মঙ্গল তারামের জীবনে একটি দিন

লেখক:

অনিতা অগ্নিহোত্রী

মাইকাল পর্বতশ্রেণি উত্তর হইতে দক্ষিণে বিসত্মৃত হইয়া আছে। ত্রিভুজাকার সাতপুরা পর্বতশ্রেণির পূর্বদিকের পৃষ্ঠভূমি এই মাইকাল পর্বত। ল্যাটেরাইট প্রস্তর-আচ্ছাদিত, অনুচ্চ মালভূমি-সদৃশ উপরিতল লইয়া মাইকাল জাগিয়া দেখিতেছে দক্ষিণ হইতে উত্তরবাহিনী নদীসমূহের জলক্রীড়া। নর্মদা, সোন, পা-ু, কন্হার, রিহান্দ্, বিজুল, বলস – কত নদী!

বিকাল গাঢ় হইতেছে। মাইকাল পাহাড়ের পূর্ব সানুদেশে উপরিতলে উঠিবার পথে ঘন অরণ্য। বড়-বড় গাছ, লতাগুল্ম, পাথর, বাঁশ অজস্র। এখানে ভূস্তর ঈষৎ লঘু, চাষ হয় না। কিন্তু অরণ্য গভীর, প্রায় রৌদ্রহীন, চিরহরিৎ। বলিতে গেলে পথ যেন নাই। ক্ষীণ পথরেখা ঢাকিয়া আছে অজস্র পিঙ্গল ও হলুদ পত্ররাশি, এখানে-ওখানে বরাহমু–র মতো কৃষ্ণবর্ণের প্রস্তর। পৃথুল কালো শরীর লইয়া দলে-দলে গাউর-বাইসন করিতেছে। তাহাদের মখমল-সদৃশ গহন কৃষ্ণ শরীরে আলো স্খলিত হইয়া ঝরিয়া যায়।

এই ঘনায়মান সন্ধ্যার ছায়ায় একটি গো- তরুণের কোমল মুখচ্ছবি চোখ টানে। পথে মানুষজন নাই, কিন্তু বন্যপ্রাণী, পাখি ও প্রজাপতিরা তাহাকে চেনে। মুখটি বড় করুণ, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কিছু কাতর হয়তোবা।

সাজা বৃক্ষের বল্কল দেখিতে কুম্ভীরের পৃষ্ঠের মতন। দীর্ঘ, পৃথুল সাজা বৃক্ষের কোটরে বসিয়া বাদামিরঙা মৎস্য-পেঁচক হলুদ বর্তুল চোখ মেলিয়া তরুণকে দেখিতেছে। দৃষ্টি গম্ভীর, কিন্তু তাহাতে কোনো উষ্মা নাই। বনচ্ছায়ায় গাউরের বিশাল দল ইতস্তত
চরিতে-চরিতে কৌতূহল-মেশা সেণহদৃষ্টিতে তাহাকে দেখে। সরিয়া যায় না। অপস্রিয়মাণ রৌদ্রে উড়িতে-উড়িতে হলুদ-কালো রাজপ্রজাপতি তার চিত্রিত ডানা লইয়া তরুণের খুব কাছে চলিয়া আসে। তরুণ চমকিয়া দেখে। প্রজাপতিটি তার কাঁধে বসিয়াছিল কি? প্রজাপতি অঙ্গে বসিলে বিবাহ ত্বরান্বিত হয়।

তরুণ, কিংবা বালক বলিলেও চলে, আজ সদ্য গ্রামের বাড়ি হইতে ফিরিয়াছে। তখনো পুরোপুরি ফিরে নাই, পর্বতশিয়রে তাহার বাসায় ফিরিতে রাত্রি হইবে। তখন তাহার ডিউটির প্রহর। পরনে নতুন খাকি ইউনিফর্ম, পায়ে তদৃশ নূতন স্পাইকবিশিষ্ট জুতা, এক হাতে একটি কুড়ুল, অন্য হাতে লাঠি, পকেটে গোঁজা নোটখাতা। তরুণের নাম মঙ্গল তারাম। মাসে চারিটি দিন তাহার ঘরে ফিরিবার ছুটি। পাশের জেলা দিলদোরির এক ছোট্ট আদিবাসী গ্রামে তাহার দিনমজুর পিতা, কাঠ ও পাতাকুড়ানি মা, দুটি ছোট ভাইবোন বাস করে। তাহাদের সঙ্গে অনেকদিন পর মঙ্গল তারাম মাহুলপত্রের থালায় ভাঙা যব ও মসুর ডালের খিচুড়ি, পাতাল কোঁড় ও কচি

বাঁশের উদ্গমের আচার, সিদ্ধ পিঠা – তাতে নারকেল ও গুড়ের পুর এইসব পেট ভরিয়া খাইয়াছে। মাত্র ছমাস হইয়াছে তাহার চাকুরী, কিন্তু এরই মধ্যে মঙ্গলের মা হংসী তারাম তাহাকে না দেখিতে পাইয়া হাঁপাইয়া ওঠে। ছোট ভাইবোন দুটি কাছ ঘেঁষিয়া বসে, নিজেদের বইখাতা আনিয়া দেখায়, স্কুলের যেসব পড়া বুঝিতে পারে না, দাদাটির জন্য রাখিয়া দেয়। দাদা ভালো ছাত্র। দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় আশি শতাংশ নম্বর পাইয়াছে। আদিবাসী ছাত্রবৃত্তি পাইয়া আসিয়াছে গত তিন-চার বৎসর। মঙ্গল তারাম গ্রামের বাড়িতে
থাকিলে কেবল পেট পুরিয়া খায় আর টানটান হইয়া ঘুমায়। তাহাদের জমি নাই, গরু-বলদ নাই। আছে একপাল ছাগল ও মুরগি। রাতে শেয়াল কি ভাম আসিয়া মুরগিদের লইয়া যাইতে পারে, তাই ঘুমাতে যাইবার আগে খিড়কি দুয়ার ও সদরে ঝাঁপ লাগাইতে হয়। দলে মোরগ মাত্র একটি। বন্যমোরগ, নীল সবুজ লাল পালক তার ডানার ভিতর হইতে উঁকি মারে, তার ঝুঁটিখানি যেন সকালের সদ্য ঘুমভাঙা সূর্য। মোরগের ডাকে আঙিনার সকাল ফানা-ফানা হয়, তখন আর ঘুমানো অসম্ভব।

দিলদোরির বাসস্ট্যান্ড হইতে বাস ধরিয়া অরণ্যের খাটয়া গ্রামঘেঁষা প্রবেশপথে নামিয়াছে মঙ্গল। পাঁচ ঘণ্টার বাসযাত্রা। ওই গেট হইতে জঙ্গল বিভাগের একটি গাড়ি তাহাকে কিছুদূর আগাইয়া দিয়াছে। তাই যথেষ্ট। অভয়ারণ্যের ভিতর গাড়ির পথ নাই। তারপর কেবল হাঁটা। মাইকাল পর্বতশিয়রে মঙ্গলের রাত্রিবাসের স্থল আরো পনেরো কিলোমিটার। ওই বাসার চারিপাশের সাড়ে ছয় বর্গকিলোমিটার অরণ্য মঙ্গলের ‘বিট’। মঙ্গল তারাম একজন ফরেস্ট গার্ড। ‘বিট’ এলাকায় পায়ে হাঁটিয়া তাহার রোজকার ডিউটি। কিন্তু আজ ‘বিট’ এলাকার সীমানায় পৌঁছাইবার জন্য তাহাকে অনেকটা হাঁটিতে হইবে। দ্বিপ্রহর হইতে হাঁটিতেছে মঙ্গল। অর্ধেকের বেশি পথ পার হইয়া আসিয়াছে। আর মাত্র চার-পাঁচ কিলোমিটার হাঁটিলে তার বাসা। নিজের বিট এলাকার পরিধির মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে তরুণ। এ অরণ্য তাহার করতলের মতো পরিচিত। এখানে প্রবেশ করিলে তাহার দেহের প্রতিটি ইন্দ্রিয় সজাগ, সতেজ এবং ধনুর টানটান ছিলার মতো একাগ্র হইয়া ওঠে। বিটের মধ্যে হাঁটা কেবল হাঁটা নয়, তীক্ষন চোখে অরণ্যের প্রতিটি ভাঁজ, আলো-অন্ধকার দেখা, পাতা, ঘাস, বাকল, শিকড় – সব শব্দ শোনা, পাখির ডানার ঝাপট, পাতাখসার অস্ফুট ডাক, বার্কিং ডিয়ারের আওয়াজ… আর হ্যাঁ।

সবকিছু ছাপাইয়া কান পাতিয়া রাখা তাহার গর্জনের জন্য, বনের রাজা যে… দাগ দেখা, নখের, শিঙের, থাবার… সব নোট করিয়া রাখা পকেট ডায়েরিতে, পরে বড় খাতায় তোলা হইবে। মঙ্গল তারাম চাকুরীতে যোগ দিবার পর তাহাকে দেওয়া হইয়াছে একটি জাবদা খাতা। সেই খাতার দুই মুখোমুখি পৃষ্ঠায় অনেকগুলি স্তম্ভ। তাতে দেখার, শোনার নানা প্রকার খোপে-খোপে দর্শানো আছে। যেমন প্রাণী : মাংসাশী, না তৃণভোজী। দেখাটি কি সাক্ষাৎ দেখা, না পায়ের ছাপ, নখের আঁচড়, না শিঙের দাগ, নাকি কেবলই বিষ্ঠা। তেমনই আছে পাখি, প্রজাপতি, নানা কীটপতঙ্গের জন্য নির্দিষ্ট খোপ। এ ছাড়া সন্নিকটের তৃণভূমি ও বৃক্ষলতা সমন্বিত অরণ্যের দর্শনপদ্ধতি – দেখা যে, বৃক্ষে নতুন ফুল আসিল কিনা কিংবা ফল, পত্রের রঙের বদলে ঋতু পরিবর্তনের ইশারা আছে বা নাই…

রাত্রে শুইতে যাইবার পূর্বে পকেট ডায়েরি হইতে বড় খাতায় প্রতিদিনের দর্শন ও শ্রবণ-বৃত্তান্ত লিখিয়া রাখে মঙ্গল। সপ্তাহান্তে ফরেস্টার বা রেঞ্জার সাহেব আসিয়া খাতা নিরীক্ষণ করেন।

বিটের পরিধির মধ্যে প্রবেশের পর মঙ্গল তারামের চলার গতি মন্থর হইয়াছে, কারণ এখন সে কেবল দুস্তর পথই পার হইতেছে না, সে দেখিতেছে ও লিখিতেছে। সারাদিনের ক্ষুধায় তাহার মাথা ঝিমঝিম, তৃষ্ণার জল সে পান করিয়াছে খাটয়া গেটের নিকটে, পানীয়জলের কলে – এখন সে-জলের স্মৃতিমাত্র নাই তাহার মস্তিষ্কে, তালুমূর্ধা শুখাইয়া উঠিয়াছে, রক্তের ভিতর গভীর তৃষ্ণা। পথে যদি ছোট নালা, কোনো স্রোতস্বিনী পড়ে – তবে অঞ্জলি ভরিয়া জল খাইবে মঙ্গল তারাম।

পকেট হইতে মোবাইল ফোন বাহির করিয়া দেখিল মঙ্গল। বেলা চারটা। বেলা বেশি নয়, মধ্য বৈকাল। তবু ঘন ছায়ামুখর অরণ্যে আলোক প্রবেশ করিতে পারে না, মনে হয় যেন দিন শেষ হইয়া আসিল।

প্রচুর গাছ এ-পথে। দীর্ঘ-দীর্ঘ বৃক্ষশ্রেণি সূর্যালোকের জন্য তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একে অপরকে অতিক্রম করিবার চেষ্টা করিতেছে। প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে অসংখ্য বীজা, মোয়েন, হরডা, বহেড়া, চাঁ আর উঠিয়াছে চিরহরিৎ শাল তরুগণের পাশাপাশি। শালের কণ্ঠলগ্না মাহুললতারা হাতির শুঁড়ের মতো স্থূল ও বঙ্কিম হইয়া ঝুলিতেছে। বাঁশের ঝাড় কচি সবুজ, ও পিঙ্গল পাতায় উপুড়ঝ- হইয়া আছে। পাহাড়ের ঢালে বাঁশের বাড় ভালো হয় – বাঁশের হালকা সবুজ রঙে শালের ও মাহুলের গাঢ়-গাঢ় সবুজের উদ্দামতা কিছু মন্থরতা পায়।

সাতপুরা পর্বতশ্রেণির অরণ্যে মূলত সেগুনের সন্নিবেশ। কিন্তু সেগুন পত্রমোচী। তাই হেমন্তশেষের অরণ্য দেখায় কালচে ধূসর ও রিক্ত। অজস্র বর্তুল হলুদ পিঙ্গল পাতা জমিয়া-জমিয়া সত্মূপাকার হয়। কিন্তু শাল চিরহরিৎ। পত্রঝরণের সঙ্গে-সঙ্গেই তার অঙ্গে নতুন পত্ররাজি আসে। এ বৈকালেও যত রং সব শালেরই – মঙ্গল তারাম মুগ্ধ হইয়া দেখিতেছে। বৃক্ষের উপরিভাগের মতন উন্মুখ পাতারা হলুদ, তার নিচের পাতাগুলি কোমল সবুজ – বিকালের আলোয় ঝলমল করিতেছে।

পাতার বাহার দেখিতে মুখ তুলিবার সঙ্গে-সঙ্গে মঙ্গলের শরীরে ঈষৎ শিহরণ জাগে – একি ভয়, না নিছক আরণ্য-সতর্কতা – উঁচু গাছের মোটা ডালে গুঁড়ি মারিয়া শুইয়া থাকে লিওপার্ড – যদিও কখনো মঙ্গলের সামনে লাফাইয়া পড়ে নাই, তবু অদূর উচ্চতায় এক অতিকায় বন্য মার্জার ভাবিলে রক্তে ঈষৎ জঙ্গমতার সঞ্চার হয়। চিতারা আর নাই। সরগুজার অরণ্যভূমি জলসিঞ্চিত ধান্যক্ষেত্রে পরিণত হইবার সঙ্গে-সঙ্গে ভারতীয় চিতাবাহিনী নিশ্চিহ্ন হইয়াছে।

বৈকালের হলুদ রোদে বনতলে স্পষ্ট হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে মাকড়সার বর্তুলাকার সূক্ষ্ম জাল। হলুদ জায়ান্টউড স্ত্রী মাকড়সা তার অপরূপ বিভায় ঝলমলাইয়া ঊর্ণাজালের কেন্দ্রে বসিয়া আছে। জালের আছে এক আশ্চর্য সীমাবদ্ধতা। জাল ছাড়িয়া স্ত্রী মাকড়সা কোথাও যাইতে পারে না। তাহাকে অনন্তকাল অপেক্ষায় বসিয়া থাকিতে হয় – শিকার – মানে কীটপতঙ্গ জালে আসিয়া পড়িবে, তবেই সে ধরিতে পারিবে। প্রজননকালে স্ত্রী মাকড়সার প্রচুর খাদ্য লাগে। আমিষ। খাদ্য না পাওয়া গেলে পুরুষ মাকড়সা তো আছে। পুরুষ মাকড়সাগুলি ছোট। লালরঙা বড়-বড় কাঠপিঁপড়ের মতো। তীব্র হলুদ স্ত্রী মাকড়সার আকর্ষণে খাদ্য হইয়া যাইতেও পুরুষ ঊর্ণার আপত্তি নাই। উপায়ই বা কী? মঙ্গল পুরুষ মাকড়সা খুঁজিল – ঈষৎ ঝুঁকিয়া। নাই। হয়তো ইতোমধ্যেই ভক্ষিত হইয়াছে। স্ত্রী মাকড়সার কথা লিখিত হইল নোটবুকে। নির্বিকার নির্বিকল্প বিধবা ঊর্ণাজালে বসিয়া আছে।

পথের ধারে শস্ন­থ ভালুক মাটি খুঁড়িয়া খোঁদল বানাইয়া গেছে। বেশ বড়সড় গর্ত। না দেখিয়া চলিলে পা হড়কাইয়া গর্তে পরিবার অসীম সম্ভাবনা। কন্দমূলের খোঁজে ঘুরিতেছিল ভালুক। লিওপার্ড অপেক্ষা ভালুকের মুখোমুখি পড়িবার বেশি ভয় মঙ্গলের। ভালুক অসীম শক্তিধর প্রাণী। তাহার ক্রোধের সামনে পড়িলে অতি শক্তিশালী কাঁধ আর হেলমেট-পরিহিত মাথাও চুরমার হইয়া যায়। ভালুকের চলাচলের ছাপ স্পষ্ট এই পথের দুধারে। গভীর অরণ্যে আছে বড়-বড় বল্মীক। বল্মীকের উইপোকার রাশ ভালুকের প্রিয় খাদ্য। তার টাক্রায় আচারের স্বাদ আনে উইপোকা। কন্দমূল, ফল, মধু এই সমস্ত কিছুর পরও শস্ন­থ ভালুক বল্মীকের সন্ধানে ঘুরিয়া বেড়ায়।

অরণ্য প্রাচীর ভেদ করিয়া ডানদিকে দূরে – যেন বহুদূরে মনে হয় মাইকাল পর্বতের মালভূমি-সদৃশ উপরিতল। উহারই এক কোণে হররাদাদর নামক সমতলে মঙ্গল তারামের বাসা। মঙ্গল তারাম পকেটে ভরিয়াছে কেঁদ ফল। কিছু আগে একটি ছোট পাথুরে সাঁকো পড়িয়াছিল পথে। সাঁকোর ধার দিয়া জলে নামিয়া অঞ্জলি ভরিয়া জলও পান করিয়াছে। এখন তৃষ্ণা নাই। ছোট জলধারাটির ধারঘেঁষা পত্রহীন এক কীটদষ্ট শালের ডালে বসিয়াছিল নীল মাছরাঙাটি। একটু পরে তার পাশে আসিয়া বসিল আর একটি মাছরাঙা। কী অপূর্ব! কাঠঠোকরার একটানা ডাক শোনা যায় – ঠক্-ঠক্-ঠক্। জলের কাছে কত অর্জুনগাছ। একদা অর্জুনগাছ দেখিয়া অভিযাত্রীরা জলের ঠিকানা করিত। অর্জুন মানে নিকটেই জলতল। অর্জুনের দীর্ঘ কা–র উপরিভাগে কাঠঠোকরার ঠোঁটের ঘায়ে নির্মিত গর্ত একের পর এক। যেন কোনো শিল্পী চাহিয়াছিল গাছটিকে একটি বংশীতে পরিণত করিতে। রক্তবর্ণ মাহুললতা দোলে। অতি শীতের অভিঘাতে লতা কোথাও-কোথাও সবুজ রং হইতে রক্তাভতে পরিণত হইয়াছে। উটের খুর বা ক্যামেল হুফ – এই লতার নাম – পাতাগুলির সঙ্গে কাঞ্চনপাতার বড় মিল। দেখিতে-দেখিতে আঁকাবাঁকা শীর্ণ পথ মিলিয়া গেল বন্য ঘাসের এক অপরূপ প্রান্তরে। পিঙ্গল দৈত্যাকৃতি ঘাস – যেন সাজানো অঞ্চল, অথচ দীর্ঘ তরুশ্রেণি নাই, তাই বিকাল গাঢ় হইয়া আসিলেও আলোকের বন্যা বহিতেছে।

মাইকাল পর্বতশ্রেণির শৃঙ্গ বলিয়া কিছু নাই – আছে নানা ‘দাদর’ নামের ন্যাড়া, পাথুরে, তৃণভূমি-সদৃশ সমতল পিঠ। হররাদাদরের ক্যাম্পে ছড়ানো-ছিটানো কয়েকটি ছোট-ছোট বাড়ি। তাহারই একটির দাওয়ায় উঠিয়া মঙ্গল তারাম ডাকিল – পাহুল! পাহুল! বুড়া চৌকিদার পাহুল ফোকলা দাঁতে হাসিয়া বাহিরে আসিল। এই বিজন অরণ্যে একাকী ক্যাম্পে রাত কাটাইবার মতো শান্তি আর নাই। চারদিন মঙ্গল ছিল না, পাহুল একা-একা নিঝুম পড়িয়া ছিল। মন ভালো নাই, খাইতে-রাঁধিতে ইচ্ছা হয় না। তাহার ওপর আর এক বৃহৎ বিড়ম্বনা ওই জাবদা খাতা! যে চারদিন মঙ্গল তারাম বাড়ি যাইবে, চৌকিদার পাহুলকে বিট ক্ষেত্রের সব দৃশ্য শব্দ, গন্ধ নোট করিতে হবে নোটবুকে ও খাতায়। পাহুল নিরক্ষর। মাথায় যতটুকু দেখাশোনা ধরে সব লইয়া সে যায় ক্যাম্পের মাথায় ফরেস্টারের ঘরে, তিনি নোটবুকে লিখিয়া দেন। তারপর মঙ্গল আসিয়া এই চারদিনের বৃত্তান্তও বড় খাতায় তুলিবে। মঙ্গল আসিবে, চৌকিদার সকাল হইতে তোড়জোড় করিতেছে। বিছানা
ঝাড়িয়া-ঝুড়িয়া দিয়াছে, বন্য পত্রের ঝাড়ু দিয়া ঘর সাফ করিয়াছে, ভিতরের ছোট রান্নাঘরের উনুনে হাঁড়িতে ফুটিতেছে কাঁচা পেঁপের তরকারি, ভাত রাঁধা হইয়া ফ্যান গালা হইয়াছে। ভাতের ডেকচিও একপাশে। মঙ্গল তারামের মনে পড়িল, তার মা হংসীর রান্নাঘর। মা দেখিলে কী বলিত – এত আঁচে পেঁপের তরকারি জ্বলে যাবে না রে? এখানেও মাহুলপাতার থালা ও দোনা রাখা আছে। শীতে বেশি বাসন করিবার ইচ্ছা না হইলে তাহারা থালায় না খাইয়া পাতায় খায়। মঙ্গল তারাম ও পাহুল চৌকিদার।

এবার তার ছোট বোনটি নানা প্রশ্ন করিতেছিল, আবদারও। সেও আসিবে, দাদার ক্যাম্প দেখিবে। অত ভোরে রোজ উঠিতে হয় – তখনো হররাদাদরের তৃণপ্রান্তরের বুকে জড়াইয়া থাকে কুয়াশা – যেন আকাশ হইতে নামিয়া আসিয়া বাষ্পভার নত একটি মেঘ মাঠে চরিতে আসিয়াছে। ওই সময় কোথা হইতে দলে-দলে চিত্রল হরিণ আসে, আসে বারাসিংগার দল, তৃণভূমিতে চরিতে-চরিতে মাঝে-মাঝে কৌতূহলভরে ক্যাম্পের হাতার ভিতর প্রবেশ করিয়া আসে তারা। গো–র ছেলে মঙ্গল – সকালে উঠবার অভ্যাস তার রক্তের ভিতর। শৈশব হইতে কত পথ হাঁটিয়া ভিন গ্রামের স্কুলে যাতায়াত করিয়াছে সে – দশম শ্রেণিতে সাইকেল কেনা পর্যন্ত। কিন্তু এক-একদিন জানালার বাহিরে শীত-জড়ানো কুয়াশা দেখিয়া মঙ্গল তারামেরও ইচ্ছা যায় কম্বলদুটি কান পর্যন্ত টানিয়া বেলা পর্যন্ত ঘুমাইতে – বিটের চেনা পরিসর ছাড়িয়া অরণ্যের অন্য কোনো অচেনা প্রান্তে ভ্রমণ করিতে। তার উপায় নাই।

– কেন নাই রে দাদা?

– এটাই চাকরির নিয়ম, মঙ্গল বোনকে বলিয়াছে। সে বলে নাই যে, জিপিএসে তাহাদের ট্র্্যাকিং হয়, অবস্থান, গতিবিধি। অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের অফিস হইতে। সে-কথা বলিতে বোনের কাছে সংকোচ হইল মঙ্গলের। মানুষের জিপিএস ট্র্যাকিং? বোন হয়তো বুঝিতে পারিবে না। হাত-মুখ ধুইয়া, চা খাইয়া পিঠের ব্যাগ নামাইয়া মঙ্গল তারাম ব্রাহ্মণীদাদরের দিকে গেল। ফরেস্টার ডাকিয়াছেন। ওখানে অন্য বিটের দু-তিনজন গার্ডও আছে। আকাশের নীল এতক্ষণে কমলা ও গোলাপি রঙের তুলিতে চিত্রিত হইতেছে। তাহাদের ক্যাম্পের মতো এখানেও সমতল, উচ্চ তৃণভূমি – তবে ওপর হইতে নিচের উপত্যকা দেখা যায়। উপরিতল খুব চওড়া নয়, বরং অপরিসর। পাহাড়ের মাথায় ওয়্যারলেস স্টেশন। নিচে একদা চালু এয়ারস্ট্রিপ দেখা যায়। ওখানে একদা নামিত কুপার কোম্পানির পেস্ন­ন। পেস্ন­নে চড়িয়া আসিত বিদেশি শিকারিরা। অরণ্য-আইন হইবার বিশ-ত্রিশ বর্ষেরও আগেকার কথা। তখন অল্প টাকার লাইসেন্সে বন্যপ্রাণী শিকারের পরোয়ানা মিলিত। কত বাঘ, কত প্রাণী যে বধ করিয়াছে এইসব শিকারি। একই সঙ্গে এ-অরণ্যে বিচরণ করে পৌরাণিক কাল। শকুন্তলার পালক পিতা কন্বমুনির বাস ছিল বুঝি এই প্রদেশে। তাঁরই নাম অপভ্রংশ হইয়া বনের নাম হইয়াছে কান্হা। এ অরণ্য দূর অযোধ্যা হইতে ডাকিয়া আনিয়াছিল রাজা দশরথকেও – শিকার খেলায়। কি জানি, এত দূর কেবল শিকারের জন্য তিনি কেন আসিতেন। ব্রাহ্মণীদাদরের এক প্রান্তেই আছে ‘দশরথ মাচাল’ আর ‘শ্রাবণ তালাও’। জন্মান্ধ বালক তাহার পিতামাতার জন্য জল ভরিতে আসিয়াছিল এই পুষ্করিণীতে – এমন জনশ্রম্নতি আছে। বন্যপ্রাণীর বদলে তাহাকে বিদ্ধ করিয়াছিল রাজা দশরথের তীর।

পাহুল চৌকিদারও পিছন-পিছন আসিতেছে। মঙ্গল তারাম নিষেধ করিয়াছে, তবু শোনে নাই। ফিরিবার পথে অন্ধকার হইবে। তাই পাহুল সঙ্গে থাকিতে চায়। বৃদ্ধের বড় মায়া তার ওপর।

ব্রাহ্মণীদাদরের শিখরপ্রান্ত হইতে বহুদূর পর্যন্ত নিমণগামী সমতল দেখা যায় – পরতের পর পরত পাহাড়শ্রেণি। ওই দূরে অরণ্যের সীমা। সূর্য অস্ত যাইতেছে। আকাশের করুণ ললাটে গাঢ় কমলা সিন্দুর টিপ দিয়া সে কী অপরূপ সূর্যাস্ত। এ আলোর আভা উপত্যকা পর্যন্ত পৌঁছায় না – উচ্চাবচ ভূমির স্তরে-স্তরে জমিয়া থাকে কুয়াশাঘন সন্ধ্যা অন্ধকার। পশ্চিমে সোজা হাঁটিয়া গেলে ওয়েন গঙ্গার উপত্যকা, বালাঘাট জেলার ভিতর দিয়া বহিয়া গিয়াছে ওয়েন গঙ্গা নদী। উত্তরে গেলে নর্মদার জলবিধৌত শস্যভূমি। কান্হার চিরহরিৎ অরণ্যভূমি, সাতপুরা, পেঞ্চ, করমাঝারি এইসব অভয়ারণ্য ভারতীয় বাঘের বিচরণভূমি। শিকারি, চোরাচালানি উপজাতির হাতে আক্রান্ত হইয়া একদা অরণ্যের রাজার বংশধরসংখ্যা এখন

করে গোনা যায়। তবু তাহারা আছে। এ-অঞ্চলে বাঘেদের মতনই কোণঠাসা হইয়া আছে গো- সহরিয়া ও বাইগা উপজাতি। আরো উত্তরে থাকে কোলেরা। দিনদোরি – যেখানে মঙ্গল তারামের বাড়ি – একদা ছিল বাইগা আদিবাসীদের নিজভূম। এখন তারা অতিদরিদ্র, জুম চাষ বন্ধ হইয়া গেছে। কেবল ধান চাষে তাহাদের কুলায় না। মঙ্গল তারামরা গো-। একদা তাহারাই ছিল ভূস্বামী। প্রাচীন ভারত উপদ্বীপের যে ‘গন্ডোয়ানা ল্যান্ড’ নাম, তাহাও গো-দের নামেই। গন্ডোয়ানা ল্যান্ডও একদা ছিল অন্য মহাদেশে সংযুক্ত। এ বহু প্রাচীন কানের কথা। পরে ‘কন্টিনেন্টাল ড্রিফট’-এর ফলে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ আজিকার ভারতবর্ষের গন্ডোয়ানা প্রদেশ হইতে বিযুক্ত হইয়া যায়। মুসলিম শাসকের হাতে গো- রাজাদের পরাজয় ঘটিয়াছিল ষোড়শ শতাব্দীতে, তারপর অষ্টাদশ শতকে পুনর্বার মারাঠিদের হাতে পরাজিত হইয়া গো-রা আশ্রয় নেয় পর্বতে। আজ তাহাদের কৃষি ভূমি নাই, অরণ্য আইনের পর অরণ্যের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হইয়াছে। গো-রা এখন অধিকাংশই দিনমজুর। তবু আজো তাহাদের বিশ্বাস, অরণ্যে বাস করেন দেবতারা, আত্মাগণ ও গ্রাম-দেবতাদের বাস এইখানে। দিনমজুরের সন্তান মঙ্গল তারাম, বিট ফরেস্ট গার্ড আজ অরণ্যের রক্ষক হইয়াছে।

ফিরিবার পথে অন্ধকারে নিঃশব্দে আসিতেছিল মঙ্গল, পিছন-পিছন পাহুল। পাখিরা ঘুমাইয়াছে। অরণ্য জুড়িয়া কেবল পাতার মর্মর, বাতাস চলনের শব্দ, তীব্র উদ্ভিদ গন্ধ মাদক আসরের মতন ভরিয়া উঠিয়াছে। এই সময় খুব স্পষ্ট, উজ্জ্বল দেখা যায় তারাম-ল। শহরের আকাশে যা কদাপি দৃশ্যমান নয়। বার্কিং ডিয়ার ডাকিয়া উঠিল কি? ক্যাম্পে পোষা কুকুর রাখিবার নিষেধ – নচেৎ ভাবা যাইত দেশি কুকুরের ঘেউ-ঘেউ। পাহুল বলিতেছিল, পাগ মার্ক সে দেখিয়াছে আজ সকালে হররাদাদর ক্যাম্পের সীমায়। খাতায় লেখার সময় পায় নাই। কটু পুরীষ গন্ধ নাকে আসিতে টর্চ জ্বালিয়া দেখিল মঙ্গল। অন্ধকারে তাহার দুই চোখ অভ্যস্ত। বিশেষ প্রয়োজন না হইলে সে হাতের বাতি জ্বালে না।

উঁহু – নাক কোঁচকাইল পাহুল। সম্বর খাইয়াছে বড়কুটুম বাঘ মহাশয়। বাঘের বিষ্ঠায় সেই অপাচ্য মৃত প্রাণীর মাত্রাতিরিক্ত ভক্ষণের কটু গন্ধ। নোটখাতায় নোট করিল মঙ্গল। দ্রষ্টব্য সব লিখিতে হইবে, এ-অভ্যাস তাহার রক্তের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িয়াছে।

ফরেস্টারের মুখে সে শুনিয়াছে, বাঘের যখন ক্ষুধা জাগ্রত হয়, তাহার পাকস্থলী হইতে এক পাচকরসের ঘ্রাণ ছড়াইয়া পড়ে অরণ্যে। সে-ঘ্রাণ মানুষ পায় না। পায় অন্য প্রাণীরা। তাদের ভিতরে সঞ্চারিত হয় ভয়। বারবেট ডাকে, ডাকিয়া সংবাদ পাঠায় বার্কিং ডিয়ার, সম্বর, বারাসিংগা – শেষোক্ত দুইজনের ডাক অস্ফুট অথচ অশ্রাব্য নয়। মনুষ্যভক্ষক বাঘের কাহিনি অনেকটাই শিকারিদের রটনা। মানুষ বাঘের স্বাভাবিক খাদ্য নয়। তাই মানুষকে দেখিলে অন্ধকার হইতে বাঘ আক্রমণ-উদ্যত হইয়া ঝাঁপাইয়া পড়িবে এমন ভাবিবার কারণ নাই।

শীতের বাতাস ঘুরিতেছে অরণ্য-বিবরে। বাঘের দ্বারা ভক্ষিত না হইয়া বাসায় ফিরিল মঙ্গল ও পাহুল। সেই ভাত ও পেঁপের তরকারি। ব্রাহ্মণীদাদরের সূর্যাসেত্মর পর মঙ্গল তারামের মনে কী যেন পরিবর্তন আসিয়াছে। পাহুলকে বলিল, তাহার ক্ষুধা নাই। ভাত কিছুটা ফেলিয়া ছড়াইয়া, পাহুলের থালা দোলা ফেলিয়া সে শুইতে গেল। সামনের ছোট ঘরটিতে পাহুল শোয়। কম্বল গলা পর্যন্ত টানিয়া শুইয়াছে মঙ্গল, কিন্তু চোখে ঘুম নাই। মাথার ভিতর দপ্-দপ্ করিতেছে উদ্বেগ। ফরেস্টার কেবল কাজের খবর লইতে ডাকেন নাই তাহাদের। গুরুতর অশুভ সংবাদ ছিল। করমাঝারির নতুন নিযুক্ত ফরেস্ট গার্ড দুইজন গ্রেফতার হইয়াছে। পরীক্ষা পাশের পূর্বে টাকা-পয়সা হাতবদলের দায়ে আজকাল কেবল পরীক্ষা বোর্ড নয়, যাহারা চাকুরী কিংবা কলেজে ভর্তি হইয়াছে পুলিশ খোঁজা আরম্ভ করিয়াছে তাহাদেরও। ব্যাপম্ নামক এই বৃহৎ ভর্তি-দুর্নীতির ঊর্ণাজাল শহর-গঞ্জে ছড়াইয়াছিল – এখন প্রবেশ করিয়াছে অরণ্যেও। নতুন চাকুরীতে প্রবেশ করিয়াছে যাহারা, তাহাদের জন্য উদ্বিগ্ন ফরেস্টার। এ বড় কঠিন জাল। ক্ষুধা না থাকিলে বাঘ শিকার করে না, ক্ষুধা থাকিলেও ঊর্ণা জাল ছাড়িয়া বাহিরে যায় না; কিন্তু মানুষ স্বভাবলোভী, জন্মশিকারি।

দ্বাদশ পরীক্ষায় ভালো নম্বর ছিল মঙ্গলের। কিন্তু কে জানে, ফরেস্ট গার্ডের চাকুরি এমনিই পাইত কিনা সে? চাকুরী আজকাল খালি হাতে পাওয়া যায় না, সকলেই বলে। দিনমজুর বাপের রোজগারের টাকা, মায়ের অঙ্গের রুপা বেচা টাকা ওই ব্যাপ্মের গর্ভে দিয়াছে মঙ্গল তারামও। এ দুর্নীতি বড় অদ্ভুত। ইহার অপরাধীরা নিজ-নিজ কক্ষ আলোকিত করিয়া বসিয়া আছেন, পিপীলিকার মতন মরিতেছে সাক্ষীরা ও প্রার্থীগণ। মঙ্গল তারাম যদি এই জালের ভিতর আকৃষ্ট হইয়া বন্দি হইয়া যায়? কে তাহাকে রক্ষা করিবে। মায়ের মুখ মনে করিয়া কষ্ট হইল মঙ্গল তারামের, ভাইবোন দুইটির কথা ভাবিয়া চোখে জল আসে। আরো একজন, সে বুঝি আসিতে-আসিতে কালো হলুদ জঙ্গল-প্রজাপতিটির মতন রহিয়া গেল – তাহার মায়ের পিসতুতো বোনের শ্বশুরকুলের কন্যা – কিশোরী, নাম উমারি, মা বলিয়াছিল উমারির সহিত তাহার বিবাহ দিবে, চাকুরীতে কদিন যাক। আজ ঘর হইতে ফিরিয়া বাসায় ঢুকিয়া কল্পনা করিতেছিল মঙ্গল – কোনার ওই ছোট ঘরটিতে কাঠ জ্বালিয়া রান্নার জোগাড় করিতেছে উমারি – তৎক্ষণাৎ পাহুলের বৃদ্ধ মুখখানি দেখিয়া হাসি পাইয়াছিল তাহার। আপাতত সে-স্বপ্ন রহিয়া গেল বুঝি। স্বপ্ন থাক, মনে-মনে গ্রামদেবতার কাছে প্রার্থনা করে মঙ্গল তারাম, আমাদের রক্ষা করো। আমি যদি গ্রেফতার হই, আমার মা-বাবা, ভাইবোন কাঁদিয়া মরিয়া যাইবে, উকিল জোটাইবার পয়সা তাহাদের নাই। উমারি, তুমি সুখে নিজের ঘরে রহিয়া যাও। তোমার ভালো বিবাহ হউক। আমি এক নষ্ট শালগাছ। শালকীট প্রবেশ করিয়াছে আমার ভিতর। কুরিয়া খাইয়া চূর্ণ করিয়া দিবে অভ্যন্তর। তুমি আমার কাছে আসিও না।

ভাবিয়া-ভাবিয়া, চোখের জল ফেলিয়া, ভোরের দিকে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল মঙ্গল তারাম। পাহুলের ডাকাডাকিতে ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল। গত রাত্রের দুর্ভাবনা মনে পড়িয়া গেল তাহার। কী হয়েছে পাহুল! পুলিশ?

রাত্রে বাঘ আসিয়াছিল। টাটকা পায়ের দাগ তাহাদের বাসার সামনে। চিত্রল হরিণের তাজা অর্ধভুক্ত শরীরটাও ফেলিয়া গিয়াছে। হরিণের গলার কাছে, ঘাড়ে গভীর ক্ষত। আধাআধি বাকি শরীরটা টানিয়া লইয়া গিয়াছে বাঘ। বাঘ আবার আসিবে। কে জানে কখন সে আসে। দিনে বা রাতে। প্রস্ত্তত থাকিতে হইবে। মঙ্গল তারাম নোটবই আনিতে ভিতরে গেল। বাঘের পায়ের দাগ, অর্ধভুক্ত হরিণ – দুইটিই গুরুত্বপূর্ণ ‘সাইটিং’ বা দেখিতে পাওয়া। লিখিয়া রাখা জরুরি।