জলাধারে স্রোতস্বিনী

লেখক: ইমরান খান

আকাশ ডেকেছিল স্বাধীনতায়, পাহাড় চূড়ারা ডেকেছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বেচ্ছাচারিতায়, ধবল মেঘেরা ডেকেছিল স্তনবতী রক্ষিতার মতো, কৃষ্ণধেনুরা আহবান করেছিল দুগ্ধবতী জননীর মতো, বায়ুপ্রবাহ হাত ছেনেছিল অবাধ জীবন প্রবাহের দিকে, বৃক্ষরাজি অঙ্গুলি হেলন করেছিল হরিৎ মদিরতায়, ঝরনারা ডেকেছিল বিশুদ্ধ অবগাহনে, বনানী ইশারা করেছিল চিরসবুজ আদিমতার পানে, নির্জনতা লোভ দেখিয়েছিল নগ্নতার, আয়না-ভাঙা প্রতিচ্ছবি দেখাতে চেয়েছিল হ্রদের সবুজ-ছায়া-চূর্ণ করা জলরাশি, চলে চলে ঘাস উঠে পায়ে চলা পথ নিরুদ্দিষ্ট পথিককে দিতে চেয়েছিল মহাসড়ক থেকে মুক্তি আর তাই, যদিও প্রথম আসা, যদিও প্রথম দেখা, যদিও প্রথম উপলব্ধি করা, তবু যেন বহুকালের অবিবর্তিত আহবানে সাড়া দিয়ে এই ছুটে আসা – ছুটে আসা নাগপাশ ভেঙে, বেড়া ডিঙিয়ে, লোভনীয় আর উপাদেয় খাদ্যের সুড়সুড়িকে নির্মোহ রসনা দেখিয়ে – এই ছুটে আসা, কিংবা বলা যায় পালিয়ে আসা, অথবা সাধনাও বলা যেতে পারে – গৃহত্যাগী সিদ্ধার্থ হয়ে নয় যদিও অশ্বত্থ গাছের অভাব নেই, হেরা পর্বতের আশ্রয়ে নয় যদিও দুর্গম জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়গুলো অনাবিষ্কৃত গুহায় ঝাঁঝরা, হিউয়েন সাংয়ের মতো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পর্যটনে নয় যদিও এটা পর্যটন কেন্দ্র – শুধু ছুটে আসা, পালিয়ে আসা, সাধনার ফল ভোগ করা।

হয়তো নিঃসঙ্গ মানুষটিকে দেখে মায়া লেগেছিল বলে, হয়তো নিজেই কোনো অজ্ঞাত কারণে নিঃসঙ্গ বোধ করছিল বলে – হয়তো মানুষের চর্মাসিত্মত্বের অন্তরালে বসবাসকারী আদিম একাকিত্বের কোনো চকিত মুহূর্তের আক্রমণের শিকার হয়েছিল বলে, হয়তো পুরনো সঙ্গীদের একঘেয়ে সঙ্গ থেকে সরে এসে সহজাত বৈচিত্র্যপিপাসু মানবমন মুহূর্তের জন্য সামান্য বৈচিত্র্য চেয়েছিল বলে পা ভাঁজ করা জিনস আর হাফ হাতা হাওয়াই শার্ট পরনে ঈষৎ কোঁকড়ানো এলোমেলো চুলের নিচে ডিম্বাকৃতির মুখওয়ালা তিরিশ-বত্রিশ বছর বয়সী যুবক নিদানের দিকে এগিয়ে যায় তারই সমবয়সী অথবা বছর কয়েকের বড় রাহাত নামের অন্য যুবকটি। তার পাশে বসে পড়ে বলে, ‘আপনি বোধহয় কথা কম বলেন! নাকি একটু লাজুক আপনি? এখনো সহজ হতে পারেননি আমাদের সাথে?’

বিপরীত মুখে প্রবাহিত তীব্র বায়ুস্রোতকে কেটে বহমান জলস্রোতের বুকে ক্ষণস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন সৃষ্টি করে ছুটে চলা যন্ত্রচালিত নৌকার সম্মুখে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা নিদান মুখ ঘুরিয়ে রাহাতের দিকে তাকালে এতক্ষণ খুলি কামড়ে ধরা চুল এবার কপাল এবং কপোলের পার্শ্বদেশে এসে জড়াজড়ি করতে থাকে, তীব্র বাতাসে বুঝি বা তার বাঁ গালটা সামান্য কাঁপেও, তাকে দেখে এইমাত্র কাঁচা ঘুম ভেঙে ওঠা কোনো অনিদ্রা-রোগী মনে হয় এবং তার উচ্চারিত কথাগুলোকে উত্তাল বাতাস রাহাতের কানে এনে ঝাপটা মেরে নিজের সঙ্গে উড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকে, ‘তিনটেই ঠিক। দেড় ঘণ্টা কি খুব বেশি সময়?’ বলেই কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যায় সে।

রাহাত বলে, ‘কিন্তু আমরা তো সুরেনদা আর তার ওয়াইফের সঙ্গে বেশ স্বাভাবিক হয়ে গেছি। এবং তাঁরাও আমাদের সঙ্গে ভালোই মিশে গেছেন। পেছন ফিরে দেখেন দুই ফ্যামিলি হইচই করে ছবি তোলাতুলি করছে। আমি হঠাৎ দেখলাম আপনি একা বসে আছেন। আসুন না, আমাদের সঙ্গে এনজয় করুন, ছবি-টবি তুলুন।’

নিদান পেছনে না ফিরে আবার সামনের দিকে তাকালে তার চুলগুলো আরো একবার তার খুলি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ‘নিজের ছবি তোলার ইচ্ছে নেই আমার। ছবি তুলছি অবশ্য।’

নিদানের এ-কথা শুনে রাহাত তার মাথাটা একটু ঝাঁকিয়ে বোধহয় প্রবল বাতাসকে কিছুক্ষণের জন্য নিজের কান থেকে সরাতে চায়, হয়তো সে বুঝতে চেষ্টা করে অনিয়ন্ত্রিত বাতাস সঠিক শব্দ বহন করতে পারছে কিনা, ‘আপনার কথা বুঝলাম না। ছবি তোলার ইচ্ছে নেই কিন্তু ছবি তুলছেন!’

‘এই যে আমি বসে আছি, নৌকা চলছে, দুপাশে জঙ্গলঘেরা পাহাড়। ওপরে সাদা সাদা টুকরো মাখন মাখানো আকাশ, স্বচ্ছ পানি। এসবের ছবি তুলতে তুলতেই যাচ্ছি আমি।’

রাহাত চিৎকার করে বাতাসের বিপরীতে একটি ছাঁচবদ্ধ-জীর্ণ প্রশ্ন করে, ‘ভাই আপনি কবিতা-টবিতা লেখেন নাকি? না লিখলেও পড়েন নিশ্চয়ই।’

‘আমি এখন দেখি।’

‘কী দেখেন?’

‘সবাইকেই দেখি। সবাই দেখে না।’

‘আপনার কথাবার্তা মিস্টেরিয়াস। সব কথা ঠিক বোঝা যায় না। প্যারাডক্সে ভরা।’

‘প্যারাডক্স! সেটা কী?’

‘বাদ দেন, আপনি কী করেন?’

‘দেখি।’

‘মানে আপনার প্রফেশন কী? জব না বিজনেস?’

‘চাকরি করতাম।’

‘এখন কী করেন?’

‘কিছুই করি না।’

‘জব ছাড়ার পর কিছুই করলেন না?’

‘করলাম। এখানে এলাম।’

‘জব ছেড়ে দিয়ে এখানে এলেন!’

‘এখানে আসার জন্যই বোধহয় চাকরিটা ছাড়লাম।’

‘কেন?’

উত্তরে কাঁধটা সামান্য ঝাঁকিয়ে আবার সামনে অবারিত জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকে নিদান, কাঁধ ঝাঁকিয়ে হয়তো সে বোঝাতে চাইল যে, সে এই ‘কেন’র উত্তর জানে না, হয়তো সে ইঙ্গিত করতে চাইল, চাকরি ছেড়ে দেওয়ারই জিনিস, কিংবা সে উত্তর দিতে চায় না বলে ভদ্রতা করে কাঁধ ঝাঁকায়।

রাহাতকে আবারো খানিকটা দ্বিধান্বিত মনে হয়, হয়তো সে শহর আর জঙ্গলের ক্রমশ বিলীয়মান পার্থক্যের কথা ভাবে, হয়তো ভাবে না; কিংবা তার কাছে ‘জিহবা পিছলে যাওয়া’ নিদানের মুদ্রাদোষ বলে মনে হয়, ‘আপনি কি প্রায়ই এরকম একা একা ঘুরতে আসেন?’

‘প্রায়ই না, মাঝে মাঝে। তবে এরকম জায়গায় এই প্রথম, যেখানে নৌকাই প্রধান বাহন আর ভাড়াও এত বেশি। এই লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম বিখ্যাত ঝরনাটা দেখতে পাব কিনা। তখনি আপনাদের দেখলাম। আমার চোখের সামনেই আপনারা দুই পরিবার পরিচিত হয়ে একসঙ্গে নৌকা ভাড়া করে টাকা সাশ্রয় করলেন। আমিও তখন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে আপনাদের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে যেতে চাইলাম আর আপনারাও রাজি হলেন। ধন্যবাদ।’

‘ও কিছু না। আমরা সানন্দেই রাজি হয়েছি। আমাদের টাকা আরেকটু সাশ্রয় হয়েছে বটে, তবে সেটাই একমাত্র ব্যাপার না। এসব ভ্রমণে আসলে সদলবলে আনন্দ না হলে ঠিক মজাটা হয় না। আমরা তো আর হানিমুনে আসিনি। কাজেই ‘দুজন দুজনার’ এরকম কোনো ব্যাপার নেই। তাছাড়া সিকিউরিটির বিষয়ও আছে। ছবি-টবি তোলা আছে, থার্ড পারসন না থাকলে ফার্স্ট পারসনদের ফটো তুলবে কে? এসব আমার কাছে ভালোই লাগে, রোমাঞ্চকর আর রহস্যময়ও মনে হয়। ভাবেন, এই নৌকায় আমরা সবাই একই শহরে থাকি, প্রত্যেকের প্রফেশনও প্রায় এক, প্রত্যেকের লাইফস্টাইল মোটামুটি সেম, তবু আমরা কেউ কাউকে চিনি না। আর যখনই আমরা ওই কমন লাইফ আর শহরটা ছেড়ে এলাম, তখনই আমাদের পরিচয় হলো আর জানলাম আমরা কমন। অপরিচিত কিছু মানুষ বৈচিত্র্যের সন্ধানে একত্র হলো, বন্ধুত্ব হলো, ভালো না?’

‘হুঁ। কিন্তু এই নৌকার সবাই একই শহরের বাসিন্দা না। নৌকার মাঝি বোধহয় এখানকারই।’

‘ওহো। আই সি!’

‘যে আমাদের গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে, তাকে ভুলে যাওয়া ঠিক না।’

‘আপনার অবজারভেশন পাওয়ার ভালো।’ বলে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে রাহাত নিদানের দিকে একটু অন্যরকম দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলে, ‘আচ্ছা, আপনি ক্যাপিটাল সিটির কোথায় থাকেন? রেলস্টেশনের আশপাশে কী?’

নিদান নির্বিকার মুখে বলে, ‘না। স্টেশন খুঁজে পাইনি।’

‘আপনার অফিস কি এয়ারপোর্টের দিকে কোথাও?’

‘না। তবে উড়ন্ত জাহাজ দেখতে ভালো লাগে।’

‘আগোরাতে কি শপিংয়ে যান প্রায়ই?’

‘আমি শপিংয়ে যাই না।’

‘সিটি বাসে রেগুলার আপ-ডাউন করেন?’

‘কখনো।’

‘শেয়ার মার্কেটে যাতায়াত আছে?’

‘আমার কোথাও কোনো শেয়ার নেই।’

রাহাত আবারো দ্বিধান্বিত চোখে নিদানের দিকে তাকিয়ে থাকে, হয়তো সে তার এত প্রশ্নের হেতু জানতে নিদানের অনাগ্রহের কারণ খতিয়ে দেখতে চায় কিংবা তাকে শনাক্ত করতে চেষ্টা করে, ‘হঠাৎ করেই আপনাকে আমার বেশ চেনা মনে হচ্ছে।’

‘আমারও।’ বলে নিদান আবারো জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকলে রাহাত হয়তো ‘আমারও’ বলতে দুজনের কাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে বোঝার চেষ্টা করে আর তখনই নিদান একচিলতে হাসে, সর্বত্র বিরাজমান কোনো সদাবাস্তব সত্তার মতো সেই হাসি।

রাহাত বলে, ‘কিন্তু আপনি তো ভাই এত চুপচাপ থাকলে হবে না। আসুন আমাদের সঙ্গে।’

নিদান কিছু না বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বসে থাকে, যাত্রীরা কেউ খেয়াল করেনি যে মাঝি হাল ঘুরিয়েছে আর নৌকা দিক পরিবর্তন করেছে, প্রবল বাতাস এখন ডানদিক থেকে প্রবাহিত হতে থাকলে নিদানকে কেমন যেন সমাহিত মনে হয়, খানিক পর রাহাত তাকে অস্থায়ী ক্ষতচিহ্নপ্রাপ্ত প্রবাহিত জলধারা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে হ্রদের দুপাশের সবুজঢাকা পাহাড়ের দিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করার পর আকাশের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখে; হতে পারে প্রকৃতির নিজস্ব কোনো ভাষা আছে কিনা নিদান চিন্তা করে, যদি থাকে – তবে সে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চায় কিনা সে ভাবতে চেষ্টা করে, যদি করে – তাহলে সে ভাষা শুনতে চাইলে মানুষকে নির্জনে যেতে হবে এবং নিভৃতে কান পাতলে তবেই তার কথা শোনা যাবে বলে সে হয়তো মনে করে, যদি শোনা যায় – তবে হতে পারে সেই বিরলভাগ্য শ্রোতা আশ্চর্য হয়ে ভাববে, পৃথিবীতে আজো এত সরল কথা কেউ বলে! এত সুন্দর করে আহবান জানায়! হয়তো প্রকৃতি কখনো প্রেমের কথা বলে, যে-প্রেম আজ অবধি খুব কম মানুষই দেখেছে, কখনো-বা সে ধমকও দিতে পারে আর সেই ধমক শুনে মনে হতে পারে এই ধমক দেওয়াই উচিত কিংবা এই ধমক না শুনলে মানব জনম বৃথা যায়; বিরলভাগ্য শ্রোতা হয়তো হঠাৎ শুনতে পাবে প্রকৃতি তার কাছে নালিশ করছে, মানবজাতির একজন প্রতিনিধির কাছে সুবিচার চাচ্ছে, তার সেই কান্না শুনলে নিজের মাথার খুলি গুলি করে উড়িয়ে দেওয়ার দুর্দম বাসনা জাগতে পারে আর এসব ভাবতে ভাবতেই নিদান আবার জলের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলে সেখানে সে অকুঞ্চিত মুখে নিজের নগ্ন প্রতিচ্ছবি লক্ষ করে।

নিদান যদি এসব চিন্তা করে থাকে, তবে সে রাহাতকে তার চিন্তার কথা বলতে চেয়েছিল কিনা আর বললে রাহাত একটু ভাবজগতে ডুবে যেতে থাকত কিনা বোঝার আগেই রাহাতের স্ত্রী তিনা তার জাগতিক সৌন্দর্যে গড়া শরীরের দিকে তাকে আহবান করে, ‘কই গেলে? এসো না, আমার আর বউদির কিছু ছবি তুলে দাও। ক্যামেরা নিয়ে ওইখানে বসে আছ কেন?’

সুরেনের ছবি তুলুনির স্মৃতিভাণ্ডার ভর্তি হয়ে গেছে, সে কিছু অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি বাতিল করতে ব্যস্ত। রাহাত উঠে গেলে নিদান আবার নিজের স্মৃতিভাণ্ডার ভর্তি করতে থাকে, হতে পারে সে পরবর্তীকালে কোনো অবসরে একান্ত মনে কিংবা নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার কোনো এক মুহূর্তে নিদানকে নিয়ে ভেবেছিল, কিংবা কখনো ভাবেনি, স্ত্রীর সকাতর আহবান হয়তো তাকে নিদানের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল।

রাহাত উঠে গেল আর নিদান পা ঝুলিয়ে বসে রইল। তার পায়ের পাতা পানির কাছাকাছি ঝুলছে কিন্তু জলস্পর্শ করছে না। করুণ ঢেউগুলো তার পায়ের বুড়ো আঙুলের দিকে ছোট ছোট লাফ দিয়ে ব্যর্থ মনোরথে যেন পেরিয়ে যাচ্ছে। যন্ত্রযানের সৃষ্ট ক্ষত ইতোমধ্যে এই হ্রদ গ্রাস করে নিয়েছে, নতুন ক্ষত সে দিতে চায় না একে।

আকাশের মাখন তখন খানিকটা গলে এসেছে আর হ্রদের জলরাশিতে ধাক্কা খেয়ে ছুটে আসা বাতাস শীতলতর। দেখা গেল সকলেই গোসলের উপকরণ সঙ্গে নিয়ে এসেছে। তিনা জিন্স পরে এসেছে, সে ওই অবস্থায়ই ছোট সেলাই করা কাপড় পরা স্বামীর সঙ্গে নেমে গেল ঝরনার জলে, শহরের পথে এভাবে নামার কথা সে নিশ্চয়ই ভাবতে পারে না। ঊষা অবশ্য শাড়ি পরা আর সে গোসল করতে চায়ও না, তার লজ্জা বেশি, সে নৌকায়ই বসে রইল। সুরেন ধীরেসুস্থে সাঁতার কাটছে। কমপক্ষে সত্তর-আশি হাত ওপর থেকে ঝরঝরিয়ে পড়তে থাকা জলরাশি নিচে এসে একটা পুকুরের মতো হয়ে গেছে আর মানুষের ঝাঁপাঝাঁপিতে সে-পানি সারাদিন ঘোলাটে থাকে। সারারাত ধরে পরিষ্কার হতে না হতে সকাল থেকেই আবার তাকে ঘোলা করার কার্যক্রম শুরু হয়। কোন শ্রেণির মানুষ নেই সেখানে? বুড়ো, প্রৌঢ়, যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণী, বালক-বালিকা। গান গাইছে কেউ দলবেঁধে, কেউ শুধু পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে চুপচাপ পড়ন্ত পানির নিচে মাথা দিয়ে বসে আছে, কেউ-বা ক্রমাগত ডুবোচ্ছে। নিদান আগের মতোই বসে আছে, তবে নৌকা চলছে না বিধায় তার চুল আর খুলি কামড়ে নেই। সে তাকিয়ে থাকে ঘোলা পানির দিকে, পড়ন্ত জলরাশি দেখে, দৃষ্টিপাত করে জঙ্গলে ছাওয়া পাহাড়ের দিকে, তারপর আবার অবিশ্রান্তভাবে পতনশীল স্বচ্ছ-নীলচে জলরাশির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে, ‘অলৌকিক জলধারা।’

যেসব সম্ভাব্য কারণে রাহাত নিদানের দিকে এগিয়েছিল হয়তো সেই একই কারণে ঊষাও এগিয়ে এসে বলল, ‘আপনি গেলেন না?’

নিদান ঘাড় ঘুরিয়ে ঊষার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসে।

‘লজ্জা করবেন না, আমাদের কাছে কিন্তু এক্সট্রা শর্টস আরো আছে। আপনি চাইলে গোসলে যেতে পারেন।’

নিদান আবারো হাসে, এবার ঊষার দিকে না তাকিয়ে।

‘আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি নামতে চাচ্ছেন কিন্তু পারছেন না। যান না, ডুব দিয়ে আসুন।’

‘নামতে পারি কিন্তু চাচ্ছি না। আমার এখন গোসল করার প্রয়োজন নেই।’

‘কেন?’

হতে পারে ‘কেন’ শব্দটি মানবজীবনের কঠিনতম জিজ্ঞাসা আর উত্তরে নিদানও ‘কেন’ বলে অদ্ভুত চোখে ঊষার দিকে তাকিয়ে থাকলে ঊষাও তার দিকে কিছুই না বুঝে চেয়ে থাকে এবং নীরবতা অস্বসিত্মকর হয়ে উঠছে অনুভব করেই সে হয়তো বলে, ‘একা একা এতদূর বেড়াতে চলে এসেছেন? আপনার ফ্যামিলিতে কে কে আছে?’

এই অতি সরল এবং বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্নটির জবাবে নিদানকে খুব বেশি দ্বিধান্বিত মনে হয় অথবা হতে পারে সে প্রশ্নটি শুনতেই পায়নি, একটু পরেই সে যখন নিচু গলায় বলে, ‘সবাই আছে’ ঠিক সেই মুহূর্তেই, বোধহয় প্রকৃতির খেয়ালেই, একটি জলজীবী পাখি মাছের সন্ধানে পানিতে ছোঁ মারে এবং একটা সচকিত জলচরের নভোচর হয়ে উড়ে যাওয়ার দৃশ্য ঊষার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সে নিদানের নিচু গলার উত্তরটিকে লক্ষ করে না।

নিদানের দিকে আবার দৃষ্টি ফেরানোর সুযোগ, অদ্ভুত এই যুবকটির সমাহিত ভাব দেখে ঊষা খানিকক্ষণ দ্বিধান্বিত চোখে তাকিয়ে থেকে বলে, ‘আপনাকে আমার বেশ চেনা মনে হচ্ছে। আপনি কোথায় থাকেন বলুন তো!’

জবাবে নিদানের ঠোঁটের কোণে আবারো সেই চিলতে হাসি ফোটে, তবে এবার সে হাসিতে বেশ খানিকটা দ্বিধাও লক্ষ করা যায়, ‘জায়গাটার নাম মনে পড়ছে না।’

‘জোক করছেন?’ মৃদু হাসে ঊষা, ‘ফিরে গিয়ে স্টেশনে নেমে রিকশাওয়ালাকে কী বলবেন?’

‘ফিরে গিয়ে!’ ঈষৎ থতমত খায় নিদান।

‘বাহ্, বেড়ানো শেষ হলে ফিরে যাবেন না?’

‘বেড়িয়েই তো এলাম।’

হয়তো লোকটার ভণিতার সঙ্গে পেরে উঠবে না ভেবেই ঊষা প্রসঙ্গ পালটায়, ‘মানুষ নাকি প্রকৃতির সন্তান। দেখুন তো, আমাকে প্রকৃতির অংশ বলে মনে হচ্ছে কিনা। আপনি বসে আছেন, আমি দাঁড়িয়ে আছি। আপনি নিশ্চয়ই আমার খোলা চুল আর মৃদু হাসির পেছনে খোলা আকাশ দেখতে পাচ্ছেন। কী মনে হচ্ছে, আমি প্রকৃতির সন্তান?’

নিদান ভদ্রতাসূচক চোখে উন্মুক্ত আকাশের পটভূমিকায় এলোচুলের কাঠামোয় ঊষার হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে আবার অবগাহনের দৃশ্যে চোখ ফেরাল। তার চোখে পড়া সামান্য ঘাটতির কথা সে বুঝি-বা বলতে পারল না। প্রকৃতি অনেক কিছু লুকিয়ে রাখে, আবার অনেক কিছু প্রকাশ করে আর যেটুকু প্রকাশ করে, নগ্নভাবেই করে। উন্মুক্ত আকাশের পটভূমিকায় খোলা চুলে ঊষার হাসিমুখ প্রকৃতিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তার বসনের উপস্থিতিতে।

দিন পড়ে আসায় আবার ফিরতি পথ ধরে সবাই, যন্ত্রযান আবারো নির্বিকার হ্রদের কোমল-স্থিতিস্থাপক বুকে লাঙল চষতে চষতে এগোয় বন্দরের পথে, হোটেলে ফিরবে সবাই, আগামীকাল আবার যাত্রা হবে অন্য কোনো দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য। এই যাওয়া আর আসা – যেন আয়নায় বস্ত্ত বা ঘটনার প্রতিবিম্ব দেখা – গান চলছে, ছবি তোলা হচ্ছে, পানিতে পা ভেজানো হচ্ছে, শীতল বাতাস দিচ্ছে, নিদানের চুল খুলি আঁকড়ে আছে, যন্ত্রযানের ঘর্ঘর শব্দ নিস্তব্ধতাকে বিরক্ত করছে – পার্থক্য শুধু ভেদাভেদহীন এক আশ্চর্য সরোবরের জলের গন্ধ তাদের দেহে মেখে থাকা – আর এরই মধ্যে সুরেন বলে ওঠে, ‘আমরা সৌভাগ্যবান।’

রাহাত উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে, ‘ঝরনায় গোসলের কথা বলছেন?’ জিজ্ঞেস করলে সুরেন উত্তর দেয়, ‘না, রিসেন্টলি এখানে একটা নতুন জায়গা আবিষ্কার করা হয়েছে। আমাদের হোটেল থেকে পনেরো কিলোর মতো হবে, দুর্গম পথ। সেখানে নাকি উঁচু-নিচু পাহাড়ের চূড়া ঘেঁষে একটা পানির স্রোত বয়ে যায়, প্রকৃতির এক অদ্ভুত বৈচিত্র্য। পর্যটন করপোরেশন জায়গাটার নাম দিয়েছে অলৌকিক জলধারা।’

তিনা আগ্রহ নিয়ে বলে, ‘হুঁ, পত্রিকায় দেখেছিলাম বটে। কিন্তু ভালো করে পড়িনি। এখানে আসব জানলে পড়তাম। ঘটনা কী বলুন তো?’

‘ধরুন, পাহাড়ের ওপর দিয়ে পানি যাচ্ছে, এরকম তো পানি যেতেই পারে। কিন্তু পাহাড়টা মনে করুন এক জায়গায় হঠাৎ বিশ ফুট উঁচু, পানি সেখানেও অবলীলায় উঠে যাচ্ছে, আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, ওটা কোনো খাল বা নদী না, মানে জলাধার বলা যায় না, বন্যার পানির মতো পানি যায়, কিন্তু পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে না। চিন্তা করতে পারেন, পাহাড়ের চূড়ায় পানি বয়ে যাচ্ছে! পুকুরও না, নদীও না, ঝরনাও না। অথচ পানি চলছে সরলরেখায়!’ সবার থতমত মুখে একবার তাকিয়ে সুরেন বলে, ‘পানি থাকতে হলে একটা ধারক লাগে। ক্ষেতে পানি দিতে হলেও চারপাশে বাঁধাল দিতে হয়। এখানে তেমন কিছু নেই। একে বলতে পারেন পাহাড়ের ওপর দিয়ে যেন স্রোতস্বিনী নদী চলেছে, যে-নদীর কোনো পাড় নেই।’

‘এপার ভাঙা – ওপার গড়ার মতো কোনো সমস্যাও নেই।’ নিদানের ভাবলেশহীন মন্তব্য।

‘আজব!’ রাহাত বিস্ময় প্রকাশ করে, ‘পানি পাহাড়ঘেরা জায়গায় থাকতে পারে বলে জানি, কিন্তু পাহাড়চূড়ায় পানি! এই পানি যায় কোথায়? কোথাও গিয়ে কি কোনো ফাউন্টেন বা স্ট্রিম হয়ে গেছে?’

‘সেটা জানা যায়নি। মাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে তো, কোথায় গিয়ে পড়েছে সেটা বের করা যায়নি এখনো। যার উৎসই এখনো জানা যায়নি, তার গন্তব্য জানবেন কী করে? লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান, যদি না জেনে থাকেন, আপনাদের অবগতির জন্য বলছি, আমরা এমন এক জায়গায় বেড়াতে এসেছি, যেখানকার অধিকাংশ জায়গায় এখনো মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি। ট্রাভেলগে পড়েছি, এখানকার মাত্র টোয়েন্টি পার্সেন্ট জায়গাতে ট্যুরিজম বিল্ডআপ হয়েছে। বাকি জায়গাটা এতই দুর্গম, সেটা জয় করার চেষ্টা নাকি সুদূরপরাহত। দুর্গম একটা জায়গার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছি আমরা। ওই অলৌকিক জলধারা হয়তো শেষমেশ কোনো এক অনাবিষ্কৃত জায়গায় গিয়ে ঝরনা হয়েছে, হয়তো কোথাও গিয়ে নদীতে পড়েছে।’

‘আবার এমনো হতে পারে কোথাও গিয়ে হঠাৎ শূন্যে মিলিয়ে গেছে!’ নিদানের কণ্ঠে ঠাট্টার কোনো আভাস পায় না চার যুবক-যুবতী।

‘আজব!’ রাহাত তার বিস্ময় পুনরাবৃত্ত করে।

‘আজব তো বটেই। কাল আমরা সেখানেই যাব। বেলা ফুরিয়ে না গেলে আজই যেতাম। রাস্তা দুর্গম-পাহাড়ি, অন্ধকারে যাওয়া অসম্ভব। নিদান ভাই, আপনিও চলেন, আপনি উঠেছেন কোথায়?’

‘এখনো কোথাও উঠিনি। এসেই তো আপনাদের সঙ্গে জুটে গেলাম।’

‘বটে। চলুন আমাদের সঙ্গে। আমরা পর্যটনের মোটেলে উঠেছি। তাও মূল মোটেলে নয়। কাছেই বনের মধ্যে কিছু হানিমুন কটেজ আছে, চারদিকে চমৎকার ন্যাচারাল বিউটি। যাবেন?’

‘কিন্তু আমি তো হানিমুন করতে আসিনি।’

‘আমরাও না।’ বলে রাহাত বাকি তিনজনের দিকে বিস্ময় আর তাচ্ছিল্যমাখা চোখে তাকায়, ‘আমাদের বিয়ে হয়েছে অনেক দিন। হানিমুন-টানিমুন শেষ।’

‘তবে? হানিমুন কটেজ কেন?’

‘কারণ যখন হানিমুনে গিয়েছি তখন হানিমুন কটেজ পাইনি।’

‘ও।’ নিদানকে দেখে মনে হলো না ঠাট্টাটা সে বুঝেছে, ‘কিন্তু আমি একা মানুষ, আমাকে দেবে?’

‘আরে ভাই আমার পরিচিত আছে। চলুন। চারদিকে জঙ্গল, মাঝখানে কুটির। গা ছমছমে ভাব। আমরা আজ রাতে বন ফায়ার করব। চলুন, মজা হবে। আমাদের ঊষা বউদি গান জানে। আগুন ঘিরে বসে খালি গলায় গান হবে। সুরেনবাবু গিটার বাজাবে। সে-রকম জমবে।’

‘না’, নিদানের বক্তব্য, ‘জমবে না। প্রাকৃতিক যখন, সবকিছু প্রাকৃতিকই থাক, যন্ত্রের দরকার নেই।’

‘সবকিছু প্রাকৃতিক করতে গেলে তো আমাদের কাপড় খুলে ঘোরা উচিত, কাপড় তো প্রাকৃতিক নয়, একমাত্র মানুষই পোশাক পরে। আপনি কি তাতে রাজি হবেন?’ সুরেন একটা সিগারেট ধরিয়ে আড়চোখে ঊষার দিকে তাকালে ঊষাকে অন্যমনস্কভাবে আবছাপ্রায় দিগমেত্মর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেল। তার চোখে অদ্ভুত ঔদাসীন্যে সুদূরের হাতছানি, শহরের ড্রয়িংরুমে একটি সিগারেট আর আপাত-অসীম জলরাশির মাঝে একটি সিগারেট একই অর্থ বহন করে না হয়তো।

‘হবো।’ নিদানের দ্ব্যর্থহীন উত্তর, ‘আমার আপত্তি নেই।’

এবার তিনাকে দেখা গেল গভীর মনোযোগ দিয়ে পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে – হয়তো নগ্নতার কথা উঠেছে বলে সে অন্যমনস্কতার ভান করে কিংবা চিরপরিচিত একটি যৌগিক পদার্থের অনুপলব্ধ সৌন্দর্যে সে সত্যিই অন্যমনস্ক হয়ে যায়।

‘তো চলে আসুন। চমৎকার ন্যাচারাল বিউটি। মজা হবে খুব।’ নিদানের নগ্নতায় রাজি হওয়াটাকে বোধহয় কেউই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। ভ্রমণে এসে যা-তা নিয়ে অত গুরুত্ব দিলে চলে না হয়তো। কিন্তু যারা ঠিক যেন ভ্রমণে আসে না, তারা বোধহয় গুরুত্ব দেয়।

‘আপনার জন্য একটা কটেজ দেখে দেব। এক কটেজে একা থাকবেন। মজাই আলাদা। কাল আমাদের সঙ্গে সেই অবাক জলপ্রবাহ দেখতে যাবেন।’

‘হুঁ।’

 

বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট কুটির আর তার মাঝখানে অগ্নিশিখার ওপর তিনটি মুরগি দগ্ধ হচ্ছে, সুরেন বসেছে গিটার হাতে আর ঊষা লাজুক মুখে গান শোনানোর প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। রাজধানীতে যা হয় না – হেমমেত্মই শ্বদন্তশীত অনুভূত হচ্ছে। বিভ্রান্তিকর-মোহনীয় কুয়াশা ঘেরা আগুন ঘিরে তিনা ঊষার সঙ্গেই এক চাদর ভাগাভাগি করে বসেছে। সুরেন আর রাহাতের মধ্যে অবশ্য অতটা শীতার্ত ভাব দেখা যাচ্ছে না, তারা আগুনে হাত সেঁকতে সেঁকতে উৎসব করার প্রস্ত্ততি নিচ্ছে আর তখনই এলোমেলো পদক্ষেপে কোত্থেকে নিদান এসে হকচকিয়ে দাঁড়াল, তাকে দেখে হঠাৎ অনাহূত অতিথির মতো বিব্রত মনে হচ্ছে। রাহাত তাকে সাদর সম্ভাষণ জানালো, ‘আসুন আসুন। কোথায় ছিলেন?’

চুপচাপ এগিয়ে এসে ওদের বিপরীতে আগুনের সামনে বসে পড়লে নিদানের চেহারায় আগুনের আভা খেলা করে আর তার ঘোরলাগা চেহারায় সেই আভা অদ্ভুত মাধুর্য সঞ্চার করলে ঊষা লক্ষ করে নিদান যেন আগুনের একটু বেশিই কাছাকাছি বসার ফলে তার মাথাটা দহিত মুরগিগুলোর কালো হয়ে আসা মাংসপি–র বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে, যেখানে বসলে এই শীতার্ত পরিবেশে উষ্ণতার বদলে হলকা অনুভব হওয়ার কথা।

‘আপনি ছিলেন কোথায়?’

দগ্ধ হতে থাকা মুরগিগুলোর দিকে তাকিয়ে নিদান বলে, ‘উপজাতি পলস্নীর দিকে গিয়েছিলাম।’

ঊষাকে উৎসাহিত মনে হয়, ‘আমরাও যাব ওদিকে। শুনেছি সস্তায় ভালো ভালো জিনিস পাওয়া যায়। আপনি কিছু পেলেন কেনার মতো?’

নিদান শিশুতোষ চোখে ঊষার দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় কেনাবেচা কথাটা সে জীবনে প্রথম শুনল।

‘হুঁ’, স্ত্রীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সুরেন বলে, ‘সস্তায় ভালো মদও পাওয়া যায় নাকি। জববর জিনিস। আপনি খেয়েছেন?’

‘না।’ নিদানের নির্বিকার উত্তর।

‘আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে ঘোরের মধ্যে আছেন, নেশা করেছেন।’

‘ও।’

‘আচ্ছা শোনেন, আমাদের সঙ্গ কি আপনার ভালো লাগছে না?’ রাহাত জিজ্ঞেস করে, ‘ভালো না লাগলে আপনি আপনার মতো থাকতে পারেন। ভদ্রতা করার দরকার নেই। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি একা থাকতেই পছন্দ করেন।’

‘আমি একাই আছি। আপনাদের সঙ্গ খারাপ না।’

‘আপনি এখানে কতদিন আছেন? মানে, আমরা তো আছি মোটামুটি সাতদিন, তো আমরা ঠিক করেছি…’

‘সাতদিন! ওহ, সাতদিন।’ নিদানের মুখে এবার কিছুটা বিকার খেলা করেই আবার হারিয়ে যায়।

‘কেন, আপনার সমস্যা হবে? সুরেনবাবুর বেলায় কোনো সমস্যা নেই, উনি বিজনেস করেন। কাজেই নিজেকে সাতদিন ছুটি দিতেই পারেন। আর আমি দুবছর আগে বিয়ে করলেও অফিসে সেটা জানাইনি। কারণটা বলছি না। এবার একবারে সাতদিনের ছুটি নিয়ে এলাম।’ রাহাতের কণ্ঠে কেন যেন একটু অজুহাতের সুর খেলে।

সুরেন বলল, ‘আমার অবশ্য পাঁচদিনের বেশি থাকার পস্ন্যান ছিল না, কিন্তু যখন শুনলাম এখানে দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় একটা প্রাচীন মন্দির আছে আর সেখানে অদ্ভুত সব দেবতার মূর্তিতে ভর্তি, তখন পস্ন্যান বদলে ফেললাম। শেষ দিনে আমরা সেখানে যাব। ট্রাভেলগে দেখেছি, টেম্পলটা প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো। ওটাকে পুরোপুরি হিন্দু টেম্পল বলতেও আর্কিওলজিস্টরা নারাজ। কারণ যেসব গডস-গডেসের স্ট্যাচু সেখানে আছে সেগুলো হিন্দু বা অ্যানশিয়েন্ট গ্রিক কোনো দেবতার সঙ্গেই মেলে না। তবে কি ওটা কোনো বিলুপ্ত ধর্মের মন্দির কিনা, তাই নিয়েই এখন রিসার্চ চলছে।’

তিনা উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে, ‘কী সেই ধর্ম? তারা কেমন জীবনযাপন করত? কে ছিল তাদের ঈশ্বর? এই দেশে এমন বিলুপ্ত ধর্মও আছে নাকি? স্ট্রেঞ্জ!’

তখন নিদান হঠাৎ সামান্য নড়েচড়ে উঠে ‘আছে’ বললে সবাই খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকার পর রাহাত বোধহয় তাকে আলগা মাতববর হিসেবে জ্ঞান করে সামান্য বিরক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি আর্কিওলজিস্ট জানতাম না। তো সেটা কী ধর্ম?’

‘আমার ধর্ম।’

‘আপনার ধর্ম কী?’

‘তাই তো,’ ঊষার আগ্রহটা স্বতঃস্ফূর্ত না কৃত্রিম বোঝা যায় না, ‘আপনার ধর্ম কী? নিদান নামটা তো কোনো ধর্মেরই মনে হচ্ছে না। কিছুটা হিন্দুধর্মের মতো মনে হচ্ছে।’

‘মুসলমান নয়, এ-কথা তুমি কীভাবে বলবে?’ সুরেন স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে।

ঊষা নিরুত্তর থাকলে তিনা বলে, ‘খ্রিষ্টান হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। ডোরিন নামটা যেমন মুসলমান-হিন্দু সবারই হয়। কিন্তু এটা তো আসলে খ্রিষ্টান নাম।’

‘অপূর্ব নামটাও সেরকম।’

‘মেরি, মেরি থেকেই মরিয়ম।’

‘উজ্জ্বল।’

‘এলিজা।’

ধর্মনিরপেক্ষ নামোচ্চারণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে খানিকটা জিকিরের পর্যায়ে উন্নীত হলে রাহাত সমাপ্তি টানার চেষ্টা করে, ‘তিনি গুরু নানকের শিষ্য নয় তো!’

‘প্যাগান, প্যাগান।’ সুরেনের সিদ্ধান্ত।

নিদান বাদে অন্য সবাই নিদানের ধর্ম নির্ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে আর একসময় নিদান বলে ওঠে, ‘আবার নামটা ধর্মহীনও হতে পারে। আর সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের যেখানে শেষ, সেখানে এক নতুন তরিকার উদ্ভব।’ তখন এই ছোট্ট চক্রটিতে কিছু সময় নীরবতার রাজত্ব চলে আর স্তব্ধতা আবারো অস্বসিত্মকর হয়ে উঠলে সুরেন তার স্বভাবজাত নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে, ‘দুর্গম পাহাড়ি পথ, পদে পদে বিপদের আশঙ্কা, বাঘ-ভালুক-চিতাবাঘ-বাঘডাশ-সাপ-ভূতপ্রেত কী না থাকতে পারে ওই পথে! কিছুদূর ভাড়া করা গাড়িতে যাওয়া যায়, বাকিটা হেঁটে। অজ্ঞাতপরিচয় দেবতা আর অলৌকিক জলধারার সন্ধানে শেষ দিনে শুরু হবে আমাদের মহাযাত্রা। কিংবা অন্তিম যাত্রা।’

নিদান অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ‘ও!’ শব্দটা উচ্চারণ করলে মনে হয় সেসব আদিম দেবতাদের সঙ্গে তার যেন জন্মান্তরের পরিচয়।

‘তাই জানতে চাচ্ছিলাম আপনি আছেন কতদিন।’

‘ঠিক নেই।’

‘মানে? কতদিন ছুটি নিয়েছেন?’

‘এখনো জানি না।’

পেশাজীবী মানুষের ছুটির একটা সময়সীমা থাকাটাই অবধারিত নিয়ম বিধায় সুরেন একটু অবাক হয়, ‘আপনি কি বিজনেস করেন?’

‘না’, রাহাত উত্তর দেয়, ‘উনি জব করেন।’

‘তো ছুটি নিয়ে আসেননি?’

‘তিনি নিজেই নিজেকে ছুটি দিয়েছেন।’

‘নিজেকে ছুটি দেবে! চাকরিজীবী! চাকরি চলে গেছে নাকি?’

নিদান চুপ করে থাকলে চারজন যুবক-যুবতীর একে অন্যের মুখের দিকে অর্থবহ দৃষ্টিতে তাকানোতে মনে হয় নিদানের ঘোরলাগা চোখ আর আপাত-উদ্দেশ্যহীন ঘোরাফেরার রহস্য এতক্ষণে উন্মোচিত হলো।

‘কেন ভাই?’ তিনা বলে,‘চাকরি হারালেন কেন?’

‘সত্য কথা বলেননি তো?’ রাহাত চোখ সরু করে তাকায়, ‘বসের মুখের ওপর? কিংবা কোনো অডিট অফিসারকে?’ হয়তো রাহাত অবচেতনেই তার নিজের কোনো অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটায় তার কথায়, কিংবা সে আপাতনিষিদ্ধ একটি কাজকে বিবর্তনবাদের তত্ত্বে ফেলতে চায়।

মুরগিপোড়া আগুনের আভায় নিদানের চোখ অদ্ভুত দীপ্তিতে হাসে।

‘কিন্তু আপনার সত্য বলায় তো কারো কিচ্ছু যায়-আসে না। কোনো পরিবর্তন আসবে না এতে। আমরাও তো চাকরি করি, এমপস্নয়ারদের ভালো করে চিনি। বর্তমানে কারা এমপস্নয়ার হওয়ার লাইসেন্স পায় আমাদের জানা আছে। কারো কিছু হবে না, মাঝখান দিয়ে আপনি পড়বেন বিপদে। একটা মিথ্যায় কারো কিছু আসবে-যাবে না। আপনার নিশ্চয়ই ফ্যামিলি আছে। তারা ভুগবে।’

‘সব জায়গাতেই এই চলছেরে ভাই। আর যেটাকে সব জায়গাতেই চালু করে দেওয়া হয়েছে, ধরে নিতে হবে ইট হ্যাজ বিন নরমালাইজড।’ রাহাতের কথায় সমর্থন দেওয়া সুরেনের উচ্চারিত এই শব্দ কটি শুনতে অনেকটা স্বসিত্মর নিশ্বাসের মতো মধুর লাগে।

ঊষা বলে, ‘টপ টু বটম একই অবস্থা। ধরুন আপনি কমপেস্নইন করলেন, ইনভেস্টিগেশন হলো, ইনভেস্টিগেশন যারা করবে তারাও যে সোজা পথের পথিক সেটা বলা যায় না, এরাও টু পাইস কামাতে চায়। আপনি সত্যি কথা বললেন যে, আপনার বস ভ্যাম্পায়ারের মতো বস্নাড সাকার, আপনার পরিণতি কী হবে? পরিণতি চিন্তা না করেই আপনি হয়তো মিথ্যা কথাই বলবেন। আরে আমার বসের তো এমন পাওয়ারও আছে যে, এখানে আমার চাকরি তো খাবেই, অন্য কোথাও চাকরি না হয় সে ব্যবস্থাও করতে পারবে। সোজা পথে চলা মুশকিল।’ নিদান কোনো কথা না বললেও কেন সবাই সত্য কথা বলাকে চাকরিহীন হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তা তারা নিজেরাও হয়তো ভেবে দেখে না।

উৎস-প্রসঙ্গটা নিদান হলেও খুব দ্রম্নতই নিদান যেন বিস্মৃতিতে পতিত হয় এবং চার যুবক-যুবতী সমাজের ময়নাতদমেত্ম মেতে ওঠে আর এক পর্যায়ে রাহাত যখন নিশ্চিন্ত-হাসিমুখে সমাধানদাতার ভঙ্গিতে বলে যে, সত্য কথা বললে যদি চাকরি যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, অনাহারে থাকার আশঙ্কা থাকে, সন্তানের ক্ষুধার্ত মুখ দেখার আশঙ্কা থাকে, সমাজে একজন ব্যর্থ মানুষ হিসেবে পরিগণিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে তবে সত্যি কথা বলতে পারা যায় কিনা, তখনই গভীর জলের অতল থেকে যেন একটা বিশাল বায়ুপি- বুদ্বুদ আকারে উঠে এসে নিদানের বাগ্যন্ত্র দিয়ে ‘পারেন’ কথাটা উচ্চারণ করালে চার জোড়া চোখ আচমকা নিদানকে নতুন করে দেখতে পায় আর রাহাত খানিকটা জেদি কণ্ঠে বলে, ‘পারেন মানে? কীভাবে পারেন? পেট ঠান্ডা তো দুনিয়া ঠান্ডা, বুঝলেন? আগে জীবন বাঁচানো, তারপর সত্য-মিথ্যার চিন্তা। না খেয়ে থাকতে হবে জানলে কে সত্য কথা বলবে? কেনইবা বলবে?’

‘কারণ সেটা সত্য।’

নিদানের এই অতি সরল উত্তরটি অগ্নিকু-কে ঘিরে অপার্থিব এক নিস্তব্ধতার জন্ম দিলে সবারই যেন শীতটা আরেকটু তীব্রভাবে অনুভূত হয় আর বাতাসও আরো খানিকটা হিমায়িত হয়ে বইতে থাকে, যার ফলে সবাই নিজেদের আরেকটু গুটিয়ে নেয় কিংবা আগুনের আরেকটু কাছাকাছি চলে এসে আগুনটাকে উসকে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অথবা মুরগি কতটুকু সেদ্ধ হলো সেটা কাঠি দিয়ে টিপে দেখে।

‘গান হোক, গান হোক। ঊষা বউদি চুপ কেন? সুরেনদা, গিটার ধরুন।’ তিনার নীরবতা ভঙ্গে ঊষা সামান্য গলা-খাঁকারি দিয়ে সাড়া দেয়। সুরেন হাত বাড়ায় যন্ত্রের দিকে।

‘কিন্তু নিদান ভাই তো বলেছিলেন গান হবে খালি গলায়।’ ঊষা মনে করিয়ে দেয়।

‘তাই তো, তাই তো!’ রাহাতের গলায় কটাক্ষ ঝরে, ‘গান হবে খালি গলায়। গিটার-ফিটার বাদ। নিদান ভাইকে ধোঁকা দেওয়া সহজ না। ঊষা বউদি, শুরু করুন।’

‘কী গান গাব… বুঝতে পারছি না।’ ঊষা মৃদু কণ্ঠে বলে।

‘পিস্নজ, প্রেমের গান-টান না। কোনো জীবনধর্মী গান করুন, মানবতার গান।’

নিদান উঠে দাঁড়ালে মনে হয় রাহাতের উচ্চারিত মহান শব্দ দুটি যেন সংক্রামক ব্যাধি।

‘কী হলো, যাচ্ছেন কোথায়? গান শুনবেন না?’

‘ওদিকেও গান হচ্ছে।’ নিদানের উদ্যত আঙুল অগ্নিসীমার ওপারে দিকনির্দেশ করে।

‘মানে?’

নিদান চলে যেতে যেতে কিছু বলে কিনা বোঝা যায় না।

‘কাল আমরা সকাল আটটায় রওনা হবো, অলৌকিক জলধারা দেখতে।’

নিদান ঘোরলাগা চোখে পেছন ফেরে, সে একবার চারজন যুবক-যুবতীর দিকে, একবার আগুনের দিকে, আর শেষবার ঝলসানো মুরগির দিকে তাকিয়ে রওনা হলে রাহাত তাকে পিছু ডাকে, ‘শুনুন। আমাদের তো প্রাকৃতিক হওয়ার কথা ছিল। কাপড় খুলবেন না?’ স্ত্রীর চিমটিকে উপেক্ষা করে রাহাত কথাটা ঠাট্টা করে না জিদের মাথায় বলে ঠিক বোঝা যায় না। যে-কারণেই হোক সে এই সত্যের খাতিরে সত্য সমর্থক মানুষটিকে চ্যালেঞ্জ করে।

নিদান হেঁটে চলে। অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয় এবং সে এক অমোঘ আহবানে সাড়া দিয়ে হাঁটতে থাকে। চারপাশে উঁচু উঁচু গাছ শাখা-প্রশাখা প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকে কিছু একটার আশায় যেন; নিদান ক্রমশ মধুচন্দ্রিমা-কুটিরের আধুনিক আর তার সামনে প্রজ্বলিত মানবেতিহাসের আদিতম কৃত্রিম আলোর পরিধিকে ক্রমশ ছাড়িয়ে যেতে থাকলে চেহারা ক্রমাগত অন্ধকারে ঢেকে যাওয়ার আগেই তার ঘোরলাগা ভাব ক্রমবর্ধমান হয়। তার দৃষ্টি দেখে মনে হয় সে গায়েবি কিছু একটা দেখতে পাচ্ছে, হতে পারে সেটা অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ অথবা বর্তমান। যদি অতীত হয়, হয়তো সে মনের অতলে ফেলে আসা নগরের পথে পথে নিজের হারিয়ে যাওয়া দেখতে পেয়ে ভেতরে ভেতরে শুঁয়োপোকা-লাগা মানুষের মতো শিউরে ওঠে অথবা আরো পেছনে তাকালে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ দেখতে পায়; যদি ভবিষ্যৎ হয়, সে হতে পারে একটি ধ্বংসসত্মূপ দেখতে পায় কিংবা আরো একটু সামনে দৃষ্টিপাত করলে একটি অসহনীয় দুঃস্বপ্নের দিকে তাকিয়ে স্বসিত্মর নিশ্বাস ফেলে আর যদি বর্তমান হয় তবে তার এখনো একটি পথ খোলা দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অসংখ্য পত্র-পল্লব আর ডালপালা যথাসম্ভব ঊর্ধ্বমুখে প্রসারিত করে প্রার্থনারত নাগা সন্ন্যাসীর মতো স্থিরাটল বৃক্ষগুলোকে আশ্চর্য চোখে দেখতে দেখতে, হতে পারে, নিদানের মনে আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত আবাসনে ছাওয়া নাগরিক জীবনের কথা মনে পড়ে কিংবা পড়ে না অথবা পড়লেও সেখানে একটা তফাৎ থেকে যায়। যদি মনে পড়ে, তো নিদান এই বৃক্ষরাজির আহবান বোঝে, আঁধারের অঙ্গুলি হেলনে সাড়া না দেওয়ার কোনো কারণ নেই আর দর-দালানের আহবানে সাড়া না দিয়ে উপায় ছিল না কিংবা থাকলেও স্পর্ধার অভাব ছিল। নিদান যেন একটি লৌহকণার মতোই বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের আনুমানিক চৌম্বকক্ষেত্রে পতিত হয়ে অনুমানকে মান মনে করতে থাকে। বনের অচেনা-পদরেখাহীন অংশটি অবিচল গাম্ভীর্য নিয়ে কী যেন আড়াল করে আছে, কী যেন সে দেখাতে চায় না, কী যেন গোপন করতে চায়। আর কী এক অদ্ভুত অভিশাপ যেন পাক খেয়ে খেয়ে হেমমেত্মর কুয়াশায় মিশে গেছে।

 

রাহাত আর ঊষা যখন টের পেল যে তারা বনের বেশ গভীরে চলে এসেছে তখন তারা বনের বেশ গভীরে চলে এসেছে। মধুচন্দ্রিমা-কুটিরের আলো আবছা চোখে পড়ছে এখান থেকে আর বারবিকিউর আগুন নিভে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে টর্চ জ্বেলে রাহাত বলল, ‘এই দেখেন, অনেকদূর চলে এলাম, না?’

ঊষা চাদরটা গায়ে আরো ভালোভাবে পেঁচিয়ে শীতটাকে বাধা দিতে চাইল, ‘হ্যাঁ, গান নিয়ে কথা বলতে বলতে এতদূর চলে এলাম খেয়াল করিনি।’

‘শুরু করেছিলাম বর্তমান সময়ের গান দিয়ে। লালন পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম আর এত ভেতরে এসে গেলাম। ইন্টারেস্টিং।’

‘আমার কিন্তু লালনের চেয়ে রবীন্দ্র বেশি পছন্দ।’

‘সে-কথা বলছি না।’

‘তবে?’

‘আধুনিক গান দিয়ে যখন আলোচনা শুরু করেছিলাম, তখন আমরা আদিম সাজে সাজানো একটা আধুনিক পরিবেশে ছিলাম। লালনে এসে ন্যাচারাল ডার্কনেসের কাছাকাছি চলে এলাম।’

‘আচ্ছা, নিদান লোকটা কেমন অদ্ভুত না?’

‘তা একটু। হঠাৎ তার কথা?’

‘জানি না, আপনি ন্যাচারাল ডার্কনেসের কথা বললেন আর সঙ্গে সঙ্গে তার কথা মনে পড়ল।’

‘লোকটাকে কোথায় যেন আগেও দেখেছি বুঝলেন?’

‘বলেন কী? আমিও তো।’

‘কোথায় দেখেছেন?’

‘মনে পড়ছে না। যাকগে, হতে পারে লোকটার চেহারা এত কমন যে তাকে চেনা মনে হচ্ছে।’

‘হতে পারে। তবে তার গতিবিধি কিন্তু সন্দেহজনক। হাবভাব দেখে মনে হয় কোনো মতলব আছে। নয় ডার্কনেস শব্দটা শুনে তার কথা মনে আসবে কেন?’

‘হুঁ। তবে এখন আবার টেকনোলজির মোস্ট রিসেন্ট একটা আবিষ্কার দিয়ে আপনি আমাদের অ্যানলাইটেন্ড করার চেষ্টা করছেন।’

‘নিভিয়ে দিই তবে?’

‘দিন। পাহাড়ি রাগ নিয়ে আলোচনাটা কিন্তু শেষ হয়নি আমাদের। আমার খুব পছন্দ। যে-গানটা গাইলাম সেটাও পাহাড়ি রাগ। কিন্তু আপনি কী যুক্তিতে ভৈরব রাগকে পাহাড়ির চেয়ে ভালো মনে করছেন?’

‘ফিরে যাবেন? সুরেনবাবু আবার না পেয়ে খুঁজবে আপনাকে।’

‘খুঁজবে না। ও একাই ভালো থাকে।’

‘তাই নাকি?’

‘হুঁ। ও আমাকে মাঝে মাঝে জীবন্ত সিসি ক্যামেরা বলে ডাকে।’

‘আমার সঙ্গে গভীর বনে আছেন জানলে আবার সন্দেহ করে যদি?’

‘করবে না। সন্দেহ বস্ত্তটা ওর মধ্যে নেই। চলুন হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। ওই যে একটু খোলা জায়গা দেখা যাচ্ছে, ওই পর্যন্ত যাব, তারপর পাহাড়ি আর ভৈরবী নিয়ে আমরা একমত হই আর না হই, ফিরে আসব। কী বলেন? আপনার ওয়াইফ সন্দেহ করবে নাকি?’

‘করতে পারে। ওর মধ্যে এটা আছে।’

‘শুধু ওর মধ্যে না, মেয়েদের মধ্যে সন্দেহ জিনিসটা বেশি।’

‘বলেন কী?’

‘হ্যাঁ। যত মেয়ে দেখেছি সবার মধ্যেই সন্দেহ আর হিংসা। মেয়ে হয়ে মেয়েদের এই দোষটা স্বীকার করছি।’

‘এটা কি মেয়েরা জন্মসূত্রেই নিয়ে আসে?’

‘মমম, জানি না। কিছুটা বোধহয় জন্মসূত্রে। আপনার কী মনে হয়?’

‘খানিকটা বোধহয় সোশ্যাল ইনসিকিউরিটির ব্যাপারও আছে। তবে আপনার হাজব্যান্ড আপনাকে হঠাৎ না দেখলে খুঁজতে বেরোবে না এটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’

‘ও ওইরকম। আমি যে আশপাশে নেই এটা খেয়াল করতেই ওর অনেক সময় লেগে যাবে। খেয়াল করার পরও সে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করবে, ভাববে আমি হয়তো আশেপাশে কোথাও আছি বা বাথরুমে গেছি। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সে ভুলে যাবে আবারো। দ্বিতীয়বার যখন খেয়াল হবে তখন হয়তো খুঁজবে।’

‘বাদ দিন, অত চিন্তার কিছু নেই। খোঁজ পড়লে মোবাইল আছে। বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া অত সহজ না। আমি ভয় পাচ্ছি তিনার সন্দেহকে। কোনো কারণ ছাড়াই সন্দেহ করার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ওর।’

‘কোনো কারণ ছাড়া? পরনারীর সঙ্গে গভীর বনে ঘুরছেন, এটা কারণ নয়?’

‘হা হা। ওই তো, একটু আগে যা বললেন, আপনারা সন্দেহপ্রবণ।’

‘তবে তিনা ভাবিকে দেখে কিন্তু সেরকম মনে হয় না। শান্তশিষ্ট।’

‘সন্দেহের জায়গাটি ছাড়া সে শান্তই বলা যায়। আমিই বরং একটু অস্থির। তিনা তো আমাকে বন্যই বলে।’

‘সেটা আমি আগেই বুঝেছি। আমাদের মধ্যে আপনিই সবচেয়ে বেশি হইচই করেছেন। আমিও খানিক অস্থিরই।’

‘দেখে কিন্তু বোঝা যায় না।’

‘সুরেনের সঙ্গে থেকে থেকে হয়তো একটু শান্ত ভাব চলে এসেছে।’

‘হুঁ, সুরেনবাবু শান্তশিষ্ট মানুষ। দেখে বোঝা যায়। তার চলাফেরা কেমন ধীরস্থির। আমরা সবাই যখন হইচই করে ঝরনায় নামছিলাম সুরেনবাবু তখনো গরুর গাড়ির মতো ধীরে ধীরে নামলেন। ধীরে ধীরে সাঁতার কাটলেন। ধীরে ধীরে ডুব দিলেন।’

‘তার সবকিছুই আসেত্ম আসেত্ম পছন্দ। তার অফিস দশটায়, সে ঘুম থেকে ওঠে ছয়টায়। কারণ তাড়াহুড়া করে রেডি হওয়া তার পছন্দ না। কোথাও যদি বাধ্য হয়ে তাকে তাড়াহুড়া করতে হয়, সেখানে সে আর তাল ঠিক রাখতে পারে না, সবকিছু গুলিয়ে ফেলে। তার ঘাম ছুটতে থাকে। বেডেও সে প্রায়ই ঝিমিয়ে যায়।’

খানিকক্ষণ ঝিঁঝি ডাকা নীরবতা, তারপর ঊষা আবার বলে, ‘মাইন্ড করবেন না, হয়তো একটা আপত্তিকর কথা বলে ফেললাম। আসলে আমি সাইকোলজির স্টুডেন্ট তো, আমাদের ক্লাসেও এসব ব্যাপার নিয়ে টিচাররা খোলাখুলি কথা বলতেন, সেটা আবার সাবকনসাসলি প্র্যাকটিস হয়ে যেত ফ্রেন্ডদের সঙ্গে আড্ডায়। কাজেই অন্য মেয়েদের তুলনায় এসব নিয়ে কথা বলতে আমি সংকোচ বোধ করি কম।’

রাহাতের কাঁপা গলা জ্যা-টংকারের মতো শোনা যায়, ‘মাইন্ড করিনি। সেক্স জীবনেরই অংশ। আলোচনা করতে বাধা কী?’

‘আচ্ছা, তিনা ভাবির সঙ্গে আপনার মিউজিক নিয়ে কথা হয় না?’

‘হয়, খুব একটা না। ও গান ভালোবাসে, কিন্তু সে বোদ্ধা না, হতে চায়ও না। এসব রাগ-রাগিণী সে বোঝে না। কানে শুনতে ভালো লাগলে ওটাই তার কাছে ভালো গান। এজন্যই তো আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে এতদূর চলে এলাম।’

‘আমার অবশ্য একটু ভয় করছে, সীমা লঙ্ঘন করে ফেললাম কিনা।’

‘কীসের সীমা লঙ্ঘন? সেক্সের কথা বলেছেন তাই? ওটা কিছু না, বললাম তো। আপনার মতো সেম অভিজ্ঞতা আমারও হয়। আমিও সেক্সের সময় স্বেচ্ছাচারিতা পছন্দ করি। ওর মধ্যে আবার সেটা নেই। নানা বিধিনিষেধ আছে। এখানে হাত দেওয়া যাবে না, ওখানে মুখ দেওয়া নিষেধ, আরে সেক্স করার সময় যদি হুঁশজ্ঞানই রাখতে হবে, তবে তো সেটা লোকচক্ষুর আড়ালে করার মানে হয় না।’

‘হুঁ। আমিও অনেকটা সেরকমই মনে করি। আমার স্বামী আর আপনার স্ত্রীর মধ্যে বেশ মিল দেখতে পাচ্ছি। আমি অবশ্য ভাবছিলাম ভ্রমণে এসে আমার জন্য আপনাদের মধ্যে একটা সন্দেহ তৈরি হয় কিনা। তিনা ভাবি সম্পর্কে যা বললেন…’

‘অত চিন্তা করে লাভ নেই। খুঁজলে তো ফোন দেবে। আর তখন দরকার হলে আমরা দুজন আলাদা আলাদা যাব।’

ওরা দুজন পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পেত কুটিরের আলো দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করেছে আর ওরাও পেরিয়ে এসেছে আলোর শেষ রেখাটুকু। ওদের যেন দৃষ্টি সয়ে এসেছে আর একটু আগে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে যেখানটায় দৃষ্টি চলে না বলে মনে হচ্ছিল, সে-জায়গাটাও ওরা এখন ক্রমশ পেরিয়ে যাচ্ছে। থকথকে অন্ধকারে কালিগোলা আঁধারের ছোপছোপ অংশকে ওরা এঁকেবেঁকে এড়িয়ে চলছিল আর একই সঙ্গে পরস্পরের শরীরে ধাক্কা লাগা এড়াতে চাইছিল।

 

স্বামী এবং স্ত্রীকে দীর্ঘক্ষণ অনুপস্থিত দেখতে পেয়ে এবং বারবার চেষ্টা করেও গতিশীল-দূরালাপনী বন্ধ পাওয়াতে বনের ভেতর বিমূর্ত জাল দুর্লভ ধারণা করে অনেক খুঁজেও এখানকার কোনো নিরাপত্তা প্রহরী কিংবা সাহায্য করতে পারে এমন কাউকে খুঁজে না পেয়ে জীবন সঙ্গী-সঙ্গিনীর অচেনা বিপদাশঙ্কায় দূরালাপনীর আলো জ্বালিয়ে সুরেন আর তিনা বনের ভেতর ঢুকে পড়ার পর বারবার সংযোগ পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে এবং বিচিত্র সব প্রাকৃতিক-অপরিচিত আওয়াজ শুনে চমকে উঠতে উঠতে হতাশ হয়ে চিৎকার করে ডাকা শুরু করবে কিনা ভাবছিল আর তখনই অদূরে একটা পুরুষ কণ্ঠের বেসুরো আওয়াজ পাওয়া গেল যেটাকে কোনো আনাড়ি গায়কের কণ্ঠে কিংবা আনাড়ি শ্রোতার কানে প্রথমে ভাওয়াইয়া গান এবং মিনিটখানেক পরে একজন কামাতুর-সঙ্গমরত পুরুষের গোঙানি বলে মনে হলেও মুহূর্তপরে দুজনেই বুঝতে পারল ওটা কোনো ভাওয়াইয়া গান বা কামোচ্চারণ নয়, বরং জীবনেও গান-না-গাওয়া কেউ একজন অর্থবহ কোনো শব্দ উহ্য রেখে কিংবা কোনো অর্থ না বুঝিয়েই গোঙাচ্ছে। সেই শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলে কেমন হয় – সুরেনের এই প্রস্তাবে তিনা খানিকক্ষণ দ্বিধা করে এবং আরো বারকয়েক বহনযোগ্য দূরালাপনীর অসুলভ জালে প্রণয়ীকে বন্দি করার ব্যর্থ চেষ্টা করে অগত্যা কাঁধ ঝাঁকিয়ে রাজি হলে দুজন একত্রে অর্থহীন শব্দের উৎস সন্ধানে ব্যাপৃত হয়। সন্তর্পণে কাঁটাঝোপ-গুল্ম-মহীরুহ আচ্ছাদিত অন্ধকারের ফাঁকফোকর গলে তারা একসময় নিজেদের বনের কোনো এক প্রান্তসীমায় আবিষ্কার করে যেখানে হঠাৎ করেই গাছগাছালির ঘনত্ব কমে যাওয়াতে অন্ধকার খানিকটা ফিকে-তরল। জঙ্গলের প্রান্তসীমার শেষ গাছটির গোড়ায় ঝোপঝাড়ের ঘনত্বকে উসকে দেওয়া একটি ঘনীভূত অসিত্মত্ব বেশ ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়ালে সুরেনের মনে হয় ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম সেরে কোনো পূজারি উঠে দাঁড়াল আর তিনার কাছে সেজদাশেষে একজন নামাজির উঠে আসার দৃশ্য ধরা দিলো। দুজনে ভয়ে খানিক দূরেই দাঁড়িয়ে পড়ে এবং দূরালাপনীর উপরি পাওনা – মশাল সেই ঘনীভূত অসিত্মত্বকে এটুকু দূরত্ব থেকে দৃষ্টিকে সহজ করতে যথেষ্ট নয় উপলব্ধি করে সামান্য কম্পিত গলায় সুরেন ‘কে?’ প্রশ্নটি উচ্চারণ করলে অনতিবিলম্বে বৃষ্টি বহনকারী মেঘের গুরুগুরু নিনাদের মতো উত্তর আসে, ‘আমি নিদান।’

হঠাৎই খানিকটা স্বসিত্ম বোধ করে এবার তিনা জিজ্ঞেস করে, ‘ঊষা বউদি অথবা রাহাতকে দেখেছেন? খুঁজে পাচ্ছি না। মোবাইলের নেটওয়ার্কও নেই এখানে।’

নিদান নিস্তরঙ্গ গলায় বলে, ‘আছে। চলে আসবে।’

‘না, ভাবছি কোনো বিপদ হয় কিনা। বনজঙ্গল জায়গা।’

‘এখানে কোনো বিপদ নেই। কোনো ভয় নেই। বন যত গভীর, তত ভয় কম।’

‘গভীর আর কোথায়? এখানে তো জঙ্গল শেষ দেখছি।’

‘এই মাঠের ওপারে আবার জঙ্গল শুরু। সেখানে কোনো মানুষের হানিমুন হয় না। সেটা আরো নিরাপদ।’

‘বলেন কী? ভয়ে শুনেছি ওখানে মানুষজন ঢোকে না। কী সব কিংবদন্তি নাকি আছে ওটাকে ঘিরে। নিরাপদ মানে?’

‘কিংবদন্তি নিরাপত্তাকে জোরদার করে।’

‘কী বলছেন বুঝতে পারছি না।’ মোবাইল টর্চের বোতামের ওপর সুরেনের আঙুল আলগা হয়ে এসেছে নিদানের কথা শুনতে শুনতে আর সেই নিরেট মানবাকৃতির অন্ধকার খানিকটা এগিয়ে এসেছে ওদের দিকে।

‘না বোঝাও নিরাপদ।’ নিদান এ-কথা উচ্চারণ করার পরপরই তিনার টর্চবিহীন মোবাইলে একটা ডাক আসে আর সেই হলদেটে আলো নিদানকে আভান্বিত করলে ওরা দুজন আদিম অন্ধকারে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিভ্রান্তিকর ফ্যাকাশে আলোয় একটি পশমহীন নগ্নদেহ দেখে যেখানে যৌনকেশ একমাত্র কালিমা। তিনা অদ্ভুত সুরে গুঙিয়ে উঠলে সুরেন নিজের স্তম্ভিত ভাব কোনোমতে সামলিয়ে তিনাকে টেনে দূরে নিয়ে আসে এবং খানিক পরই দুজনে এমন ভাব করতে থাকে যেন কিছুই দেখেনি ওরা। বরং মোবাইলে দুই দাগ হলেও যোগাযোগ পাওয়া গেছে জেনে উৎসাহিত হয়ে ঊষা এবং রাহাতকে ফোন করলে সুরেন এবং তিনাকে কটেজের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলে অন্য দুজন।

বনের দুই প্রান্ত থেকে দুজন বেরিয়ে আসার পর সুরেন এবং তিনা যার যার জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পেলে আপাত নিখোঁজ দুজনের অজুহাত দেওয়ার পালা শুরু হয়। খানিক পর ঊষা কটেজের ভেতর ঢুকে গোসলখানার দিকে এগোলে এবং রাহাত একটু কোনায় সরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালে ঊষার থরথর চোখের পাপড়িতে এবং রাহাতের কম্পমান হাতে ধরা সিগারেটে কাঁচাঘুম ভাঙা অনিদ্রা রোগীর অসমেত্মাষ ঝরে পড়তে থাকে।

 

এই চারজন যুবক-যুবতীর মুখে আর একবার বাদে কখনো ‘নিদান’ শব্দটি উচ্চারিত হতে শোনা যায়নি – অন্তত যতদিন ওরা এখানে ছিল। সুরেন এবং তিনা বোধকরি সচেতনভাবেই প্রায়ান্ধকার বনপ্রামেত্ম গাছের সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকা এক আদিম মানবের ইটচাপাঘাস রঙের নগ্নদেহের দেখা পাওয়ার কথা চেপে গিয়েছিল আর অন্য দুজন হয়তো নিজেদের হঠাৎ বলকানোপ্রায় অবদমিত আদিমতার অসমেত্মাষকে চাপা দিতে গিয়ে বিস্মরণ হয়েছিল স্বল্পপরিচিত যুবকটিকে কিংবা যার যার শোবার ঘরের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় পরস্পরের শয্যাসঙ্গীর কাছে হয়তো এ-কথা প্রকাশ করে থাকবে যেটা ওই দরজার ওপাশেই রয়ে যাবে অনাদিকাল; আবার হতে পারে তিনা কখনো বা শরীরের ওঠানামার কোনো এক চরম মুহূর্তে অমূলপ্রত্যক্ষণের মতো নিজের শরীরের ওপর উবু হয়ে থাকা অতিপরিচিত লোকটির মধ্যে হঠাৎ সেই পশমহীন দেহ দেখতে পাবে এবং সাজানো শোবার ঘরটি হঠাৎ বিবর্তিত হবে সেই বনপ্রামেত্ম। পরিকল্পনা অনুসারে অলৌকিক জলধারা দেখার বিস্ময় শেষ হতে না হতে যখন তারা ভ্রমণের শেষ দিনটিতে পৌঁছে গেল তখন পথিমধ্যে তিনা দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আচ্ছা, নিদান লোকটা গেল কোথায়? কাউকে কিছু না বলে হাওয়া!’ এ-কথার জবাবে সুরেন তিনার দিকে একটি চকিত দৃষ্টি হেনেছিল কিনা বলা মুশকিল। কারণ ততক্ষণে সে ব্যস্ত চোখে দুপাশের জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড় দেখতে দেখতে হয়তো ভাবছিল বনপ্রামেত্ম মাঠের ওপারের সেই কিংবদন্তির জঙ্গলের অবোধ্য নিরাপত্তার কথা কিংবা হয়তো কল্পনা করতে চেষ্টা করছিল ওই ভালুকের মতো পাহাড়ের ঘন পশমের ভেতর কোথাও নিদান এখনো নগ্নগাত্রে রং বদলে ঘুরছে কিনা সেই কথা, আবার হতে পারে নিদান একজন পুরুষ না হয়ে নারী হলে কেমন হতো তা চিন্তা করে সে তিনার প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করে।

 

ছুটি ফুরিয়ে এলে যখন আবার এই চার যুবক-যুবতী একই সান্ধ্য ট্রেনে রাজধানীর পথে রওনা হয় ঠিক সেই অপরাহ্ণে সেই মুহূর্তে আরো কয়েকটি বনপ্রান্ত পেরিয়ে আরো গোটাকয়েক কিংবদন্তির মাঠ মাড়িয়ে গিয়ে নিদান আরেক বনপ্রামেত্ম উপস্থিত হয়ে চোখের সামনে সেই অলৌকিক জলধারার উৎসটি আবিষ্কার করে, পর্যটকেরা যার শুধু প্রবাহিত একটি অংশমাত্র দেখতে পায়। একমাত্র নিদানের পদচিহ্নপ্রাপ্ত এই পাহাড়ের ঢালে একটি সমতলের বিশাল ফাটলকে অলৌকিক এই জলধারার উৎস হিসেবে আবিষ্কার করে নিদানকে খুব একটা বিস্মিত হতে দেখা যায় না। তার চোখে এক ধরনের অদ্ভুত আনন্দমিশ্রিত অব্যাখ্যেয় কৌতূহল চোখে পড়ে আর পরমুহূর্তেই সে হাঁটুগেড়ে বসে গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদতে থাকে – সেদিনও এই ধরনের গোঙানিকেই সুরেন এবং তিনা ভাওয়াইয়া গান কিংবা অর্থহীন কামোচ্চারণ মনে করেছিল। শেষে সে নিজের শরীরটাকে খুব হালকা অনুভব করে এই জলস্রোতের ওপর চিৎ করে ভাসিয়ে দিলে মনে হয় এর উৎসে নয়, গন্তব্যে তার আগ্রহ। অলৌকিক জলস্রোত তাকে মসৃণ গতিতে ভাসিয়ে নিয়ে চলে – হয়তো এখনো কিংবদন্তির অপেক্ষায় থাকা কোনো কিংবদন্তির দিকে। এর আবিষ্কৃত অংশটুকুতে তখন যদি বিগত চার যুবক-যুবতীর মতো আরো কোনো পর্যটক উপস্থিত থাকে আর সেই মুহূর্তে যদি জলস্রোতের স্বেচ্ছাচারী টানে নিদান ওই জায়গা অতিক্রম করে, হয়তো উপস্থিতরা প্রথমে দূর থেকে তাকে এই রহস্যময় অসীম জলস্রোতে একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাঠের গুঁড়ি ভাববে কিংবা কারো হাতে যদি দূরবীক্ষণ যন্ত্র থাকে তবে সে পুরোপুরি নিজের চোখকে বিশ্বাস করে বিস্ময়ে উপনীত হওয়ার আগেই নিদান পেরিয়ে যাবে আবিষ্কৃত এলাকার দৃষ্টিসীমা অথবা এই অলৌকিক জলধারার সঙ্গেও সে রূপ বদলে একাত্ম হয়ে যায় কিনা! কে জানে নিদান আদৌ কোনোদিন এই অলৌকিক-আপাত অসীম স্রোতস্বিনীর শেষ গন্তব্য আবিষ্কার করতে পারবে কিনা কিংবা আদৌ এর কোনো গন্তব্য আছে কিনা। r

Leave a Reply

%d bloggers like this: