বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

লেখক: বিশ্বজিৎ ঘোষ

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-৭৫) সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনিই বাঙালির শ্রেষ্ঠতম জাতীয়তাবাদী নেতা। বাঙালির সম্মিলিত চেতনায় জাতীয়তাবোধ সঞ্চারে তিনি পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। গণতান্ত্রিক মূল্যচেতনা, শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা – এই ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যই বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদের মূল কথা। জাতীয়তাবাদের এই মূলমন্ত্রকে তিনি সঞ্চারিত করে দিয়েছেন বাঙালির চেতনায়। এভাবেই, ইতিহাসের অনিবার্য দাবিতে, তিনি হয়ে উঠেছেন বাঙালির অবিসংবাদিত জাতীয়তাবাদী নেতা।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ, প্রকৃত অর্থে, অভিন্ন ও একাত্ম। বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও স্বাধীনতা – এই শব্দত্রয় একই সূত্রে গাঁথা। বাঙালির মুক্তি আর স্বাধীনতার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশের কথা বলতে গিয়ে অনিবার্যভাবে এসে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। জনগণের স্বার্থের সঙ্গে, দেশের স্বার্থের সঙ্গে নিজের স্বার্থকে তিনি একাত্ম করতে পেরেছিলেন অবলীলায়। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, দেশের স্বার্থের কাছে, জনগণের স্বার্থের কাছে তিনি নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। এ-কারণেই বোধ করি কবি-মনীষী অন্নদাশঙ্কর রায় বাংলাদেশের আরেক নাম রেখেছেন Mujibland। এক অর্থে বঙ্গবন্ধুই, একটা পর্বের, বাংলাদেশের ইতিহাস। তাঁর জীবন ও কর্মের ক্রমিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা-আন্দোলনের একটি বিশেষ সময়খণ্ডের কথা আমরা জানতে পারি।

শোষক ও শোষিতের সংগ্রামে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে বঙ্গবন্ধু পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেকে তিনি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করতে চেয়েছেন, চেয়েছেন দেশকে স্বাধীন করতে। এই মুক্তির সংগ্রামে তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, কিশোর বয়স থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন প্রতিবাদ, সর্বদা বলেছেন সত্য ও ন্যায়ের কথা – এবং হয়ে উঠেছেন স্বাধীনতার মূর্তপ্রতীক। সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে তিনি কখনো দূরে সরে যাননি, ভীতি ও অত্যাচারের মুখেও সর্বদা তিনি সত্য ও ন্যায়ের কথা বলেছেন, শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন। শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এই নির্ভীক অবস্থানের কারণে তিনি কেবল বাংলাদেশেই নয়, শোষিত-নির্যাতিত বিশ্বমানব সমাজেরও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। প্রসঙ্গত স্মরণ করতে পারি ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত আলজিয়ার্সের জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের কথা, যেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন – ‘বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত – শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন – এসব স্থানে শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়, বিশ্বের শোষিত-নির্যাতিত মানুষ বঙ্গবন্ধুকে গ্রহণ করে নেয় নিজেদের নেতা হিসেবে।

বিশ্ব-ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর মতো জাতীয়তাবাদী নেতার দৃষ্টান্ত বিরল। তিনিই বিশ্বের একমাত্র নেতা – যিনি জাতীয় পুঁজির আত্মবিকাশের আকাঙ্ক্ষা ও বাঙালির সম্মিলিত মুক্তির বাসনাকে একবিন্দুতে মেলাতে পেরেছেন। এ-কারণেই তিনি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, এ-কারণেই তিনি আমাদের জাতির পিতা। সবার স্বপ্নকেই তিনি একটি গ্রহণযোগ্য বিন্দুতে মেলাতে পেরেছিলেন। বিশ্ব-ইতিহাসে কোনো জাতীয়তাবাদী নেতার কর্মসাধনায় আমরা এই যুগল স্রোতের মিলন লক্ষ করি না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন গণতন্ত্রের অতন্দ্র সৈনিক। তাঁর কর্ম ও সাধনা, চিন্তা ও ধ্যানে সর্বদা ক্রিয়াশীল থেকেছে বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। কৈশোরকাল থেকেই তিনি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে ছিলেন সোচ্চার। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আটান্নর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা-আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের মহান গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ – প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি পালন করেন নেতৃত্বের ভূমিকা। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান শক্তি-উৎস ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে তিনি ছিলেন সর্বদা বজ্রকণ্ঠ। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে তাঁর ভাষণ ছিল গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে, স্বাধিকারের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে এক ঐতিহাসিক দলিল। একটি ভাষণ একটি জাতিকে জাগ্রত করেছে, সকলকে মিলিয়েছে একবিন্দুতে – এমন ঘটনা বিশ্ব-ইতিহাসে বিরল।

উনিশশো একাত্তর সালের ছাব্বিশে মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ নয় মাসের সেই মহান যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের প্রধান শক্তি-উৎস। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, সমগ্র বাঙালি জাতির কাছে বঙ্গবন্ধুর নামটিই ছিল ভরসার স্থল, তাঁর নামটিই ছিল শক্তি, সাহস ও প্রেরণার অবিরল উৎস। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। বাংলাদেশের মুক্তি-আন্দোলনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এ-কথাই যেন ব্যক্ত হয়েছে অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই শব্দগুচ্ছ – ‘যতকাল রবে পদ্মা-মেঘনা-গৌরী যমুনা বহমান/ ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনন্য স্থপতি। দীর্ঘ সাধনায় বাঙালির মানসলোকে তিনি সঞ্চার করেছেন স্বাধীনতার বাসনা। উপনিবেশ-শৃঙ্খলিত একটি ঘুমন্ত জাতিকে তিনি জাগ্রত করেছেন, তাদের করে তুলেছেন স্বপ্নমুখী, রক্তমুখী, মুক্তিমুখী। এই যে একটি জাতির মানসপ্রকল্পকে জাগিয়ে তোলা – এটাই বঙ্গবন্ধুর অক্ষয় অবদান। ঔপনিবেশিক অবকাঠামোর মধ্যে তাঁর মতো জাতীয়তাবাদী নেতার জাগরণ রীতিমতো বিস্ময়কর। পুরো ব-দ্বীপকে তিনি জাগিয়ে তুলেছেন, কিংবা বলি পুরো দেশকে তিনি জাগিয়েছেন – এ-কারণেই তিনি বঙ্গবন্ধু, এ-কারণেই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ আজ অভিন্ন। বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ আজ এক সুতোয় গাঁথা – একটি অপরটির পরিপূরক। একটি থেকে অন্যটিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো পথ নেই। বংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু, প্রকৃত অর্থে, আজ সমার্থ হয়ে গেছে। অনেক বিদেশির কাছে বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু – এ-কথা প্রায়শই তো আমরা শুনে থাকি।

বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশি কোনো শক্তির শাসন বঙ্গবন্ধু মেনে নেননি। এজন্য তাঁকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, কারাগারে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। দেশের প্রতি, দেশের মাটির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি স্বাধীনতার যে-ঘোষণা দেন, সেখানেও দেশের মাটির কথা তিনি চরম বিপদের মুখেও উচ্চারণ করেন নির্ভীকচিত্তে। স্মরণ করা যায় বঙ্গবন্ধুর সেই স্বাধীনতার ঘোষণা :

This may be my last message; from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh, wherever you may be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved. Joy Bangla.

দেশকে ভালোবাসতেন বলে বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছেন মিলিত বাঙালির। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল তাঁর মজ্জাগত, মানবিক চেতনায় তিনি সর্বদা ছিলেন উচ্চকিত। তিনি ছিলেন বাঙালির ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির ধারক। মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে তাঁর কাছে সর্বদা প্রাধান্য পেয়েছে মানব-পরিচয়। এ-কারণে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে তিনি ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির ধারক বাঙালির জন্য অসম্মানের বলে মনে করতেন। বাংলাদেশ ও বাঙালি সত্তাকে তিনি কী বিপুলভাবে ভালোবাসতেন, তা বোঝা যায় ১৯৭২ সালে ১০ই জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি যে ভাষণ দেন, তা থেকে। ওই ভাষণে তিনি বলেছিলেন – পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের মুখের ওপর তিনি বলেছেন : ‘আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবরও খোঁড়া হয়েছিল। … আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের নিকট নতি স্বীকার করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা, জয় বাংলা।’ এ-বক্তব্য থেকেই অনুবাধন করা যায়, দেশের জন্য, বাঙালির জন্য, বাংলা ভাষার জন্য বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসা। ১০ই জানুয়ারির ভাষণে কেবল দেশপ্রেম নয়, বঙ্গবন্ধুর উদার মানবতাবোধ এবং সদর্থক বিবেচনারও পরিচয় ব্যক্ত হয়েছিল। সেদিনের ভাষণে সুস্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছিল এই উদার মানবচেতনা, এই মহৎ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা – ‘আমার পশ্চিম পাকিস্তানের ভায়েরা, আপনাদের প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই।আমি চাই আপনারা সুখে থাকুন। আপনাদের সেনাবাহিনী আমাদের অসংখ্য লোককে হত্যা করেছে, আমাদের অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে, আমাদের গ্রামগুলো বিধ্বস্ত করেছে, তবুও আপনাদের প্রতি আমার কোনো আক্রোশ নেই। আপনারা স্বাধীন থাকুন, আমরাও স্বাধীন থাকি। বিশ্বের অন্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে আমাদের যে ধরনের বন্ধুত্ব হতে পারে, আপনাদের সাথেও শুধুমাত্র সেই বন্ধুত্বই হতে পারে। কিন্তু, যারা অন্যায়ভাবে আমাদের মানুষদের মেরেছে, তাদের অবশ্যই বিচার হবে।’এই-ই হচ্ছে আমাদের জাতির পিতা মানবিক বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় পরিচয়। উদ্ধৃতির শেষের বাক্যটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু সচেতনভাবে এখানে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলেছেন। যুদ্ধাপরাধের এই বিচার-প্রক্রিয়ার ঐতিহাসিক এক ডিসকোর্সের সামনে আজ বাংলাদেশ। এ-প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের বক্তব্য আরো তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে।

কেবল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তিই নয়, বাংলাদেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মুক্তি সংগ্রামেও অন্যতম নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাংলা ভাষাকে তিনি বুকে ধারণ করতেন – রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ বদলে শিল্প-সাহিত্য পালন করতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায়, ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি-আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে বঙ্গবন্ধুর এই অসামান্য উক্তি :

যারা সাহিত্য সাধনা করছেন, শিল্পের সাধনা করছেন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সেবা করছেন, তাঁদেরকে দেশের জনগণের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র রক্ষা করে অগ্রসর হতে হবে। দেশের জনগণের চিন্তা-ভাবনা, আনন্দ-বেদনা এবং সামগ্রিক তথ্যে তাঁদের জীবনপ্রবাহ আমাদের সাহিত্যে ও শিল্পে অবশ্যই ফুটিয়ে তুলতে হবে। সাহিত্য-শিল্পে ফুটিয়ে তুলতে হবে এদেশের দুঃখী মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা। সাহিত্য-শিল্পকে কাজে লাগাতে হবে তাঁদের কল্যাণে। আজ আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতির শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে, আপনাদের লেখনীর মাধ্যমে তার মুখোশ খুলে ধরুন, দুর্নীতির মূলোচ্ছেদে সরকারকে সাহায্য করুন। আমি সাহিত্যিক নই, শিল্পী নই, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, জনগণই সব সাহিত্য ও শিল্পের উৎস। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনোদিন কোনো মহৎ সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না।

বস্তুত, তাঁর সাধনার মধ্য দিয়েই ভাষা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিসম্ভব বাঙালি জাতীয়তাবাদের পূর্ণাঙ্গ রূপ সৃষ্টি হয়েছে। ভাষা-আন্দোলনের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে তিনি রেখেছেন যেমন বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর অপরিসীম ভালোবাসার পরিচয়, তেমনি জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে সে-পরিচয়কেই করে তুলেছেন আরো প্রগাঢ়। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বঙ্গবন্ধুই প্রতিষ্ঠা করেন ভাষা সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। তাঁর সৃষ্ট জাতীয়তাবাদের মোহনায় মিশেছে সমগ্র বাঙালি। অন্য কোনো নেতা বাঙালিকে এভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে সমর্থ হননি। সে-কথাই যেন ব্যক্ত হয়েছে জসীমউদদীনের কবিতায় :

এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,

সন্ন্যাসী বেশে দেশ-বন্ধুর শান্ত-মধুর ডাক।

শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী – জীবন করিয়া দান,

মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান।

তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,

জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।

(‘বঙ্গ-বন্ধু’, জসীমউদদীন)

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের কথা ভাবতে ভাবতে মনে জাগছে আরেক শ্রেষ্ঠ বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা।রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গবন্ধু ধারণ করেছেন অন্তরে, যেমন ধারণ করেছেন বাংলাদেশকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার বাংলা’ ধারণাকে বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেছিলেন তাঁর আরাধ্য কর্ম হিসেবে। রবীন্দ্রনাথের সংগীতকেই তিনি নির্বাচন করেছেন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে। তিনি চেয়েছিলেন শোষণমুক্ত সুষমবণ্টন-ভিত্তিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি, চেয়েছিলেন নিম্নবর্গের মানুষের উত্থান। সর্বকালের এই দুই শ্রেষ্ঠ বাঙালির স্বপ্ন ও বাসনাকে এক বিন্দুতে মিলিয়েই আমরা নির্মাণ করতে পারি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ – স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’। হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে একসূত্রে গ্রথিত করেছেন। তিনি হলেন রাজনীতির কবি – Poet of politics। রাজনীতিকে তিনি সৃষ্টিশীল চেতনা দিয়ে নিজের হাতে আকার দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের।বঙ্গবন্ধুর সে-স্বপ্ন এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যকন্যা বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিচালনায় বাংলাদেশ আজ উন্নতির উচ্চশিখরে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আরাধ্য স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে হলে, শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে, প্রকৃত দেশপ্রেম নিয়ে সচেতনতার সঙ্গে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। সেটাই হবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের শ্রেষ্ঠ উপায়।

Leave a Reply