মিলের শব্দ আর নিমের গন্ধ

লেখক: অমর মিত্র

বস্তিতে যা ঘটে পাগলা হাওয়ার মতো এ-মুড়ো থেকে ও-মুড়ো অবধি ছড়িয়ে যায়, এই যে স্যার কাচকলটা আকাশদীপের মতো ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে যাবে, এই খবরটা কেউ একজন একাই তো জনেজনে শুনিয়ে বেড়ায়নি, কিন্তু একদিনেই বস্তির সমস্ত জায়গার লোক জেনে গেল, সবাই ক্ষেপে গেল।

বস্তির লোক কি হিংস্র, ভাংচুর করে? অখিল জিজ্ঞেস করল।

শান্ত স্যার, ঝুট-ঝামেলায় থাকলে পেটের ভাত আসবে কী করে, আমিও কোনোদিন খারাপ কাজ করিনি, দুবলা ছিলাম ছোট বেলায়, তাই মারামারি করতে পারতাম না, আমরা খেতে পাই না তো গায়ে জোর হবে কী করে?

থানার সেপাই কু-ু আর এসআই মিশ্রকে চেনেন আপনি?

চিনি স্যার, খুব শয়তান, শচীন কারক আর ওর বউ একসঙ্গে বিষ খেল, সেই সময় এসেছিল পরপর কদিন, তখন লোককে কম হয়রান করেনি।

কে শচীন কারক?

প্রভুদয়াল রোলিং মিলে কাজ করত, সুইসাইড করেছিল ও আর ওর বউ, বেশি বয়স না স্যার, রোলিং মিল বন্ধ হয়ে সেখানে আকাশদীপ হাউজিং, শচীনের ক্ষয়রোগ ধরেছিল, ওটা তো চিকিৎসা করলে সেরে যেত; কিন্তু তার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো, তাতে ওর সংসার অচল, বউ ঝিগিরি ধরল, ওই আকাশদীপ হাউজিংয়েই, হাউজিংয়ে সব অনেক টাকাওয়ালা মানুষের বাস, তারা বাংলা বলে না, হয় ইংরেজি না হয় হিন্দি, নানা রঙের গাড়ি আছে, মানুষগুলোও কত অদ্ভুত!

অখিল থামায়, আপনি কিন্তু নিজের নামটা বলেননি।

বলিনি স্যার, বলছি, বলছি শচীনের বউ মাধু ওখেনে ঝিগিরি করতে যেত, শচীন একটা পান-গুমটি বসাবে বলে ঘুরছিল,

এটা-ওটা করত, শরীরে পারত না, বাড়িতে বসে ঠোঙা বানানো শুরু করল, অনেক রাত্তির পর্যন্ত ঠোঙা বানাত স্বামী-স্ত্রী মিলে, আমি গিয়ে গল্প করতাম, ওরা যে মরবে তা বুঝতেও পারিনি, ওদের পাঁচ বছরের ছেলেটাকে মাসি নিয়ে গেল কদিনের জন্য বেলঘরিয়ায়, সেই ফাঁকে – পুলিশ কু-ু আর মিশ্র আমাকেও ঝামেলায় ফেলেছিল স্যার, নগদ দুশো টাকা দিয়ে রক্ষে।

কেন?

আমি ওদের বাড়ি যেতাম তো, তাই, প্রায়ই ডেকে পাঠাত ফাঁড়িতে।

আপনি কী করেন?

রোলিং মিলে কাজ করতাম, এখন বাজারে বসি।

বাজারে বসেন মানে?

লোকের মাল বেচে দিই।

কী রকম? কৌতূহলী হলো অখিল শ্রীবাস্তব।

আজ্ঞে যুগল নস্কর আমের সিজিনে আম তুলল, তার দুটো জায়গা ধরা আছে বাজারে, একটায় সে নিজে বসে, অন্যটায় আমি বা আর কেউ, বৈরাগীও বসত, বৈরাগী নিজে মাল আনত, আবার যখন আনত না তখন হয় যুগল নস্কর, না হয় হরিশ মালের জায়গায় বসে তার জিনিস বেচে দিত, আমি স্যার এই রকম লোক, কিছুই নেই, একেবারে স্যার স্বাধীন, বউ-বাচ্চাও নেই, বিয়ে করিনি বলে বেঁচে গেছি, এই যে আজ গেলাম না, সংক্রান্তি তাই যাব না বলেছিলাম, অথচ আজ তো নারকোল আর পাটালি বেচার দিন, যুগল রেগে গেছে; কিন্তু আমি কী করব স্যার, কেন যাব?

অখিল জিজ্ঞেস করল, আকাশদীপ হাউজিংয়ের কোন ফ্ল্যাটে কাজ করত বউটা, ওই শচীনের বউ?

চমকে উঠল লোকটা, কেন স্যার?

জানতে চাইছি।

কী হবে স্যার?

আচমকা বিষ খেল কেন?

খুব কষ্টে ছিল স্যার, শচীন খুব মানের বড়াই করত; কিন্তু যার কাজ নেই, টাকা নেই, যার বউ ঝিগিরি করে, তার মান কিসের?

কত নম্বর ফ্ল্যাট, কোন বস্নক?

কী হবে স্যার, ওরা তো মরে গেছে? লোকটা বলল। লোকটা নিজেই এসে জুটেছে অখিল শ্রীবাস্তবের কাছে। অখিলের চার পুরুষ এই বাংলা মুলুকে। দেশভাগের আগে তারা ছিল রাজশাহীতে। তারপর কলকাতায়। অখিল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। আত্মহত্যা নিয়ে গবেষণা করছে। মানুষ কেন নিজেকে মারে। সেই কাজে এই শহরতলির ২২ নম্বর বস্তিতে এসেছে। যুগলের আত্মহননের খবর ছিল তার কাছে।

যেতে হবে স্যার? লোকটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। অখিলকেও দাঁড়াতে হলো। লোকটা মাথা নামিয়ে হাত ঘষছে হাতে। পকেট থেকে বিড়ি বের করে ধরাতে লাগল। ধরাতে গিয়ে পরপর কয়েকটা কাঠি নষ্ট করল। অখিল বলল, আমাকে একটা বিড়ি দেবেন?

হ্যাঁ স্যার, ইয়েস স্যার।

অনেকদিন বাদে অখিল শ্রীবাস্তব বিড়ি মুখে দিলো। বেশ কড়া। হালকা শীতে বিড়ির টানে আমেজ তৈরি হলো। অখিল দুটি টান মেরে আবার বলল, কোন বস্নক, কোন ফ্ল্যাট?

ওরা তো ফিরবে না, শুধু শুধু যাওয়া হবে স্যার।

আপনি বলছেন না কেন?

লোকটার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল, বিড়বিড় করল, ওই যে  বললাম স্যার, শচীন কারকের খুব মান ছিল, মান গেল বলে – কথা থেমে গেল।

মান গেল বলে দুজনে মরেছিল?

জানি না স্যার। লোকটা আচমকা ভেঙে পড়ল যেন, বিড়বিড় করল, মাধু মেয়েটার মুখে হাসি ছাড়া আর কিছুই দেখিনি কোনোদিন, আমি সেদিন যাইইনি ওদের বাড়ি – কু-ু আর মিশ্রবাবুদের বলেছিলাম হাউজিংয়ের কথা।

ওরা কী বলেছিল?

আমাকে ওই যে ফাঁড়িতে ডাকত বারবার, শেষে ভয় দেখাতে লাগল, বলল ফ্ল্যাটবাড়ির কথা বললে হাজতে ঢুকিয়ে দেবে, কু-ু আর মিশ্রটা ছেঁচড়া স্যার, শয়তান, আমি এবার যাই স্যার।

কোথায় যাবেন, আজ তো বাজারে যাওয়া নেই?

আমি আপনার সঙ্গে যাব না স্যার, আমার তাহলে থাকা হবে না এখানে।

আপনি আসুন, আমি একটা কাজে এসেছি, আমি আপনাকে প্রোটেকশন দেবো, এসেছি কোর্ট থেকে পারমিশন নিয়ে। অখিল হাঁটতে লাগল। অখিলের সঙ্গে লোকটাও হাঁটতে লাগল। অখিল হাঁটতে হাঁটতে বলল, পথ ভুল হলে বলবেন, আকাশদীপ যাচ্ছি, এইপথে যাওয়া যাবে তো?

ইয়েস স্যার।

দুজনে সুইসাইড করলে আপনারা যাননি কেন হাউজিংয়ে।

কু-ু আর মিশ্র শাসিয়েছিল বললাম তো।

কী বলেছিল?

এ নিয়ে গোল না পাকাতে, কাউকে কোনো কথা না বলতে, কাগজের লোকের কাছেও মুখ না খুলতে।

শুধু শাসানোর জন্য?

হ্যাঁ স্যার, তবে ফ্ল্যাটবাড়ির সঙ্গে ২২ নম্বরের অনেকে তো জড়িয়ে, কেউ খবরের কাগজ দেয়, কেউ দুধ দেয়, জামাকাপড় ইস্ত্রি করে, ঠিকে কাজও তো করে অনেকের বউ, সবাই চুপ করে থাকতেও চেয়েছিল, নইলে কাজ যাবে, বাঁদিকে স্যার, বড় রাস্তায় পড়ে যাব, ওদিকেই আকাশদীপ ফ্ল্যাটবাড়ি, আগে ছিল প্রভুদয়াল রোলিং মিল।

 

 

দুই

আকাশদীপ হাউজিংয়ের আয়তন তিরিশ বিঘের কাছাকাছি। এতটা জমিতে ছিল প্রভুদয়াল রোলিং মিল। মিল ম্যানেজার, গার্ডের কোয়ার্টার, ক্যান্টিন, গোডাউন। এখন সেখানে দেড় মানুষ উঁচু প্রাচীর, মস্ত ফটক, গোঁফওয়ালা দারোয়ান, ফটকে ভিজিটরস বুক, দারোয়ানের জিজ্ঞাসাবাদ – সব মিলিয়ে আকাশদীপ এই নিম্নবর্গের বসতি এলাকায় ভয়ানক ব্যতিক্রম। লোডশেডিংয়ের রাতে যখন সমস্ত বাইশ নম্বর বস্তি আর তার আশপাশ নিকষ অন্ধকারে নিশ্চিহ্ন, তখন আকাশদীপে আলো জ্বলে লাইট হাউসের মতো। অন্ধকার সমুদ্র থেকে দেখা লাইট হাউসের মতো লাগে আকাশদীপকে। আকাশদীপ সমস্ত দিন তার রং আর বৈভব দেখায় বাইশ নম্বরের মানুষকে।

ফটকে অখিল শ্রীবাস্তব তার আই কার্ড দেখাতে দারোয়ান খাতা মেলে দিলো, লিখুন স্যার।

অখিলের সঙ্গের লোকটির মুখ চেনে দারোয়ান। তাকে আটকে দিতে অখিল আবার তার আই কার্ড বের করে বলল, আমার সঙ্গে, ভিজিটরস বুকে লিখেছি অখিল শ্রীবাস্তব প­vশ ওয়ান।

দারোয়ান অবাক হয়ে ছেড়ে দিলো। ভেতরে ঢুকে অখিল অবাক, এ তো আর এক নগর। তিরিশ বিঘেয় উপনগরী গড়েছে আকাশদীপের প্রমোটার। অখিলের সঙ্গের লোকটি বলল, আমি আগে আর একবার এসেছিলাম।

কবে, কারকের বউয়ের মৃত্যুর পর?

না না স্যার, তখন ফ্ল্যাটগুলোর কাজ চলছিল, এখানে তো বাইশ নম্বরের অনেক লোক কাজ করত, কারখানায় যারা কাজ করত তাদের কাজ গেল, তখন বাইশ নম্বরে যে রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি তারা এখানে কাজ করতে লাগল, আমি রংমিস্ত্রির হেলপার হয়ে কাজ করেছি, একটা বাড়ি তুলতে কত লোক লাগে স্যার, বাইশ নম্বরে সব আছে।

অখিল অবাক হচ্ছিল লোকটার কথায়। কী চমৎকার বলছে, কারখানার লোকের কাজ গেল, এলো ইট গাঁথার লোকজন, তারপর তাদেরও কাজ শেষ হলো, তখন বাইশ নম্বর থেকে এলো কাজের লোক, ‘ঝিগিরি’ করতে এলো শ্রমিকদের মেয়ে আর বউরা, অল্পবয়সী বউগুলোর উপায় ছিল না, মিল উঠে গেল, অত লোক কোথায় কী করবে?

অখিল দেখছিল আবাসনটি সাজানো। দুপাশে দেবদারু শোভিত পিচঢালা রাস্তা, ডানদিকে, বাঁদিকে ঘুরে আয়তক্ষেত্র রচনা করেছে। প্রতিটি বাড়ি সাততলা, প্রতিটি বাড়ির সামনে একফালি করে সবুজ মাঠ। ভেতরে কমিউনিটি হল, খেলার মাঠ, দোকানপাট রয়েছে। সুইমিংপুল, ব্যাডমিন্টন কোর্ট দেখতে পায় অখিল। সে ঘুরছিল তার সঙ্গীকে নিয়ে। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে দেখে নিতে চায় সমস্তটা। পথের ধারে ছোটবড় গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়িগুলির কতরকম রং, লাল, নীল, হলুদ, চকোলেট, আকাশি রঙের মারুতি জেন, টাটা-সুমো, টাটা সিয়েরা, টাটা হুন্ডাই, মারুতি ৮০০, মারুতি সুজুকি – গাড়ি দেখতে হলে আকাশদীপে আসা যায়। প্রতিটি বহুতলের বারান্দা থেকে ঝুলে আছে রঙিন শাড়ি, অখিলের মনে হচ্ছিল স্বপ্নের রং ছড়িয়ে পড়ছে আকাশি নীল, ঘন নীল, গোলাপি, হলুদ, গাঢ় লাল, আর রাজহংসের মতো গাড়িগুলি থেকে। সমস্ত আবাসনটি চুপচাপ। কথা নেই তেমন। কথা যারা বলছে, স্বর অতিনিম্ন।

অখিলের সঙ্গী বলল, ওই ই-বস্নকে মিল ম্যানেজারের কোয়ার্টার ছিল স্যার, লোকটা এখন এখানেই থাকে শুনেছি, এখানকার লোকদের তো তেমন দেখা যায় না, গাড়ি ছাড়া বেরোয় না কেউ।

অখিল জিজ্ঞেস করল, ফ্যাক্টরি চিনতে পারছেন?

খুব পারছি স্যার, সব আমার মুখস্থ ছিল।

কিছুই তো নেই, এখন এলোমেলো মনে হচ্ছে না?

স্যার, আমি ঠিক টের পাচ্ছি জি-বস্নকে গোডাউন ছিল, মস্ত গোডাউন, লরিতে লোডিং-আনলোডিং হতো সব ওখানে।

অখিল দেখছিল হিরো হোন্ডা, রয়াল এনফিল্ড মোটরসাইকেলে পা দিয়ে টেলিভিশনের ছবির মতো অনিন্দ্যকান্তি যুবক ফিসফিস করছে জিনস, টি-শার্টপরিহিত যুবতীর সঙ্গে। সকালের রোদে আমূল বেবিরা সব লাল বল নিয়ে ছুটছে সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে। মলিনবেশ আয়া, দাসীরা হাঁটছে শিশুদের সঙ্গে। আবাসনে এত রোদ। অখিল বাইশ নম্বর বস্তি ভেদ করে এসেছে এখানে। বাইশ নম্বরে রোদ ঢোকে না। সমস্ত রোদ যেন আকাশদীপের সবুজ গালিচায় গল্প করতে বসেছে শীতের সকালে।

অখিলের সঙ্গী বলল, টি-বস্নকে ছিল মেইন শেড, কারখানাটা এখন বোঝাই যায় না, কিন্তু স্যার আমি টের পাচ্ছি।

কী টের পাচ্ছেন?

মিল-চলার শব্দ, কী আওয়াজ, আমি কানে তুলো দিয়ে রাখতাম, কিন্তু তাতেও হতো না, অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল স্যার, এখনো ওই আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়, আছে স্যার।

আছে মানে?

আওয়াজটা ফুরিয়ে যায়নি।

কী বলছেন? অখিল বিস্ময় প্রকাশ করে।

থাকে স্যার, আমি শুনতে পাচ্ছি।

আশ্চর্য!

কেন স্যার, আশ্চর্য কেন, আশ্চর্য কেন, অত বছর ধরে যে মিল চলল, লোহায় লোহায় ঘষাঘষি লাগালাগিতে শব্দ হলো, অত লোকের ভাত জুটত যে-শব্দে, তা বন্ধ হয়ে গেলেই হবে, মনে আছে না, আমি তো রাত হলেই শুনতে পাই মিল চলছে, মিল উঠে গেলেও তার শব্দ আছে, লুকিয়ে আছে এখানেই কোথাও, বিশ্বাস করুন স্যার।

অখিল তাকিয়ে দেখছিল তার সঙ্গীকে। লোকটা কে? নাম বলেনি। যতবার জিজ্ঞেস করছে এড়িয়ে যাচ্ছে। লোকটা মিলের শব্দের কথা এমনভাবে বলছে, অখিলের মনে পড়ে যাচ্ছে বিগব্যাং … পৃথিবীর জন্ম-মুহূর্তের মহাসংঘর্ষে নিঃসৃত শব্দের কথা। মহাব্রহ্মা– সেই শব্দ নাকি এখনো ভেসে আছে, পৃথিবী লয় হলেও থেকে যাবে তা।

অখিল বলল, আর কী শুনতে পান?

সত্যি বলছি স্যার, একা মানুষ, ঘুম ভেঙে গেলে দোরে তালা দিয়ে পথে বেরিয়ে আসি, শব্দটা আমাকে টেনে নিয়ে আসে এদিকে, চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকি।

অখিল বলল, ভেতরে কোনো গাছ ছিল না?

ছিল স্যার, মস্ত কৃষ্ণচূড়া, গরমের সময় কী অদ্ভুত লাল ফুলে ছেয়ে থাকত সে, ওই যে ওই এফ-বস্নকের কাছেই ছিল মনে হয়, নিম ছিল স্যার, ফুল ফুটত ফাল্গুনে।

অখিল জিজ্ঞেস করল, গন্ধের কথা মনে পড়ে?

ফুলের গন্ধ তো! লোকটা হাসল, আপনি ঠিক ধরতে পেরেছেন স্যার, গন্ধটা মাঝেমধ্যে পাই, সব শেষ করা যায় না স্যার, কিছু থেকে যায়।

 

 

তিন

অখিল হাঁটছিল। অখিলের পাশে বকবক করতে করতে লোকটা…। লোকটা বলে যাচ্ছিল প্রভুদয়াল রোলিং মিল উঠে যাওয়ার বৃত্তান্ত। বৃত্তান্ত নতুন কিছু নয়। যত রকমভাবে লোন পাওয়া যায়, নিয়ে মিল বন্ধ করে দিলো মালিক। ভালোই চলছিল, কিন্তু আরো ভালো হলো তিরিশ বিঘে জমিতে প্রমোটিং, ব্যাংকের টাকা না শোধ করা, তার জন্য যেখানে যেখানে পুজো দেওয়ার দিয়ে ধুয়ে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়ে গেল প্রভুদয়ালের নাতি, একদিন আচমকা তালা পড়ল গেটে।

আন্দোলন করেননি? অখিল জিজ্ঞেস করল।

হি-হি করে হাসল লোকটা, বলল, মিলগেটে বসল সবাই, বসে বসেই রোগা হয়ে যেতে লাগল, মড়ার মতো হয়ে যেতে লাগল, লখিন্দারের কথা তো জানেন স্যার, বেউলা-লখিন্দার?

অবাক হয়ে অখিল, কেন?

লখিন্দারের মড়া নিয়ে যাচ্ছিল বেউলা স্বগ্গে, মড়া গলে পচে হাড় বেরিয়ে আসছিল, দেহ থেকে মাংস খসে গিয়ে হাড় পড়ে থাকছিল, তেমনি হয়ে পচ্ছিলাম আমরা, মড়া, গায়ের মাংস খসে যাচ্ছিল, শেষে এক একজন করে কেটে পড়তে লাগল, তখন পুলিশ এসে ভাগ শুয়োরের বাচ্চারা করে পিটিয়ে তুলে দিলো, ইউনিয়ন-টিউনিয়ন সব হাওয়া, ওই পুলিশও মিশ্র আর কু-ু ছিল।

অখিল দোকানে সিগারেট কিনল। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, এইচ-৮ কোন দিকে। নির্দেশ নিয়ে চলতে লাগল অখিল আর তার সঙ্গী। অখিলের সঙ্গী বলল, ওটা হলো টিভিবাড়ি।

টিভিবাড়ি মানে?

আজ্ঞে মাধু তাই বলত, ঠিকে কাজের লোকেরা ওই নাম দিয়েছিল, পদবি হলো সোনি, সোনি নামে টি.ভি. ছিল তো স্যার।

অখিল হাসল, জিজ্ঞেস করল, এই রকম আর কী কী নাম আছে, মানে কাজের লোকেরা দিয়েছিল।

কুকুরবাড়ি আছে শুনেছি, বুলডগ কুকুর আছে সে-বাড়িতে, মাধু সেই বাড়িতে কাজ পেয়েছিল, কুকুরের ভয়ে একদিনের পর আর যায়নি, কুকুরবাড়ি আছে, আর একটা আছে মেয়েছেলেবাড়ি।

সেটা কী?

আবার হিহি করে হাসল লোকটা, বলতে লাগল, বাড়ির সবাই মেয়েমানুষ, লেডিজ স্যার, কারোর বিয়ে হয়নি, কিন্তু কত টাকা, যত খেত, তার চেয়ে বেশি নষ্ট করত, যত শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ পরত, তার চেয়ে বেশি আলমারিতে ঠাসা ছিল, ঘরদোর ল-ভ-, কম্পুটারে শুধু খারাপ সিনেমা, ন্যাংটো সিনেমা, পারুল বলে এক মেয়ে সেখানে কাজ করতে গিয়েছিল, পারুলকে একদিন এমন মেরেছিল! ওদের স্বভাব খুব রুক্ষ, নোংরা কাজ করত ঘরে বসে, পারুলের এখন বিয়ে হয়ে গেছে, চলে গেছে বাইশ নম্বর ছেড়ে।

আর আর কী আছে?

পাগলবাড়ি আছে, পাগল বাঁধা থাকে চেনে। আর একটা বাড়িতে কাজের একটি ছেলের সঙ্গে কমবয়সী বউ জড়িয়ে থাকত, ইয়ে করত, সব খবর নিয়ে আসত মাধু, রাতে ঠোঙা বানাতে বানাতে গল্প বলত ফ্ল্যাটবাড়ির।

আর কী গল্প বলত?

কত রকম, একদিন কোন ফ্ল্যাটে একটা ছেলে আর মেয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিল খারাপ অবস্থায়, দুজনেই এখানকার, নানা রকম কেচ্ছা, কেচ্ছা ছাড়া আর কিছু নেই, থাক স্যার ওসব সবাই জানে, সব জায়গায় হয়, বড়লোকের খেয়ালখুশি কতরকম, শুধু শচীন সাবধান করত বউকে, সাবধান মাধু, ওরা কেউ লোক ভালো না।

মাধু বলত, টিভিবাড়ি ভালো, বাবু ভালো, বিবিও ভালো।

ভালো?

ভালো তো মনে হতো মাধুর।

কী রকম?

পুজোর সময় দামি কাপড় দিয়েছিল, ছেলের জামাকাপড়ের টাকা দিয়েছিল, দুপুরের খাবার প্রায়ই নিয়ে আসত ও, আর বাবু টাকা-পয়সা দিত এমনিই।

মাইনে ছাড়া?

এটা-ওটা কিনতে পাঠাত, ফেরত টাকা নিত না।

তাতেও মাধু ধরতে পারেনি কিছু, কেন দেয়?

না স্যার। ওদের অনেক টাকা, ঘরের ভেতরে টাকা ছড়িয়ে থাকে, দামি ঘড়ি, আংটি খোলা পড়ে থাকে, বাথরুমে বাড়ির বউয়ের গয়না পড়ে থাকে, হার বালা, মাধু সেসব নিয়ে বউয়ের কাছে জমা দিত, বউ মানে, তার বয়সও কম না, মাধু তাকে ভাবি বলত, ভাবি মাধুকে একবার একটা খুব দামি সেন্ট দিয়েছিল, কেন দিয়েছিল কে জানে, ভাবি খুব সরল প্রকৃতির, ঘোরপ্যাঁচ ছিল না।

তারপর কী হলো?

এসে গেছে স্যার, এই তো এইচ-বস্নক।

অখিলরা এখন লিফটে। এ-বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে কার পার্কিং, ফার্স্ট ফ্লোর থেকে বসবাসের ফ্ল্যাট। থার্ড ফ্লোরে নেমে পড়ল দুজন। কী নিস্তব্ধ, নির্জনতা সমস্ত বাড়িতে। লিফট থেকে বেরিয়ে তিন ধাপ উঠে ওরা আট নম্বর ফ্ল্যাটের দরজায় এসে পৌঁছল। কেউ কোনো কথা বলছিল না। দরজায় পেতলের নামফলকে অজয় সোনি নামটি উজ্জ্বল ইংরেজি ও হিন্দিতে শোভিত। ডোর বেল টিপতেই ভেতর থেকে সাড়া এলো নারীকণ্ঠ, কৌন?

 

 

চার

কলাপসিবল­ গেটের ওপারে যিনি দাঁড়িয়ে তাকে গৃহকর্ত্রী মনে হলো অখিল শ্রীবাস্তবের। তাহলে তিনিই মাধুর ভাবি? অখিল বলল, মি. সোনি আছেন?

আপনার পরিচয়? শুদ্ধ বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন মহিলা, বয়স বছর পঁয়তালিস্নশ, শ্রীময়ী, গায়ের রং দুধ আর মাখনে মেশা, মুখখানি ঢলোঢলো, চোখ দুটি বেশ বড়, কিন্তু শান্ত।

অখিল বলল, আমি কোর্টের পারমিশনে এসেছি, সুইসাইড নিয়ে তথ্য সংগ্রহ আমার কাজ, ওঁর সঙ্গে কথা বলব।

কৌন? ভেতর থেকে বছর-পঞ্চাশের একজন বেরিয়ে এলো, ধবধবে পায়জামা পাঞ্জাবি, তার ওপরে খুব দামি কাশ্মিরি শাল, কেয়া চাহিয়ে?

অজয় সোনি?

আমি আছি, বলুন।

অখিল তার আই কার্ড বের করে মেলে ধরল, কোর্ট পারমিশন দিয়েছে তথ্য সংগ্রহে, সুইসাইড নিয়ে রিসার্চ করছি, দরজা খুলুন।

অজয় সোনির হাতে চাবি দিয়ে মহিলা ভেতরে চলে গেছেন। আইডেনটিটি কার্ড দেখে অজয়ের চতুর মুখখানিতে সম্ভ্রমের ভাব এলো, আসুন স্যার। কলাপসিবলের তালা খুলে টেনে জায়গা করে দিলো অখিলের প্রবেশের জন্য। অখিল ভেতরে ঢুকতেই গেট আটকে দিতে গেলে অখিল টেনে তার সঙ্গীকে ভেতরে ঢুকিয়ে নিল, উনি থাকবেন।

এমন সাজানো ড্রইংরুম অখিলের চেনা, কিন্তু তার সঙ্গী, বাইশ নম্বরের মানুষটির একেবারেই অচেনা। অখিল দেখল লোকটি অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নরম কার্পেটের ওপর। ওর পায়ের পুরনো হাওয়াই চটি কার্পেটে এতই বেমানান যে, তা টের পেয়ে লোকটা পায়ের পাতা যেন লুকোতে চাইছে। অজয় সোনি এখন এই ঘরে নেই। লোকটি বলল, এমন ঘর সিনেমায় থাকে।

দেখেছেন সিনেমায়?

এভাবে দেখা তো হয়নি স্যার, আসলে সিনেমায় তো হিরো, হিরোইনকে দেখতে যায় লোকে, তাই-ই দেখা হয়, আশপাশে এসব থাকে; কিন্তু নজর পড়ে না।

বসুন।

না স্যার দাঁড়িয়ে থাকি।

না, বসুন বলছি। ধমকে ওঠে অখিল।

লোকটা সোফায় ডুবিয়ে দিলো নিজেকে। কেমন ভ্যাবলার মতো বসেই থাকল। অখিল চারপাশ দেখে নিতে থাকে। সবই তো পরিপাটি করে সাজানো, কই কোথাও তো বিশৃঙ্খলা নেই। তবে যে লোকটা বলছিল, এখানে ওখানে পড়ে থাকে গয়না? কই, তেমন চিহ্ন তো নেই কোনো জায়গায়।

লোকটি সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল, এমন ময়লা ড্রেস স্যার!

আপনি বসুন।

তখন অজয় সোনি ভেতরে এলো। তার পিছুপিছু কমবয়সী পরিচারিকা। হাতে ধরা ট্রেতে মিষ্টি নোনতা। টিপয়ে রেখে পরিচারিকা তা এগিয়ে দিতে গেলে অখিল বলল, থাক, নিয়ে নেব।

কফি না চা স্যার।

আগে কথা বলি, এগুলি নিয়ে যান, শুধু চা হলেই হবে।

নো, নো স্যার, আপনি এলেন।

অখিল পরিচারিকাকে দেখছিল। বাইশ নম্বরের হলে তার সঙ্গের লোকটি চিনতে পারত। পরনের শাড়িটি দামি সিনথেটিক, গায়ে বেশ দামি সোয়েটার। বয়স বছর চবিবশের মধ্যে। চোখমুখে বয়সের শ্রী, গায়ের রং ময়লা ময়লা।

তুম যাও লিপি। অজয় সোনি পরিচারিকাকে সরিয়ে দিলো। পরিচারিকা চলে যেতে অখিল জিজ্ঞেস করল, মেইড সার্ভেন্ট কি লোকাল?

নো স্যার।

বাড়িতে থাকে?

কিউ স্যার, কেন?

এমনি, আপনি কনস্টেবল অধীর কু-ুকে চেনেন?

পুলিশ কনস্টেবল! হাসল অজয় সোনি, নো স্যার, তো উনি কে, ইনিও কি রিসারর্চ করছেন, তুম কৌন? গলার স্বর আচমকা বদলে গেল অজয় সোনির, হু ইজ হি?

অখিল বলল, আমার সঙ্গে এসেছেন।

উনাকে চলে যেতে বলুন সাব, তারপর সব কথা হবে, তুমি ভাই নিচে ওয়েট করো। সাবের সঙ্গে আমার কথা হোবে, থার্ড পার্সন তো আমি অ্যালাউ করব না।

লোকটা উঠে দাঁড়িয়েছে। অখিল দেখল লোকটা হাসছে। অপমান লুকিয়ে ফেলেছে কয়েক মুহূর্তের ভেতরেই, বলল, ঠিক আছে স্যার, আমি যাচ্ছি।

না, না, যাবেন কেন, উনি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। অখিল বলল।

নো স্যার, মনে হয় ২২ নম্বর বস্তির আছে, শি ইজ ফ্রম দ্যাট সস্নাম এরিয়া, এ ভাই কী কাম করো?

লোকটি বলল, খোচড়।

খোচড়, খোচড় কী আছে?

ইনফর্মার, সাহেবের ইনফর্মার।

নো, নো, তুমি ঝুটা বলছ, তুমি বাজারে সবজি নিয়ে বসো।

তুমি দেখেছ? লোকটা জিজ্ঞেস করে।

এমনি কামই করে সব, হামি জানি। অজয় সোনি বলল।

ভুল জানো তুমি। লোকটার গলার স্বর আচমকা বদলে গেছে যে তা টের পায় অখিল।

হামি বলছি তুমি ফ্ল্যাটের বাইরে যাও, দেখিয়ে সাব, এরকম আদমি হামার ফ্ল্যাটে ঢুকবে, হামি তা অ্যালাউ করতে পারি না, আপ এনকোয়্যারিং অফিসার, লেকিন আই হ্যাভ রাইট টু প্রটেক্ট মাইসেলফ, দিস পার্সন ইজ আনওয়ানটেড, পিস্নজ টেল হিম টু গো আউটসাইড।

তুমি একটা ক্রিমিনাল, এইটা তো বলতে পারলাম। চাপা গলায় বলতে বলতে লোকটি আর দাঁড়ায় না। কলাপসিবল গেট খোলার শব্দ পায় অখিল শ্রীবাস্তব। সে বুঝতে পারছে অজয় সোনি খুব সহজ মানুষ নয়। লোকটি বেয়াদব। লোকটির সঙ্গে তার মোকাবেলা খুব সহজ হবে না। লোকটি হয়তো টের পেয়েছে তার আসার উদ্দেশ্য, তাই প্রথমেই তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করল এই ঘরে। বাইশ নম্বরের লোকটিকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া যে প্রকারান্তরে তাকেই অগ্রাহ্য করা তা অখিল বুঝতে পারছে। অখিল নিজে এখন আক্রমণের জন্য তৈরি হতে লাগল। সে জিজ্ঞেস করল, এসআই জগন্নাথ মিশ্রকে চেনেন?

এসআই মতলব?

সাব-ইন্সপেক্টর।

সেলস ট্যাঙ, অর ইনকাম ট্যাঙ?

অখিল বুঝতে পারল লোকটি অতি ধূর্ত। সে তার ভূমিকা স্থির করে নিল, গম্ভীর গলায় বলল, আমি কোর্ট থেকে আদেশ পেয়ে এসেছি, এসআই জগন্নাথ মিশ্র যে পুলিশের তা আপনি ভালোভাবে জানেন, গত বছর এখানে ওই জগন্নাথ মিশ্র কতবার এসেছিল মি. সোনি?

অজয় সোনি বলল, কী বলতে চান আপনি?

মাধুকে চিনতেন?

কৌন মাধু?

আপনার মেইড সার্ভেন্ট, হাজব্যান্ড-ওয়াইফ একসঙ্গে সুইসাইড করেছিল, ক্যান য়ু রিমেমবার?

অজয় সোনি একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে অখিলের দিকে। চোখের পলক পড়ছে না লোকটার। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। অখিলকে মেপে নিচ্ছে যেন। কয়েক মুহূর্ত গেল নিঃশব্দে, তারপর বলল, আপনার ওই ইনফর্মারের খবর?

যা বলছি উত্তর দিন, হ্যাঁ কিংবা না।

কী বলছেন আপনি?

মাধুকে চেনেন, মানে চিনতেন?

মাধু, হামার ওয়াইফ চিনতে পারে। মেইড সার্ভেন্ট তো ও-ই রাখে। কে মাধু, দেখিয়ে সাব ছ-মাস বাদে বাদে মেইড সার্ভেন্ট বদল করতে হয়, কাম ছেড়ে দেয় ঔর ধরা পড়ে যায়।

ধরা পড়ে যায় মানে?

ওই বাইশ নম্বরের মেয়েছেলে সব চোর আছে, আরে

হা-হা-হা, একটা লেড়কি, ম্যারেড, বহু থা, ও হামার সোনার চেন চোরি করেছিল, তার কথা বলছেন?

নামটা বলুন। মাধু।

হামার ওয়াইফ জানবে, হামি তো মেইড সার্ভেন্টের নাম জানি না সাব।

এই যে নাম ধরে ডাকলেন মেইড সার্ভেন্টকে, লিপি।

হা-হা করে হাসল অজয় সোনি, আপনি তো এনকোয়্যারিং অফিসার আছেন, ডিটেকটিভ, আপনাকে ফাঁকি দেওয়া চলবে না, ও নামটা হামি ওকে দিলাম এখন, কখনো লিপি বলি, কখনো জুহি বলি, কখনো জয়া বলি, লেকিন ওর আসল নাম আমার তো জানা নেই।

অখিল বলল, দেখুন মি. সোনি, আপনি মাধুকে কাজ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, কেন?

অজয় সোনি তখন দরজার কাছে চলে গেল, শুনবে, এ জুহি তোর ভাবিকে ডেকে দে।

অখিল বলল, লিপি-ই কি জুহি?

ইয়েস স্যার, আমার যেমন ইচ্ছা তেমন ডাকি।

অখিল শ্রীবাস্তব দেখল দরজার মুখে সেই মহিলা। স্নিগ্ধ শান্ত মুখখানি। চোখ দুটিতে ভয় দেখল অখিল।

অজয় তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে, কৌন মেইড সার্ভেন্টকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো?

মহিলা চুপচাপ। জবাব দিলেন না।

অজয় বলল, দেখিয়ে সাব, মেইড সার্ভেন্ট যায়-আসে, কৌন লেড়কির কথা বলা হচ্ছে বুঝব কীভাবে, কুছ কুছ লেড়কি থাকে বেয়াদব।

অজয় সোনির চোখে চোখ রাখল অখিল, বলল, তার নাম মাধু, বাইশ নম্বরে থাকত, হাজব্যান্ড ওয়াইফ একসঙ্গে সুইসাইড করেছিল, ওই কেসে এসআই মিশ্র আর কনস্টেবল কু-ু আসত এ-বাড়িতে, মনে পড়ে?

সুইসাইড করেছিল তো হামি কী করব?

অজয় সোনির স্ত্রী ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হয়েছেন, অখিল বলল, কী হয়েছিল বলবেন? কেন তাড়িয়ে দিয়েছিলেন?

হামি কুছু বলব না স্যার, আমার ভকিল কথা বলবে, ও কেস ড্রপড।

কেস রি-ওপেন করা যেতে পারে, আমি কনস্টেবল আর এসআইয়ের ভূমিকা জানতে চাইছি।

দেখিয়ে সাব, বাইশ নম্বরের সব আদমি চোর আছে, ও মেয়েটা হামার মিসেসের নেকলেস সাফাই করেছিল, বিশ হাজার রূপয়া দাম হোবে, ছোড় দিজিয়ে সাব, লিভ ইট, হামি পোলিসে দিতে পারতাম, লেকিন মেয়েছেলে তো, সিরিফ কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিলাম, তার আগেও এটা-ওটা গেছে, রূপয়া চলে যেত, একবার গেল রিস্ট ওয়াচ, সিঙ্গাপুর থেকে আনা, দশ হাজার রূপয়া দাম ছিল, সব নিত ওই মেয়েছেলেটা, আগে তো ধরতে পারিনি।

অখিল বলল, মিশ্র আর কু-ু এখনো আসে?

হামার ভকিল কথা বলবে সাব, হামি এ নিয়ে আর বাত করব না, কেসটা ফালতু, গরিব আদমি তো সুইসাইড করেই থাকে, কত আচ্ছা আদমি সুইসাইড করছে, টেক ইট সাব, মিঠাই নিন, আসলি হলদিরামের আছে।

অখিল বলল, শোনা যায়, শি ওয়াজ রেপড হিয়ার।

মতলব? আচমকা কোণঠাসা হয়ে রুখে এলো যেন লোকটা।

রেপড হয়েছিল মাধু?

এ কেয়া বাত মি. শ্রীবাস্তব, হামার ভকিল যা বলবার বলবে, আপনি কেন এসেছেন, আপনি কী চান, কিতনা চাহিয়ে বোলিয়ে, সব আমার ভকিল করবে, হামি কুছু বলব না।

মেয়েটার সমস্ত খবর বাইশ নম্বরে জানে।

হামি কুছু বলব না মি. শ্রীবাস্তব।

অখিল উঠে দাঁড়াল। কথাটা আন্দাজে ফেলে দিয়েছে অখিল। তার মনে হচ্ছিল এই রকম কিছু হতে পারে। সে বলল, কেসটা আবার তোলা হবে, এসআই মিশ্র কী রিপোর্ট দিয়েছিল জানা দরকার।

অখিল শ্রীবাস্তবের কথায় ভাবলেশহীন অজয় সোনি ডাকল কাজের মেয়েটাকে, এ লিপি, গেট খুল।

বেরোতে বেরোতে অখিল টের পায় মেইড সার্ভেন্টের গা থেকে দামি সুগন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে ফ্ল্যাটের ভেতরে।

 

বাইরে এসে অখিল তার সঙ্গীকে খুঁজে পায়নি। চারদিকে দেখল, কোথাও লোকটি নেই। সে হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে দেখল মাঠে বাচ্চাদের হাত ধরে যারা হাঁটছে, তারা বাইশ নম্বরের হতে পারে। বাইশ নম্বরের মানুষজন এখানে এসব কাজ করে, আয়া, ঠিকেঝি, ফাইফরমাশ খাটা বালক ভৃত্য ইত্যাদি; কিন্তু লোকটা কোথায় গেল? আশ্চর্য! এখন ওকে খুঁজবে কীভাবে? নামটা কিছুতেই আদায় করতে পারেনি অখিল।

অখিল অল্পবয়সীদের ক্রিকেট খেলা দেখল মিনিট পাঁচ। আসলে ওখানে, মাঠের ধারে কিছু লোকে জটলা করছিল, তার ভেতরে লোকটা আছে কিনা তা দেখার জন্য সে পাঁচ মিনিট সময় নিল। তারপর আবার চলতে লাগল। রাস্তার দুপাশের বাড়ি থেকে চটুল হিন্দি ফিল্মি সংগীত বেরিয়ে এসে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। অখিল টের পায় এই সংগীতের ভেতরেই বাইশ নম্বরের মানুষটির বিগ ব্যাং, মহাজাগতিক সংঘর্ষের শব্দ – রোলিং মিলের শব্দ, নিমফুলের গন্ধ। ঘাম, আনন্দ, রাতে জাগা সব মিশে রয়েছে। লোকটা সেই হারিয়ে যাওয়া রোলিং মিলের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছিল। রোলিং মিল স্মৃতি নিয়েই ভেসে আছে এই আবাসনের ঘাসে আর ইট-কাঠে। সে এখানেই আছে কোথাও।

Leave a Reply

%d bloggers like this: