বঙ্গবন্ধু ও ছাত্র-রাজনীতি : আদিপর্ব

লেখক: মুনতাসীর মামুন

কৈশোরেই বঙ্গবন্ধু যোগ দিয়েছিলেন ছাত্র-রাজনীতিতে। কলকাতায় যখন যান ইসলামিয়া কলেজে পড়তে, তখনো জড়িয়ে পড়েন ছাত্র-রাজনীতি ও মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত রাজনীতিতেই ছিলেন। উপমহাদেশের এমন মানুষের সংখ্যা কম, যিনি স্কুলে যাওয়ার বয়স থেকে মৃত্যু পর্যন্ত রাজনীতিতে অবগাহন করেছেন।

এখানে আমি বঙ্গবন্ধুর কৈশোরে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া, কলকাতার ছাত্র-রাজনীতিতে ভূমিকা রাখা পর্যন্ত আলোচনা করেছি। এক হিসেবে বলা যায়, ১৯২০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত। এ-প্রবন্ধে ব্যবহৃত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ হাসিনা-সম্পাদিত সিক্রেট ডকুমেন্টস [বিবরণে শুধু প্রতিবেদন], আবুল হাশিমের ইনস্ট্রপেকশন [বিবরণে শুধু আবুল হাশিম]।

বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে জন্ম থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তাঁর জীবনকথা লিখেছেন। কৈশোরের স্মৃতিচারণায় গ্রাম ও পরিবেশের কিছু বর্ণনা আছে। পরিবারের বর্ণনা তেমন নেই। মূলত ছাত্র-রাজনীতি থেকে তিনি কীভাবে রাজনীতিতে এলেন এবং পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদ হয়ে উঠলেন তার বর্ণনাই বেশি।গোয়েন্দা দফতরের প্রতিবেদনগুলোতেও স্বাভাবিকভাবে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথাই এসেছে। এ-প্রবন্ধে আমি তাঁর রাজনৈতিক জীবনই পুনর্গঠন করতে চেয়েছি, এর বেশি কিছু নয়।

১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে প্রথম বঙ্গবন্ধুর জীবনেতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাই। এই প্রতিবেদনে তাঁর গ্রামের বাড়ির ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছিল টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর। ঢাকার ঠিকানা ১৫০ মোগলটুলি, ঢাকা। এখানে মূলত ১৯৪৭-৪৮, বিশেষ করে ১৯৪৮ সালে কবে কখন খাজা নাজিমুদ্দীনের বিরোধিতা করেছেন তার উল্লেখ আছে।

১৯৪৯ সালের ১ মে ডিআইবির সাব-ইন্সপেক্টরের কাছে বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরেন।এখানে তাঁর পিতার নাম মৌলভী শেখ লুৎফর রহমান, টুঙ্গিপাড়া, ডাকঘর-পাটগাতী, থানা-গোপালগঞ্জ, জেলা-ফরিদপুর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পুরো নাম উল্লেখ করে জানান, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের এলএলবির ছাত্র। তাঁরা চার বোন ও দুই ভাই। ১৯৪৮ সালের পুলিশ প্রতিবেদনে এ-সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দেওয়া আছে, যা তাঁর আত্মজীবনীতে নেই। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ‘হিস্ট্রি শিট’ অনুযায়ী তাঁর বোন তিনজন, ১৯৪৯ সালের জবানবন্দি অনুযায়ী চারজন। এঁরা হলেন – ফাতেমা বেগম, আসিয়া বেগম, আমেনা বেগম ও লায়লা বেগম। হিস্ট্রি শিটে তাঁর তিন বোনের স্বামীদের উল্লেখ আছে, কিন্তু কে কোন বোনের স্বামী তার উল্লেখ নেই। যে তিনজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাঁরা হলেন –

১. মৌলভী সৈয়দ হুসাইন এমএ বিএসসি, বেঙ্গল এক্সসাইজের ইন্সপেক্টর, রাজশাহী [গ্রাম : পারুলিয়া, পো : অ. কাশিয়ানী, জেলা ফরিদপুর]।

২. মৌলভী নুরুল হক বিএ; প্রধান কেরানি, এজি, পূর্ববঙ্গ, ঢাকা [গ্রাম টুঙ্গিপাড়া]।

৩. আবদুর রব [আবদুল খালেকের পুত্র, সরাইল, গৌরনদী, বরিশাল] সিভিল সাপ্লাইয়ের ট্রান্সপোর্ট কন্ট্রাক্টর।

কনিষ্ঠ ভ্রাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ আবু নাসেরের নাম। পেশা, খুলনা সিভিল সাপ্লাইয়ের ঠিকাদার। কিন্তু ১৯৪৯ সালে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন, আবু নাসের সে-বছর গোপালগঞ্জের এমএন একাডেমি থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়েছেন। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার্থী ও ঠিকাদার ঠিক খাপ খায় না। হয়তো মাঝে মাঝে ঠিকাদারি করতেন। চাচা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পাটগাতির মৌলভী মুশাররফ হোসেনকে।

মুজিব জানিয়েছিলেন, গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন ১৯৪২ সালে, কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ ১৯৪৫ সালে আর একই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে বিএ। বয়স ১৯৪৯ সালে ২৮ বছর। এই ২৮ বছরের বিস্তারিত বিবরণ আছে আত্মজীবনীতে।

বঙ্গবন্ধু জানিয়েছেন, তাঁর পূর্বপুরুষ শেখ বোরহানউদ্দিন এই শেখ বংশের প্রতিষ্ঠা করেন হয়তো মুঘল আমলে। সম্পন্ন পরিবার ছিল তাঁদের। উনিশ শতকের শেষার্ধে মামলা-মোকদ্দমার কারণে তার ক্ষয় শুরু হয়। সে-সময় এই পরিবার ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে। এটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। ওই সময়, টুঙ্গিপাড়ার মতো একটি এলাকায় কোনো মুসলমান পরিবার ইংরেজি শিখছে সেটি আশ্চর্য ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর বাবা যখন এন্ট্রান্সের ছাত্র তখন তাঁর বাবার [বঙ্গবন্ধুর দাদা] মৃত্যু হয়। পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে বর্তায় তাঁর ওপর। এবং তিনি সেরেস্তাদারের চাকরি পান। ‘যেদিন আমি ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়তে যাই, আমার আব্বাও সেই দিন পেনশন নিয়ে বাড়ি চলে যান।’ এরই মধ্যে মুজিব বিয়ে করেছেন রেণুকে ১৩ বছর বয়সে। রেণু তাঁর আত্মীয়। লিখেছেন তিনি –

রেণুর বাবা মারা যাবার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সাথে আমার এক নাতনির বিবাহ দিতে হবে। কারণ, আমি আমার সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাব।’ রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধ হয় তিন বছর হবে। রেণুর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তার মা মারা যান। একমাত্র রইল তার দাদা। দাদাও রেণুর সাত বছর বয়সে মারা যান।তারপর সে আমার মার কাছে চলে আসে। আমার ভাইবোনদের সাথেই রেণু বড় হয়। রেণুর বড় বোনেরও আমার আর এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিবাহ হয়। এরা আমার শ্বশুরবাড়িতে থাকল, কারণ আমার ও রেণুর বাড়ির দরকার নাই। রেণুদের ঘর আমাদের ঘর পাশাপাশি ছিল, মাত্র দুই হাত ব্যবধান। (ওই, পৃ ৮)

টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর ছোট দাদা একটি ইংলিশ স্কুল খুলেছিলেন। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে তিনি পড়েন। তাঁর বাবা তখন গোপালগঞ্জে চাকরি করেন। তিনি গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন।

মুজিব দুরন্ত ছিলেন, কিন্তু কৈশোরেই দুটি বড় ধরনের রোগে আক্রান্ত হন। ১৯৩৪ সালে যখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়েন তখন বেরিবেরিতে আক্রান্ত হন। দু-বছর চিকিৎসা চলেছিল এবং তাঁর হার্ট দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

১৯৩৬ সালে তাঁর বাবা মাদারীপুরের সেরেস্তাদার হিসেবে বদলি হন। ওই বছরই মুজিব গ্লুকোমায় আক্রান্ত হন। কলকাতায় ডাক্তারের চিকিৎসায় ভালো হন।

১৯৩৪-৩৬ এ দু-বছর তাঁর পড়াশোনা হয়নি। ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হলেন সপ্তম শ্রেণিতে। ১৯৪১ সালে ম্যাট্রিক দিলেন অসুস্থ শরীর নিয়ে, তারপর ইসলামিয়া কলেজে। বঙ্গবন্ধু তাঁর শিক্ষাজীবনের কথা আর বিস্তারিত লেখেননি। স্কুল থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সে-জীবনের কথাই লিখেছেন। তিনি যখন ম্যাট্রিক দিচ্ছেন, মিশন স্কুল থেকে, তখনো তিনি অসুস্থ। পড়াশোনা থেকে রাজনীতি বেশি করছেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, সে-সময় তাঁর বাবা তাঁকে একটি কথা বলেছিলেন যা তাঁকে পথ দেখিয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখ, ÔSincerity of purpose and honesty of purpose’ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না। একথা কোনোদিন আমি ভুলি নাই।’ (আত্মজীবনী, পৃ ২১)

এ-কথা মুজিব শুধু মনে রাখেনইনি বিশ্বাস করেছেন, যে-কারণে রাজনীতিতে তিনি সফল হয়েছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৯ সালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বিবরণ দিয়েছিলেন ডিআইবির সাব-ইন্সপেক্টরের কাছে। তার সংক্ষিপ্ত একটি রূপরেখা দিচ্ছি –

            ১.                     ১৯৩৭-১৯৩৯ : সাধারণ সম্পাদক, মহকুমা মুসলিম ছাত্রলীগ, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর।

            ২.         ১৯৩৯-১৯৪২ : প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, মুসলিম লীগ ও মুসলিম ছাত্রলীগ, গোপালগঞ্জ।

            ৩.        ১৯৪২-১৯৪৩ : সম্পাদক, মুসলিম লীগ প্রতিরক্ষা কমিটি, গোপালগঞ্জ।

            ৪.         ১৯৪০-১৯৪৭ : মুসলিম লীগ ও মুসলিম ছাত্রলীগ সংগঠন।

            ৫.         ১৯৪৩-১৯৪৪ : বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ত্রাণ কমিটিতে সম্পাদক। মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর সহকারী।

            ৬.        নাটোর এবং বালুরঘাটে এ কে ফজলুল হক ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের হয়ে প্রচার। গোপালগঞ্জে পাকিস্তান সম্মেলনের জন্য যে-অভ্যর্থনা কমিটি হয় তার সভাপতি।

            ৭.         ১৯৪৪ : কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে মুসলিম লীগের হয়ে কাজ।

            ৮.         ১৯৪৫-১৯৪৬ : ফরিদপুর জেলা নির্বাচন ও প্রচার অফিসের ‘ওয়ার্কার ইন চার্জ’। ছয়টি জেলা ছিল এই অফিসের অধীন।

            ৯.         দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ সম্মেলনে ডেলিগেট হিসেবে যোগদান।

       ১০.           ১৯৪৬ : দিল্লিতে মুসলিম লীগের বিশেষ সম্মেলনে যোগদান এবং কায়েদে আজমের সামনে পাকিস্তানের জন্য আত্মত্যাগের শপথ _ [I took oath to give my life for the achievement of Pakistan in front of Quide-e-Azam].

            ১১.       ১৯৪৬ : বিহারে দাঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ শিবিরে মুসলিম লীগের প্রতিনিধি। তিন মাস, আসানসোল, কারলিয়া, মাদাইগঞ্জ, মায়েরা, নিগা প্রভৃতি এলাকায় শরণার্থী ক্যাম্পে সহায়তা।

            ১২.       ১৯৪৬ : কলকাতা দাঙ্গায় কলকাতা মুসলিম ছাত্রলীগের প্রধান হিসেবে ব্রাবোর্ন কলেজে কাজ।

            ১৩.       ১৯৪৬-১৯৪৮ : বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিলর।

            ১৪.       ১৯৩৮-১৯৪৭ : সর্ব বাংলা মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্য।

            ১৫.       ৩০০ স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে সিলেট গণভোটে কাজ; পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে কাজ।

            ১৬.       ১৯৪৭-এর পর –

                        তিনি আরো জানিয়েছেন, কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ জন ছাত্রের শাস্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগদান।

            ১৯.       ১৯৪৯ : সালে ৪.১০ মিনিটে আরো ছয়জন ছাত্রের সঙ্গে গ্রেফতার।

                        [১.৫.১৯৪৯ সালের জবানবন্দি, প্রতিবেদন, পৃ ১৪৮]

শেখ মুজিবের জবানবন্দিতে দেখা যাচ্ছে, ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতিতে আচ্ছন্ন। মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলন ছিল ধ্যান-জ্ঞান এবং দিবারাত্রি রাজনৈতিক কর্মী সেই থেকেই। তবে, আত্মজীবনীতে পাই ১৯৩৮ সাল থেকেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিশেষ করে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। আর যদি মনে রাজনৈতিক স্ফুরণের কথা বলি তাহলে দেখব, কিশোর বয়সেই এই ধারণা জন্ম নিয়েছিল। মুজিবের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠাটা স্বদেশি আন্দোলনের মাঝে। ওই সময়ের কথা স্মরণ করে আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘ইংরেজদের বিরুদ্ধেও আমার মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হলো। ইংরেজদের এ দেশে থাকার অধিকার নাই। স্বাধীনতা আনতে হবে। আমিও সুভাষ বাবুর ভক্ত হতে শুরু করলাম।’

১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের ছাত্র তিনি। মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী এসেছেন গোপালগঞ্জ। মিশন স্কুল তাঁরা পরিদর্শন করলেন। আজকাল বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বিভিন্ন জীবনীতে দেখা যায়, মিশন স্কুলে তিনি মন্ত্রী দুজনকে বলছেন স্কুলের ছাদ সারিয়ে দিতে এবং তাঁর নেতৃত্বে সবাই মুগ্ধ। এরকম একটি ঘটনা ঘটলে মুজিব আত্মজীবনীতে তা লিখতেন না, এমনটি হয় না। বরঞ্চ যেটি উল্লেখযোগ্য সেটি উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো হিন্দু-মুসলিম সমস্যা যা এখনো বিদ্যমান।

মুসলিম লীগ মন্ত্রীরা আসবেন, স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের অভ্যর্থনার জন্য মুজিবের নেতৃত্বে একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা হলো। হিন্দু ও মুসলমান – দুই সম্প্রদায়ের ছাত্ররাই ছিলেন। কিন্তু দেখা গেল আস্তে আস্তে হিন্দু ছাত্ররা সরে যাচ্ছে। তাঁর এক হিন্দু বন্ধু জানালেন, কংগ্রেস থেকে তাদের মানা করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি এ খবর শুনে আশ্চর্য হলাম। কারণ, আমার কাছে তখন হিন্দু মুসলমান বলে কোন জিনিস ছিল না।’(আত্মজীবনী, পৃ ১১)

আসলেই তা ঠিক এবং পরবর্তীকালেও হিন্দু-মুসলমানকে প্রথমে তিনি বাঙালি হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু মুসলিম লীগ করেছেন পাকিস্তানের জন্য। বিষয়টি কখনো তাঁর কাছে সাম্প্রদায়িক মনে হয়নি। হতে পারে, তিনি ভেবেছিলেন সম্প্রদায়গতভাবে মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্র হলে তারা নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু, ধর্মীয় দিকটি এত তীক্ষ্ণভাবে ভাবেননি।

এ-ঘটনাটা তাঁর মনে রেখাপাত করেছিল। হয়তো এ-কারণেই তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন – ‘আমাদের নেতারা বললেন, হক সাহেব মুসলিম লীগের সাথে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন বলে হিন্দুরা ক্ষেপে গিয়েছে। এতে আমার মনে বেশ একটা রেখাপাত করল। হক সাহেব ও শহীদ সাহেবকে সম্বর্ধনা দেয়া হবে। তার জন্য যা কিছু প্রয়োজন আমাদের করতে হবে।আমি মুসলমান ছেলেদের নিয়েই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করলাম। তবে, কিছু সংখ্যক নমশূদ্র শ্রেণীর হিন্দু যোগদান করল। কারণ, মুকুন্দবিহারী মল্লিক তখন মন্ত্রী ছিলেন এবং তিনিও হক সাহেবের সাথে আসবেন। শহরে হিন্দুরা সংখ্যায় খুবই বেশি। গ্রাম থেকে যথেষ্ট লোক এল। বিশেষ করে নানারকম অস্ত্র নিয়ে, যদি কেউ বাধা দেয়।’ (আত্মজীবনী, পৃ ১১)

কোনো ঝামেলা ছাড়াই সভা শেষ হলো। সোহরাওয়ার্দীকে মুজিব লঞ্চঘাটে নিয়ে চলছেন। ঘাটে এসে তিনি তাঁকে ‘ডেকে নিলেন খুব কাছে, আদর করলেন এবং বললেন, ‘তোমাদের এখানে মুসলিম লীগ কর নাই?’ বললাম কোনো প্রতিষ্ঠান নাই। মুসলিম ছাত্রলীগও নাই। তিনি আর কিছুই বললেন না। শুধু নোটবুক বের করে আমার নাম ও ঠিকানা লিখে নিলেন। কিছুদিন পরে আমি একটা চিঠি পেলাম, তাতে তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং লিখেছেন কলকাতা গেলে যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করি। আমিও তাঁর চিঠির উত্তর দিলাম। এই ভাবে সাথে সাথে চিঠি দিতাম।’(ওই, পৃ ১২)

সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সমসাময়িক নেতাদের এখানেই পার্থক্য। কলকাতা ফিরে গোপালগঞ্জের এক অচেনা কিশোরকে চিঠি দিয়ে ধন্যবাদ জানান – এটি বিস্ময়কর ব্যাপার। কিন্তু এভাবেই সোহরাওয়ার্দী সংগঠন করতে সহায়তা করেছেন। তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছেন। শেখ মুজিবও এই গুণটি আয়ত্ত করেছিলেন, যে-কারণে তাঁর পক্ষে মজবুত ভিত্তিতে সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল।

এভাবে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মুজিবের যোগাযোগ। ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসারে বলতে হয়, সেই থেকে সোহরাওয়ার্দী হয়ে গেলেন তাঁর ‘গুরু’ আর মুজিব তাঁর ‘চেলা’। সোহরাওয়ার্দী যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন এর ব্যত্যয় হয়নি।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, ১৮ বছর বয়সে প্রথম জেলে যাওয়া। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অনেক কিছুর উল্লেখ থাকলেও এর উল্লেখ নেই।

হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের সম্পর্কেও সে-সময় অবনতি ঘটে। মালেক নামে তাঁর এক বন্ধু ছিল। হিন্দু মহাসভার সভাপতি তাঁকে আটক করেন। মুজিব খবর পেয়ে তাঁর দল নিয়ে মারপিট করে তাঁকে উদ্ধার করে আনেন। মহাসভার নেতারা মুজিব ও তাঁর বন্ধুদের গ্রেফতার করায়। থানার দারোগা তাঁর সঙ্গে ভালোই ব্যবহার করেছেন। তারপর তাঁকে আদালতে প্রেরণ করা হলো। তাঁদের জন্য জামিনের আবেদন করা হয়। যে জবানবন্দি তিনি দিয়েছেন তাতে উল্লেখ করেছেন, ১৯৩৭-৩৯ সালে তিনি ছিলেন মুসলিম ছাত্রলীগের সম্পাদক। আসলে তা হবে ১৯৩৯-৪২। আর ডিফেন্স কমিটির সম্পাদক ছিলেন ১৯৪২-৪৩ সালে।

রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় তাঁর পিতা তাঁকে বাধা দেননি। শুধু বলেছেন, পড়ালেখার দিকে যেন মনোযোগ থাকে। তবে রাজনীতির পাশে ফুটবল খেলায়ও তাঁর ঝোঁক ছিল। ১৯৪১ সালে অসুস্থ শরীরে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েও দ্বিতীয় বিভাগ পান। এতে বোঝা যায় পড়াশোনায় খুব একটা অমনোযোগী তিনি ছিলেন না।

পরীক্ষার পর কলকাতায় যান ও সভা-সমিতিতে যোগ দেন। ফিরে এসে মাদারীপুরে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন। পরীক্ষা পাশের পর কলকাতায় গিয়ে ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। থাকতেন বেকার হোস্টেলে। তখন সোহরাওয়ার্দীর কাছে প্রায়ই যেতেন। তিনিও তাঁকে স্নেহ করতেন। ‘মুসলিম লীগ বললেই গোপালগঞ্জে আমাকে বোঝাত’, লিখেছেন তিনি। (আত্মজীবনী, পৃ ১৫) হক শ্যামা মন্ত্রিসভা গঠিত হবার পর মুসলিম লীগ তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। শেখ মুজিব গোয়েন্দা প্রতিবেদনে যা বলেছেন আত্মজীবনীতেও তাই লিখেছেন – ‘মুসলিম লীগ ও ছাত্রকর্মীরা তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করল।আমিও ঝাঁপিয়ে পড়লাম। … নাটোর ও বালুরঘাটে হক সাহেবের দলের সাথে মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থীদের দুইটা উপ-নির্বাচন হয়। আমিও দলবল নিয়ে সেখানে হাজির হলাম এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করলাম, শহীদ সাহেবের হুকুম মত।’ (ওই, পৃ ১৫)

দুই

১৯৪১-৪৩ সালের মধ্যে মুসলিম ছাত্রলীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। দ্বন্দ্বটা ছিল জমিদার-নবাবরা মুসলিম লীগের নেতৃত্বে আজীবন থাকবেন, না উঠতি মধ্যবিত্তদের স্থান ছেড়ে দেবেন। মুজিব যেটাকে আত্মজীবনীতে ‘অফিসিয়াল মুসলিম লীগ’ বলেছেন। অর্থাৎ খাজা নাজিমউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন যে মুসলিম লীগ ছিল তার প্রধান ছিলেন নাজিমউদ্দীন ও ছাত্রলীগের ওয়াসেক। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী ও তাঁর নেতৃত্বে ছাত্রলীগে আনোয়ার হোসেন, চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী। মুজিব ছিলেন শেষোক্ত দলে। ১৯৪৩ সালে খাজাদের প্রার্থীকে পরাজিত করে আবুল হাশিম সাধারণ সম্পাদক হন। এর আগে সোহরাওয়ার্দীই ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। আবুল হাশিমও তাঁর আত্মজীবনীতে কলকাতা কেন্দ্রের ছাত্রনেতাদের মধ্যে শেখ মুজিবের নাম উল্লেখ করেছেন।

আবুল হাশিমের মতে, মুসলিম ছাত্রদের দুটি কেন্দ্র ছিল, কলকাতা ও ঢাকা। কলকাতা কেন্দ্রের নেতারা ছিলেন বরিশালের নুরুদ্দীন আহমেদ, সালেহ আহমেদ, আবদুর রহমান, খুলনার মোহাম্মদ ইকরামুল হক ও শেখ আবদুল আজিজ, যশোরের আবদুল হাই, মোশাররফ হোসেন খান, রাজশাহীর আবুল হাসনাত [আবু হেনা] মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, মোহাম্মদ আতাউর রহমান, মুজাম্মিল হক, মোহাম্মদ মাহবুবুল হক, আবদুর রশীদ খান, ফরিদপুরের শেখ মুজিবুর রহমান, বগুড়ার বি এম ইলিয়াস ও শাহ আবদুল বারী, রংপুরের আবুল হোসেন ও এম মোহসিন, পাবনার আবদুর রফিক চৌধুরী, দিনাজপুরের দবিরুল ইসলাম, চট্টগ্রামের আনোয়ার, শাহাবুদ্দীন ও জহিরউদ্দীন।

ঢাকায় ছিলেন টাঙ্গাইলের শামছুল হক ও কামরুদ্দীন আহমেদ, কাজী মোহাম্মদ বশীর, ইয়ার মোহাম্মদ, শামসুদ্দীন আহমদ, মোহম্মদ শওকত আলী, রাজা মিয়া, আলমাস আলী, আওয়াল ও তাজউদ্দীন আহমদ, কুমিল্লার মোশতাক আহমেদ ও অলি আহাদ, নোয়াখালীর মোহাম্মদ তোয়াহা ও নাজমুল করিম। (আবুল হাশিম, পৃ ২৮৮)

এ নামগুলি উদ্ধৃত করলাম একটি কারণে। পরবর্তীকালে দেখব, এঁদের অধিকাংশ প্রথমে ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দী ও পরে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীকারাগারের রোজনামচায় এ-নামগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। অর্থাৎ, এরা ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করেছেন। এখনকার মতো বিভিন্ন পেশা থেকে অর্থ বা সম্পর্কের কারণে রাজনীতিতে আসেননি, বিশ্বাস বা আদর্শ থেকে এসেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো আদর্শ বদল করেছেন।

ছাত্র-রাজনীতির দ্বন্দ্বের কারণ একটিই। মধ্যবিত্তের উত্থান। রাজনীতি তাঁরা তাঁদের করায়ত্তে আনতে চাচ্ছিলেন। ক্ষমতায় ছিলেন নবাব, জমিদার প্রভৃতি। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, সোহরাওয়ার্দী যখন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তখন থেকেই এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। ‘এই সময় থেকেই’ লিখেছেন তিনি, ‘মুসলিম লীগের মধ্যে দুইটা দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। একটা প্রগতিবাদী দল, আর আরেকটা প্রতিক্রিয়াশীল। শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা মুসলিম লীগকে জনগণের লীগে পরিণত করতে চাই, জনগণের প্রতিষ্ঠান করতে চাই। মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় নাই। জমিদার, জোতদার ও খান বাহাদুর-নবাবদের প্রতিষ্ঠান ছিল। কাউকেও লীগে আসতে দিত না। জেলায় জেলায় খান বাহাদুরের দলেরাই লীগকে পকেটে রেখেছিল।’ (আত্মজীবনী, পৃ ১৭)

শেখ মুজিবের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তিনি যা বিশ্বাস করতেন তাকে রূপায়িত করতেন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে। একদিকে, যেমন তিনি প্রগতিবাদীদের হয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের বিভিন্নভাবে প্রতিরোধের চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে জনসেবা অক্ষুণ্ন রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে ওই সময়ের প্রধান দুটি ঘটনার উল্লেখ করব।

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ। ওই সময় তিনি প্রাদেশিক লীগ কাউন্সিলের সদস্য হন। সোহরাওয়ার্দী সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী ছিলেন। তিনি লঙ্গরখানা খোলার হুকুম দিলেন। লিখেছেন মুজিব, ‘আমিও লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনেকগুলো লঙ্গরখানা খুললাম। দিনে একবার করে খাবার দিতাম। মুসলিম লীগ অফিসে, কলকাতা মাদ্রাসায় এবং আরও অনেক জায়গায় লঙ্গরখানা খুললাম। দিনভর কাজ করতাম। আর পরে কোনোদিন বেকার হোস্টেলে ফিরে আসতাম। কোনোদিন লীগ অফিসের টেবিলে শুয়ে থাকতাম।’ (ওই, পৃ ১৮)

পরে লীগের কাজ করার জন্য গোপালগঞ্জ চলে আসেন। ত্রাণের জন্য টাকা-পয়সা জোগাড় ও মুসলিম লীগের প্রতি সমর্থন আদায়ের জন্য ‘দক্ষিণ বাংলা পাকিস্থান’কনফারেন্সের আয়োজন করেন। প্রচণ্ড পরিশ্রম করেন, কলকাতা থেকে নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আসেন, তাঁর পিতারও অনেক টাকা খরচ হয় এবং শেখ মুজিবও অসুস্থ হয়ে পড়েন।

তাঁর পিতার বন্ধুরা বলেছিলেন, শেখ মুজিবকে তো জেল খাটতে হবে। জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। লুৎফর রহমান বলেছিলেন বন্ধুদের, ‘দেশের কাজ করছে, অন্যায় তো করছে না; যদি জেল খাটতে হয়, খাটবে; তাতে আমি দুঃখ পাব না। জীবনটা নষ্ট নাও তো হতে পারে, আমি ওর কাজে বাধা দিব না। আমার মনে হয়, পাকিস্তান না আনতে পারলে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না।’ (ওই, পৃ ২২)

সম্প্রদায় হিসেবে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করা ও নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখা পাকিস্তান আন্দোলনে প্রণোদনা জুগিয়েছিল। মুজিব আত্মজীবনীতে হিন্দু মহাজন ও জমিদারদের অত্যাচার ও মধ্যবিত্তের ধর্মীয় গোঁড়ামির কথা অনেকবার বলেছেন। এটি অস্বীকার করলে ইতিহাস যেন অস্বীকার করা হবে। বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেত্রী মণিকুন্তলা সেনের বাড়ি ছিল বরিশাল। একদিনের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।

‘একদিন গৈলাতে আমার দিদির বাড়ির অন্য হিস্যায় এক বাড়িতে একটি লোক চেলাকাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে দিতে এসেছে। লোকটি ঘুরপথে সদর দিয়ে না এসে পেছন দিয়ে দুই ঘরের মালামালের সরু পথ দিয়ে উঠোনে চলে এসেছে। ঘর দুটির একখানা ছিল রান্নাঘর। আর যায় কোথায়? কর্তাব্যক্তিরা লাফিয়ে পড়লেন, ‘হারামজাদা তুই রান্নাঘর ছুঁইয়া দিলি?’ লোকটি বোঝাতে চেষ্টা করল, ‘ছুঁই নাই কর্তা, মাঝখান দিয়ে আইছি। বেড়ায় ছোঁয়া লাগে নাই।’ কিন্তু কর্তা কি মানেন? ‘ব্যাটা দুই ঘরের ডালে ডালে যে ছোঁয়া আছে। তার তলা দিয়া তো আইছস রান্নাঘরে ছোঁয়া লাগল না? আবার তর্ক?’ ঘা কয়েক জুতো পড়ল পিঠে। লোকটি কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘কর্তা, ওখান দিয়া তো আপনাগো কুকুরডাও যায়, ভাতের হাঁড়ি কি তাতে ফেলা যায়? মুই তো এট্টা মানুষ কর্তা।’ (মণিকুন্তলা সেন, সেদিনের কথা, কলকাতা, ১৯৮২, পৃ ১০)

 শেখ মুজিবুরের ছেলেবেলায় নিজেও এ-ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি পাকিস্তান চেয়েছেন, কিন্তু সাম্প্রদায়িক হননি। সে-প্রসঙ্গে পরে আসব।

১৯৪৩-৪৭ সালের মধ্যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল এবং তার প্রত্যেকটিতে মুজিবের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল। এর মধ্যে যেটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো মুসলিম ছাত্রলীগ [মুছালি] স্পষ্টতই দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেল। মুজিব প্রত্যেকটি কাউন্সিলে প্রগতিবাদীদের হয়ে লড়াই করে বাংলায় পরিচিত ছাত্রনেতা হয়ে উঠলেন। কুষ্টিয়ায় তিনি পেলেন হাফপ্যান্ট পরা কামারুজ্জামানকে। ঘটনাটি উল্লেখ করছি এ-কারণে যে, স্কুলছাত্র হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত থেকে পরবর্তীকালে জাতীয় চার নেতার অন্যতম হয়ে উঠেছিলেন কামারুজ্জামান। একই সঙ্গে মুসলিম লীগ রাজনীতিতেও তরুণ তুর্কি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেন।

অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের দিল্লি সম্মেলনে ১৯৪৪ সালে যোগ দেন। দিল্লি ভ্রমণের চমৎকার বিবরণ আছে আত্মজীবনীতে। আবারো দিল্লি যান ১৯৪৬ সালে কনভেনশনে যোগ দিতে। জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, এই কনভেনশনেই তিনি পাকিস্তানের জন্য জীবনোৎসর্গের শপথ নেন। আত্মজীবনীতে এর উল্লেখ না থাকলেও অন্য একটি বিষয়ের উল্লেখ আছে, যা গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো লাহোর প্রস্তাব। তিনি লিখেছেন –

জিন্নাহ সাহেব বক্তৃতা করলেন, সমস্ত সভা নীরবে ও শান্তভাবে তাঁর বক্তৃতা শুনল। মনে হচ্ছিল সকলের মনেই একই কথা, পাকিস্তান কায়েম করতে হবে। তাঁর বক্তৃতার পরে সাবজেকট কমিটি গঠন হলো।আট তারিখে সাবজেকট কমিটির সভা হলো। প্রস্তাব লেখা হলো, সেই প্রস্তাবে লাহোর প্রস্তাব থেকে আপাতদৃষ্টিতে ছোট কিন্তু মৌলিক একটা রদবদল করা হলো। একমাত্র হাশিম সাহেব আর সামান্য কয়েকজন যেখানে পূর্বে ‘স্টেটস’ লেখা ছিল যেখানে ‘স্টেট’ লেখা হয় তার প্রতিবাদ করলেন; তবুও তা পাস হয়ে গেল। ১৯৪০ সালে লাহোরে যে প্রস্তাব কাউন্সিল পাস করে সে প্রস্তাব আইনসভার সদস্যদের কনভেনশনে পরিবর্তন করতে পারে কি না এবং সেটি করার অধিকার আছে কি না এটা চিন্তাবিদরা ভেবে দেখবেন। কাউন্সিলই মুসলিম লীগের সুপ্রিম ক্ষমতার মালিক। পরে আমাদের বলা হলো, এটা কনভেনশনের প্রস্তাব। লাহোর প্রস্তাব পরিবর্তন করা হয় নাই। জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ঐ প্রস্তাব পেশ করতে জনাব মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অনুরোধ করলেন। কারণ তিনিই বাংলার এবং তখন একমাত্র মুসলিম লীগ প্রধানমন্ত্রী। (ওই, পৃ ৫২)

এই অনুচ্ছেদ পড়লে বোঝা যায় শুধুমাত্র একটি শব্দ [এস] পরিবর্তনের জন্য ওই কনভেনশন ডাকা হয়।জিন্নাহ, লিয়াকত আলী প্রমুখ পশ্চিমা নেতা খুব ভেবেচিন্তেই এ-কাজটি করেছিলেন। ট্র্যাজেডি এই যে, লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন ও তা নাকচ – এই দুইয়ের প্রস্তাবক ছিলেন বাংলার মুসলমানদের নেতা ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী। এস শব্দটির বদল সোহরাওয়ার্দীর চোখ এড়ায়নি কিন্তু তারপরও তিনি কেন তা করলেন এই রহস্য জানা যাবে না। কিন্তু এই একটি শব্দের বদল উপমহাদেশে ২৫ বছর অনেক ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়েছিল।

মুসলিম লীগের টানাপোড়েন ও আন্তঃপার্টি ষড়যন্ত্রের নানা রূপ বিধৃত হয়েছে আত্মজীবনীতে। যেহেতু তিনি ঘটনাগুলোর সঙ্গে কমবেশি জড়িত ছিলেন সে-কারণে বিশদভাবে ঘটনাগুলোর বর্ণনা করেছেন।স্বাভাবিকভাবেই গোয়েন্দা রিপোর্টে সেগুলো নেই। কারণ তাদের নিযুক্তই করা হয়েছিল ‘সরকারি মুসলিম লীগ দলের’ পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য।

এখানে আরেকটি পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করব। ভবিষ্যতে জীবনের কে কোন পথে অগ্রসর হবেন তা তাঁর যৌবনের কাজকর্মেই বোঝা যায়। দু-এক ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতেই পারে। লিখেছেন বঙ্গবন্ধু, ‘এই সময়কার একজন ছাত্রনেতার নাম উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে; কারণ, তিনি কোন গ্রুপে ছিলেন না এবং অন্যায় সহ্য করতেন না। সত্যবাদী বলে সকলে তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। নেতাদের সকলেই তাঁকে স্নেহ করতেন। তাঁর নাম এখন সকলেই জানেন, জনাব আবু সাঈদ চৌধুরী বার এট ল। এখন ঢাকা হাইকোর্টের জজ সাহেব। তিনি দুই গ্রুপের মধ্যে আপস করতে চেষ্টা করতেন। শহীদ সাহেবও চৌধুরী সাহেবের কথার যথেষ্ট দাম দিতেন। জনাব আবদুল হাকিম এখন হাইকোর্টের জজ হয়েছেন। তিনি টেইলর হোস্টেলের সহ সভাপতি ছিলেন। জজ মুকসুমুল হাকিম সাহেব ছাত্রলীগের সাথে জড়িত ছিলেন না। বেকার হোস্টেলের প্রিমিয়ার হয়েছিলেন, ভালো ছাত্র ছিলেন, লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।’(ওই, পৃ ৩২)

মুক্তিযুদ্ধে বিচারপতি সাঈদের ভূমিকা সবাই জানেন। তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি, বঙ্গবন্ধু যখন প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে এই সম্পর্ক মেনে নিতে সংকোচ হয়নি ওই কারণে। মুকসুমুল হাকিম আগরতলা মামলার অন্যতম বিচারক ছিলেন এবং পরে বিএনপি আমলে রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন।

তিন

আবুল হাশিমই ঢাকায় প্রাদেশিক লীগের একটি আঞ্চলিক অফিস খোলেন ১৫০ নম্বর ঢাকা মোগলটুলিতে, যার ভার দেন শামছুল হককে এবং এখানেই জড়ো হতে থাকেন ঢাকার কর্মীরা। ঢাকায়ও কলকাতার মতো অনেকে ‘হোলটাইমার’ হয়ে যান। কলকাতায় মুজিবও হোলটাইমার হয়ে যান। আবুল হাশিম ঢাকা ও কলকাতায় এসে ক্লাস নিতেন। মুজিবও তাঁর সঙ্গে যেতেন। এভাবে ঢাকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে ঢাকায় জেলা মুসলিম লীগ কীভাবে পরিবর্তিত হলো তার কথা উল্লেখ করেননি। আবুল হাশিম তা উল্লেখ করেছেন। খাজারা তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। কামরুদ্দীন আহমেদ, শামছুল হক, শামসুদ্দীন, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ এই আধিপত্য ভাঙার চেষ্টা করেন। খাজা শাহাবউদ্দীন অনেক চেষ্টা করেও আধিপত্য বজায় রাখতে পারেননি। আবুল হাশিম লিখেছেন, এভাবেই ঢাকা জেলা খাজাদের হাত থেকে মুক্ত হয়। বাংলার মানুষ উল্লাসের সঙ্গে এ-সংবাদ গ্রহণ করে। কলকাতার পত্রিকাগুলোও এ-সম্পর্কে খবর ছাপে। জেলার নেতারা পরদিন কলকাতা আসেন সম্পাদক আবুল হাশিমকে জানাতে। শেয়ালদহতে তাদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য সবাই জড়ো হয়। খাজারা আবুল হাশিমকে অনুরোধ জানান কার্যকরী পরিষদের সভা ডাকতে, যাতে ঢাকা জেলার শাসনতন্ত্র পাশ না হয়। তবে, তরুণ নেতাদের আধিক্য দেখে তা মেনে নেন। ওই সময় পার্টি হাউসে যেসব তরুণ নেতা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন : চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী, ঢাকার শামছুল হক ও শামসুদ্দীন, বর্ধমানের নুরুল আলম ও শরফউদ্দিন এবং বরিশালের নুরুদ্দিন আহমদ ও ফরিদপুরের শেখ মুজিবুর রহমান। [আবুল হাশিম, বিস্তারিত] এরপর খসড়া ম্যানিফেস্টো কীভাবে রচিত হলো তা নিয়েও বিস্তারিত বিবরণ আছে।

মুসলিম লীগ সরকারের পতন হয় কীভাবে বঙ্গবন্ধু সে-সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী ছিলেন তখন সোহরাওয়ার্দী। তিনি লক্ষ করেন, যুদ্ধের সুযোগে মাড়োয়ারিরা বড় বাজারে কাপড় গুদামজাত করে। তাদের গুদাম তল্লাশি করা হলো এবং দেখা হলো অনুমান ঠিক। কয়েক লক্ষ টাকা তুলে তারা কয়েকজন এমএলএ কিনে ফেলে, এক ভোটে মুসলিম লীগ সরকার হেরে যায়। মুজিব লিখেছেন, এমএলএদের কেনাবেচা করা যেতে পারে তা তিনি কখনো ভাবেননি। লিখেছেন, ‘আমরা ছাত্র ছিলাম, দেশকে ভালোবাসতাম, দেশের জন্য কাজ করতাম, এই সকল জঘন্য নীচতা এই প্রথম দেখলাম, পরে যদিও অনেক দেখেছি, কিন্তু এই প্রথমবার এই সমস্ত খান বাহাদুরদের দ্বারা আজকে দেশ স্বাধীন হবে, ইংরেজকে তাড়ানোও যাবে, বিশ্বাস করতে কেন যেন কষ্ট হতো। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠান পূর্বে ছিল খান সাহেব, খান বাহাদুর ও ব্রিটিশ খেতাবধারীদের হাতে, আর এদের সাথে ছিল জমিদার, জোতদার শ্রেণীর লোকেরা। এদের দ্বারা কোনোদিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হতো না। শহীদ সাহেব ও হাশিম সাহেব যদি বাংলার যুবক ও ছাত্রদের মধ্যে মুসলিম লীগকে জনপ্রিয় না করতেন এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে টেনে না আনতে পারতেন, তাহলে কোনোদিনও পাকিস্তান আন্দোলন বাংলার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারত না। যদিও এই সমস্ত নেতাদের আমরা পরাজিত করতে পারি নাই। যার ফলে পাকিস্তান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই খান বাহাদুর ও ব্রিটিশ খেতাবধারীরা তৎপর হয়ে উঠে ক্ষমতা দখল করে ফেলল।’ (ওই, পৃ ৩৬)

এই অভিজ্ঞতা শেখ মুজিব মনে রেখেছিলেন। ১৯৪৭ সালের পর ঢাকায় এসে প্রথমে তরুণদের সংগঠিত করেন। এঁদের অনেকেই আজীবন তাঁর সঙ্গী ছিলেন। শুনতে হয়তো আশ্চর্য লাগবে, ১৯৭১ সালে তাজউদ্দীন আহমদ বা কামারুজ্জামানের বয়স ছিল ৫০-এর নিচে আর বঙ্গবন্ধুর বয়স ছিল ৫১। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর রেহমান সোবহান, কামাল হোসেন প্রমুখ তরুণ বুদ্ধিজীবীকে আওয়ামী লীগের কাছে নিয়ে আসেন। সভাপতি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পুরো বাংলাদেশ তিনি চষে বেড়িয়েছেন এবং তৃণমূলকে সংগঠিত করেছেন। ওই যে তৃণমূলে তিনি আওয়ামী লীগকে গড়ে দিয়েছিলেন তার সুফল আওয়ামী লীগ এখনো ভোগ করছে। ৩৪ বছরে তিনি তৃণমূলে যে-জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন আর কোনো নেতা সেরকম প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী ৭৮ শতাংশ মানুষ ছিলেন এই তৃণমূলের। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের জন্য যখন নির্বাচনী প্রচার করছেন তখন একটি ঘটনার সম্মুখীন হন, যা উদাহরণ হিসেবে এখানে উল্লেখ করছি। লিখেছেন বঙ্গবন্ধু –

আমার মনে আছে খুবই গরিব এক বৃদ্ধা মহিলা কয়েকঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, শুনেছে এই পথে আমি যাব, আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বলল, ‘বাবা আমার এই কুঁড়েঘরে তোমার একটু বসতে হবে।’ আমি তার হাত ধরেই তার বাড়িতে যাই। অনেক লোক আমার সাথে, আমাকে মাটিতে একটি পাটি বিছিয়ে বসতে দিয়ে এক বাটি দুধ, একটা পান ও চার আনা পয়সা আমার সামনে ধরে বলল, ‘খাও বাবা, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমার তো কিছুই নাই’, আমার চোখে পানি এল, আমি দুধ একটু মুখে নিয়ে, সেই সাথে আরও কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বললাম, ‘তোমার দোয়া আমার জন্য যথেষ্ট, তোমার দোয়ার মূল্য টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না।’ টাকা সে নিল না, আমার মাথায় মুখে হাত দিয়ে বলল, ‘গরিবের দোয়া তোমার জন্যে আছে বাবা,’ নীরবে চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল। যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি, সেই দিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ‘মানুষকে ধোঁকা আমি দিতে পারব না।’ আমি ইলেকশনে নামার পূর্বে জানতাম না, এ দেশের লোক আমাকে কত ভালোবাসে, আমার মনের একটা বিরাট পরিবর্তন এই সময় হয়েছিল।(ওই, পৃ ৪০)

মুজিব তাঁর কথা রেখেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর সংগঠনের দিকে মনোযোগ দিলেন। বঙ্গবন্ধুর মতে, ‘পাকিস্তান আন্দোলনকেও শহীদ সাহেব এবং হাশিম সাহেব জনগণের আন্দোলনে পরিণত করতে পেরেছিলেন।’(ওই, পৃ ৩৬)

চার

সুভাষ বসু সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর এক ধরনের শ্রদ্ধা ছিল। ছেলেবেলা থেকেই তিনি সুভাষ বসুর ভক্ত। কিন্তু পাকিস্তান প্রশ্নে তাঁর মনেও দ্বন্দ্ব লেগেছিল। লিখেছেন তিনি, ‘মাঝে মাঝে সিঙ্গাপুর থেকে সুভাষবাবুর বক্তৃতা শুনে চঞ্চল হয়ে উঠতাম। মনে হতো, সুভাষবাবু একবার বাংলাদেশে আসতে পারলে ইংরেজকে তাড়ান সহজ হবে। আবার মনে হতো, সুভাষবাবু আসলে তো পাকিস্তান হবে না। পাকিস্তান না হলে দশ কোটি মুসলমানের কি হবে? আবার মনে হতো, যে নেতা দেশত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে পারেন তিনি কোনোদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না। মনে মনে সুভাষবাবুকে তাই শ্রদ্ধা করতাম।’             (ওই, পৃ ৩৬)

বাধ্য হয়ে কিছুদিন ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সম্পাদক হন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। জবানবন্দিতে অনেক কিছু উল্লেখ না করলেও আত্মজীবনীতে করেছেন। তিন মাসের মধ্যেই পাকিস্তানের হয়ে কাজ করার জন্য সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

 দৈনিক আজাদ মুসলিম লীগের মুখপত্র ছিল। তাই প্রগতিশীলদের একটি কাগজের দরকার ছিল। আবুল হাশিম ও তরুণ কর্মীরা কাগজের অভাব বোধ করছিলেন। তাঁরা ঠিক করলেন সাপ্তাহিক কাগজ বের করবেন। সোহরাওয়ার্দী তখন ওকালতি করে বেশ টাকা করছেন। শেখ মুজিব ও নুরুদ্দিন সোহরাওয়ার্দীকে ধরলেন কাগজ বের করার টাকা দিতে। মুসলিম লীগ অফিসের নিচতলায়ই অফিস করে প্রকাশিত হলো মিল্লাত। আবুল হাশিম সম্পাদক। শেখ মুজিবসহ অনেক কর্মী তখন ফেরি করে কাগজ বিক্রি করতেন। মিল্লাতের প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছিল ১৬ নভেম্বর ১৯৪৫ সালে। প্রতি সপ্তাহে ৩৫,০০০ কপি ছাপা হতো বলে জানিয়েছেন আবুল হাশিম। তিনি লিখেছেন, তিনি ছিলেন কাগজে-কলমে সম্পাদক। আসল সম্পাদক ছিলেন কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস।

নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা হয়েছে। প্রদেশ মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন হবে। এর বিস্তারিত বিবরণ বঙ্গবন্ধু ও আবুল হাশিমের গ্রন্থে আছে। তবে, বিবরণ দুটিতে পার্থক্য আছে। মুজিব জানাচ্ছেন, খাজা নাজিমউদ্দীন বোর্ডে তাঁর দল ভারী করতে চাইলেন। নয়জনের মধ্যে চারজন তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন। বাকি পাঁচজন তাঁরা ভেবেছিলেন নির্বাচনে পার করে নিতে পারবেন। লিখেছেন তিনি, ‘এতেই গোলমাল শুরু হয়ে গেল। আমরা প্রতিবাদ করলাম এবং বললাম, শহীদ সাহেবকে এমএলএ-দের পক্ষ থেকে কেন নেওয়া হবে না? তাঁকে অপমান করা হয়েছে। কারণ, তিনি ডেপুটি লিডার মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির। এটা একটা ষড়যন্ত্র। শহীদ সাহেব আমাদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন, ‘ঠিক আছে, এতে কি হবে?’ আমরা বললাম, আপনি আর উদাহরণ দেখাবেন না …’ ইত্যাদি। (আত্মজীবনী, পৃ ৪১-৪২)

আবুল হাশিম লিখেছেন [২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫], পার্লামেন্টারি পার্টির দুজন সদস্য নির্বাচনের জন্য সভা ডাকা হলো। নাজিমউদ্দীন ফজলুর রহমানের নাম প্রস্তাব করলেন। সোহরাওয়ার্দী বললেন তিনি নাজিমউদ্দীনের সমর্থন পাবেন না। তখন তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আইনসভা থেকে সোহরাওয়ার্দী সোজাসুজি এলেন মুসলিম লীগ অফিসে আবুল হাশিমের ঘরে। সোহরাওয়ার্দী বললেন, ‘হাশিম এখন আমাকে বনেবাদাড়ে ঘুরতে হবে।’ তাঁর গাল বেয়ে পানি পড়ছিল, তিনি মদ-সিগারেট খেতেন না। আবুল হাশিমের সহকারী সিদ্দিক তাঁকে সিগারেটের প্যাকেট দিলেন, তিনি একটার পর একটা সিগারেট খেতে লাগলেন। হাশিম তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, পাঁচটি আসনেই তাঁরা জিতবেন, তবে সোহরাওয়ার্দীকে পার্টিম্যানের মতো আচরণ করতে হবে। সোহরাওয়ার্দী বললেন, তা-ই তিনি করবেন।

খাজা নাজিমউদ্দীনের একটি আসনের দরকার ছিল। তিনি ভাবলেন, সোহরাওয়ার্দীকে একটি আসন দিলে বাকিগুলোতে তাঁরা জিতবেন। বিকেলে সোহরাওয়ার্দীকে মওলানা আকরম খাঁর বাসায় ডাকা হলো।সেখানে গিয়ে দেখলেন, খাজারা বসে আছেন, তাঁরা জানালেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে সোহরাওয়ার্দীকে নেওয়া হবে, বাকি চারটি আসন ব্যালটের মাধ্যমে নির্ধারণ হবে। তিনি সে অনুযায়ী একটি সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষর করলেন।

এ-খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। আবুল হাশিমের ভাষায় বামপন্থি, বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ‘প্রগতিশীলরা’ এতে ক্ষিপ্ত হলেন।

পরদিন সকালে প্রগতিশীলরা জমা হলেন অফিসে আবুল হাশিমের রুমে। তিনি তাঁদের নিরাশ হতে মানা করলেন, বললেন, সোহরাওয়ার্দী যদি খাজাদের পক্ষ ত্যাগ না করেন তাহলে তাঁকে তাঁরাও ত্যাগ করবেন। তিনি লিখেছেন –

I started hurling abuses on Mr. Suharawardy for his betrayal and sent to him groups of men in succession to inform Mr. Suharawardy what was happening in the Muslim League office. This tactics succeeded and Mr. Suharawardy grew awfully nervous.             (আবুল হাশিম, পৃ ৯১)

দুপুরে সোহরাওয়ার্দী আবুল হাশিমের সঙ্গে দেখা করলেন। হাশিম জানালেন কী ঘটেছে। তিনি তখনই খাজা নাজিমউদ্দীনকে ফোন করে জানালেন। গতরাতের প্রস্তাবে তিনি রাজি নন। [ওই]

শেখ মুজিবের বিবরণ এর থেকে ভিন্ন। তিনি লিখেছেন, কলকাতা অ্যাসেম্বলি পার্টি রুমে পরিষদ সদস্য ও লীগ নেতাদের বৈঠক হবে আপসের জন্য। রুদ্ধদ্বার বৈঠক, বেকার হোস্টেল ও অন্যান্য হোস্টেলে খবর দিয়ে ২০০-৩০০ ছাত্র নিয়ে তিনি সভাস্থলে উপস্থিত হলেন। ছাত্রদের চাপে দরজা খুলে তাদের ভেতরে আসতে দিতে হলো। ‘আমিই প্রথম বক্তা, প্রায় আধঘণ্টা বক্তৃতা করলাম এবং শহীদ সাহেবকে বললাম, ‘আপোস করার কোন অধিকার আপনার নাই। আমরা খাজাদের সাথে আপোস করব না। কারণ, ১৯৪২ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে নিজের ভাইকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। তাঁর বংশের থেকে এগারজনকে এমএলএ বানিয়ে ছিলেন। এদেশে তারা ছাড়া আর লোক ছিল না? মুসলিম লীগ কোটারি করতে আমরা দিব না। আমরাই হক সাহেবের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। দরকার হয় আপনার বিরুদ্ধেও আন্দোলন করব।’ শহীদ সাহেবকে বাধ্য করে সভা থেকে উঠিয়ে নিয়ে চলে এসেছিলাম। (আত্মজীবনী, পৃ ৪২) পরে ফজলুল কাদের চৌধুরী ও লাল মিয়া মুজিবকে সমর্থন করে বক্তৃতা দিলেন। সোহরাওয়ার্দী বললেন, পরদিন সকাল নয়টার মধ্যে তিনি জানাবেন।

বঙ্গবন্ধুর বর্ণনা আগে পরে হয়েছে বলে আমার ধারণা। তিনি যে-ঘটনার উল্লেখ করলেন সেটি খুব সম্ভব প্রথম দিনের। হাশিম যা লিখেছেন তাও অবিশ্বাস করার কারণ নেই। তবে, একটি বিষয়ে বেশ গরমিল।

২৯ সেপ্টেম্বর মুসলিম ইনস্টিটিউটে বিকেলে সভা শুরু হলো। নাজিমউদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর নাম প্রস্তাব করলেন। সোহরাওয়ার্দী সে-প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন, জানিয়েছেন আবুল হাশিম। তখন দুপক্ষেই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলতে লাগল। ফরিদপুরের ইউসুফ আলী চৌধুরী মুন্সিগঞ্জের শামসুদ্দীনকে পেটে এমন লাথি মারলেন যে তিনি ছিটকে পড়লেন এবং অজ্ঞান হয়ে গেলেন। শেখ মুজিব চৌধুরীর গলা চেপে ধরে তাঁকে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। পরদিন পর্যন্ত মিটিং মুলতবি হয়ে গেল। (আবুল হাশিম, পৃ ৯৬) এ-ঘটনার কথা বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে নেই।

বঙ্গবন্ধু জানাচ্ছেন, সেদিন সোহরাওয়ার্দীকে তাঁরা নিয়ে এসেছিলেন এবং সেদিন রাত পর্যন্ত কমবেশি তাঁরা থেকেছেন। সকালে তাঁরা হাজির হলেন সোহরাওয়ার্দীর বাসায়। ‘আমি বললাম’, লিখেছেন বঙ্গবন্ধু, ‘স্যার বিশ্বাস করেন আমরা নিশ্চয় জিতব, খোদার মর্জি থাকলে আমাদের পরাজিত হবার কোন কারণ নেই।’ আমি টেলিফোন তাঁকে দিয়ে বললাম, ‘বলে দেন খাজা সাহেবকে ইলেকশন হবে।’ শহীদ সাহেব নাজিমউদ্দীন সাহেবকে টেলিফোন করে বললেন, ‘ইলেকশনই হবে। যাই হোক না কেন, ইলেকশনের মাধ্যমেই হবে। সকলেই তো মুসলিম লীগের, আমরা কেন উপরের থেকে চাপাতে যাব।নাজিমউদ্দীন সাহেব কি যেন বললেন। শহীদ সাহেব বললেন, ‘আর হয় না। আপনারা ভালো ব্যবহার করেন নাই।’ (আত্মজীবনী, পৃ ৪)

আবুল হাশিম ও মুজিব দুজনই জানিয়েছেন, ফজলুল কাদের চৌধুরী সোহরাওয়ার্দীর দলে থাকলেও রাতে আবার নাজিমউদ্দীন গ্রুপের কাছে গেছিলেন তাঁকে যেন মনোনয়ন দেওয়া হয় সেজন্য। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, সোহরাওয়ার্দী রাতেই সে-খবর পেয়ে বললেন, ‘কিছুতেই ওকে নমিনেশন দেওয়া হবে না কারণ এই বয়সেই এর এত লোভ।’ (ওই, পৃ ৪৪) এই লোভের কবল থেকে ফজলুল কাদের চৌধুরী কখনো মুক্তি পাননি এবং তার পরিণতিও কী তা সবার জানা। লাল মিয়াকে মুজিব ও সোহরাওয়ার্দী ক্যানভাস করে নিয়েছিলেন। কিন্তু বোর্ডে ফরিদপুরের নমিনেশন দেওয়ার সময় তিনিও গ্রুপের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেন। তিনিও বিস্মৃত। রাজনীতিতে লোভ, ক্ষুদ্র স্বার্থের ওপরে যিনি উঠতে পারেননি, তিনিই আর বেশি দূরে এগোতে পারেননি। শেখ মুজিব এগুলির ঊর্ধ্বে ছিলেন তাই তিনি বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন।

এরপর নির্বাচন। মুজিব ভার পেলেন ফরিদপুরের। ফরিদপুরেও মুসলিম লীগের অপর পক্ষের সঙ্গে লড়াই করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলো। কীভাবে সালাম গ্রুপ তাঁর বিরোধিতা করেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ আছে তাঁর আত্মজীবনীতে। নির্বাচনে তাঁরা জিতেছিলেন।

পাঁচ

মুজিব এরপর দিল্লি গিয়েছিলেন। তারপর বাড়ি। তাঁর তখন অর্থ দূরে থাকুক, জামাকাপড়ও নেই। ঠিক করেছিলেন কলকাতায় ফিরে, পড়াশোনা করে পরীক্ষা দেবেন। এই প্রথম দেখলেন তাঁর বাবা খানিকটা অসন্তুষ্ট। তিনি পুত্রকে বললেন, ‘কোনো কিছুই শুনতে চাই না, বি.এ. পাস ভালোভাবে করতে হবে।অনেক সময় নষ্ট করেছ, ‘পাকিস্তান আন্দোলন’ বলে কিছুই বলি নাই। এখন কিছুদিন লেখাপড়া কর।’ স্ত্রী রেণু তাঁর জন্য কিছু টাকা জোগাড় করেছিলেন। সে-টাকা নিয়ে ফিরলেন কলকাতা।

কলকাতায় ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে বঙ্গবন্ধুর জীবনে একটি বড় ঘটনা। ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে সম্পর্কে এতদিন এক ধরনের বিবরণ তৈরি করা হয়েছে এবং এর ফলে সৃষ্ট দাঙ্গার দায় সম্পূর্ণভাবে মুসলিম লীগ ও মুসলমানদের ওপর চাপানো হয়েছে, যা আদৌ ঠিক নয়। আসলে ১৯০০-৪৭ পর্বের বিভিন্ন বিবরণ এখন মনে হয় আবার পর্যালোচনা করার সময় এসেছে এবং সঠিক তথ্য তুলে ধরা উচিত।

১৯৪৬ সালের ১৯ জুলাই, মুম্বাইয়ে মুসলিম লীগ সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব পাশ করে, যা প্রত্যক্ষ কর্মসূচি বা ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ নামে পরিচিত। মুজিব লিখেছেন ২৯ জুলাই, সেটি ঠিক নয়। সিদ্ধান্তে বলা হলো ১৬ আগস্ট ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে পালিত হবে। মুজিব অর্থাভাবে সম্মেলনে যেতে পারেননি। আবুল হাশিম গিয়েছিলেন। প্রস্তাবটির মূল ছিল, ওইদিন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হরতাল ডেকে প্রতিবাদ জানানো হবে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, আবুল হাশিম তাঁদের বললেন, ‘তোমাদের মহল্লায় মহল্লায় যেতে হবে, হিন্দু মহল্লায়ও তোমরা যাবে। তোমরা বলবে, আমাদের এই সংগ্রাম হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, আসুন আমরা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে তা পালন করি।’ কিন্তু হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস এর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে যার মর্মার্থ এটি হিন্দুদের বিরুদ্ধে। সোহরাওয়ার্দীও তাই জানতেন। আবুল হাশিমও ১৩ আগস্ট এক বিবৃতিতে জানান, এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, অকটারলনি মনুমেন্টের নিচে সোহরাওয়ার্দী মুসলমান ও সংখ্যালঘুদের নিয়ে একটি সভা করেন। সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ডের সামনে একটি প্রস্তাব করেন। আন্দামান বন্দিদের ঢাকা জেলে এনে রাখা হয়েছিল। তিনি প্রস্তাব করলেন, এঁদের মুক্তি দিতে হবে। দাঙ্গা-হাঙ্গামার উদ্দেশ্য থাকলে সোহরাওয়ার্দী এ-প্রস্তাব দিতেন না। ১৪ আগস্ট তাঁদের মুক্তি দেয়া হলো, তাঁরা কলকাতায় এসে আবুল হাশিমের বাসায় দেখা করেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আবদুল্লাহ রসুল তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আবুল হাশিম গর্ব করে লিখেছেন, ‘এই প্রথম আমি বাংলার বিপ্লবী নেতাদের যেমন, অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, অম্বিকা চক্রবর্তী, লোকনাথ বল, আনন্দ গুপ্ত প্রমুখকে দেখলাম।’ (আবুল হাশিম, পৃ ১১৫) তাঁরা তাঁর বাসায় মধ্যাহ্ন ভোজ সারেন।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন ১৬ তারিখ সোহরাওয়ার্দী ছুটি ঘোষণা করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে যেন দিনটা পালন করা হয়। কোনো গোলমাল হলে মুসলিম লীগ সরকারের বদনাম হবে।’ ঠিক হলো ১৬ আগস্ট গড়ের মাঠে সভা হবে। নেতাকর্মীরা কে কোথায় থাকবেন তাও ঠিক করে দেওয়া হলো। কিন্তু সেদিন দুপুরের আগে থেকেই দাঙ্গা শুরু হলো।

গড়ের মাঠে সভা চলছে। আবুল হাশিম তাঁর দুটি বালক পুত্রকে নিয়ে এসেছিলেন। লালমিয়া তাঁর নাতি নিয়ে এসেছিলেন। হাশিম লিখেছেন, অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকলে তো পুত্র নাতি নিয়ে তাঁরা মাঠে যেতেন না। Men may lie but circumstances never lie.         (ওই, পৃ ১১৬)

মুজিব ও তাঁর কর্মীরা গড়ের মাঠে পৌঁছে সোহরাওয়ার্দীকে সব জানালেন। তিনি বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করে সবাইকে বাসায় ফিরে যেতে বললেন। এই দাঙ্গা ক্রমশ উত্তাল হয়ে ওঠে এবং পাঁচদিন ধরে ওই সময় রাতদিন মুজিব ও তাঁর কর্মীরা কাজ করেছেন। হিন্দুদের উদ্ধার করে হিন্দু মহল্লায় পাঠিয়েছেন, মুসলমানদের মুসলমান পাড়ায়। রিলিফ দিয়েছেন, এরপর ঢাকা, বিহার, নোয়াখালীতে দাঙ্গা শুরু হয়েছে। মুজিব এরপর ত্রাণকাজ চালাবার জন্য বিহার গিয়েছিলেন।

ত্রাণকাজ সেরে দেড় মাস পর কলকাতায় ফিরলেন, বিএ’র টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেছে। অধ্যক্ষ জানালেন, মুজিব ‘তুমি যথেষ্ট কাজ করেছ পাকিস্তান অর্জন করার জন্য। তোমাকে আমি বাধা দিতে চাই না। তুমি যদি ওয়াদা করো যে এই কয়েক মাস লেখাপড়া করবা এবং কলকাতা ছেড়ে বাইরে কোথাও চলে যাবা এবং ফাইনাল পরীক্ষার পূর্বেই এসে পরীক্ষা দিবা, তাহলে তোমাকে আমি অনুমতি দেব।’ (আত্মজীবনী, পৃ ৭১) মুজিব ওয়াদা করলেন এবং ছোট বোনের কাছে চলে গেলেন [আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায়]। পরীক্ষা দিয়ে তিনি পাশ করলেন।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অন্তর্কলহে মুসলিম লীগ ছিল ক্ষতবিক্ষত। সোহরাওয়ার্দী আবুল হাশিমের সম্পর্ক ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়েছে। খাজা নাজিমউদ্দীন আবার মুসলিম লীগের নেতৃত্ব পেয়ে ঢাকায় চলে এসেছেন। সেই সময়ের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন বঙ্গবন্ধু। এমএলএদের কেনাবেচা চলছে। সিলেট থেকে একদল এমএলএ এসেছেন। মুজিব ও ডা. মালেক গেছেন সোহরাওয়ার্দীর বাড়িতে রাত দুটায়। ‘ডা. মালেক এসে বললেন, আমাদের অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না। কিছু টাকা খরচ করলে বোধ হয় অবস্থার পরিবর্তন করা যেত। শহীদ সাহেব মালেক সাহেবকে বললেন, ‘মালেক পাকিস্তান হয়েছে, এর পাক ভূমিকে নাপাক করতে চাই না। আমার কাজ আমি করেছি।’ … সেইদিন থেকে শহীদ সাহেবকে আমি আরও ভালোবাসতে শুরু করলাম।’(ওই, পৃ ৭৭)

১৪ আগস্টের পর আবার কিছু দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হয়েছে। মহাত্মা কলকাতায় এসেছেন। সোহরাওয়ার্দী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য তাঁর সঙ্গে শান্তি মিশনে কাজ শুরু করলেন। তরুণ মুজিবকে নিয়ে তিনি ব্যারাকপুর গেলেন গান্ধীর আশ্রমে। তাঁর একটি আলোকচিত্র আছে।

কলকাতায় ধরপাকড় শুরু হয়েছে। মুজিব ও তাঁর ছোট বোনের জামাই সেরনিয়াবাত পার্ক সার্কাসে একটি রেস্টুরেন্ট খুলেছিলেন। আবদুর রব তখন কলকাতার বাইরে ছিলেন। তাঁকে টেলিফোন করলেন, কলকাতায় ফিরে এসব ব্যাপার সামাল দিতে। তারপর গেলেন সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করতে।ইতোমধ্যে তাঁর ওপর কয়েকবার আক্রমণও হয়েছে। শেখ মুজিব তাঁকে অনুরোধ করলেন, ঢাকায় চলে আসতে। তিনি বললেন, ‘যেতে তো হবেই, তবে এখন এই হতভাগা মুসলমানদের জন্য কিছু একটা না করে যাই কি করে? দেখ না, সমস্ত ভারতবর্ষে কি অবস্থা হয়েছে, চারদিকে শুধু দাঙ্গা আর দাঙ্গা। সমস্ত নেতা চলে গেছে, আমি চলে গেলে আর এদের উপায় নেই। তোমরা একটা কাজ কর দেশে গিয়ে, সাম্প্রদায়িক গোলমালে যাতে হিন্দুরা চলে না আসে। এরা এদিকে এলেই গোলমাল করবে। তাতে মুসলমানরা বাধ্য হয়ে পূর্ব বাংলায় ছুটবে। যদি পশ্চিম বাংলা, বিহার ও আসামের মুসলমানরা একবার পূর্ব বাংলার দিকে রওনা হয় তবে পাকিস্তান বিশেষ করে পূর্ব বাংলা রক্ষা করা কষ্টকর হবে। এত লোকের জায়গাটা তোমরা কোথায় দিবা আমার তো জানা আছে। পাকিস্তানের মঙ্গলের জন্যই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতে দিও না।’   (ওই, পৃ ৮২) মুজিব জানালেন, শামছুল হক খবর দিয়েছেন, ঢাকা যেতে, সভা হবে। তারপর বিদায় নিয়ে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ফিরে এলেন। ফের গিয়েছিলেন কলকাতায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২৫ বছর পর। ১৯৭২ সালে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: