শার্ল বোদলেয়ার : পঙ্কে যিনি ফোটাতে চেয়েছিলেন পদ্ম

লেখক: ফারহানা রহমান

প্যাঁচারা
জ্ঞানীর চোখ, তা দেখে যায় খুলে
হাতের কাছে যা আছে নেয় তুলে
থামায় গতি, অবুঝ আন্দোলন;
শান্তি তার এ তো চিরন্তন –
কেবল চায় বদল, বাসা বদল!
(‘লে ফ্ল্যর দ্যু মাল’, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)

ফরাসি কবি, সমালোচক ও অনুবাদক শার্ল বোদলেয়ারের জন্ম ১৮২১ সালের ৯ এপ্রিল প্যারিতে। তাঁর পুরো নাম শার্ল পিয়ের বোদলেয়ার। বাবা জোসেফ ফ্রাঁসোয়া বোদলেয়ার, মা ক্যারোলিন দ্যুফে। শার্ল বোদলেয়ার ফরাসি সাহিত্যাঙ্গনে একটি উজ্জ্বল নাম।
গদ্য-কবিতায় স্বতন্ত্রধারার সূচনাকারী এই কবি পরবর্তী সময়ের অনেক কবিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছেন। এ-কারণেই তাঁকে আধুনিক কবিতার জনক বলা হয়।
বাবা জোসেফ ফ্রাঁসোয়া বোদলেয়ার ষাট বছর বয়সে দ্বিতীয়বারের মতো সংসার পাতেন তাঁর চেয়ে চৌত্রিশ বছরের ছোট অনাথ মেয়ে ক্যারোলিনের সঙ্গে। ক্যারোলিনের বয়স সে-সময় মাত্র ২৬ বছর। এই অসম বয়সী দম্পতির ঘরে ১৮২১ সালের এপ্রিলের ঝলমলে একটি দিনে ফ্রান্সের প্যারিতে জন্ম হয় জগদ্বিখ্যাত কবি শার্ল বোদলেয়ারের। তাঁর অমর সৃষ্টি লে ফ্ল্যর দ্যু মাল।
কাব্যজগৎ নিয়ে বোদলেয়ারের ধারণা ছিল এরকম : ‘অদৃশ্যকে দেখতে হবে, অশ্রুতকে শুনতে হবে, ইন্দ্রিয়সমূহের বিপুল ও সচেতন বিপর্যয় সাধনের দ্বারা পৌঁছাতে হবে অজানায়, জানতে হবে প্রেমের, দুঃখের, উন্মাদনার সব প্রকরণ; খুঁজতে হবে নিজেকে, সব গরল আত্মসাৎ করে নিতে হবে, পেতে হবে অকথ্য যন্ত্রণা, অলৌকিক শক্তি, হতে হবে মহারোগী, মহাদুর্জন, পরম নারকীয়, জ্ঞানীর শিরোমণি। আর এমন করেই অজানায় পৌঁছান।’
এই অজানা অনন্তে পৌঁছানোর জন্য দৈহিক বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য বোদলেয়ারের প্রার্থনা :
ভগবান, ভগবান, দাও সেই শক্তি ও সাহস, যেতে পারি
দেখে নিতে আমার শরীর মন বিতৃষ্ণাব্যতীত
আত্মভোলা, সৎ ও শিল্পীমনের অধিকারী ফ্রাঁসোয়ার পেশা ছিল শিক্ষকতা। একমাত্র ছেলে বোদলেয়ারকে ভীষণ ভালোবাসতেন তিনি। বোদলেয়ারও বাবার ন্যাওটা ছিলেন। বাবার পা-িত্য ও চিত্রকলার ওপর যে-নেশা, তারই প্রভাব পড়েছিল শিশু বোদলেয়ারের ওপর। ছবি দেখা ও চেনার সুরটা তিনি বাবা ফ্রাঁসোয়ার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। শিশু বোদলেয়ারের যখন ছ-বছর বয়স, বাবার কাছ থেকে ল্যাটিন অক্ষর অ-আ শিখছেন মাত্র, ঠিক তখনই ১৮২৭ সালে বাবা জোসেফ ফ্রাঁসোয়া বোদলেয়ারের মৃত্যু হয়। আর এই সময়টিতেই ফ্রান্সে রোমান্টিকতার চরম উত্থান ঘটে। ১৮২৯ সালে শিশু বোদলেয়ারের বিধবা মা ক্যারোলিন দ্যুফে পুনর্বিবাহ করেন ক্যাপ্টেন (যিনি পরে জেনারেল হয়েছিলেন) ওপিককে। মাতা ও বিপিতার সমূহ ভালোবাসা, মনোযোগ পাওয়া সত্ত্বেও বালক বোদলেয়ার কিশোর বয়স থেকেই বিষাদাক্রান্ত হন এবং জীবনভর সে-বিষাদেই ডুবে থাকেন।
১৮৩৬ সালে কর্নেল ওপিক বদলি হয়ে প্যারিতে চলে আসেন। সেখানে বোদলেয়ারকে একটি নামকরা উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন তিনি। বিপিতা কর্নেল ওপিক বোদলেয়ারকে নিয়ে নানা স্বপ্ন বুনতেন এবং একই সঙ্গে উচ্চ ধার-ণাও পোষণ করতেন। তিনি উচ্চবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের সঙ্গে ছেলের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় বলেন, ‘মসিয়ে, আমি আপনার জন্য একটি মূল্যবান উপহার এনেছি। সন্দেহ নেই যে, এই ছেলে আপনার বিদ্যালয়ের গৌরব বাড়াবে।’
ছেলেবেলায় বোদলেয়ার মায়ের কাছে ইংরেজি শিখেছিলেন। এরপর স্কুলে ভর্তি হয়ে পরবর্তী তিন বছর তাঁর ইংরেজি-চর্চা অব্যাহত থাকে। এ-সময়ে তিনি ফরাসি ও ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি গভীরভাবে মগ্ন হয়ে পড়েন। লিখে চলেন একের পর এক কবিতা। নিজেকে যেন খুঁজে পেলেন স্যাতঁ-ব্যভের ‘কবিতা’ এবং তাঁর উপন্যাস ‘ইন্দ্রিয়বিলাস’ (ঠড়ষঁঢ়ঃব) Ñ এই দুটি গ্রন্থের মধ্যে। তবে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, শিক্ষকরা ছাত্র বোদলেয়ারের ওপর নানা কারণে বিরক্ত হয়ে রইলেন। এদিকে বোদলেয়ার ইতিহাসকে ‘অর্থহীন এক বিষয়’ বলে কর্তৃপক্ষের আঁতে ঘা দেওয়ার ফলে ১৮৩৯ সালে তাঁকে স্কুল থেকে বিতাড়িত করা হলো। পরবর্তী দু-বছর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়েই লাতিন কোয়ার্টারে বাসা নিয়ে থাকতে শুরু করেন এবং প্যারিসীয় ছাত্রদের মতো উচ্ছৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। আফিমসহ নানা নেশায় অভ্যস্ত বোদলেয়ার লুশেৎ নামে এক রক্ষিতা রাখলেন। ধারণা করা হয়, এখান থেকেই তিনি সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ-রোগই পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে।
১৮৪১ সালে ছেলের উন্নত ভবিষ্যতের আশায় বোদলেয়ারের মা ও বিপিতা তাঁকে ভারত ভ্রমণের উদ্দেশ্যে জাহাজে তুলে দেন। যদিও বোদলেয়ার প্যারি ছাড়তে চাইছিলেন না, অবশেষে ভ্রমণে অভিজ্ঞ নেরভালের পরামর্শে ১৮৪১ সালের ৯ জুন তিনি বর্ডো থেকে ‘দক্ষিণ আকাশ’ নামে জাহাজে করে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হন। দুর্ভাগ্যবশত জাহাজটি উত্তমাশা অন্তরীপে এক ভয়াবহ ঝড়ের মুখে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তিন সপ্তাহের জন্য মরিশাস দ্বীপে আটকে থাকে। এ-সময় বোদলেয়ার প্যারিতে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। ফলে তিনি ভারত সমুদ্রের রেনুয়ার দ্বীপ থেকে অন্য জাহাজে করে প্যারির উদ্দেশে যাত্রা করেন। পাঠক জানেন হয়তো, তাঁর কাব্যে এই প্রাচ্য-ভ্রমণের অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রকৃতপক্ষে বোদলেয়ার এই একবারই তাঁর জীবনকালে
বিদেশ-ভ্রমণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর এই ভ্রমণ নিয়ে বন্ধুদের কাছে গর্ব করতেন এবং মৃত্যুর কিছুকাল আগে তিনি ভারতবর্ষ নিয়ে একটি কবিতা লেখার আশা প্রকাশ করেছিলেন।
১৮৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি ভ্রমণশেষে ফ্রান্সে ফিরে আসেন। এ-বছরটি বোদলেয়ারের কাব্যজীবনের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটি বছর। কারণ এ-বছরই তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ তেওদর দ্য বাভিল প্রকাশিত হয়। একই সময় তিনি আইনত সাবালক হয়ে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হলেন, ফলে তাঁর জীবনযাপনে দেখা দিলো ধনাঢ্য ব্যক্তির উচ্ছ্বাস। তিনি তাঁর সস্তা লাতিন কোয়ার্টার পঁসিয় ছেড়ে উঠে আসেন উঁচুদরের হোটেল ‘পিমদাঁ’য়। পরবর্তী দু-বছর তিনি ডুবে থাকলেন নানা ধরনের নেশায় Ñ আফিম, সিদ্ধি ও বিচিত্র ধরনের মদের নেশা। অতিথির চোখকে বিহ্বল করে তোলার জন্য তিনি ঘরের মেঝেতে বিছিয়ে রাখতেন দামি গালিচা, গৃহ সজ্জিত করেন প্রাচীন কবিদের সোনা-বাঁধানো মূল্যবান সংস্করণ দিয়ে, চিত্র ও অন্যান্য শিল্পদ্রব্যের সমাহারে ভরে ওঠে বোদলেয়ারের বি-িচত্র বাসগৃহ। এ-সময় তিনি ধার করে কেনেন বহু চিত্র ও শিল্পকর্ম। এজন্য জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁকে এই ঋণের বোঝা টানতে হয়েছিল।
১৮৪২-৪৪ Ñ এই বছরগুলো বোদলেয়ারের জীবনে নানাভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এ-সময়টিতেই তাঁর পরিচয় হয় জান দ্যুভালের সঙ্গে, যে-নারী কোনো-না-কোনোভাবে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বোদলেয়ারের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। লে ফ্ল্যর দ্যু মালের অধিকাংশ কবিতাও এই দু-বছরের মধ্যেই রচিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
কবিতা, মানসী, তুই, প্রাসাদের উপাসক জানি কিন্তু বল, যখন প্রদোষকালে, হিমেল বাতাসে নির্বেদে, নীহারপুঞ্জে জানুয়ারি কালো হয়ে আসে –
নীলাভ নয়নে তোর তাপ দিবি, আছে তো জ্বালানি?
মর্মরে নিটোল তনু; কিন্তু তার পুনরুজ্জীবন
হবে কি বাতায়নের রন্ধ্রে বেঁধা দীপের শিখায়?
যেমন রসনা নিঃস্ব, সেইমতো শূন্য পেটিকায়
ভরাবি, আকাশ ছেঁকে, নীলিমার উদার কাঞ্চন?
না, তোকে যেতেই হবে, দিনশেষে অন্ন জোটে যাতে,
মন্দিরে, দাসীর মতো, আরতির কাঁসর বাজাতে,
যে-মন্ত্রে বিশ্বাস নেই, মুখে তাই জপ করে যাবি,
কিংবা, উপবাসী তুই, পরে বিদূষকের বসন,
না-দেখা চোখের জলে ভিজিয়ে রঙিন প্রহসন,
ইতর জনগণের তিক্ততায় আমোদ জাগাবি?
(‘পণ্য কবিতা’, লে ফ্ল্যর দু মাল, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)

পুত্রের এই উচ্ছৃঙ্খল ও অমিতব্যয়ী জীবন দেখে মাদাম ওপিক অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠলেন। ছেলে যাতে অর্থের বিনাশ করতে না পারে এবং নির্দিষ্ট একটি নিয়মের মধ্যেই জীবনযাপন করে, সে-উদ্দেশ্যে তিনি প্রৌঢ় আই-নজীবী আঁসেলকে আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য আইনসম্মত অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ করেন। ছেলে যেন মূলধনে হাত দিতে না পারে তিনি সে-ব্যবস্থাই পাকাপোক্তভাবে করে যান। তাই প্রতিমাসে বোদলেয়ার শুধু মূলধনের সুদটুকুই পেতে লাগলেন। এ-ব্যবস্থার জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মায়ের প্রতি বিক্ষুব্ধ ছিলেন। যদিও এর পর থেকেই বোদলেয়ারের জীবনে দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাত নেমে আসে; কিন্তু কোনোকিছুই মাদাম ওপিককে নির্ধারিত ব্যবস্থা থেকে এতটুকু টলাতে পারেনি। তাই পিতামাতার যথেষ্ট অর্থসম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বোদলেয়ারের মৃত্যু হয়।
হোটেল পিমদাঁর বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে পরের বছর অর্থাৎ ১৮৪৫ সালে বোদলেয়ার উঠে আসেন একটি মাঝারি পাড়ার সাধারণ বাড়িতে। সাহিত্যকে নিজের জীবনে গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন। এই প্রথম চিত্রপ্রদর্শনীর সমালোচনা নিয়ে একটি প্রবন্ধ ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হলো। এর পরপরই প্রকাশিত হলো একটি কবিতা। চেষ্টা চালালেন সাহিত্যের মাধ্যমে কিছু উপার্জনের; সেখানেও তিনি হতাশ হলেন। তবে পরবর্তী বছরই আরো তিনটি কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হলো।
১৮৪৭ সালে তাঁর প্রথম ছোট উপন্যাস বা নভেলা লা ফাঁফার্লো প্রকাশিত হলো। পরের বছর পো-র গল্প ‘মেসমেরীয় উন্মীলনে’র অনুবাদ ছাড়া আর তেমন কোনো কিছুই তাঁর পক্ষে লেখা সম্ভব হলো না। এর কারণ ফ্রান্সে দ্বিতীয় রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য ফেব্রুয়ারির
বিপ্লব তখন শুরু হয়ে গেছে। এই একটিবারের জন্যই বোদলেয়ার নিজেকে রাজনীতিতে জড়িয়ে ছিলেন। মেতেছিলেন বিপ্লবের নেশায়।
১৮৪৯-৫০ সময়কালে তিনি প্যারি ছেড়ে দিজঁ শহরে একটি পত্রিকার সম্পাদনার ভার নিয়ে চলে যান। এছাড়া সেখানে যাওয়ার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল ইজাবেল ম্যনিয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা, যিনি ফরাসি ভাষায় এডগার অ্যালান পো-র গল্প ‘কালো বিড়াল’ অনুবাদ করেছিলেন। ১৮৫০-এর শুরুতে তিনি প্যারিতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং জান দ্যুভালের সঙ্গে একই বাসায় থাকতে শুরু করেন। পরের বছর অর্থাৎ ’৫১-তে কৃত্রিম স্বর্গ পত্রিকায় তাঁর বেশকিছু কবিতা ও প্রবন্ধ ছাপা হয়।
বোদলেয়ারের জীবনে এডগার অ্যালান পো-র অবদান অনস্বীকার্য। নিজের সাহিত্যিক অসাফল্যে তিনি যখন চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পো-র রচনা তাঁকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহী করে তোলে। সাহিত্যের মাধ্যমে সে-সময় পোর মধ্য দিয়ে তাঁর নিজেকে প্রকাশ করার আবেগ ছিল অদম্য। তিনি নিজেকে পো-র অনুবাদক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন।
১৮৫৬ ও ১৮৫৭ সালে বোদলেয়ার দু-খ-ে প্রকাশ করলেন পো-র গল্প ও প্রবন্ধের অনুবাদ। এভাবেই আরো তিন খ- বের হলো ১৮৫৮, ’৬৩ ও ’৬৫-তে। এই পাঁচ খ- অনুবাদই বোদলেয়ারের সাহিত্যিক জীবনের একটি বড় প্রাপ্তি বলে মনে করা হয়। তবে এতসব অনুবাদের মধ্যে পো-র মাত্র চারটি কবিতার অনুবাদ তিনি করেছিলেন।
বোদলেয়ারের জীবনে দুজন দার্শনিকের প্রভাব বিশেষভাবে পড়েছিল। তাঁরা হলেন জোসেফ দ্য মেস্তর এবং সোয়েডেনবর্গ। দ্য মেস্তর ছিলেন দার্শনিক ও কূটনীতিক। বোদলেয়ার তাঁর অন্তরঙ্গ ডায়েরিতে লিখেছিলেন, জোসেফ মেস্তর ও পো আমাকে চিন্তা করতে শিখিয়েছেন। এদিকে এমানুয়েল সোয়েডেনবর্গ, যিনি তাঁর অর্ধেক জীবন বিজ্ঞানী হিসেবে কাটিয়ে পরবর্তীকালে একটি নতুন ধর্মতত্ত্ব প্রবর্তন করেন, তাঁর বিপুল প্রভাব এসে পড়ে বোদলেয়ারের
চিন্তা-চেতনায়। এরই মধ্যে বালজাকের মিস্টিক উপন্যাসত্রয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং এক ধরনের অলৌকিকতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি রচনা করেন তার ‘প্রতিসাম্য’ ও ‘পুনর্জন্ম’ শীর্ষক কবিতাগুলো।
অসুখী, ঋণগ্রস্ত কবি বোদলেয়ারের সাহিত্যিক জীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে দেখা দিলো বিচিত্র পরিবর্তন। এরই মধ্যে বহু বছরের প্রেমিকা জান দ্যুভালের প্রতি সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে তাঁকে ত্যাগ করলেন এবং নিঃসঙ্গ অবস্থায় প্রেম নিবেদন করলেন ম্যারি দোব্র্যাঁকে। কিন্তু ম্যারি ভালোবাসতেন বাঁভিলকে, ফলে প্রত্যাখ্যাত বোদলেয়ার প্রেমের আশ্রয় খুঁজলেন মাদাম সাবাতিয়ের কাছে। বহু বছর আগে হোটেল পিমদাঁয়
থাকাকালে তাঁর সঙ্গে এই অসম্ভব রূপসী, বহু শিল্পীর মডেল এবং প্যারিসের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর রক্ষিতা সাবাতিয়ের সাক্ষাৎ হয়েছিল। বোদলেয়ার এই অপ্সরীর নাম দিলেন ‘শ্বেত ভেনাস’, যাঁকে তিনি মনে মনে পূজা করতে লাগলেন। ভাবতে লাগলেন ম্যাডোনা, সরস্বতী ও দেবদূত রূপে। এই রূপসী বন্ধুবৎসল নারী প্রতি রোববার তাঁর নিজ গৃহে নামজাদা সাহিত্যিক ও শিল্পীদের নিয়ে আসর বসাতেন। এই আসরে আসতেন দ্যুমা, গোতিয়ে, ফ্লোবেয়ারের মতো নামকরা সাহিত্যিকরা। তাঁরা সাবাতিয়েকে ডাকতেন আপলনি বলে। সেইসঙ্গে প্রতি রোববার সাহিত্যের আসরে যোগ দিতেন বোদলেয়ারও। আর এই আপলনির উদ্দেশেই দু-বছর ধরে বোদলেয়ার রচনা করলেন একগুচ্ছ প্রেমের কবিতা, যা তাঁর উদ্দেশে বেনামিতে পাঠাতে লাগলেন বোদলেয়ার। ১৮৫৪-র মে মাসের ৮ তারিখে বোদলেয়ার তাঁর শ্বেত ভেনাসকে শেষ অর্ঘ্য ‘স্তোত্র (ঐুসহব)’ পাঠিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এমন শান্ত, নম্র ও হৃদয়গ্রাহী কবিতা বোদলেয়ারের খুব কমই আছে। তবে এটাই ছিল এই সময়ের জন্য শেষ চিঠি। পরবর্তী তিন বছরে মাদাম সাবাতিয়েকে তিনি আর কোনো চিঠি দেননি।

স্তোত্র, লে ফ্ল্যর দ্যু মাল

প্রিয়তমা, সুন্দরীতমারে,
যে আমার উজ্জ্বল উদ্ধার Ñ
অমৃতের দিব্য প্রতিমারে,
অমৃতেরে করি নমস্কার।
বাতাসে সত্ত্বার লবণে
বাঁচায় সে জীবন আমার,
তৃপ্তিহীন আত্মার গহনে
গন্ধ ঢালে চিরন্তন।
(অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)

১৮৫৫ সালে রক্ষণশীল রোমান্টিকতার মুখপাত্র দুই জগতের পত্রিকার সম্পাদক নিজ দায়িত্বে বোদলেয়ারের আঠারোটি কবিতা একসঙ্গে প্রকাশ করেন। লে ফ্ল্যর দু মাল নামটি এই কবিতাগুচ্ছের জন্যই প্রথম ব্যবহার করা হয়। পরের বছর অ্যালান পো-র অনুবাদের প্রথম খ-ের সমালোচনা লেখার জন্য স্যাঁৎ ব্যভকে নানাভাবে অনুনয়-বিনয় করেও কোনোভাবে রাজি করাতে পারলেন না বোদলেয়ার। তবে প্রকাশক পুলে মালাসির সঙ্গে লে ফ্ল্যর দু মালের জন্য চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করলেন।
নির্ঘুম নিরলসভাবে পাঁচ মাস ধরে একনাগাড়ে প্রুফ দেখার পর মোট একশটি বাছাইকৃত কবিতা নিয়ে লে ফ্ল্যর দ্যু মাল বই আকারে প্রকাশিত হলো। প্রথমেই এক হাজার কপি প্রকাশ করা হলো, যার দাম ধরা হলো দু ফ্রাঁ করে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করলেন তেফোয়েল গোতিয়েকে। উৎসর্গপত্রে লিখলেন :

ফরাসি সাহিত্যের পরম জাদুকর
আমার অতি প্রিয়, অতি শ্রদ্ধেয়
গুরু ও বন্ধু
তেফোয়েল গোতিয়েকে
গভীরতম বিনয়ের অনুভূতিসমেত
এই দূষিত পুষ্পগুচ্ছ
উৎসর্গ করলাম।

তবে উৎসর্গপ্রাপক গোতিয়ে থেকে শুরু করে সম্পাদক দ্যু কা, অন্যসব প্রতিভাশালী বন্ধু, এমনকি বোদলেয়ারের আত্মীয় স্যাঁৎ ব্যভ পর্যন্ত, একজনও মুখ ফুটে বা লিখিত আকারে বইটি সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না, বা লিখলেন না। অবশ্য এতকিছুর পরও একজন মাত্র ব্যক্তি Ñ যার নাম বার্বে দোর্ভি লে ফ্ল্যর দ্যু মাল সম্পর্কে কাগজে একটি সপ্রশংস সমালোচনা লিখেছিলেন।
১৮৫৭-এর শুরুতে তিতিবিরক্ত বোদলেয়ার গদ্যকবিতা ‘লিপিকা’ লেখা শুরু করেন। নাম দিলেন প্যারিস সপ্লিন। এটিকেই মনে করা হয় বিশ্বের সর্বপ্রথম সাবঅলটার্নবিষয়ক কাব্যগ্রন্থ। এই সমাজের গদ্যময় প্রাসাদ থেকে শুরু করে ফুটপাত, বৈভব থেকে বৈধব্য, প্রেম-অপ্রেম কীভাবে সবকিছু ভীষণ কাব্যময় হয়ে উঠতে পারে, তার অপরূপ নিদর্শন বোদলেয়ার রেখে গেছেন তাঁর প্যারিস সপ্লিন কাব্যগ্রন্থে। যদিও ১৮৬৭ সালের ৩১ আগস্ট, যেদিন তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন, সেই দিনটিতেই প্রকাশিত হয়েছিল প্যারিস সপ্লিনের শেষ গুচ্ছকবিতা।
১৮৫৭ সালের ২০ আগস্ট ব্লাসফেমি (ঈশ্বর-নিন্দা) ও অশ্লীলতার অভিযোগে আসামি হয়ে কাঠগড়ায় উঠতে হয়েছিল বোদলেয়ারকে। অশ্লীলতার অভিযোগে বোদলেয়ারকে তিনশো ফ্রাঁ আর প্রকাশককে দুশো ফ্রাঁ জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ছয়টি কবিতাকে পরবর্তী একশ বছরের জন্য নির্বাসনদ- দেওয়া হয়। এই বছর, অর্থাৎ ১৮৫৭ সালে বোদলেয়ারের বিপিতা জেনারেল ওপিকের মৃত্যু হয় এবং একই বছর তিনি নিজেও ভীষণভাবে অসুস্থ হয় পড়েন।
১৮৫৮ সালের শুরু থেকেই একদিকে ভগ্নস্বাস্থ্য, অন্যদিকে অসহনীয় আর্থিক মন্দায় একপ্রকার পাগলপ্রায় হয়ে উঠলেন বোদলেয়ার। তিনি তাঁর বার্ষিক আয় থেকে দুই হাজার চারশো ফ্রাঁ অগ্রিম নেওয়ার জন্য আঁসেলকে ও মাদাম ওপিককে নানারকম অনুনয়-বিনয় করে চিঠি লিখেও ব্যর্থ হন। এদিকে বছরশেষে জান দ্যুভাল ফিরে এলে তাঁকে নতুন করে একটি বাসা ভাড়া করে দিতে হলো। ১৮৫৯ সালের এপ্রিলে দ্যুভাল পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা করালেন বোদলেয়ার। একই বছরে কাজ করলেন লে ফ্ল্যর দ্যু মালের দ্বিতীয় সংস্করণ নিয়ে। প্রকাশ করলেন গোতিয়েকে নিয়ে একটি বই, চিত্রপ্রদর্শনীর সমালোচনার বই এবং শেষ করলেন কৃত্রিম স্বর্গ বইটির পা-ুলিপি। পরের বছর এই কৃত্রিম স্বর্গ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো। ডিকুইন্সির অহিফেনসেবক বইটির সমূহ প্রভাব লক্ষ করা যায় কৃত্রিম স্বর্গ বইটিতে। মূলত বইটির বিষয়বস্তু নেশা, অর্থাৎ আফিম ও সিদ্ধি নিয়ে তিনি এ-বই লিখেছেন। আসলে অহিফেনসেবক থেকে অনেক কিছুই তিনি গ্রহণ করেছিলেন তাঁর বইটিতে। ছোট উপন্যাস যুবক জাদুকর লিখলেন। এছাড়া এডগার অ্যালান পো-র অনুবাদের সঙ্গে সঙ্গে লিখে চললেন তাঁর অন্তরঙ্গ ডায়েরি আমার উন্মুক্ত হৃদয় এবং হাউই।
নতুন পঁয়ত্রিশটি কবিতা নিয়ে লে ফ্ল্যর দ্যু মালের দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয় ১৮৬১ সালে। গীতিকবি হ্বাগনার ছিলেন বোদলেয়ারের জীবনে অ্যালান পোর মতোই আরেকজন উৎসাহব্যঞ্জক কবি। তাঁকে নিয়ে বোদলেয়ার একটি স্মরণীয় প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। এই সময়ে হ্বাগনার প্যারিতে থাকায় তাঁদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি বোদলেয়ারের জীবনে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে, শেষ রোগশয্যায় যখন বোদলেয়ারের বোধবুদ্ধি একেবারেই লুপ্তপ্রায়, তখনো তিনি হ্বাগনারের সংগীত শুনে সাড়া দিতেন। এই বছরের মাঝামাঝি অর্থাৎ জুলাইয়ে হঠাৎ তাঁর মাথায় কী এক বুদ্ধি চাপল, তিনি আকাদেমির সভ্য পদের জন্য প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। সে-সময়কার প্রতিপত্তিশালী সব সাহিত্যিকের কাছেই ব্যাপারটি তামাশা বলে মনে হয়েছিল।
লে ফ্ল্যর দ্যু মালের তৃতীয় সংস্করণ বের হওয়ার আগেই বোদলেয়ারের মৃত্যু হয়। এটিতে ভূমিকা হিসেবে লিখেছিলেন, ‘কোনো কোনো বিখ্যাত কবি, বহুকাল ধরে কাব্যজগতের পুষ্পল প্রদেশগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন। আমি কিন্তু পাপ থেকেই নিংড়ে বের করেছি সৌন্দর্য Ñ তাতে কৌতুক বেশি, আর দুঃসাধ্য বলেই তা অধিক প্রীতিকর। পরম নিষ্পাপ গ্রন্থ কোনো কাজে আসবে না কখনো। আমি এটি রচনা করেছিলাম আর কোনো উদ্দেশ্যে নয়, শুধু নিজের বিনোদন জোগাতে, আর দুরূহের প্রতি আমার তীব্র অভিরুচির তৃপ্তির জন্য।’
১৮৬২ সালের প্রথমদিকে মাদাম দ্যজয়ে নামে এক ভদ্রমহিলা প্যারিতে জাপানি শিল্পদ্রব্যের একটি দোকান খুললেন। সেখানে আড্ডা দিতে যেতেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী মঁনে, হুইসলার, গঁকুর ভ্রাতৃদ্বয় এবং সেইসঙ্গে যেতেন বোদলেয়ার। চিত্রশিল্পী মঁনের সঙ্গে ছিল বোদলেয়ারের গভীর বন্ধুত্ব। তিনি মঁনেকে প্রশংসা করে দুটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। মঁনের আঁকা ‘ললা দ্যু ভাসেঁল’ দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি একটি সনেট রচনা করেন। আর এই সময়টিতেই চিত্রশিল্পী মঁনে বোদলেয়ার এবং জান দ্যুভালের প্রতিকৃতি আঁকেন। বছরের শুরুতেই আরেকটি অঘটন ঘটেছিল, সেটা হলো Ñ লে ফ্ল্যর দ্যু মালের প্রকাশক ‘পুলে মালাসি’ দেনার দায়ে কারারুদ্ধ হন। বোদলেয়ার নিজেও এই প্রকাশকের কাছ থেকে পাঁচ হাজার ফ্রাঁ ঋণ নিয়েছিলেন। এদিকে বহু তিক্ততা ও অনর্থক উদ্বেগ ভোগের পর তিনি আকাদেমির সদস্য হওয়ার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন।
১৮৬৩ সালে সে-সময়কার নামকরা পত্রিকা ফিগারোতে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘আধুনিক জীবনের শিল্পী’ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু হচ্ছে ব্যঙ্গচিত্রকর কুস্তাঁত্যাঁ গি। এই প্রবন্ধটির জন্য সমালোচনা লিখলেন বুঁর্দ্যা, যিনি এর আগে লে ফ্ল্যর দ্যু মাল সম্পর্কে বিষোদ্গার করেছিলেন এই ফিগারো পত্রিকাতেই। একই সময়ে তিনি পাঁচ বছরের জন্য তাঁর লিপিকা প্যারি সপ্লিন বিক্রি করেন এক প্রকাশকের কাছে। সেখান থেকে কিছু ফ্রাঁ অগ্রিম হাতে আসে। এছাড়া পাঁচ খ-ের পো-র অনুবাদও প্রকাশক মিশেল লেভির কাছে দুই হাজার ফ্রাঁর বিনিময়ে পাঁচ বছরের জন্য বিক্রি করেন। যদিও এখান থেকে একটি কানাকড়িও বোদলেয়ার পাননি। সবই ঋণ শোধ করতে ব্যয় হয়ে যায়।
লা ফ্ল্যর দ্যু মালের প্রকাশক পুলে মালাসি দেনার দায় থেকে বাঁচার জন্য বেলজিয়ামে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণের সময় বোদলেয়ারও তাঁর সঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ-কারণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন, যাত্রার উদ্দেশ্য দেখান বেলজিয়ামের শিল্পকলা অধ্যয়ন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আবেদন নামঞ্জুর হয়। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। পরের বছর এপ্রিলে বহু চেষ্টা-চরিত্র করে বেলজিয়ামে পৌঁছান। প্রকাশক পুলে মালাসি ব্রাসেলসে বোদলেয়ারের জন্য বেশকিছু বক্তৃতা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। মোট পাঁচটি বক্তৃতা দেওয়ার কথা থাকলেও শ্রোতার অভাবে তিনটি বক্তৃতা দিতে পেরেছিলেন বোদলেয়ার। এতে আয় হয় সর্বসাকল্যে ১০০ ফ্রাঁ। ওই বছর তিনি ব্রাসেলসেই থেকে যান।
১৮৬৫ সালের জুলাইয়ে হঠাৎ একদিন আলুথালু বেশে মালপত্রহীনভাবে প্যারিতে এসে হাজির হন বোদলেয়ার। রেলস্টেশন থেকে বেরিয়েই দেখা হয়ে যায় তরুণ কবি কাত্যুল মাঁদেসের
সঙ্গে। রাতে একমনে বসে বসে কী যেন হিসাব করছেন দেখে মাঁদেস জানতে চান তিনি কী হিসাব করছেন। সেই প্রশ্নের উত্তরে বোদলেয়ার মাঁদেসকে জানালেন যে, তাঁর সারাজীবনের সাহিত্যের মূল্য, অর্থাৎ বিগত পঁচিশ বছর ধরে লেখালেখি করে তিনি রোজগার করেছেন মাত্র পনেরো হাজার আটশো বিরানব্বই ফ্রাঁ ষাট সঁতিম। রাত গভীর হলে বোদলেয়ারের কান্নার শব্দ শুনতে পান মাঁদেস। মাঁদেসের বাসায় রাত্রিযাপন করে ভোর হতে না হতেই একটি চিরকুটে ‘বিদায়’ কথাটি লিখে রেখে কিছু না বলেই হারিয়ে যান বোদলেয়ার।
আবারো ব্রাসেলসে ফিরে আসেন বোদলেয়ার। হাতে সময় কম বুঝতে পেরে সময় নষ্ট করলেন না। ১৮৬৬ সালে ব্রাসেলসেই প্রকাশ করলেন বেওয়ারিশ মাল কাব্যগ্রন্থটি। নতুন কবিতার সঙ্গে যোগ হলো পুরনো সেই দ-প্রাপ্ত ছয়টি কবিতা। ল্য পার্নাস কঁতেঁপরেন পত্রিকায় বের হলো আরো পনেরোটি কবিতা। যখন লে ফ্ল্যর দ্যু মালের তৃতীয় সংস্করণে হাত দিলেন, আবারো গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। সেই বছরের মার্চে প্যারিতে পাকাপোক্তভাবে ফিরে যাওয়ার মনস্থির করেন। কিন্তু অসুস্থতার জন্য ব্রাসেলসেই থাকতে হয় তাঁকে। অবস্থার যখন ব্যাপক অবনতি হলো, মায়ের কাছে চিঠি পাঠালেন। মাদাম ওপিক তাঁর দেখভাল করার জন্য প্রৌঢ় আইনজীবী আঁসেলকে বোদলেয়ারের কাছে পাঠান। আঁসেল খবর পাওয়ামাত্র ব্রাসেলসে ছুটে যান এবং বোদলেয়ারকে নার্সিংহোমে ভর্তি করান। সেখানে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে মাদাম ওপিক এসে ছেলেকে নিয়ে একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন। এখানে এসে বোদলেয়ার কিছুটা সুস্থ হলেন। পক্ষাঘাতে অচল বোদলেয়ার যখন কিছুটা সুস্থ হয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন, বন্ধুরা তখন চাঁদা তুলে ট্রেনের একটা কামরা রিজার্ভ করে ১৮৬৬ সালের ২ জুলাই বোদলেয়ারকে প্যারিতে ফিরিয়ে আনলেন। এখানে একটি নার্সিংহোমের নিচতলায় তাঁকে স্থায়ীভাবে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। তাঁর প্রিয় বইগুলো দিয়ে ঘর সাজানো হলো, দেয়ালে টানানো হলো প্রিয় চিত্রকর্মগুলো। ঘরের সামনেই একটি ছোট বাগান। মাঝে মাঝে একমনে তিনি সেদিকে তাকিয়ে থাকতেন। বন্ধুরা এলে তাঁদের কথা শুনতেন, কখনো কখনো হেঁটেও বেড়াতেন। চিকিৎসকরা আশা করেছিলেন তিনি আস্তে আস্তে সেরে উঠবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৮৬৭ সালের মে মাসে তাঁর অবস্থার চরম অবনতি হয়। নিজের নাম ভুলে গেলেন। চেহারা পর্যন্ত চিনতে পারতেন না। আয়নায় নিজের চেহারা দেখে অপরিচিত ব্যক্তি ভেবে অভিবাদন জানাতেন Ñ এমনই ছিল তাঁর অবস্থা। নিজেকে মাঝে-মধ্যে নের্ভাল ভেবে কথা বলার চেষ্টা করতেন। চুল আঁচড়াতেন না, দাড়ি কামাতেন না, শুধু দুহাত কোলের ওপর রেখে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতেন। জুনের প্রথম সপ্তাহে পুরোপুরি বিছানায় পড়ে গেলেন। এর পরের দু-মাস জ্ঞানহীন মুমূর্ষু অবস্থায় কাটল তাঁর। ওই বছর, অর্থাৎ ১৮৬৭ সালের ৩১ আগস্ট প্যারির সময় বেলা এগারোটায় ছেচল্লিশ বছর চার মাস বয়সে তিনি মায়ের কোলে মাথা রেখে ইহলোক ত্যাগ করেন।
সারাজীবন ধরে অপমানিত ও অবহেলিত বোদলেয়ার মৃত্যুর পরেও খুব বেশি সম্মানিত হননি। গির্জায় তাঁর পারলৌকিক কার্যকলাপ সম্পন্ন করার সময় একশ লোকও হয়নি। দোসরা সেপ্টেম্বর তাঁর সৎকারে বক্তৃতা করার জন্যও কাউকে পাওয়া যায়নি। এমনকি প্যারির সাহিত্য পরিষদ সংবাদ প্রকাশের জন্য একজন প্রতিনিধি পর্যন্ত পাঠায়নি।
১৮৬৭ সালের নভেম্বরে বোদলেয়ারের গ্রন্থগুলো নিলামে ওঠানো হয়। মিশেল লেভি পরবর্তী ৫০ বছরের জন্য মাত্র এক হাজার সাতশো পঞ্চাশ ফ্রাঁ দিয়ে সমগ্র রচনাবলি কিনে নেন।

শেষ কথা
আধুনিক নাগরিকজীবনের জটিলতাই ছিল বোদলেয়ারের কবিতার প্রধান বিষয়-আশয়। যা কিছু কবিতা নয় তা থেকে কবিতাকে মুক্তি দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ। তাই তিনি তাঁর কবিতাকে বাহুল্য বর্জন করে কবিতাসর্বস্ব করে তোলেন। আধুনিকতার পুরোধা কবি হিসেবে তিনি আজ সারাবিশ্বে সমাদৃত। বাঙালি কবিদেরও তিনি প্রভাবিত করেছেন। আধুনিকতার গতিপথকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন বোদলেয়ার।
তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি ও শব্দ, মিল ও অনুপ্রাস অমোঘ ও তীক্ষè। তাঁর মহৎ কীর্তি হলো, তিনি ক্ল্যাসিক ও রোমান্টিকের চিরাচরিত দ্বৈতকে লুপ্ত করে দিয়েছিলেন। আবেগের নিবিড়তম মুহূর্তেও উচ্ছ্বাসের কাছে ধরা দেননি। কবির ওপর সবসময় কবিতাকে স্থাপন করেছিলেন। তাঁর কাব্যে কোনো হেঁয়ালি নেই। তাঁর প্রতিটি কবিতা স্বপ্রতিষ্ঠ ও স্বতোদ্ভাসিত। বোদলেয়ারের সমগ্র কাব্যে যে-বাণী নিরন্তর ধ্বনিত হয়েছে তা হলো, ‘সকলে জানবে না, জানতে পারবে না বা চাইবে না; কিন্তু কবিরা জানুন।’ কবিরাই ঈশ্বর। পঙ্কে তাঁরাই ফোটাতে জানেন পদ্ম। জীবনের পঙ্কিলতার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে সুন্দর।
বলো আমাকে, রহস্যময় মানুষ, কাকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো;
তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা, অথবা ভগ্নিকে?
তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগ্নি Ñ কিছুই নেই আমার।
তোমার বন্ধুরা?
ওই শব্দের অর্থ আমি কখনো জানিনি।
তোমার দেশ?
জানি না কোন দ্রাঘিমায় তার অবস্থান।
সৌন্দর্য?
পারতাম বটে তাকে ভালবাসতে Ñ দেবী তিনি, অমর।
কাঞ্চন?
ঘৃণা করি কাঞ্চন, যেমন তোমরা ঘৃণা করো ভগবানকে।
বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ, কী ভালোবাসো তুমি?
আমি ভালোবাসি মেঘ … চলিষ্ণু মেঘ … অই উঁচুতে …
আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল!
(‘অচেনা মানুষ’, প্যারিস স্বপ্লিন, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)

২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল ছিল কবি বোদলেয়ারের ১৯৭তম জন্মদিন (মৃত্যু ৩১ আগস্ট, ১৮৬৭ র্যু দু দোম)। তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। ৎ

Leave a Reply

%d bloggers like this: