কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৬ তারুণ্যের স্বীকৃতি

লেখক:

আবসার জামিল

‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’ একদিকে যেমন তরুণ সাহিত্যিকদের জন্য আনন্দের ও সম্মানের, তেমনি প্রাপ্তিরও। শুধু আর্থিক প্রাপ্তি নয়, এ-পুরস্কার নিঃসন্দেহে তাঁদের আগামীদিনের সাহিত্যচর্চায় অনুপ্রেরণা, শক্তি ও সাহস জোগায়। নবীনদের পরিচর্যার এ-ধারাবাহিক আয়োজনে নবমবারের মতো প্রদান করা হয়েছে ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৬’। গত ২৯ জানুয়ারি শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে এ-পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এবার পুরস্কারের পাঁচটি বিভাগেই কালি ও কলম এ-পুরস্কার প্রদানে সমর্থ হয়েছে। বিভাগগুলো হলো – ১। কবিতা, ২। কথাসাহিত্য, ৩। প্রবন্ধ, গবেষণা ও নাটক, ৪। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা/ প্রবন্ধ এবং ৫। শিশু-কিশোর সাহিত্য বিভাগ। কবিতা বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেছেন ঢেউয়ের ভেতর দাবানল গ্রন্থের জন্য নওশাদ জামিল; কথাসাহিত্যে ফুলবানু ও অন্যান্য গল্প গ্রন্থের জন্য রাফিক হারিরি; প্রবন্ধ, গবেষণা ও নাটক বিভাগে কুঠুরির স্বর গ্রন্থের জন্য তুষার কবির; মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা/ প্রবন্ধে ভাটকবিতায় মুক্তিযুদ্ধ গ্রন্থের জন্য হাসান ইকবাল এবং শিশু-কিশোর সাহিত্যে অদ্ভুতুড়ে বইঘর গ্রন্থের জন্য শরীফুল হাসান। গতবারের তুলনায় এবার কবি ও লেখকদের বিপুল সাড়া পাওয়ায় এবং মানসম্মত বই বেশি জমা পড়ায় সব বিভাগেই পুরস্কার প্রদান করা সম্ভব হয়েছে বলে অনুষ্ঠানস্থলে জানানো হয়।
মাঘের হিম-বিকেলে এ-আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। বিশেষ অতিথির আসন অলংকৃত করেন ওপার বাংলার প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য চিন্ময় গুহ এবং এপার বাংলার বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক এবং কালি ও কলমের সুহৃদ ইমদাদুল হক মিলন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক এবং কালি ও কলমের সম্পাদকম-লীর সদস্য লুভা নাহিদ চৌধুরী। এছাড়া অনুষ্ঠানমঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কালি ও কলমের প্রকাশক আবুল খায়ের এবং সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রিকাটির সম্পাদক আবুল হাসনাত।
২০০৮ সাল থেকে তরুণ কবি ও লেখকদের সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে এ-পুরস্কার প্রদান করে আসছে কালি ও কলম। সে-বছর দুটি বিভাগে এ-পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০০৯ সালে বিভাগ বেড়ে দাঁড়ায় তিনটি। ২০১০ সালে যোগ করা হয় আরো দুটি বিভাগ। ফলে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাঁচটি বিভাগেই বই চাওয়া হয়। মাঝে ২০১৪ সালে তিনটি বিভাগে বই চাওয়া হলেও ২০১৫ সালে ফের পাঁচটি বিভাগেই পুরস্কার প্রবর্তন করে কালি ও কলম।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আগেরবারের তুলনায় ২০১৬ সালে আমরা তরুণ লেখকদের কাছ থেকে অধিক সাড়া পেয়েছি। চার সদস্যের বিচারকম-লী চূড়ান্তভাবে পুরস্কারের বই নির্ধারণ করেন। এই বিচারকম-লীতে ছিলেন – অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ, কবি ও অধ্যাপক মাহবুব সাদিক, অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল এবং অধ্যাপক খালেদ হোসাইন। তিনি আরো বলেন, আগামী ১ ফাল্গুন কালি ও কলম ১৪ বছরে পদার্পণ করবে। এ উপলক্ষে কালি ও কলম বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করছে।
লুভা নাহিদ চৌধুরীর বক্তব্য শেষে ২০১৬ সালে পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। পরে ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেওয়া এ-পুরস্কার নিয়ে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। ২০১৬ সালের বিজয়ীদের উদ্দেশে শংসাবচন পাঠ করেন যথাক্রমে অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ এবং কবি ও অধ্যাপক মাহবুব সাদিক। শংসাবচন পাঠশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, প্রত্যেক বিজয়ীর হাতে একটি ক্রেস্ট, এক লাখ টাকার চেক ও শংসাবচন তুলে দেন মঞ্চে উপস্থিত বিশিষ্টজনরা।
বিশেষ অতিথি ইমদাদুল হক মিলন প্রথমেই পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, অনেক সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তিত হয়েছে। কিন্তু কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার এক্ষেত্রে অনন্য। কাব্য-সাহিত্যে-শিশু উপন্যাসে এই কালি ও কলম পুরস্কারটি মুখ চেনা নেই
– এমন লেখককেও দেওয়া হয়েছে। এই পুরস্কারে কখনো পক্ষপাতিত্ব হয়নি। আমি যদি তরুণ হতাম, যদি পুরস্কারটি পেতাম, তবে বড় ধন্য হতাম। এ সময় তিনি
এ-প্রতিযোগিতায় পূর্বের বিচারক হিসেবে নিজের ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি আরো বলেন, কালি ও কলম প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের মানুষ সাহিত্য পড়তে চায়। শুধু বাংলাদেশে নয়, কালি ও কলম এখন বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে বিশাল স্থান দখল করে আছে। তাঁদের এ অর্জন হিমালয়সম হোক।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে চিন্ময় গুহ বলেন, কালি ও কলম, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সংগীত উৎসব, সাহিত্য সংস্কৃতির পরিচর্যায় এসব উদ্যোগের সীমা ছাড়িয়ে গেছে আজকের অনুষ্ঠান। এটি একটি অদ্ভুত সুন্দর উদ্যোগ, আপনাদের অভিনন্দন। তিনি বলেন, ই-পৃথিবী ও বোকা বাক্সের সর্বগ্রাসী থাবায় পৃথিবী যখন বিপর্যস্ত, বিপন্ন, বই শকুনির থাবার নিচে, তখন কালি ও কলমের এ-উদ্যোগ প্রশংসনীয়। পৃথিবীর শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাস তরুণরাই সৃষ্টি করে। সাহিত্যের রূপরেখাকে বারবার তছনছ করেছেন তরুণ কবি ও লেখকরা। সব সময় প্রশ্ন তুলেছেন স্রোতের বিপরীতে, কেন আমার তোমাকে মানতে হবে? একইভাবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকরাও সব সময় প্রচলিত নিয়ম ভেঙেছেন। তরুণরাই বারবার নিয়ম ভেঙেছেন, তরুণরাই হাতে তুলে নিয়েছেন মশাল। এটা প্রতিরোধ। সাহিত্য মানেই প্রতিরোধ। এ প্রতিরোধ হচ্ছে আশ্চর্য রকম স্বপ্নীল। তাই সাহিত্যে কখনো কোলাবরেটরদের কোনো জায়গা নেই। লেখা মানে হচ্ছে জীবন নাড়ির স্বপ্ন-ছোঁয়া। জীবনের সঙ্গে যোগ না থাকলে কোনো তারুণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন পুরস্কারপ্রাপ্ত তরুণরা তাঁদের এই সাহিত্যচর্চা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাবেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ খান মেনন বলেন, চিরকালই তরুণরা প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ভূমিকা রেখেছে সংস্কৃতি বিকাশে। পুরস্কারপ্রাপ্ত এই পাঁচ তরুণও সেই দলেরই অগ্রপথিক। ভাষা-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গত শতকের ষাটের দশকে আমরা একঝাঁক তরুণ লেখক পেয়েছিলাম। তবে মুক্তিযুদ্ধোত্তর সদ্য স্বাধীন দেশে তরুণ লেখকদের একটা সংকট তৈরি হয়েছিল।
কালি ও কলমের প্রকাশক আবুল খায়ের তাঁর বক্তৃতায় দুই বাংলা থেকে প্রকাশিত এ-সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এবং এমেরিটাস অধ্যাপক ও কালি ও কলমের সভাপতিম-লীর সদস্য আনিসুজ্জামানকে। তিনি কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার প্রদান অব্যাহত থাকবে বলেও উল্লেখ করেন।
পুরস্কারগ্রহণের পর প্রত্যেক বিজয়ী সংক্ষেপে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। কবি নওশাদ জামিল কালি ও কলমের প্রকাশক এবং এ-পুরস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, স্বপ্ন ছিল শুধুমাত্র সনেট দিয়ে প্রকাশ করব একটি কাব্যগ্রন্থ। ঢেউয়ের ভেতর দাবানল সেই স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। বইটি পুরস্কার পাওয়ায় আমি তাই আনন্দিত।
নবীন কথাসাহিত্যিক রাফিক হারিরি বলেন, আমার মতো শ্রমিক লেখকের জন্য পুরস্কার সত্যিকার অর্থেই দারুণ উৎসাহের বিষয়। তিনি তাঁর সাহিত্যচর্চা নিরলস চালিয়ে যাবেন বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
গবেষক তুষার কবির বলেন, তিনি মূলত কবি, পুরস্কারপ্রাপ্ত বইটি তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ। তবে এ-গ্রন্থেরও বিষয়বস্তু কবিতা ও কবি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এ পুরস্কার তাঁকে উজ্জীবিত করেছে সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় পদচারণায়।
মুক্তিযুদ্ধ ও সে-সময়কার ভাট কবিতা নিয়ে গবেষণারত হাসান ইকবাল। পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, এ পুরস্কার তাঁর কাজের পরিধি নিশ্চিতভাবেই আরো বৃদ্ধি করবে।
শিশু-কিশোর সাহিত্যে পুরস্কার পাওয়া শরীফুল হাসান বলেন, পুরস্কারপ্রাপ্ত গ্রন্থটি ছিল তাঁর প্রথম কিশোর উপন্যাস। কালি ও কলম পুরস্কার তাঁকে সাহিত্যের এ-শাখায় কাজ করার উৎসাহ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্তরা অনুভূতি প্রকাশের পর বক্তব্য রাখেন অনুষ্ঠানের সভাপতি শামসুজ্জামান খান। প্রথমেই তিনি পুরস্কারপ্রাপ্ত নবীন কবি ও লেখকদের অভিনন্দন জানান। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সচেতন হও যতেœর সঙ্গে পড়ো। শুধু বিদেশি সাহিত্যের পেছনে ছুটো না। শামসুজ্জামান খান আরো বলেন, সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে আত্মিক সম্পর্কের সঙ্গে নিষ্ঠার সম্পর্ক রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তরুণরাই সাহিত্যের স্বকীয়ধারা তৈরি করবে।
পুরস্কার প্রদান ও সম্মানিত অতিথিদের বক্তব্যের পালা শেষে অভিনীত হয় শুভাশিস সিনহা-রচিত কাব্যনাট্য দ্বিখ-িতা। নাট্যাভিনয়ে অংশ নেন ফেরদৌসী মজুমদার ও ত্রপা মজুমদার। দেশের দুই স্বনামধন্য অভিনেত্রীর অভিনয় যখন শেষ হলো, ঘড়ির কাঁটা তখন রাত আটটার ঘর পেরিয়ে গেছে।
ধীরে-ধীরে অনেকে তখন ফিরতে শুরু করেন নিজ-নিজ গন্তব্য-অভিমুখে। সবার মনেই হয়তো তখন আগামী বছরও এমন একটি সুন্দর ও আনন্দময় অনুষ্ঠান উপভোগের প্রত্যাশা জন্ম নিয়েছে।