ষোলো

দুই নারী

পুকুরের এ-ধারটায় জলের ওপর হাঁসের ছানার মতো ভাসছে একচাক হেলেঞ্চা। দুপুর হয়ে আসা রোদ পড়েছে হেলেঞ্চার গাঢ় সবুজ পাতায়। কোনো পাতা মুখ তুলে আছে আকাশের দিকে, কোনোটা উপুড় হয়ে জলের আয়নায় মুখ দেখে। গৃহস্থলোকের পছন্দের শাক। পচনধরা শোল, গজার বা শিং, টাকি মাছের সঙ্গে চচ্চড়ি করলে গরম ভাতের সঙ্গে খেতে ভারী স্বাদ।

পুকুরঘাটে এসে কমলরানী প্রথমেই তাকিয়েছে হেলেঞ্চার চাকটির দিকে। চাকের তলা থেকে মাথা বের করেছিল হাতখানেক লম্বা এক শোল মাছ। নিজের লাল চোখ দিয়ে জলের ওপর বুক বরাবর ভাসতে দেখল নারী মানুষের ছায়া। দেখে লেজে মৃদু আলোড়ন তুলে আর মৃদু একখানা বুড়বুড়ি কেটে গভীর জলের দিকে হারিয়ে গেল।

হেলেঞ্চার গা জড়াজড়ি করে আছে সামান্য বড় পাতার কলমি। আরেক শাক। এই শাকও পছন্দ করে খায় গৃহস্থলোক। কলমির ডগায় ডগায় ফুল ফুটেছে। আকাশের দিকে মুখ তুলে চৈত্রদিনের নির্মম রোদে মুচকি মুচকি হাসছে ফুলেরা। রোদের তেজ তাদের মø­ান করতে পারেনি। কলমি ফুলে উড়ছে লম্বা লেজের কয়েকটি ফড়িং। নির্জনতা এতই প্রগাঢ়, যেন ফড়িংয়ের ফিনফিনে পাখা নাড়ানোর অতি সূক্ষ্ম শব্দটুকুও কানে এলো কমলরানীর। চান করতে আসা মানুষটি, দেবু ঠাকুরের স্ত্রী হয়ে আসা মালখানগর বসুবাড়ির কন্যাটি যেন সেই নির্জনতার অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল।

এ কোথায় এসে পড়েছে সে! এ কোন জগৎ! যে-জগতে বিশাল এক বাড়ি নির্জনে পড়ে আছে। গাছ পুকুর ঝোপজঙ্গল রোদ হাওয়ার মাঝখানে একটুখানি আঙিনা। সাদা মাটির নিকোনো উঠোন। দক্ষিণে বড় ঘর। উত্তর ভিটিতে দোলন থাকে তার ঘরে। পুবের দোচালা ঘরটি রান্নার। বসত আঙিনাখানি দশ-বারো গণ্ডারও কম জায়গায়। বাড়ির বাকি জায়গা জুড়ে শুধুই গাছপালা ঝোপজঙ্গল। হঠাৎই কিছুটা খোলা জায়গা, আবার ঝোপ। মাঝখানে একটি পুকুর, পুবে আরেকটি, দক্ষিণে আরেকটি। বাঁশঝাড়ে দিনমান খুনসুটি করে হাওয়া। পাতারা নাচতে থাকে হাওয়ার তালে। পাখিরা মেতে থাকে গান আর নিজস্ব কোলাহলে। দিন নেই রাত নেই ঝিঁঝিঁ পোকারা ডেকেই চলেছে। ডেকে ডেকে ক্লান্ত পাখিরা একসময় পিঠে মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ে। বহতা হাওয়া বিরক্ত হয়ে হেঁটে চলে যায় অন্যত্র। তখন স্তব্ধতা, গাঢ় স্তব্ধতা। শুধু ক্লান্ত হয় না ঝিঁঝিঁ পোকারা, কীটপতঙ্গেরা। তারা শুধু ডেকেই যায়, ডেকেই যায়।

সারা বাড়িতে চারজন মাত্র মানুষ। দেবু ঠাকুর আর কমলরানী। দোলন আর প্রিয়নাথ। তখনো পর্যন্ত প্রিয়নাথই ছিল দেবু ঠাকুরের কম্পাউন্ডার।

এমন নির্জনতায় মানুষ বাঁচে কেমন করে?

মালখানগরের বসুবাড়িটি ছিল হাটবাড়ি। যে বিশাল বাড়িতে ঘরের পর ঘর, উঠোনের পর উঠোন, গৃহস্থের পর গৃহস্থ, শত মানুষের বসত এক বাড়িতে, সেই হচ্ছে হাটবাড়ি। হাটের মতো কোলাহল। ঝগড়াঝাটি, আনন্দ। গল্পগাছা হইচই। কান্না আর গালমন্দ আর উথলে ওঠা শোক আর অবোধ শিশুর মস্তকে চুম্বন গলাগলি করে থাকে। সেই বাড়িতে বড় হওয়া মেয়ে এমন নির্জন নিরিবিলিতে জীবন কাটায় কেমন করে! স্বামীকে তো তেমন পাওয়াই যায় না। সকালবেলার জলখাবার সেরে প্রিয়নাথকে নিয়ে বেরিয়ে যান রোগীবাড়িতে। প্রিয়নাথের হাতে ডাক্তারি ব্যাগ। ডাক্তারের হাতে ছাতা। দুপুরে ফিরে স্নান, আহার। ঘণ্টাখানেকের বিশ্রাম। তারপর আসতে থাকে রোগীরা। রোগী থাকতে থাকতেই আসে গ্রামের আড্ডাবাজ ইয়ার বন্ধুরা। যুবক পোলাপান আসে নানা দরকারে। তাদের বিদায়ের সঙ্গে রাত বাড়ে অনেকখানি। এইসব সময়ে সঙ্গী বলতে কমলরানীর শুধু দোলন।

তখনো পর্যন্ত কমলরানী বুঝে উঠতে পারেনি ঠাকুরের জীবনে এসে দিন-রাত্রির চার ভাগের তিন ভাগ সময় যে যুবতী নারীটির সঙ্গে তার কাটছে, সে-ই তার জীবনের কাল।

কমলরানী দাঁড়িয়েছিল পুবদিককার পুকুরঘাটে। এই ঘাটটা ঠাকুর, সে আর দোলন ব্যবহার করে। ধসেপড়া ঘাটলার শেষ ধাপে জলের তলায় দেখা যায় শ্যাওলার পোশাকে সেজে আছে নিচে নেমে যাওয়া অন্য ধাপগুলো। নামলে যখন-তখন পিছলে যাবে পা। এই বাড়ির বউ হয়ে আসার পর একদিনও জলে নেমে ডুব দেয়নি সে, সাঁতার কাটেনি। হাতে ধরা পিতলের লোটায় সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে জল তুলে স্নান করেছে। পায়ের হাঁটু অবধি নামানো থাকত শ্যাওলাধরা জলতলার ভাঙা ধাপে।

পুকুরের তিন দিকেই নিবিড় হয়ে আছে ঝোপজঙ্গল। বাঁশঝাড় আছে। হিজল বরুন, কদম তেঁতুল, আম জামের গাছ। তাল, খেজুরের গাছও আছে কয়েকটি। বুনোলতা সাপের মতো বেয়ে উঠেছে বড় গাছগুলোতে। তালের উবু হয়ে থাকা পাতার পিঠে একজোড়া ঘুঘু পাখি বসে, পুরুষটা গলা আর পিঠ ফুলিয়ে নারীটির চারপাশে ঘোরে, সঙ্গিনীকে বাগে আনার চেষ্টা করে।

কোথাও কোনো মানুষের ছায়া নেই। তবু স্নান সেরে ঘাটপাড়ে দাঁড়িয়েই বসন বদলাতে লজ্জা করে তার। ঠাকুরের নতুন বউ, মানুষ না হোক গাছপালা তো তাকে বসন বদলাতে দেখবে, আকাশ আর রোদ দেখবে, মেঘের ছায়া আর চৈতালি দিনের হাওয়াটুকু দেখবে। ফুটে ওঠা বুনোফুলেরা দেখবে! হেলেঞ্চার চাকের তলায় লুকিয়ে থাকা শোল মাছটাও কি দেখবে না! পাখিরা দেখবে, ফড়িং আর ভ্রমরেরা দেখবে!

লজ্জা! লজ্জা!

বাড়ি এসে ভেজা বসনেই ঘরে ঢুকে যায় কমলরানী। ভেজা বসন বদলে হলুদ গাঁদা ফুলের পাপড়ি রঙের শাড়ি পরে। সঙ্গে লাল রঙের ঘটিহাতা ব্লাউজ। শাড়ির কুচিতে ফুটে ওঠে বসুকন্যার আভিজাত্য। লম্বা চুল গ্রীবার কাছে নতুন গামছায় জড়ানো। ভেজা মুখখানি বৃষ্টিস্নাত পান পাতার মতো।

কমলরানী তারপর আবার যায় পুকুরঘাটে। ভেজা বসন ধুয়ে এনে উঠোনের তারে অলস ভঙ্গিতে মেলে দিতে থাকে। মুখে প্রশান্তি। স্বামী সহবাসে উৎফুল্ল­ শরীরের আনাচকানাচ। উঠোনে ফেলা পা দু’খানি যেন আনন্দের আতিশয্যে মাটি স্পর্শ করছে না। রক্তজবা রঙের ঠোঁটের কোণে যেন ঘুমোঘোরে হেসে ওঠা শিশুর হাসিটি।

উত্তরের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা দোলন এই নারীকে দেখে অনুভব করে, তীক্ষè ঈর্ষায় তার বুকের গভীর অন্ধকারে কে যেন অবিরাম ঢিল ছুড়ছে। তার বুক তোলপাড় করে। শিরায় শিরায় বইতে থাকে উন্মত্ত রক্তধারা। যেন বা সেই রক্ত, রক্ত নয়। যেন বা সেই রক্ত মুহূর্তে জ্বলে ওঠা কোনো দাহ্য পদার্থ। যেন বা উঠোনের তারে ভেজা শাড়ি মেলে দেওয়া নারীটি এই মাত্র একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে ছুড়ে দিয়েছে সেই দাহ্য পদার্থের ওপর। রক্তে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে দোলনের। 

দোলন মনে মনে বলল, ‘স্বামী সোহাগে অহংকারী হয়েছ। তোমার এই অহংকার আমি শুকনো পাতার মতো উড়িয়ে দেব। তোমার জীবন আমি নাড়ার আগুনে ধিকিধিকি পোড়াব। সেই আগুনে তুমি দিবারাত্রি পুড়বে। অন্তর পুড়ে যাওয়ার সেই অনন্ত যন্ত্রণার কথা জগৎসংসারের কারো কাছে তুমি বলতে পারবে না।’

এক দমকা হাওয়া আসে তখন। গাছের পাতারা চড়ুই পাখির মতো হুটোপুটি করে। চালের ওপরকার জামগাছের একটা মরা পাতা দোলনায় দোলা শিশুর মতো দুলতে দুলতে উঠোনের সাদা মাটিতে এসে পড়ে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে বলক ওঠা দুধের গন্ধ।

দোলনের মনে পড়ে রান্নাবান্না শেষ করে দুধের কড়াই চুলায় বসিয়েছিল সে। নামাতে ভুলে গেছে। কী কাজে নিজের ঘরে এসে কাজ সেরে উঠোনের দিককার জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখনই কমলরানীকে দেখে অন্তর্জ¡ালায় উন্মত্ত হয়েছিল। দুধের গন্ধে এখন মনে পড়ল, তার বুকের ভিতরকার হিংসার মতো বলক ওঠা দুধও বুঝি সাদা ফেনায় ফুলে উঠেছে।

দৌড়ে উঠোনে নামল দোলন। রান্নাঘরের চৌকাঠে পা দেওয়ার আগেই দেখে কমলরানী ঢুকে গেছে রান্নাঘরে। চুলার পাশে রাখা তাপে তাপে পুড়ে থাকা, পোড়া দাগ ভর্তি কাপড়ের লুছনি দিয়ে কড়াইয়ের দুই হাতল ধরে চুলার পারে নামিয়েছে কড়াই। ফুলে ওঠা দুধ ছড়িয়ে পড়েছে চুলার চারপাশে। দুধপোড়া গন্ধ ভাসছে রান্নাঘরের হাওয়ায়।

কমলরানী সংসারে আসার পর থেকেই পরিষ্কার দুটো চেহারা ধারণ করেছে দোলন। বাইরে এক, অন্তরে আরেক। মুখে মধু, অন্তরে বিষ। কমলরানীর সঙ্গে কথা বলে সে হাসিমুখ আর মধুমাখা কণ্ঠে। কথায় আচরণে সে মঞ্চ মাতিয়ে দেওয়া অভিনেত্রী। কে তার মুখ দেখে আর কথা শুনে বলবে, এই মেয়ে আসলে নবীন ছুতারের ব্যবহৃত সদ্য কিনে আনা নতুন করাতখানি। একদিকে ঘষে ঘষে কাটে, আরেক দিক রোদের দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে হাসে।

এখনো দোলনের মুখে রোদের হাসি। ‘আমিও তো আসছিলাম দুধ নামাতে। তুমি কাপড় রোদে না দিয়ে চলে এলে যে?’

ঠাকুর বা দোলনের মতো শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারে না কমলরানী। তার ভাষা আর উচ্চারণ বিক্রমপুর অঞ্চলের অন্তর থেকে ওঠে আসা। মুখে তেমন হাসিও থাকে না তার। অত্যন্ত সাদাসিধে অল্পশিক্ষিত এক গৃহস্থবাড়ির মেয়ে। মালখানগরের ওদিকটায় বারুজীবী সম্প্রদায়ের বাস। পানচাষী। বসুবাড়ি আভিজাত্যপূর্ণ। তাদের জমি বর্গা নিয়ে পানের বরজ করে বারুজীবীরা। কমলরানীর বাবা বিশ-বাইশ কানি জমির মালিক। জমির আয়েই তাদের সংসার চলে। গ্রামের ইস্কুলে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে সে। মাথা তেমন ভালো ছিল না। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার স্বপ্ন ছিল। কোনো ক্লাসেই ঠিকঠাক মতো পাশ করতে পারত না বলে একটা পর্যায়ে মা-বাবা আর বড় দুই ভাই লেখাপড়া তার বন্ধই করে দিলো। বিয়ের কথাবার্তা হতে লাগল। মেয়ে সোমত্ত হয়ে উঠেছে। সৎপাত্রে কন্যাদান করতে পারলেই পরিবারের দায়িত্ব শেষ।

কমলরানীও ভিতরে ভিতরে বিয়ের প্রস্তুতি নিতে লাগল। স্বামী, বাসররাত আর সংসারের স্বপ্ন দেখতে লাগল। শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাশুর বা দেবর ননদ। জা। কত জন সংসারে! কেমন মানুষ তারা! স্বামী দেবতাটি হবে কেমন? বাসররাতেই কি রক্তাক্ত করবে তাকে! এই ভেবে রোমকূপ খাড়া হতো। রক্ত নাচতে থাকতো পদ্মার ঢেউয়ের মতো।

এদিক-ওদিক পাত্রের খোঁজ চলল। কানাইলাল নামে এক ঘটকের আনাগোনা শুরু হলো বাড়িতে। আত্মীয়-পরিজনেরাও পাত্রের খোঁজে নেমেছে। তারপরও গতি হচ্ছিল না কমলরানীর। হিন্দু বনেদি পরিবারের মেয়ে হওয়ার পরও কমলরানী দেখতে তেমন আহামরি নয়। গায়ের রং ফর্সার দিকে। গড়নগাড়ন ভালো। চেহারায় আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। চোখ সুন্দর হলে মেয়েদের মুখও সুন্দর দেখায়। কমলরানীর চোখ অতি সাধারণ। চেহারায় বোকা বোকা ভাবও আছে। এইসব কারণে মনের মতো পাত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। পাত্রপক্ষ কনে দেখতে এসে ভালভালাই খেয়ে বিদায় নিত, আর ফিরে আসত না।

মেয়েরা কুড়িতে বুড়ি। কমলরানী কুড়ি পেরিয়ে ক্রমশ এগোতে লাগল। যৌবন জোয়ার ভাটার দিকে গড়ায়। তারপর তার জীবনে আসবে সেই স্বপ্নের দিন আর স্বপ্নের মানুষ। রতনপুরের দেবকুমার ঠাকুরের সঙ্গে সাত পাকে ঘুরবে সে। শত মানুষের হইচইয়ে মুখর মালখানগর বসুবাড়ির মেয়েটি এসে পড়বে পঁচিশ-তিরিশ কানির ওপর এক বনভূমির মতো নির্জন বাড়িতে। যে-বাড়িতে মানুষ কথা বলে আকাশ আর জলের সঙ্গে, গাছের পাতা আর পাখিদের সঙ্গে, ঝিঁঝিঁ পোকা আর ফড়িংয়ের সঙ্গে। আকাশভাঙা আলো আর নদীভাঙা হাওয়ার সঙ্গে। কথা বলার মানুষ তারা যে চারজন তাদের একজনের সঙ্গে কথা বলার তেমন দরকারই হয় না। কম্পাউন্ডার প্রিয়নাথ। রাত ছাড়া স্বামীকে কাছে পাওয়াই যায় না। পাওয়া যায় শুধু দোলনকে। সেই মেয়েটিও কেমন যেন! কমলরানী তাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

সেই বলক দিয়ে ওঠা দুধের দুপুরে দোলনের কথা শুনে কমলরানীর মুখখানিও একটু যেন উজ্জ্বল হয়েছিল। বলল, ‘তোমার আইতে দেরি দেইখা আমিই দৌড়াইয়া আইলাম। দুধে পোড়া গন্ধ লাইগা যাইতাছিল।’

দোলনের আগের মতোই হাসিমুখ। ‘ভুলটা আমারই। চুলায় দুধ বসিয়েছি, মনেই ছিল না।’

এই ধরনের কথায় কাছাকাছি বয়সের নারীরা রঙ্গরস করতে পছন্দ করে। ‘কী হইছে গো ভাগ্নি, মন উড়ো উড়ো ক্যান? বিয়ার বাইদ্য বাজব হেই চিন্তায় ধরছে নি?’

কমলরানীর গামছা জড়ানো ভেজা চুল থেকে এক ফোঁটা জল ছিটকে পড়ল চুলার আগুনে। ছ্যাত করে শব্দ হলো। সেই শব্দটা যেন আপন বুকের ভিতর তরঙ্গ তুলল দোলনের। ‘বিয়ে! বিবাহ! স্বামী! বর!’

দোলন মনে মনে বলল, ‘আমার সেই স্বপ্ন তো তুমিই কেড়ে নিয়েছ। আমি যে মানুষটির গলা জড়িয়ে ঘুমাতাম, তুমি আজ তার গলা জড়িয়ে ঘুমাও। তার আর আমার শ্বাস-প্রশ্বাস মিলে অন্ধকার ভর্তি ঘরের ভিতরটা স্বর্গপুরী হয়ে যেত। আমরা যখন একে অন্যের শরীরে প্রবেশ করতাম, তখন মনে হতো এই জীবনে আমার আর কোথাও কিছু চাওয়ার নেই। আমি কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছি। তুমি আমাকে আমার সেই সুখের জীবন থেকে টেনে এনে ছুড়ে ফেলে দিয়েছ বাঁশবনের অন্ধকারে। আমার চারপাশে এখন শুধুই অন্ধকার। আর কোথাও কিছু নেই। তবে আমি এই অন্ধকারে থাকব না, এই অন্ধকার থেকে বেরোব। শিশুদের খেলনা রঙিন মার্বেলের মতো বিভিন্ন রঙে গড়িয়ে গড়িয়ে আসব তোমার দিকে। অথবা আমি এগোব অতিবিষাক্ত কালজাত সাপের ভঙ্গিতে। শিকার ধরার আগে যেভাবে এগোয় তারা। তারপর ছোবলে ছোবলে, ছোবলে ছোবলে তোমার জীবন বিষময় করে তুলব।’

দোষ কি আসলে কমলরানীর? সে তো কোনো অন্যায় করেনি! তার তো কোনো অপরাধ নেই? দোলনকে তো ছুড়ে ফেলেছে দেবু ঠাকুর! নিজের মান বাঁচাতে, চতুর্দিকের মানুষের কাছে নিজের মুখ রক্ষার্থে দোলনের জায়গায় এনে বসিয়েছে কমলরানীকে। দোষ তো আসলে ঠাকুরের। তাহলে দোলনের সব রাগ গিয়ে পড়েছে কেন কমলরানীর ওপর? কমল কী করেছে? ঠাকুর যদি না চাইত, তাহলে কি তার জীবনে আসতে পারত অন্য কোনো নারী? প্রতিশোধ নিতে চাইলে নিতে হবে তো ঠাকুরের ওপর! নিরীহ কমলরানী কেন?

এসবও মনে হয় দোলনের। আবার মনে হয়, কমলরানীর ওপর প্রতিশোধ নেওয়া মানে তো আসলে ঠাকুরের ওপরই প্রতিশোধ নেওয়া। কান টেনে আনলেই তো মাথাটা আসবে।

রাতের খাবার একটু আগেই খায় দোলন। আগে ঠাকুরের সঙ্গে বসে খেত। দুপুরবেলায়। বহু গ্রাম ঘুরে, রোগী দেখা শেষ করে, দুপুর পার করে বাড়ি ফেরে ঠাকুর। ফিরে স্নান সেরে আহার। দোলন বসে থাকতো তার ফিরে আসার পথ চেয়ে। তারপর রান্নাঘরের মেঝেতে পাটি পেতে খেতে বসা। রাতেও মুখোমুখি বসত দু’জনে। গ্লাসভর্তি দুধ চুমুকে চুমুকে খেত ঠাকুর আর দোলন খেত ভাত-তরকারি। খেতে খেতে টুকটাক কথা, হাসি-আনন্দ। প্রিয়নাথ ঘুমাতে গেলে নিজের ঘরের দরজা নিঃশব্দে খুলে সে এসে ঢুকত ঠাকুরের ঘরে। কত সুখময় সেইসব রাত্রি।

এখনো সেই একই নিয়মে আবর্তিত হয় সবকিছু। শুধু পাত্রীটি বদলে গেছে। দোলনের জায়গা নিয়েছে কমল। রাতের খাওয়া শেষ করে দোলন তার ঘরে ঢুকে দরজা লাগায়। ওদিকে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে স্বামী-স্ত্রীর কথামালার টুকটাক শব্দ। অনুচ্চ হাসির শব্দ। বড় ঘরের দরজায় খিল তোলা হয় তারও পরে। সেই শব্দে ভেঙে খান খান হয়ে যায় দোলনের বুকের ভিতরটা। কার দরজায় কে তোলে খিল! দোলনের আনন্দশয্যা হয়ে থাকে কণ্টকশয্যা। একটা দুঃখী রাতপাখি টি টি করা গুমরানো শব্দে কেঁদে চলে দক্ষিণ পুকুরের পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো তেঁতুল গাছটির ঝাপড়ানো ডালার নিবিড় অন্ধকারে।

বিয়ের কুড়ি-পঁচিশ দিনের মধ্যেই কমলরানী উপলব্ধি করবে ইতোমধ্যেই সে যেন স্বামীর কাছে পুরনো আর অদরকারি হয়ে পড়েছে। দেবু ঠাকুরের সঙ্গে তার বয়সের ব্যবধান অনেক। তারপরও বাসররাতেই সে বুঝে গিয়েছিল মানুষটার শরীরে তাপ-উত্তাপের কমতি নেই। যৌনকর্মে সে অতি দক্ষ। মেয়েমানুষের শরীর নিংড়ে কামরস খসাতে সে এক অতুলনীয় পুরুষ। একবার দু’বার তিনবার দেহমিলনেও তার কোনো ক্লান্তি থাকে না। অন্যদিকে ক্লান্তি-অবসাদে নেতিয়ে পড়ে কমলরানী। রতিক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পর সকালবেলায় সে অনুভব করে শরীর জুড়ে অপরিসীম আনন্দ। শরীরের কানায় কানায় ছড়িয়ে যায় সকালবেলাকার শালিক পাখির ডানায় ভেসে আসা রোদ। কোমল উষ্ণতায় নারীশরীর যেন হয়ে ওঠে ঝরেপড়া কুটুম পাখির পালকের মতো হালকা। যেন বা তার উড়তে ইচ্ছে করে। বাড়ির আঙিনায় কত ফুল ফুটে থাকে। চেনা-অচেনা ফুলের ওপর ঘুরে বেড়ায় নানা রঙের প্রজাপতি। কমলরানী যেন হয়ে ওঠে সেই প্রজাপতি। আনন্দের ডানা মেলে এদিক-ওদিক উড়ে যেতে ইচ্ছে করে। রাতের স্মৃতিতে আলোকময় থাকে তার অন্তর্গত ভুবনখানি। ঠোঁটের কোণে সারাক্ষণই ফুটে থাকে মৃদু একটুখানি ভালো লাগার হাসি।

দোলন সেই মুখখানি দেখেছে আর অন্তর্জ¡ালায় জর্জরিত হয়েছে। কার ভুবনে কে করে বিচরণ!

রাতের আনন্দ জোয়ারে ধীরে ধীরে লাগল ভাটার টান। তিন থেকে দুই। দুই থেকে এক। এক থেকে শূন্যে নেমে এলো মিলিত হওয়া। দুদিন তিনদিন, শরীরে সাড়া নেই ঠাকুরের। চারদিন পর হয়তো একবার কমলরানীর শরীরে হাত রাখল সে। আবার পাঁচদিন নিঃসাড়।

কমলরানী অবাক। এত দ্রুত স্ত্রীদেহের আকর্ষণ কমে যায় পুরুষ মানুষের? নাকি ত্রুটি আসলে তার শরীরের। মানুষটিকে সে কি পরিতৃপ্ত করতে পারছে না? এমন তো হওয়ার কথা নয়। সে তার শরীর চেনে। পুরুষ শরীরের তীব্র আকাক্সক্ষা বা চাহিদা তার তেমন নেই। যতটা আছে তাতেই তো খুশি থাকার কথা স্বামীর। সে তো স্বামীর ছন্দে ছন্দ মিলিয়ে চলার চেষ্টা করেছে। তাহলে ঠাকুর কেন এভাবে নিভে যাবে? বিছানায় শুয়েই অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে কেন ডুবে যাবে ঘুমের অতলে?

এইসব কয়েকদিন খুব ভাবল কমলরানী। দিন সাতেক পরের এক রাতে তার দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে থাকা দেবু ঠাকুরের বাহুতে আলতো করে হাত রাখল সে। ‘ঘুমাইছো?’

ঠাকুর জেগেই ছিল। ঘুম আসি আসি করছে। ওইসব মুহূর্তে কণ্ঠস্বর জড়িয়ে যায় মানুষের। সে রকম কণ্ঠে বলল, ‘না।’

কমলরানী একটু চেপে গেল স্বামীর দিকে। নিবিড় করে জড়িয়ে ধরল তাকে। ‘আমার ঘুম আসতেছে না।’

‘ক্যান?’

‘কইতে পারি না।’

‘মাথা গরম হয়েছে?’

‘না।’

‘আমার মনে হয় মাথাটা তোমার গরমই হয়েছে। ওই যে জবাকুসুম তেল এনে রেখেছি, উঠে গিয়ে মাথায় দিয়ে এসো। এই তেল হচ্ছে ঘুমের মহৌষধ। ভালো করে ডলে ডলে মাথার তালুতে দাও। ঘুম হবে।’

কমলরানী ফাঁপরে পড়ে গেল। কীভাবে স্বামীকে বোঝায়। মাথা গরম হয়নি তার। হয়েছে শরীর। আসলে কি মাথাও গরম হয়নি? ওই আকাঙ্ক্ষা তো প্রথমে মগজেই তৈরি হয়। মগজ থেকে ছড়ায় শরীরে। ঠাকুর কেন তা বুঝতে চাইছে না!

স্বামীর ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে গেছে কমলরানী। শ্বাস-প্রশ্বাস উষ্ণ হয়েছে তার। বুক চেপে ধরেছে স্বামীর পিঠে। তবু জেগে উঠছিল না ঠাকুর।

আর কী করার আছে এক গ্রাম্য যুবতী নারীর? আর কতটা নির্লজ্জ হতে পারে সে? একসময় কান্না পেয়ে গেল তার। শরীরের উষ্ণতা চোখের জল হয়ে ঝরতে লাগল বালিশে। স্বামীর দিকে পিঠ ঘুরিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল সে।

ঠাকুর ততক্ষণে গভীর ঘুমে ডুবে গেছেন। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী ও ধীর লয়ে পড়ছে। বাইরে বোধহয় চৈতালি জ্যোৎস্না ফুটেছে। আমের গোটা বড় হয়ে ওঠার পরও গাছে গাছে বয়ে গেছে হলুদ রঙের বোল। নিশিরাতের অবোধ হাওয়ায় অন্ধকার ঘরের ভিতরে এসেও ঢুকেছে আমের বোলের গন্ধ।

সকালবেলায় কমলরানীর মুখখানি লক্ষ করবে দোলন। রোজ সকালেই এই কাজটা সে করে। যেন কমলের মুখের দিকে তাকিয়ে রাত্রিকালের ইতিহাস পাঠ করার চেষ্টা। পাঠটা সে করতেও পারে। নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারে কমলরানীর বিগত রাতের ঘটনাবলি। বুঝে কোনো সকালে বেদনায় লীন হয় সে আর কোনো কোনো সকালে হয় আনন্দিত।

সেই সকালে কমলরানীর মুখ দেখে যা বোঝার বুঝে যাবে দোলন। ওই নিয়ে সে কখনোই কথা বলে না। আজো বলবে না। যেন তার হাতে এক দুরন্ত কিশোরের মাঞ্জা দেওয়া সুতো প্যাঁচানো লাটাই। ঘুড়িটা উড়ছে দূর আকাশে। সে নাটাই ঘুরিয়ে শুধুই সুতো ছেড়ে যাচ্ছে। শত্রু ঘুড়িটা কাটা পড়লেই আনন্দে লাফিয়ে উঠবে সে। কাটা ঘুড়ি যেন ভাসতে ভাসতে আপনা-আপনি চলে আসবে তার হাতের সীমানায়। মুঠোয়।

কমলরানী তার সেই কাটা ঘুড়ি। নিজ থেকেই এসে ধরা দেবে তার হাতে। দোলন তখন নিজের মর্জিতে পরিকল্পনা তৈরি করবে। যেমন করে হোক এই নারীর কবল মুক্ত করতে হবে তার দেবু ঠাকুরকে। হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্য তাকে উদ্ধার করতেই হবে। এখন তার শরীরে আর কোনো জ্বালা নেই। জ্বালা শুধু অন্তরে। শরীরে তার কোনো কাম নেই, আছে শুধু প্রতিশোধস্পৃহা।

দুপুরবেলা স্নানের ঘাটে গেছে কমলরানী। কদমপাতার উদাসী ছায়ার মতো একটুখানি ছায়া জমে আছে তার মুখে। পুকুরজলে পা ডুবিয়ে বসে আছে তো বসেই আছে। যেন স্নান করতে ভুলে গেছে। যেন বা নিজেকেই ভুলে গেছে।

আঙিনা থেকে ধুলোমাখা পায়েচলা ধূসর পথখানি দক্ষিণ-পশ্চিমে অনেকটা দূর গিয়ে ঝোপঝাড়ের অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসবে দোলন। সে গিয়েছিল চৌধুরীর ঘরে। ধীরেন চৌধুরী কাল সন্ধ্যায় কালনা থেকে ফিরেছেন।

কৃপণ মানুষ। তারপরও কমলরানীর জন্য একখানা তাঁতের শাড়ি এনেছেন। দোলন মেয়েটির মন খারাপ হবে ভেবে তার জন্যও এনেছেন একখানি। কমলরানীর শাড়িটি লাল রঙের। দোলনের শাড়ির রং কলাপাতার বুকের মতো। এই রংটা দোলনের খুব পছন্দ।

চৌধুরীর ঘরে সে গিয়েছিল আমের মোরব্বা দিয়ে আসতে। মানুষটা যখন-তখন মিষ্টি জিনিস খেতে চায়। বুড়ো হয়ে গেলেও জিভের স্বাদ তাঁর যায়নি। বাড়িতে থাকলে মিষ্টি আচার, শুকনো বরই, এসব যখন-তখন বয়াম থেকে বের করে খায়।

দোলন এই বাড়িতে আসার পর থেকেই একেক ঋতুতে একেক রকমের আচার তৈরি করে। আমের আচার করে অনেক রকমের। ঝাল, টক-মিষ্টি, শুধুই মিষ্টি। চিনির সিরা তুলে আস্ত লাল মরিচ, আদার কুচি আর ফালি ফালি আমের টুকরো মিলিয়ে তৈরি করে কাশ্মিরি আচার। তাতে এলাচ লবঙ্গ আর দারুচিনিও দেয়। ভারী স্বাদ হয় জিনিসটি। দুধ ভাতের সঙ্গে সেই আচার মিশিয়ে খেতে পছন্দ করেন দেবু ঠাকুর। বড় বড় কাঁচা আমের দু’পিঠ কেটে এক থোকা খেজুরকাঁটা মুঠোয় ধরে সেই কাঁটা আমে অবিরাম বিঁধিয়ে যায়। ফুটোয় ফুটোয় ভরে যায় আমের চাকা। যেন ছোট ছোট চালনি। দুপুরের পর এক আগইল কয়েক দিন পর পেকে যাবে এমন আম নিয়ে বসে দোলন। ধারাল বঁটিতে ছিলে হাতের পাঞ্জা আকৃতির দু’খানা পিঠ কেটে নেয়। পাশে রাখা কুলোয় জমতে থাকে আমের পিঠগুলো। ওরকম পঞ্চাশ একশখানা হলে সারাটা বিকেল ধরে সেইসব কাটা আমের পিঠে অবিরাম চালায় খেজুরকাঁটা। অ্যালুমিনিয়ামের বিশাল একটা গামলায় সেই আম সারা রাত ভিজিয়ে রাখে। সকালবেলায় দেখা যায় কালচে হয়ে উঠেছে জল। আমের পিঠগুলোও সামান্য কালচে। অর্থাৎ আমের সব কষ বেরিয়ে জলটা কালচে হয়েছে। তারপরও হাতের মুঠোয় আমের টুকরোগুলো নিয়ে চিপে চিপে আরেকটা পাত্রে রাখবে দোলন। অর্থাৎ শেষ কষটুকুও বের করে ফেলবে।

এই গেল প্রাথমিক কাজ। এখন মোরব্বা তৈরির আসল কাজ। কড়াইয়ে তোলা হবে চিনির ঘন সিরা। তাতে ছেড়ে দেওয়া হবে এলাচ লবঙ্গ দারুচিনি। তারপর মুঠো মুঠো ছাড়া হবে সেই তৈরি করা আম। খেজুরকাঁটায় করা আমের ছিদ্রে ছিদ্রে ঢুকে যাবে চিনির সিরা। মনোহর গন্ধ হবে। হয়ে গেছে আমের মোরব্বা। নিপুণ হাতে বড় বড় বয়ামে মোরব্বা ভরে রাখবে দোলন। চিনির সিরাও ঢেলে ঢেলে দেবে বয়ামে। বছরভর বয়ামভর্তি ঘন সিরায় ডুবে থাকবে হাতের পাঞ্জার সমান একেক টুকরো মোরব্বা। কী স্বাদ সেই জিনিসের!

বর্ষাকালে চালতার আচার তৈরি করে দোলন। বরইয়ের দিনে করে বরইয়ের আচার। উঠোনের মাটিতে পাটি বিছিয়ে ছড়িয়ে দেয় আগইলভর্তি পাকা বরই। শুধু শুকনো বরইও খেতে মজা। আবার মিষ্টি বরই শুকিয়ে আরেক রকমের আচার তৈরি করে। সেই আচারের স্বাদও অতুলনীয়। বৃষ্টির দিন ছাড়া বছরের প্রতিটি দিনেই রোদে পড়ে থাকে দোলনের মোরব্বা আর আচারের বয়ামগুলো।

কখনো আমসত্ত্ব তৈরি করে দোলন। আম ফালি ফালি করে কেটে আমসি করে। রোদে শুকালে সেই জিনিস টিকে থাকে সারাবছর। বলক ওঠা ডালে ছেড়ে দিলে ডালের স্বাদ বদলে যায়। আর আছে তেঁতুলের আচার। বিচি ফেলে সরিষার তেল আর শুকনা মরিচ মিশিয়ে ভর্তার মতো বানালেই হয়ে গেল তেঁতুলের আচার। সঙ্গে খেজুর বা আখের গুড় মেশালে সেই জিনিসের স্বাদও বেদম। তেঁতুলের মিষ্টি আচার গৃহস্থলোকের রুচি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে!

শুরুর দিকে ঠাকুর একদিন অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘তুই এত এত আচার বানানো কোথায় শিখেছিস দোলন?’

দোলন হেসে বলেছে, ‘চাঁদপুরের বাড়িতে মাসিদের দেখেছি। এইসব কাজ মেয়েরা একবার দেখলেই শিখে ফেলে।’

ঠাকুরকে এসব খেতে শিখিয়েছিল দোলন। গ্রামের ঘনিষ্ঠ লোকেরা এলে ঠাকুর তাদের দোলনের হাতের আচার আর মোরব্বা খাইয়ে সন্তুষ্ট করতেন। দোলনের আচারের সবচাইতে বড় ভক্ত ধীরেন চৌধুরী। তার কাছ থেকে শিশুর মতো চেয়েচিন্তে তো খায়ই, অনেক সময় উঠোনের রোদে রেখে দেওয়া বয়াম খুলে নিজে নিজেও খায় মানুষটা।

সেই মানুষ দোলনের জন্য এনেছেন তার পছন্দের শাড়ি! সেই আনন্দে অথবা কৃতজ্ঞতায় দোলন আজ তাঁর জন্য চিনেমাটির পেয়ালা ভর্তি করে নিয়ে গিয়েছিল কাশ্মিরি আচার। ফিরে আসার পথে দেখে ঘাটপারে বিষণ্ন ভঙ্গিতে বসে আছে কমলরানি। খানিক এগিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে তার গাল বেয়ে নেমেছে অশ্রুজলের ধারা। নিঃশব্দ কান্নায় ডুবে আছে সে।

মানুষের কান্নায় অন্য মানুষের মন খারাপ হয়, এ-ই জগতের রীতি। দোলন চলে গেল এই রীতির বিপরীতে। মন একটুও খারাপ হলো না তার, হলো আনন্দ।

কী দুঃখে কাঁদে এমন সদ্য বিবাহিত নারী? বাপের বাড়ির কথা ভেবে? নাকি স্বামীর অবহেলায়? নাকি কাঁদে স্বামীসঙ্গ বঞ্চিত হয়ে?

পরের ধারণটিই বদ্ধমূল হলো দোলনের মনে। নিশ্চয় ঠাকুর তাকে শরীরসুখে বঞ্চিত করছে। নিশ্চয় ঠাকুর তার সঙ্গসুখে সুখী নয়।

এই তো চায় দোলন। এই তো চায়।

তবু কমলরানীর মুখ থেকে বের করতে হবে কথা। জানতে হবে সব। কূটচালে বিপর্যস্ত করতে হবে বসুবাড়ির কন্যাটিকে।

তখনই এগোল না দোলন। পুকুরঘাটে গিয়ে বসল না কমলরানীর পাশে। জানতে চাইল না কোন কষ্টে এমন করে কাঁদছে মানুষটি! জানতে চাইল বিকেলবেলায়। ঠাকুর যখন ব্যস্ত হয়েছেন তার রোগীদের নিয়ে। উঠোনে আর বসার ঘরে যখন রোগক্লান্ত নারী শিশু আর যুবক বৃদ্ধরা অপেক্ষা করছিল। 

দুপুরের পর স্বামীর পাশে শুয়ে কমলরানীও ঘুমিয়েছে ঘণ্টাখানেক। রোগীদের সাড়া পেয়ে ঠাকুর বিছানা ছেড়েছেন, কমলরানী তখনো শুয়েছিল। ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও বিছানা ছাড়েনি। ছাড়ল আরো কিছুক্ষণ পর। উঠে হাত-মুখ ধুয়ে এই সময়টায় প্রতিদিনই সামান্য সাজগোজ করে সে। লম্বা চুলের সুন্দর খোঁপা করে। মুখে সামান্য প্রসাধন। পরনের শাড়ি বদলে অন্য শাড়ি পরে। হাতে গলায়, কানে নাকে সোনার গহনা। অপরাহ্ণের আলোয় তেমন রূপবতী না হওয়ার পরও কমলরানীকে মোটামুটি ভালোই দেখায়।

আজ সে পরেছে ধীরেন চৌধুরীর এনে দেওয়া নীল রঙের তাঁতের শাড়িখানি। মন ঠিক নেই। হৃদয়ে পড়েছে স্বামীর উদাসীনতার দাগ। সেই দাগ ঘষে ঘষে তুলে ফেলার চেষ্টায়ই কি আজ নিজেকে একটু বেশি আকর্ষণীয়া করার চেষ্টা করেছে কমলরানী?

বিকেলবেলা দোলনও একটু সাজগোজ করে। এ যেন নারী জাতির অনাদিকাল থেকে চলে আসা এক রীতি। দিনের শেষ ও রাত্রির আগমন কালের মধ্যবর্তী সময়টুকুতে তাদের শরীর আর মনের ভিতর ছন্নছাড়া এক হাওয়া বইতে শুরু করে। সেই হাওয়ার কারণেই তারা বুঝি নিজেকে সাজাতে চায়।

পিছন দরজা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিল কমলরানী।

এদিকটায় ছোট্ট সবুজ একটা মাঠ বা অবহেলায় পড়ে থাকা ঘাসভর্তি কিছুটা জমি। অনেক রকম ফুলের ঝাড় ছড়ানো ছিটানো। কামিনী, গন্ধরাজ, অনেকগুলো রক্তজবার গাছ। বেলি ফুলের ঝাড়। টগর মালতির ঝাড়। বড় একটা নিমগাছ একটু দূরে। একটা চালতা গাছ। আমগাছ আছে তিনটা। বিকেলবেলায় পশ্চিম আকাশের রোদ এসে পড়ে এদিকটায়। গাছের পাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে রোদ এসে শিশুর মতো খেলা করে জায়গাটায়। বিকেলবেলায় এখানটায় একা একা ঘুরে বেড়াতে খুব ভালো লাগে কমলরানীর। হয়তো তখন নিমের ডালে বসে আছে একাকী এক কুটুম পাখি। দুটো শালিক পাখি হয়তো দিনশেষের খাবার খুঁজছে ঘাসের আনাচেকানাচে। একটা দাঁড়কাক হেরে গলায় ডেকে উড়ে গেল দক্ষিণের পুকুরের দিকে।

এই সবকিছুই খুব ভালো লাগে কমলরানীর। উঠোনের দিকে তখন ভিড় করেছে ঠাকুরের রোগীরা। তাদের টুকটাক কথাবার্তার শব্দ পাওয়া যায়। রোগীদের কারণে বিকেলবেলায় আর উঠোনের দিকে যায় না কমলরানী। বৈকালিক সাজগোজ সেরে চলে আসে তার প্রিয় জায়গাটিতে।

আগে এদিকটায় প্রায়ই আসত দোলন। সুন্দর জায়গা কমবেশি সবাইকেই আকর্ষণ করে।

দোলনের আজ একবার ইচ্ছে করেছিল ধীরেন চৌধুরীর এনে দেওয়া শাড়িখানা পরতে। ঠাকুরের মতো চৌধুরীকেও সে ডাকে মামা। ধীরেনমামা। কী ভেবে ধীরেনমামার আনা শাড়িটা দোলন পরল না। তার মনে আজ অন্য এক কূটচালের আনাগোনা। কী হয়েছে কমলরানীর? কেন পুকুরঘাটের নির্জনতায় বসে অমন করে কাঁদছিল সে? জানতে হবে। তার ধারণার সঙ্গে জানাটা যদি মিলে যায় তাহলে হাতে আরেক শক্তিশালী অস্ত্র পেয়ে যাবে দোলন। সেই অস্ত্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দেবে কমলরানীকে।

পিছ দুয়ার দিয়ে সেই জায়গাটিতে চলে এলো দোলন। মুখে মোলায়েম হাসি আর একটু বেশি মধুমাখা কণ্ঠস্বর। ‘কী গো বসুবাড়ির ঝি, ঠাকুরবাড়ির নতুন বউ! আজ যে দেখি একটু বেশি সাজগোজ। ইস্ কী সুন্দর যে তোমাকে লাগছে দেখতে। তুমি এমনিতেই খুব সুন্দর। আজ যেন সেই সোন্দর্য ফেটে পড়ছে।’

কমলরানীর মুখে মø­ান একটুখানি হাসি ফুটল। ‘কী যে কও তুমি? কই, কী সাজগোজ করলাম! আর আমারে তুমি সোন্দর কও কী দেইখা? আমি সোন্দর নি? সোন্দর হইলা তুমি। তোমারে দেখলে চোখ জুড়াইয়া যায়।’

একটু উদাস হলো কমলরানী। নিমগাছের মাথার ওপর দিয়ে পশ্চিমের আকাশে তাকাল। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল তার।

দোলন বলল, ‘তোমার কী হয়েছে, মামি?’

হঠাৎ এই রকম প্রশ্ন, কমলরানী থতমত খেল। ‘না, কিছু হয় নাই তো?’

‘হয়েছে, হয়েছে। আমার কাছে লুকাতে পারবে না। মামার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?’

‘আরে না, আমি ঝগড়াঝাটি করার মানুষ না। আমার লগে কেউর ঝগড়া লাগে না।’

‘তাহলে এমন মন খারাপ করে আছ কেন?’

কমলরানী কিছু বলার আগেই যেন গভীর মমতায় বা অত্যন্ত সহানুভূতির ভঙ্গিতে কেউ কারো হাত ধরেছে এমন ভঙ্গিতে কমলরানীর একটা হাত ধরল দোলন। ‘কী হয়েছে আমাকে বলো? মাসখানেকও হয়নি এ-বাড়ির বউ হয়ে এসেছ। এত অল্পদিনেই কী এমন হতে পারে, কেন সকাল থেকে তোমার মন খারাপ দেখছি? বাপের বাড়ির জন্য কষ্ট হচ্ছে?

মা-বাবা আর ভাইদের কথা মনে হচ্ছে? পাড়া-প্রতিবেশী বা সইদের কথা মনে হচ্ছে?’

দোলনের দিকে একবার তাকিয়েই মুখ অন্যদিকে ফেরাল কমলরানী। ‘না, ওইসব না।’

সেই ফাঁকে দোলন দেখে চোখ দুটো ছলছল করছে কমলরানীর। তাহলে তো এখনই সময়। কমলরানীর ছলছলানো চোখই তো বলে দিচ্ছে অনেক কথা।

অতি ঘনিষ্ঠ সখীর ভঙ্গিতে কমলরানীর কাঁধে হাত রাখলো দোলন। ‘তাহলে মনে হয় মামার সঙ্গে কিছু হয়েছে তোমার। সম্পর্কে আমি তোমার ভাগ্নি। তারপরও বন্ধুর মতো। বয়সেও আমার চেয়ে তেমন বড় হবে না তুমি। এখানে তো মামা ছাড়া অন্য কেউ নেই তোমার, যাকে তুমি তোমার মনের কথা বলতে পারো। আমাকে তুমি বিশ্বাস করে সব বলতে পারো। আমিও তো মেয়ে। যুবতীকন্যা। এক মেয়ের কষ্ট অন্য মেয়ে যেমন বুঝবে, অন্য কেউ তেমন বুঝবে না। তুমি আমাকে বলো। মামার সঙ্গে তোমার কী হয়েছে? ঘাটলায় বসে কাঁদছিলে কেন?’

দোলনের কথায় চমকালো কমলরানী। থতমত খেয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। ‘আমি যে কানতাছিলাম তুমি জানলা কেমনে?’

‘দেখেছি। না দেখলে বললাম কী করে? ধীরেনমামার ঘর থেকে ফেরার সময় হঠাৎই পুকুরঘাটের দিকে তাকিয়েছিলাম, তখন দেখেছি।’

এবার কমলরানীর কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে পিঠের দিকটায় আনবে দোলন, একটু বেশি ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে তাকে টানবে নিজের বুকের কাছে। ‘আমাকে তুমি বলো কী হয়েছে? মামার সঙ্গেই যে অশান্তি হয়েছে, তা আমি বুঝতে পারছি। আমাকে তুমি সব বলো। মনের কষ্ট কাউকে বলতে পারলে মন হালকা হয়।’

কমলরানী তারপর দুঃখী শিশুর মতো অথবা একেবারেই ভেঙে পড়া মানুষের মতো দু’হাতে জড়িয়ে ধরবে দোলনের কণ্ঠ। আকুল করা কান্নায় কাঁদতে কাঁদতে জড়ানো স্বরে বলতে থাকবে তার প্রতি ঠাকুরের উদাসীনতার কথা। শুনতে শুনতে দোলনের ঠোঁটে ফুটে উঠবে ক্রূর এক হাসি। অতি নিষ্ঠুর আর নির্দয় হাসির প্রকাশ কিছুতেই ঘটাবে না সে, অন্তর জুড়ে থাকবে তখন তার এক নিষ্ঠুর আনন্দ। মনে মনে বলবে, ‘আমি তো এই-ই চেয়েছি। এখন তোমার প্রাণের ভিতর জ্বলতে থাকা ধিকি ধিকি আগুনে আমি ধীরে ধীরে ঢেলে যাব আঁজলা আঁজলা ঘি। ঘিয়ের আগুনে তোমাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিব।’

সেই ফাঁকে নিমের ডালা থেকে উধাও হয়ে যাবে নিত্য বিকেলের কুটুম পাখিটি। ঘাসের বনে খাবার খুঁজতে থাকা শালিক পাখি দুটো উড়াল দেবে নীড়ের দিকে। রোদ গুটিয়ে নিতে থাকবে দিনশেষের সূর্য। গ্রাম প্রান্তের দিক থেকে শকুনের ডানার মতো উড়ে আসতে থাকবে অন্ধকার। [চলবে]