আড় ভাবুকের কড়চা

লেখক:

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

গেয়র্গ ট্রাক্ল্

থেকে থেকে ফিরে আসো তুমি, বিষণ্ণতা,
নিঃসঙ্গ সত্তার তুমি আনম্র বিন্যাস।
পরিশেষে প্রজ্বলিত স্বর্ণময় দিন।

সহিষ্ণুর যন্ত্রণায় সমর্পণখানি
স্বরসাম্য ও কোমল মত্ততায় ভরা।
ঐ দেখো! প্রদোষ ঘনাল জানি জানি।

রাত্রি ফিরে এল, এক নশ্বরের পরিতাপে কাঁপে
যন্ত্রণার অংশীদার আরো একজন।

শরতের নক্ষত্রের নিচে শিউরে উঠে
বছরে-বছরে শুধু আরো বেশি ঝুঁকে পড়ে মাথা।

এই বিষাদস্তোত্রটি রচনা করেছেন গেয়র্গ ট্রাক্ল্। কবিতাটির নাম : ‘একটি পুরোনো অ্যালবামে’ (in ein altes Stammbuch)। কবি যেন পুরোনো পারিবারিক অ্যালবামে তাঁর কাঁপা হাতের স্বাক্ষর লিখে গিয়েছেন। জন্ম সাল্জবুর্গে ১৮৮৭, মৃত্যু ১৯১৪, ক্রাকোভে। সাতাশ বছরের পরিমিত এই জীবনে জন্ম থেকেই মৃত্যুর সুরশৃঙ্গার বেজে চলেছিল। মোটামুটি সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে শৈশব যাপন করেন ট্রাক্ল্। গ্রামার স্কুলের পালা তাড়াতাড়ি চুকিয়ে ফার্মাসিস্টের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কিন্তু ওই শিক্ষণের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল মহামারীর বীজ। শিক্ষার্থী হিসেবে ‘ড্রাগস’ বা নেশার নানাবিধ রসদের সঙ্গে তাঁর মোকাবিলা হয়েছিল। আর নিজেও তার শিকার হতে দেরি হয়নি তাঁর। ওই মৃত্যুময় সংকট থেকে তাঁকে উদ্ধার করতে জানতেন একমাত্র তাঁর পিঅ্যানোবাদিকা বোন, কিন্তু তিনিও একই নেশার কবলে পড়েছিলেন। সদ্য-উদ্ধৃত কবিতার দুটি লাইনে যন্ত্রণার্ত দুজন মানুষের ছবি অাঁকা আছে রাত্রির পটভূমিতে যন্ত্রণা-জর্জরিত একজন নশ্বর আর তার যন্ত্রণা ভাগ করে নিচ্ছে আরো একজন। এরা দুজন আর কেউ নন, ভাই এবং বোন। এ দুজনেই এই পরিবারের অ্যালবামের মুমূর্ষু দুটি সদস্য। আশ্চর্যের বিষয়, এই বোনটিও ট্রাক্লের আত্মহত্যার বছরেই মৃত্যুবরণ করে নেন।
১৯১০ সালে এক বছরের জন্য মিলিটারি মেডিক্যাল শিবিরে ভলান্টিয়ার ছিলেন ট্রাক্ল্। কিন্তু পাকা চাকরির প্রসাদগুণ ছিল না তাঁর কপালে। ফিকার বলে একটি বন্ধু তাঁকে আর্থিক ও আত্মিক নানা সংকট থেকে বাঁচিয়েছেন। তিনিই তাঁর পত্রিকায় ট্রাক্লের কবিতা তখন ছাপিয়েছেন। ট্রাক্লের প্রথম বই ‘কবিতাগুচ্ছ’ (Gedichte) বেরোয় ১৯১৩ সালে। প্রথম থেকেই তাঁর কবিতা প্রকৃতির নানা বর্ণালিতে ছুপিয়ে নেওয়া। বিশেষত শরৎকালের। কিন্তু এই শরৎ কোনো শারদোৎসবের সমাচার বয়ে আনে না। জীবনানন্দ দাশের এঁকে-তোলা বিপন্ন হেমন্ত ঋতু যেমন একই সঙ্গে ঐশ্বর্য ও মৃত্যুর প্রতীক, তাঁর প্রিয় কবি ট্রাক্লের প্রণীত শারদোৎসবেও সেই নিরুপায় যুগ্মতা লেগে রয়েছে। অপরাহ্ণে চাপা গলায় বলা (In den Nachmittage gefluestert) কবিতার অসামান্য চারটি স্তবক আমরা এই মর্মে নিবেদন করছি :

সূর্য শারদীয় রিক্ত আর দ্বিধান্বিত,
গাছ থেকে ঝরে যায় ঝরে যায় ফল।
স্তব্ধতা বিরাজ করে নীল পরিসরে
এক দীর্ঘ দীর্ঘায়িত অপরাহ্ণ শুধু।

ধাতু থেকে অবকীর্ণ মৃত্যুর রণন,
হঠাৎ লুটিয়ে পড়ে শুভ্র এক প্রাণী।
বাদামি মেয়েরা মেঠো গীতিগুচ্ছ নিয়ে
ঝরা পল্লবের সঙ্গে বাসি হয়ে যায়।

ঈশ্বরের ভালে জাগে স্বপ্নের বর্ণিমা,
পাগলামি মেলে দেয় নম্র তার ডানা,
ছায়াগুলি ঘিরে যায় পাহাড় ঘনিয়ে
কালো অবক্ষয় দিয়ে সকলই বেষ্টিত

গোধূলি ছেয়েছে অবসর আর সুরা;
বিষণ্ণ গিটার থেকে সুর ঝরে যায়;
কমনীয় ঐ বাতিদানের ভিতরে
স্বপ্নের আদলে শুধু ফিরে আসো তুমি!

লক্ষ করতে হবে, যন্ত্রণার সমাচার কখনই তিনি চিৎকার করে শোনাননি। এমনকি অস্তিত্বের উন্মত্ততাকেও তিনি জুড়ে দেন নরম ডানা। যন্ত্রণাকে স্তবকে অনুবাদ করে গেয়র্গ ট্রাক্ল্ নিজেকে ধন্য ও নন্দিত বলে মনে করেছেন। এই প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য, মানবজীবনের যন্ত্রণাকে এই কবি যথাযোগ্য স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি নিজে বলেছেন, এমন এক-একটি সময় আসে, যখন ব্যক্তিবিশ্ব ও বহির্বিশ্ব একই সঙ্গে ভেঙে পড়ে এবং তখনই Leid বা যন্ত্রণার সূচনা হয়। এই স্বীকারোক্তি থেকে আমরা সহজেই ধরে নিতে পারি, শুধু নিজস্ব ট্র্যাজেডির চাপে বিদীর্ণ হয়ে যাবেন এমন সংকীর্ণ ক্ষমতার কবিয়াল ছিলেন না ট্রাক্ল্। প্রথম মহাযুদ্ধের স্নায়বিক আবহ-পরিবেশ রক্তে রক্তে জানা ছিল তাঁর। এবং তারই অভিঘাতে তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন, ব্যক্তিগত নৈরাজ্যের কোনো মানেই হয় না যদি তার কোনো বিশ্বভূমিকা না থাকে।
ট্রাক্লের কবিতা ‘একসপ্রেশনিস্ট’ বা অভিব্যক্তিধর্মী। এই Expressionism বা অভিব্যক্তিবাদ ১৯১০ নাগাদ জার্মান সাহিত্যে সূচিত হয়। এই আন্দোলনের সঙ্গে তরুণ গ্যোয়েটের ‘ঝড়-ঝপটার যুগ’ বা Sturm und Drang আন্দোলনের নিবিড় যোগ ছিল। যেহেতু পূর্বসূরির ঐ শিল্পবিবেকী অথচ জিজ্ঞাসাজাগর পর্বেও আত্মসন্ধানের তাগিদ খুব কম ছিল না। একসপ্রেশনিজমে আমরা লক্ষ করি, প্রকৃতির অন্ধ প্রতিকৃতি রচনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও শিল্পসচেতনতার সুর। অন্যদিকে, রোমান্টিকতার স্বাধিকারপ্রসন্নতা থেকেও মুক্ত এই আন্দোলন। যে-সত্য মানবহৃদয়ের গহনে লুকিয়ে আছে, তাকে, মনঃসমীক্ষণের সাহায্য ছাড়াই উদ্ধার করা এই সাহিত্যসত্তার লক্ষ্য। এই অর্থে, মানুষের তিয়াষা ও আশঙ্কার এক একটি সংবেদী অথচ নির্ভীক দলিল রচনা করাই ট্রাক্ল্ এবং তাঁর সতীর্থদের জীবন ও শিল্পের প্রগাঢ় অভিপ্রায় হয়ে উঠেছিল।
কোনোরকম পার্থিব প্রলোভন ট্রাক্ল্কে তাঁর শিল্পচর্চা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তাঁর বন্ধু এরহার্ডকে ভিয়েনা থেকে লেখা একটি চিঠিতে তার নিবিড় নিদর্শন আছে। চিঠির তারিখ জুলাই ১৯১৭। আমরা এই চিঠিখানি এখানে তরজমা করে দিচ্ছি।
প্রিয় বন্ধু,
ধরে নিতে মুশকিল বাধছে যে তুমি আমায় সাহায্য করতে পারছ না, তবু বিশ্বাস করো আমি তোমার ওপর একটুও রাগ করিনি।
সচেতন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পুরো ব্যাপারটিকে আমি সুসম্পন্ন বলে ধরে নিচ্ছি। উলমানকে দেওয়া আমার কবিতাগুলো আমি ফেরতও চাই না। তা যদি চাইতাম তাহলে ঠোঁট-ফোলানো শিশুর দশা হতো আমার।
পুরো ব্যাপারটায় আমার এখন আর কিছুই এসে যায় না। আমার রচনা কেউ যদি অনুকরণের যোগ্য বলে মনে করে, তাতে আমার কী এসে যায়; যে অনুকরণ করবে, এটা তারই বিবেকের প্রশ্ন। তবু যে শ্রীযুক্ত উলমান আমার রচনা বিষয়ে স্টেফান হসোয়াইগকে সচেতন করেছেন, সেজন্য তাঁকে ধন্যবাদ। আমার অবিশ্যি, এখন অন্যরকম দশা। ছন্দ আর ছবি আমাকে ঘিরে মেতে উঠেছে এক নারকীয় এবং পৈশাচিক উন্মাদনায়। অন্য কোনো ব্যাপার নিয়ে মেতে ওঠার সময় আমার কোথায়? আমার ওই অতিপ্রাকৃত দশাটিকেই আমি অংশত রূপায়িত করতে ব্যস্ত। যেন আমাকে কেউ একদিন হাস্যকর মৃত্যুর উচ্ছৃঙ্খল ব্রতচারী বলে চিহ্নিত না করে। যদি ওরকম আমাকে কেউ ঠাউরে বসে, তাহলে নানারকম আধিব্যাধি ও বিকারের শিকার হয়ে উঠব আমি। আর তাহলে কি অন্তহীন অকথ্য রিক্ততা নেমে আসবে আমার জীবনে। অর্থহীন ছিন্নবিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতে হবে তাহলে আমাকে।
কার্ল ক্রাউসকে খুব নৈর্ব্যক্তিক ও ঠান্ডা চিঠি লিখেছি। তাঁর কাছ থেকে আমার প্রত্যাশার কিছুই নেই। আমার সাম্প্রতিক বেশ কিছু সৃষ্টির নমুনা তোমাকে পাঠিয়ে দিলাম।
তোমার
গেয়র্গ ট্রাক্ল্

এই একটিমাত্র চিঠি থেকেই গেয়র্গ ট্রাক্লের সমগ্র চরিতমানস আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অকারণ কল্লোলীয় নেশায় তিনি বোহেমিয়ান হয়ে উঠতে চান না। চারদিকের পরিবেশের কাছে কোনোই প্রত্যাশা নেই তাঁর। সাহিত্যজগতের নানাবিধ গোষ্ঠীর মধ্যে যে-তরল ষড়যন্ত্র চলে, সে-বিষয়ে তিনি পূর্ণমাত্রায় সচেতন। এবং সে-বিষয়ে নালিশ জানিয়ে তিনি তাঁর আত্মসম্ভ্রম খোয়াতেও চান না। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় কথা হলো নাটকীয় এবং যে-প্রবাহ তাঁকে প্লাবিত করে যাচ্ছে, অন্তত তার একটি অংশকে শিল্পরূপ উপহার দেওয়া। তা থেকে স্পষ্ট হয়, সামাজিক জীবনে শিল্পীকে যে রীতিমতো সংযত ভদ্রলোকের মতো চলতে হয়, সে-বিষয়ে তিনি সজাগ ছিলেন। কিন্তু তবু ওই বুর্জোয়া সমাজজীবন তাঁকে প্রতারণা করেছিল। তাঁর রচিত বিভিন্ন রচনায় প্রচ্ছন্নভাবে সমাজজীবনের শঠ ও প্রতারক দিকটির ছবি জ্বলন্ত লাভার রঙে অাঁকা আছে। ওই আলেখ্যের ওপরেই তিনি বুলিয়ে দিয়েছেন সুভদ্র শিল্পী-স্বভাবের নম্র নীল রং। জার্মান একসপ্রেশনিজমের একটি প্রধান লক্ষণ হলো ‘টেলিগ্রাম স্টাইল’ (Telegrammstil)। রোমান্টিক কবিতার চরিত্রলক্ষণ ছিল প্রতিমুহূর্তের স্বীকারোক্তি রচনা বা Sekundenstil। পক্ষান্তরে, নতুন অভিব্যক্তিবাদীরা বাক্য থেকে ব্যাখ্যাবিশদ ক্রিয়াপদ এবং নানাবিধ আবর্জনা ঝরিয়ে তাকে মন্ত্রের মর্যাদা দেন। এই ব্যাপারে হ্যোল্ডারলিনের কাছে ঋণী ছিলেন গেয়র্গ ট্রাক্ল্। হ্যোল্ডারলিন তাঁর জীবনের দ্বিতীয়ার্ধে পরিপূর্ণ পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। পাগলামির সেই অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা থেকে ওই মরমি কবি নির্মাণ করে চলেছিলেন সৌম্য বিবেকী বেদনার মন্ত্র। ওই মন্ত্রগুলো গদ্যধর্মী, যদিও গদ্যের অতিশয়োক্তি তাদের মধ্যে একেবারেই ছিল না। ট্রাক্ল্ চেয়েছিলেন, সমসময়ের বিশ্বপটে তাঁর আপন জীবনের সাক্ষ্য দিতে, অনেকটা সংগ্রামী পুরোহিতের ধরনে। তথাকথিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আস্থা ছিল না তাঁর, যাজক-পান্ডারা যেভাবে বাগজালে শ্রোতৃবৃন্দকে আচ্ছন্ন করে তোলেন, সে-বিষয়ে ছিল তাঁর তীব্র ঘৃণা ও অরুচি। তিনি তাই দৈব কার্পণ্যগুণে আক্রান্ত করে তুলতেন তাঁর বাক্যগঠন, এক-একটি শব্দকে ঘিরে রচনা করে তুলতেন সম্মোহবলয়। তাঁর শেষ পর্বের কবিতায় এই শিল্পময় অথচ সংযত আকস্মিকতা লক্ষণীয়। এ-ব্যাপারটি রিলকের মতো মহাকবিকেও প্রভাবিত করেছিল। রিলকের ‘দুইনো এলেজি’ কবিতাগুচ্ছে তাই পড়েছিল পূর্বসূরি ট্রাক্লের এই মিতব্যয়ী অথচ অমোঘ মন্ত্রময়তার ছায়া। এই মন্ত্র দিয়ে সমাজ ও জগতের তিনি কোনো পারমার্থিক উপকার করতে চাননি। চেয়েছিলেন প্রতিবেশকে একটি সংহত সচেতন আয়তন উপহার দিতে। তাঁর Sieben Gesang des Todes বা ‘মৃত্যুর সাত কোরাস’ কবিতাটি থেকে তার প্রমাণ মেলে। কবিতাটির তর্জমা এখানে দাখিল করছি :

নীলাক্ত গোধূলি হলো বসন্ত। শুয়ে-নেওয়া বারুদের নিচে
কী-যেন অাঁধার সত্তা সন্ধ্যা আর অস্তের মাঝারে,
এবং দোয়েলদের নম্র অভিযোগের কান পাতে।
নীরবে প্রবেশ করে রাত্রি, এক রক্তাপ্লুত প্রাণী
ডুবে যায় পাহাড়-কিনারে, ধীরে।

স্বেদাক্ত সমীরে দোলে মঞ্জরিত আপেল-প্রশাখা,
দ্রবীভূত এবং রুপালি,
রাত্রি-জাগা চোখে, জ্বলে কিসের উৎকাঙ্ক্ষা, ঝরে নক্ষত্রের দল;
শৈশবের কোমল গীতালি।

কালো অরণ্যানী ঘিরে নেমে আসে এক তন্দ্রাময়
মাটিতে গুঞ্জন করে নীল উৎসধারা
তখুনি সে-তন্দ্রাময় তার তুষারার্ত মুখপটে
তুলে ধরে শুভ্র ভ্রু-যুগল।
এবং শিকারি চন্দ্র লাল জন্তুটাকে
গর্তের ভিতর থেকে তুলে আনে;
মেয়েদের অন্ধকার বিলাপে ঘনাল মৃত্যু তার,
শুভ্র এক পরবাসী হাত রাখে তার
উজ্জ্বল ললাটে।
নীরবে ভাঙন-ধরা বাড়ি ছেড়ে যায় মৃতজন।

হায় মানুষের নষ্ট প্রতিকৃতি; ঠান্ডা ধাতুপুঞ্জ দিয়ে গড়া
রাত্রি আর সন্ত্রাস এবং
জান্তব জ্বলন্ত মরুভূমি
সেই বুঝি সত্তার ভিতর জুড়ে পবনবিরতি!
কালো ডিঙি বেয়ে গেল উজ্জ্বল স্রোতের ভাটিটানে।
সেই জন মেরুণরঙা তারা ভরে, ডুবে গেল ডিঙি,
তার পরে ঝুঁকে থাকে শান্ত এক সবুজ প্রশাখা;
রুপালি মেঘের থেকে ঝরে-পড়া আফিঙের ফুল।

জার্মান সাহিত্য-সমালোচকেরা আজো এই কবিতাটির নিহিতার্থ নিরূপণ করতে পারেননি। তা সত্ত্বেও, অথবা সেজন্যই, তাঁরা সকলেই কবুল করেছেন, এই কবিতাটি একটি অনির্দেশ্য মহত্ত্বের দ্বারা আক্রান্ত। মৃত্যুর ঢাকনা সরিয়ে দিয়ে সত্যকে যেন নগ্ন হাতে এখানে ছুঁয়েছেন কবি।

দুই

পুরোনো সেই দিনের কথা
কবি হিল্ডে ডোমিনকে (জ. ১৯২২) নিয়ে তরুণ কবি মিশায়েল বুসেলমায়ার, হাইডেলবার্গের পুরোনো সেতুর তোরণটা পটভূমির মতো রেখে একটি কবিতা লিখেছেন :
আমার কাঁধের ওপর
এই মহিলাকবিকে বয়ে
টাওয়ার থেকে নামতে থাকি।

অথবা তাঁর হাত ধরে-ধরে
এক পা দু-পা করে
ঘোরানো সেই সিঁড়ির

ধাপ ধরে নামাই
যা নাকি অনেক কবি
আর ঘাতকদের একদা বহন করেছে।

জল বাড়তে শুরু করলেই
সাঁকোর বাঁদরটা তার
শেকল নিয়ে নাড়াচাড়া জুড়ে দেয়।

শ্রীমতী ডোমিন এখনো দস্ত্তরমতো শক্ত-সমর্থ থাকলেও তাঁকে মিশায়েল একা-একা সর্পিল সোপান ভাঙতে দিতে রাজি নন। হাতের কাছে প্রণতি জানানোর মতো যে সম্ভ্রান্ত অতীতকে ধরতে-ছুঁতে পারা যাচ্ছে, তাকে প্রাণপণে আবজে-আগলে রাখার এই প্রবণতাটুকু ভারি মায়াবী। অন্যদিকে আধুনিক জার্মান কবিতার অন্যতম পথিকৃৎ সেই নারীও এই মুহূর্তের প্রজন্মের দিকে এক ঝটকায় চলে এসে ধরা দেওয়ার জন্য কীরকম আর্ত!
অনেকেরই, কিছুদিন আগে পর্যন্তও মনে হচ্ছিল, বয়স হলেই বুঝি জার্মানিতে মা-বাবাদের জরাভবনে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বার্থপরতার ঝাসু হয়ে থাকবার নিরাপদ বিধান আছে। ওরকম ব্যবস্থা যে পরিলুপ্ত হয়ে গেছে, সে-কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে। তবু বিবেকের আরেকটা প্রতিশব্দ তো অস্বস্তি। সেই দৃপ্ত দায় এখানে এখন নবীন ভাবুকদের আস্তে আস্তে ছুঁয়ে দিচ্ছে। এখন রাস্তায়-রাস্তায় দেখা যাচ্ছে, সাত জন্মের বুড়োসুড়ো কোনো একজন মানুষকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে একটি কিশোর তাঁর প্রতিদিনের ভ্রমণ সুসম্পন্ন করে তুলছে। এরা, স্বর্গীয় এসব নওজোয়ান, বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষানবিশির বদলে পৌর পরিচর্যার বিকল্পবৃত্তিকেই (Ersatzdienst), অনেকটা যেন বুসেলমায়ারের মতো, তাদের ব্রত হিসেবে নির্বাচন করে নিয়েছে। দেবদূতের মতো ওদের এই চালচলন দেখে আমার মাথাটা নুয়ে আসে।
এমনিতেই এখন এখানকার সামরিক বিভাগ নাৎসি জমানার অপস্মৃতি থেকে নিজেকে মুক্ত ও শুদ্ধ করে নিতে চেষ্টা করছে। এই কাজটা তত সহজ নয়। অতীতের শুদ্ধশীল উত্তরাধিকারকে অমিশ্রভাবে উদ্ধার করা যায়? সৈনিকেরা অনেক আগে যেসব লোকগীতি গাইত, ফ্যুরারের জঙ্গি জওয়ানেরাও কি সময়-অসময় ঐ গানগুলো গায়নি? তার ফলে কি সেসব গান কিছুটা দূষিত হয়ে গেছে? এসব বিবেচনা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক নয়। বিবেকের কাজই তো হলো অতিক্রান্ত কালের মধ্য থেকে বাঁচা ও বাঁচানোর রসদ ছেঁকে নিয়ে ব্যবহার করা। বিষ্ণু দের আশ্রয় নিয়ে আমাদের কবুল করতেই হয়, স্মৃতি ছাড়া সত্তা অর্থাৎ বর্তমান নেই, নেই ভবিষ্যৎও।
জার্মানির প্রতিষ্ঠিত লেখকদের মধ্যে অনেকেই দায়ে পড়ে একদা হিটলার-জওয়ান (সংক্ষেপে Hj) হতে বাধ্য হয়েছিলেন। এঁদের সাম্প্রত লেখালিখির লক্ষ্যই হলো, অতীতকে পরিশীলিত করে ভবিষ্যপ্রজন্মের উপযোগী করে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া। গুন্টার গ্রাস এঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সবশেষের ‘ব্যাপ্ত এক পরিসর’ (Ein weites Feld) শীর্ষক উপন্যাসের উদ্দেশ্যই হচ্ছে, আগের সময়কালের বিশাল জ্ঞানকান্ড থেকে একালের মানুষের জন্য কান্ডজ্ঞান চয়ন-আহরণ করে আনা। সেই দুরূহ সন্ধানে তাঁকে ৭৮১ পৃষ্ঠা ধরে হন্যে হয়ে লিখতে হয়েছে। বিসমার্কের রাইশ প্রতিষ্ঠা (১৮৭১) থেকে আরম্ভ করে বিভক্ত দুই জার্মানির সমীকরণ পর্যন্ত বিস্তারিত সময়টাকে স্ববিবেকী মানদন্ডে সাজিয়ে-গুছিয়ে পরিবেশন করতে গিয়ে তাঁকে কম বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সংস্কৃতির অহংকার কোনো-কোনো সাহিত্যসাধক, যেমন থেয়োডোর ফন্টানে (১৮১৯-৯৮) কিংবা গেরহার্ট হাউপ্টমান (১৮৬২-১৯৪৬), তাঁকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষত প্রথমজনের কাছে গ্রাসের ঋণের অন্ত নেই। থেয়ো বলে প্রধান চরিত্রটি, অলটার ইগোর ভূমিকায়, থেয়োডোর ফন্টানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের জটিল সময়কে ধারণ করে আছে। আর ফরাসি পরিবারের প্রতিভাবনা সন্তান সেই ফন্টানে? এই উপন্যাসে আমরা একটি চনমনে ফরাসি মেয়েকে দেখতে পাই, তাঁকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বার্লিনে তার সেই পিতামহের সঙ্গেই তার সাক্ষাৎ। ফন্টানে তো তার কাছে পুঁথিপুরুষই নয়, তিনি যে তার কত আপন। হৃদয়ের সেই যুক্তিতে মেয়েটি তাকে ‘ফন্টি’ বলে ডেকে ওঠে।
জ্যোতিস্মান অথচ জনপ্রিয় ওই লেখকের শততম মৃত্যুবর্ষে বার্লিন কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। আলোকচিত্রীর অনুপুঙ্খময়তায় এই শহরটাকে তিনিই না বিশ্বস্ততম আঙ্গিকে ধরে রেখেছেন। তাই তো তাঁর সমকালীন একজন সতীর্থ বার্লিনকে ‘ফন্টানোপোলিস’ বলে অভিহিত করেছেন। অথচ আজ যদি তাঁর অভ্যস্ত সান্ধ্য পর্যটনের গরজে ফন্টানে লাইপৎসিগার প্লাৎস থেকে টিয়ারগার্টেন ছাড়িয়ে আবারও হাঁটতে শুরু করেন, তিনি শিউরে উঠবেন। বার্লিনের কেন্দ্র, তাঁর মৃত্যুর একশ বছরের ভিতর, কী ভীষণ বদলে গেছে। পটসডামার স্ট্রাসে ১৩৪সি-র যে-বাড়িটায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, শেষ যুদ্ধের সৌজন্যে তার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সেই পিছুটানে মেদুর সরাইখানা-কফিঘর-দোকানপাট সুনসান হয়ে গেছে, বুলডোজার আর নবনির্মাণরত ক্রেন ছাড়া পরিবর্তমান দৃশ্যের ওপর আর কোনো স্মৃতিসঞ্চারী অনুসঙ্গেরই সামান্যতম কোনো অধিকার নেই।
চোখের ওপর প্রিয়তম পরিপার্শ্বগুলি এভাবে পালটে যেতে থাকলে পুরোনো সেই দিনের কথা ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য এখনকার কবি কিংবা কথাশিল্পীর দ্বারস্থ হতে হয় আমাদের। সেই প্রত্যাশামদির মুহূর্তে থেয়োডোর ফন্টানের অাঁকা আলেখ্যসমূহ আমাদের যাবতীয় কৌতূহল চরিতার্থ করে। গাইডের মতোই কখনো ঈষৎ সামনে, কখনো-বা পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে এক-একটা জায়গার সৌন্দর্য আর তাৎপর্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। পাঁচ ভল্যুমে প্রসারিত তাঁর ‘মার্ক ব্রান্ডেনবুর্গ ধরে পদযাত্রা’ (Wanderung durch die Mark Brandenburg, ১৮৬২-৮৯) আমাদের চিনিয়ে দেয় কাছে-পিঠেই ঘাপটি মেরে থাকা সমস্ত দৃশ্যকোণ, সতেরো থেকে উনিশ শতক অবধি বিবর্তিত প্রাশিয়ার ইতিহাস, যাদের অন্তরঙ্গে প্রাণবন্ত হয়ে আছে এখনো।
গোটা জার্মান সাহিত্যে ভ্রমণসাহিত্যের এমন জাদুকর কারিগর বোধহয় আর কেউ নেই। সমালোচকেরা এমনকি সংগত দাবি পোষণ করেন, এসব রচনার মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি রীতি প্রবর্তন করেছেন। শুধু নিসর্গের প্রতিবেদন নয়, নারীহৃদয়ের গহন সমাচারের ক্ষেত্রে তাঁর কথকতা আর্কেটাইপকে সতেজ করে তোলে। সেই যে লিনে নামের মেয়ে-দর্জিটি হঠাৎ ঠাহর করতে পারে ব্যারনমশাই বোঠোফেন রিন একারের সঙ্গে তার প্রণয় খুব একটা বেশিদূর অবধি গড়াবে না, কিংবা নতুন ধনী য়েনি-স্বৈরিণী মেলানি কি অসুখী এফি ব্রিস্ট একটুখানি স্বীকৃতির তিয়াসায় তাঁর হাতে দরদি আদল পেয়ে ঘরে-বাইরে ঘুরে বেড়াতে থাকে, মানুষের মনে তাদের রণন ফুরোয় না। শেষোক্ত নারীর নামাঙ্কিত উপন্যাস (১৮৯১-৯৩) বিশ্বসাহিত্যের পাঁচটি শ্রেষ্ঠ আখ্যানের অন্যতম। আধুনিক চীনের কথাসাহিত্যেও তার অভিঘাত প্রত্যক্ষ।
সারা আটানববই জুড়েই এই লেখক অসংখ্য উৎসবের শামিল হয়ে চলবেন, সেই আয়োজন জলে-স্থলে ব্যাপ্ত। মাটিতে যখন আয়না ছাউনিতে গুন্টার গ্রাস তাঁর লেখাপত্তর থেকে আবৃত্তি করে শোনাবেন, রুপিনার হ্রদে উন্মথিত হতে থাকবে ফন্টানের উদ্দেশে নৌকাবিহার। সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে যাবে ফন্টানের মানচিত্র ধরে মার্ক ব্রান্ডেনবুর্গে সমবেত পদচারণা।
দূরের মানুষ আমাদের আত্মপরিচয়ের ঠিকানা ধরিয়ে দিয়ে কাছে চলে আসেন, জানতে তো ইচ্ছা করবেই তিনি নিজে কীভাবে উৎসব করতে ভালোবাসতেন! বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে ভোজসভা গুলজার করা ছিল তাঁর প্রবল শখ। অন্তত সাত-সাতটা পদ থাকত, বাদ পড়ত না দুর্মূল্য ক্যাভিয়ার, গলদা চিংড়ি, কিংবা ওডার নদী থেকে সদ্য-তুলে আনা কাঁকড়া। আতিথেয়তার ঘরানার এরকম একজন মানুষকে কাছে পাওয়ার জন্য আজ এখানে তথাকথিত সাধারণ মানুষজনের ছটফটানির ছবিটা দেখতে ভারি সুন্দর ঠেকছে।

তিন

গ্যোয়েটে কি মৃত?
ভাইমারের শিল্পমেলার একটি বড় সংঘটন ছিল বিনোদনমূলক বিতর্কসভা। বিষয়টা ভারি আজব : ‘গ্যোয়েটে-মুর্দাবাদ’। আর ওই ভয়াবহ মৃত্যুদন্ডের নিচেই ছোট হরফে ছাপা : ‘একটি ভালোবাসার ঘোষণা।’ যাঁরা এই আসরে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতিভার কাছে আমি ঋণী : নিকোল হেস্টার্স, উলরিশ হিবল্ডগ্রুবার, গুন্টার য়াউখ, রোবার্ট হুঙার-ব্যুলার এবং সর্বোপরি শ্রীমতী হানা শিগুলা। শেষোক্ত অভিনেত্রী মননবেদনা ও সমাজচেতনার সমন্বয়ে ইয়োরোপীয় ফিল্ম ও নাটকে সম্পূর্ণ একটি নতুন মাত্রা জুড়ে দিয়েছেন। হঠাৎ কেন তাঁরও মনে ক্ষোভ জাগল, গ্যোয়েটে আমাদের সময়ে অচল? তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা এনৎসেন্সবের্গেরের তৈরি বয়ানের ওপর নির্ভর করে গ্যোয়েটের বিভিন্ন রচনা থেকে অংশোদ্ধার করে অভিনয় করতে থাকলেন। এসব বিক্ষিপ্ত টুকরো থেকে অনেকেরই মনে হতে পারে, ওই মহাকবির সময়বীক্ষা ও সমাজবোধ তেমন প্রবল ছিল না। অতঃপর আসরের পরিচালক টুকরোগুলোকে যখন জড়ো করলেন, সবার কাছেই প্রতিপন্ন হলো, এই কবি এখনো নখাগ্র অবধি এই শতকের শরিক।
আমাদের ভাবনাচিন্তার পূর্বসূরিদের নিয়েও মাঝেমধ্যেই এরকম উত্তেজক অনুষ্ঠান হলে ভালো হয়। আর তা না হলেই আমরা তাঁদের নিয়ে একধরনের অমেরুদন্ডী ভক্তিবাদে মজে গিয়ে তাঁদের প্রাসঙ্গিকতা ভুলে যেতে থাকব। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডে এই মর্মে সুন্দর একটি প্রবর্তনা জেগেছিল। হাওয়ার্ড রেন্টুন প্রশ্ন তুলেছিলেন : গ্যোয়েটোর ফাউস্ট কেন ইয়োরোপীয় সাহিত্যের অনারোহ এভারেস্ট হয়ে থাকবে এখনো? কেন নাটকের দলগুলো তাদের শেরপাদের নিয়ে এ-সুদূর গিরিশিখরে হানা দেবে না? ফাউস্টের প্রথম খন্ডে মেফিস্টোফিলিসের সঙ্গে নায়কের চুক্তি ও গ্রেচেনের সঙ্গে প্রেমপ্রপঞ্চের বৃত্তান্ত সবারই তো জানা, তবু কেন সেই উচ্চাশী শিল্পসদনে কেউ অভিনয় করতে সাহস পায় না? সে কি এজন্যই যে এই পর্বতচূড়ার মঞ্চে দাঁড়ালে অভিনেতৃবর্গ অক্সিজেন নিতে পারবে না?
লোককথা-পুতুলনাট্য-মার্লোর জনপ্রিয় প্রবাহ থেকে গ্যোয়েটে এই কাহিনিটি তুলে নিয়ে শীর্ষাসনের কায়দায় উলটো করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। বন্ধু লেসিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন জল্পনা-কল্পনা করে স্থির করে নিয়েছিলেন, এনলাইটেনমেন্ট বা উজ্জীবনের যুগের উপযোগী জার্মান একজন নায়ককে খুদে তুলবেন, যিনি বিজ্ঞানী এবং সত্যের সন্ধানে ইন্দ্রজালের দিকে যাওয়া সত্ত্বেও অভিশপ্ত হবেন না, এবং সত্যাগ্রহের সৌজন্যেই দিব্য ট্র্যাজেডির প্রাণপুরুষ হয়ে উঠবেন। লেসিং, নন্দনতত্ত্বের বিপ্লবী সূত্রধার, এ-প্রকল্পের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে হাল ছেড়ে দিলে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে গ্যোয়েটে এই ভাববস্ত্তর সঙ্গে সৃজনী সংগ্রাম চালিয়েছিলেন। তা না হলে আমরা এই সৃষ্টিকাজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেতাম না। ১৮৩২ নাগাদ মৃত্যুশয্যায় গ্যোয়েটে ফাউস্টের নবভাষ্য রচনা করতে চেয়েছিলেন : স্বর্গের পথে ফাউস্টকে প্রতিহত করতে গিয়েও যৌন আকর্ষণসঞ্চারী বালক দেবদূতদের মোহিনী মায়ায় পড়ে শয়তানের সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বোঝা যায়, বুড়ো বয়েসেও মজা করার ধাত গ্যোয়েটেকে ছেড়ে যায়নি। বোঝা যায়, তথাকথিত পার্থিব স্তরের ঘটমানতার সঙ্গে সংগতি রাখার ওই দৃপ্ত নমনীয়তার জন্যই তিনি বেকেটের পথিকৃৎ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। স্ট্রাটফোর্ড-আপ-অন-আভনে সোয়ান থিয়েটারের প্রযোজনায় লৌকিক সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত ফাউস্টের মঞ্চায়ন দেখে মনটা নেচে উঠেছিল।
একই অনুপ্রাণনায় ক্যোলন শহরে পূর্ণাঙ্গ ফাউস্টের পুনর্নব পাঠ চোখের সামনে অভিনীত হতে দেখলাম। ছয় ঘণ্টার অভিনয়-সময় দুই সন্ধ্যায় বিভক্ত। পুরো পটভূমি অন্ধকারে আচ্ছন্ন। তারই মধ্য থেকে রাতরঙা ব্যাবক পোশাক পরে ফুটে উঠতে থাকে চরিত্রেরা, নির্মম কৌতুকে দীর্ণ দীর্ণ করে দেয় দূরবর্তী গ্যোয়েটের অপ্রাপনীয়তা, তাঁকে টেনে নিয়ে আসে স্বেদক্লেদে সংসক্ত আমাদের এই অপরূপ সময়ের স্নায়ব দৈনন্দিনে। এভাবেই প্রণীত হয়ে ওঠে ফাউস্টের দ্বিতীয় খন্ড মঞ্চস্থ হওয়ার সম্ভাবনা। এভাবেই প্রমাণিত হয়ে যায়, গ্যোয়েটে মৃত নন, বরং আমাদের চেয়ে অনেক প্রাণবন্ত।

চার

উদ্যাপনের দায়
হাইনরিশ্ হাইনে, বের্টোল্ট ব্রেশ্ট, গুন্টার গ্রাস – তিন প্রজন্মের এই তিনজন লেখকের পূর্ণায়ত জন্মদিন যাপনের ঝোঁকে সারা দেশ যখন কিছু অস্থিরমতি, সাহিত্য-সমালোচক হেরিবের্ট ফোগ্ট তখন অন্তর্লীন পারম্পর্য খুঁজতে ব্যস্ত। বর্ষশেষ এবং নববর্ষের দোটানায় উত্তরাধিকার এবং চ্যালেঞ্জের বিরোধাভাসে তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রগতিশীল এই ত্রয়ী চিরায়ত সাহিত্যের ঘরানায় সুদীক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও একায়তনিক এবং প্রদত্ত বাস্তবতার অনুশাসন ডিঙিয়ে এক-একটি বৈপ্লবিক সম্ভাব্যতার অভিমুখে আমাদের আমন্ত্রণ করেছেন। অর্থাৎ সাহিত্যকে তাঁরা দর্পণ হিসেবেই গ্রহণ করেননি, খেলার শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত করেছেন। দর্পণ যেখানে যান্ত্রিক বিশ্বস্ততা দাবি করে, খেলার পরিসর অন্যতর বিকল্প ও বীক্ষার বিন্যাসের আরো বড় মাপের বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
শ্রীমতী ব্রিগিটে ক্রোনাউয়ের্য হাউডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবারকার নন্দনতাত্ত্বিক ভাষণমালায় সাহিত্যকে ‘একেবারে অন্য’ বলে রায় দিয়েছেন : ‘আমার তো মনে হয়, সাহিত্য যদি তার একান্ত নিজস্ব সম্ভাবনাগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, তার পক্ষে তখনই একটি বৈপ্লবিক যাথার্থ্য উপহার দেওয়া সম্ভব হয়।’ একমাত্র শর্তহীন স্বাধীনতার টানেই রচয়িতা তখন খেলতে শুরু করেন। ভাবতে অবাক লাগে, গোটা সাতানববই জুড়ে সৌন্দর্যতত্ত্ব বিষয়ে চতুর্দিকে যত কথাই বলা হয়েছে, তাদের কেন্দ্রে বিরাজিত ছিল শিলারের এই উপপাদ্য : ‘মানুষ তখনই খেলা করে যখন ‘মানুষ’ শব্দটার সামগ্রিক তাৎপর্য সে চরিতার্থ করে; আর খেলতে খেলতেই সে সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে।’
এই অর্থেই সংস্কৃতির সবগুলি এলাকায় খেলার কাজ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। প্রচলিত বস্ত্তবিশ্বের নিয়মাবলি ভেঙেচুরে স্বাধীন প্রতিবিম্ব নির্মিতির নেশায় ফ্রানৎস শুবার্টের দুশো বছরের জন্মদিন আ য়োহানেস ব্রাম্সের মৃত্যুশতবার্ষিকী পাশাপাশি উদ্যাপন করতে গিয়ে অবিভক্ত জার্মানির সংগীতশিল্পীরা প্রতিপন্ন করলেন, শিল্পের দায়িত্ব খেলাচ্ছলে বিকল্পবীক্ষা রচনা করতে থাকা। তাঁদের এই মুক্তিলীলার মাঝখানেই গির্জার অচলায়তন থেকে বেরিয়ে এসে পথের মধ্যেই বিবাগী ভাবুকেরা যথার্থ মানুষ এবং সংস্কারক ফিলিপ মেলান্শ্থনের পঞ্চশতজন্মবার্ষিকী মঞ্চস্থ করলেন।
না, প্রযোজক প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী হয়ে এসব তাঁরা করেননি। শিল্পীরা এখন আর স্পন্সরের করুণার ওপর নির্ভর করতে রাজি নন। এতদিন ধরে পৃষ্ঠপোষকদের দাক্ষিণ্যকে স্বতঃসিদ্ধ স্রোতের মতো ধরে নেওয়ার ফলে খেলাটা যেন তেমন জমছিল না। বার্লিনের কিংবদন্তিপ্রতিম রঙ্গমঞ্চ (Schabuhne) হঠাৎই ভেঙে পড়বার উপক্রম হলে দর্শকেরা হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। একজন নাট্যসমালোচক তো পুরো ব্যাপারটাকে মস্ত বড় প্রতিশ্রুতির ব্যঞ্জনায় দেখছেন আর মহা উত্তেজিত হয়ে হাতের কাছে যাকে পাচ্ছেন, তাকেই ব্রেশ্টের ‘দৈনন্দিন থিয়েটারকে নিয়ে’ (Uber alltagliches Theater) থেকে শুরুর দিকের এই অনবদ্য লাইনগুলি আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন :

তোমার শিল্পীর দল, যারা থিয়েটার বানিয়ে চলেছো
বিশাল রঙ্গমঞ্চে, নকল ফ্লাডলাইটের সূর্যাবর্তের নিচে
আর নিশ্চুপ জনগোষ্ঠীর সামনে, এক-একবার কখনো-সখনো
পথেঘাটে ঘটতে থাকা থিয়েটারে ভিড়ে গিয়েই দ্যাখো-না!
দৈনন্দিন, সহস্রঝোরা, নাম-করা নয় –
তবু কী যে জীয়ন্ত, দস্ত্তরমতো পার্থিব, যৌথ জনজীবনের
উৎস থেকে উপচে-পড়া তরতাজা সেই নাটক
রাস্তার মধ্যে যা অভিনীত হয়ে চলেছে।

আর্থিক দুর্দশার পরোয়া না করেই আনাচে-কানাচে, অধিকাংশতই সৃষ্টিধর্মী বেকার মানুষজনের প্রণোদনায় অসংখ্য অতিক্ষুদ্র নাট্যসংস্থা, ব্রেশ্টেরই জঙ্গম এই দায়ভাগে, এখন নিরীক্ষামূলক নাটক রচনা ও মঞ্চায়নে মগ্ন আছে, এই ঘটনাকে অগ্রাহ্য করলে অনৈতিহাসিকতার নজির রাখা হবে। আর যাঁরা ওপরমহলের হর্তাকর্তা, তাঁদেরও কি এসব অনামিক কান্ডকারখানা নজরে পড়ছে না? তৃণমূল আর হর্ম্যচূড়ার এই গোপন বিনিময়ের টানাপড়েনের ফলেই বার্লিনের দুর্গতির মুখে মাইনৎস শহরে যেন অকারণ একটু বেশি ধুমধাম করেই স্থাপিত হলো একটি নতুন নাট্যসদন। শোনা যাচ্ছে, এখানে প্রধানত সৃষ্টিছাড়া নতুনদের পালাই অভিনীত হবে। বাডেন হুর্টেনবার্গের মতো সম্পন্ন অঞ্চলে সরকারি সহায়তায় ভাটা পড়লে জাঁকজমক করে পরপর যে-দুটি নাট্যোৎসব সংঘটিত হলো, সেখানেও এলিটকে উপেক্ষা করেই লোকায়তিক শিকড়ের সৃজনী সত্তার স্বাধিকার প্রমাণিত হয়েছে।
একদিকে উদ্যত বস্ত্তজগৎ, আর অন্যদিকে তাকে অংশত কবুল করে নিয়ে মানুষের খেলাধুলোর চৈতন্য – এই দুয়ের ভিতর থেকে উন্মীলিত হয়ে চলেছে অন্য একটি লীলাদর্পণ। এরই মধ্যে ঘটল উজ্জ্বল আড়ভাবুক রুডলফ বারোর অকালমৃত্যু। তাঁর ক্রান্তিসঞ্চারী – ‘অন্যতর’ (Die Alternative/১৯৭৭) বইটি এ-মুহূর্তে বাইবেলের চেয়েও অমোঘ হয়ে উঠেছে। একদা হোনেকারের আমলে পুব-জার্মানিতে তাঁর এই অন্যবিবেকী গ্রন্থ প্রতিষ্ঠানের চিত্তে ছমছমে অস্বস্তি জাগিয়ে দিয়েছিল, পশ্চিমে উদ্বোধন করেছিল সবুজ আন্দোলন, যার অন্তঃস্থ মন্ত্রই হলো : ‘একেবারে অন্য’। তাঁর দুই ঘনিষ্ঠ লেখকবন্ধুও, স্টেফেঅন হের্মলিন আর য়ুরেক বেকার, প্রয়াত হলেন। শিল্পসংস্কৃতিই অহরহ যাঁদের ধ্যানজ্ঞান, তাঁরা কিন্তু এঁদের মৃত্যুদিনকে সৃষ্টিসুখের উল্লাসেই গণ্য করেছেন। তাঁদের লক্ষ্যই যে জগদ্ব্যাপারকে ঢেলে সাজানো। 

/////////////

পাঁচ
কবির ঠিকানা
যাঁরা প্রজ্ঞান অর্জনের ভরসায় রোমে পাড়ি দিতে চান, এখন থেকে তাঁদের একটি নতুন লক্ষ্য নির্ণীত হলো : ‘কবির বাড়ি’ (Casa di Goethe)। বাইরে থেকে দেখলে তাকে এমনকিছু উল্লেখ্য বলে মনে হয় না। কিন্তু ১৮ নম্বর ভিয়া দেল কর্সোর এই বাড়িটা আচম্বিতে বিশ্বের সমস্ত তীর্থযাত্রীর ‘আদি পিতা’র (Urvater) আসল ঠিকানা হয়ে উঠেছে। স্মৃতিফলকটা এখনো কিছু ম্লায়মান, কিন্তু ঐ আপাতজীর্ণতার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে শাশ্বতের দায়ভাগ।
‘যেদিন রোমে পা রাখলাম, সেই দিনটাকেই আমার দ্বিতীয় জন্ম অথবা পুনর্জন্মের নিরিখ হিসেবে ধরতে হবে,’ লিখেছেন গ্যোয়েটে। ১৭৮৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাঁইত্রিশ বছর বয়সে হঠাৎই এই শহরে চলে গিয়েছিলেন তিনি। হাইমারের সংকীর্ণ চৌহদ্দি তাঁর কাছে দুঃসহ ঠেকেছিল নিশ্চয়ই। তা ছাড়া সৃষ্টির সংকটও ছিল অন্তর্লীন কারণ। নাট্যকার রোল্ফ হোখহুথ রঙ্গচ্ছলেই বলেছেন : ‘এই সংক্রান্তিটাকে সামলে নিতে পেরেছিলেন বলেই গ্যোয়েটে জার্মান সংস্কৃতি-ইতিহাসের সার্থকতম প্রযোজক।’ দু-দুটো বছর এখানে এবং এখান থেকেই তিনি ধ্রুপদী শিল্পসাহিত্যের উৎসে হানা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নিজের রচনার নবায়ন ঘটাতে পেরেছিলেন। তাই তো তাঁর কবিতায় ইতালি ‘সে-দেশ, যেখানে নেবু ফোটে থরে থরে।’ প্রায় পনেরো মাস এখানে তিনি তাঁর বন্ধুশিল্পী হিবলহেলম টিশবাইনের সঙ্গে কাটিয়েছেন।
‘না, এটা কোনো পিছুটানের সজল কোণ কিংবা ধূলিধূসর জাদুঘর হবে না।’ আশ্বাস দিলেন পুনর্নব গ্যোয়েটে-ভবনের পরিচালিকা উরসুলো শোমার। ভিতরে ঢুকে দেখি, সত্যিই তাই। কবির ব্যবহৃত আসবাবপত্তর এখন লুপ্ত। সেই কারণেই তাদের বদলি নকলের প্রস্তাব নাকচ হয়েছে। দোতলার দ্বারদেশে টিশবাইনের অাঁকা সেই অয়েলচিত্রণের একটি চমৎকার কপি যাপিত একটি সময়ের সাক্ষ্য হয়ে আছে; ঝুঁকে পড়ে কবি অ্যান্টিকের সম্ভাবনাপূর্ণ ধ্বংসাবশেষ দেখছেন। তারই পাশাপাশি এই ছবিরই আধুনিক সম্পূরক, অ্যান্ডি হবারহোলসের অাঁকা, কবির প্রতিকৃতি আমাদের টেনে নিয়ে আসে অস্তগামী, অমীমাংসিত এই শতকের দিকে।
‘আমি টিশবাইনের এখানেই চলে এসেছি। কর্সোর জায়গাটা থেকে পোর্টা দেল পোপোলোর দূরত্ব মাত্র তিনশো পা।’ তখনই কর্সো ছিল রোমের পর্যটনবীথি। বাণিজ্যসরণিও বটে। কিন্তু গ্যোয়েটের বড় ভালো লেগেছিল ঈর্ষাহীন এক বন্ধুর বাড়ির ‘স্বচ্ছন্দ পরিমন্ডল’। তাই বুঝি অত্যল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর মনের তাবৎ আধিব্যাধি কেটে গিয়েছিল। ‘এগমন্টের পান্ডুলিপি শেষ…ফাউস্ট এখন পূর্ণাঙ্গ হলেই হয়,’ প্রকাশককে লিখছেন হ্লোল্ফগাং, যাঁকে ততদিনে ইতালির মানুষেরা ‘ভোলফাঙো’ বানিয়ে নিয়েছে।
‘পৃথিবীর শিল্পীদের একমাত্র উপযুক্ত জায়গা রোম, আর আমিও তো, সত্যি বলতে আসলে শুধু-শিল্পীই।’ এখানে তাঁর তারুণ্যের সবগুলি স্বপ্ন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। এরকমই উদ্দীপনা হয়তো এখনকার সফরশিল্পীদেরও সহজাত। কিন্তু তাঁদের লক্ষ্যমাত্রায় স্পেনীয় সোপান কিংবা পিয়াৎসা নাভোনা যতটা ঝলক দেয়, দুশো বছর আগেকার ওই পর্যটকের কাছে তখন কিন্তু মূল আকর্ষণ ছিল অতীতের পরিত্যক্ত যত বিয়োগফল। আজ, তাঁর উদ্যাপিত সেই বাড়িটা সতেজ স্মৃতিসদনে পরিণত হয়েছে। এখানেই গড়ে উঠছে একটি গ্যালারি, যেখানে চিত্র-চিঠি প্রথম সংস্করণের অনুপুঙ্খ তথ্যায়নের ফলে অদীক্ষিত এবং বিশেষজ্ঞজন পথে চলে যেতে যেতে গ্যোয়েটের চিত্তে নিত্য নতুনের অভিঘাত এবং সাম্প্রতিকে তাঁর উত্তরসূরির কাছে তার সংবেদনের একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন পেয়ে যাবেন।
বলা বাহুল্য, পুরো ব্যাপারটাকে আদল দিতে গিয়ে জার্মান সরকারের প্রচুর খরচ লেগেছে। জার্মানির অবস্থা এখন পান্তা আনতে লবণ ফুরোনোর মতো। পোটসডাম-ব্রান্ডেনবুর্গ-কেমনিৎস-মেকলেনবুর্গ-ফোরপমার্ন – সর্বত্রই অপেরা-থিয়েটারের অস্তিত্ব বিপন্ন, শিল্পীরা বেকার। এমনকি চতুর্দেশে গ্যোয়েটে ইনস্টিট্যুটগুলিরও দেউলে দশা, কোনো কোনোটি তো বন্ধই করে যাওয়া হচ্ছে। এখুনি কি রোমে ঘটা করে কবির ঠিকানা প্রতিষ্ঠিত না করলেই চলত না?

ছয়
এখনো ঘরে ফেরেনি
‘মাদল বাজাও, হৃদয়ে রেখো না ভয়’ মন্ত্রটিকে সম্বল করে ড্যুসেলডর্ফের নাট্যভবনে হাইনরিশ হাইনের জয়ন্তীর বোধন হলো। উদ্বোধন বললেই হয়তো সঠিক হতো। কেননা, হাইনের দ্বিশতবার্ষিক জন্মদিনের বিভাবে সারা বছরজুড়ে সমারোহময় যত অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে, তাদের আড়ালে অনন্যোপায় আনুষ্ঠানিকতার বালাই অনায়াসেই ঠাহর করা যায়, বোঝা যায় ক্লিষ্ট বিবেকের গরজেই এত ঘনঘটা হতে চলেছে।
ড্যুসেলডর্ফে এই হঠাৎ উদ্যাপিত কবির জন্ম ১৭৯৭-এর ১৩ ডিসেম্বরে। জীবদ্দশায় ইহুদি হিসেবে জার্মানিতে লাঞ্ছিত ও তাড়া-খাওয়া হাইনরিশ তাঁর মৃত্যুর ১০ বছর পরও জন্মশহরে ‘স্বদেশের কলঙ্ক’ বলে অভিহিত হয়েছেন। নাৎসিরা ড্যুসেলডর্ফের যশস্বী সন্তানের অস্তিত্ব বিষয়ে রা তো কাড়েইনি, উপরন্তু কেউ টুঁ শব্দ করলেও তাকে নাজেহাল করেছে। পরিকল্পিত বিস্মরণের পালা দীর্ঘদিন ধরে চললে যা হয়, সময়টা স্বাভাবিক হলেও বিস্মৃত মানুষটিকে আয়ত্তে আনা যায় না আর। ঠিক এই কারণেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরেও বেশ কয়েক বছর হাইনের নাম ঘিরে জার্মানিতে একরকম ছমছমে নৈঃশব্দ্যের পরিচর্যা চলেছিল। তারই প্রতিবাদে ১৯৮১-তে ভাস্কর বের্ড গেরেশহাইম কবির একটি প্রতিমূর্তি গড়লেন। একরাশ অভিমান আর বিদ্রূপের ব্যঞ্জনায় শিল্পিত ওই মুখমন্ডল অনবদ্য পৃথিবীর সমস্ত নির্বাসিত শিল্পীর প্রতিনিধি হয়ে তাকিয়ে আছে। গেরেশহাইম শহরের মাঝখানের পার্কে ওই প্রতিমূর্তি এমনভাবেই স্থাপন করে দিয়েছিলেন, যেন শিশুরা তাকে খেলবার সঙ্গী ঠাউরে নিয়ে তার কোলেপিঠে উঠে গিয়ে তাকে আদর করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে, তরুণ প্রেমিকযুগল তার কাছে-পিঠে দুদন্ড বসে থেকে অনর্পিত সেই সত্তার প্রাসঙ্গিকতা অনুভব করতে পারে। পরবর্তী প্রজন্মের মূল্যবোধ জাগিয়ে রাখার এই প্রবর্তনা থেকেই বছর সাতেক পর নর্ডরাইন ভেস্টফালেনের রাজধানীতে হাইনরিশ হাইনের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
সারা জীবন সত্যের পক্ষে যিনি সংগ্রাম করেছিলেন, সেই কবি যখন ১৭৯৯-কেই তাঁর জন্মবর্ষ বলে নির্ণয় করেন, তার পেছনে নিশ্চয়ই নিজেকে তারুণ্যের কাছাকাছি রাখবার এষণা কাজ করে থাকবে। উত্তর আমেরিকার হাইনে সমিতির সদস্য লেখিকা শ্রীমতী রুথ ক্ল্যুগার প্রসঙ্গত রঙ্গচ্ছলে, নাট্যভবনের প্রথম অনুষ্ঠানে তাঁর কথিকায় আমাদের জানিয়েছেন, ‘হাইনের কাছে মিথ্যে আর কল্পক্রীড়ার তফাৎটা তেমন স্পষ্ট ছিল না। তাঁর ওই জন্মদিনের তারিখ থেকে শুরু করে আজীবন তিনি সবকিছু নিয়েই একটানা অনৃতকথন চালিয়ে গিয়েছেন।’ আসল কথা কি এটাই নয় যে, পরিপার্শ্বের নানারকম দাপট থেকে বাঁচবার জন্যেই তাঁকে কখনো-সখনো মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছিল?
রুথ ক্ল্যুগারকে (জ, ১৯৩১) এবারকার হাইনে-পুরস্কার দেওয়া হলে তিনি অবশ্যই তাঁর কৃতজ্ঞ ভাষণের বৃহদংশ ছেয়ে আমাদের কবির সাহসিক সত্যপ্রিয়তার কথা বলেছেন। ইহুদি এই মহিলাকেও টেরেসিয়েনস্টাট-আউশ্সুইৎস ক্রিস্টিয়ানস্টাটের বন্দিশিবিরে দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে। ওত পেতে থাকা মৃত্যুর শিকার হয়ে থাকার সময়, হাইনের কাব্যাদর্শ কবুল করে নিয়েই, অসত্যের সঙ্গে – তা সে যত বর্বরই হোক – রফা করেননি তিনি। কারাযাপনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনি কবিতায় আক্রান্ত ‘আরো বেঁচে থাকা – একটি যৌবন’ (Weiter Leben – Eine Jugend) শীর্ষক যে-গদ্যগ্রন্থ লিখেছেন, তারই ভিত্তিতে তাঁর এই পুরস্কার। প্রাপ্তির আনন্দে কাঁপা গলায় রুথ বললেন : ‘হাইনের কবিতা বিস্ময়করভাবেই আধুনিক। অথবা বলা যায়, আমাদের এই কালপর্বে, যখন চতুর্দিকে পণ্যবাদের চক্রান্তে মানুষ বস্ত্ততে পর্যুষিত হতে চলেছে, তাঁর কবিতা মানুষের কাছে নতুন অঙ্গীকার আর দায়ভাগের সংক্রামে অপরিহার্য।’
নিজস্ব পরবাসীকে নিয়ে মাতামাতি না-করলে ভালো দেখায় না, এটা বুঝতে কারোরই কোনো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। যুক্তি-বক্রোক্তি-সৌন্দর্য-ঋজুতা-রোমান্টিক অন্তমুর্খিতা – হাইনরিশের সৃষ্টির অন্তর্গত এসব ধ্যানধারণার চূড়ান্ত বর্গীকরণ কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে উদ্যোক্তারা যথেষ্টই মাথা ঘামাচ্ছেন। নির্বাসিত কবির দ্বিতীয় মাতৃভূমি প্যারিসেও জার্মানি থেকে ‘আমি ভাগ্যের সং’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনী পাঠানো হচ্ছে। তাঁর নামে জামার বোতাম থেকে আরম্ভ করে ডাকটিকিট কি দশ-মার্ক স্মৃতিমুদ্রার বাহার দেখে অনেকেরই সংগত সংশয়, অচিরেই বিয়ার বোতলের ঢাকনা, টি-শার্ট, এমনকি মোজার গায়েও তাঁর প্রতিকৃতি পাওয়া যাবে। ভবঘুরে বিশ্বনাগরিকের তবু, মৃত্যুর পরেও, ঘরে ফেরার কোনো লোভলক্ষণ নেই। অথচ ঘরেই কি সে থাকতে চায়নি?

ঝঞ্ঝা বাজায় নৃত্যরঙ্গগীত,
শিস্ দেয়, শনশনায়, গর্জরত;
কী কান্ড! দোলে কেমন নৌকোখানা!
রাত্রিটা বড় মজার, অসংযত।

জীয়ন্ত এক জলস্তম্ভশিলা
ক্ষুব্ধ সাগর গড়ে;
এইখানে কালো অতলের জৃম্ভন,
ওইখানে জাগে শুভ্রতার শিখরে।

শাপশাপান্ত, বমি ও প্রার্থনার
স্বর ঠিকরিয়ে পড়ছে কেবিন ঠেলে;
মাস্তলটাকে অাঁকড়িয়ে সাধ জাগে;
রইতাম যদি ঘরেই ঘরের ছেলে।

সাত

একশ পঁচিশ নম্বরের বাড়িটা
শোসেস্ট্রাসে ১২৫। ফরাসি ও জার্মান দুটি শব্দের মানেই ‘পথ’। তবু যে সমার্থসূচক দুটো শব্দই সচেতন পথিকেরা দিনের মধ্যে অসংখ্যবার বিড়বিড় করে আওড়ায়, তার কারণটা হচ্ছে এই যে ওরা বলতে চায়, এইটেই হলো রাস্তার রাস্তা। এখানেই জীবনের শেষ দিনটে বছর কাটিয়েছিলেন ব্রেশ্ট। জার্মানি অবিভাজ্য হওয়ার পর এই বাড়িটা সারা জগতের মানুষজনের তীর্থ হয়ে উঠেছে।
পনেরো বছর নির্বাসনের পর স্বদেশের একরাশ ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ফিরে এসে প্রথমেই ব্রেশ্টের কাছে মাথা গুঁজবার মতো এতটুকু বাসা পাওয়াটাই প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জার্নালধর্মী একটি কবিতায় তার অব্যর্থ সংকেত আছে :

যখন ফিরে এলাম
চুলে আমার পাক ধরেনি বলে বেশ ভালোই লাগছিল আমার
পর্বতরাজির টানাপড়েন পড়ে রইল আমাদের পেছনে
সামনের দিকে বিস্তারিত আমাদের টানাপড়েন সমতলের।

তিনি তখন রাজার রাজা। তরুণ কবিরা একবার তাঁর দর্শন পাবেন বলে উদ্গ্রীব হয়ে থাকেন। কোথায় তাঁদের তিনি বসতে দেবেন, কোথায়ই বা বসে লিখবেন, সেই ছিল তাঁর অস্তিত্বের অস্বস্তি। জীবনব্যাপী যুঝে-চলার পর একটুখানি স্বাচ্ছন্দ্যও কি তাঁর অভিপ্রেত অথবা প্রাপণীয় ছিল না? ছেলেবেলার কিছু আসবাবপত্তর, পথে-প্রবাসে সংগৃহীত নো-নাটকের কয়েকটা মুখোশ, অন্তত সাড়ে তিন হাজার বই – এসব তো দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য রুচি-রুটির মতোই ছিল অত্যাবশ্যক সামগ্রী। আর তাছাড়া? রুথ ব্যার্লাউ, তাঁর ঘরানার উজ্জ্বল অভিনেত্রীও প্রেম, অতিরিক্ত অথচ জরুরি তালিকায় সেই মর্মে লিখেছেন :
টেবিল, অনেক টেবিল
টাইপরাইটার
টেব্লল্যাম্প
অঢেল আলো
সুন্দর টাইপ করার কাগজ
ছবি কেটে সাজিয়ে রাখবার জন্য প্রথমতম উপকরণ কাঁচি
এবং আঠা।

এই পর্যন্ত লিখেই রুথের মনে হয়েছিল, পরা-প্রয়োজনীয় আরো কিছু শর্তের কথা :

ছাত্র, অনেক ছাত্র
দক্ষ অভিনেতৃবর্গ
সুরকার
সংলাপ
জ্ঞানী বিজ্ঞানী
ডিটেকটিভ উপন্যাস
আর তাঁর বিশ্রাম।

সৃজনী অবসরের এই চাহিদা মিটিয়ে দিয়েছিল শোসেটাসের ওই বাড়িটা। ‘যাঁরা এখানে আসবেন, জাদুঘরের প্রত্যাশা নিয়ে এলে ভুল করবেন। অনৃত ভক্তির বদলে প্রসন্ন শ্রদ্ধা নিয়ে এলেই তাঁরা বুঝতে পারবেন, এখানে সমাধিসদনের মতো নিছক স্মৃতিসামগ্রী সংকলন করে রাখা হয়নি। একজন প্রাসঙ্গিক মানুষের যাপিত জীবনটা উপলব্ধি করে ঋদ্ধ হয়ে ওঠাই তাঁদের কাছে আমদের কাম্য’, ব্রেশট ভবনের সংবিধানপ্রতিম মুখপত্রে কথাগুলো জোর দিয়েই বলা হয়েছে।
ওই প্রস্বর যে স্বাভাবিক, বার্লিনে এবার নতুন করে বুঝলাম। বিশ্বসংস্কৃতি-ভবনের (Haus der Kulturen der Welt) উদ্যোগে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সেখানে যে ভারত ও পাকিস্তানের লেখকদের মেলামেশা আর সম্মেলনের আয়োজন হয়েছিল, তার চেয়ে সময়োচিত আর কিছুই হতে পারে না। প্রথমদিকে যেন মনে হচ্ছিল, দুই দেশের দ্বিধান্বিত শিবির ছেয়ে ঠান্ডা যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ নিথর শান্তির তুষারপাত চলছে। একদিন দুর্জয় কথাশিল্পী ইন্তিজার হুসেইন with love for my friend from the land of Tagore লিখে তাঁর গল্পগুচ্ছটি আমার হাতে তুলে দিয়ে স্মিত হাসলেন। রবীন্দ্রনাথের মতোই, হয়তো তাঁর চেয়ে আরো অমোঘ অভিঘাতে, সেতু ছুড়ে দিয়েছিলেন ব্রেশ্ট।
প্রায় প্রতিদিনের পাঠে, পর্যালোচনায় এই কবিনাট্যকারের নাম ধ্রুবপদের মতো উঠে এসেছিল। শুধু তা-ই নয়, একটু সময় পেলেই দলবেঁধে সবাই শোসেস্ট্রাসের এই বাড়িটার কাছে ঘুরঘুর করতেন। দেখে মনে হবে যেন বৌদ্ধ শ্রমণেরা প্রদক্ষিণরত। তীর্থপরিক্রমার সর্বশেষ দেবায়তন ছিল অবশ্যই ব্রেশ্ট ও হেলেনে হবাইগেলের সমাধিবেদি। খুব কাছেই রুথ ব্যার্লাউয়ের স্মারকপ্রস্তর। ব্রেশ্টের প্রিয় এবং সংশয়ভাজন দুই দার্শনিক, হেগেল ও ফিশ্টেও অদূরশায়ী। এরকম একটা জায়গায় এসে ঘোর নাস্তিকেরও হৃদয়-মন আচ্ছন্ন হয়ে যায়। হিন্দি ভাষার অগ্রণী কবি কৈলাস বাজপেয়িরও কী রকম যেন ভাবসমাধির অবস্থা হয়েছিল। অথচ একটু পরেই আমাদের সমীক্ষণ আর সেমিনারের পালা। আমি তাঁর বিবশ দশা ঘুচিয়ে দেওয়ার জন্য নির্মম একটি সত্য উদ্ঘাটন করলাম : ‘জানো তো, প্রাচীরপতনের পরমুহূর্তেই এখানে নয়া নাৎসিরা এসে ব্রেশ্টের বেদিটায় কালিঝুলি লেপে চলে যায়। ওরা ভেবেছিল, দুনিয়ার নির্জিত মানুষদের ওই প্রতিনিধির দুর্নাম রটিয়ে দিয়ে বুঝি তাঁর শুভময় ও সক্রিয় প্রভাব চিরতরে রদ করে দেওয়া যাবে!’

আট
ভিতরবাসী বিশ্ববাসী : ওক্টাভিও পাজ
মুম্বাই শহরে ওক্টাভিও পাজ প্রথম যেদিন পা রাখেন, তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি যেন সরে গিয়েছিল। এত ছন্নছাড়া জনতা কোনোদিনই তো কোথাও তিনি দ্যাখেননি। ভিড় থেকে পালিয়ে এক রোববার দ্বৈপ অবকাশযাপনের পরিকল্পনায় এলিফ্যান্টাতে গিয়েও এতটুকু শান্তি পাননি। রাজ্যের লোকজন সেখানে পিকনিকের প্রমোদ প্রহর কাটিয়ে রাশিকৃত আবর্জনা ফেলে গিয়েছে। যদি পাওলো পাসোলিনি বা গুন্টার গ্রাস হতেন, তাহলে তাঁর ভারতবীক্ষা প্রথম অভিজ্ঞতার সেই বিতৃষ্ণাতেই আবদ্ধ হয়ে থাকত। কিন্তু পাজ যে নাছোড় বিশ্বনাগরিক, ভারতবর্ষের কাছে তাই মাটি অাঁকড়ে দীক্ষিত হওয়ার জন্যই উন্মুখ হয়ে রইলেন। এবং আশ্চর্য, অত্যল্প সময়ের মধ্যেই প্রাথমিক অস্বস্তি রূপান্তরিত হয়ে যায় প্রগাঢ় মুগ্ধবোধে। তাঁকে তখন দেখা যায় দিল্লিতে শ্রাবণের মধ্যরাত্রে একটা শাদা কাগজের ওপর ঝুঁকে আছেন। পাশের ঘরে তাঁর স্ত্রীর পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে : বাগানের মহানিমগাছটা কবির কাছে নতুন কথা শুনবার অপেক্ষায় কান পেতে আছে। এরকম বোধিকল্পময় আবহমন্ডল শুধু বাইরের দিক থেকেই নয়, কবিস্বভাবের মধ্য থেকেই উদ্ভূত হয়ে উঠছে।
ভারতবর্ষের কথা উঠলেই পাজ তাই কেমন যেন সময়হীন হয়ে পড়েন। এই দিব্যদশার অভিঘাত এতই প্রবল যে তাঁর আত্মজৈবনিক লেখায় তিনি তাঁর প্রথম সফরের (১৯৫২) বছরটা অন্তত বছরখানেক পিছিয়ে দেন। এর ১০ বছর পর ভারতে এসে তিনি ছয় বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। ১৯৮৪-৮৫ নাগাদ আরো দুবার তিনি মেক্সিকোর পরেই তাঁর এই প্রিয় মৃত্তিকাকে ছুঁয়ে যান। ভিতরবাসী এই মানুষটির কবিতায় কবিতায় তাই যে ভারতীয়তা-মথিত হয়ে থাকবে, এতে অবাক হওয়ার কী আছে?
তাঁর প্রিয় কবি পাবলো নেরুদার মতো কূটনৈতিক বৃত্তিকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। কেননা, তার আড়ালে সৃষ্টির মন্ত্রণাকে লুকিয়ে রাখা যায়। একবার স্পেনীয় গৃহযুদ্ধের স্মারক অনুষ্ঠানে, আলব্যের কামু এবং আরো কয়েকজন সতীর্থের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ‘অপরাধে’ মেক্সিকো সরকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবেই তাঁকে রাজদূত করে পাঠিয়ে দেয় ভারতবর্ষে। নির্বাসনের বিভাব থেকে তীব্র ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে, এমন একসময় তাঁর স্বদেশে বিদ্রোহী ছাত্রদের ওপর সরকারি দমননীতির প্রতিবাদে তিনি তাঁর ডিপ্লোম্যাটিক পদমর্যাদা একমুহূর্তে বিসর্জন দিতে দ্বিধাবোধ করেন না।
ভালোবাসা ও অনর্পিত প্রগতিবিবেক, এ দুয়ের মায়াবী মিশ্রণে বলয়িত হয়ে ওঠে পাজের ব্যক্তিত্ব। ভারত স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে জার্মান ভাষায় তাঁর অনবদ্য ‘ভারতের আলোয়’ বইটির পরিবর্ধিত জার্মান সংস্করণটি প্রকাশিত হলে পাজের ভক্ত-পাঠকদের কাছে তাঁর ভারতপ্রেমের দুটি দিক আপাতচোখে পরস্পরবিরোধী ঠেকেছিল। একদিকে তিনি দাবি করছেন, এই গ্রন্থ ‘জ্ঞানের নয়, সংরাগের ফল’, আবার অন্যদিকে বলছেন, ভারতাত্মা নিয়ে Ladera Este (১৯৬৯) শীর্ষক যে-কাব্যগ্রন্থ লিখেছিলেন, ও-বই তাঁরই ‘বিদগ্ধ ও বিস্তারিত বিন্যাস’। প্রকৃত প্রস্তাবে এই দুই বক্তব্যের মধ্যে কোনো মেরুবিভাজন নেই। যে-ওক্টাভিও হিন্দি কবি অজ্ঞেয় এবং শ্রীকান্ত বার্মার সঙ্গে তিন হাতে ‘বন্ধুত্বের কবিতা’ লেখেন, তিনিই ঐতিহাসিক দেম-ভিনসেন্ট স্মিথ-রাঘবনের আকর গ্রন্থাবলি থেকে তথ্যযুক্তি আহরণ করে ভারতবর্ষীয় স্থাপত্য-ভাস্কর্য, সাহিত্য-সংগীত-শিল্পকলার অনন্যতা প্রতিপন্ন করেন, আর সেটা এমন শিক্ষার্থীসুলভ তন্নিষ্ঠা নিয়েই করেন, যেন ভারতবিরোধী শিবিরগুলি থোঁতামুখ চিরতরে ভোঁতা হয়ে যায়। এভাবে, দস্ত্তরমতো যুক্তিসুসজ্জিত হয়ে তিনি যখন ভারতসভ্যতা-বিষয়ক একটি থিসিস খাড়া করে তুলেছেন, আচমকা নিজেই অনুভব করেন, ভারতবর্ষ হৃদয়ের যৌক্তিকতায় তাঁর আপন সাধন ধন হয়ে উঠেছে। কবুল করেন, সেখানেই তিনি অর্জন করেছেন একটি মন্ত্র : ‘মানুষ বলতে মানবতা বোঝায়’। তাঁকে ব্রাসেলস-এর গ্রাঁ প্রি আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হলে কাঙ্ক্ষণীয় প্রাইজ নেবেন কি-না, সেই মর্মে চূড়ান্ত বিধান নেওয়ার জন্য আনন্দময়ী মায়ের সঙ্গে গেলে সেই প্রজ্ঞাপারমিতা তাঁর দিকে কমলালেবু ছুড়ে দিয়ে গ্রহণ ও অপরিগ্রহের সমার্থদ্যোতনা আভাসিত করেন। আর তখনই পাজের কাছে প্রতিভাত হয়ে ওঠে ভগবদ্গীতার নিহিতার্থ : ‘দেওয়া আর নেওয়া আসলে সমার্থক ক্রিয়াকলাপ।’

কেউই তখন একবিন্দু বুঝতে পারে না।
কয়েক লহমা যখন পাজের সাক্ষাৎ হয়েছিল, তিনি এই মর্মে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন, দ্বিভাষিক (বাংলা-স্পেনীয়) কবিতা পাঠের মাধ্যমে আরেকবার তিনি ভারতপথিক হবেন, শ্রোতাদের কাছে তাঁর প্রতিমা স্পষ্ট করে তুলবেন আরো। মৃত্যু এসে বাদ সাধলেও বুঝে নিতে পারি, মানুষের কোনো-কোনো ইচ্ছা চরিতার্থ না হয়েও মূল্যবোধের মতো দীর্ঘ দীর্ঘ কাল জেগে থাকে।

নয়
হ্যারি পটার
শ্রীমতী সারা কির্শ, জার্মানির অন্যতম কবি, মগ্ন মন্ত্রোচ্চারে তাঁর বিখ্যাত ‘চৈতী বাংলো’ কবিতাটি পড়ছিলেন :
হাঁস উড়ে গেল বাড়িয়ে লম্বা গলা
আকাশের দিকে লাল ওয়াইনের বোতল
উত্থিত যেই সূর্য বিদায় নিল
পড়ন্ত দিন দীঘল তাতিয়ে ওঠা
পান করি আর কাটি গোলাপের ডাঁটা।

ঘোর কেটে যাওয়ার পর লক্ষ করলাম, বহুবিজ্ঞাপিত অনুষ্ঠানে মাত্র এগারোজন শ্রোতা উপস্থিত। সভা শেষ হলে উদ্যোক্তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘এরকম দশা কী করে হলো?’ তিনি বললেন, ‘মুষড়ে পড়লে তো চলবে না। কবিকে বলতে হবে, তাঁর ইংরেজ সতীর্থা জোয়ান রোলিংয়ের মতো হ্যারি পটারের ধরনের উপন্যাস লিখুন।’
কে এই হ্যারি পটার? জনপ্রিয়তম কিশোর-সিরিজের এই নায়ক দিগ্বিদিকে তুমুল অভিঘাত রচনা করেছে। প্রথম তিনটি বইয়ের পঁয়ত্রিশ মিলিয়ন কপি বিকিয়ে গেছে, পঁয়ত্রিশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বেশ কয়েক মাস ধরেই ‘হ্যারি পটার এবং প্রজ্ঞাপাথর, হ্যারি পটার আর সর্বনাশের ঘর’ আর ‘হ্যারি পটার আর আস্কাবনের কয়েদিরা’ বেস্ট সেলার তালিকার তুঙ্গে। চতুর্থ খন্ড ‘হ্যারি পটার আর অগ্নিপাত্র’ বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই পাঁচ মিলিয়ন কপি বাজার থেকে উবে গেছে। জার্মান তর্জমায় বইটি এখনো বেরোয়নি, কিন্তু এরই মধ্যে ইন্টারনেটে এক লক্ষ কপির বায়না পড়ে গেছে।
হ্যারি দুবলা-পাতলা ছোট্ট ছেলে, পাগলা দাশুর মতোই উসকোখুসকো চুল। ভাঙা চশমাটা তার আঠা দিয়ে জোড়াতালি লাগানো। কপালে বিদ্যুতের মতন ক্ষতচিহ্ন। অনাথ বালক, শয়তান এক বাজিকর তার মা-বাবাকে হত্যা করেছে। এগারো বছরের জন্মদিনে হ্যারি দৈবক্রমে জানতে পারে, তা মা-বাবাও নামকরা জাদুকর ছিলেন। জানতে পারামাত্রই পেঁচা এসে তাকে ডাক-চিঠি দিয়ে যায় : তুকতাক যন্তরমন্তরের ইশ্কুল হগওয়ার্টস থেকে তার নেমন্তন্ন এসেছে। সঙ্গে সঙ্গেই স্বাভাবিক লোকজন বা মাগলসদের (Muggels) চেনাজানা জগৎ থেকে তার স্বনির্বাসন শুরু হয়ে যায়। মাগলসরা ইন্দ্রজালের দুনিয়াকে দুর্বলতার প্রতীক বলে জানে, আর তাকে ডরায়ও খুব। কী করে এসব মধ্য চিত্তদের মধ্যে অকারণ কালাতিপাত করবে সে! স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ডসে ইন্টারনেট যে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। সেখানে গিয়ে হ্যারি মন্ত্রপানীয় বানাতে শেখে। তখন থেকে তার বন্ধু কিডিচ, আকাশে তিন-তিনটে বল নিয়ে যে অতীন্দ্রিয় উপায়ে ফুটবল খেলতে পারে। হগওয়ার্টসে তার যেসব অভিজ্ঞতা ঘটে, তার অনেকগুলিই বিপজ্জনক। আবার ভূত-দৈত্য-দানো বা খাপছাড়া মাস্টারমশাইদের সঙ্গে অনেক রকম কৌতুকী ব্যাপারস্যাপারেও জড়িয়ে পড়তে থাকে। জাদুবিদ্যার ইশ্কুলে অনভিজ্ঞ-অনাথ ছেলেটি খেলাধুলোয় সবাইকে চমকে দেয়। তার শুভার্থী বন্ধু আর অনিষ্টকর শত্তুরদের সংখ্যা যখন সমান সমান হয়ে ওঠে, তাকে মনে হতে থাকে জগদ্ব্যাপারে মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি খন্ডেই দেখা যায়, ভালো বন্ধুদের সঙ্গে সে রহস্যময় ইন্দ্রজালকে কালো ম্যাজিকের অপশক্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখতে তৎপর। তার মানে এই নয় যে, তার ধরন-ধারণে অতিমানবের লক্ষণ মূর্ত হয়ে উঠেছে। বস্ত্তত প্রায়ই ভয় পায় তার। সাতশো বছর ধরে হলওটার্টসে তিন স্কুলের টুর্নামেন্টের যে-প্রথা আছে, তার শামিল হতে গিয়ে প্রতিটি পর্যায়েই সে ভয় পেয়েছে। সারা বছর ধরেই পড়ুয়াদের মধ্যে সেই প্রতিযোগিতার লড়াইমূলক মহড়ার সদস্য তাকে থাকতেই হয়। এই মহড়ায় সাংঘাতিক কত যে দুর্ঘটনার সাক্ষী সে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। তবু সবগুলি সংগ্রামের শেষে তার আরেক ক্লাসবন্ধু সেডরিক ডিগরির সঙ্গে সে যখন উদ্বৃত্ত-উত্তীর্ণ থাকে, তাদের আনন্দ দেখবে কে? ওরা তখন দুজন আগুনের আধার ছুঁয়ে দেয়।
হ্যারির রচয়িত্রী যোয়ান কে রোলিংয়ের সৃষ্টির পথ এখন অপ্রতিরোধ্য। অথচ আবালবৃদ্ধবনিতার ফ্যান ক্লাবের এই আরাধ্য মহিলা নিজেও ভাবেননি, পার্থিব এই সার্থকতা তাঁকে স্পর্শ করবে। একলা বেকার জননী, কোলের শিশুকে নিয়ে স্কটল্যান্ডে যখন পালিয়ে বেড়িয়েছেন, কফিহাউসের স্যাঁতসেঁতে ঘরে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন। লেখার কাগজ কেনার সামর্থ্য ছিল না বলে সাতশস্তা ন্যাপকিন পেপারে লিখতে শুরু করে দেন। প্রথম খন্ড এইভাবে সম্পন্ন হলে একজন প্রকাশককে দেখাতেই তিনি সেটি ছাপানোর সঙ্গে সঙ্গেই এঁরা উভয়েই প্রভূত প্রতিপত্তি অর্জন করেন।
হ্যারির জয়যাত্রার মর্মে শুভাকাঙ্ক্ষা জানিয়ে বাড়ি ফিরে হাতে তুলে নিই সারা কির্শের নতুন কবিতাপুঁথি। অনুবাদ করতে করতে মনে হয়, আমি অন্তত তাঁর এক হাজার পাঠকের একজন তো!

দশ
জর্জ অরওয়েল
২৫ জুন জর্জ অরওয়েল (আর্থার ব্লেয়ার, ১৯০৩-৫০)-এর জন্মশতবার্ষিকী এদেশে অনুদ্যাপিত থেকে গেল। অথচ ইয়োরোপ ও মার্কিন দেশে ভাবুকমহলে তাঁকে নিয়ে পার্বণের ঘনঘটা যে মাত্রা ছাপিয়ে গিয়েছিল, তার একটি অব্যবহিত কারণ : ১১ সেপ্টেম্বর। যে-সমাজ সাহসিক ব্যক্তিত্বকে নির্জিত করে তার সম্পর্কে অরওয়েলের অস্বস্তির শেষ ছিল না। সেই আতঙ্কের ইউটোপিয়া তাঁর ক্রান্তিসঞ্চারী উপন্যাস ‘উনিশশো চুরাশি’ (রচনাকাল ১৯৪৮)। এই ভবিষ্যভারাতুর আখ্যানে তিনি আমাদের সেই রাষ্ট্রের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন, যা গোয়েন্দার ধাঁচধরনে ব্যক্তিনাগরিকের নাড়িনক্ষত্র নিয়ন্ত্রণ করে, মতামত প্রকাশ করবার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। এই রাষ্ট্রেরই নাম রেখেছেন তিনি Big Brother। তাবৎ তরল সোপ অপেরায় এই সংজ্ঞায়ন অকাতরে প্রযুক্ত হয়ে চলেছিল, কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর অভিঘাতে হঠাৎই বিধুর হয়ে টঙ্কার দিলো দূরদর্শীর সাবধানবাণী : Big Brother is watching you, একটি রাষ্ট্র তার সীমা ছাড়ানো ক্ষমতা চরিতার্থ করে নেওয়ার আস্পর্ধা কদ্দুর যেতে পারে, সম্প্রতি ইরাকবিধ্বংসী আয়োজনের নজিরে সেই মর্মে আজ যে তুমুল প্রতর্ক বেধেছে, সে জন্য অরওয়েলের কাছে সারাবিশ্বের মানুষজন আ-ঋণী এখন। ঔপনিবেশ ইংরেজ মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান ইটন স্কুলে দ্রুত পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ইন্ডিয়ান ইমপিরিয়্যাল পুলিশ দপ্তরে (১৯২২-২৭) অন্যমনস্ক চাকরির পর শুরু হয়ে যায় তাঁর ভবঘুরের দশা (১৯২৮-৩৬)। দক্ষিণ ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সে নিঃশর্ত পরিব্রজনের প্রক্রিয়ায়, কখনো রেস্তোরাঁয় প্লেট ধুয়ে, কখনো-বা এলোমেলো শিক্ষকতা কিংবা বইয়ের দোকানে অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে, আচমকা খুলে গেল লেখালেখির নির্ঝর। রেডিওর জন্য কাজ করতে এসে সাহিত্যে অদীক্ষিত ‘সাধারণ’ মানুষের স্বরায়তন স্পর্শ করলেন, আর সেইটেই হয়ে উঠল তাঁর রচনার প্রাণস্পন্দ। অরওয়েলের জন্ম এপার-বাংলারই অদূরবর্তী মতিহারিতে, যা অনেকেরই অজানা।