তাবিজ

লেখক: সাদিয়া সুলতানা

সাদিয়া সুলতানা
১.
জয়নব বছর বিয়োনি। দশ বছর হলো ওর বিয়ের। একটা বছরও শান্তি পায়নি জয়নব। নারী শরীরের অনুর্বরতা যেখানে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায় সেখানে নিজ শরীরের ধারণক্ষমতায় খুশি না হয়ে সকাল থেকেই নিজেকে অভিশাপ দিচ্ছে জয়নব। মাঘ মাসের এই অসহনীয় শীতের সাথে শরীরের বেকায়দায় অবস্থা জয়নবকে আরও অসহায় করে তুলেছে। এই বছর শরীর আর টিকবে না। গত বছরও এমন মনে হয়েছিল জয়নবের। কিন্তু ওর শাশুড়ি সুফিয়া বেগম কোথা থেকে যেন তাবিজ কবজ নিয়ে আসে আর পড়া পানি খাওয়ায়!
নাতিতো হয়ই না শুধু জয়নব বুঝি সেই তাবিজের জোরেই টিকে যায়। গেলবারও জয়নব টিকে গেল যদিও বাচ্চাটা টিকল না। এই নিয়ে তিনখানা বাচ্চা আঁতুড় ঘরেই মরে গেল। ঘরে প্রায় সমবয়সী পাঁচ সন্তানের কিলবিলানি সহ্য হয় না জয়নবের। তাই সদ্যজাত কোনো সন্তানের মৃত্যু এখন আর বিচলিত করে না তাকে। আর দুঃখ করার সময় কোথায় ওর! একটু দম নিতে না নিতেই হাভাতের গুষ্ঠি থালা-মগ নিয়ে চলে আসে, মা খাওন দে…খাওন দে!
উঠোন ঝাঁট দিতে দিতে জয়নবের পিঠে টান লাগে। পেটের ভেতরের জনও ভাতের জন্য আথালি-পাথালি করছে। জয়নবের শরীর গত বছরই বেশ ভেঙে গেছে। পানি ভাত, শাক আর আলু ছানায় কত টিকে শরীর! তার উপর আবার বছর বছর বিয়োনো! জয়নবের সব রাগ যেয়ে পড়ে শাশুড়ির উপর। আর রাগ উঠলেই জয়নব প্রথমে চোখের সামনে শফু, জরি, মলি, জলি, কলি যেটাকে পায় ধুপধাপ লাগায় ক’ঘা। এখন কাছে পিঠে একটাও নেই। পাঁচ মেয়ে জয়নবের।
জয়নবের বড় মেয়ে শফুর বয়স নয় বছর। ছোটটার বয়স দুই পার হয়নি। নাম কলি। মুখে সব কথা না ফুটলেও ‘খিদা’ শব্দটা ফোটে খইয়ের মত। শফু আর জরি স্কুলে গেছে। ভালোই পড়ে নাকি দুজনে। জয়নব ওইসব বোঝে না। শুধু বিনা পয়সার স্কুল ভেবেই মনের মাঝে স্বস্তি। ছোট তিনটা একসাথে কোথায় গেল? পাশের বাড়ি হাসিদের উঠোনেও তো দেখা যাচ্ছে না। বুকের ভেতর কেমন ধড়ফড় করে জয়নবের। আজকাল শরীরে যেমন কাজের ধকল সহ্য হয় না তেমনি কোনো বিষয় নিয়ে বেশিক্ষণ চিন্তাও সহ্য হয় না। মাথার দু’পাশে দপদপ করতে থাকে। বরাবরের মত সেই অদৃশ্য দপদপানি বাড়তে বাড়তে ধৈর্য্যরে বাঁধ ভেঙে যেয়ে তুমুল গর্জন শুরু করে জয়নব। জোরে ডাক দেয়, মলি…ইইই। চিৎকার করতে করতে হাঁফিয়ে ওঠে জয়নব। তবু তিনটার দেখা পাওয়া যায় না।
খানিকক্ষণ পরে উঠোনে কারো ছুটোছুটি শোনা যায়। মায়ের গগণবিদারী চিৎকার শুনে তিনটাই ছুটতে ছুটতে বাড়িতে ঢোকে। ছোটটা পিছনে পড়ে গেছে। মলি, জলি কাছ আসতেই দুই হাতে দুইটার কান ধরে কাছে টানে জয়নব,
-হারামজাদিরা…ডাইক্যা পাড়া মাথায় তুলছি…কই গেছিলি শয়তানের দল…।
-দাদীর লগে ঘাটে গেছিলাম। এহন শাক তুলতাছি। ছাইড়া দেও মা…
জয়নব এখন কোনো উত্তরেই সন্তুষ্ট হবে না, সেই নিয়তই করে রেখেছে। মলি আর জলির পিঠে দু’তিনটা কষে চড় বসায়। নিজেদের দোষের মাত্রা পরিমাপ করতে না পেরে দুই বোনই মায়ের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে। কিন্তু সেই চেষ্টা বৃথা হতেই দুই বোনই কান্না শুরু করে। দুই বোনের এই দুরাবস্থা দেখে কলি চুপ করে আপাত নিরাপদ আশ্রয় বড় ঘরে ঢুকে যায়। মলি এইবার মায়ের উপর রেগে যায়। মায়ের কাছ থেকে শেখা গালি মায়ের উপরই প্রয়োগ করে সে,
-ছাড় হারামজাদি…নাইলে তোর পেটে ঘুষি মারমু…
এতক্ষণের অনুনয়ে যে কাজ হয়নি, এইবার মুহূর্তেই তা হয়ে যায়। জয়নবের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে বিদ্যুতের গতিতে দুই বোন বাড়ির বাইরে চলে যায়। মাতৃত্বের সহজাত সচেতনতায় জয়নবের মনের রাগ চলে যেয়ে আতংক এসে ভর করে। যদি সত্যিই ঘুষি মেরে বসতো! আবার আনমনা হয়ে যায় জয়নব। কিসের এত ভয় তার? তবে কী ছেলে সন্তানের সাধ মরেনি বেহায়া জয়নবের? ছেলে সন্তানের শখ তাহের মিয়ার মিটেছিল তিন মেয়ের পরেই।
কিন্তু সুফিয়া বেগমের সাধ মেটে না। দুপুরের সূর্য হেলবার আগেই নাতনিদের সারি করে বসিয়ে মাথায় তেল লাগান আর বিলাপ করেন, জুম্মাবারে আমরার ব্যাটার হাত ধইরা নামাজ পড়তে যাইবো ক্যাডারে…আমরার আর ব্যাটার কব্বর জিয়ারত করবো ক্যাডারে…শুনে শুনে জয়নবের চেয়ে বেশি রেগে যায় শফু। মাঝে মাঝে নারিকেল তেলের শিশিতে লাথি মেরে দৌড়ে পালায়, তুই মর বুড়ি এহনই…আমি তোর কব্বরে যামু…
মেয়ে দু’টোর সাথে ধস্তাধস্তি করায় কেমন ক্লান্ত লাগে জয়নবের। সকালেই এক পেট খেয়েছে জয়নব। এখনও বেলা বাড়েনি। দুপুরের রান্নাই চড়েনি। সুফিয়া বেগম পুকুর ঘাটে গেছে চাল নিয়ে। ফেরার সময় ক’টা শাক তুলে আনার কথা। শাশুড়ি ফিরলে চুলা ধরাবে জয়নব। তবু সময়ের আগেই অসময়ের ক্ষুধা জয়নবকে অস্থির করে তোলে। ভেতর ঘরে ঢুকেই টিন হাতড়ে কয়েকটা মুড়ির মোয়া পায়। ঠা-ায় মিইয়ে যাওয়া মোয়া চিবোতে চিবোতে জয়নবের দু’চোখ ভরে পানি আসে। কলি মায়ের নীরবতা দেখে দরজার আড়াল থেকে এসে মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। ওর চোখের ভাষায় ক্ষুধার আকুতি। জয়নব একটা মোয়া মেয়ের হাতে দেয় আর নিজেও কামড় দেয় মোয়ায়। শুকনো মোয়া জয়নবের গলা দিয়ে নামে না। পেটের ভেতরের তোলপাড়ে জয়নবের বুকের ভেতর অভিমান জমতে থাকে। স্বামীর উপর নিষ্ফল অভিমান। মানুষটাও কী বোঝে তাকে? বোঝে খালি চাষ-বাস! চাষার ব্যাটা চাষা!
ক্রমশ জয়নবের অভিমান রাগে রূপান্তরিত হয়। আর যথানিয়মে সব রাগ গিয়ে পড়ে শাশুড়ির ওপর। কী দরকার আছে বুড়ির এইসব তাবিজ কবজ আনার! মাথার মাঝখানে সিঁথি থেকে খোঁপা বরাবর হাতড়াতে থাকে জয়নব। কোথায় গেল? আজ সাত সকালেই তো বুড়ি জয়নবের মাথায় একখানা তাবিজ গুঁজে দিয়ে পুকুর ঘাটে গেল। পুব পাড়ার কোন পীর বাবার কাছ থেকে সইয়ের মাধ্যমে খুব গোপনে তাবিজখানা আনিয়েছেন সুফিয়া বেগম। প্রতিবারই বিয়োবার সময় এলে কোনো না কোনো তাবিজ গুঁজে দেন সুফিয়া জয়নবের খোঁপায়। খোঁপা বরাবর জয়নব এইবার তাবিজটা খুঁজে পায়। মনের রাগ ঝাড়বার নতুন উপাদান পেয়ে সময় নষ্ট করে না জয়নব। চৌকির কোণে তাবিজটা ছুঁড়ে মারবার পর ওর মনটা শান্ত হয়ে আসে।
২.
আলো যেখানেই যায় পেছন পেছন যায় ওর নাতি। আলোর নাতি সোনা বেশ ফুটফুটে। আলোর কপালটাই বেশ। ছেলের ঘরে এক নাতি আর নাতনি। আর দুই মেয়ের ঘরে তিন নাতি। আলোর সাথে সুফিয়া সই পাতিয়েছেন বহু বছর ধরে। যেদিন বউ হয়ে এই গ্রামে এলেন, তারপর থেকেই তাদের দুইজনের মধ্যে সইভাব। সুখে-দুঃখে দুই জন মানুষ মিলেমিশে এক সাথে চলতে চলতে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন তবু আজকাল মনে মনে কেমন একটা হিংসেবোধ সুফিয়ার বুকের ভেতরটা কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। এই যে আলোর নাতি সোনা দাদীর সাথে মনোযোগ দিয়ে শাক তুলছে, এই দৃশ্য তাকে মুগ্ধ করার বদলে বুকের ভেতরে অর্থহীন এক জ্বালা ধরায়।
মলি, জলি ছুটতে ছুটতে দাদীর কাছে চলে এসেছে। মায়ের মার দেবার ঘটনা বিশদ বর্ণনা করতে করতে দু’জনেই আবার কেঁদে ফেলে। নাতনিদের প্রতি দরদে এবার সুফিয়া বেগমের মন দ্রবীভূত হয়ে যায়। বড় তেজ বাড়ছে বেটির! বারোবিয়ানির আবার তেজ! সুফিয়া আপন মনেই বকতে থাকেন আর ভাবেন বাড়ি গিয়ে একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বেন। চট করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে টের পান কোমর ধরে গেছে। সুফিয়া একটু বসে নিয়ে সই এর কাছ থেকে বিদায় নিতে যাবেন তখনই আলো বিবি তাকে পিছু ডাকেন,
-যাওগা সই? আরেকটু শাক তোলো। এই কোণে কতগুলান আতাড়ি-পাতাড়ি শাক আছে। এহনও কারো চোক্ষে পড়ে নাই। আরেকটু নাও। এতজন মাইনষের এইটুকুতে হইবো না তো সই।
সই এর উৎকন্ঠিত মুখ দেখে সুফিয়া আবার বসে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দেয়,
-আইজকাল আর আগের লাহান বেলা ধইরা বইয়া থাকতে পারি না। মাজা লাইগা আসে। তোমার দুলাভাই মইরা যাওনের পর থেইকা আর জোর পাইনা কিছুতে।
-কী করবা? আমারে ছাইড়া তো তোমার দুলাভাই আরও আগে দুনিয়া ছাড়লো। এহন এই নাতিডার মুখ চাইয়া বাইচ্যা আছি।
নাতির প্রসঙ্গ আসতেই সুফিয়ার গলায় আবার পুরনো আক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে,
-আমার তো হেই কপালও নাই। মাগীর আবার তেজ বাড়তাছে দিন দিন। বারোবিয়ানি! তাও নাতির সমবাদ নাই।
আলো এবার সইয়ের গা ঘেঁষে বসে। এবার সীমাহীন গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন করে,
-তাবিজখানা দিছিলা?
-দিছিলাম। মাগীর বড় তেজ। কইলাম, অযু কইরা আসতে। হের পর তাবিজখান দেই…কয় এহন ঠা-া পানি ছুঁইতে পারমু না! দিলে দ্যান, না দিলে নাই! ঠ্যাকা য্যান আমার!
সইয়ের কাছে নিজের দুর্ভাগ্যের কথা বর্ণনা করতে আর ভালো লাগে না সুফিয়ার। আজকাল সই এর সংস্পর্শে সুুফিয়ার অর্ন্তজগতের রক্তক্ষরণ বন্ধ তো হয়ই না বরং সই এর ¯েœহময় কন্ঠে তা বেড়ে যায়। আলো বিবি আর সোনার সাথে বেশি সময় কাটালে ¯েœহবাৎসল্যতার একরৈখিক বিচরণ তাকে কাবু করতে করতে শেষ পর্যন্ত স্বার্থপর করে তোলে। নিজের বেদনা আবিষ্কার করেও আলো বিবির কাছে তা প্রকাশ করতে তার ইচ্ছে হয় না তখন। সুফিয়া জানে এই গভীর অর্ন্তদর্শন বোঝবার ক্ষমতা তার সই এর নেই। তাছাড়া আলোর সামনে নিজেকে প্রকাশ করতে ভয় হয়। যদি তার জীবনের অপ্রাপ্তি থেকে উদ্ভুত গোপন হিংসাবোধ সইয়ের প্রতি আচরণে তাকে ভারসাম্যহীন করে তোলে? তা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে খুঁজতে সুফিয়া শেষ পর্যন্ত বলে ওঠে,
-তোমার ছেলে বউ আর মায়াগোর তো সোনার পেট। না চাইতেই পায়। আর আমারে দেহ… তিনখান সন্তান নষ্ট হয়া এক ছাওয়ালই টিককা রইল। তার ঘরে পুতের খবর নাই। এই নিয়া বউ নয়বার বিয়াইতে লাগছে। কী হয় আল্লাহ মালুম!
সুফিয়া একটানা কথা বলে দম নেয়। সই’য়ের মনের কথা বুঝতে পেরে আলো বিবি তার কাছে আসে। অকৃত্রিম দরদে পিঠে হাত বুলিয়ে সুফিয়াকে আশ্বস্ত করে,
-এই পীর বাবার তাবিজের জোর অনেক। এইবার ফল পাইবাই সই।
আলো বিবির মুখের দিকে তাকিয়ে সুফিয়ার কুঞ্চিত ভ্রু ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়। সইয়ের কথা বড় ভালো লাগে সুফিয়ার। দুই সইয়ের ভাবনার দূরত্ব আচমকা কমে আসে। চোখের ভাষাতেই পরস্পরের সাথে সন্ধিপূর্ণ বোঝাপড়া হয় যেন। নাতনিদের হাত টেনে বসান সুফিয়া। সবাই আবার শাক তোলায় মনোযোগ দেয়। ধীরে ধীরে ঝুড়ি ভরে ওঠে। সুফিয়া বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সামনে তাকান। সবুজ জমির অপার সম্ভারের সাথে সাথে তার চোখের সামনে ভবিষ্যতের হিজিবিজি কিছু সুখচিত্র ভেসে ওঠে।
৩.
কৃষকের ব্যস্তময় দুপুরে ভাত ঘুম ঘুমোবার সুযোগ ঘটে না বলে রাতের ঘুমটা বড় নিরবচ্ছিন্ন হওয়া চাই। সারাদিনের পরিশ্রম তো আর কম না। তাছাড়া শীতের শেষে সরিষা তোলার সময়ে খুব সাবধানী হতে হয়। দিনের বেশকম হলেই সরিষার বীজ ফেটে দানা ঝরে পড়া শুরু করবে। তখন জমিতেই মুখ থুবড়ে পড়বে এত দিনের পরিশ্রম। তাহেরের নিজের যতটুকু জমি তা থেকে সময়মত ফসল পেতে গেলে একটা কামলা লাগালে হয় না। এক কামলার রোজও এখন অনেক। তাই জানু কামলার সাথে নিজের জমিতে নিজেই দিনভর কামলাগিরি করে তাহের। সরিষা ঘরে তুলতে তবু আরও দিন দুই লাগবে। সারাদিনের খাটুনির সাথে পাল্লা দিয়ে পেটে খাবার পড়ে না বলে শরীরের জোরও দিন দিন কমে আসছে। তাই আজকাল ক্লান্তিও খুব তাড়াতাড়ি কব্জা করে ফেলে তাহেরকে। পাশের চৌকিতে তাহেরের পাশে মলি ঘুমিয়েছে। আর জয়নবের দুইপাশে জলি আর কলি। সাত ফিট বাই আট ফিট ঘরে দুইটা চৌকি। পাশের ছোট ঘরে মা, শফু আর জরিকে নিয়ে শোয়।
স্বামীর নিশ্চল শরীর দেখে জয়নব বুঝে যায়, এই ঘুম সহজে ভাঙার নয়। কলি চাপতে চাপতে একেবারে জয়নবের বুকের মধ্যে এসে পড়েছে। শীতের রাতে কলি মায়ের বুক ঘেঁষে শুয়েও স্বস্তি পাচ্ছে না। পুরাতন কম্বলের উপরে মোটা কাঁথা গায়ে জড়ানো থাকলেও মাঝে মাঝেই দুধের নেশায় মায়ের বুকে মুখ ঘঁষছে। জয়নব মেয়ের উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করে ওকে পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে দেয়। এরপর শরীরের বেখাপ্পা অংশকে নিয়ে ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। তার সতর্ক চাহনি রাতের নীরবতা আর পাশে শোওয়া ঘুমকাতর মানুষগুলোকে পরখ করে নেয় একবার। গর্ভবতী শরীরের স্বাভাবিক নিয়মে শেষের মাস দু’টিতে বারকয়েক প্র¯্রাবের জন্য মাঝরাতে বাইরে যেতে হয় তাকে। কিন্তু জয়নবের আজকের পরিপাটি সচেতনতা রাতের নিস্তব্ধতার কাছেও ভিন্ন অর্থ বহন করে। মনের ভেতর কী এক অপার্থিব ভাবনার ঘূর্ণি পাক খায়। গাঢ় অন্ধকারে বাড়ি ঘরের সাথে পুরো গ্রাম যেন নিঃসাড় পড়ে আছে। মাঝে মাঝে দু’একটা কুকুরের ডাক রাতের নীরবতাকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
নিজের পরিচিত গ-ির ভেতরে অন্ধকারেও অনায়াসেই জয়নব কুপিটা খুঁজে পায়। ম্যাচের কাঠিতে কুপি জ্বলে উঠলে জয়নব কম্পিত দৃষ্টিতে চারপাশের দৃশ্যগুলোকে আরেকবার দেখে নেয়। কুপির আলোয় অন্ধকারে রহস্যময় নকশার সৃষ্টি হয়। চৌকির ধারে একবার হোঁচট খেতে যেয়েও নিজেকে সামলে নেয় জয়নব। তার শরীর কেঁপে ওঠে। এবার ভয় করে জয়নবের। জয়নব যেন খাদের কিনারে দাঁড়ানো। একটু হেললেই নিশ্চিত পতন! কী এক যন্ত্রণাকাতর অনুভূতিতে শরীরটা ভারি লাগে। তবু কী যেন ভেবে নিয়ে শরীরের সাথে সাথে নিজেকে সামলে নেয়। নিয়তিকে নিজ মুঠোতে আনার তীব্র আকাঙ্খায় তার ভয়ার্ত অনুভূতি আবার পরাজিত হয়। এখন জয়নব নিজের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতির টের পায়। কিন্তু এর পেছনের কারণ সে বুঝতে পারে না। রাতের মতোই এই অনুভূতি যেন প্রগাঢ় রহস্যময়তায় আচ্ছন্ন।
চুপি চুপি চৌকির পশ্চিম কোণে হাঁটু গেড়ে বসে কুপিটা এগিয়ে ধরে জয়নব। কুপির ম্লান আলোতেও তাবিজটা ঠিক চোখে পড়ে। চারপাশে আবার তাকিয়ে জয়নব আস্তে করে মেঝেতে বসে পড়ে। তারপর যেন নিজেকেই ফাঁকি দেয় জয়নব। চুপ করে তাবিজটা তুলে নিয়ে খোঁপার মধ্যে গুঁজে নেয়। ছোট একটা কাজ করতেই জয়নব হাঁফিয়ে যায়। নিজের মাথায় হাত রেখে বারকয়েক আল্লাহ-রসুলের নাম নেয় আর নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায়। বাসনার যে বীজ তার মনের ভেতর রোপিত হয়েছিল, তার পরিচর্যা করে নিতেই মনের ভেতর চলতে থাকা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে যায়। এবার এক ফুঁ এ কুপিটা নিভিয়ে দিয়ে জয়নব চৌকিতে বসে।
কুপি নিভে যেতেই কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের রহস্যময়তা আরও বেড়ে যায়।