বেঙ্গল শিল্পালয়ে দিলারা বেগম জলির একক প্রদর্শনী আমাকে নিস্তার দাও ভাঙনের শব্দ থেকে … স্মৃতির ভেতর ফের খুলে যাচ্ছে কোষবদ্ধ এক নিপুণ তরবারি …

লেখক: শহীদ কাদরী

যুদ্ধ সারা পৃথিবীতে এক নিগ্রহের আবহ তৈরি করে। যুদ্ধে সবচেয়ে অবমাননার শিকার হয় নারী। দিলারা বেগম জলি এবারের প্রদর্শনী উৎসর্গ করেছেন সকল নারীকে। প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘জঠরলিপি’। প্রদর্শনীর মোট শিল্পকর্মের সংখ্যা ছয়টি, মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন অ্যানিমেশন ফিল্ম, আলোকচিত্র, মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রে সুচের ব্যবহার, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর টর্চার চেয়ারের আলোকচিত্র, টর্চার টেবিল ও ৪০ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র, যেটি তৈরি হয়েছে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতিত ‘রমা চৌধুরী’র জীবনযাপন নিয়ে।
‘জঠরলিপি’ প্রদর্শনীর কাজ নিয়ে দিলারা বেগম জলি ভাবেন এমন করে – ‘বিশ্বের যুদ্ধের ইতিহাস অনুসন্ধান করে আমার উপলব্ধি, সকল যুদ্ধই জঠর বিনাশ করতে উদ্যত। শুধু যুদ্ধে নয় – নারীর জীবনযুদ্ধও প্রায় একই রকম।’
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের নারীরা কী নির্মম নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন, দিলারা বেগম জলি সে-যুদ্ধের স্মৃতি হাতড়ে-খুঁড়ে তৈরি করেছেন নানামাত্রিক শিল্পকর্ম। দিলারা বেগম জলি শিল্পকর্মে সুন্দর-অসুন্দর উপস্থাপন করেন না, তিনি নারীকে বিষয় করে চলতি সমাজ ও বিগত সমাজ কাঠামোয় নারীর অবস্থান, গ্রহণ, নিগ্রহ, বাস্তবতার আলোকে নারীর দিনযাপন তুলে আনেন।
এবারের প্রদর্শনীর শিল্পকর্মে নারীই কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে, শাখায় জলি নিরীক্ষা করেছেন। দ্বিমাত্রিক তলে শিল্পনির্মাণ, চলচ্চিত্র, বাচিক শিল্প, অভিনয় বা পরিবেশনা শিল্প ও প্রথাগত শিল্প নির্মাণের বাইরে কাগজে সুচের ব্যবহারে আলোকচিত্রের সঙ্গে যুক্ত করেন সুচের ফোঁড়। ইতিপূর্বে আয়োজিত প্রদর্শনীর কাজগুলোতে শিল্পী মাধ্যমে ভিন্নতা এনে সৃষ্টি করেছেন নানান শিল্পকর্ম। এরকম শিল্পকর্মে তিনি কখনো স্থির থাকেন না, নারী বিষয়ের মূল কেন্দ্রে অবস্থান করলেও শিল্পের সব শাখায় তাঁর সৃষ্টিকর্ম আমাদের মনে নতুন ভাবনা তৈরি করে।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ইতিপূর্বে তাঁর আরো তিনটি প্রদর্শনী আয়োজন করেছে। ‘জঠরলিপি’ চতুর্থ প্রদর্শনী।
এবারের প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ‘জঠরলীলা’ তথ্যচিত্রটি দর্শকদের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে এনে দেয়। পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ মানুষের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি করে তার প্রামাণ্য দলিল ‘জঠরলীলা’। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর নৃশংসতায় আক্রান্ত লেখক রমা চৌধুরীর মনোদৈহিক বিপর্যয় জলি তুলে এনেছেন প্রামাণ্যচিত্রে। রমা চৌধুরীর নিজ বয়ান, সন্তান হারানোর শোক কীভাবে প্রতিবাদ হয়ে প্রকাশ পেয়েছে, তা মূর্ত হয় প্রামাণ্যচিত্রে। যুদ্ধের ক্ষত বয়ে নিয়ে একজন নারী কীভাবে তাঁর নিজের পায়ের স্যান্ডেল জোড়া ব্যবহার না করে খালি পায়ে প্রিয় মাতৃভূমিতে হাঁটেন, সভ্য সমাজে
নিভৃতে এক জননী মনের ভেতর লুকিয়ে রাখেন যুদ্ধের ক্ষত – প্রামাণ্যচিত্রে এমন ভাবনা প্রধান হয়ে ওঠে। রমা চৌধুরীকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র আমাদের বোধে আঘাত হানে। অস্বস্তি তৈরি করে। আমরা কেঁপে উঠি। নির্মাতা-কুশলীদের সঙ্গে দিলারা বেগম জলির ভাবনা যুক্ত হয়ে গড়ে ওঠে এক বেদনার স্মৃতিগাথা।
অন্যদিকে প্রদর্শনীতে ফ্রেমবন্দি করে রাখা বীরাঙ্গনার অনেক মুখ আমাদের ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের নির্যাতিত নারীদের মনোভূমিতে তৈরি হওয়া ক্ষতচিহ্ন মনে করিয়ে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রের সাদাকালো রং প্রায় বর্ণহীন মুখের সঙ্গে জলি সুচের ফোঁড় যুক্ত করেন। এ-মুখগুলোতে করুণ চাহনির সঙ্গে প্রকাশ পায় যুদ্ধের ক্ষত।
প্রদর্শনীর স্থাপনাশিল্পে দিলারা বেগম জলি যুক্ত করেছেন স্যানিটারি ন্যাপকিন ও প্লাস্টিকের পুতুল। পৃথিবীব্যাপী নারী নিগ্রহের যে-উন্মাদনা তা থেকে নিস্তার চেয়ে এমন ব্যতিক্রমী স্থাপনা পৃথিবীর কাছে এক জিজ্ঞাসা তৈরি করে। দিলারা বেগম জলি তাঁর বয়ানে বলেন – ‘আমরা যুদ্ধ করেছি ঠিকই কিন্তু তার স্মৃতি সংরক্ষণ করিনি। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরে ইতিহাসের সাক্ষী বলতে আছে কিছু অসংরক্ষিত দালান আর ভবন, যেগুলো প্রায় বিলীন। সে-সময়ের বয়ানকে সামনে রেখে একটি পরিবেশনাশিল্প উপস্থাপন করেছি ডালিম ভবনে।’
শিল্পী স্মৃতিতে ভর করে সামনে চলেন। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন। এ-অনুসন্ধান থেকে তুলে আনেন নারীর জরায়ু কীভাবে সামগ্রিক রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে – নারীরা দুর্বল – এ-ভাবনাকে কেন্দ্র করে। একটি জাতিকে দুর্বল ও দিগ্ভ্রষ্ট করার জন্য কীভাবে রাজনীতি আর নারীজঠরকে গভীরভাবে বিনষ্ট করা হয় তা এই দীর্ঘ সময়ের নিরীক্ষায় স্পষ্ট হয়।
আমাদের সমাজব্যবস্থা নারী-পুরুষের চোখ দিয়েই দুনিয়া দেখতে শেখে। প্রদর্শনীতে রাখা অনেকগুলো নারীমুখে সুচের ফোঁড় দিয়ে দেখিয়ে দিতে চান নারী সমাজ-রাষ্ট্র, জীবনবোধ নির্মাণ করেন সুচের সূক্ষ্ম ফোঁড়ের মতো করেই। সে-সমাজে পুরুষ নিপীড়ন করে নারীকে নিত্যব্যবহার্য হাতিয়ারের মাধ্যমে।
এবারের প্রদর্শনীর খণ্ড খণ্ড বিষয়ে নানা মাধ্যমের নিরীক্ষায় দিলারা বেগম জলি যুদ্ধ, সংঘাত, হানাহানি আর নারীর প্রতি বৈষম্য, অপমানকে অগ্রাহ্য করে সাম্যের সমাজ নির্মাণের ইঙ্গিত দেন। দিলারা বেগম জলির সৃজন সাধনা নারীর জন্যে। সমাজের রীতি-প্রথায় নারীর অবদমন অগ্রাহ্য করেন তীক্ষè অঙ্গীকার নিয়ে।
রাজধানীর বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনশালায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ-প্রদর্শনী শেষ হবে ২৮ মার্চ ২০২০।
দিলারা বেগম জলি চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ থেকে ১৯৮১ সালে বিএফএ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) থেকে ১৯৮৪ সালে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তীকালে প্রিন্টমেকিংয়ে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের জন্য তিনি শান্তিনিকেতনে যান। ১৯৯১ সালে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রিন্টমেকিংয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। তিনি ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: