এত তাড়া কীসের ছিল?

মনজুর যে আমাদের কত কাছের মানুষ ছিলেন, তা নতুন করে অনুভব করতে পেরেছি চিরতরে চলে যাওয়ার আগে তাঁর এক সপ্তাহকাল হাসপাতালে থাকার সময়ে। প্রায় প্রতিদিনই অন্তরের টানে হাসপাতালে গিয়ে কিছুক্ষণ থেকেছি, তাঁর সর্বশেষ অবস্থার খোঁজ নিয়েছি আর তাঁর গুণগ্রাহীদের সঙ্গে স্মৃতি রোমন্থন করেছি। সবারই প্রার্থনা ছিল, মনজুর দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন। কেউ কল্পনাও করতে পারেননি যে, তিনি আর ফিরে আসবেন না। মনজুর কখন যে আমার আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন, তা টেরই পাইনি।

আশির দশকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে আমরা আমাদের বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীতে ইংরেজি কপি লেখার জন্যে আমন্ত্রণ জানাই। খণ্ডকালীন এ-কাজের জন্যে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকদের ওপর বেশি নির্ভর করতাম। মনজুর ছাড়াও শওকাত হোসেন ও ফকরুল আলম আমাদের হয়ে বিজ্ঞাপন তৈরিতে সাহায্য করেছেন। সে-সময়েই মনজুরের সৃষ্টিশীলতার পরিচয় আমরা পেয়েছিলাম। কী করে কম কথায় বক্তব্য প্রকাশ করা যায় মনজুর সেটা জানতেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে তাঁর বক্তৃতা ও লেখালেখিতে তাঁর এ-গুণটা লক্ষ করেছি।

চার দশকের পরিচয় তাঁর সঙ্গে। তাঁর অনেক সহকর্মী বা বন্ধুবান্ধবের মতো আমি যে কখনো দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর সঙ্গে গল্প করে সময় কাটিয়েছি, এমন নয়। বিভিন্ন সভা-সমিতি বা অনুষ্ঠানে দেখা হতো, অনেক সময়ে একই সভায় অংশ নিয়েছি বা একই অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেছি। তবে মাঝে মাঝে আড্ডা হতো ঢাকা ক্লাবে। ক্লাবের ম্যাগাজিন রমনা গ্রিনের সম্পাদনা পরিষদে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। দ্রুততার সঙ্গে কোনো লেখা সম্পাদনা করার দক্ষতা তাঁর ছিল। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীর জন্যে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি, অনেকবারই সেমিনার উপ-পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

এ-প্রসঙ্গে চিত্রকলা সম্পর্কে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করতে চাই। ছাত্রজীবন থেকেই শিল্পকলায় তাঁর প্রবল আগ্রহ, শিল্পীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। তাঁর নান্দনিক বোধ তাঁকে আমাদের দেশের একজন প্রধান
শিল্প-সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বিদেশে আমাদের চিত্রকরদের শিল্পকর্ম পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর মতো সৃজনশীল শিল্প-সমালোচক খুব কমই চোখে পড়ে।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা গভীরভাবে অনুধাবন করেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের কবি খ্যাতির আড়ালে চিত্রকর হিসেবে তাঁর পরিচয় যে অনেকটা হারিয়ে গেছে, তা নিয়ে আক্ষেপ ছিল তাঁর। আমাদের প্রাচ্য শিল্পকলায় রবীন্দ্রনাথের জ্যামিতি ও অন্যান্য শিল্পপ্রসঙ্গ তাঁর নান্দনিক শিল্পবিচারের এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

বাংলা একাডেমি-প্রকাশিত তাঁর লেখা নন্দনতত্ত্ব শীর্ষক ছোট বইটি নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানলাভের জন্যে আদর্শ। মানুষের মধ্যে নান্দনিক বোধ সৃষ্টিতে গ্রন্থটি খুবই সহায়ক। ১৯৯০ সালে আমরা যখন থিয়েটার স্কুল চালু করলাম, তখন ক্লাসে নন্দনতত্ত্ব পড়ানোর জন্যে আমরা তাঁকে আমন্ত্রণ জানাই। তিনি সানন্দে আমাদের আহ্বানে সাড়া দেন এবং বেশ কয়েক বছর নিয়মিত নন্দনতত্ত্বের ক্লাস নিয়েছেন। ছাত্রছাত্রীরা মুগ্ধ হয়ে সহজ ভাষায় তাঁর মুখ থেকে শোনা নন্দনতত্ত্বের সূত্রগুলো অনুধাবন করত।

মনজুরের চেয়েও তাঁর স্ত্রী সানজিদা ইসলামের সঙ্গে পেশাগত কারণে আমাদের যোগাযোগ ছিল বেশি। আমাদের বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘এক্সপ্রেশানস্’-এর সামাজিক যোগাযোগের অনেক প্রকল্পে সানজিদা জড়িত ছিলেন। আবার ক্লায়েন্টের দিকেও আমরা তাঁকে পেয়েছি। এক্ষেত্রে আমার মেয়ে ত্রপা তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে।

২০০৬ সালে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে আমার স্ত্রীর দুই হাঁটুর অপারেশন হয়। তারপর থেকে প্রতি বছরই আমরা চেকআপের জন্যে সিঙ্গাপুর যেতাম। কয়েক বছর পর যখন সানজিদার ক্যান্সার ধরা পড়ল, তখন চিকিৎসার জন্যে তাঁকে নিয়ে মনজুর সিঙ্গাপুরে একই হাসপাতালে যেতেন। বেশ কয়েক বছর আমরা ঈদুল আজহার ছুটিতে যেতাম। একই সময়ে মনজুর ও সানজিদাও যেতেন। একাধিকবার আমরা একই গেস্ট হাউসেও উঠেছি। আমাদের দু-পরিবারেরই আবশ্যিক মিলনকেন্দ্র ছিল আমাদের থিয়েটার স্কুলের ছাত্র শহিদ হোসেন খোকন এবং মনজুরের ছাত্রী স্বাতীর বাসা। দুদিন দু-বাসায়ই আমাদের নিমন্ত্রণ থাকত। অনেক গান-বাজনা, আড্ডা আর খাওয়ার আয়োজনে অনেক আনন্দময় সময় কাটিয়েছি আমরা। মাঝে মাঝে দিনের বেলায় খোকনের অফিসেও আমি আর মনজুর আড্ডা দিয়েছি। আমাদের জন্যে খোকনের আন্তরিকতা কখনো ভোলার নয়। মনজুরের অসুস্থতার খবর পেয়ে সানজিদা যখন আমেরিকা থেকে আসে, খবর পেয়ে একই দিন খোকনও সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় এসে যায়। প্রায় সারাটা সময়ই হাসপাতালে কাটিয়েছে। মনজুর চলে যাওয়ার পরেই ও সিঙ্গাপুর ফিরে যায়। এমন নির্ভরযোগ্য আপনজন খুব কমই পাওয়া যায়।

মনজুরের কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন স্থিতধী ব্যক্তিত্বপূর্ণ স্মার্ট মানুষের ছবি। পোশাকে সবসময়ে কেতাদুরস্ত, প্রায়ই সুতির জ্যাকেট পরতেন, পায়ে ফিতাওয়ালা জুতো, মুখে স্মিত হাসি নিয়ে চলেন, এক কাজ সেরে অন্য কাজে। সানজিদার অসুস্থতার পর থেকে কাজের পর বাসায়ই থাকতেন বেশি সময়, স্ত্রীকে সঙ্গ দেওয়ার জন্যে। ইদানীং তাঁর সঙ্গে দেখা হতো বেঙ্গলে, নানা অনুষ্ঠান উপলক্ষে। আনিস স্যার চলে যাওয়ার পর বেঙ্গলের অনেক অনুষ্ঠানে তাঁকেই পৌরহিত্য করতে হতো। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ও ড. আনিসুজ্জামানের পর তাঁকেই দেখেছি বক্তৃতায় পরিমিতিবোধের পরিচয় দিতে।

শিক্ষক হিসেবে তাঁর সাফল্য ও জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয় ছিল। যে-কোনো কঠিন বিষয় সহজবোধ্য করে বোঝানোর ক্ষমতা তাঁর ছিল। ছাত্রছাত্রীদের সবসময়ে উৎসাহ দিতেন, বন্ধুর মতো আচরণ করতেন। ছাত্রছাত্রীরাও তাঁকে যে কতটা ভালোবাসত, তার প্রমাণ পেয়েছি হাসপাতালে। কত পুরনো ছাত্রছাত্রী খবর শুনে ছুটে এসেছে তাদের প্রিয় শিক্ষকের অবস্থা জানতে। অন্তরের টান না থাকলে এটা ঘটে না। তাঁর মতো খুব কম শিক্ষকই আছেন, যাঁরা পড়াতে ভালোবাসেন। মনজুর মনেপ্রাণে ছিলেন একজন শিক্ষক, এ-পেশার বাইরে যাওয়ার কথা কোনোদিন কল্পনা করেননি।

প্রথমদিকে প্রাবন্ধিক ও সমালোচক হিসেবে তাঁর প্রতিষ্ঠা হলেও পরবর্তীকালে মনজুর কথাশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। একের পর এক গল্প লিখে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। তাঁর গল্প পড়ে মনে হয়, তিনি তাঁর দেখা কোনো ঘটনা বর্ণনা করছেন। বাস্তব আর কল্পনার মিশেল পাঠকের পক্ষে ঠাহর করা সম্ভব হয় না। উপন্যাসও লিখেছেন তিনি, কিন্তু গল্পেই তিনি পারদর্শী। তাঁর গল্পে সাধারণ মানুষের জীবন ও সমাজের নানা অসংগতি ফুটে উঠেছে। এখানে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই। আমার নাতনি আত্রেয়ী জার্মানির বার্লিনে বার্ড কলেজে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কোর্সে এ-বছরই ভর্তি হয়েছে। ওর পাঠ্য বিষয়ের অন্যতম হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য। মনজুর যখন হাসপাতালে, তখন একদিন ও তার মাকে একটা বইয়ের পৃষ্ঠার ছবি পাঠিয়ে দেখালো পরের দিনের ক্লাসের জন্যে কী পড়ছে। দেখলাম সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের একটি গল্পের অনুবাদ ‘দ্য ওয়েপন’। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পাশাপাশি মনজুরের গল্পও ওদের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।

দেশের যে-কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংকটে তিনি সাহসের সঙ্গে সত্য উচ্চারণ করেছেন। ফলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’, আমাদের চেতনার বাতিঘর। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন, কথায় ও লেখায় অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান করেছেন। পদ-পদবির হাতছানি থেকে নিজেকে সবসময়ে দূরে রেখেছেন। তিনি চাইলেই যে-কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে পারতেন। আসলে তাঁর মতো যোগ্য শিক্ষকদেরই উপাচার্য হিসেবে আমরা দেখতে চাই, রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রকাশকারী শিক্ষকদের নয়। তাঁকে বাংলা একাডেমি ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছিল, তিনি সম্মত হননি। ব্যক্তিগতভাবে আমি তা জানি।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অমায়িক, বন্ধুবৎসল। কখনো তাঁকে কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে বা রাগ করতে দেখিনি। সব অবস্থায়ই শান্ত থাকার একটা ক্ষমতা তাঁর ছিল। একটা বিষয় লক্ষ করে আশ্চর্য হয়েছি, কোনো দিন কারো সম্পর্কে তাঁর মুখে নিন্দা শুনিনি। এ-গুণটা যদি আমরা আয়ত্ত করতে পারতাম, তবে সমাজে পারস্পরিক সম্পর্কগুলো অনেক উন্নত হতো।

শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে তরুণদের তিনি সবসময়ে উৎসাহ জোগাতেন। তরুণ লেখকদের বই পড়তেন, চিত্রকরদের শিল্পকর্ম দেখতেন, নাটক বা সংগীতশিল্পীদের কাজও তাঁর নজর এড়াত না। তরুণদের সঙ্গে সহজে মিশতে পারতেন বলে তরুণরাও তাঁকে একজন ভরসা করার মতো অভিভাবক বা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পেরেছিল।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাঁর আক্ষেপ বিভিন্ন সময়ে লেখা ও বক্তৃতায় তিনি ব্যক্ত করেছেন। প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি প্রশ্ন করেছেন, একজন প্রাথমিক শিক্ষকের বেতন কেন এক লাখ টাকা হবে না? তাহলেই যোগ্য শিক্ষক পাওয়া যাবে, তখন উপযুক্ত ছাত্রছাত্রী তৈরি হবে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘একজন সাধারণ শিক্ষক শেখান, একজন অসাধারণ শিক্ষক অনুপ্রাণিত করেন।’ অনুপ্রাণিত করার মতো শিক্ষকের আজ বড়ই অভাব। মনজুর ছিলেন একজন অনুপ্রেরণাসঞ্চারকারী শিক্ষক। মনজুরের মতো একজন সজীব, প্রাণবন্ত মানুষের এভাবে চলে যাওয়া অকালপ্রয়াণই বটে। মনজুর বেঁচে থাকবেন তাঁর অগণিত ছাত্রছাত্রীর স্মৃতিতে, তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধের মাঝে। একজন মানবিক বুদ্ধিজীবী হিসেবে ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা থাকবে। কেবলই মনে হচ্ছে, এত তাড়া কীসের ছিল তাঁর এমনভাবে চলে যাওয়ার? চারপাশে যখন পথ দেখানো মানুষ হাতেগোনা, তখন তিনিই তো ছিলেন অন্যতম আলোকবর্তিকা।