কাচঠোকরা

লেখক: আশান উজ জামান

জরুরি একটা কাজে গিয়েছিলাম। শহর থেকে দূরে। অন্য শহরে। ওখানেই এক বন্ধুর বাড়ি। ওর কাছে উঠব। স্টেশন থেকে নিয়ে যাবে আমায়। এই ছিল কথা।

নেমেই খোঁজ করলাম। আসেনি।

অপেক্ষা করলাম। এলো না।

যাওয়ার পথে মোবাইল হারিয়েছি। ফলে যোগাযোগও করা গেল না।

কী করব?

তখন রাত। বাড়ছে। বিদেশবিভুঁই।

কে যেন বলেছেন, যার কোথাও থাকার জায়গা নেই, তার হোটেল আছে!

তা-ই সই। কিন্তু একা থাকার কোনো সিট ফাঁকা নেই। দুজনের রুম আছে। চাইলে ভাগাভাগি করে থাকতে পারি। পরে কেউ এলে থাকবে, না এলে নাই। এক সিটেরই ভাড়া দিতে হবে।

উঠে গেলাম। না, অন্য হোটেলে খোঁজ নেওয়ার অবস্থা তখন ছিল না আমার। সারাদিন রাস্তায়। না খাওয়া, না দাওয়া, নাড়ি চোঁ চোঁ করছে, চোখ লেগে আসছে।

খেলাম। তারপর ঘুম।

বড় ক্ষুধায় খাওয়া যেমন, বেশি ক্লান্তির ঘুমও তেমন। হয় না বেশি। হুটহাট ভেঙে যায়। তবে আমি বেঘোরে ঘুমুচ্ছিলাম। ডাকলেন এক ভদ্রলোক। আমার রুমমেট। ওপাশের আলোটা জ্বেলে লিখছিলেন। কাগজ শেষ! আমার কাছে চাইছেন। কাগজ একটা ছিল। মেদভুঁড়ি কমানোর উপায় – একটা পোস্ট দেখেছিলাম এফবিতে, প্রিন্ট করেছিলাম। ব্যাগেই আছে। এক পৃষ্ঠায় লেখা যাবে। লেখক মানুষ, পেয়ে বসেছে লেখায়, লিখুন। আমি ঘুমাই। ল্যাঠা চুকে গেল।

কিন্তু চুকল না আসলে।

সকালে দেখি মাথার কাছে একটা গল্প। শেষ অংশটা লেখা হয়েছে আমার ওই কাগজে!

ভদ্রলোককে দেখলাম না কোথাও। হয়তো ব্যস্ততা ছিল। উঠে গেছেন ভোরে।

রুমবয়কে জিজ্ঞেস করলাম। জানে না। ম্যানেজারকে বললাম। তিনি তো অবাক। একাই ছিলাম আমি! কেউ ওঠেনি রুমটাতে!

তা হলে?

কেউ তো নিশ্চয়ই ছিল। না হলে কে ডাকল আমায়? কাগজ চাইলে কে? গল্পটাই-বা এলো কোত্থেকে! ভাবছেন, আমি নিজেই লিখেছি, এখন ভুলে গেছি?

না, অসম্ভব। ডান হাতে লিখতাম, হাতটা কেটে ফেলতে হয়েছে এক দুর্ঘটনার পর। এখন টাইপ করে কাজ চালাই। বাঁহাতে। হ্যাঁ, এক হাতেই।

গল্পটাও অদ্ভুত! এমন লেখা লেখা তো দূরের কথা, পড়িওনি আগে।

দুই

 

শহরের এদিকটায় খুব একটা আসেন না বোধ হয়, না? এলে চোখ এড়াত না বাড়িটা।

নজরে পড়ার মতো বিশেষ কিছু নয় যদিও। চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি। সাদাসিধে। ঘিঞ্জি এলাকায় গড়ে ওঠা আঁটসাঁট আর দশটা বাড়ির মতো। বারান্দা নেই। ব্যালকনি নেই। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেলে আড়মোড়া যে ভাঙবে, তার সুযোগও নেই। চারপাশের প্রাচীর ঘেঁষে দেয়াল।

সাধারণ বাড়ি। কিন্তু আপনার নজরে এটা পড়তই। এড়াত না।

প্রতিবেশী বাড়িগুলো মান্ধাতা আমলের। দেয়ালে দেয়ালে শ্যাওলা। জানালায় কাঠের পাল্লা। কিছু ভেঙে গেছে। কিছু ভাঙছে। ছাদগুলো ভাঙব ভাঙব করছে। প্রথম দেখায় অবাক হতে হয়, এখনো ভাঙেনি! বাড়িগুলো নিজেরাও অবাক হয় এই টিকে থাকা দেখে। শেষ হওয়ার পরও শেষ না হওয়া ভালো কিছু নয়। এ এক যন্ত্রণা। যন্ত্রণা বুকে নিয়েই ওরা দাঁড়িয়ে আছে। এ দিন একদিন ফুরোবে, এই আশায়।

বাড়িগুলোর মাঝখানের জায়গাটা ফাঁকা ছিল। ভরে উঠেছিল ময়লা-আবর্জনায়। কচুঘেচু বনগাছ দখল গিয়েছিল। আড্ডা বসত বেওয়ারিশ কনডম, ব্যবহৃত-অব্যবহৃত প্যাড, চিপসের প্যাকেটসহ সমমনাদের। মশা-মাছি আর রোগজীবাণুর অভয়ারণ্য হয়ে নিশ্চুপ ঘুমুচ্ছিল জায়গাটুকু। হঠাৎ সেখানে নড়েচড়ে উঠল জীবন। ইট-বালু-সিমেন্ট এলো। দু-মাস না যেতেই দাঁড়িয়ে গেল নতুন বাড়িটা। সাদা ধবধবে দেয়াল। মাঝে মাঝে জানালা। চৌকোনা থাই গ্লাসে মোড়া। নীলচে মুখোশে ঢাকা জানালাগুলো হাসতে থাকে। সবাইকে সে দেখে অথচ তাকে কেউ দেখে না – হাসির এটাই কারণ। জীর্ণ প্রতিবেশীদের দেখে ভেংচি কাটে। রোদ এলে ফিরে ফিরে যায় আলোর সংকেত হয়ে। সে-আলোয় ধাঁধা লাগে চোখে।

বিশেষণহীন হয়েও তাগড়া জোয়ান বাড়িটা তাই নজরে আসে। আসেই।

আপনারও আসত।

গল্পটা যদিও বাড়িটাকে নিয়ে নয়।

এর নায়ক একটি কাঠঠোকরা। সচল সাধারণ স্বাভাবিক একটি কাঠঠোকরা। বাড়িটার দিকে তাকালেই চোখে পড়ে।

আট ফ্ল্যাটের ওই নতুন দুনিয়া এখনো জমে ওঠেনি। ভাড়াটিয়া এসেছে তিনটাতে। আরগুলো খালি। খালিগুলোর জানালা বন্ধ। এমনই চোখ-না-ফোটা এক জানালায় দেখা পাখিটাকে। আপন মনে ঠক্ ঠক্ করতে থাকে। কাচের ওপর। এই শহুরে রোদে যেখানে পাখির ছায়াই বিরল, সেখানে কাঠঠোকরা! তাও আবার থাই গ্লাসে ঠোঁট কুটে মরছে! সকালের পর সকাল। বিকেলের পর বিকেল।  মাতাল না হলে এমন হয়?

তীক্ষè পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী আপনি। আপনার চোখে নিশ্চয়ই পড়ত ঘটনাটা।

এবং আপনার মনে হতো নিশ্চয় কোনো রহস্য আছে এর পেছনে।

এবং আবিষ্কার করতেন, আপনি চেষ্টা করছেন রহস্যটা ভেদ করতে।

তিন

জানালাটার বয়স কত হবে?

কতগুলো নতুন বছর যে জানালাটা গলে ভেতরে ঢুকেছে আর   পুরনো হয়ে বেরিয়েছে, তার হিসাব নেই। আমরা শুধু দেখি জং ধরেছে লোহার শিকগুলোয়। অনেক বছর ধরে থাকতে থাকতে জংগুলোর হাত লেগে গেছে। তাই কোনোমতে জড়াপিষ্টি করে আছে তারা। আলগোছে ধরে আছে ভেতরের ক্ষীয়মাণ লোহাটুকুকে। আলতো করে টানলেও হালকা হালকা পরতে ওঠে। হেলান দিয়ে দাঁড়ালে জংয়ের নকশা আঁকা হয় কাপড়ে। বাতাসেও ঝরে যায় কিছুটা। প্রতি সকালেই তাদের মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে দেখা যায় বাড়ির বউটাকে। ঝাড়– দিয়ে। সে-সময় মধুর সুরে একটা গান গায় মেয়েটা। বাড়িটায় থাকতে আর মন চাইছে না তার। কিন্তু তার অকম্মার ঢেঁকি বর কোনোভাবেই বাসা বদলায় না। পুরো শহরে এত কম ভাড়ায় এত ভালো বাসা নাকি নেই। ভাড়া একটা ছুতো। ওপরতলার ভাবির সঙ্গে তার জমে যাওয়া ভাবই আসল কথা। না হলে এই এতটা পথ পাড়ি দিয়ে ক্লাস করতে যায় তার বউ, এই ঘিঞ্জি ঘরে থাকে, এই স্যাঁতসেঁতে মেঝেয় হাঁটে, বর্ষায় মাছ ধরা যায় ঘরে, গরমে পোকামাকড় এসে আত্মীয়তা করে, ঠান্ডায় ভিজে যায় লেপ-তোশক, তবু কেন গা করে না সে? এই হলো গানের কথা। বাড়ির কর্তার ভাষায় এর নাম গ্যাজর গ্যাজর। কখনো কখনো ঘ্যানর ঘ্যানর। আজ সকালেও গানটা শুনেই ঘুম ভেঙেছে।

গান করতে করতেই ক্লাসে গেল বউটা।

বরটার কাজ আছে বাইরে; কিন্তু যাবে না। ঘ্যানঘ্যানানিতে ঘুমভাঙা দিন ভালো যায় না।

বারান্দায় এলো সে। জানালা বরাবর শুয়ে আছে একটা বিছানা। দুটো তোশক। একটা বেডশিট। দুটো বালিশ। তেল চিটচিটে ভাবটা তার কালও ছিল। ধুয়ে দিয়েছে বউ। বাতাসে আজ লেবুর সুবাস। গন্ধটা আরেকবার টেনে নিয়ে গা এলিয়ে দিলো। হাতে পত্রিকা। বালিশের পাশেই কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স।

পড়তে পড়তে তার মনে হলো কিসের যেন আওয়াজ আসছে নতুন বাড়িটা থেকে। ভাড়াটিয়া এলো নাকি? চোখ বাড়াল সে। এবং অবাক হলো। একটা কাঠঠোকরা, কাচ ঠুকছে! কোনোদিকে খেয়াল নেই। ঠুকেই যাচ্ছে।

এটা তো অস্বাভাবিক! কী হয়েছে পাখিটার?

ভাবতে থাকল সে।

তার মনে হলো প্রেমের বিয়ে কাঠঠোকরাটার।

ছাত্রজীবনেই সঙ্গী হয়েছে দাম্পত্য। গরিব ঘরের সন্তান। টিউশনির অল্প টাকায়, কাঠের চাকায়, নিজেরই ঠিকমতো চলে না, চালাতে হয় মাকেও। তার ওপর সোনার ডিম পাড়া বড় টিউশনিটা হাতছাড়া হলো ছাত্রীটাকে ঘরে তোলার কারণে। ফলে আবেগটা থিতিয়ে যাওয়ার পর তার ওপর কষ্টের বুদবুদ আর হতাশার যে-সর জমে তার আড়ালে ঢাকা পড়ে জীবন। বড়লোক বাবার বড় মেয়েটা তার বউ, যে কি না সব ছেড়ে তার ছায়া হয়েই উড়াল দিয়েছে এবং বয়সে ছোট, তাই দেহ-মন চিন্তা অপরিণত এখনো, তাই হাঁপিয়ে উঠেছে। ফলে লেগেই থাকে খিটিমিটি। জীবনটা দুজনের গলাতেই ফাঁস হয়ে ওঠে, তা না যায় খোলা, না যায় আটকানো।

কিন্তু রোদ থাক না থাক দিন পার হয়ই। রাতও।

পড়া শেষ হয়েছে পাখিটার। কিন্তু চাকরি হচ্ছে না।

জীবনধারণ জটিল হয়ে গেছে বড়। আগে যেখানে-সেখানে খাবার মিলত। এখন সব মালিকানায় চলে। কিনতে হয়।

বউয়ের পড়া শেষ হয়নি। তার খরচ আছে। সঙ্গে খাওয়া-পরা আর বাসাভাড়া। পাহাড় হয়ে দাঁড়ায় সামনে। অথচ টিউশনিই সম্বল তার। চলছে তাই না চলার মতো।

কিন্তু কীই-বা করার আছে আর? আশার পায়ে ভর দিয়ে হাঁটা ছাড়া? প্রতিদিনই চাকরির সন্ধানে যায় সে। আর ফিরে আসে। আর যায়। আর আসে। জোটে না। এক ভোরে এক সাক্ষাৎকারের স্বপ্ন দেখল সে। চাকরিটা হয়েই যাচ্ছ এমন সময় বাগড়া বাধল। চাকরিদাতা বললেন, যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। ভাঙতে হবে তার ঘরের জানালাটা। পারলে তার চাকরি।

লেখাপড়ায় ভালো ছিল বরাবরই। ব্যবহারিক পরীক্ষার ফলও ভালো। কাঠ তার কাছে শোলা। শুধু যোগ্যতায় হয় না বলেই চাকরি হয়নি আজো। কিন্তু এ কেমন পরীক্ষা! কাচের জানালা কীভাবে ভাঙবে সে?

তবু। চেষ্টা করতে দোষ কী?

তাই লেগে পড়ে কাজে। বীরবিক্রমে ঠোকরাতে থাকে। কিন্তু কাচ ভাঙে না, ভাঙে ঘুম।

সেই থেকে স্বপ্নটাকেই তার সত্য মনে হয়। মনে হয় কাচটা ভাঙলেই তো চাকরি। অন্যান্য চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে তাই এটাও চলে। নিয়ম করে। কখনো সকাল। কখনো বিকেল। দিন যায়। মাস যায়। কিন্তু ভাঙে না জানালাটা। তবু হাল ছাড়ে না সে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিখেছিল যার যত শব্দ, তা ততই হালকা। কাচটার আওয়াজ শুনে সাহস পায় তাই। আর ঠোকর মারে।

তাই কি? এটাই কি কারণ ওই পাগলামির?

ভাবনাটা আর এগোল না।

মেঝেতে খবরের কাগজ পাতা। তাতে সাজানো তার বই। তার মধ্যে একটা ইঁদুর ঢুকতে দেখা গেল। তাড়াতে হবে। নইলে একটা  বইও আস্ত রাখবে না।

ইঁদুর তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ছেলেটা।

 

চার

ওই দালানেরই দ্বিতীয় তলার কথা।

আগেরটার মতোই জানালা। কাঠের পাল্লা। লোহার শিক। গরাদের মতো। লম্বালম্বি দাঁড়িয়ে আছে। সামনে কেউ দাঁড়ালে বাইরে থেকে কয়েদি মনে হয়।

এ-মুহূর্তে একজন বসে আছেন জানালাটার সামনে।

একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন ভদ্রলোক।

বউ পোয়াতি। আট মাস চলছে। বাপের বাড়ি আছে।

আজ ছুটির দিন না। কিন্তু ইচ্ছে করছিল না যেতে। তাই যাননি অফিসে। অসুস্থ বলে থেকে গেছেন।

এই যুগে অফিসই ঘর। ঘরই অফিস। কাজ থাকেই।

কিছু কাজ বাকি আছে। করতে হবে। ল্যাপটপটা চালু করলেন। শুরু হলো কাজ। হঠাৎ খেয়াল হলো অনেকদিন কিছু দেখা হয় না। তার সংগ্রহ ভালো। বেছে বেছে একটা চালিয়ে দিলেন। বাসায় কেউ না থাকলে এ এক সুবিধা। উপভোগ করা যায় সময়টাকে।

যেভাবে খুশি সেভাবে। যখন খুশি তখন।

আয়োজন সম্পন্ন। এবার ডুব। দেবেন দেবেন করছেন। এমন সময় খেয়াল করলেন কাঠঠোকরাটার আওয়াজ। মনোযোগ        দিলেন সেদিকে। আগের ছেলেটা, আপনি এবং আমি অবাক হয়েছি। তারও হওয়ার কথা। হতেনও। কিন্তু নতুন বাড়িরই নিচতলার একটি   জানালা সুযোগটা দিলো না।

জানালা বরাবর ড্রেসিং টেবিল। তার সামনে ও-বাড়ির মেয়েটা। নিজেকে আবিষ্কারে মত্ত। এদিকে ঘুরছে। ওদিকে ঘুরছে। এটা ধরছে। ওটা মাপছে। চোখদুটো আয়নায়। আয়নাটাতে নেচে যাচ্ছে তার ছায়া। ছায়াটার পায়ে জুতো নেই। হাতে চুড়ি নেই। গলায় হার নেই। পোশাক নেই পরনে। সব ছাড়াও ছায়াটা এত সুন্দর! এত রূপসী! অবাক হয়ে তাই দেখছে ছায়ার অধিকারী দেহটা। আশ মিটছে না তার। বারবার দেখছে।

হঠাৎ থামল সে। কী যেন ভেবে ঘুরে তাকাল।

এ-বাড়ির ভদ্রলোক তখনো হাঁ। চোখ ঠিকরে আছে তার।       গোগ্রাসে উপভোগ করছেন কচি দেহটার নড়াচড়া। অকস্মাৎ ওই দৃষ্টির আঘাত তিনি প্রত্যাশা করেননি। অপ্রস্তুত হলেন। চোখ ফিরিয়ে নিতে পারলেন না। ধরা পড়লেন। একটু কি লজ্জা তাতে পেলেন? বোঝা গেল না।

মেয়েটার রং কিন্তু বদলে গেল। মনে হলো তার মাথাটা কাটা গেছে। লজ্জায়। কিছুই অনুভব করতে পারছে না সে। কিন্তু আড়াল যে নিতে হবে, সেটা বুঝল।

খুব গরম বোধ হচ্ছিল এ-বাড়ির কর্তার। ঠান্ডা হওয়া দরকার। একটু ভেজা দরকার। ভিজবেন। কিন্তু মনোযোগ হারালেন। আবার। রিংটোন বাজছে।

একটা গালি দিলেন। গালিটা দেখা যায় না কোনোভাবেই।

ফোন করেছেন তার বস।

 

পাঁচ

কিসের যেন আওয়াজ। ঘুম ভেঙে গেল। আওয়াজের উৎস খুঁজতে বাইরে তাকালেন ভদ্রলোক।

ঠক্ ঠক্ ঠক্।

ঠক্ ঠক্ ঠক্।

কাঠঠোকরা।

অসময়ে অজায়গায় পাখিটাকে দেখে খুব আগ্রহ বোধ করলেন তিনি।

কতদিন গ্রামে যান না। কোনো পাখি দেখেন না। কাঠবিড়ালি দেখেন না। পানকৌড়ি দেখেন না। কতদিন! পাখিটাকে খুব আপন মনে হলো। শৈশবের মতো।

আরেকটু ভালোভাবে দেখতে চাইলেন তাই; কিন্তু ক্ষমতা নেই। যে-হাত দিয়ে জানালাটা খুললেন, সেটা কাঁপছে। জানালার পাশে দাদুভাইর পরীক্ষার রুটিন সাঁটা। চোখ পড়ল। স্পষ্ট দেখতে পেলেন না। সবকিছু ঝাপসা। চশমাটা ও-ঘরে। নিয়ে আসতে আসতে যদি উড়ে যায় পাখিটা! তাই গেলেন না। আনলেও লাভ হতো না। পাওয়ার ঠিক নেই। দেখা যায় না ঠিকমতো।

চশমার চিন্তা বাদ দিয়েই তিনি দেখছেন পাখিটাকে। অস্পষ্ট লাগছে। তাতে কী? চিন্তা করতে পারলে দেখতে পারতে হয় না। ভাবলেন।

মনে হচ্ছে পাখিটার একটা ছেলে আছে।

ছেলেটা খুব ভালো কাঠ ঠুকতে পারে। চাকরি করে একটা কোম্পানিতে। কোম্পানিটা বাসা বানায়। অন্য পাখিদের জন্য। তার বেতন ভালো। কিন্তু উন্নতি হচ্ছে না। বাবার অসুখ। মার অসুখ। ছেলে পড়ছে। বউ আবার পোয়াতি হয়েছে। কাজে যেতে পারে না। চিকিৎসার খরচ আছে। অন্যান্য ব্যয় আছে। সব মেটাতে হাবুডুবু হাবুডুবু।

একটা কোচিং আছে তার। বাসার ডালে অফিস। কাজ থেকে ফিরে কোচিংয়ে যায়। গোটাপাঁচেক তরুণ কাঠঠোকরা পড়তে আসে। স্যার হিসেবেও ভালো সে। দারুণ করে পড়ায়। কীভাবে কাঠ ঠুকতে হয় পড়ায়। কীভাবে উড়তে হয় পড়ায়। কীভাবে হাসতে হয় পড়ায়। কীভাবে কষ্ট গোপন করে ভালো থাকতে হয় পড়ায়।

পড়ানো শেষে বাসায় ফিরে আবার পড়ায় :

বাবাকে। কীভাবে ওষুধ খেতে হয়। কীভাবে চশমার কাচ মুছতে হয়। কীভাবে চলতে হয়!

মাকে। কীভাবে ছানা পাখিদের কোলে নিতে হয়! বড় করতে হয়!

বউকে। কীভাবে খাবার তৈরি  করতে হয়! শ্বশুর-শাশুড়ির মধ্যে কীভাবে খুঁজে নিতে হয় বাবা-মাকে।

তারপর খায়। তারপর শুতে যায়। তখন তার বড় ছেলেটা তাকে পড়ায়। বাতাসে কিসের গন্ধ থাকলে ঝড় হয়। কোন তারা কোথায় থাকলে ভোর হয়। কোন গাছের ছাল শক্ত কিন্তু কাঠ নরম। তার কোন স্যার সবচেয়ে ভালো। কোন ম্যাডামটা বেশি সুন্দর। ইত্যাদি। পড়তে পড়তে ঘুম আসে তার। ঘুমিয়ে যায়। তারপর রাত গভীর হয়। তারপর ফ্যাকাশে হয়। তারপর সকাল। তারপর কাজে যায় সে।

যায়, বিকেলে ফেরার আশায়।

যায়, ওষুধ নিয়ে আসবে বলে।

যায়, বাইরে গেলে ঘরে ফেরা নিয়ম বলে।

দিনশেষে ফিরেও আসে।

আবার পড়ায়। আবার ঘুমোয়। আবার ওঠে। আবার যায়। আবার আসে। আবার যায়।

একদিন হোঁচট খায় নিয়মটা। ফেরা হয় না তার।

ফেরা হয় না পরের দিনও।

তার পরের দিনও।

তার পরের দিনও।

ফেরে না সে।

তার বাবা, মানে ওই কাঠঠোকরাটা, চিন্তায় পড়ে যায়। ছেলে তার আসে না কেন। ওষুধ শেষ। তার মা, মানে কাঠঠোকরাটার বউ, চিন্তায় পড়ে। ছেলে তার আসে না কেন। বাত বেড়েছে।

তার বউ, মানে কাঠঠোকরাটার ছেলের বউ, চিন্তা করে। স্বামী তার আসে না কেন। খাবার নেই। তার ছেলে, মানে ওই কাঠঠোকরার নাতি, চিন্তায় পড়ে। কাল পরীক্ষা। বেতন নাকি। বাবা তার আসবে কবে।

কী হলো তার? কোথায় গেল? এমন কেন? কেন আসে না?

সব চিন্তা বোঝা হয়। আশ্রয় নেয় কাঠঠোকরাটার মাথায়। অচল পাখি সে। পাখা মেলতেই হাঁপিয়ে ওঠে। তবু প্রতিদিন বের হয়। খুঁজে আসে ছেলেকে। পায় না।

একজনের কাছে জানতে চায়। দেখো হয়তো পেট্রল বোমায় পুড়েছে। সে বলে।

আরেকজনের  কাছে জানতে চায়। দেখো কেউ কুপিয়েছে কি না। সে বলে।

আরেকজন বলে অন্য কথা। দেখো মাদক বেচার দায়ে পুলিশে ধরেছে কি না।

দেখো গুলিতে মরল পড়ল কি না। শিশুহত্যার দায়ে গণপিটুনিতে মরল কি না। গুম হলো কি না। আরেকটা বিয়ে করে পালিয়ে গেল কি না।

সবাই যার যার মতো সমাধান দেয়। কিন্তু ছেলে তার ফেরে না।

তাই আবার বের হয়। পায় না।

আবার বের হয়। পায় না।

বাবার বুক ছিঁড়ে যায়। মার বুক ছিঁড়ে যায়। বউয়েরও। আর কারো কিছু হয় না। না প্রতিবেশীদের। না পথচারীদের। তাদের যেন বুকই নেই! কাঁপবে কী! অথবা পাখিটা যেন কেউ না। তার জীবনের কোনো দাম নেই। তার থাকা-না-থাকার কোনো গুরুত্ব নেই! এ কেমন সময়! অবাক লাগে বাবার।

একদিন বেরিয়েছে বাবা পাখিটা। ছেলের কারখানায় যাবে। কিন্তু ঠিকানা জানে না। উড়তে উড়তে এদিকে চলে এসেছে। যাওয়ার সময় থামল নতুন বাড়িটা দেখে। বাকশোর মতো বাড়ি। সাদা। গায়ে খোপ খোপ। খোপগুলো নীল। এমনই এক নীল খোপের ভেতর ছেলের দেখা পাওয়া গেল। কিন্তু এ কি? ছেলেটা যে বুড়ো হয়ে গেছে! তার মতো। তার পাখনা তার পা তার চোখ তার ঝুঁটি সব তো তার মতো। তার মতো করে উড়ছে। তার মতো করে ডানা ঝাপটাচ্ছে। কী করে হলো! এই কদিনে!

এত চিন্তার সময় এখন না। ওকে বের করতে হবে আগে।

সেই থেকে ঠুকরিয়ে যাচ্ছে সে। ভেতর থেকে ছেলেও ঠোকরাচ্ছে। তার মতো করেই। দেখছে সে। কিন্তু দেয়ালটা ভারি শক্ত। ছিদ্র হচ্ছে না। হাল ছাড়ার পাত্রও সে নয়। ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে। যদি না পারে? যদি সে দমবন্ধ হয়ে মরে?

এটুকু ভেবেই পড়ে গেলেন লোকটা। জানালার একটা শিক ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেটা খুলে গেছে বলেই পড়ে গেছেন। উঠতে হবে তাকে। কাঠঠোকরাটার কী হলো জানা দরকার। কিন্তু মাথা তুলতে পারছেন না। চোখজুড়ে অন্ধকার।

 

ছয়

পাখিটার সমস্যা গুরুতর।

চাকরি করে সে। করে তার সঙ্গীও।

সংসার দেখে সে। দেখে তার সঙ্গীও।

তার বাবা-মা গরিব। গরিব তার সঙ্গীর বাবা-মাও। সবাই থাকে গ্রামে।

তার সঙ্গী তার মা-বাবার খরচ দেয়। কিন্তু সে দিলে দোষ। নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কিছুই করা যাবে না।

সঙ্গীটা তার যখন-তখন বাইরে যায়, যখন-তখন আসে, যার-তার সঙ্গে মেশে। ঠিক আছে। কিন্তু তার কাজ একটু দেরিতে শেষ হলে বা মেঘ করলে বাসায় ফিরতে দেরি হলে, হতেই পারে, বা অফিসের কোনো আয়োজন তার বিলম্ব ঘটালে, টেকা যায় না। চাকরিটা তাই ছেড়ে দিতে হলো! কারো সঙ্গে কথা বলা যাবে না। হাসা তো যাবেই না। তার কোনো বন্ধু বা বান্ধবী বা আত্মীয় বাসায় আসতে পারবে না।

না।

হুট হাট করে বাসায় চলে আসে সঙ্গীটা। খুঁজে দেখে কেউ আছে কি না! সন্দেহ সারাক্ষণ।

কিছু হলেই বাপ-মা তুলে গালাগাল। বাবা-মা গরিব বলেই হয়তো।

সহ্য হয় না এই কারাগার জীবন। বুক ভেঙে যায়।

ভালো লাগে না কিছুই। মন বসে না। বাড়ির কথা মনে পড়ে। ছোট ভাইটার কথা মনে পড়ে। খেতে বসলেই মনে হয় ওরা না খেয়ে আছে। পরতে গেলেই প্রশ্ন জাগে ওরা পরছে কী? মাখতে গেলেও চিন্তা হয়। কিন্তু কিছু করতেও পারছে না। দুই ডানা বাঁধা। প্রিয় টিং টংয়ের কথা মনে পড়ে। পড়ে আছে গ্রামে।

কত স্মৃতি কত কথা কত খুশি মেঘে মেঘে আঁকা হয়, ও দেখে। ছুঁতে পারে না। তাই বৃষ্টি ঝরে চোখে।

টিংটংয়ের সঙ্গে ঘর হলে নিশ্চয় এমন হতো না। মনে হয় ছুটে যায় তার কাছে। মানুষ যদি হতো, হেঁটেই পাড়ি দিত হাজার মাইল, বাড়ি চলে যেত।

কিন্তু পারে না। কাজে যাওয়ার সময় বাসা বন্ধ করে যায় সঙ্গীটা!

কথা বলা যায় না। বের হতে পারে না। পাখিটা তাই মাথা কুটে মরে। কাচের দেয়ালে।

ভাবছিল একটি মেয়ে। আগের বাড়িটার পাশের বাড়িতে বাস তার। বাড়িটার অবস্থা বেশ ভালো। আগেরটার মতো পুরনো নয়। জানালার শিকে জং নেই। আছে রঙের নকশা। সেই নকশার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল মেয়েটাকে। রঙিন পোশাকে ঢাকা শ্যামলা রঙের গা। মুখটা বেজার। চোখটা আরো বেজার। বেজার সেই চোখদুটোয় কাঠঠোকরাটার ছায়া নাচছিল। আর সে ভাবছিল পাখিটার কাহিনি।

ভাবতে ভাবতে থামল মেয়েটা। পাখিটা মাথা কুটছে না, কুটছে ঠোঁট। শুধরে নিল। তাছাড়া বের হতে না পারাটাও ভুল। পাখিটা জানালার বাইরে থেকেই ঠোকরাচ্ছে। গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছে হলে সে তো যেতেই পারে। তার মানে ঘটনা অন্য। কী হতে পারে? সেটা খোঁজার সুযোগ সে পেল না। চুলায় দুধ ছিল। পোড়া লেগেছে। গন্ধ ছুটেছে। ছুটতে হলো তাকেও।

 

কয়েকবার পড়লাম গল্পটা। ইনিয়ে-বিনিয়ে। বুঝলাম না কিছুই! কিন্তু ও নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। কাজ ছিল। করলাম। একটু ঘুরলাম শহরটাতে। বিকেলে চেক আউট করলাম। বাড়ি ফিরব। বাসস্ট্যান্ডে দেখা হলো বন্ধুটির সঙ্গে! কাল থেকে অপেক্ষা করছে আমার জন্য! কী এক ঝামেলায় আটকে গিয়েছিল। তাই আসতে পারেনি সময়ে। তারপর থেকে ওঠেনি আর। যদি আমি আসি! কী গাধামিটাই না করেছি।

ফেরা হলো না। যা হোক। বন্ধুর বাড়ি শহরের কাছেই। নতুন গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকায়।

চমৎকার বাড়ি! আধুনিক ফিটিংস। পরিবারটাও দারুণ। বোনটা তো আপু আপু করে পাগল করে তুলল। একটা ঘর দেওয়া হলো আমাকে। তিনতলায়।

দুদিন ছিলাম।

দুদিনই দেখেছি একটা কাঠঠোকরা ঠোকরাচ্ছে আমার জানালার কাচ। ওই গল্পের মতো করে! আগে থেকেই কি ঠোকরায়? জিজ্ঞেস করেছিলাম। না। সেদিনই প্রথম দেখল ব্যাপারটা। সবকিছু খুব অদ্ভুত ঠেকল আমার কাছে। কিন্তু কোনো বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তা করলে সেটা পেয়ে বসে। তাই পাত্তা দিলাম না।

তবু রেহাই নেই।

বাড়ি এলাম যেদিন, তার পরদিন বিকেল থেকে আমার জানালায়ও তার দেখা মিলছে। প্রথমে শুধু ঘুরত। উড়ত। এখন ঠোকরায়!

যখন খুশি, তখন। প্রতিদিন।

বছর ঘুরতে চলল, কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

এবং এ-কারণেই কিনা জানি না। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। সম্ভবত।

যেখানেই থাকি, যতদূরেই থাকি, ঠক্ ঠক্ আওয়াজটা শুনতে পাই। বুকে ব্যথা হয় ঠোকরের তালে। মনে হয় প্রতিটা ঠোকর পড়ছে আমার বুকে। কাচে নয়।

বিশ্বাস করছেন না, তাই না? দোষ দেবো না আপনাকে। আমার বর বিশ্বাস করেনি। পরিবার করেনি। প্রতিবেশী না, ডাক্তারও না। অথচ আমি এখন বাড়ি নেই। আছি অনেক দূরে। আপনার কাছে।

এই যে শুনুন। ঠক্ ঠক্ আওয়াজটা! শুনতে পাবেন।

একটু খেয়াল করুন!

শেয়ার করুন

Leave a Reply