মুক্তিযুদ্ধের বয়ান

লেখক: ফারজানা সিদ্দিকা

পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে দ্রৌপদী একই সঙ্গে নারীর অপমান আর সংগ্রামের প্রতীক। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুযায়ী, পুত্রকামনায় রাজা দ্রম্নপদের যজ্ঞকু- থেকে তিনি উদ্ভূত – সত্যযুগে বেদবতী, ত্রেতায় সীতা আর দ্বাপরে দ্রৌপদী নামে পরিচিত। ব্যাসের মতে, পূর্বকালের পাঁচ ইন্দ্রই পঞ্চপা-বরূপে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং লক্ষ্মীদেবী দ্রৌপদীর রূপ ধরেই এঁদের স্ত্রী হবেন। শ্যামবর্ণা, আজন্ম যৌবনা, তেজস্বী এই নারীর জীবনেতিহাসের সঙ্গে আপাতভাবে বাংলাদেশের শক্তিমান ঔপন্যাসিক রাজিয়া খানের দ্রৌপদী উপন্যাসের কাহিনিগত বা চরিত্রচিত্রণে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া না গেলেও এই উপন্যাসের প্রধান নারীচরিত্রের তেজস্বিতায় আর যুদ্ধের পটভূমিতে বিরুদ্ধ সময়ে রাষ্ট্রের সম্মান রক্ষায় অবিচল থাকার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের যে-বয়ান নির্মিত হয়েছে তাতে  কখনো কখনো খুব ক্ষীণ হলেও বেজে ওঠে যেন মহাকাব্যিক সিম্ফনি। যদিও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে দ্রৌপদী উপন্যাসে তিনজন তরুণ-তরুণীর পারস্পরিক আমত্মঃসম্পর্ক এবং নিজ নিজ ভুবনে স্বতন্ত্র সক্রিয়তার এক অভিনব জীবন প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকের এই স্বতন্ত্র জীবনকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ।

দুই তরুণ সোহরাব ও মিহির – এদের দুজনের কেন্দ্রে রয়েছে নয়ন নামে এক সুন্দরী, মেধাবী, সৃষ্টিশীল তরুণী, যার জীবনাচরণে দ্বিধাহীন স্পষ্টতার জন্যে ‘দ্রৌপদী’ নাম দিয়ে বিকৃত মন্তব্য করেছিলেন এক সিনিয়র নৃত্যশিল্পী। নয়ন নিঃসংকোচে সে-নামটিকেই গ্রহণ করেছিল।

উপন্যাসটিকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়। ১৯৬৯-এর নভেম্বরে পিএইচ.ডি শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয় সোহরাব। ঢাকায় ফিরে এ-যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ। সেখানে প্রাধান্য পায় কেবল তিন বন্ধু – সোহরাব-নয়ন-মিহির। মাঝেমধ্যে যুক্ত হয়েছে সবিতা নামে আরেকজন। নয়নের ফুফাত ভাই ওসমান ওদের বয়সে ছোট হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে ওদের সংস্পর্শে থেকেছে মাঝেমধ্যে। স্মৃতিচারণের এ-অংশে মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া, আড্ডা এবং নাটককে ঘিরে ওদের সক্রিয়তার নানা প্রসঙ্গ বর্ণনা করেছেন ঔপন্যাসিক। সময়কালটি সম্পর্কে ঔপন্যাসিক স্পষ্ট কিছু না জানালেও ধারণা করা যায়, এদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের কালপর্ব ১৯৬১-৬৫-এর মধ্যবর্তী সময়ে। কেননা, এর পরপরই সোহরাব লন্ডনে চলে যায় এবং তিন বছর পর পিএইচ.ডি. শেষে পুনরায় ১৯৬৯-এর নভেম্বরে ঢাকায় ফিরে আসে।

উপন্যাসের স্মৃতিচারণ পর্বের উজ্জ্বল অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রচিত। এ-সময়টিতে, বিশেষত ডাকসুর সক্রিয়তায় মুগ্ধ হতে হয়। ডাকসুর উদ্যোগে একের পর এক সাংস্কৃতিক কর্মকা–, বিশেষ করে নাটকের সঙ্গে যুক্ত হয় তিন বন্ধু। মিহির ডাকসুর আয়োজনে পরিচালনা করেছিল কবর নাটক। অন্যদিকে, রক্তকরবীতে ওরা তিনজনই নিয়মিত অভিনয় করেছে। নয়ন সে-নাটকে নন্দিনী। এরা তিনজন যেমন সাংস্কৃতিক কর্মকা– সক্রিয়, তেমনি ইরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী। এমএ-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করে কালীনারায়ণ বৃত্তি লাভ করেছিল মিহির। সোহরাব প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় আর নার্ভাস ব্রেক-ডাউনের অসুখে ভুগে পরীক্ষা দিতে না পেরে এক বছর পর নিচের ক্লাসে নয়নও লাভ করেছিল প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান।

উপন্যাসের এ-পর্বে নাটকের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বাস্তব চরিত্রকে তুলে আনেন ঔপন্যাসিক। ডাকসুর বাসমত্মী নাট্যোৎসবে, ড্রামা সার্কেলে কিংবা পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারতে শুভেচ্ছা মিশনে ওই বাস্তব চরিত্ররা সক্রিয় থাকেন। আসকার ইবনে সাইখের বিদ্রোহী পদ্মা নাটকে অভিনয় করে ওরা। সেই নাটক কিংবা রক্তকরবী বা

কৃষ্ণকুমারীর নির্দেশনা দেন ফতেহ লোহানী, বজলুল করিম, মকসুদুস সালেহীন। কলকাতায় পরে ওদের নাটকে সহযোগিতা করেন বহুরূপী নাট্যদলের শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্র। ওদের শুভেচ্ছা মিশনের নেতৃত্ব দেন তাজউদ্দীন আহমদ, পরে মুক্তিযুদ্ধেরও নেতৃত্ব দেন তিনি।

‘ব্যানার্জি’ নামে যে-শিক্ষকের স্নেহে ও নির্দেশনায় তিনজনের জীবনই পরিপূর্ণ হয়েছে তাকে আপাতভাবে কাল্পনিক চরিত্র মনে হলেও একটু সচেতন পাঠকই বুঝে নিতে পারেন যে, এই ‘ব্যানার্জি’ আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের নামকরা শিক্ষক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা। ব্যানার্জি স্যারের স্ত্রীর নাম উপন্যাসে বাসমত্মী। বাস্তবে ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার স্ত্রীর নামও ছিল বাসমত্মী। তাঁদের একমাত্র কন্যা মেঘনার নাম উপন্যাসে ‘শর্মিলা’ রাখা হয়েছে। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে – উপনাসে ব্যানার্জি স্যারের হত্যাকা–র বর্ণনাও একইরকমভাবে দিয়েছেন ঔপন্যাসিক। দ্রৌপদী উপন্যাসটি ঔপন্যাসিক রিজিয়া খান উৎসর্গও করেছেন ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে। অন্য শিক্ষকদের মধ্যে ড. দেব অর্থাৎ জি. সি. দেবের হত্যাকা–র কথা বলা হয়েছে। আলতাফ মাহমুদ, মধুদার হত্যাকা–রও উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া এ-উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসীদের সংগঠনের কাজে যুক্ত বিচারপতি আবু সাঈদের সাংগঠনিক তৎপরতার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে টাঙ্গাইলে যুদ্ধ করেছে সোহরাবের ছোট ভাইয়েরা।

পাকিস্তানের পক্ষে, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, ঢাকার গভর্নর ড. মালিক, পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টোর নাম প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে। শেখ মুজিবুর রহমান, ইন্দিরা গান্ধীর নাম বারবার এসেছে অবধারিতভাবেই।

যে-সময়টিতে উপন্যাসের প্রধান তিন চরিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সেটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল সময়। ১৯৬৯-এর নভেম্বরে উপন্যাসের অন্যতম নায়ক ঢাকায় ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়। সহপাঠী বন্ধু নয়ন আগেই একই বিভাগে শিক্ষকতা করেছে; কিন্তু এ দুজনের কথোপকথনের মধ্যে কোথাও রাজনৈতিক উত্তাপের প্রসঙ্গ থাকে না। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা তারও আগে ছয় দফা আন্দোলন, বা বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন কোনো প্রসঙ্গেই এই তিন মেধাবী শিক্ষার্থীর কোনো কৌতূহল বা অংশগ্রহণ ছিল না। অথচ এই তিনজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিককর্মী, মেধাবী শিক্ষার্থী। উপন্যাসের শুরুতেই জানা যায় নয়ন ‘রাইটার্স গিল্ডের সম্মেলনে’ নিয়মিত যায়। এছাড়া, লাহোরে নয়নের পরিবার থাকে। ফলে নিয়মিত পারিবারিক যোগাযোগের মাধ্যমেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের রূপটি লেখক, কবি নয়নের চোখে পড়ার কথা। কিন্তু সেরকম কোনো প্রসঙ্গ ঔপন্যাসিক নয়নের উক্তিতে বা ভাবনায় উল্লেখ করেননি। মাঝে, মাঝে, কেবল, … ‘রাজনৈতিক আবহাওয়াটা খুব ঘোলাটে মনে হল।’ (খান, পৃ ৫৫২) কিংবা ‘আশেপাশের সবাই রাজনীতি আলোচনায় মুখর। শেখ মুজিবের দীর্ঘ কারাবাস – আইউব শাহীর আসন্ন পতন ইত্যাদি আলোচনায় মাঝে মাঝে দায়সারা গোছের অংশ নিচ্ছিলাম।’ (খান, পৃ ৫৭১) পাঠক হিসেবে প্রশ্ন জাগে, কেন দায়সারা গোছের অংশগ্রহণ? মাঝে মাঝে এরা চা-বিরতির ফাঁকে ছাদে দাঁড়িয়ে কারামুক্তির পর শেখ মুজিবের ফিরে আসা দেখে। এ-উপন্যাসে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ নিয়েও পাত্রপাত্রীদের মধ্যে কোনো আলাপচারিতা, কৌতূহল, উদ্বেগ নেই। অথচ, এরা তিনজনই কবর বা রক্তকরবীর মতো রাজনৈতিক নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর, লাহোর থেকে কেবল বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করার বাসনা নিয়ে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল নয়ন। যদিও শতভাগ বাঙালি হয়ে ওঠা তার পক্ষে যুক্তিসংগত ছিল না। কেননা, তার বাবা বাঙালি হলেও মা ছিলেন পাঞ্জাবি। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক অন্যান্য উপন্যাসে ৭ই মার্চের ভাষণের ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণ বা শুনবার অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকার জনসাধারণের মধ্যে যতটা প্রাণচাঞ্চল্যের বর্ণনা পাওয়া যায় – এ-উপন্যাসে এ-প্রসঙ্গে ঠিক ততটাই নিরুত্তাপ।

১৯৬৫-এ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে অবিশ্বাস ও অনাত্মীয় সম্পর্কে দুই রাষ্ট্র জড়িয়েছিল সেই পরিবেশে সোহরাবের পক্ষে নিরুদ্বিগ্নভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা বা পরবর্তী সময়ে চাকরি নেওয়া সম্ভব ছিল না। কেননা, সোহরাবের বাড়ি মুর্শিদাবাদে। বাবার কবর গোবরায়। তার মা ছোট দুই ছেলে নিয়ে কলকাতায় থাকেন। বাবার পেনশনের টাকায় এবং প্রকাশনীর ব্যবসায় তাদের সংসার চলে। সোহরাবের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের কোনো পারিবারিক বন্ধন নেই। নয়ন বাঙালি হওয়ার বাসনা নিয়ে ঢাকায় এলেও সোহরাব কী কারণে কলকাতা ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে তা এ-উপন্যাসে স্পষ্ট নয়। কেবল ঢাকার গাছপালাঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ তাকে আকর্ষণ করেছে বলে ঔপন্যাসিক ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু এ-যুক্তি দুর্বল বলেই মনে হয়।

মূলত ঔপন্যাসিক তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মতো এ-উপন্যাসেও বিশাল ভূগোল রচনা করেন। কলকাতা-ঢাকা-লাহোর-চট্টগ্রাম-লন্ডন-রোমকে ঘিরে এ-উপন্যাসের চরিত্রদের বিচরণ।

তিন বন্ধু সোহরাব-নয়ন-মিহির। সোহরাব তার পারিবারিক ইতিহাস সংক্ষেপে দিয়েছে এ-উপন্যাসে। মিহির চট্টগ্রামের ছেলে, বাবা-মা নেই, উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল টাকার মালিক। কদম নামের একজন গৃহকর্মী তাকে ছোটবেলা থেকে লালন-পালন করেছে – এর বাইরে তেমন কোনো পরিচয় দেওয়া হয়নি।

সোহরাব ও মিহিরের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নয়ন। নয়নই এ-উপন্যাসের চালিকাশক্তি। অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী নয়নকে ঘিরেই দুই বন্ধুর প্রেম ও বন্ধুত্ব এক বিচিত্র জীবনবোধের জন্ম দিয়েছে। দুই বন্ধুই নয়নকে ভালোবেসেছে গভীরভাবে। দুই বন্ধুই দুজনের সেই গোপন ভালোবাসা নিয়ে দিনের পর দিন কথোপকথনে মেতেছে; কিন্তু কেউ কাউকে ঈর্ষা করেনি, প্রতিপক্ষ ভাবেনি। দুই বন্ধুই নয়নকে না পাওয়ার ব্যর্থতার কষ্ট ঘোচাতে অন্য নারীতে আসক্ত হয়েছে, সে-আসক্তি কেবল শরীরকেন্দ্রিক; কিন্তু অন্য কোনো নারীর প্রেমে পড়তে পারেনি। এসব স্খলনের গল্পও তারা পরস্পরের কাছে গোপন রাখতে পারেনি। এমনকি নয়নও জেনেছে তাদের স্খলনের গোপন ইতিবৃত্ত।

একসময় বিয়ে করে সংসারী হতে চেয়েছে মিহির; কিন্তু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায় ওর অল্পবয়সী স্ত্রী। লন্ডনে এক টাইপিস্টের সঙ্গে প্রায় লিভ-টুগেদারের জীবন যাপন করে সোহরাব। নয়ন বিয়ে করে এক ওষুধ ব্যবসায়ীকে, রবি নামে দুই বছরের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে তার। ওষুধ ব্যবসায়ীকে কেন বিয়ে করছে নয়ন, কোন বিবেচনায় তার মতো স্বাধীনচেতা, রুচিশীল, সৃষ্টিশীল নারী এমন পাত্র বেছে নিয়েছে … ভাবায় পাঠককে। যাই হোক, ওদের তিনজনের জীবন ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতায় সঞ্চিত হলেও বন্ধুত্বে ফাটল ধরে না। শরীরের বাসনার কাছে ধরা দেয়নি বলেই ওদের বন্ধুত্ব নয়নের কাছে ‘আত্মার অমরত্বে’ এক অটুট বন্ধন তৈরি করতে পেরেছে।

তিন বন্ধুর মধ্যে সবচেয়ে বর্ণাঢ্য জীবন নাজনীন সদরুদ্দিন নয়নের। নয়ন সুন্দরী, মেধাবী, সৃষ্টিশীল এক নারীর প্রতীক। শরীরে তার বইছে বাঙালি ও পাঞ্জাবি রক্ত। বাবা স্যার সদরুদ্দিন মির্জা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার শিক্ষামন্ত্রী, পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা। রাজনৈতিক আবহে, অভিজাত পরিবেশে বড় হয়েছে নয়ন। কেনেড কলেজের ছাত্রী নয়ন লাহোর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল ‘বাঙালির’ পরিচয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর মঞ্চনাটকে অভিনয়ে, আবৃত্তিতে, নাট্যকার পরিচয়ে, কবি হিসেবে এমনকি কীর্তন গান লিখে ও সুর করে এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের পরিচয়ে চারপাশের সকলকে মুগ্ধ করে নয়ন। এমনকি লেখাপড়াতেও সে ঈর্ষণীয় ফলাফল করে। এমএ পরীক্ষার পর সে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে গেলেও পড়াশোনা শেষ না করেই দেশে ফিরে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়। ওষুধ ব্যবসায়ী আরফিকে বিয়ে করে দাম্পত্য জীবনে অসুখী হলেও শিশুপুত্র রবি, বন্ধু সোহরাব ও মিহির, শিক্ষকতার ও সৃষ্টিশীল জীবনের উত্তাপে সে বেঁচে থাকে নিজের একান্ত জগতে। এ-উপন্যাস পাঠ করার পর অন্নদাশঙ্কর রায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে রাজিয়া খানকে চিঠি লিখেছিলেন। জানিয়েছিলেন, নয়ন এক আশ্চর্য চরিত্র।

১৯৭১-এর ২৫ মার্চের আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে যে-আলোড়ন চলছিল তার তেমন কোনো উল্লেখ না থাকলেও ঠিক ২৫ মার্চের দু-তিনদিন আগের দু-একটি ঘটনা থেকেই ঔপনাসিক যেন একটা প্রস্ত্ততির ইঙ্গিত দিতে চেষ্টা করেছেন। ১৯৬৯-এর নভেম্বরে সোহরাব দেশে ফেরে। ১৯৬৯ জুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ঘটনার জন্ম হয়। ১৯৬৯-এর ২০ জানুয়ারি মিছিলে ছাত্র আসাদুজ্জামান নিহত হয়। ১৫ ফেব্রম্নয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ১৮ ফেব্রম্নয়ারি ড. সামসুজ্জোহাকে হত্যা করা হয়। ২২ ফেব্রম্নয়ারি গণ-আন্দোলনের চাপে ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হয়। ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন। নভেম্বরের শুরুতে অর্থাৎ ১৯৬৯-এর ১-৪ নভেম্বর ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা বাধে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে ১৯৬৯-এর ৫ ডিসেম্বর। সেদিন, ‘শেখ মুজিব কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ’ (রহমান, পৃ ৩২) হয়। উপন্যাসের সোহরাব বিদেশে থাকলেও রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে নয়ন সে-সময় ঢাকাতেই অবস্থান করছিল। অথচ তাদের মধ্যে এসব ঘটনা তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। কেবল, নয়ন জানায়, সম্প্রতি লাহোর গিয়ে তার মনে হয়েছে, হয়তো সেখানে আর যাওয়া হবে না। যদিও নয়নের বাঙালি বাবা আর পাঞ্জাবি মা লাহোরেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এই লাহোরেই ১৯৬৬-এর ৫ ফেব্রম্নয়ারি শেখ মুজিব ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন।

অভিজাত জীবনে একাধিকবার লাহোরে নয়নের সঙ্গে পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জলুফিকার আলি ভুট্টোর দেখা হয়। ভুট্টোর একান্ত সহচর আহমেদ কায়সারের সঙ্গে নয়নের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে পিপলস পার্টির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার জন্যে নয়নকে প্রস্তাব দেওয়া নিয়ে তারা নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নেয়। কিন্তু নয়ন তাদের সে-ফাঁদে পা দেয়নি। যদিও এ-উপন্যাসে নয়ন কেন সে-ফাঁদে পা দিতে রাজি নয়, কী তার রাজনৈতিক আদর্শ বা অবস্থান, সে-সম্পর্কে স্পষ্টতা নেই।

১৯৭০-এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬৯ আসনে আওয়ামী লীগ ১৬৭ আসন পায়। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৪৪টি আসনের মধ্যে ৮৮টি আসন পায় ভুট্টোর পিপলস পার্টি। প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয়লাভ করলে ভুট্টো তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ১৯৭০-এর ২১ ডিসেম্বর এক সভায় ভুট্টো ঘোষণা করেন, ‘গত তেইশ বছর পূর্ব পাকিস্তান দেশ শাসনে ন্যায্য হিস্যা পায়নি। তাই বলে আগামী তেইশ বছর পাকিস্তানের ওপর প্রভুত্ব করবে তা হতে পারে না।’

(রহমান, পৃ ৩২)

১৯৭০-এর জলোচ্ছ্বাস, নির্বাচন বা ভুট্টোর এই দম্ভোক্তি – কোনো কিছু নিয়েই উপন্যাসের চরিত্রদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় না। বিশেষত, নয়নের – যে-নয়ন ভুট্টোর উপস্থিতিতে নানা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছে।

রাজনৈতিক উত্তাপে উত্তপ্ত সেই ঢাকার উত্তাপের আঁচ ১৯৭০-এর ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত প্রতিদিনের জীবনযাপনে খুব একটা লাগেনি এ-উপন্যাসের মুখ্য তিন চরিত্রের মননে। ক্লাস নেওয়ার প্রয়োজনে কিছু জরুরি নোট আনতে নয়নের মণিপুরীপাড়ার বাসায় যাওয়ার সময় সোহরাব দেখে, ‘সমস্ত এয়ারপোর্ট রোড উত্তেজনায় মুখরিত। শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পেয়েছেন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে গাড়িতে এই পথ দিয়ে যাবেন।’ (খান, পৃ ৫৮৮) এর আরো কয়েকদিন পরে ব্যানার্জি স্যারের বাড়িতে নিমন্ত্রণে যাওয়ার সময় গাড়িতে বসে রাস্তাঘাট দেখতে দেখতে নয়ন বলে ওঠে, ‘মনে হচ্ছে সাংঘাতিক একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে -’ (খান, পৃ ৫৯৪)। একই রকম অনুভূতি হয় ব্যানার্জি স্যারের মেয়ে শর্মিলারও। গান গাইতে অনুরোধ করলে শর্মিলা বলে, ‘আমার একটুও গান গাইতে ইচ্ছে করছে না বাবা। কেমন ভয় করছে। বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম মনে হল কারা যেন আমাদের মারতে আসছে।’

(খান, পৃ ৫৯৪)

টিএসসির স্টাফ রুমে চা খেতে খেতে শিক্ষকেরা ‘শেখ সাহেবের’ মুক্তিলাভ নিয়ে উত্তেজিত আলোচনা করে।

ঢাকাসহ সারাদেশে ১৯৭১-এর মার্চে একাধিকবার কারফিউ জারি করেছে পাকিস্তান সরকার, অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন শেখ মুজিব। তাঁরই আহবানে হরতাল পালিত হয়েছে। এসব পরিস্থিতি নিয়ে ঔপন্যাসিক বিসত্মৃত বর্ণনা দেননি। তবে নয়নের বাড়িতে লাঞ্চের নিমন্ত্রণে রেডিওতে ইয়াহিয়া খানের ভারি কণ্ঠস্বর শুনে ভয় পেয়ে যায় শর্মিলা। সে থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেও হোটেল ইন্টারকনে কফি খেতে গিয়ে বিস্ফোরণের আগমুহূর্তের জমাটবাঁধা গুমোট পরিবেশে যখন এয়ারপোর্টের ছাদে মেশিনগান-হাতে সেনাবাহিনী দেখে নয়ন তখন শর্মিলার মতো নিজেও সে আঁতকে ওঠে।

মূলত ২৫ মার্চের পর থেকেই এ-উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ একটি স্বতন্ত্র চরিত্র হয়ে ওঠে। সময় ও পরিস্থিতি হয়ে ওঠে উপন্যাসের চালিকাশক্তি। মুক্তিযুদ্ধই নিয়ন্ত্রণ করে উপন্যাসের পরবর্তী গতি।

তিন বন্ধুর মধ্যে মিহির শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করেনি। কূটনীতিক হিসেবে রোমে পোস্টিং ছিল তার। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মিহিরের স্ত্রী মারা যায়। চট্টগ্রামে মিহিরের শ্বশুরবাড়ি। বন্ধুর দুঃসময়ে মিহিরের পাশে দাঁড়ায় সোহরাব। মিহিরকে ঢাকায় নিয়ে আসে। ফুলার রোডে শিক্ষক কোয়ার্টারে দুই বন্ধুর জীবনে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ।

কয়েকদিন ধরেই পরিস্থিতি থমথমে ছিল। অনেকেই নিজেদের বাসা ছেড়ে অন্য বাসায় নিরাপত্তার জন্যে আশ্রয় নিয়েছে। নয়ন নিজের বাসা থেকেই ফোন করে দুই বন্ধুকে সাবধানে থাকার জন্যে পরামর্শ দেয়। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোনের লাইন কেটে যায় আর তারপরই সমস্ত আকাশ গমগম করে ওঠে গুলির শব্দে। ট্যাংকের গর্জন, মর্টারের বিস্ফোরণে নিমজ্জিত হয় চারপাশ :

মনে হচ্ছে যেন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ওপরই রোষটা বেশি। শর্মিলার সেই অনামিকা আশংকাই যেন ধীরে ধীরে একটা স্পষ্ট অবয়ব গ্রহণ করছে। আশেপাশের ফ্ল্যাটগুলোর দরজা জানালা বন্ধ। রাস্তা জনশূন্য। কেবল মারণাস্ত্র নিয়ে রণে নেমেছে ভীষণ শত্রম্ন – ট্যাংকের লৌহ আবরণে তারা রক্ষিত। রাস্তায় যে রক্ত চলকে পড়েছে অবাধ ধারায় তা অসহায় প্রতিরোধহীন বাঙালির। এ রক্ত জমাট বাঁধছে রাতের শান্তিময় নীড়ের দেয়ালে, মেঝেতে, বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলোর করিডোরে – চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বাসস্থানের অঙ্গনে, শয্যায়, তক্তপোষে – মাংস বিক্রিরত কসাইদের বাঁধানো কাউন্টারে। ঐ রক্তের চিহ্ন ধরে পরে যখন নগর পরিক্রমায় বেরিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল আমার জন্মভূমির এক নতুন মানচিত্র তৈরি হয়েছে – তা ঐ রক্তের রেখায় রাঙা।

(খান, পৃ ৬১১)

গোটা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রক্তে রঞ্জিত। সোহরাবের পাশের ফ্ল্যাটের শিক্ষক, ব্যানার্জি স্যার, ড. দেব – একে একে পরিচিত-অপরিচিত মানুষের হত্যাকা– স্তম্ভিভত হয়ে পড়ে ওরা। ব্যানার্জি স্যারের স্ত্রী ও কন্যাকে প্রায় পনেরো দিন পরে হাসপাতালে খুঁজে পাওয়া যায়। নয়ন তার শিশুসন্তান রবিকে নিয়ে সোহরাবের বাসায় আশ্রয় নেয়। তারপর অন্য সকলের মতোই বেঁচে থাকার তাগিদে ধ্বংসনগরী ঢাকা থেকে পালায় ওরা। নয়নের স্বামী আরিফও ওদের সঙ্গী হয়। উপন্যাসের এ-অংশটিতে সবকিছু যেন নাটকীয়ভাবে অত্যন্ত দ্রম্নততার মধ্য দিয়েই ঘটতে থাকে।

প্রথমে ওরা গৃহকর্মী কদমের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। ময়লা কাপড় পরে, তেল মেখে শ্রমজীবী মানুষের বেশ ধারণ করে। পথে পথে আর্মির টহলগাড়ি। মামাবাড়ির খুব কাছে অবস্থান করলেও সে-বাড়িতে কারো খোঁজে যেতে পারে না মিহির। কেননা সে-বাড়ির সদরেই অবস্থান নিয়েছে হানাদার বাহিনী। আগরতলা হয়ে এক  সময় কলকাতায় সোহরাবের মায়ের বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয় জোটে ওদের। কদম তার অমত্মঃসত্ত্বা স্ত্রী ও মাকে নিয়ে থেকে যায় আগরতলার উদ্বাস্ত্ত শিবিরে। সেখানে অনাহারে ক্লান্তিতে কদমের স্ত্রী একটি মৃত সন্তান প্রসব করে।

দেশ ছাড়ার পূর্বে প্রিয় শিক্ষকের স্ত্রী ও কন্যাকে নিরাপদে রাখার দায়িত্ব পালন করেছিল ওরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মিহির চট্টগ্রামে ওর শ্বশুরবাড়িতে তাদের রেখে এসেছিল।

২৬ মার্চ রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মেজর জিয়ার ঘোষণা শুনে ওরা বুঝেছিল যুদ্ধ অনিবার্য। পথে পথে নির্বিচারে হত্যাকা- ও ধ্বংসযজ্ঞের যে-চিত্র ওরা দেখে তাতে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না কীভাবে এ-লড়াই চালিয়ে যাবে বাংলার মানুষ! স্বাধীন বাংলা বেতারে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম প্রতিনিধি তাজউদ্দীন আহমদ। ছাত্রজীবনে পশ্চিম পাকিস্তানে যে-শুভেচ্ছা মিশনে ওরা তিনজনই গিয়েছিল সেই মিশনের নেতা ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ – ‘সেই নব্য উকিলই যে একদিন শেখ মুজিবুর রহমানের পরিত্যক্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে এমন অগ্নিশপথ গ্রহণ করবার মতো ব্যক্তিত্বের অধিকারী, তা তখন বুঝতে পারিনি।’ (খান, পৃ ৬১৭) মনে মনে ভরসা পায় ওরা।

কলকাতায় সোহরাবের মায়ের যত্নে পলাতক জীবনের পথের ক্লান্তি দূর হয়। দিনরাত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নতুন কোনো খবরের আশায় কান পেতে থাকে ওরা সকলে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার জন্যে তিনজনেই অস্থির হয়ে ওঠে। এদিকে, কলকাতায় শরণার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে : ‘… পার্কসার্কাস এলাকা ভরে গেছে চেনা মুখে। পথে ঘাটে, বাস ট্রামে দেখাও হয়েছে

কয়েকবার রাজশাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালিয়ে আসা শিক্ষক এবং নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে।’ (খান,

পৃ ৬২৪-৬২৫) প্রত্যেকেরই বীভৎস সব অভিজ্ঞতা। চোখে-মুখে ভয়-আতঙ্ক-অনিশ্চয়তা। শরণার্থী ক্যাম্পগুলোত জায়গার সংকুলান হয় না।

মূলত এ-উপন্যাসের ঐতিহাসিক মূল্য নির্ধারিত হয়ে যায় এ-পর্বে। বাংলাদেশের নারী ঔপন্যাসিকদের উপন্যাসে শরণার্থীর জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান সম্পর্কে উল্লেখ নগণ্য। যদিও এ-উপন্যাসের চরিত্রেরা সরাসরি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়নি, তবু সেই দুঃসময়ে কলকাতায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়া বাংলাদেশের মানুষের উদ্ভ্রান্ত ও ভয়ার্ত চেহারার একটি স্কেচ আঁকতে সমর্থ হয়েছেন রাজিয়া খান।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও বিকল্প উপায়ে যোদ্ধা হওয়ার পথ খোঁজে ওরা। নয়নের ফুফাত ভাই ওসমান ওদের সেই পথের সন্ধান দেয়। নয়নই উদ্যোগ নেয় সেই পথকে সফল করার। কলকাতায় বহুরূপী নাট্যদলের শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রের সহযোগিতায় ছাত্রজীবনে মঞ্চায়িত রক্তকরবী নাটকটি প্রদর্শনের পরিকল্পনা করে। আরিফ এবং নয়নের পুত্র রবিকেও যুক্ত করে ওরা। মহড়া চলতে থাকে। নাটকের প্রদর্শনীর টাকা যুদ্ধের অর্থ জোগানের কাজে ব্যয় করা হবে। ওসমানের সহযোগিতায় ১৯৭১-এর মে মাসে ওরা লন্ডনের পথে পাড়ি জমায়। এরই মধ্যে নয়ন তার তীক্ষ্ণ মেধা দিয়ে রক্তকরবীর ইংরেজি অনুবাদকে পরিমার্জন করে।

মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা ও সক্রিয়তা এ-উপন্যাসকে ঐতিহাসিকতা দান করেছে নিঃসন্দেহে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা জনমতে নিয়মিত ছাপা হয় মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধের অবিশ্বাস্য কাহিনি। বাংলাদেশের ওপর যে-লোমহর্ষক প্রবন্ধটি ইংরেজ সাংবাদিক মাসকারিনাস লিখেছিলেন, লন্ডনের পার্কে ছোট্ট রবিকে নিয়ে খেলার সময় সে-প্রবন্ধটি পড়ে ফেলে সোহরাব। ওসমান জানায়, ‘লন্ডনবাসী বাঙালিরা তাদের কষ্টোপার্জিত অর্থ ও অস্ত্রের কয়েকটা কিস্তি ইতিমধ্যেই পাঠিয়ে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য।’

(খান, পৃ ৬৬৩)

ঢাকা থেকে পালানোর সময় যে-জমানো টাকা ওরা সঙ্গে আনতে পেরেছিল, ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসে। ছোট্ট ঘরে গাদাগাদি করে থেকে পয়সা বাঁচানোর চেষ্টা করে ওরা। ছোটখাটো চাকরি নেয় প্রত্যেকে। সুযোগ বুঝে নয়নের মতো প্রতিষ্ঠিত নাট্যকার বা ইংরেজির মেধাবী শিক্ষককে বিবিসি কম বেতনে কেরানির চাকরির প্রস্তাব দেয়।

কাজশেষে বাসায় ফিরে রান্না আর ধোয়ামোছার কাজ সেরেই নাটকের মহড়া শুরু করে। তারপর, বহু কষ্টে ১৬ আগস্ট থেকে নাটক প্রদর্শনীর জন্যে হল মেলে। প্রবাসী বাঙালিরা ওদের নাটক নিয়ে উৎসাহী হয়ে ওঠে। বন্দনা নামে একজন যুক্ত হয় ওদের সঙ্গে। বন্দনার সাংবাদিক ভাই পত্র-পত্রিকায় নাটকের বিজ্ঞাপন ছাপাবার ভার নিজে থেকেই নেয়। আরিফের দূরসম্পর্কের বোন শাহানা বেপরোয়া জীবনযাপন করলেও নাটকের টিকিট বিক্রির দায়িত্ব পালন করে সুচারুভাবে। জুলাই মাসের শেষে একটা ‘ফুল ড্রেস রিহার্সেলে’ ওরা বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে পঁচিশ পেনি দামের টিকিটের বিনিময়ে। চারিদিকে প্রচার-প্রচারণা চলতে থাকে, ‘এক মাস ধরে বিজ্ঞাপন বেরুতে লাগল বাংলাদেশে নির্যাতিত জনগণের সাহায্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অবদান – ইংরেজিতে রক্তকরবী -।’

(খান, পৃ ৬৩৯)

প্রদর্শনীর প্রথম সন্ধ্যায় মাত্র জনাদশেক ইংরেজ দর্শক উপস্থিত ছিল। কিন্তু বন্দনার সাংবাদিক ভাই সোমেনের আমন্ত্রণে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকবন্ধু নাটকটির ত্রম্নটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও এমন অতিরঞ্জিত প্রশংসা করে রিভিউ লিখতে থাকেন যে প্রদর্শনীর তৃতীয় দিন থেকে প্রেক্ষাগৃহ ভিড়ে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। নাটকের স্যুভেনিরে শম্ভু মিত্র আর তৃপ্তি মিত্রের বাণী ছাপা হয়। এ-বাণী নয়ন কলকাতা থেকেই জোগাড় করে এনেছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতাকে রক্তকরবী নাটকের মূল দর্শনের সঙ্গে একাত্ম করে তোলেন ঔপন্যাসিক। রক্তকরবীর রাজার একনায়কত্ব আর অমানবিক নিষ্ঠুরতা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর প্রতীকে পরিণত হয়। রক্তকরবী নাটকের শ্রমিকের বঞ্চনা-অপমান যেন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরই অপমান হয়ে ওঠে। আর মুক্তিযুদ্ধ আসে নন্দিনীর রূপ ধরে। রাজিয়া খানের উপন্যাস আলোচনায় এ-প্রসঙ্গে অধ্যাপক হাবিব আর রহমান মন্তব্য করেছেন, ‘আসলে রাজিয়া খান সেই গোত্রের ঔপন্যাসিক যাঁদের রচনা সম্ভোগের জন্য বিদ্যানুশীলন ও বহু সৃষ্টির সঙ্গে পরিচয় থাকা বাঞ্ছনীয়। এবং এ মন্তব্য তাঁর প্রথম উপন্যাস থেকেই প্রযোজ্য।’

(আর রহমান, পৃ ১৬৩)

কলকাতায় অবস্থানকালে সম্মুখ সমরে নারী হিসেবে অংশগ্রহণ করতে না পারার যে ব্যর্থতা নয়নকে স্পর্শ করেছিল সেই ব্যর্থতাকে সে রূপান্তর করেছে অন্য এক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। রক্তকরবীর নন্দিনী মানবসভ্যতার চিরকালের সজীব এক যোদ্ধারই প্রতিরূপ। মঞ্চে সেই নন্দিনীর ভূমিকায় অভিনয় করে নয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক দার্শনিক যোদ্ধায় পরিণত হয়। যুদ্ধ তো কেবল অস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, চেতনায় আঘাত করে যে-অস্ত্র সে-অস্ত্র প্রাণ কেড়ে নেয় না, প্রাণকে নতুন প্রাণে রূপান্তরিত করে। নন্দিনীর আহবানে সেই নতুন প্রাণের জোয়ারে অন্ধকার থেকে আলোর পানে যাত্রা করে পৃথিবীর বঞ্চিত-লাঞ্ছিত ভাগ্যহতরা।

সফল নাট্য-প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অর্থ জোগানের প্রত্যাশিত ফল লাভ করে ওরা। বাড়তি পাওনাও মেলে ওদের। লন্ডনের সিলেটি পাড়ায় ভালোবেসে নাটকের চরিত্রের নাম ধরেই ওদের সম্বোধন করে অনেকে।

নাটকের অনেকগুলো প্রদর্শনীশেষে ওরা পুনরায় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে বিহবল হয়ে পড়ে। কেবল অর্থসাহায্য পাঠিয়েই যেন দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। লন্ডন টাইমসের পাতায় পলায়নরত বাঙালি মেয়ের ভয়ার্ত মুখের ছবি দেখে পুনরায় ওদের কতর্ব্যবোধ সচল হয়। সেই সচলতায় গতি এনে দেয় বন্ধু সবিতার চিঠি। কলকাতা থেকে দীর্ঘ চিঠিতে সবিতা জানায় :

যারা দেশের জন্য এমন অমানুষিক কষ্ট করছে তাদের যোগ্য মর্যাদা কি আমরা দিতে পারব? পরনে একটি মাত্র ছেঁড়া লুঙ্গি – তাই বুক পর্যন্ত টেনে কোনোমতে কনকনে শীতের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে দেখলাম কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের। দীর্ঘ উপবাসের পরে খেতে দেখলাম একমুঠো শুকনো গম। এত ভারী রাইফেল বহন করবার মতো নয় ওদের কচি হাত। অনেকে শীতে, ঘাড়ের ব্যথায়, ক্ষুধায় একেবারে নীল হয়ে গেছে –

(খান, পৃ ৫৫২)

সবিতার এ-চিঠির বর্ণনায় নতুন করে যুদ্ধের জন্যে তৈরি হয় ওরা। লন্ডনে ততদিনে আর্থিকভাবে একটু নিশ্চয়তা ও স্বস্তি জুটেছিল ওদের। কিন্তু সবিতার চিঠি ওদের ফিরিয়ে আনে কলকাতায়।

সোহরাবের কিশোর ভাই-দুটো বালুরঘাট ইউথ রিসেপশন ক্যাম্পে নাম লেখায়। সোহরাবরা যখন লন্ডন থেকে ফেরে তখন টাঙ্গাইলে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যুদ্ধ করছিল ওর দুই ভাই জাভেদ-জাহেদ।

সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেয় সোহরাব-মিহির-আরিফ। কলকাতায় পুত্র রবিকে নিয়ে সোহরাবের মায়ের কাছে থেকে যায় নয়ন। নভেম্বরে জলপাইগুড়িতে মাত্র দু-সপ্তাহের ট্রেনিং নিয়েই ওরা চড়ে বসে এক কনভয়ে। নেপালের সীমান্ত দিয়ে একসময় পৌঁছে যায় রংপুরে। সেখানেই এক অপারেশনে মিহিরের ঊরুতে গুলি লাগে। হাসপাতালে পাঠানো হয় তাকে। সোহরাব-আরিফও যুদ্ধ করবার খুব একটা সুযোগ পায় না। হিলি হয়ে বগুড়ার দিকে আক্রমণের প্রস্ত্ততি নিতে নিতেই ভারতীয় বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আক্রমণ শুরু করে। ৬ থেকে ৮ ডিসেম্বর তুমুল যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভারতীয় বিমান বাহিনীর সহায়তায় সোহরাব-আরিফেরা যখন বগুড়া দখল করে তখন ওদের চারপাশে বৃষ্টির মতো রকেট ও শেল পড়তে থাকে।

পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে সাদা পতাকার চিহ্ন দেখে সেই যুদ্ধক্ষেত্রেও সোহরাবের মনে পড়ে হুইটম্যানের কবিতা। এমনিভাবে কখনো কখনো ওদের কাছে শিল্প আর যুদ্ধ একাকার হয়ে যায়।

১৬ ডিসেম্বরের পরে কলকাতায় ফিরে জানা যায়, মিহির অনেকটা সুস্থ হলেও নয়ন সেই ছাত্রজীবনের মতো নার্ভাস ব্রেক ডাউনে ভুগছে। কিন্তু পাঠকের জানা হয়ে ওঠে না কী কারণে নয়ন নার্ভাস ব্রেক ডাউনের শিকার হলো? বন্ধুদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে যেতে না পারার ব্যর্থতা, নাকি অন্য কোনো গভীর সংকটের আগাম আভাস পেয়েছে সে? অবশ্য রাজিয়া খানের উপন্যাসের চরিত্ররা পরিবেশগত সংকটের চেয়ে আত্মিক সংকটে বেশি আচ্ছন্ন :

আমাদের গ্রাম প্রধান বাংলাদেশে সত্যিকারের নাগরিক সাহিত্য নির্মাণ একটি জটিল বিষয়। কেবল অভিজ্ঞতা আর যাপনের নির্যাস থেকেই বেরিয়ে আসতে পারে ঐ ধরনের আখ্যান। জটিল নগরজীবন, মানবিক বিচ্ছিন্নতা আর আত্মক্ষরণের শিল্পপ্রতিমা আমাদের সাহিত্যে তখন এক রকম অনুপস্থিতই বলা চলে। রাজিয়া খান এমন একটি কালখ– নাগরিক মানসের জটিল সঙ্কট নিয়ে হাজির হলেন।

(আলম, পৃ ১৭৭)

সুতরাং অনেক রক্তক্ষরণ-ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে প্রত্যাশিত স্বাধীনতা এলেও প্রখর নাগরিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী এ-উপন্যাসের নামচরিত্র নয়ন তথা দ্রৌপদীর সুস্থতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। পুত্র রবির জন্মদিনে, রবির মন ভালো করে দেওয়ার প্রলোভনেও সে সাড়া দেয় না। এভাবেই উপন্যাসটির সমাপ্তি ঘটলেও নয়ন বা দ্রৌপদীর পরবর্তী পরিণতির জন্যে পাঠকের কৌতূহল থেকে যায়।

পৌরাণিক চরিত্র দ্রৌপদী যুগে যুগে নারী-লাঞ্ছনার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিমানে দুপাশে দুই ছেলে বন্ধুকে বসিয়েছিল বলে নয়নকে অপমান করবার উদ্দেশ্যেই ‘দ্রোপদী’ নামটি দিয়েছিলেন একজন নৃত্যশিল্পী। কিন্তু ক্ষেপে না উঠে নয়ন সে-নামটিকে সানন্দে গ্রহণ করেছিল। উপন্যাসের শেষে নয়ন কি নিজেকে তার মাতৃভূমির লাঞ্ছনার সঙ্গে দ্রৌপদীর লাঞ্ছনাকে একাকার করেছে, নাকি একজন সৃষ্টিশীল নারী হিসেবে সদ্য স্বাধীন দেশটির ভবিষ্যৎ লাঞ্ছনার আভাস সে পেয়ে গেছে কোনোভাবে :

‘দ্রৌপদী’ রাজিয়া খানের অবশ্যই একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। এ রাজনীতি গভীর দর্শন থেকে উঠে আসা। রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যকার নানা Identits নিয়ে বর্তমান বিশ্ব যেভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে – রাজিয়া এ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে কিছু সন্দর্ভের ইঙ্গিত দিচ্ছেন বলেই মনে হল। তিনি নানা চরিত্রের মুখ দিয়ে বা ভাবনা চেতনার মধ্য দিয়ে টুকটুক করে Discourse-গুলো ছুঁড়ে দিয়েছেন।

(চট্টোপাধ্যায়, পৃ ২৮৫)

হয়তো নয়নের নিশ্চুপ থাকার মধ্যে ইতিহাসের নতুন কোনো ডিসকোর্সকেই ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন ঔপন্যাসিক। চরিত্র রূপায়ণে কিছু যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের এক ভিন্ন মাত্রার ইতিহাসকে রাজিয়া খান পুনর্নির্মিত করেছেন শিক্ষিত নাগরিক চোখে ও মননে।

 

সহায়ক গ্রন্থ

১. রাজিয়া খান, দ্রৌপদী, উপন্যাসসমগ্র, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা,

২০০৪।

২. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশের তারিখ, মাওলা

ব্রাদার্স, ঢাকা, ১৯৯৮ (দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০১)।

৩. হাবিব আর রহমান, ‘বটতলার উপন্যাস : যন্ত্রণাবিদ্ধ

ব্যক্তিসত্তার আত্মকথন’,  গল্পকথা, (রাজিয়া খান ও কায়েস

আহমেদ যৌথ সংখ্যা), রাজশাহী,  বর্ষ ৮, সংখ্যা ৯ ও ১০,

২০১৮, সম্পাদক : চন্দন আনোয়ার।

৪. খোরশেদ আলম, ‘বটতলার উপন্যাস : মানবিক অসুখের

বৃত্তান্ত’, গল্পকথা, প্রাগুক্ত।

৫. সাধন চট্টোপাধ্যায়, ‘ঔপন্যাসিক যখন না-কথা বলার বাণী

পুঁতে রাখেন’, গল্পকথা, প্রাগুক্ত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: