ডিসেম্বর ২০২৫-এর প্রথম সপ্তাহে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হলো ‘শান্তির সন্ধানে’ শীর্ষক এক দলীয় চারুকলা প্রদর্শনী। শিল্পী মো. কাইমুল ইসলামের কিউরেটিংয়ে এটি কালার্সের দ্বাদশ চারুকলা প্রদর্শনী।
সহপাঠী আটজন নারীশিল্পীর গ্রুপ কালার্স প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১৫ সালে। প্রতিষ্ঠার দশ বছরে বারোটি প্রদর্শনীর আয়োজন গ্রুপটির সচলতা, সরবতা ও ক্রমঅগ্রসরমান সৃজনশীলতার পথে যাত্রার পরিচায়ক।
বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। দেশে চারুশিল্প-শিক্ষার বিস্তার লাভের পাশাপাশি সৃজনশীল শিল্পচর্চা বাড়তে থাকে।
এ-সময় আমাদের নারীশিল্পীরাও নিজেদের সৃজন-আয়োজন নিয়ে অধিকমাত্রায় ক্রিয়াশীল হয়েছেন। আমরা এ-সময়
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দলীয় চারুকলা প্রদর্শনী আয়োজনের ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। কালার্সের প্রতিষ্ঠা এই প্রবণতারই একটি লক্ষণ। তবে আশার কথা, এই গ্রুপটির বয়স দশ বছর হলেও তারা নিরন্তর সৃজনপথ চলার প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে চলেছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, দশ বছরে তাঁরা কতদূর এগোতে পারলেন। সবক’টি না হলেও আমি তাঁদের কয়েকটি প্রদর্শনী দেখেছি। ফলে, আমার দেখার চোখ ও অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছে, শুরু থেকে এ-পর্যন্ত দলটির শিল্পীদের কাজের গুণগত মানে বেশ উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অগ্রগতি আছে তাঁদের কাজের ক্র্যাফটসম্যানশিপে, পাশাপাশি দলটির সদস্যদের চিন্তা ও মননের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবণতা খানিকটা বেড়েছে।
এবার কালার্সের আট শিল্পীর উল্লিখিত প্রদর্শনীর কাজ ও ভাবনা নিয়ে কথা বলতে চাই।
ফারহানা আফরোজ বাপ্পি এই দলের অন্যতম একজন চিত্রকর। মাস দুয়েক আগে ঢাকায় দ্বীপ গ্যালারিতে তাঁর একক চিত্রপ্রদর্শনী হয়েছে। একদিন তাঁর কাজগুলো দেখে এসেছি।
প্রতিনিয়ত নিরীক্ষায় নিমগ্ন এই শিল্পীর চিত্রকর্মে আমরা দেখতে পাই জ্যামিতিক ফর্ম নিয়ে নিজের চিত্রপটে তিনি এমন ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করেছেন ফর্ম, বর্ণ আর আলোছায়ার মায়াবী প্রক্ষেপণের সম্মিলনে, যা শিল্পবোদ্ধা দর্শকদের চোখ ছুঁয়ে হৃদয়গ্রাহী করে। অংকন ও মাধ্যমের কুশলী প্রয়োগ তাঁর সাম্প্রতিক কাজে আমরা প্রত্যক্ষ করছি। ‘জলবিন্দু-১’ শীর্ষক শিল্পকর্মে অ্যাক্রিলিক রঙের ব্যবহার প্রায় জলরঙের মতো বর্ণপরম্পরার আবহ সৃষ্টি করেছে। তাঁর বেগুনি-নীল রঙের প্রয়োগে যে কাব্যিক অনুভূতি এসেছে তা বোদ্ধা দর্শকদের চমৎকৃত করেছে।
ফারজানা ইসলাম মিল্কী ভাস্কর। মেটাল দিয়ে মানুষ ও অন্য প্রাণীর শরীরী অভিব্যক্তি সহজ-সরলভাবে তুলে ধরেন তিনি। ভাস্কর্যশিল্পে গভীর অভিনিবেশের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর সাম্প্রতিক সৃজনে। উল্লেখ্য, আকারে বড় না হলেও গড়নকৌশল ও উপস্থাপনার দক্ষতায় ফারজানা মিল্কীর শিল্পকর্মে ভাস্কর্যের মনুমেন্টাল অনুভূতির সঙ্গে অভিব্যক্তির রসবোধ মিলিয়ে অতুলনীয় এক রূপ তৈরি হয়।
মাধ্যমগত নিরীক্ষাও এই ভাস্করের শক্তির বড় দিক। আগে মেটালে কাজ করলেও তাঁর সাম্প্রতিক কাজে মাধ্যম হিসেবে স্থান নিয়েছে কাগজ। ব্যয়ের বাহুল্য কমেছে, তবে মেটাল ভাস্কর্যের ওজন, গড়নের গভীরতাও যেন অন্তর্হিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
মনিরা সুলতানা মুক্তা পাঠ নিয়েছেন মৃৎশিল্পে। শিক্ষাজীবনের শেষদিকে তাঁর তরুণ বয়সেই একাধিকবার মৃৎশিল্পের একক প্রদর্শনী হয়েছিল। এরপর
সংসার-সন্তান সামলে সৃজনকলাচর্চায় মুক্তার ফেরা সম্ভব হয়েছে কালার্সের তাগিদে।
মাধ্যমগত বৈচিত্র্যর দিক থেকে মৃৎশিল্প কারুকলার বৃত্ত অতিক্রম করে ভাস্কর্য ও দৃশ্যশিল্পের অবস্থানে জায়গা নিয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই মুক্তার কাজে। পোড়ামাটির ফলকের সঙ্গে সুই-সুতার প্রয়োগ করে তিনি নারী-অবয়বের নির্মিতি ঘটিয়েছেন। তাঁর ‘যমজ’ শীর্ষক কাজে এই সাহসী নিরীক্ষা মৃৎশিল্পকে দেয়ালচিত্রে তুলে আনার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাকে শক্তি জোগাবে।
রেবেকা সুলতানা মলি বিশেষ একটি ফর্ম ও মোটিফ ব্যবহার করে দক্ষ অংকন ও অলংকরণে নারী-অবয়বের সৌন্দর্যের মায়াজাল সৃষ্টি করে চিত্রনির্মিতির নিজস্ব একটা রীতি তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন। তাঁর কাজের জায়গা টেক্সটাইলের শিক্ষার্থীদের নকশা শেখানো। সেই আলংকারিক নান্দনিকতার সংশ্লেষ তাঁর চিত্রপটে দেখে আমাদের মন ভরে যায়।
মলি তাঁর সাম্প্রতিক কাজে ইতিপূর্বের সৃষ্টিকর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিজেকেই যেন ছাড়িয়ে গেছেন – চিত্রপটে ডিটেইলস আর রঙের বর্ণিলতাকে জুতসই প্রয়োগের কুশলতায়।
দলের আটজনের অন্যতম রেহানা ইয়াসমিন মৃৎশিল্পে পাঠ নিয়েও নিজের শিল্পবোধ ও কৃৎকৌশলে তাঁর সৃজনকে ভাস্কর্যের কাতারে স্থাপন করেছেন। বিষয় নির্বাচনে, কম্পোজিশনে, উপস্থাপনায় তাঁর কাজ দর্শকের কাছে বেশ গ্রহণীয় হয়। ‘পরিবার’ শিরোনামের শিল্পকর্মে দর্শক দেখতে পান শান্তির প্রতীক এক কপোত পরিবারের, যারা বদ্ধ জানালায় নানা ছন্দময় ভঙ্গিমায় ক্রীড়ারত। কপোত পরিবারের গতিময় গড়ন ও পেলব উপস্থাপনা কঠিন পোড়ামাটিতে প্রাণের স্পন্দন জাগিয়েছে।
রিফাত জাহান কান্তার কাজ আপাত সহজ-সরল উপস্থাপনা মনে হলেও দর্শক যখন তাঁর কাজে মনোযোগী হন, চিত্রের ভেতরে দৃষ্টির স্থিতিতে তাঁরা আবিষ্কার করেন – সবিস্ময়ে তাঁরা একে একে দেখতে পাবেন মনোক্রোম বর্ণে সূক্ষ্ম ডিটেইলসের রহস্যময় বিস্তার। আর ক্যানভাসের কেন্দ্রে উজ্জ্বল বর্ণ লেপনে বিরাট করে আঁকা গন্ধরাজ ফুলের বাস্তবানুগ উপস্থাপন, এ যেন অবচেতন মনের প্রায় রংহীন ঘোরের পর বিস্তৃত এক রঙের বাগান দেখার বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা।
বছর কয়েক আগে থেকেই কান্তার চিত্রপটে দেখছি বড় করে দেখানো ফুল, পাখির অবয়ব আর অলংকরণের কাজে তাঁর আগ্রহসঞ্জাত দক্ষপ্রয়োগ। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সব মিলে তাঁর আঁকা চিত্রকর্মকে অলংকার ভারাক্রান্ত মনে হয় না!
শায়লা আখতার আধা-বির্মূত ও প্রকাশবাদী বির্মূত ধারার চিত্রকলা চর্চা করেন। কালার্সের সর্বশেষ প্রদর্শনীর শিরোনাম যখন ‘শান্তির সন্ধানে’, তো একে দর্শকের সামনে প্রকাশমান করতে, আধা-বাস্তবানুগ ফর্মে তাঁর চিত্রপটকে সাজিয়ে মেলে ধরেছেন শান্তির প্রতীক উড়ন্ত কপোত। আর এর প্রেক্ষাপটে গভীর নীলচে কালো রঙের লেপন। শিল্পীর নীলচে কালো রঙের এই প্রয়োগ বোধ করি চলতি সময়ে দেশের অনিশ্চয়তাকে প্রতীকায়িত করেছে।
শারমিন সিরাজী দীর্ঘকাল ধরে দেশের বাইরে আছেন। প্রবাসে থেকেও তিনি বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশকে স্মরণ করেন।
উল্লিখিত প্রদর্শনীতে তাঁর শিল্পকর্মে বাংলা প্রকৃতিতে সহজলভ্য ফুল, বিশেষ করে নানা বর্ণের শাপলা দেখতে পেলাম। প্রদর্শিত চিত্রকর্মে শারমিন তুলে ধরেছেন জলাশয়ে প্রস্ফুটিত শাপলা ও রক্তপদ্ম। শারমিনের গতিশীল তুলির আঁচড় ও পরিমিত উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার উনিশ শতকের প্রতিচ্ছায়াবাদী চিত্রকর্মের কথা মনে করায়। তাঁর আত্মবিশ্বাসী স্ট্রোক ও রঙের মনোহর প্রয়োগ দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। গত ৫ই ডিসেম্বর শুক্রবার শুরু হয়ে কালার্সের এ-প্রদর্শনী শেষ হয়েছে ১১ই ডিসেম্বর, ২০২৫, বৃহস্পতিবারে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.