প্রথম উপন্যাস অ্যা পেইল ভিউ অব হিলস এবং ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত অ্যান আর্টিস্ট অব দি ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড উপন্যাসের পটভূমি জাপান। প্রথম দুটি উপন্যাস সম্পর্কে দ্য টেলিগ্রাফের গাবি উডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘প্রথম দিকে যখন আমি উপন্যাস লিখতে শুরু করি, জাপানের পটভূমিতেই শুরু করেছিলাম। এটা করার পেছনে কিন্তু ব্যক্তিগত কারণও ছিল। আবেগের তাড়নায় আমি চাইতাম আমার নিজস্ব জাপানকে আমি আমার মতো করে নির্মাণ করব।’

কিন্তু ক্রমে বুঝতে পারেন কোথায় যেন ঘাটতি আছে, সংকটও আছে। তা নিজের দেশের ওপর অধিকারবোধ এবং যে-দেশে তিনি অভিবাসী সে-দেশকে নিজের বলে মনে করার মধ্যেও। তাই তিনিই বলেন, ‘মাই ভেরি লেক অব অথরিটি অ্যান্ড লেক অব নলেজ  অ্যাবাউট জাপান আই থিংকিং, ফোরস মি ইনটু, … থিংকিং অব মাইসেলফ এজ অ্যা কাইন্ড অব হোমল্যাস রাইটার। আই হ্যাভ নো অভিয়াস সোসাল রোল বিকস আই ওয়াজ নট অ্যা ভেরি ইংলিশ

ইংলিশম্যান এ্যান্ড আই ওয়াজ নট এ ভেরি জাপানিজ আইদার’ (ইশিগুরো, কোটেড ইন ওয়ে অ্যান্ড ইশিগুরো)।

আত্মপরিচয় সংকটের লেখকেরা ভাসমান লেখক – এ-অভিধায় বিবৃত করলে খুব একটা ভুল হবে না। ভি এস নাইপল, সালমান রুশদি, হারুকি মুরাকামি, কাজু ইশিগুরো, জিয়া হায়দার রহমান, তোজকোল  – এঁরা সবাই দেশ থেকে দেশান্তরে ভেসে বেড়াচ্ছেন  অথবা অভিবাসী হচ্ছেন এবং নানা যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

তাঁদের কলম বেগবান হয়েছে এ ছিন্নমূল অবস্থার জন্যই। আর তা-ই তাঁদের আন্তর্জাতিক করে তুলেছে।

 

সাত

অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়ার পর আমেরিকা প্রবাসী ডক্টর অমর্ত্য সেনকে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন এক নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করে। সংবর্ধনার জবাবে তিনি বক্তব্য শুরু করেন এই বলে যে, ‘গত রাতে এখানে আমি আমার এক বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলাম। কলিংবেল বাজাতেই একটি ফুটফুটে ছোট্ট মেয়ে গ্রিলের দরজার ওপাশে এসে দাঁড়াল। আমি বললাম, তুমি কে মা? মেয়েটি তৎক্ষণাৎ বলল, না, না, এটি আমার বাড়ি, আগে তোমার পরিচয় দাও।’

ব্যাপারটা খুব ছোট কিন্তু গভীর অর্থবহ। বাংলাদেশ থেকে ভারত, ভারত থেকে আমেরিকায় – আসলে কী পরিচয় তাঁর? পরিচয় দেওয়া এবং নেওয়ার মধ্যে একটি সংরক্ষিত অধিকারের ব্যাপার আছে, মেয়েটির কথায় হয়তো তাঁর সে-উপলব্ধি হয়েছে।

পরিচয় বা আইডেনটিটির প্রথম মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন এরিক এরিকসন। তাঁর মতে, পরিচয় হচ্ছে গুণাবলি, বিশ্বাস, বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তিত্ব, প্রকাশ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। পরিচয়সংকট বা আইডেনটিটি ক্রাইসিস সম্পর্কে বলেন, মর্যাদাময় আত্মপরিচয় (ইগো আইডেনটিটি) অর্জনে ব্যর্থতা। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধ বা দ্বান্দ্বিক ক্লেশ, যা মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়, ব্যক্তি-উন্নয়নে বাধার সৃষ্টি করে। আরো গভীরভাবে দেখলে পরিচয়-সংকট সময়ের একটি গভীর বিশ্লেষণ এবং একজন মানুষকে নানাভাবে দেখার অর্জনমূলক অনুসন্ধান।

আত্মপরিচয়-সংকটের স্বরূপটি প্রতিভাত হয়েছে অভিবাসী-সাহিত্যে (মাইগ্রেন্ট লিটারেচার)। এ-সাহিত্যে অভিবাসীদের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে। এরা নিজের বসতি ছেড়ে অন্য দেশ বা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী এলাকায় বসবাস করতে গেছে। এরা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। অভিবাসী-সাহিত্যের মূল ভাবনা বা থিম সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ইট ওফেন ফোকাস অন দ্য কনটেক্সট ইন দ্য মাইগ্রেশন কান্ট্রি অব দ্য অরিজিন হুইচ প্রমোট দেম টু লিভ, অন এক্সপেরিয়েন্স অব মাইগ্রেশন ইটসেলফ, অন দ্য মিক্সড রিসিপশন হুইচ দে সে রিসিভ ইন দ্য কান্ট্রি অব অ্যারাইভাল, অন এক্সপেরিয়েন্স অব রেসিজম অ্যান্ড হোস্টালিটি অ্যান্ড অন দ্য সেন্স অব রুটলেসনেস অ্যান্ড দ্য সার্চ ফর আইডেনটিটি হুইচ কেন রেজাল্ট ফ্রম ডিসপ্লেসমেন্ট অ্যান্ড কালচারাল ডাইভারসিটি।’

অভিবাসী সাহিত্যের সঙ্গে উপনিবেশ-উত্তর (পোস্ট-কলোনিয়াল) সাহিত্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অভিবাসী সাহিত্যের জন্মই হয়েছে উপনিবেশ-উত্তরকালে। এডওয়ার্ড সাঈদ এবং জেমস উডসহ আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন লেখকরা উপনিবেশ-উত্তর এবং অভিবাসী সাহিত্য নিয়ে জ্ঞানগর্ভ মতামত ব্যক্ত করেছেন। সংজ্ঞা, তত্ত্ব বা দার্শনিকভাবে এঁরা যা-ই বলুন না কেন, এ-সাহিত্য আত্মপরিচয়- সংকটের মর্মমূল থেকে উৎসারিত – এ-বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই।

কিছুকাল আগে ঢাকায় ‘গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে’র নবম শীর্ষ সম্মেলন হয়ে গেল। সংস্থাটির চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ এর আয়োজন করেছে। এতে বিশ্বের প্রায় ১২০টি দেশ, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি খাতের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তিন মাস আগে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ‘রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেন্টস’ বিষয়ে শীর্ষ বৈঠকে বিশ্বনেতারা ‘নিউইয়র্ক ডিক্লারেশন ফর রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেন্টস’ গ্রহণ করেছেন। তাতে দুটি বৈশ্বিক চুক্তির ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। প্রথমটি শরণার্থীবিষয়ক দায়িত্ব বণ্টন এবং দ্বিতীয়টি নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে আস্থা, আত্মবিশ্বাস ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিতকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক আলাপ-আলোচনার পর রাষ্ট্রগুলো একমতে পৌঁছেছে যে, অভিবাসীদের মর্যাদা যা-ই হোক না কেন, তাদের মানবাধিকার রক্ষা করা হবে। শীর্ষ বৈঠকে অভিবাসীদের মানবাধিকার নিশ্চিতকল্পে বিভিন্ন নীতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে, যার মধ্যে আছে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় অধিকারভিত্তিক মনোভাব গ্রহণ, অভিবাসনবিষয়ক সব নীতিতে সুরক্ষানীতি সংযোজন, সংকটের সময় অভিবাসীদের বিশেষ গুরুত্ব প্রদান প্রভৃতি। আর তা করতে হবে এ-কথা মাথায় রেখে যে, অভিবাসীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে অবদান রাখছেন। টেকসই উন্নয়নে ২০৩০ এজেন্ডার অংশ হিসেবে তা তাঁরা করছেন। কিন্তু মর্যাদার প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে মানবাধিকার কীভাবে সুরক্ষা হবে তা স্পষ্ট নয়। মানবিক মর্যাদাবোধের প্রসঙ্গটি মানবাধিকারের অংশ। আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও আত্মমর্যাদাবোধের প্রশ্ন জড়িত। মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কোনো অভিবাসীর পরিচয়কেই সমুন্নত করা যাবে না, বরং সংকট আরো বৃদ্ধি পাবে।

সাহিত্য মানবিক মর্যাদাবোধ এবং মানবাধিকারের কথা বলে। আত্মপরিচয়ের সঙ্গে আত্মমর্যাদাবোধের আর্ত উচ্চারণ অভিবাসী লেখকদের লেখায় মূল সুর হয়ে এসেছে। তাঁরা নিশ্চয়ই যাঁরা লেখক নন, কিন্তু পরিচয়হীন অভিবাসী তাদের কথাও বলেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: