ভাঙা রেখায় গানের উত্থান

লেখক: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

শি ল্পের কাজ সৌন্দর্য সৃষ্টি করা। যে-সৌন্দর্য দর্শককে টেনে ধরে রাখবে; দর্শকের চোখে পলক পড়বে না। দর্শকের কাছে এক একটি শিল্পকর্ম হবে এক একটি স্বপ্নময় জগতের দরজা – যে-দরজা দিয়ে তার চোখ-মন প্রকৃত অর্থে দর্শক প্রবেশ করবে আর শুরু হবে অন্তহীন সৌন্দর্যের পথ। সম্প্রতি তেমনি এক স্বপ্নময় রঙের জগতের দরজা খুলেছিল গ্যালারি চিত্রক। ষাটের দশকের প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী আবু তাহেরের আঁকা ছবি নিয়ে চিত্রকে হয়ে গেল প্রদর্শনী। শিল্পীর শেষ দুই যুগে আঁকা ছবিগুলো থেকে নির্বাচিত অর্ধশতাধিক ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছিল এ-প্রদর্শনী। ছবিগুলোর নিচের দিকে ডানপাশের কোনায় শিল্পীর স্বাক্ষরের সঙ্গে উল্লিখিত আঁকার সাল থেকে জানা যায় এগুলো ১৯৯১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আঁকা। তেলরং, জলরং, অ্যাক্রিলিক, কলম, পেনসিলসহ মিশ্রমাধ্যমে আঁকা পেইন্টিং মাঝারি ক্যানভাসে, আর ওয়াশ, গোয়াশ, ড্রইং, স্কেচ ইত্যাদি কাগজে ছোট ফ্রেমে।

এই প্রবীণ চিত্রশিল্পী বেশ কয়েক বছর ধরে অসুস্থ। কয়েক মাস ধরে তিনি হাসপাতালে শয্যাশায়ী। তাই তিনি আসতে পারেননি নিজের প্রদর্শনীতে।

আবু তাহেরের জন্ম ১৯৩৬ সালে কুমিল্লায়। তিনি ১৯৯৪ সালে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক। চিত্রকলার প্রায় সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন তিনি। তবে মিশ্রমাধ্যমে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। মোহাম্মদ কিবরিয়ার পর এ-মাধ্যমে তিনিই সবচেয়ে বেশি কাজ করছেন। জানা যায়, এটা নিয়ে তিনি রীতিমতো গবেষণা করেন। চিত্রকলার এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে কাজ করা বেশ সহজ কাজ নয়। যেমন, তেলরং থেকে জলরং বা জলরং থেকে মিশ্রমাধ্যমে কাজ করতে চাইলেই যে কেউ যেতে পারেন না। এই চিত্রী সে-কাজটি করেছেন সাবলীলভাবে।

আবু তাহেরকে এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পী বলা হয়। কিন্তু কখনো-সখনো তাঁর ছবিতে ব্যবহৃত রং ও ব্রাশের স্ট্রোক ইম্প্রেশনিস্ট ও পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর অধিকাংশ কাজই মূলত বিমূর্ত ও আধাবিমূর্ত। এ-শিল্পী যেন প্রাণশক্তিতে ভরপুর। এ-শক্তিকে শিল্পে রূপ দেওয়ার প্রবণতা কাজ করেছে তাঁর মনে ও মননে। তিনি যখন বিমূর্তরীতির অনুসারী না হয়ে অবয়বধর্মী কাজ করেন, তখন সেখানেও এ-শক্তি প্রবল ও অনাবৃত রূপের প্রকাশ ঘটায়। তিনি নিজের কাজে সবসময় নিজস্ব ধরন অক্ষুণœ রেখেছেন। তাঁর আঁকা ছবিগুলো নানা ভাবনার জায়গা তৈরি করে অনুরাগী মনে।

আগেই বলেছি, শিল্পকর্ম সৃষ্টি হবে কেবল সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য। এ-সৌন্দর্য বিমানবিক নয়, মানবিক; এ আমাদের স্বপ্ন ও স্মৃতির অভাবনীয় নন্দন। এ-নন্দন কল্পনার। শিল্প কারো কাছে, কোনোকিছুর জন্য দায়বদ্ধ নয়। তবে শিল্পী দায়বদ্ধ; যেহেতু সমাজে তাঁর বসবাস, সেহেতু এ-সমাজ এবং তাঁকে ঘিরে থাকা প্রতিবেশ শিল্পীকে প্রভাবিত করবে, তাড়িত করবে। তাই বলে তাঁকে তা শিল্পে সরাসরি প্রয়োগ করতে হবে না। কিন্তু শিল্পী যখন ছবি আঁকবেন, তিনি চান বা না চান, তা তাঁর ছবিতে কোনো-না-কোনোভাবে, হয় রঙে, নয় একটি সংক্ষিপ্ত রেখায় অথবা কোনো বিন্দুতে, প্রকাশ পাবেই। তিনি যদি সরাসরি তা প্রয়োগ করেন তবে তাকে আরোপিত মনে হবে; কোমলতা, ছন্দময়তা, তাল ইত্যাকার সুকুমার গুণ আর থাকবে না। আবু তাহেরও সরাসরি কোনো দায় বা প্রতিক্রিয়া থেকে কখনো ছবি আঁকেননি। তাঁর আঁকা ছবি মূলত তাঁর একান্ত অনুভূতির ভাষা, সে-ভাষার ললিত রূপ। তাঁর সেই অনুভূতি হর্ষ-বিষাদের, সুন্দর-অসুন্দরের। কখনো দ্বেষ-বা ঘৃণার, কখনো বা প্রগাঢ় ভালোবাসার, স্মৃতি ও নস্টালজিয়ার। তাঁর সাম্প্রতিক প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত ‘রুরাল’, ‘দ্য বিউটি অব বেঙ্গল’, ‘লিবারেশন ওয়ার্ক’, ‘আগ্রাসন’, ‘মেকআপ’, ‘আ ফ্যামিলি’, ‘গার্ল উইথ ফ্যান’, ‘নেচার’, ‘ভিলেজ ক্যানভাস’, ‘ট্রি অ্যান্ড বার্ড’, ‘উল্লাস’সহ বিভিন্ন শিরোনামের বিচিত্র ছবিগুলো যেন তারই প্রমাণ।

রঙের কার্নিভালে ভরা যেন প্রতিটি ক্যানভাস। রঙের ঐশ্বর্যেই যেন চিত্রিত হয়েছে নানা বিষয়। এভাবেই রঙের আভরণে, ভাঙা ভাঙা রেখায় দর্শকের দৃষ্টি ও মনকে কোমলভাবে ছুঁয়ে দিয়েছেন এ-চিত্রী। তাঁর রং ও রেখায় যেন আঁকা হয়েছে আকাশগামী গানের উত্থান। যাপিত জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির নানা রূপ চিত্রিত হয়েছে শিল্পীর ক্যানভাসে। প্রতিটি ছবি থেকে ভিন্ন ভিন্ন আলো ফুটে উঠেছে। সে-আলোই ইন্দ্রজাল হয়ে দর্শককে সম্মোহিত করে। ছবিগুলো রঙের আস্তরণ, পুরুত্ব আর তুলির লাবণ্যময় আঁচড়ে যেন তুলে ধরেছে শিল্পীর অনুভূতির বস্তুগত রূপ।

প্রদর্শনীতে ২০১২ সালের পর আঁকা কোনো ছবি শিল্পী রাখেননি। শিল্পী হয়তো পেছনে ফেলে আসা দুই শতাব্দীর সন্ধিক্ষণের এপার-ওপার প্রায় দুই যুগের স্মৃতি, অবস্থা, আনন্দ, বেদনা, স্বপ্ন, সাধ, ক্ষোভ ইত্যাকার অনুভূতির একটা অধ্যায়কে ধরতে চেয়েছেন তাঁর এই ছবি নির্বাচনের মাধ্যমে। দু-একটি বিমূর্ত ছবি বাদ দিলে অধিকাংশই আধাবিমূর্ত। ব্যবহার করেছেন ডিসটর্ট ফিগার।

যদিও তাঁর অধিকাংশ ছবি আধাবিমূর্ত। কিন্তু একটু মনোযোগী হলেই বোঝা যায় ছবিতে উঠে এসেছে কখনো গ্রামের সৌন্দর্য বা লোকালয়, কখনো বন, গাছের সারির ওপর পাখির কলরব, যুদ্ধদিনের স্মৃতি, মানুষের মুখ, নারীর বিশ্রাম ও স্নানের দৃশ্য; বোঝা যায়, ফিদা হুসেনের আঁকা ঘোড়ার মুখের মতো ক্ষুব্ধ ঘোড়ার মুখ।

আবু তাহেরের ছবির বিষয়বস্তু দেশীয়, কিন্তু বিষয়ে নেই ভিন্নতা, সেই একই বিষয় এঁকেছেন পশ্চিমা রীতিতেই। তবে রং, ফর্ম, রেখা, কম্পোজিশন ইত্যাদির স্বকীয়তা বিচার করলে সহজেই পূর্বাপর শিল্পীদের থেকে আবু তাহেরকে আলাদা করা যায়।

ধানমণ্ডি ৬ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর বাড়িতে এই চিত্রপ্রদর্শনী ২৮ জুলাই ২০১৮ থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় ৮ আগস্ট। প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply