নীলিমার ওপারে পাহাড় তুলতে তুলতে

লেখক: আবেদীন কাদের

একটা সময় থাকে যখন কিশোর বয়সে শিক্ষকদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী আমরা বইপত্র পড়ি। পরে খবরের কাগজ এবং সাহিত্য পত্রিকার দেওয়া তথ্যানুযায়ী ভালো বই খুঁজে বের করি। দেশে থাকতে আমার অগ্রজ লেখকদের কথা অনুযায়ী পড়তাম, পরে দেশ পত্রিকাসহ কয়েকটি ভালো লিটলম্যাগ যেমন অনুষ্টুপ বা কবিতীর্থ ইত্যাদির গ্রন্থ-সমালোচনা দেখে বুঝতে পারতাম কোন কোন বই অবশ্যপাঠ্য। নিউইয়র্কে দুটো পত্রিকা, নিউইয়র্ক টাইমস এবং নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকস জগতের উৎকৃষ্ট বইয়ের সংবাদ এবং আলোচনা প্রকাশ করে। সেগুলো সত্যিই মূল্যবান লেখা। কিন্তু একটা সময় আসে যখন বই পড়তেও নির্বাচন প্রয়োজন, কারণ হাতে সময় কমতে থাকে। বিদগ্ধ বন্ধুদের পরামর্শের ওপর নির্ভর করতে হয়। বই পড়া প্রায় একটা সার্বক্ষণিক কাজ, একে বিরামহীন চালিয়ে যাওয়া খুব সহজ নয়।
প্রায় একত্রিশ বছর আগে আমি এক শীতের সন্ধ্যায় কবি তারাপদ রায়ের কলকাতার লিটল রাসেল স্ট্রিটের বাড়িতে বসে আছি। তারাপদদার কথা শুনছি। হঠাৎ বাইরে থেকে ঘরে ফিরলেন তারাপদদার একমাত্র সন্তান কৃত্তিবাস রায়, তাতাই, সেই বিখ্যাত ডোডো তাতাই। মাত্র প্রেসিডেন্সি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভালো ফল নিয়ে অনার্স করে এমএ-তে ভর্তি হয়েছে। কবিতা এবং গল্প লেখে। আনন্দবাজারে খ-কালীন প্রতিবেদকের কাজ করে। খুব ধারালো তরুণ। এর কদিন পরই আমেরিকার রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায় এবং সেখান থেকেই এমএ এবং পিএইচ.ডি করে কিছুদিন জাপানে পড়ায়। ওর পোস্ট ডক ছিল বারক্লিতে। হার্ভার্ডে কিছু কোর্স করেছিল। সব মিলিয়ে ওর লেখাপড়ার ভিত্তিটা খুব মজবুত।
সেই সন্ধ্যায় আমাকে কৃত্তিবাস জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আজ তুমি কী কী বই ঘাঁটাঘাঁটি করলে?’ আমি তখন প্রায় প্রতিবছর শীতে কলকাতা যেতাম খানিকটা ডাক্তার দেখাতে, খানিকটা বইপত্র খুঁজতে, সারাদিন কলেজ স্ট্রিটসহ অন্যান্য বইয়ের দোকান টহল দিতাম, পুরনো বই খোঁজাখুঁজি করতাম। নতুন ইংরেজি বইয়ের জন্য আমার পছন্দের দোকান ছিল কফি হাউসের ওপরে রূপা, আর গ্র্যান্ড হোটেলের নিচে রাসত্মার ওপর এক বইয়ের বিক্রেতা যে সাম্প্রতিক সময়ের বিদেশি ভালো বই রাখত, সেই রাসত্মার দোকানটি। আমি কৃত্তিবাসকে জানাই কোথায় গিয়েছিলাম। কৃত্তিবাস আমাকে একটি বই কিনে পড়তে বলে। বইটি রূপা ভারতীয় সংস্করণ বের করেছে। বইটির নাম Native Realm : A search for Self-Definition। আমি পরের দিন বইটি রূপা থেকে কিনি। খুব বেশি দীর্ঘ বই নয়। বইয়ের লেখক চেশোয়াভ মিউশ। তিনি ততদিনে সবার পরিচিত, ১৯৮০ সালে কবিতার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আমি তখনো মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে তাঁর সামান্য কিছু কবিতা পড়েছি। গদ্য পড়িনি। কিন্তু এই স্মৃতিকথাটি জীবনের একটা সময়কাল নিয়ে লেখা। ছেলেবেলায় ক্যাথলিক বিশ্বাসে বেড়ে ওঠার কারণেই হয়তো মরালিটি একটা বড় ভূমিকা রাখে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনায়। নিজের আইডেন্টিটি নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি নিজের জীবনের সাড়ে চার দশকের একটা অসাধারণ চিত্র আঁকেন এ-বইয়ে, যা প্রায় কবিতা-শিল্পের মতো। স্মৃতি ও সত্তার পুনর্নির্মাণ!
আশির গোড়ায় জগতের সাহিত্যের মানচিত্রে আসন্ন পরিবর্তনের কিছু দোলা লক্ষ করা যাচ্ছিল। কিছু কিছু জনপদ বহুদিন আগে হারিয়ে গিয়েছিল। তারা শুধু বেঁচেছিল মিউশের The Issa Valley, বা Seigfried Lenz উপন্যাসে। হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ভূখ-, এক চিলতে দেশ জার্মানি ও পোল্যান্ডের মাঝখানে, আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গারের পোল্যান্ড অনেকদিন আগে হারিয়ে গেছে। আজকের মানচিত্রের পোল্যান্ড নামের দেশটির কয়েক মিলিমিটার ওপরে, ছিল ভুতুড়ে অস্তিত্ব নিয়ে! এসব লেখকের স্মৃতিতে যেভাবে বেঁচে আছে এই ভূখ-গুলো, তারা শুধু নতুন করে ফিনিক্সের মতো জেগে উঠেছে এই তো কয়েক বছর আগে পূর্ব ইউরোপে রাজনৈতিক মানচিত্র বদলের পর। হয়তো এসব ভূখণ্ডের অনেক অজানা নিয়তি নতুন করে কুয়াশার মাঝখান থেকে সামনে আসছে। রাজনৈতিক মানচিত্র-বদল সাহিত্যের মানচিত্র-বদলকে ত্বরান্বিত করছে, নাকি লেখকের স্মৃতির মানচিত্রকে বাস্তবে টেনে আনছে, সেটাই হয়তো অজানা নিয়তি! আশ্চর্য বেদনা নিয়ে লেখকদের কল্পনায় হারিয়ে যাওয়া, খুন হওয়া ভূমিখ-গুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠী, হারিয়ে যাওয়া ভূগোল বর্তমানের সত্তা নিয়ে চোখের সামনে। এই ভূগোল স্বপণ ও বাস্তবের মাঝের বিভাজন রেখাকে মুছে দিয়েছে। কিন্তু মানচিত্রে কিছু ‘সত্যিকার’ ভূখ-ও রয়েছে, যেখানে ইতিহাস ‘শক্তির’ দ্বারা মিথ্যেভাবে লেখা হয়েছিল, কিন্তু লেখকের ‘কল্পনা’ রাজশক্তির চেয়েও জোরালো শক্তি হয়ে এদের টেনে তুলল। এসব ক্ষেত্রে লেখকের মস্তিষ্ক ও হৃদয় দুই-ই নির্ধারণ করেছে মানচিত্র। সোলজেনেৎসিনের রাশিয়া এদের একটি। নিজের দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র-বদলের ‘কুৎসিত প্রক্রিয়াকে প্রায় একা হাতে রুখে দিয়েছিলেন’, যার মধ্য দিয়ে অসীম সাহস জুগিয়েছিলেন তাঁর সমকালীন অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় বা ল্যাটিন আমেরিকার লেখকদের।। সেটা ‘সত্য’ বা ইতিহাসের পুনর্নির্মাণের শুরু, বিশেষ করে রাশিয়ায়, যেখানে কয়েক দশক আগে ‘সত্য’ নির্বাসিত ছিল ‘শক্তির’ কাছে।
নতুন এই মানচিত্রে আরো ভূখ- রয়েছে, ‘স্মৃতির’ ভূখ- ও বাস্তবের ভূখ-, দুই-ই। এসবের প্রায় প্রবাদতুল্য শিল্পিত চিত্রায়ণ মার্কেজের কলম্বিয়া-মেকেনদো রূপান্তরে। মার্কেজের বর্ণনা এমন তুলনারহিত শক্তি ধারণ করে আছে যে, যে কেউ বাস্তবের ভয়ংকর মৃত্যুপুরীকে শিল্পীর কল্পনার রূপে পেতে বেশি পছন্দ করবেন। চাইবেন রক্তাক্ত কলম্বিয়াকে মেকেনদো হিসেবে পেতে। আসলে নির্বাসিত বেশ কয়েকজন শিল্পীর ঐতিহাসিক অবদান এই বাস্তব ভূমিকে বিদায় দিয়ে কল্পনাশ্রয়ী ভূখ- নির্মাণ।
পূর্ব ও সেন্ট্রাল ইউরোপ এবং ল্যাটিন আমেরিকান শিল্পীরা ভিন্ন শিল্প-রাজনৈতিক ভুবনে বসে সৃষ্টিকর্ম করেন। তাঁদের সৃজনশীলতার ধরনও তাই কিছুটা আলাদা। যেসব দেশ মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে, সেসবের ভূতপূর্ব নাগরিকরা বাস্তবতা থেকে সুদূর এক স্মৃতির জগৎ মাথায় নিয়ে সৃষ্টি করেন। সে-কারণে সেই স্মৃতি-সৃষ্ট জগৎ যেমন হতে পারে কল্পনাতীত সুন্দর আবার অন্যদিকে বিপজ্জনক। হয়তো কেউ কেউ প্রাক্-নস্টালজিয়া এক ভূখ- দ্বারা আচ্ছন্নও হতে পারেন। তাঁর জন্য লড়াইটা মনোজাগতিক। একটা সময় ছিল ভূখ- হারাতে হতো বৈষয়িক যুদ্ধজনিত কারণে, কিন্তু আজ নতুন দুর্ভোগ যোগ হয়েছে তার সঙ্গে, সেটা হলো মনোজগৎ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া, কারণটা ইনফরমেশন টেকনোলজি। আজ আর সৃজনশীল কাজ বা তার পুনর্নির্মাণ কোনো ‘নিরীহ’ বিষয় নয়।
লেখকের মনোজগতের পুনর্নির্মিত ভূখ- এর সীমামেত্মর বাইরে লেখকের কল্পনায় সৃষ্টি হতে থাকে বিরামহীন! চেশোয়াভ মিউশের বাল্যবেলার লিথুয়ানিয়া তাঁর পুনর্নির্মিত সৃষ্টিতেই রয়েছে, বাস্তবে তা নেই, বর্তমানের লিথুয়ানিয়া যতই আমাদের দৃষ্টি কেড়ে নিক না কেন।
আজকের তথ্য-বিপস্নবের দিনে ‘পরবাসী’র (outsider) ‘পুরাণ গাথাই সত্যি’, আর ভেতরের মানুষদের কাহিনি এক কল্পকাহিনির নির্যাস। পশ্চিমা দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের জাতীয়তাবাদকে পুঁজি পিষিয়ে গুঁড়ো করে মিলিয়ে দিচ্ছে কালো ধোঁয়ার মতো অন্য কোনো লোভের আড়ালে। তবে পুঁজি ভিন্ন আরেক লোভও আছে, আর সেটা হলো স্মৃতি বা নস্টালজিয়া। জাতীয় স্বার্থের যুদ্ধগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে করতে হয়। পশ্চিমা জগৎ জীবনের জটিল বিষয়গুলোকে ভুলতে সাহায্য করে টেলিভিশন-নির্মিত ‘বাস্তবতার’ ভেতরে সবাইকে বুঁদ করে দিয়ে। কসমোপলিটান গেস্নাবাল-গ্রাম সেস্নাগানের মধ্যে স্থির নির্বাক করে রাখে! জগৎ জুড়ে একদিকে গেস্নাবাল পুঁজি অদৃশ্য জালে বেঁধে দিচ্ছে দরিদ্র জাতিসত্তাসমূহকে, অন্যদিকে একনায়করা তাদের দেশের অর্থনীতি সংস্কৃতিকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের মরীচিকা আর প্রাচ্যের তথাকথিত ‘সন্ত্রাস’ সৃষ্টি করছে ‘স্বদেশ’-এর কল্পগাথা। যেসবের মধ্যে রয়েছে নির্বাসিত লেখক-শিল্পীদের স্মৃতিতে লুকিয়ে থাকা ‘স্বদেশ’।
কবি মিউশের লিথুয়ানিয়া হচ্ছে সেই ‘দেশ’ যা এককভাবে তাঁর শৈশবের স্মৃতিতে, ইতিহাস ও পুরাণ-মিশ্রিত। এর ‘বাস্তবতা’ বা সত্যতা নির্ধারিত হয় শৈশবস্মৃতি ঠিক যেভাবে নির্মাণ করে। সেই স্মৃতি মিউশকে একদিকে লেখকের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু স্মৃতি একজন নিষ্পাপ শিশুর আলোকোজ্জ্বল অনুভূতি বয়ানেও প্রলুব্ধ করে। মিউশ প্রাচীন ইতিহাসের ক্রনিক্লার হয়ে দাঁড়ান। ক্রনিক্লাররা মানবেতিহাসের শুরু থেকে সকল ঘটনা লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করতেন, বিশেষ করে বিভিন্ন ট্রাইবের রাজাধিরাজদের কর্মপ্রণালি! তাদের নিয়ত যুদ্ধ করতে হতো নিজেদেরই সঙ্গে, মানে তাদের লিখিত বিবরণ ধারণ করতো ‘ইতিহাস’ এবং পুরাণ দুই-ই, যার অনেকটাই কাব্যিক ভাষার আবরণে ধ্রম্নপদী কোনো সাহিত্যশিল্প। মিউশের উপন্যাস Issa Valley-এর কথক টমাসের পূর্বপুরুষ হাইয়ারনিমাস সুরকামেত্ম একজন লেখক ও জাতি-নির্মাতা। তার ভাষা ভবিষ্যতের চিত্র বলে দেয়। তরুণ টমাস জনমানুষের ইতিহাসের প্রান্তসীমায়, মানচিত্র থেকে লিথুয়ানিয়া বিলুপ্ত হওয়ার সামান্য কিছু ধূসর মুহূর্তকে চাক্ষুষ করে। সে লিপিবদ্ধ করে একটি জাতির মিলিয়ে যাওয়ার মূল্যবান চিত্র! সে শৈশবের স্মৃতিকে পুনর্নির্র্মাণ করে দুঃসময়ের স্বদেশকে, দুঃসময়ের বিভীষিকাময় চিরচঞ্চল মুহূর্তরাজিকে, এক বিনাশী শতাব্দীর হারানো জীবনপথগুলোকে, যা তার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি! এক নিঃসঙ্গ একাকী শিশু, বনেদি সন্তান, মাতৃভাষা পোলিশ। শিশুটির নিঃসঙ্গ সময় কাটে খুব নিবিড়ভাবে পাখি ও লতাগুল্ম দেখে দেখে। এক বিস্ময়কর শক্তি আছে তার, কখনো জাদু, কখনো বা বস্ন্যাক ম্যাজিকের জগতে প্রবেশ করার; কিন্তু বিংশ শতাব্দীর ঝলমলে জগতের অজানা প্রদেশের চাবির নিমিত্তে সবই হয়তো পরিত্যাগ করে। জীবনটা তার অনেকটা এক দোলনার মতো, যা
নিয়ত নিঃসঙ্গতা ও অজানা সংস্কৃতিতে দোলায়মান। দোলায়মান ইতিহাস থেকে পুরাণে, টমাস নিজেকে ঝুঁকে যেতে দেখে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্নে, যা তাকে সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখে। আর নিজের আচ্ছন্নতার প্রশ্নচিহ্নের উত্তর একমাত্র তারই জানা, যা নিহিত
লিথুয়ানিয়াকে পুনর্নির্মাণের মাঝে। এই শিশুর হৃদয় দোলায়মান মানবেতিহাসের প্রবঞ্চিত সময়ের ক্রূরতা এবং নিঃসঙ্গ এক দ্বীপান্তরিত কবির বয়ে বেড়ানো সময়ের হৃদয়হীন নির্মমতা! কিন্তু যখন পুরাণ-নির্ভর জগতের উপাদানগুলো অপস্রিয়মাণ, তখন একমাত্র মানব মিউশ যিনি ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টার মতো স্থির স্থাণু, ঠোঁট কামড়ে সাবধানবাণী শোনান, হারিয়ে যাওয়া লিথুয়ানিয়া পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে!
যে-কোনো মানবতাবাদী ইউরোপিয়ানের মতোই ভাবনা বা সৃষ্টিশীল কল্পনা মিউশের জন্য হেঁটে চলাফেরার মতোই স্বাভাবিক ক্রিয়া! আর তাঁর সৃষ্টিশীল মনটাই তাঁর ঘর বা নিবাস, যা তাঁর জীবনের একাধিক নিবাসের চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী এবং প্রেরণাদায়ক। ১৯৫১ সালে পোল্যান্ডের সঙ্গে নিজের জীবনের বিচ্ছেদের পর ‘মনটাই’ বা স্মৃতিটাই তাঁর স্থায়ী নিবাস! পশ্চিমা জগতের শেষ প্রামেত্ম, মানে ক্যালিফোর্নিয়ার বারক্লি ক্যাম্পাসের এক কোলাহলহীন ঘরে বসে, ষাটের তীব্র রাজনৈতিক দ্রোহের ঋতুতে মিউশ আধুনিক বুর্জোয়া সমাজের ঘনবদ্ধ দ্বন্দ্বগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই নীরব কক্ষটিই ছিল তাঁর জন্য আদর্শ জায়গা, যেখানে বসে তিনি একটি দেশকে পুনর্নির্মাণ করতে পারেন তাঁর কল্পনায়। মিউশ ভাবেন, অভিবাসীরা ঝাঁকে ঝাঁকে আসেন মার্কিন দেশে বা ইউরোপের অন্যত্র। তাদের কেউ আসেন তাদের পুরনো জন্মদাগ বা জন্মভূমি স্মৃতি থেকে মুছে ফেলে নতুন দেশে মোহ্যমান হতে, কেউ কেউ আসেনস্মৃতি নির্ভর কোনো নতুন দেশ গড়তে। এটা ঠিক এক ধরনের প্রাকৃতিক নিয়ম নয় স্মৃতির, যা স্বাভাবিক নিয়মে অভিবাসীর মনে সৃষ্টি হয়, বরং নতুন দেশ তার মধ্যে যে অগণিত প্রশ্নের জন্ম দিতে থাকে তার উত্তর হিসেবে সৃষ্টি হয় তার ফেলে আসা জন্মভূমির পুনর্নির্মাণ! আর এই সৃষ্টি এবং পুনর্নির্মাণের কেন্দ্রে থাকে বাল্যবেলার স্মৃতি সেখান থেকেই প্রেরণার উৎসারণ। কিন্তু কখনো কখনো মিউশের স্মৃতি, কল্পনা এবং ‘সময়ে’ রূপ নেয়। বারক্বির ক্যাম্পাস অফিসকক্ষে বসে ১৯৬৯ সালে মিউশ জীবনের সেই উপলব্ধিকে ভিন্নভাবে দেখেন, তিনি তাঁর সময় এবং বেছে নেওয়া দেশ সম্পর্কে বলেন, ‘Never has the division between man as a unique creature and man as a cipher, the co-creator of the unintended, been so clear-cut, and perhaps the calling of America, Europe’s illegitimate child, to compose a parable of universal significance.’ কিন্তু এই আপাত অবিন্যস্ত বাক্যরাজি দিয়ে মিউশ কী বোঝাতে চান! তাঁর ব্যবহার করা ‘illegitimate child’ অভিধা চিন্তার উদ্রেক করে নিশ্চয়! মিউশের ভাবনা এবং বাক্যরাজি কোনো রাজ্যহারা শাসকের কণ্ঠ মনে করিয়ে দেয় কি! বাক্যগুলোর তেজ ও ক্ষার সেই অন্বেষণে হয়তো উদ্বুদ্ধ করবে, তাহলে একমাত্র সেই-ই ‘বৈধ শিশু’ যে স্বচক্ষে লিথুয়ানিয়ার ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছে! মিউশ কি চান না তাঁর বাল্যবেলার স্মৃতিতে যা ধরা আছে তা অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা হোক, বা কেউ সেটা করুক! বাল্যবেলা মিউশের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ভীষণ নির্মল অপাপবিদ্ধও, যেমনটা তিনি চান হোক তাঁর সকল স্বদেশবাসী। কিন্তু সেটা কি ভীষণ নাইভ চাওয়া নয়! যাকে তিনি ‘Man as a unique creature’ হিসেবে দেখেন, তিনি তো ‘ধার্মিক’ মানুষ, সেই মানুষ যিনি অতীন্দ্রিয় জগতে বিচরণ করতে সমর্থ, যিনি পূজারি, শুভ ও মঙ্গল বোধের প্রতীক! ‘The co-creator of the unintended’ বলতে হয়তো বোঝান ‘নিরীহ’ কোনো চিন্তা-যন্ত্র, যা একদিকে সৃষ্টি করে সামষ্টিক বিবেক (Collective Conscience) এবং একাকী ‘পরবাসী’ (outsider) মানুষ। আর ক্যালিফোর্নিয়ার বারক্লি ক্যাম্পাসের নিজের পাঠের ঘরে মিউশ অনুভব করেন এই দুই সত্তা অন্ত-বদ্ধ বা বিজড়িত (interlocked) এবং যা বিরামহীন ক্ষরণরত, নিজের সঙ্গে দ্বন্দ্বে। এই দ্বন্দ্বের চারিত্র্য বা প্রকৃতি কী, তা অনুধাবন খুব সহজ নয় তাঁর কাছে। তিনি অনুভব করেন এক এপিফেনির মতো বোধ তাঁর অভিজ্ঞতায় ধরা দেয়, এই বোধও একই সঙ্গে দ্বন্দ্বজীর্ণ এবং জায়মান, এবং তার ভেতরের শক্তি অপ্রতিরোধ্য! নিজেকে তাঁর মনে হয় সেইসব ক্ষুধার্ত ও বিকল্পহীন ইউরোপীয়দের মতো যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল, তাদের মধ্যে সেই সব মানুষ ছিল নতুন চিন্তা-দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পকলার কর্ষিত মানুষ। কিন্তু অন্যদিকে কেউ কেউ ছিল, নিজেকে যারা বিচ্ছিন্ন করতে সমর্থ হয়েছিল ক্রূর, ভয়ংকর নির্মম শিল্পায়ন, দুর্ভিক্ষ, অনাচার এবং শেকড় থেকে ছিটকেপড়া, উন্মূল মানুষ! এই দুই বিপরীত মানুষের সংমিশ্রণ, নিজের ভেতর দ্বন্দ্বদীর্ণতা রক্তিম বেদনার সৃষ্টি করেছে মিউশের মাঝে। এটা অবশ্য প্রায় সকল অভিবাসী বা নির্বাসিত শিল্পীর মাঝেই থাকে কম-বেশি।
ইউরোপের এই মানুষরা পেছনে রেখে এসেছিল ইউরোপ যা কিনা নিজেরই তীব্র বৌদ্দিক চাহিদার মাঝে বন্দি ছিল, যা কিনা তাদের মনোজগৎকে পাশবিক দুই যুদ্ধ এবং নির্মম হত্যাযজ্ঞের ভেতরে নিয়ে যায়। কয়েক মিলিয়ন নিরীহ মানুষের প্রাণ নিধন হয়।
১৯৬৯ সালে বারক্লিতে বসে স্মৃতি হাতড়ানোর মতো হাজারটা বেদনা-মিশ্রিত বিষয় ছিল মিউশের। সময়ের বিপরীত কখনো কখনো বিভিন্ন মাত্রিক বিষয়কে তিনি প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করেন। যেন তাঁর অন্তর্গত দ্বন্দ্বের বা বিভিন্ন চিন্তার পারস্পরিক দ্বন্দ্বের নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। আর তাঁর নির্বাসিত জীবনের অস্তিত্বের কনুকণা অনেকটা সেই ভেতরের নাট্যমঞ্চের আলো হিসেবে ক্রিয়াশীল। আর সেই শুরু থেকেই তাঁর ভেতরে বয়ে চলছে, অনেকটা লিথুয়ানিয়ার পুনর্নির্মাণের জরুরি উপাদান হিসেবে। কিন্তু তাঁর কাছে এই প্রক্রিয়াকে একবারে শূন্য থেকে ক্রিয়াশীল কিছুর অস্তিত্বও মনে হয়েছে মাঝে মাঝে। ‘ভাবনা’ তাঁর কাছে বস্ত্তগত বাস্তবতা হয়ে ধরা দেয়, মুহূর্তের মধ্যে হয়ে ওঠা ইতিহাসের চেয়েও বেশি অর্থময়। মিউশ আমেরিকার শিল্পের অ-বিজ্ঞানের বিরাট অবদানের কথা ভাবেন, কবি এলেন গিন্সবার্গ যাকে উল্লেখ করেছিলেন Industrial Moloch হিসেবে, যদিও কিছুটা ভিন্নার্থে। এটাই আমেরিকার ‘দ্বিতীয় প্রকৃতি’ (second nature), যা কিনা প্রথমটার চেয়েও ভীতিসঞ্চারকারী। আর সেটা প্রথমে যারা বসতি স্থাপন করেছিলেন তারা জানেন হয়তো। আর এই ‘দ্বিতীয় প্রকৃতি’ আসলে মিউশ মনে করেন ইউরোপ থেকে আসা নির্বাসিতদের সামষ্টিক প্রয়াসের ফসল, যা যোগাযোগ বিজ্ঞানের বা প্রযুক্তির মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে গঠন করছে অদৃশ্যভাবে। মিউশের কাছে এই ‘প্রযুক্তির ধর্ষণ’ ঠিক একই ভয়াবহতা নিয়ে সক্রিয়, যাকে মাঝে মাঝে মনে হয় ভয়ে হিম করে দেওয়া বিবেকহীনতা, যার আসলে কোনো মানে নেই, মানে সেই ইউরোপীয় অর্থহীনতার। এই ‘দ্বিধা’ বা বিদ্যমান contradictions মিউশকে দোদুল্যমানতায় ফেলে দেয়, তাঁর কাছে দাবি করে একটি পরিষ্কার পক্ষপাত। প্রাচ্যের নিয়তিবাদী হওয়া তাঁর জন্য নয়, তাঁকে ঠিক মানায় না। এই ‘দুই প্রকৃতির’ যা কিনা মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে, যাকে মিউস অভিহিত করেন Orders of mindlessness, একটি প্রাকৃতিক, অন্যটি প্রযুক্তির, যাতে তিনি জীবনের ‘অর্থ’ অন্বেষণ করেছেন এতোদিন, এমনকি তা যদি একবারে শূন্য থেকে তাঁর স্মৃতির লিথুয়ানিয়াকে পুনর্নির্মাণ করতেও হয়। তিনি সহজেই যেন লিখতে পারেন, ‘In modern times, the great metaphysical operation has been the attempt to invest history with meaning, that is, we, as foreigners, intruders, face a world that knows neither good nor evil; so let our labyrinth but increase, let our law, born of the challenge we hurl at the world in the name of what should be, be established.’
নিজের স্মৃতিতে জমা রাখা ছবি নিয়ে মিউশ উচ্চারণ করতে গেলেই পাঠকের প্রশ্ন জাগবে মনে, কোথা থেকে মিউশ কথা বলছেন? তা কোন ভূগোল ও সময় থেকে উৎসারিত? হয়তো ভূগোলের দিক থেকে এটা একটা নদীতীরে শুয়ে থাকা, স্বপ্ন দেখতে থাকা সেই শিশুর ছবি! শিশুটি তাঁর কাছে খোলা উৎস, যেখান থেকে কোনো জাদুকরী পুরাণের জন্ম হয় না। যখন শিশুটিকে সজোরে বিচ্ছিন্ন করা হয় নদীতীর থেকে, তখন সে নিজের ‘ভূগোলে’ অবিরাম ভ্রমণ করতে থাকে এবং সেই হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নকে, বহুদিন ভুলে থাকা স্বপ্নকে পুনর্নির্মাণ করতে থাকে। এই শিশুটি থেকে পরিণত মানুষটিকে ছিনিয়ে বের করলে, সত্যিকার ‘বাস্তব’ – এবং এর মাঝের মানবসমূহ বা তাঁর ছায়ারা ভেসে ওঠে স্মৃতির পর্দায়, আদি স্বপ্নে, পুরাণে!
অন্যদিকে মিউশের সমকালীন আরেক নির্বাসিত লেখক উইটলড গোমব্রউইস মিউশের চিন্তা বা শিল্পাদর্শের বা মৌলিক ভাবনার বিপরীতে ছিলেন। মিউশের কিছু আগে ১৯৩৯ সালে মাতৃভূমি পোল্যান্ড ছেড়ে আর্জেন্টিনায় আশ্রয় নেন। সেখানে নিদারুণ দারিদ্রে্যর মধ্যে তাঁর দিন কাটে, কিন্তু লেখার বিষয়ে তিনি কোনো রকম সমঝোতায় বা নিজের সত্তা বিক্রির ঘোর প্রতিবাদী। পোলিশ ভাষায় বিস্ময়কর সব উপন্যাস ও নাটক লিখে চলছিলেন সেই তীব্র দারিদ্রে্যর মধ্যেও। তাঁর তিনটি উপন্যাস Cosmos, Pornografia এবং Ferdydurke যুক্তরাষ্ট্রের গ্রোভ প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। পরে তা অনূদিতও হয়। তাঁর লেখা নাটক The Marriage ইউরোপে মঞ্চস্থ ও ছাপা হয়। সেটাই ছিল আমার গোমব্রউইসের কোনো লেখা প্রথম পাঠের অভিজ্ঞতা। ইউরোপে এই নাটক খ্যাতি কুড়িয়েছিল। কিন্তু সাকল্যে দেখা যায় এই শক্তিশালী লেখক বৃহৎ আন্তর্জাতিক পাঠক পরিম-লে অজানাই থেকে যান। নির্বাসিত লেখকদের একাকিত্ব বা ক্ষরণ নিয়ে তাঁর অনুভব এবং লেখা অন্যদের লেখার থেকে ভিন্ন। তিনি মিউশের লেখার তীক্ষন সমালোচক হয়েও মিউশের প্রভূত প্রশংসা করেছেন। মিউশ ও গোমব্রউইসসের লেখার পার্থক্য হলো মোটা দাগে, মিউশ নিজেকে ইতিহাসের প্রলম্বিত এক যুদ্ধের মাঝখানে স্থাপন করেছেন। তিনি যুদ্ধে সক্রিয় প্রায় সকল রাজনৈতিক-শৈল্পিক-ভাষাগত বিষয়ের ইস্যুগুলো নিয়ে। আর সেই যুদ্ধ যারা স্বদেশে বসে চালিয়ে যান তাদের থেকে একটু আলাদা। সকল ইডিওলজিক্যাল ইস্যুর সঙ্গে তাঁর শৈল্পিক-মিসটিক ভাবনাকে বিচ্ছিন্ন করে না। অসাধারণ ভাষা ও সাহিত্য-পা–ত্যের গভীর সংমিশ্রণ থাকে সেখানে, সেটার অন্যতম কারণ হয়তো ইউরোপের কয়েকটি ভাষায় তাঁর পা–ত্য এবং বারক্লিতে সেসব বিষয়ে বহুদিনের অধ্যাপনা। তারুণ্যের প্রথম দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষ ছিল আইন শাস্ত্রে, তাই মনের গড়নটা অনেকখানি রিজন দ্বারা গড়া, কিন্তু শিল্পের ‘আলো’ বিবর্জিত নয়। তাই তা হয়ে উঠেছে একেবারে ভিন্নরকম সাহিত্য! তাঁর লেখা মৃদু পায়ে এগোয়, কিন্তু তাঁর সৌন্দর্য অসাধারণ, যাকে গোমব্রউইস বলেছেন, ‘quickens our pulse’। মিউশের quickening কিছুটা ভয় এবং দূরতর শংকাও সৃষ্টি করে, আর লেখার অমত্মঃস্রোতে নিরন্তর ক্রিয়াশীল থাকে নস্টালজিয়ার মিথ। গোমব্রউইসও আমাদের শিরার গতিকে দ্রম্নততর করে, কিন্তু তাতে কিছুটা ‘আশা’ মিশ্রিত থাকে বেদনার সঙ্গে। তাঁর লেখায় একধরনের সম্ভাবনার কথা থাকে যে মানবেতিহাসের ‘পুনর্জাগরণ’ জরুরি প্রয়োজন, কারণ ইতিহাসের বড় বিষয়গুলো তাদের নিজেদের থেকে বিচিছন্ন করে অন্য এক অজানা প্রদেশ খোঁড়াখুঁড়িতে ব্যস্ত করে রেখেছে। তাঁর কাছে মানব যে-কোনো ইডিওলজির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আনন্দ কর্তব্যের চেয়েও মূল্যবান। তিনি লেখেন, ‘The world has become mortally and stupidly serious and our truths, which are denied play, bore themselves and through their vengeance bore us’। কথাগুলো অনেক নির্বাসিত লেখককেই ভাবাবে, যাঁদের জীবন আনন্দ-বিবর্জিত। হয়তো ঠান্ডা লড়াই এবং মহাযুদ্ধের বিভীষিকাময় ফল পুরো পূর্ব ইউরোপকে তিমির চাদরে ঢেকে দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না মিউশের মতো, তাই তাঁর ‘উচ্চ সংস্কৃতি’ নিয়ে একটু বিরাগ ছিল, তিনি সহজেই লিখতে পারেন, ‘The West has remained faithful to absolute value and still believes in art. Where they see a man kneeling before Bach’s music, I see people who force each other to genuflect and feel delight and admiration.’ গোমব্রউইস মনে হয় নির্বাসিতের বেদনা কিছুটা নিরাময়ের প্রয়াসকে গুরুত্ব দেন, যেখানে মিউশ একেবারে দৃঢ় ও আনকম্প্রোমাইজিং থেকে একধরনের মেটাফিজিক দাবি নিয়ে উপস্থিত। মঙ্গলামঙ্গলের ভেদরেখা খুবই স্পষ্ট, স্পষ্ট একজন রক্তাক্ত নির্বাসিতের ভেতর ও বাহিরটা। কিন্তু গোমব্রউইস মানবের ভেতরের সেন্স অব ডিগনিটিকে ভিন্নভাবে পুনরুদ্ধার করতে চান। তাই নির্বাসিতের ভেতরের আধুনিক সত্তার রক্তক্ষরণের ওপর এক এনটিডট বা বেদনা নিরাময়ের ওষুধের প্রলেপ দিতে চান। মুক্ত করতে চান তাকে রাজনীতির বিষ থেকে, কিন্তু তাঁর চেয়েও যা গুরুত্বপূর্ণ তাহলো এমনভাবে চিন্তা করতে শেখান যা তাকে ‘স্বাধীন’ হতে সাহায্য করবে। তাঁর Diary-র প্রথম ভলিউম ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৬ সাল সময় পরিধি নিয়ে লেখা। সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ বই। এখানেই তিনি প্রথম প্রতিবাদ করেন ঠান্ডা লড়াইয়ের, যা মানবকে, চিন্তাশীল মানবকে দুই বিপরীত মেরুতে বন্দি করেছিল। ঠিক বিপরীত বক্তব্য হলেও মিউশ তাঁর The Seizure of Power গ্রন্থে মূলত সেই কথাই বলতে চেয়েছেন, যা আপাত ভিন্ন ধরনে বললেও দুজনের অন্বিষ্ট এক! মিউশের এই বইয়ের বক্তব্য নিয়ে গোমব্রউইস লিখেছেন, ‘Wouldn’t it more in keeping with history and with our knowledge of man and the world if you treated the world from behind the curtain not as a new, incredible and demonic world but as a devastation and distortion of a normal world?’ হয়তো তাঁর পক্ষে এমন প্রশ্ন করা সম্ভব ছিল, নিজ দেশে কমিউনিজমের অন্ধকার দিকের অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না সোলজেনিৎসিন বা মিউশের মতো, তাই বলেই! শেষ বিচারে মিউশ এমন এক নির্বাসিত শিল্পী যিনি শুধু অন্তর্গত রক্তক্ষরণের বোঝা নিয়ে তীরবিদ্ধ ঈগলের মতো অসহায়, কিন্তু গোমব্রউইস মহাযুদ্ধ-উত্তর নির্বাসিত শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের জন্য তাঁদের ক্ষরণ থেকে নিষ্কৃতির এক বুদ্ধিবৃত্তিক পথ বাতলাতে চান ডেডলি সিরিয়াস এক ক্রূর হিউমার দিয়ে!
ব্যক্তিগত জীবনে মিউশ এবং গোমব্রউইস ছিলেন একেবারে আলাদা প্রকৃতির মানুষ। তাঁদের জীবন তাঁদের সাহিত্য ও শৈল্পিক জীবনে ছায়া ফেলেছে।
চেশোয়াভ মিউশের জন্ম ১৯১১ সালে লিথুয়ানিয়ার সেটেনিয়ালে, যা এখন কাউনাস নামে পরিচিত। পরে ওয়ারশতে ও ক্রাকাওতে বাস করেন। আইন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেন ১৯৩৪-এ। ১৯৩১ সালে প্যারিসে কিছুদিন ছিলেন। সেখানে কাজিন কবি অস্কার মিউশের সান্নিধ্যে প্যারিসের কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটান।
যুদ্ধের সময় বেশ কয়েকটি ইহুদি পরিবারকে সাহায্য করেন। গ্রাম থেকে কয়েক অসহায় ইহুদি দম্পতিকে ওয়ারশতে এনে লুকিয়ে রাখেন তাঁকে এ-ব্যাপারে সাহায্য করেন। তাঁর অনুজ আন্দ্রে মিউশ, যিনি পরবর্তীকালে সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে খ্যাতি পান। যুদ্ধের অনেক পর ইসরায়েল সরকার তাঁর এই ভূমিকার জন্য তাঁকে সম্মানিত করে। মিউশ প্রথম কবিতার বই প্রকাশ করেন ১৯৩৪ সালে। পরে তিনি পোল্যান্ডের বিদেশ মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন এবং প্যারিস ও ওয়াশিংটনে কালচারাল অ্যাটাশে ছিলেন। ১৯৫১-তে পোল্যান্ডের রাজনৈতিক অবস্থায় কিছুটা মানসিকভাবে আহত হয়ে প্যারিসে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। কয়েকটি ভাষা যেমন লিথুয়ানিয়ান, রুশ, পোলিশ, ইংরেজি ও ফরাসিতে সুপ–ত এই মানুষটি ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মাইগ্রেট করেন এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সস্নাভিক ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত তিনি বারক্লি ক্যাম্পাসে পড়ান। এখানেই তাঁর জীবনের লেখালেখির সবচেয়ে ফলবান সময় কাটে। ১৯৮০-তে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৮৯ সালে পান যুক্তরাষ্ট্রের National Medal for Arts। একই বছর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ২০০৪ সালে মৃত্যুর আগে তিনি বারক্লি ও ক্রাকাওতে বছরের সময় ভাগ করে কাটাতেন। নির্বাসিত এই শিল্পী ছিলেন পঞ্চাশের দশকে কমিউনিস্ট জগৎ থেকে পশ্চিমা জগতে আশ্রয় নেওয়া ভাবুকদের একজন। তাঁর রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য লেখকদের মধ্যে আলবেয়ার কামু খুব সহানুভূতিশীল ছিলেন, কিন্তু নেরুদা তাঁর সমালোচনা করেন। কবিতা ছাড়াও তাঁর গদ্যসাহিত্য অসাধারণ খ্যাতি লাভ করে। তাঁর The Captive Mind সত্মালিনের সময়ের বিভীষিকাময় চিত্রের দলিল, যা মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের Totalitarianism কোর্সের পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হয় আজ বহু বছর।
অন্যদিকে মিউশের স্বদেশি উইটলড মেরিয়ান গোমব্রউইস পোল্যান্ডের একই শহরে জন্মগ্রহণ করেন এক ধনাঢ্য পরিবারে ১৯০৪ সালে। তাঁর পরিবার কাউনাসে প্রায় চারশো বছর বাস করে। পরে ওয়ারশতে বাস শুরু করে। ১৯২৭ সালে ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে মাস্টার্স করেন। এরপর এক বছর প্যারিসে পড়াশোনা করেন। ১৯৩৯ সালে আর্জেন্টিনা ভ্রমণে যান, কিন্তু যুদ্ধের জন্য বুয়েন্স আয়ারেসে আটকা পড়েন। যুদ্ধের সময় খুবই দারিদ্রে্যর মধ্যে দিন কাটান। এ-সময় কয়েকটি উপন্যাস লেখেন, কিন্তু লেখক হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেতে তাঁর অনেক দেরি হয়। ষাটের গোড়ায় ফোরড ফাউন্ডেশনের বৃত্তি নিয়ে পশ্চিম বার্লিনে যান এক বছরের ফেলোশিপ করতে। সেখান থেকে ১৯৬৪ সালে প্যারিসে থিতু হন। এই সময়েই তাঁর বহুকাঙিক্ষত সাহিত্যখ্যাতি আসে, তাঁর উপন্যাসগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়, নাটক ইউরোপের বিভিন্ন শহরে মঞ্চস্থ হয়।
গোমব্রউইস ছিলেন দ্বিকামী। তাঁর সমকামিতা নিয়ে নিজের বিখ্যাত গ্রন্থ ডায়েরির এক ভলিউমে বিসত্মারিত লেখেন। বুয়েন্স আয়ারসের এক দরিদ্র সম্প্রদায়ের তরুণ ছিল সমকামী সাথি, যাঁকে নিয়ে তাঁর দীর্ঘ লেখা রয়েছে ডায়েরিতে। ’৬৭ সালে তিনি Prix International পুরস্কার পান সাহিত্যে অবদানের জন্য। কিন্তু এ-সময় তাঁর শরীর ভাঙতে থাকে, তিনি আর্জেন্টিনায় ফিরতে পারেন না। ইতোমধ্যে ’৬৪ সালেই এক কানাডিয়ান তরুণী ফরাসি সাহিত্যের ছাত্রী, যিনি প্যারিসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তখন, তাঁর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক হয় এবং ’৬৭-তে তাঁরা বিয়ে করেন। মৃত্যুর আগে তাঁর সময় কাটে লিখে আর দর্শন ও সাহিত্য বিষয়ে সিরিজ বক্তৃতা দিয়ে। Guide to Philosophy in Six hours and fifteen minutes শিরোনামে যা প্রকাশ করা হয়। বক্তৃতা শুরু করেন ইমানুয়েল কান্ট বিষয়ে এবং শেষ করেন অস্তিত্ববাদ দিয়ে। তাঁর বান্ধবী, পরে যিনি স্ত্রী হন, রিতা লাম্ব্রস তাঁর লেখার সংকলন পরে সম্পাদনা করেন। নির্বাসিত এই লেখকের মনোজগৎ অন্যান্য ইউরোপীয় নির্বাসিত লেখকের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং বেশ জটিল। সে-কারণেই হয়তো তাঁর লেখা কিছুটা জটিল মনোসত্মাত্ত্বিকতার ছায়া ধারণ করে। ১৯৬৯ সালের ২৪ জুলাই তিনি ফ্রান্সে মৃত্যুবরণ করেন।

%d bloggers like this: