কড়ির বাজার

লেখক:

পারভেজ হোসেন

পোলাপানগুলারে সাহেব না বানাইয়া ছারবানা দেখছি? নবীন হাওয়ায় লাউয়ের ডগার মতো তরতরিয়ে মাচা ডিঙানো বউয়ের ওপর বিরক্ত হয় এমদাদ।
কেন বানামু না? চাষার জাত জনম ভইরা চাষাই থাকবো, নাকি? জেদ
ধরার মতো করে বলে রেহানা।
কেবল দুটো কাঁচা পয়সার মুখ দেখেছে এমদাদ, এরই মধ্যে রেহানার আবদারের আর শেষ নেই। নতুন বাসা, ফার্নিচার, পুরনো টিভিটা বিক্রি করে এলসিডি, ছ-মাসের মাথায় আড়াই লাখ নামিয়ে দিয়েছে মহিলা। এখন সরকারি স্কুল থেকে ছাড়িয়ে বাচ্চা দুটোকে ইংলিশ মিডিয়ামে ঢোকাতে চাইছে। চাইবেইবা না কেন, যার একটু সামর্থ্য হয়েছে চারপাশটায় চোখ রেখে তার আর উপায় কী? মফস্বল ছেড়ে এসে গাধার খাটুনি খেটে,
অনন্ত দৌড়ঝাঁপের জীবন তো এসবের জন্যেই। লেখাপড়া শিখে পায়ে কাদামাখা বাপ-দাদাদের চাষবাসের নিস্তরঙ্গ স্রোতে সাঁতার কাটলে কি চলে?
প্রাইভেট চাকরির ফাঁকে ফাঁকে শেয়ার ব্যবসার উপর্যুপরি মুনাফায় অতটা পাগল হওয়ার ছেলে যদিও সে নয়, তবু কলিগদের মাতামাতি আর বাজারের স্ফীতি দেখে টাকা-পয়সা যেখানে যা ছিল ঢেলে দেয় এমদাদ। রেহানাও যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা তার বিয়ের সোনাদানাটুকু দিয়ে এমদাদের সাহস আরো কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারের এমন অবস্থা বুঝেশুনে টাকা ঢাললেই হলো। লাভ আর লাভ, লাভের পাহাড়ে চড়বার জন্যে মুখিয়ে আছে মানুষ। চারদিকে বিশেষজ্ঞেরও অভাব নেই; সুযোগ পেলেই কম্পিউটারের স্ক্রিনে বাজারদর দেখে, খাবার টেবিলে, চায়ের আড্ডায়, বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে, পাশের কলিগদের সঙ্গে ফিসফিসিয়ে, এমনকি বসের রুমেও আলাপ-আলোচনার একটা নতুন কালচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে অফিসপাড়া। শুধু কি তাই, কেনাবেচার ফর্দ নিয়ে প্রতিদিন শুতে গিয়ে বউয়ের সঙ্গে ফুসুর-ফাসুর, জল্পনা-কল্পনা ছাড়া যেন জুত লাগে না আর। ব্যাপারটা এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, বাড়ির ঝিয়েরাও সারাজীবনের সঞ্চয় ভেঙে গৃহকর্তার কাছে দু-পাঁচ হাজার লগ্নি না করে পারছে না এখন।
মনের মধ্যে অচেনা উদ্বেগ থাকলেও জীবনটাকে বদলে ফেলেছে এমদাদ। গ্রামের বাড়ির ভাগের জমিটা বেচে, অফিস থেকে লোন নিয়ে ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছে সে। গাড়ি কেনা ছাড়া রেহানার এখন একটাই দাবি বাচ্চাদের ইংলিশ মিডিয়ামে ঢোকানো।
কম্বলের তলা থেকে বেরিয়ে খাটের পাখায় বালিশ চেপে আধশোয়া হয় এমদাদ। বলে, পড়ালেখা করানোর ব্যবসা ফাঁদছে স্কুলগুলা। ইংল্যান্ড-আমেরিকার সিলেবাস-টিলেবাস ফলো করে না পড়ায়, কী কী সব কয়! এর জন্যে আবার আলাদা মাস্টার রাখো, দুনিয়ার হ্যাপা। পোলাপান হাতছাড়া হইবো যখন বুঝবা।
তপু আর টুসি জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে আছে। আজ ছুটির দিন বলে বেলা করে উঠবে ওরা। রেহানা পর্দা সরিয়ে জানালার একটা পাল্লা খুলে দিতে দিতে বলে, চাষামিটা দেখছি যাইবো না তোমার। আর কমুইবা কী, জ্ঞাতি-গুষ্টিতে তো বিদ্যার ব-ও নাই। সন্তানাদি নিয়াই তো মানুষ স্বপ্ন দেখে নাকি?
ছুটির ভোরের আয়েশ ভেঙে ঝগড়ায় জড়াতে চায় না এমদাদ। পরীবাগের বারোতলা ফ্ল্যাটের ন-তলার দক্ষিণের জানালা দিয়ে কচি রোদ এসে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় বাড়ি খেয়ে সারাঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। রেহানা মশারি গুছিয়ে আলো আড়াল করে ওদিকটায় গিয়ে দাঁড়ায়। শীতের সকালে এখানে দাঁড়াবার একটা সুখ আছে, কুয়াশামোড়া রমনার পুরো সবুজটাই চোখে পড়ে। সাইড টেবিল থেকে খবরের কাগজ তুলে ওলটাচ্ছিল এমদাদ। কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বলল, ঠিক আছে ফরম আনো কিন্তু আমার একটা কথা রাখতে হইবো।
কী কথা?
দুই লাখ টাকা লাগবে, অল্পদিনের মধ্যেই দিয়া দিমু, জোগাড় কইরা দেও না প্লিজ।
কোনো উত্তর না দিয়ে নিশ্চুপ থাকে রেহানা। নিজের চেনাজানা গন্ডি থেকে বারকয়েক এনে দিয়ে ধার চাওয়াটা এমদাদের কাছে সহজ করে তুলেছে সে। টাকার অঙ্কটা বড় করে চাইতে তাই আর বাধছে না ওর। যা-ই হোক দিয়ে তো দেয় ঠিকঠাক, ভেবে রাজি হয় রেহানা। বলে, চাইয়া দেখি পাই কিনা, বেশিদিন রাখতে পারবা না কিন্তু।
পুরনো বন্ধুদের ছেড়ে ক্যামব্রিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে নতুনদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না তপু-টুসি। তার ওপর পড়ালেখার আকস্মিক চাপ খেলাধুলা কেড়ে নিয়েছে ওদের। রেহানাও দমবার পাত্রী নয়; বাড়িতে মাস্টার রেখে, রুটিন করে, বাড়তি সময় দিয়ে যত্ন নিচ্ছে ছেলেমেয়ের। কিন্তু পাঠ নেওয়ার নামে তোতা পাখির মতো গাদাগাদা বই গেলার ফল আদতে কী দাঁড়াচ্ছে সে-হিসাব কষবার শক্তি কি আছে মা-বাবাদের! সুন্দর হাতের লেখা, চমৎকার উচ্চারণ আর নতুন নতুন বিদ্যা শেখার তালিম দেখে চমকাবে, গদগদ হবে, পারলে জীবন দিয়ে দেবে – এটাই তো স্বাভাবিক।
আট-ন মাসের মধ্যেই বউয়ের সঙ্গে সঙ্গে বইখাতায় লেপ্টে যাওয়া বাচ্চাদের নতুন জীবনে জড়িয়ে পড়ে খাবি খেতে থাকে এমদাদ। ভোর ৭টায় ওদের স্কুলে দিয়ে সোজা অফিস, লাঞ্চ আওয়ারে একবার স্টক এক্সচেঞ্জে ঘোরাঘুরি, আবার অফিস, বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ৭টা কি রাত ৮টা। তপু-টুসি তখনো পড়ছে। রেহানা রান্নাঘরে ব্যস্ত। হাতমুখ ধুয়ে এসে ওদের পড়ালেখা নিয়েও যেটুকু সম্ভব বসতে হচ্ছে তাকে।
সারাদিনে দম ফেলার সুযোগ না মিললেও রাতে রেহানার পাশে শুয়ে নিজেকে জুড়োবার জুতটুকু যখন উপভোগ করে সে, ভাবে, অর্থের কীর্তি হয়তো এই – স্ত্রীর সাড়া দেবার ভঙ্গিও বদলে দেয়।
ক্লান্তি নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমের ঘোরে ডুবতে ডুবতে ভাবনা দীর্ঘ হয় তার। মাত্র তো ক-বছর, চাকরি নিয়ে চলে আসার আগেও বাবার সঙ্গে ক্ষেতে মই দিয়েছে, ধান কেটেছে, খালেবিলে মাছ ধরেছে, পায়ে কাদার গন্ধ এখনো উবে যায়নি হয়তো। কিন্তু রেহানার চুলে তৈলাক্ত সুবাস, শরীরের গোপন ভাঁজে ভাঁজে ঘামের কটু ঘ্রাণ এখন আর খুঁজে পায় কই এমদাদ। সব ধুয়ে-মুছে সাফ করবার জন্যেই কি তবে কলুর বলদের মতো খেটে মরা তার? যতোই খাটুক, এ খাটায় অদ্ভুত এক আমোদও তো আছে। সমূহ সম্ভাবনার আমোদ, আয়েশ-বিলাস-ভোগের আমোদ।

দুটা বছরও ফুরালো না। এমদাদ কল্পনাও করতে পারেনি এমন হতে পারে, তার বিশেষজ্ঞ বন্ধুরাও না। সবকিছু দুঃস্বপ্নের মতো ঘটে গেল। চায়ের আড্ডায়, খাবার টেবিলে বিচার-বিশ্লেষণ করবে কী, কেউ কারো মুখের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারে না এমন।
প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে শেয়ারের সূচক। সবচেয়ে মারাত্মক, দর নেমেই ক্ষান্ত থাকছে না, তড়াক করে উঠে পড়ছে আবার। এরপর নামছে যখন, একেবারে তলায় গিয়ে ঠেকছে।
ভূমিকম্পের মতো এই প্রবল ওলট-পালটের মধ্যে তড়পাতে তড়পাতে আরও কয়টা মাস কেটে গেল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না।
মাসিক খরচটা ঠেকাবার জন্যে কাউকে না জানিয়ে পরীবাগের ফ্ল্যাট ছেড়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে দুকামরার একটা বাসায় গিয়ে উঠলো এমদাদ।
এমন নয় যে কাজকর্মে অভ্যাস নেই, গতর খেটে সংসারটা তো টেনেছে এদ্দিন, রেহানাও তার কাজের মেয়েটাকে ছাড়িয়ে দিলো। খরচ যতোটুকু কমানো যায়। কিন্তু কত আর কমাবে, এমদাদ বেতন যা পায় তার তিন ভাগের দুই ভাগই তো লোন বাবদ কেটে নিচ্ছে অফিস। ক্রমান্বয়ে ধার-দেনায় দিশেহারা হয়ে উঠতে থাকে তারা।
রেহানা নীরবে সব সইতে থাকলো কিন্তু এভাবে আর কয়দিন, পাওনাদারের চাপ ভদ্রতার বেড়া ভেঙে ফেলে। কুলসুম ভাবি দুই লাখ টাকা চাইতে এসে বলে, অনেক ইজ্জতঅলা ভাবছিলাম আপনেরে। বাসা ছাড়লেন একবার জানাইলেনও না। যতোবার টাকা নিছেন, টাইম টু টাইম দিয়া দিছেন আর যখনই বেশি নিলেন গড়িমসি শুরু হইয়া গেল। গুডউইলের তেলেসমাতিটা তো ভালোই দেখাইছিলেন!
রেহানা স্বপ্নেও ভাবেনি কুলসুম ভাবি এভাবে বলতে পারে। ওর গলা ধরে আসে, ঢোক গেলে রেহানা। বলে, আপনের ধারণাডা ভুল ভাবি, টুসির আববায়…
রেহানাকে কথা বলার সুযোগই দেয় না সে। বলে, টাকা দেওয়ার সময় তো কিছু জিগাই নাই ভাবি, এহন আমি কিছু সুনমুও না, আপনে এ-মাসের মইধ্যেই আমার টাকা দিয়া দিবেন। সম্পর্কটা ভালো থাকবো।
এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন আগে কখনো হয়নি রেহানা, ফলে রাগ অভিমান ক্রোধ জেদ সমস্তটাই গিয়ে পড়ে বেচারা এমদাদের ওপর। কিন্তু কী করবে এমদাদ? ঝড়ে যে-ঘরের চাল উড়ে গেছে শুধু বেড়া দিয়ে সে-ঘরে আর কতক্ষণ!
অল্পদিনের মধ্যেই ওদের সংসারের সকল শৃঙ্খলা একেবারে ভেঙে পড়ে। বাচ্চা দুটো এখনো স্কুলে যাচ্ছে, দুবেলা খেতে পাচ্ছে কিন্তু ওদের চোখের আড়ালে কখনো কখনো স্বামী-স্ত্রীতে যে উপোস দিতে হয়। যতো কটূক্তিই করুক লাজ-শরমের মাথা খেয়ে বাড়িওয়ালা, দোকানদার, পাওনাদারের সামনে মাথা নোয়াতে হয়।
ঘরের মালামালের মধ্যে এমদাদ টিভিটা বেচে দিলো। তপু মুখ ভার করে নিঃশব্দে কাঁদছে, টুসি কিছু বলছে না কিন্তু বোঝা যায় সারাক্ষণের বন্ধু হারাবার ব্যথা মুখ বুজে সইছে মেয়েটা। এমদাদ ছেলেকে কোলে নিয়ে বারবার চোখ মুছিয়ে দিচ্ছে, কয়দিন পর আবার কিনা আনমু আববা, কান্দে না লক্ষ্মীসোনা, বলতে বলতে জবজবে জলে নিজেই চোখ ভারী করে তোলে সে।
এরপর দফায় দফায় ওদের সামনে থেকে সোফা, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, ওভেন, ফ্রিজ বিদায় নিতে থাকলেও তপু-টুসির তেমন কিছু যায়-আসে না আর।
বুক ফেটে যাচ্ছে তবুও মুখে খিল তুলে দিয়েছে রেহানা। না তুলেইবা কি করে সে? শহরে এসে কত করে বলল লেখাপড়া যেটুকু আছে তা নিয়ে একটা কাজ শুরু করি; কিন্তু কে শোনে কার কথা, এমদাদের ওই এক গো, ঘরের বউ ঘরে থাকো। কাজে গেলে বাচ্চারা মানুষ হবে না। বড় বড় মেয়েমানুষ যারা দিনরাত সংসারের ঘানি না টেনে চাকরি-বাকরি করছে তাদের বাচ্চারা বুঝি ঘাড়ে জোয়াল তুলে ঘুরে বেড়ায়?
এমদাদ অতশত বোঝে না। সে চায়নি ব্যস। এখন বুঝুক! রেহানা একে তাকে ধরে একটা কাজের চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু যার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, বললেই তো আর তার কাজ জুটে যায় না।

নিত্যনতুন দরপতনের আতঙ্কে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছে। কীভাবে কী ঘটছে কারোরই ধারণা নেই। প্রতিদিন কেবল সর্বস্বান্ত হওয়ার খবর, তবু সর্বহারার দল অনবরত ধসের মধ্যেও নতুন করে দর ওঠার ক্ষীণ আশায় বুকে পাথর বেঁধে আছে। কিন্তু সব আশার বাঁধ ভেঙে দিয়ে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ মাথা ঘুরে পড়ে গেলে পুঁজিহারা মানুষের বিক্ষোভে রাজপথ উথলে ওঠে।
মতিঝিলের সোনালী ব্যাংকের মোড়ে পুলিশের দাবড়ানি খেয়ে রক্তেভেজা শার্ট আর ফাটা মাথা নিয়ে ঘরে ফেরে এমদাদ। ধুয়ে-মুছে তুলায় মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে গজগজ করছে রেহানা, তুমি মরো আর আমি পোলাপান লইয়া রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করি। আকাইম্মা বজ্জাদ বেডা কোনহানের। যা হবার হইছে, দলাদলির মধ্যে যাওয়া কেন? এত হাউস কেন তোমার? কী কপাল লইয়া জন্মাইছিলাম, এক ফোঁডা সুখ যদি সয়!
গজগজানির অভ্যাস রেহানার আছে কিন্তু অন্তরের গভীর থেকে ব্যথা মেশা এমন ঝাঁঝ তো আগে কখনো পায়নি এমদাদ। শংকিত হয় সে, কুণ্ঠিতও হয়, বলে, ভুক্তভোগির দলে কোনো দলাদলি নাই বুঝলা। স্লোগান দিয়া রাস্তায় নামলাম, পুলিশে ধাওয়া দিলো।
স্বামীর সরল কোমল এমন উচ্চারণে কেঁদে ফেলে রেহানা। রক্তাক্ত বাপকে ঘিরে তপু-টুসি হতবাক হয়েছিল, মায়ের দেখাদেখি এবার তারাও ফোঁপাতে থাকে।

তিন মাসের বাড়িভাড়া বাকি। বাচ্চাদের স্কুলের বেতনও।
দুবার চিঠি দিয়ে এবার এমদাদকে ডেকে পাঠিয়েছেন প্রিন্সিপাল। সবকিছু বুঝিয়ে বলার পরও তিনি তার অপারগতা প্রকাশ করলেন, বললেন, বুঝতে পারছি না যে তা নয়। আমিও তো চাকরি করি ভাই। নিয়মের মধ্যে চলতে হয়। টিউশন ফিস ক্লিয়ার না করে ওদেরকে আর স্কুলে পাঠাবেন না প্লিজ।
আকাশ ভেঙে পড়ে এমদাদের মাথায়। নিজেকেই যে বুঝ দিতে পারছে না সে কী বলবে এখন ছেলেমেয়েদের? ঘরে ফিরে অভিশপ্তের মতো পাথর হয়ে থাকে এমদাদ। এমন কিছু আর অবশিষ্ট নেই যা বিক্রি করে সামলাবে। তপু-টুসিকে ডেকে শুধু বলে, কাল থেকে স্কুলে যাইতে হইবো না, তোমাগো স্কুল ছুটি।
শুনে বাচ্চারা আনন্দ পেলেও রেহানার বুকে বজ্রপাতের আওয়াজ হয়। রান্নাঘর থেকে এমদাদের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে চোখ সরিয়ে নেয় সে।

বাড়িওয়ালা হুমকি-ধমকি দিলেও এখনো অতোটা বেপরোয়া হয়নি। তার ছোট ছেলেটাও শেয়ারে পুঁজি হারিয়ে ঘরে ঘাপটি মেরেছে। এইটুকু মমতা কি সে-কারণেই? হবে হয়তো বা। বাড়ির মালিক হলেও মানুষ তো। কিন্তু কদিন বাদে কুলসুম ভাবি জোয়ান দেবরকুলসহ টাকা চাইতে এসে এমন ভাবভঙ্গি করলেন যেন তুলে নিয়ে যাবেন। আর ছেলেগুলোও মাশাল্লা – লম্বা চুলের ঝুঁটি, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কানের লতিতে রিং, হাতে রুলি পড়েছে। এসেই যে যেখানে পারলো বসে পড়লো, আদর করলো তপু-টুসিকে, যেন অনেকদিনের চেনা!
এমদাদকে এসবের কিছু না জানিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে একদম সিটিয়ে গেলো রেহানা। ভয়ে আধখানা হয়ে থাকলো। কুলসুম ভাবির দেবরদের চেহারাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলেই রক্ত হিম হয়ে বুকের স্পন্দন থেমে যেতে চায় তার। দৈনিক পত্রিকা আর টেলিভিশনের বীভৎস সব খবর, এযাবৎ যা দেখেছে সে, স্মৃতিতে ঘুরপাক খেতে থাকে। অলক্ষুনে ভাবনায় কাতর রেহানা মানসিক চাপ ধৈর্যের সঙ্গে বইতে পারে না আর। একবার ভাবে, পালাবে, আবার চিন্তা করে দু-দুটো সন্তান নিয়ে রিক্ত হাতে যাবেই বা কোথায়। পাগল হয়ে ওঠে রেহানা। ওদের নিয়ে তবে ট্রেনের নিচে কাটা পড়বে? বিষ খাবে? শেষে বিষ খাবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় সে।

তপু-টুসিদের জানালার নিচে বাড়িওয়ালার বাগান কসমস, গাদা, ডালিয়া সূর্যমুখীতে থইথই করছে। রংবেরঙের অনেক প্রজাপতি ওখানে, উড়ে উড়ে দোতলার গ্রিলের কাছে চলে আসে। বাইরে হাত বাড়িয়ে বর্ষায় বৃষ্টি ধরার মতো প্রজাপতির পাখা ধরতে চায় তপু। কিন্তু কিছুতেই পেরে ওঠে না সে। পেছনে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের প্রজাপতি ধরার চেষ্টা দেখে টুসি।
বাবা চলে গেলে দরজায় তালা লাগিয়ে মাও বেরিয়ে যায় রোজ। তখন ওদের আর কোনোকিছুতেই বেশিক্ষণ মন বসে না। তপুটা এটা খাবো ওটা খাবো বলে কাঁদে। টুসিরও যখন তখন বেদম ক্ষিদে পায় কিন্তু টোস্ট বিস্কুট আর পানি ছাড়া ঘরে মুখে তোলার মতো কিইবা থাকে আর! কোনো আবদার তুলে একবার ফোঁপাতে শুরু করলে কিছুতেই থামতে চায় না ছেলেটা।
আজ ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলছে, বাবায় আমার জন্যে কিছু আনে না কেন আপু? মায়ও তো খাবার জন্যে বকে না। বলতে বলতে হেঁচকি তুলে কাঁদতে থাকে ছেলেটা, বলে, আমার খুব খিদা পায়। আমার মন খারাপ, আমার কিচ্ছু ভাল্লাগে না। আমগো তালা দিয়া মায় কই যায়? হাজারটা প্রশ্ন তার আর কলজে ফুলিয়ে কান্না।
চোখ মুছিয়ে দিয়ে ছোট্ট মাথাটাকে কচি বুকের মধ্যে চেপে ধরে টুসি, কাইন্দো না ভাই, বাবায় না কইছে তোমার জন্যে কেক নিয়া আইবো।
শীতের রোদ ভেঙে রেহানার ফিরে আসতে দুপুর গড়িয়ে যায়। কখন রাঁধবে আর খাবেই বা কখন? ঘরে চাল আর আলু ছাড়া তো কিছু নেই যা ফুটিয়ে দেবে। মাকে পেয়ে খোকারা জাপটে ধরে, কী আনছো মা? খুব খিদা পাইছে।
যে-শিশুদের পইপই করে বলেও কিছু গেলানো যেত না এখন তারা খাবার জন্যে কেমন মুখিয়ে থাকে! কিছু আনলেই হলো, মন মজিয়ে তৃপ্তি নিয়ে খায় ওরা।
মেঝেতে বসে বাচ্চাদের বুকের সঙ্গে অনেকক্ষণ ঠেসে ধরে ডান-বামের দুটি কপালে বারবার চুমু খায় রেহানা। ওর বুকের ভারী স্পন্দনে গাল চেপে থাকে তপু-টুসি। একটা অ্যাম্বুলেন্স জ্যামে আটকা পড়ে কান ফাটিয়ে কোঁকাচ্ছে।
ব্যাগ খুলে চারটে সমুচা আর একটা কোকা-কোলার বোতল বার করে রেহানা। পিরিচে করে সমুচা দিয়ে বোতলটা নিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে সে। কোক, সমুচার আয়োজন তপুর সবচেয়ে প্রিয়। ওরা নিবিষ্টমনে সমুচার মচমচে খোল ভেঙে খাচ্ছে আর গ্লাস ভরে কোক ঢেলে দেবার অপেক্ষা করছে। কিন্তু কোক ঢেলে না দিয়ে একটা ঘোরের মধ্যে রান্নাঘরে শিলনোড়ায় আতপ চাল পেশার মতো এক মুঠো ট্যাবলেট পিষে বোতলে গুলিয়ে নিচ্ছিলো রেহানা।
অসময়ে গেটের কলিংবেলটা বারকয়েক বেজে উঠলো তখনই। দরজা খুলে দিয়ে বাপকে ঘিরে কোকের কথা ভুলে গেছে বাচ্চারা। এমদাদের হাতের ঠোঙায় দুপিস কেক আর একটা জুসের বোতল।
শেয়ার কেলেঙ্কারি প্রতিরোধ কমিটির মিটিং থেকে সে অফিসের দিকে ফেরেনি আর। মনে নতুন আশা নিয়ে হেঁটে হেঁটে সোজা বাসায় চলে এসেছে। বাজার পরিস্থিতি উন্নতির দিকে না গিয়ে পারবে না এখন, অর্থমন্ত্রীকে দিয়ে তো কিছু হলো না, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করবেন, দায়িত্ব নেবেন। মিটিংয়ে এসব আলোচনা হয়েছে, প্রয়োজনে বৃহত্তর কর্মসূচির জন্যে সবাইকে প্রস্ত্তত হতে বলেছে।
রেহানা যত বাধাই দিক ওকে না জানিয়ে অল্পদিনে এসবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এমদাদ। নেতৃত্বের সঙ্গে থাকতে চাইছে সে। ও বিশ্বাস করে বিপদ চিরদিন ঘাড়ের ওপর চেপে থাকে না, আজ হোক কাল হোক অাঁধার কাটবেই।

গুঁড়া মেশানো কোকের বোতলটা তাকে রেখে মাতালের মতো টলতে টলতেই অভ্যাসবসে চুলায় চাল চাপিয়েছে রেহানা। আলু সেদ্ধ করেছে। টিনের কৌটায় কুমড়ার বিচি খুঁজে পেয়ে ভেজে ভর্তা করেছে। ভাত পেতে বেলা গড়িয়ে গেলেও এমদাদ যেমন কোনো রা করেনি, রেহানাও ঘন-গভীর দুর্বোধ্য খেয়ালের মধ্যে ফর্সা মুখখানা অন্ধকার করে থমধরে থাকলো সারাদিন। ছেলে-মেয়ে-স্বামী কারো কোনো চেতন আছে কি নেই বোঝা গেল না। সন্ধ্যারাত থেকে ভারী কাঁথার তলায় মরার মতো ঘুমিয়ে রইলো।

বেজায় ঠান্ডা পড়েছে আজ। ভরদুপুরেও এক ফোঁটা রোদ নেই। একটা পলিথিনের পোঁটলায় সামান্য বাজার নিয়ে ফিরেছে রেহানা। গেটেই বাড়িওয়ালা বুড়োর সঙ্গে দেখা। চাদর পেঁচিয়ে উপচেপড়া ড্রেনের দিকে আনমনে তাকিয়ে আছেন তিনি। রেহানাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে সরে দাঁড়ালেন। দুরুদুরু বুকে দ্রুত সিঁড়ি টপকে উঠে এলো ও, যেন ঘরে গিয়ে দরজায় খিল অাঁটতে পারলেই বাঁচে।
তালা খুলে কপাট ঠেলতেই আত্মা উবে যায় রেহানার! হাত পা ছড়িয়ে হিমশীতল মেঝেতে লুটিয়ে আছে বাছারা, দুটো গ্লাস আর কোকের খালি বোতলটাও লুটাচ্ছে। ব্যাপারটা বুঝতে একমুহূর্তও লাগে না তার। হায় আল্লা, হায় হায় বলে, আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করা চিৎকারে মূর্ছা যায় সে।