শিউলির বাবার শূন্যে উদ্যান

লেখক: রেজাউর রহমান

এক

ঢাকা শহরটা জেগে ওঠার আগেভাগে সূর্য এর স্বপ্নিল আভা উপরমুখী উঠে যাওয়া ইটপাটকেলের জবুথবু অথচ দাপুটে দালানকোঠার ওপরকার ঝুলন্ত আস্তরণের বাধাবিপত্তি এড়িয়ে সন্তর্পণে, অনেকটা যেন সস্নেহ পরশ বুলিয়ে এসে পড়তে থাকে, জমতে থাকে ধানম–র চিলতে লেকের পশ্চিম পাড়ের জবরদখল করা বেঢপ পস্নটে মাথা তুলে দাঁড়ানো বিল্ডিংয়ের চতুর্থতলার ঝুলবারান্দার শিউলির বাবার সযত্নে লালিত মাটির টবের নানা রঙের তরতাজা ফুলের পাপড়ি-পাতা-গাছগাছালির সমারোহে। খানিকটা ওপরের অর্কিডের ঝুলে থাকা সুচারু লতানো ডালপালার ছড়ায়ও।

আসন্ন পৌষের সকাল। শীত মাত্র জমতে শুরু করেছে আটঘাট বেঁধে। সকালি সূর্যের আলোতে সোনারং। এই সোনালি রোদের সকাল শিউলির যে বড় চেনা। তার বাবা এমনসব সকালেই উঠে যেতেন। খুন্তি-কাঁচি হাতে। শিউলি ধড়ফড়িয়ে উঠে বাবাকে প্রায়ই এক কাপ চা করে দিতে চাইতো।

বাবা সুখের হাসি হাসতেন।

‘পাগলি মেয়ে, রোদ আর একটু চড়ে গেলে শিউলি ফুলের রাতের জমা শিশিরের বিছানো নরম রেশ যে আর থাকবে না। উবে যাবে। রোদে ফুলচর্চা, গাছগাছালির যত্ন হয় না।’

একটু থেমে মৃদু হেসে আবার শিউলির বাবা বলেন, ‘বরং কাজ সেরে এসে নিশ্চিন্ত আয়াসে চা নিয়ে বসা যাবে। দৈনিক পত্রিকার পাতা খুলে ধরা যাবে। চোখের সামনে। আজগুবি অস্বাভাবিক সব ঘটনাপ্রবাহে। হত্যা-মৃত্যু … এই তো!’

বাবার বেশি আশকারা পাওয়া একমাত্র মেয়ে শিউলি বিরক্তি চেপে বলে ফেলতে ছাড়ে না।

‘তুমি কি সবকিছুতে আবছায়া-অন্ধকারই দেখো? আমাকে যে তুমি কোনো দিন ভালো করে দেখলে না?’

‘কেমন! শিশিরভেজা ফুলের মতো শিউলি মায়ের কোনো আবদার কি আমি সজ্ঞানে এড়িয়ে গেছি?’

‘হ্যাঁ গেছো। আমি যে তোমাকে এক কাপ করে দিতে চাইলাম। সাত-সকালে উঠে।’

‘আচ্ছা চা রেডি করো। আমি আসছি বলে।’

খুন্তি-কাঁচি হাতে এগিয়ে যেতে যেতে শিউলির বাবা আপনমনে বলে যেতে থাকেন,

‘গোলাপ-গন্ধরাজের আঙিনায় আমার যে বড় লোভ। আর ঝাউবনের ছন্দিল উপরমুখী উঠে যাওয়ার মহড়া থেকে আমি যে চোখ ফেরাতে পারি না।’

আজ শিউলির মনে পড়ে, বাবা সময় পেলেই বারান্দায় গিয়ে বসতেন। বসে একবার তিনি আকাশের রং দেখতেন। আর একবার ওপর থেকে চোখ নামিয়ে আনতেন তিনি। তিনি দেখতেন নিচের ক্রমেই সরু হয়ে যাওয়া লেকের জলজ পরিসর, যার এক অংশে কষ্টেসৃষ্টে ভেসে আছে কিছু পদ্মপাতা। সেখানে কালেভদ্রে ফোটে দু-চারটি তরতাজা পদ্মফুলও। তবে তা টিকে থাকেনি বেশিক্ষণ। লোকজনের চোখের আড়ালে নয়, উপস্থিত সবাইকে দেখিয়েই ছিনতাই হয়ে যেতো সেইসব জল থেকে খানিক উঠে থাকা ফুল সব। বিনষ্ট হয়ে যেতো পুরো জলজ-চত্বরটি। এ পরিস্থিতি হলে শিউলির বাবা বেশিক্ষণ সেখানে বসে থাকতে পারতেন না। হালকা মাথা নেড়ে সেখান থেকে উঠে যেতেন। তিনি তখন ভীত-সংকুচিত। শিহরিত। তিনি ভাবেন, এইমাত্র যেন নিষ্পাপ কোনো অপ্সরা সুন্দরী দানবীয় কারো চরম নিষ্পেষণের শিকার হয়ে গেল। জলজ ঢেউয়ের নিরন্তর চাপা কান্না হয়ে।

খানিক পরে আবার ফিরে এসেছিলেন শিউলির বাবা। শিউলিও ততক্ষণে চা-ক্র্যাকার্স হাতে তার পাশে এসে বসার সুযোগ পায়।  বাবা তখন বলেন, ‘মা তুমি একটু বসো। মাত্র গত সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার সময় গোলাপের চারাটা এনেছি। তা টবে একটু গুছিয়ে নিই।’

শিউলির রাগ তখন উপচে পড়ে।

‘তোমার তো ওই একটাই কথা। কাজটা একটু সেরে নিই। আমি প্রতিদিনকার ওই একই বাক্য শুনবো না আজ। তুমি নড়বে না একটুও। এই নাও চা। কোন সকাল থেকে খালি পেটে। আবার বলো, আজকাল মাঝে মাঝে পেটটা – না বুকটা জানি একটু একটু ব্যথা করে। ডাক্তার দেখানোরও সময় নেই তোমার।’

‘দে চা দে … পাগলি মেয়ে।’

সময় বাঁচানোর জন্য পিরিচে গরম চা ঢেলে মুখে তোলে শিউলির বাবা। আর হাসে।

‘শোন … পাগলি মেয়ে … লেকের পদ্মফুল যে লোপাট হয়ে যাচ্ছে সবার চোখের সামনে দিয়ে।’

‘তাতে তোমার কী?’

‘দায়টা আমার নয়তো কার? আমার চোখের সামনে দিয়ে সেই ডাকাতিয়া লোকজন যদি আমার শিশিরভেজা শিউলিকে উঠিয়ে নিয়ে যায় কোনোদিন?’

শিউলি বাবার কথা অনুসরণ করে হাসে। পরে রাগও হয়।

‘কেন, তোমার বাড়িতে কি জায়গার অভাব হয়েছে! তুমি কি চাও না, আমি থাকি তোমার এখানে। তোমার সঙ্গে সারাটা জীবন।’

‘আমি তো তাই চাই। কিন্তু তুই কি চিরকাল আমার এখানেই …। রাজপুত এসে গেলে তুই ঠিকই তার ইশারার জোয়ারের জলে ভেসে যাবি।’

শিউলির আজ মনে পড়ে, কিছুক্ষণ চুপ থেকে কেঁদে ফেলেছিল সে।

‘দেখো বাবা আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। জোয়ার-টোয়ার আমি বুঝি না।’

‘ঠিক আছে মা তোকে বুঝতে হবে না।’ বাবা পকেট থেকে রুমাল বের করে তার চোখ মুছিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন।

পিরিচে নয়, একটু সময় নিয়ে চায়ের কাপে চা শেষ করেন শিউলির বাবা।

‘হ্যাঁ কাপ-পিরিচ পাশে রাখো। বলো নতুন গোলাপ গাছের বয়ান।’

‘আমি সচক্ষে পড়িনি। ফুল-বিক্রেতার কাছে শোনা। সে বলল, পৃথিবীতে বছরপ্রতি চারশো থেকে পাঁচশো নতুন জাতের গোলাপ-সমন্তানের জন্ম হয়। গোলাপচাষিরা এগুলো তৈরি করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণে। তখন সেগুলো যায় ব্রিটিশ মিউজিয়াম বা অন্য কোনো ফুল-বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের কাছে। সেখানকার বিশেষজ্ঞ দল চুলচেরা বিশেস্নলষণ-বিন্যাস করে দেখে তখন। এ-ফুলটা নতুন জাতের, নাকি এতে কোনো ভেজাল-গুমর রয়েছে।

এটা আন্তর্জাতিক সর্বজনস্বীকৃত একটা প্রথা। ফুলওয়ালা আরো জানিয়েছে, বর্তমান বিশ্বে গোলাপ প্রজাতির সংখ্যা ৬,৫০০-এর মতো।’

শিউলি প্রায় চমকে ওঠে, ‘কী বললে … কত? আমি তো শুধু দেখি, লাল-সাদা-গোলাপি … এই তো।’

‘কেন এই যে তোমার এই ছোট্ট শূন্যের উদ্যানেই তো এর চেয়ে বেশি রকমের গোলাপ রয়েছে। কাল যে-কলমটা এনেছি সেটার ফুল ফুটলে দেখবে এর রং হবে সূর্যমুখীর মতো উজ্জ্বল হলদে।’

‘বাবা তুমি কী-সব অদ্ভুত কথা বলো?’

‘মা আরো অদ্ভুত লাগবে তোমার কাছে যেদিন দেখবে এই সূর্যমুখী গোলাপ ফুটে আছে ঠিক তোমার গায়ে-হলুদের দিনে …।’ বলে হা-হা-হা করে হাসতে হাসতে তাঁর গড়িয়ে পড়ার অবস্থা।

এমনসব নিরীহ আহ্লাদ-আবদারে, হাসি-তামাশায় ও অফুরান ভালোবাসায় ভরেছিল মেয়ে-বাবার জীবন-সংসার।

 

দুই

এমনি ধারায় চলতে চলতে কত কী ঘটে গেল এ-সংসারে।

দিনটি ছিল অনিয়মিত বন্ধের। শিউলির বাবা লেকের এপার-ওপারের কোনো সরকারি সংস্থার লাগানো বকুল, শিউলি, কৃষ্ণচূড়া, কদম, নিম আরো নানা জাতের গাছগাছালির দেখভাল, আদর-যত্ন করে সন্তুষ্টচিত্তে বাড়ি ফিরছিলেন। হাতে তার খুন্তি-নিড়ানি-কাঁচি। এ হাউজিং কমপেস্নলক্সের ঘোরানো সিঁড়ি ভেঙে তিনি উঠছিলেন তার চতুর্থতলার ফ্ল্যাট বরাবর। লিফট ধরে ওঠা তার অপছন্দ। চার সিঁড়ি ভেঙে পঞ্চম সিঁড়িতে পা দিতে গিয়ে কিনি কাত হয়ে পড়ে যান নিচে। দারোয়ান-সুপারভাইজার দৌড়ে এসে তাকে টেনে ওঠাতে গিয়ে সুবিধা করতে পারেনি। তার চোখ ততক্ষণে উলটে গেছে। ডান হাত তার বুকের বাঁ-পাশটায় চেপে ধরা।
বাঁ-হাতে তখনো সেই কাঁচি-খুন্তি।

সুপারভাইজার তৎক্ষণাৎ শিউলিদের বাড়িতে ফোন দেয়। শিউলির মা তেমন কিছু বুঝতে না পেরে নিজেকে সামান্য গুছিয়ে নিচে নেমে আসার আগেই গ্রাউন্ড ফ্লোরের একতলা-দোতলার বাসিন্দারা নেমে এসে তৎক্ষণাৎ শিউলির বাবাকে কাছের হাসপাতালে নিয়ে যায়। ইমার্জেন্সি ডিউটি ডাক্তার সামান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হতাশা প্রকাশ করেন।

‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। কিছু করার নেই।’ দুহাত ছড়িয়ে ডাক্তার বিনীত হয়ে চলে গেলেন।

কলেজের কী একটা উপলক্ষ ছিল। শিউলি ছোট চাচার ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরে দেখে ঘটনা অন্যরকম। ফোনে চাচা অতশত বলেননি তাকে।

এখানকার ময়মুরুবিবরা শেষকৃত্য কার্যক্রমের সুবিধার জন্য শিউলির বাবার মরদেহ গ্রাউন্ড ফ্লোরেই খাটলা সাজিয়ে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু মেয়ে-মায়ের কান্না-বিলাপে তারা মরদেহ তাদের ফ্ল্যাটে নিয়ে তোলেন। তারা তাকে জীবিতের মতোই সেবা-শুশ্রূষা, আদর-যত্ন করতে থাকে। সঙ্গে কান্না-বিলাপও চরম রূপ ধারণ করে। একপর্যায়ে শিউলি সেদিন জ্ঞানও হারিয়ে ফেলে।

দুপুরের পরপর শিউলিদের আত্মীয়স্বজন এসে যায়। এ পর্যায়ে শিউলি-শিউলির মায়ের অবস্থা দেখে ছোট চাচার নেতৃত্বে কতিপয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার তেমন বিশেষ কিছু থাকেও না। জানাজার সময় ও কবরস্থ করার স্থান-সময় এই তো।

আসরের নামাজের পর জানাজাশেষে খাটলাসহ শিউলির বাবাকে বনানী গোরস্তানে সমাহিত করার আগে নিয়ে এসেছিল তাদের হাউসে। শেষবারের মতো কাফনের মাথার মুঠি খুলে দেওয়া হয়েছিল। অনেকের সঙ্গে প্রায় কোলে তুলে আনা হয়েছিল শিউলি ও তার মাকে। তখন তারা কতদূর কী দেখল বোঝা গেল না। তাদের চোখ ছিল জলে ভরা বন্ধ, অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাদের কণ্ঠে ছিল ভাঙা গলার কান্নার রোল – মাতম। শিউলির মা মাথার চুল ছিঁড়ছিলেন। টেনে টেনে।

 

শিউলির বাবা ও তার ছোট ভাই সচ্ছল সংসারের আদর-আবদারেই বড় হয়েছিলেন। তাদের বাবা ঢাকায় চাকরি করতেন। বেসরকারি এক বাণিজ্য সংস্থায়। দুই ছেলেকে নিয়ে তাদের বাবা-মায়ের উচ্চাশা কম ছিল না। তাই বড় ছেলে যখন জুলদিয়ার মেরিন অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হলো তাঁরা খুশিই হলেন। মন্দ কি বড় ছেলে সাগর-মহাসাগরে ঘুরে বেড়াবে ধবধবে বিশাল সাদা জাহাজে। ভেসে ভেসে নোঙর ফেলবে নানা জানা-অজানা দেশে।

শিউলির বাবার এই সাগরমুখী নেশাটা পেয়ে বসেছিল ছোটবেলাতেই। সি-ক্ল্যাসিক পড়ে আর সিনেমা দেখে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন বিক্ষুব্ধ সাগরজলে ডিঙি চড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন অচেনা দ্বীপপুঞ্জে, অজানা লোকালয়ে।

মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে শিউলির বাবা বড় এক বিদেশি কোম্পানির চাকরি ধরে ফেলেন। প্রতিবছর তিনি ছুটিতে দেশে আসতেন। মা-বাবা-ভাইয়ের সঙ্গে সময় কাটিয়ে যেতেন। চতুর্থ বছরের মাথায় তিনি বিয়ে করেন। তার বাবা-মা তা ঠিক করে রেখেছিলেন। অমত করেননি শিউলির বাবা। বিয়ের চতুর্থ বছরে তাঁদের ঘরে আসে শিউলি। বছর-দশেক বিদেশ করে করে শিউলির বাবা দেশের মাটির টানে শুধু নয়, মেয়েটি যে বেড়ে উঠছে, সেই আবদার কি উপেক্ষা করার জো আছে বাবার?

শিউলির বাবা সাগরজলে ভেসে বেড়ানোর চাকরি ছেড়ে মেয়ের কাছে ফিরে আসেন। শিউলি যারপরনাই খুশি। তখন বাবার মনে হতে থাকে … এটাই জীবনের বড় পাওয়া।

দেশি এক শিপিং করপোরেশনে চাকরি নেন শিউলির বাবা। বাড়ি কিনতে গিয়ে জলের ধারে বাড়ি কেনেন। ধানম– লেকের পশ্চিম পাড়ে বাড়ি কিনে স্থায়ী হয়ে বসেন। শিউলিকে ঘিরে
সুখের-শখের স্বর্গ গড়ে তোলার উদ্যোগী হয়ে উঠতে থাকেন।

 

তিন

শিউলির বাবার চলে যাওয়ার পর প্রতিদিন এলেও চারদিনের মাথায় ছোট চাচা সকাল সকাল আসেন। শিউলির মা তখন তাদের বিছানার জায়নামাজে উপুড় হয়ে পশ্চিমমুখী। ছোট চাচা তখন শিউলির খোঁজ করেন। সে তখন তাদের ফ্ল্যাটের ঝুলবারান্দায়। তার বাবার লাগানো টবে সদ্য ফুটে থাকা একটা টকটকে লাল গোলাপে গাল চেপে ধরে বিড়বিড় করে কথা বলছে, ‘বাবাগো আমারে রেখে তুমি কেমন করে চলে গেলা? কিছু না বলে … তোমার গাছগুলি যে দিব্যি আছে। সকালের সূর্যের আলোয় যে হাসছে … খেলছে … দোল খাচ্ছে।’ শিউলির দু-চোখ বেয়ে তখন জল গড়িয়ে নামে।

চাচা শিউলিকে টেনে কোলে তুলে নেন। তাঁর চোখও অশ্রম্নসিক্ত হয়ে ওঠে। ফুলপাগল, গাছপাগল, জঙ্গলপাগল বড়ভাইয়ের চেহারাটা তাঁর চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে থাকে। শিউলিকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্যই চাচা ভেজা গলায় বলে যান।

‘মা … বুয়া বলল, তুমি সকাল থেকে কিছু খাওনি। দশটা-এগারোটা বেজে গেল … অসুখ-বিসুখ হয়ে যাবে। তোমাকে তো কলেজে যেতে হবে … বাবার স্বপ্ন …।’

‘চাচু … আমার স্বপ্ন এখন একটাই।’

‘কী?’ চাচা আগ্রহী হন।

‘বাবার এই ঝুলবারান্দায় বসে বসে সময় কাটিয়ে দেওয়া। বাবার হাতে লাগানো ফুলের সঙ্গে। গাছের সঙ্গে। বাকি জীবন …।’

চাচা ধরে নিলেন শিউলিকে এই মর্মান্তিক মানসিক শক থেকে সরিয়ে আনতে হলে তার লাইনেই কথা বলতে হবে। আপাতত এর যে বিকল্প নেই।

‘তোমার বাবার হাতে লাগানো গাছ কয়টা আর তুমি লাগিয়েছ কয়টা?’

কান্নায় ভেঙে পড়ে শিউলি জানায়, ‘আমি আর গাছ লাগালাম কবে? সব তার লাগানো। ওই যে দেখছেন ব্যালকনির কোনায় তার খুন্তি-কাঁচি।’

আঁচলে চোখ মোছে শিউলি।

‘তাঁর বাগান কি শুধু এটুকুই? না, ওই যে লেকের দুপাড়ে যত গাছ … সরকারি-বেসরকারি সংস্থার লাগানো … সে মনে করত সব তার গাছ। এগুলোর ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব সে নিজে থেকে হাতে নিয়ে নিয়েছিল।’

এটুকু বলতে পেরে সে আবার ডুকরে কেঁদে ওঠে।

‘এটাই তো কাল হলো তার। সূর্য ওঠার আগে খুন্তি-কাঁচি হাতে বেরিয়ে যেত। প্রতিটা গাছের সুবিধা-অসুবিধা দেখে … লেক থেকে পানি টেনে তুলে গাছে গাছে তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তবে বাড়ি ফিরত … সিঁড়ি ভেঙে, লিফটে চড়ে নয় …।’

আবার সশব্দে কেঁদে ওঠে শিউলি।

প্রসঙ্গ পালটানোর চেষ্টা করে ছোট চাচা।

‘কয়টা টব? সবই কি গোলাপ?’

‘হ্যাঁ ফ্লোরে আছে ১৭টি টব। সব গোলাপ। নানা রঙের। নানা জাতের। এর মধ্যে একটি আবার নতুন আমদানি। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আনা। সূর্যমুখী গোলাপ। এতে ফুল হয় মাত্র দুটি। আর ওপরের দুই সারিতে ঝোলানো আছে নানা জাতের অর্কিড।’

‘অর্কিডগুলোর কয়েকটাতে ফুল এসেছে। ফুলগুলো সুন্দর তরতাজা … হালকা রঙের।’

‘অর্কিডের নাম বাবা প্রায়ই আমাকে বলত। আমি যে নাম মনে রাখতে পারিনি। তখন সিরিয়াসলি নিইনি। এখন কে আর বলে দেবে এসবের নাম?’

‘নাহ্, তুমি চিমন্তা করো না। আমি অর্কিড ম্যানুয়াল জোগাড় করে দেবো। তুমি ফুল দেখে … গাছের গঠন-আকার বুঝে চিনে নিতে পারবে। অসুবিধা হবে না।’

শিউলিকে শান্ত দেখায়।

‘মা আমার যে বড় খিদা পেয়েছে। চলো না সামান্য কিছু মুখে দেই।’

শিউলি তারপরও কিছুক্ষণ ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে চাচার সঙ্গে পা বাড়ায়।

পাকের ঘর থেকে বুয়া দৌড়ে আসে।

‘মা-শিউলি, তোমার বাটার টোস্ট টেবিলে ঢাকা। লেমন-টি করে দিচ্ছি।’

সময় নিয়ে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে মাকে ডাকতে যায় শিউলি।

বাবার জায়গায় তার আপন ছোট ভাই। একমাত্র ভাই। তার গা ঘেঁষে বসে থাকে শিউলি। দুপুর অবধি যেন কিছুটা বাবার সান্নিধ্য … দূর থেকে ভেসে আসা বাবার গায়ের গন্ধ পায় সে।

 

দুপুরের আগে থেকে দু-একজন করে আত্মীয়স্বজন আসতে থাকে।

তাঁরা দুপুরের নামাজ সারেন ড্রয়িংরুমে। দুপুরে খেতে বসলে শিউলিকে চাচা তার পাশে বসান। ছোট চাচি শিউলির কাঁদতে         থাকা মাকে অনেক কাকুতি-মিনতি, জবরদস্তি করে প্রায় টেনে নিয়ে আসেন খাওয়ার টেবিলে। শিউলি উঠে এসে মায়ের কাছে বসে। শিউলি হয়তো মায়ের জন্যই পেস্নটে সামান্য কিছু ভাত মেখে নিজে মুখে দেয়। মায়ের মুখেও তুলে দেয় দু-এক লোকমা। মা মেয়ের বিষণ্ণ-অবসন্ন চেহারার দিকে চেয়ে কিছু একটা না খেয়েও পারেন না।

আসরের নামাজের পরপর আত্মীয়স্বজন সবাই উঠে পড়ে। তারা বনানী গোরস্তানে যাওয়ার জন্য তৈরি হন।

ছোট চাচা শিউলির কাঁধে সস্নেহ হাত রাখেন।

‘মা কাপড়টা বদলে আয়।’

‘কেন … কোথাও যাচ্ছো তোমরা?’

‘আজ যে চৌঠা … বাবার মৃত্যুর চারদিন … আজ তোমার বাবার মাজার জিয়ারত করতে যেতে হবে। সে তো সাধারণ লোক ছিল না। গাছপাগলা, বৃক্ষপ্রেমিক-ফুলপ্রেমিক এক লোক … লোক তো নয়। বরং বলতে হয় সন্ন্যাসী। সেখানে গেলেও মানুষের সওয়াব হবে। যাও তৈরি হয়ে নাও।’

শিউলি বেঁকে বসে। ‘না চাচা, আমি সেখানে যেতে পারব না। সে আমায় ছেড়ে গেল কেন? আমাকে কিছু না বলে …।’

‘অভিমানী পাগলি … তোর কথাও ঠিক। তবে কি-না অতি আপনজনদেরও যে এ-সময়ে যেতে হয়। না গেলে …।’

‘না চাচু, আমি যাব না।’

অন্যদিকে শিউলির মায়ের অবস্থা আরো নাজুক। আরো নড়বড়ে। ছোট চাচির কাঁধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ান। তাদের শোয়ার ঘরের দিকে হেঁটে যান। ছোট চাচি শিউলির মাকে কোনো রকমে গুছিয়ে নিয়ে বের হতে কিছুটা সময় লাগে। প্রায় সবাই নিচে গেলেও শিউলি অনড়। সে যাবে না। ছোট চাচাকে তার একটাই প্রশ্ন, ‘তাদের কাউকে কিছু না বলে চলে গেল কেন বাবা?’ এ পর্যায়ে চাচা দেখলেন, আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। অভিমানী মেয়ে যাবে না।

রাস্তা ধরে হাউজের গ্যারেজ পর্যন্ত চারটি গাড়ি তৈরি হয়েছিল। দূরের রাস্তা। ধানম– থেকে বনানী। পথে জ্যামে পড়ার ভয়। ছোট চাচার গাড়িটা এ-গ্যারেজেই রেখেছিলেন। কেননা, শিউলির মায়ের অবস্থাটা যে চলনশীল নয়। ছোট চাচা তার গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করেন। তিনি গাড়ির দরজা খুলে লিফটের কাছাকাছি অপেক্ষা করছিলেন। লিফট নিচে এসে খুলে গেলে ছোট চাচি শিউলির মাকে জাপটে ধরে গাড়ির পেছনের সিটে বসে পড়েন। চাচা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কমপেস্নক্সের চত্বর ছেড়ে রাস্তায় নামেন। তখন চাচা দেখেন, সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে শিউলি নামছে আর চিৎকার করছে। হাতে তার ফুল।

‘চাচা দাঁড়ান … আমি আসছি। একটু দাঁড়ান।’

ছোট চাচা খুশি হন।

‘আস মা … আস। এই তো লক্ষ্মী মা …।’

শিউলি এগিয়ে আসে। চাচা গাড়ির সামনের দরজা খুলে ধরেন।

‘না চাচা, আমি যাব না। শুধু এই গোলাপ দুটি তাঁর মাথার কাছে রেখে দিয়ে বলবেন, তুমি তো তোমার শিউলিকে ভালোবাসনি কোনোদিন। ভালোবেসেছো ফুলকে-গাছকে। তুমি জেনে রেখো … আমি প্রাণ দিয়ে হলেও তোমার হাতে লাগানো ফুল আর গাছ বাঁচিয়ে রাখব। তুমি নিশ্চিমেত্ম ঘুমাও।’

তারপরও চাচা মিনতি জানায়।

‘গাড়িতে বস …। একটু দেখে আসি … তোর বাবাকে।’

‘না চাচু, আমি যাব না।’

মা শিউলির বাবাকে হারিয়ে তার কথা বলে খুব বেশি কাঁদতেও পারেননি তেমন। তবে কেঁদেছেন মেয়ের কথা ভেবে। মানুষটা এমন সময়ে চলে গেল যখন মেয়ে-বাবার জীবিত থাকাটা যে বড় দরকার ছিল। শিউলির বয়স বাড়ছে। নানামুখী সামাজিকতার প্রয়োজন হবে। এ-কাজ কি অন্য কাউকে দিয়ে হয়? আশপাশের দু-চারজনও তাই বলে।

 

চার

শিউলিদের বাড়ির পরিবেশের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। মাসছয়েক কেটে যাওয়ার পরও। শিউলি কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তার বন্ধুরা একাধিকবার এসে ফিরে গেছে। কাজ হয়নি। তাদের সঙ্গে দু-চারটা কথা বলে সে বাবার ঝুলবারান্দায় সাজানো গাছগাছালির দিকে চলে গেছে আনমনা হয়ে। একে একে বন্ধু-বান্ধবীরাও আসা-যাওয়া ছেড়ে দেয়। শেষমেশ একজনই টিকে রইল। কাঁকন বালা সেন। সে বিবাহিত হয়েও ধরে রেখেছে লেখাপড়া। সে কলেজ থেকে ফেরার পথে সময়-সময় শিউলির সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটিয়ে যায়।

মায়ের অনুরোধে ছোট চাচা শিউলির বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে থাকেন। মা এছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখছেন না। এ-কথাটা নিয়ে তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গেও পরামর্শ করেন। দিনতিনেক পরে ছোট চাচি জানান, ‘আজ রবীনদের বাড়ি গিয়েছিলাম।’

‘রবীন জানি কে?’

‘ও মা তোমার দেখি কিছুই মনে থাকে না আজকাল। আমার ফুফাতো ভাই … ব্রিলিয়েন্ট স্টুডেন্ট। বিসিএসে খুব ভালো করেছে। ফরেন সার্ভিসে সিলেকশন পেয়েছে।’

‘তাই … ভেবে দেখি … কিন্তু শিউলিকে যে ম্যানেজ করা এক সমস্যা।’

একটু থেমে আবার চাচি বলেন, ‘সমস্যা একটাই …।’

‘মানে?’

‘মানে তাদের পারিবারিক অবস্থা তেমন না।’

‘কী রকম?’

‘রবীনের বাবা অবসরে গেছেন। মালিবাগে থাকেন। ভাড়া বাড়িতে। ছোট বোনটাও লেখাপড়া তেমন করেনি। কার সঙ্গে জানি ভেগে গিয়েছিল। ফিরে আসেনি।’

ছোট চাচা বিরক্ত হন।

‘দেখো … এসব গ্রাম্য কেচ্ছা আমাকে শোনাবে না। ছেলের বাড়ি নেই তো কী হয়েছে? মেয়ের তো আছে।’

‘তা ঠিক।’ ছোট চাচি থেমে যান।

সেদিন অফিসশেষে ছোট চাচা শিউলিদের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। শিউলিদের বাড়ির লিফট থেকে কাঁকন নেমে এলে ছোট চাচার মুখোমুখি পড়ে যায় সে।

সে নমস্কার জানিয়ে চলে যাচ্ছিল। তখন ছোট চাচার মাথায় হঠাৎ করেই একটা বুদ্ধি খেলে যায়। তিনি ভাবেন, মেয়েটা শিউলির ভালো বন্ধু। একাধিকবার তার সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ও হয়েছে এ-বাড়িতে। তাকে যদি কোনো কাজে লাগানো যায়?

কাঁকনকে তিনি পেছন থেকে ডাকেন।

‘শোনো … কোন দিকে যাবে তুমি?’

‘রায়েরবাজার।’

‘আমিও তো ওদিকেই যাবো। আমি তোমাকে পৌঁছে দেবো। … তোমার সঙ্গে আমার কিছু আলাপ করতে পারলে ভালো হতো।’

‘কী আলাপ কাকাবাবু।’ কাঁকন ঘুরে দাঁড়ায়।

ছোট চাচা সরাসরি প্রসঙ্গে চলে যান।

‘দেখো, কাঁকন, মেয়েটার কষ্ট আর ভালো লাগে না … সইতে পারছি না। তোমার কি মনে হয় … আমরা ওর জন্য কিছু করতে পারি?’

কাঁকন খানিক সময় নেয়।

‘কাকাবাবু আপনি কি শিউলির কথা বলছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘আমিও কাকাবাবু ওকে নিয়ে চিন্তিত … যেভাবে সে ডিপ্রেশনের দিকে যাচ্ছে … আমার ভয় হয়।’

‘তোমার কি মনে হয় আমরা তার বিয়ের কথা ভাবতে পারি?’

‘আমিও মাঝে মাঝে তাই ভাবি। আমি অলকেশের সঙ্গে এ-ব্যাপারে আলাপও করেছি। স্কুল-কলেজ-বন্ধু-বান্ধব ছেড়ে দিয়ে একেবারে …।’

‘তাই তো। তুমি তো বিয়ে করেছো?’

‘হ্যাঁ কাকাবাবু … একটু কম বয়সেই …।’

‘না কম বয়সে কি আবার, এটাই তো বিয়ের বয়স।’

ছোট চাচা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।

‘কাঁকন মা তোমার জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলো। একটু চেষ্টা  করো না … প্লিলজ।’

‘আচ্ছা দেখি কাকাবাবু … অলকেশের সঙ্গে কথা বলব … কিছু করা যায় কি না।’

‘না … না … একটু অপেক্ষা করো। আমি তোমাকে পৌঁছে দেবো।’

‘না কাকাবাবু আজ আসি।’

 

তিনদিন পর বিকেলবেলা কাঁকন আসে অলকেশকে নিয়ে। ওপরের দৃশ্য একই। শিউলি তাদের ঝুলবারান্দায়। চুপচাপ মোড়ায় বসে। চারপাশে তার বাবার হাতে লাগানো গোলাপের টব। তরতাজা সব। যত্নের ছাপ।

কাঁকনের প্রথম ডাকে সে উত্তর দেয়নি। অগত্যা তাকে পস্নল্যানমাফিক বলতেই হয়, ‘শিউলি, অলকেশ এসেছে।’

শিউলি এবার উঠে দাঁড়ায়।

‘মানে!’ আশ্চর্য হয় সে।

‘মানে আমার জামাই এসেছে। তার সঙ্গে তো তোর দেখা হয়েছে। তাই না?’

শিউলি বিড়বিড় করে।

‘হবে হয়তো …’

শিউলি তার কিছুদিনের স্বভাবসুলভ ঘোর কাটিয়ে বারান্দা থেকে বের হয়।

কাঁকন ভাবে, এমনটাই চাইছিলাম।

শিউলি এসে তাদের মুখোমুখি বসে।

শিউলি বুয়াকে ডাকে।

‘মাকে ডেকে আনো। মেহমান এসেছে। চা বসাও।’

কিছুক্ষণ এ-কথা সে-কথা … হালকা গল্প-গুজবের পর কাঁকনই কথাটা পাড়ে।

‘আমরা বেরিয়ে ছিলাম বাইরে কোথাও খাব বলে। আমাদের দ্বিতীয় বিবাহ-বাসর আজ।’ কাঁকন সলজ্জ হাসে।

শিউলি ফ্যালফ্যাল করে তাদের দিকে চেয়ে থাকে। যেন তাদের কথা বুঝতে পারেনি সে।

‘আপনিও চলুন … শুধু দুজনে কেমন দেখায়।’ অলকেশ তাকে আমন্ত্রণ জানায়।

‘চল শিউলি, অলকেশ এমন করে বলছে … আমারও ভালো লাগবে।’

ততক্ষণে মা মাগরিবের নামাজ সেরে এ-ঘরে আসেন। তাদের কথোপকথন শোনেন খানিক। মা সজাগ হন।

‘যা না … ঘুরে এলে ভালো লাগবে। সারাদিন বাড়িতে। একা একা …।’

মায়ের মুখে ‘একা একা’ কথাটা যেন শিউলিকে খানিকটা ভাবালু করে। বিচলিত করে।

তার তখন মনে পড়ে যায় বাবাকে। সেই মানুষটিই তো তার চারপাশ, সব কুল ভরিয়ে রেখেছিল। কী থেকে কী যে হয়ে গেল? নিজেই নিজের কাছে সে এক সমস্যা হয়ে উঠেছে। মায়ের জন্যও তার কষ্ট হয়। দুঃখ বাড়তে থাকে। অথচ তার চারপাশের সবই যে ঠিকঠাক আছে। দিব্যি আছে কাঁকন-অলকেশ, তার অন্য সব বন্ধু। শুধু সে-ই …।

ব্যাপারটা কাঁকন যেন আন্দাজ করতে পারে। এটাই ভালো সময়। ‘মানুষের সঙ্গে দু-চারটা কথা বললেও তো ভালো লাগে। মন হালকা হয়। সময় ভালো কাটে। চলো আমাদের সঙ্গে।’

শিউলির কাছে যে কথাগুলো নতুন তা নয়। তবে তার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কাঁকন অলকেশকে একসঙ্গে দেখে তার খানিক মানসিক পরিবর্তন হয়। সে ভাবে, তারা তো বেশ আছে। হেসেখেলে, ঘরসংসার করে দিন কাটে তাদের। তার দিন যে কেমন কাটে তা সে অনুভব করে। তার চারপাশ যেন দুর্ভেদ্য এক পর্দায় ঢাকা।

মা তাদের চা এগিয়ে দিতে গিয়ে আবার তাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেন।

‘যা-না মা … তারা দূর থেকে পস্নল্যান করে এসেছে। একসঙ্গে খাবে। কত ভালো বন্ধু তোর। তাদের অনুরোধ …।’

হঠাৎ করে শিউলি নিয়ন্ত্রণহারা হয়েই যেন মুখ খোলে, ‘তোরা কোথায় খেতে যাবি?’

‘কেন তোদের বাড়ির কাছেই তো রেসেন্তারাঁ … অনেক হোটেল। দেশি-চাইনিজ-কাবাব হাউস। তোদের বাড়ির পরের রাস্তায় তো সব। সাতাশ নম্বর রোডে।’

‘কাবাব-টাবাব বাবা আমার ভালো লাগে না।’

‘তাহলে চাইনিজ … জিনডিয়ান রেসেন্তারাঁই ভালো এ-এলাকায়।’

‘কাপড় বদলাতে হবে আবার।’

‘নাহ … তোকে তো এমনি সুন্দর লাগছে।’ কাঁকন উঠে দাঁড়ায়।

মায়ের মুখে হাসি ফোটে। ইশারা-ইঙ্গিতে কাঁকনকে তিনি উৎসাহ দেন।

‘যাও মা তোমরা। যাও, আলস্নলাহ ভরসা।’

 

 

পাঁচ

ধানম– ১৫ ছেড়ে গলিমুখের মাথায় সদা ব্যস্ত, সদা জ্যাম লাগা ২৭ নম্বর সড়ক। এ-রাস্তার সামান্য পশ্চিমমুখী হেঁটে গেলেই জিনডিয়ান চাইনিজ রেসেন্তারাঁ। কাঁকন এগিয়ে যায়। শিউলি অলকেশ তার পেছন পেছন। তারা রেসেন্তারাঁর দোতলায় উঠে গেলে শিউলি টানা কাচের পাশের খোলামেলায় বসে। চারপাশ আলোকিত। সড়কের চলন্ত গাড়ি-ঘোড়া-রিকশা মানুষের ব্যস্ততা। শিউলি কাঁকনের দিকে চেয়ে হাসে।

‘কতদিন হবে মনেও পড়ছে না ছাই, বাড়ি ছেড়ে বের হইনি।’

কাঁকন-অলকেশও হাসে। প্রশান্ত হয়ে। তারা তাদের পস্নল্যানমাফিক আপাতত সফল। শিউলির ছোট চাচা তো এতটুকু সাহায্যই চেয়েছিলেন তার কাছে।

তারা খাবার অর্ডার করার প্রস্ত্ততি নেয়। মেন্যু বুক হাতে তুলে নেয়। হঠাৎ করে শিউলি বেশি তৎপর হয়ে ওঠে।

‘আমি কিন্তু চিকেন কর্ন সুপ খাব। থাই সুপও ভালো। তবে একটু ঝাল।’

কাঁকন আরো খুশি হয়। ‘তাই হবে। আর …?’

‘স্মোকড সিস্নপার ফিশ …।’ তখন শিউলির মনে পড়ে, সে যে সঙ্গে টাকা নিয়ে আসেনি। সে থেমে গিয়ে খানিক লজ্জিত হয়।

‘কাঁকন মস্ত একটা ভুল হয়ে গেছে।’

‘কী?’

‘খালি পকেটে দৌড়ে চলে এসেছি।’

অলকেশ আমুদে হয়ে ওঠে।

 

‘তুমি আজ আমাদের গেস্ট। আমরা না তোমাকে নিয়ে এলাম। বরং তুমি আমাদের একদিন খাইয়ে দিও … কেমন?’

‘অবশ্যই।’

তারা সুপসহ আরো কিছু অর্ডার করে। সুপ এসে যায়। শিউলি বাটিতে সুপ তুলে নিতে তৎপর হয়। আর তখনই তার ছোট চাচা-চাচি ও আর একজন অপরিচিত ছেলে তাদের টেবিলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে যায়। হাসতে হাসতে চাচি বলেন,

‘কী আশ্চর্য … কী সৌভাগ্য আমাদের। এমনভাবে দেখা হয়ে যাবে তো ভাবিনি।’

শিউলি উঠে দাঁড়াতে চায়। চাচা বাধা দেন।

‘দাঁড়াতে হবে না। আমরাও তোমাদের পাশের টেবিল দখল করে বসছি। ক্ষুধায় আমার পেট চোঁ-চোঁ করছে।’

পাশের টেবিলে বসতে বসতে শিউলির আড়াল থেকে ছোট চাচা হাসিমুখে কাঁকনকে মুষ্টিবদ্ধ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান।

তারাও মেন্যু দেখে খাবারের অর্ডার করে। এ-ব্যাপারে তাদের সঙ্গে তৃতীয় যুবক ছেলেটিই বেশি তৎপর হয়ে রইল।

শিউলি-কাঁকনের দল খাবারের পর্ব শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। পাশের টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। ‘কাকা আমরা আসি। রাত বাড়ছে।’

‘তা যাও … তোমরা তো যাবে রায়েরবাজারের দিকে। শিউলি? তার পথ-তো উলটো। তোমরা বরং যাও। শিউলিকে আমি পৌঁছে দেবো।’

শিউলি হালকা আপত্তি করতে গেলে চাচা তাকে টেনে তার পাশে বসান।

কাঁকন-অলকেশ সফলতার হাসি ছড়িয়ে চলে যায়।

শিউলির চাচার পাশে গা-লাগা চেয়ারে বসেছে অপরিচিত যুবক ছেলেটি।

ছোট চাচা ছেলেটির সঙ্গে শিউলিকে পরিচয় করিয়ে দেন।

‘ও রবীন … তোমার এক ভাই। চাচির ফুফাতো ভাই …। সে বিসিএস দিয়ে ফরেন সার্ভিস পেয়েছে। চলে যাবে বিদেশ।’

রবীন মুখে চিকেন রোস্ট তুলে নিয়ে মিষ্টি হাসে।

‘আপনিই শিউলি … আপনার কথা অনেক শুনেছি। দেখা হয় নাই।’

চাচি তৎপর হয়ে ওঠেন।

‘দেখা হয় নাই। এখন হবে … দেখা-সাক্ষাৎ যখন একবার হয়েছে।’

শিউলি খানিক লজ্জা-নম্র হয়। মাথা নুইয়ে নেয়।

কিছুটা সময় পরে সবাই ওঠে।

শিউলিদের গেটের সামনে গাড়ি থামে। ছোট চাচা গেট খুলে ধরলে শিউলি নামে। নামেন চাচিও।

‘কই রবীন নামো … এসেই যখন পড়েছি, বড় ভাবিকে একবার সালাম না দিয়ে যাই কেমনে?’

চাচা তাতে সমর্থন দেন।

সবাই লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শিউলি ঘোরানো সিঁড়ি ধরতে পিছিয়ে যায়।

‘আপনারা ওঠেন। আমি আসছি।’

লিফটে চড়ে চাচা সবাইকে শুনিয়ে বিড়বিড় করেন।

‘বেচারীর বাবাও লিফটে চড়তেন না! সিঁড়ি ধরে উঠতেন আর সেই সিঁড়িতেই তার কাল হলো।’

রবীন কৌতূহলী হয়ে শোনে।

চারতলায় উঠে সবাই শিউলির মায়ের ঘরের দিকে হাঁটে। মা দেরিতে এশার নামাজ পড়ে উঠে দাঁড়ান। কিছুটা আশ্চর্য হন।

‘কী গো, তোমরা সবাই একসঙ্গে কোত্থেকে?’

ছোট চাচা এগিয়ে আসেন।

‘এই চাইনিজ খেতে এসে শিউলির সঙ্গে দেখা। ভাবলাম, কাছে যখন এসে পড়েছি আপনাকে সালাম করে যাই। এই রবীন … ভাবিকে সালাম করো।’

রবীন নিচু হয়ে শিউলির মাকে পা ছুঁয়ে সালাম করে।

চাচি তার পরিচয় দেন।

‘ও … আমার আপন ফুফাতো ভাই। কিছুদিনের মধ্যে সরকারি চাকরি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে।’

ছোট চাচা এই পর্ব আর লম্বা করলেন না।

‘ভাবি রাত হয়েছে, আমরা আসি।’

‘এটা কেমন দেখায়। শুধু তোমরা এলে না হয় কথা ছিল। এলে ছেলেটাকে নিয়ে … কিছু মুখে না দিয়ে …।’

তারা আর দেরি করেনি; চলে যায়।

পরের দিন ছেলেমেয়েকে স্কুলে দিয়ে চাচি সরাসরি শিউলির মায়ের কাছে চলে আসেন। শিউলি তখন ঝুলবারান্দায়। টবে সাজানো গোলাপ বাগিচায়।

মায়ের ঘরে বসে চাচি চা খেতে খেতে সরাসরি কথাটা পাড়েন।

‘রবীনকে কেমন লাগল ভাবি?’

‘ভালোই তো।’ মা কৌতূহলী হন।

‘আমি শিউলির কথা ভাবছিলাম।’

মা যেন আকাশ থেকে পড়েন। যথেষ্ট আগ্রহী হয়ে সব শোনেন তিনি।

‘তোমার ভাই … এখানে দেখার তো খুব কিছু নেই। সম্ভব হলে …। আর আমি যে বিপদগ্রস্ত। বাবা থাকলেও না হয় একটা কথা ছিল।’

‘শিউলির চাচাও তাই বলেন।’

ছেলেমেয়েদের স্কুল ছুটির সময় ধরে চাচি চলে যান।

বিকেলের পরপর আসে কাঁকন। ছোট চাচা ও সে পরামর্শ করেছে। চাচা জানিয়েছেন, ‘গতকালের ঘটনার পর আমি ধরে নিলাম … তুমিই পারবে এ-কাজ। শিউলি-রবীনের জুটিটাও বাঁধতে তোমাকে এগিয়ে যেতে হবে।’

কাঁকনকে পেয়ে শিউলি খুশি হয়।

‘কী করছিলে?’

‘কেন ওই বাগানে একটু …।’

‘কলেজ ছেড়েছো, বন্ধুবান্ধব ছেড়েছো … এভাবে কি জীবন কাটবে তোমার?’

শিউলি মাথা নুইয়ে থাকে।

‘চা খাবি?’

‘হ্যাঁ খাবো। কিন্তু আমার কথার তো জবাব দিলি না।’

‘কী জবাব দেবো?’

কাঁকন হাসে।

‘জবাব দিবি … আমার বন্ধুবান্ধব লাগবে। আমি সমাজের আচার-কানুন মেনে চলব ইত্যাদি।’

‘সমাজের আচার-কানুন আবার কী?’

‘এই ধর, ভালো বন্ধু … বিয়েশাদি।’

এবার শিউলি রসিকতা করে।

‘মানে আমাকেও তোর মতো অলকেশ জোগাড় করতে হবে?’

‘একজাক্টলি।’

‘কিন্তু সঠিক অর্থে অলকেশ পাওয়াটা কি খুব সহজ?’

‘আমার তো মনে হয় সহজই। তোর আশপাশেই তো ঘুরে বেড়াচ্ছে সেসব মানুষ।’

‘কেমন?’

‘ওই যে রবীন।’

‘কী বলে?’

শিউলি চা করে আনতে চলে যায়।

শিউলি চায়ের ট্রে নিয়ে এলে কাঁকন তার পস্নল্যানমাফিক ঠিক করে এ-বিষয়ে আজ আর কিছু বলবে না শিউলিকে। বিগড়ে যেতে কতক্ষণ। তাই অন্য প্রসঙ্গ পাড়ে।

‘তোর মায়ের শরীরটা কেমন যাচ্ছে?’

‘ভালো … মোটামুটি ভালোই তো দেখি।’

‘তবু … আমার মনে হয় তোর কাকাবাবুর সঙ্গে প্রোগ্রাম করে একটা থরো চেকআপ করা দরকার। বয়স তো হয়েছে।’

‘তা ভালো বলেছিস। দেখি …।’

চা-ঝালমুড়ি শেষ করে কাঁকন ওঠে। ‘আজ আসি … দেরি হয়ে গেছে।’

‘আবার কবে আসবি?’

এবার কাঁকন একটু কৃত্রিম রাগ দেখায়।

‘শুধু আমাকেই আসতে হবে তোদের বাড়িতে! আমার কি বাড়িঘর নাই?’

শিউলি লজ্জিত হয়।

‘কেন আমিও যাবো।’

‘কবে আসবি?’

‘যখন বলবি।’

‘তাই … তাহলে আগামী পরশু আয়। আমার ফোন নম্বরটা আছে না? আমরা রায়েরবাজার থাকি। একটু ভেতরের দিকে। তাই তুই বরং সাতমসজিদ রোডের রায়েরবাজারের বাসস্ট্যান্ড হয়ে যে- রাস্তাটা পশ্চিমমুখী চলে গেছে সেখানে এসে পড়। আমি থাকব। ফোন করিস।’

‘তাই হবে।’

কাঁকন চলে যায়।

 

 

ছয়

পরের দিন নাশতা খেতে বসে শিউলি মাকে জানায়,

‘মা আজ বিকেলে আমি কাঁকনদের বাড়ি যাবো।’

‘যা-না। এমনটাই তো হওয়া উচিত। শুধু সে-ই আসবে, তোর যেতে হবে না?’

‘তাই তো। আজ বিকেলের দিকে …।’

‘দেখ মা, একে একে তোর সব বন্ধু বিদেয় হয়েছে। কেউ আর আসে না। আছে শুধু এক কাঁকন … তাও সে আবার কবে উধাও হয়। দেখ মা … একটা কথা, সংসারে-সমাজে চলতে হলে বন্ধুবান্ধব লাগে। একা একা কি মানুষ বাঁচে!’

‘একা একা’ – মায়ের কথাই শিউলিকে বিচলিত করে। আসলে সে তো একাই। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন এ-কথাটা সে জানতে পারেনি। কিন্তু এখন সে বড় একা, নিঃসঙ্গ। সে ভাবে, যাক বিকেলে তো কাঁকনের সঙ্গে দেখা হবে। ভালো সময় কাটবে।

 

সময়মতো শিউলি সাতমসজিদ রোড ধরে এগিয়ে যায়। রায়েরবাজারের বাসস্ট্যান্ড অনুমান করে কাঁকনকে ফোন দেয়। সে শিউলিকে নির্দেশনা দেয়।

‘আর একটু এগিয়ে রিকশা ছেড়ে সোজা পশ্চিমমুখী হয়ে রাস্তা ক্রস কর। আমি তোকে অলরেডি দেখতে পাচ্ছি। আয় …।’

তারা দুজন খানিকটা হাঁটে। সরু গলিপথে ঢুকে তবে তারা এক দোতলায় ওঠে। কাঁকন হাসে,

‘এই হলো আমার রাজপ্রাসাদ।’

‘রাজা আছে তো?’

‘না … তুই যখন এসে গেছিস সেও এসে পড়বে।’

‘মানে?’

‘মানে … টেলিপ্যাথি। মানুষ প্রিয়জনের খবর পেয়ে যায়।’

‘কীভাবে?’

‘বাতাসে।’

দুজনই হাসে।

কাঁকনের বসার ঘর ছোট। এতে দুটি চেয়ার ও ছোট একটা টেবিল বসালে আর জায়গা থাকে না।

বসতে বসতে শিউলির চোখে-মুখের কৌতূহল নিবারণের জন্যই কাঁকন সহজ-সরল ভঙ্গিমায় বলে যায়,

‘আমরা সাবলেটে থাকি। একটা বসার জায়গা আর একটা বেডরুম … এতেই চলে আমাদের। অলকেশ দুই শিফটে কাজ করে। সকাল ৬টায় কাজে যায়। তার গ্রামের বাড়ির অবস্থা ভালো। তার বাপ-ভাই বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্য করে। কৃষি ক্ষেতখামারিও আছে। আমাদের মাসের চাল-ডাল তার বাড়ি থেকেই আসে। ভাবছি কলেজটা পাশ দিয়ে আমিও চাকরি নেব।’

অল্পক্ষণের মধ্যেই অলকেশ এসে যায়। হাতে তার একাধিক ঠোঙা।

‘এই কাঁকন … গলির মোড়ে গরম-গরম শিঙাড়া আর জিলাপি পেলাম …।’

কাঁকন হাসে।

‘দেখ শিউলি, বলেছিলাম না … টেলিপ্যাথি …। দেখলি তো এবার।’

‘হ্যাঁ, তাই তো।’

হাত-মুখ ধুয়ে এসে অলকেশ বসে। কাঁকন চা করতে যায়।

‘আমি কি খেতে এসেছি? বস গল্প করি।’

‘এই পাঁচ মিনিট …।’

চা খেতে খেতে তারা অনেক গল্পগুজব করে। কিন্তু কাঁকন বরাবরই সজাগ ছিল যে, সে শিউলির ব্যক্তিজীবন নিয়ে কোনো কিছু বলবে না।

রাত বাড়ে। শিউলির ছোট চাচা ফোন করেন।

‘শিউলি তুমি কোথায়?’

‘আমি কাঁকনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি।’

‘তার বাড়ি কোথায়?’

‘রায়েরবাজার।’

‘ভালো কথা, আমরা রাইফেলস ক্লাবের বাজারে এসেছি। রাত হয়েছে। তোমার একা রিকশায় যাওয়া ঠিক হবে না। তুমি মেইন রোডের পাশে থেকো। আমি তোমাকে উঠিয়ে নেব।’

‘আচ্ছা চাচা। দেখা হবে।’

ছোট চাচা সময় ধরে আসেন। তিনি নিজে ড্রাইভ করছিলেন। জায়গামতো গাড়ি থামলে চাচি পেছনের দরজা খুলে শিউলিকে কোলে টেনে নেন।

‘আয় মা … আয়।’

চাচা স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে মধ্যরাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে থাকেন। রাত বাড়ছে। চাচি সামনের সিটের দিকে ইঙ্গিত করে শিউলিকে বলেন, ‘মা সামনে তোমার রবীন ভাই …।’

ততক্ষণে রবীন পেছন ফিরে হাসে।

‘আপনি ভালো আছেন?’

শিউলি অপ্রস্ত্তত হয়ে সলজ্জ হাসে। কিছু বলতে পারে না। চাচিও হাসেন।

‘এ কী রবীন! তুমি শিউলিকে আপনি বলছো! ও তো তোমার ছোট … ছোট বোন।’

‘তাই তো।’

চাচা শিউলিকে তাদের বাড়ির গেটে নামিয়ে দিয়ে চলে যান। শিউলি বলার চেষ্টা করে,

‘চাচা মায়ের সঙ্গে একটু দেখা করে গেলে ভালো হতো না?’

‘না … মা আজ নয়। বাচ্চারা বাসায়। হয়তো না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে শুরু করেছে।’

শিউলির চারপাশে অস্বচ্ছ এক শূন্যতা যেন জড়ো হতে থাকে। কাঁকন-অলকেশের ছোট সংসারটার ছবি তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাদের ঘিরে কোনো অর্থবিত্তের ছড়াছড়ি নেই। তাদের চাহিদাও বোধকরি তেমন নেই। তবে সেখানে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কোনো কমতি নেই। এই মুহূর্তে তেমনি কিছু একটা প্রত্যাশা নিয়ে যেন সে সহজ-সরল একটা অবলম্বন ধরে বেঁচে উঠতে চাইল। নির্ভার হতে চাইল। সে আবার ভাবতে থাকে, এ-বাড়িতে একটা মানুষ ছিল। মানুষটা এখন নেই। শুধু রেখে গেছে কিছু ফুল আর তার জন্য জলজলে ভালোবাসা … অফুরান ভালোবাসা যা ক্ষণে ক্ষণে, সারাক্ষণ ফিরে ফিরে তার অস্তিত্ব-অবস্থানকে করে তুলেছে আরো বিষাদময়। অন্ধকারাচ্ছন্ন। সেখানে এসে জমেছে দুর্ভেদ্য শূন্যতা। মায়ের পাশে শুয়ে তার ঘুম আসে না সারারাত। এ-অবস্থা থেকে কী তার মুক্তির পথ, সে ভেবে পায় না।

 

দুদিন পরে দুপুরের দিকে কাঁকন আসে।

‘শিউলি আমি দুপুরে খাইনি। আমাকে খেতে দে।’

ঘর থেকে বেরিয়ে মা বুয়াকে ডাকেন। শিউলি তখনো খায়নি। মা নিজ হাতে দুজনকে একসঙ্গে খাবার দেন।

খাওয়া শেষ করে কাঁকন-শিউলি পাশাপাশি ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসে। কাঁকন শিউলির কাঁধে তার মাথা এলিয়ে দেয়।

‘বাহ্, কী আরাম। এতক্ষণে আমি স্বস্তি পেলাম। টিচারদের বকবকানি কত শোনা যায়।’

‘শুবি … বালিশ এনে দেবো।’

‘নরম কাঁধের আরাম কি কম? ছেলেদের কাঁধে ভর করতে পারলে আরামের সঙ্গে স্বস্তিও আসে। সেটা আরো আরামের।’

‘তাই … অলকেশের কাঁধের কথা বলছিস?’

‘হ্যাঁ গো হ্যাঁ। আর সে যখন জাপটে ধরে, তখন কি আর সহজে ছাড়ে।’

‘বাধা দিস না?’

‘এমনটাই তো মেয়েরা চায়। তুই চাস না?’

লজ্জা পায় শিউলি।

‘তোর মুখে কিছু আটকায় না।’

কাঁকন শিউলির কাঁধ থেকে মাথা তোলে। দুগালে চুমু খেয়ে তার চোখ বরাবর চেয়ে থাকে। তার দৃষ্টিতে কৌতুক-মেশানো চাপা হাসি। ঝলমলে হয়ে আছে।

‘বলব?’

‘কী বলবি?’

‘একজনের কথা।’

‘কার কথা?’

‘তুই তাকে চিনিস। সেও তোকে চেনে।’

‘মানে?’

‘মানে হলো, তোর জন্য একজন দেওয়ানা হয়ে আছে।’

শিউলি খানিক থেমে থাকে। সে ভাবালু হয়। সে ভেবে পায় না কাঁকনের কথার মোড় কোন দিকে গড়াচ্ছে।

‘তাহলে শোন … সরাসরি বলে ফেলি … তোর এক ভাই তোর জন্য পাগল। তার বিদেশে পোস্টিং হয়েছে। হাতে তার মাত্র মাসখানেক সময়। এরই মধ্যে সে সব সেরেসুরে রাজকুমারীকে নিয়ে দুলদুল ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যাবে সাগরপাড়ের এক দ্বীপমালার দেশে।’

শিউলি ব্যাপারটা খানিক আন্দাজ করতে পারে।

‘তুই রবীনভাইয়ের কথা বলছিস?’

‘ব্যাপারটা তো ভালোই ধরেছিস।’

‘কিন্তু … কিন্তু এ-বাড়িতে সবেমাত্র একটা মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেছে … এরই মধ্যে …।’

‘এজন্যই সবার তাড়া। তোর মাকে একটু স্বস্তি দিবি তো?’

‘মায়ের আবার কী হলো?’

‘ভাগ্যিস তোর ছোট চাচা এসে দাঁড়িয়েছেন তোদের পাশে। তাঁর কাছে তোর মায়ের একটাই কথা। এই দুর্ভাগা বাবা-মরা মেয়েটার কী হবে?’

শিউলি কিছুটা ক্ষ্যাপাটে হয়ে উঠতে চায় তখন।

‘কেন আমি আবার কলেজে যাওয়া শুরু করব। লেখাপড়া করে নিজের পায়ে …।’

‘তা তো বিয়ে করেও করা যায়। আমি করছি না?’

এ পর্যায়ে কাঁকন আর না এগিয়ে অন্য প্রসঙ্গ টানে।

‘পড়াশোনা নিয়ে বড় বিপদে আছি। ভেবেছিলাম, ভালো রেজাল্ট করে এগিয়ে যাবো। কিন্তু টিচাররা ভালো বোঝায় না ক্লাসে … শুধু কোচিংয়ের ধান্ধা …। আইসিটি ও আরো কয়েকটা সাবজেক্টে এগোতে পারছি না।’

এসব বাস্তব সমস্যা নিয়ে আরো কিছুটা সময় কাটায় তারা।

একসময় কাঁকন ওঠে। শিউলি তাকে বিদায় দিতে নিচে এলে রিকশায় চড়ার আগে আবার সে বলে, ‘ব্যাপারটা একটু সিরিয়াসলি ভেবে দেখিস, সুযোগ সব সময় আসে না … একবার তা ফসকে গেলে সহসা এর দেখাও মেলে না।’

শিউলি ঘুরন্ত সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে ভাবালু হয়। বাবার ওপর তার অভিমান আরো বাড়ে। এভাবে তাকে একা ফেলে যাওয়াটা কি ঠিক হয়েছে তার?

অনেকটা রাত অবধি শিউলি ড্রয়িংরুমে টিভির সামনে বসে থাকে। টিভির পর্দার ঘটনাপ্রবাহ ও ছিঁচকে নাটকের অংশবিশেষে সে মনোযোগ দিতে পারে না। কাঁকনের কথাগুলো সে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারে না।

দেরিতে শুতে গেলে শিউলি দেখে মা জায়নামাজে সেজদা দিয়ে আছেন আর নিচু সুরে বিড়বিড়িয়ে কী বকে চলেছেন।

মা উঠে বসেন।

‘এসেছিস মা?’ তিনি আঁচলে চোখ মোছেন।

শিউলি তা না দেখার ভান করে। শিউলি এই মুহূর্তে মা-সংসার এসব ভাবনা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। আর কতই বা ভাববে? সে মানসিক-শারীরিকভাবে ক্লান্তিবোধ করে। বালিশ টেনে শুয়ে পড়ে সে।

ভোররাতের দিকে তার ঘুম ভাঙে। সে জেগে দেখে, মা বসে আছে তার গায়ে হাত রেখে। শিউলিও আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে। আর তখনই মা তার গলা জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কেঁদে ফেলেন। শিউলি চমকে ওঠে।

‘কী হয়েছে মা … শরীর খারাপ?’

‘না … রে … মা … না। আমি কাঁদি তোর জন্য। তোর বাপটাও এমন সময় গেল, যখন কি-না তার দরকার ছিল সবচেয়ে বেশি।’

‘তা তো ঠিক। কিন্তু এ-অবস্থায় আমাদের কী করার আছে। আর কেঁদেও তো লাভ নেই।’

‘তাও তো মা তোর চাচা এগিয়ে এসেছেন। আমাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে।’

‘তা ঠিক।’ আর কী বলা যায় ভেবে পায় না শিউলি।

একটু বিরতিতে মা শিউলির হাতদুটি তাঁর মুঠিতে নিয়ে চুমু খান আর বলেন, ‘মা তোর জীবন কি এভাবে চলবে? স্কুল-কলেজ-বন্ধুবান্ধব সব ছেড়ে দিয়েছিস …।’

শিউলি চুপ করে থাকে। মা বলে যান, ‘গতকাল তোর চাচি এসেছিলেন। তারা তোর একটা বিহিত করতে চান।’

‘কী বিহিত মা?’

‘মা তোমারও যে এসব বোঝার বয়স হয়েছে। আমার ঘরে যদি একটা ছেলেও থাকত … না হয় অপেক্ষা করা যেত। এখন তোমার মুরুবিব বলতে সেই এক চাচা-চাচি। তারা চান, এ-অবস্থায় তোমার বিয়ের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে। তোমার মতামত ছাড়া তো …।’

শিউলি তখন সহজ হয়ে পরিস্থিতিটা আন্দাজ করার চেষ্টা করে। সে বুঝতে পারে, মায়ের কথাগুলো তাকে ঘিরে সার্বিক পরিকল্পনার এক বহিঃপ্রকাশ। এর সঙ্গে এ-সময়ে তার চারপাশের প্রায় সবাই চাচা-চাচি, কাঁকন-অলকেশ এতে যুক্ত। তাদের সবার ইচ্ছা, তাকে এ-বাড়ি থেকে বিদেয় করা। কিন্তু এ-বাড়ি যে তার পক্ষে ছাড়া সম্ভব নয়। এমন ভাবনা পেয়ে বসলে সে অভিমানী হয়ে ওঠে।

‘মা আমি কি তোমার বোঝা হয়ে গেছি। আমাকে এ-বাড়িছাড়া করতে চাও।’

মা মেয়েকে বুকে চেপে ধরে কেঁদে ফেলেন, ‘মা তোকে আমিও এ-বাড়ি থেকে যেতে দেবো না … বরং যদি কেউ আসার হয় তাকে এ বাড়িতে …।’

 

 

সাত

নাশতা খাওয়ার সময় মা বুয়াকে ডাকেন।

‘শোন … আজ বিকেলে মেহমান আসবে। ঘরদোর গোছগাছ করতে হবে। নাশতা-পানির আয়োজন …।’

শিউলি মাথা নিচু করে নাশতা খাচ্ছিল। সে মুখ তোলে, ‘কে আসবে মা?’

‘তেমন কেউ না … এই তোমার চাচা-চাচি, আর ফুফা-ফুফু। এই তো।’

শিউলি ব্যাপারটা কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেও চুপ করে থাকে।

 

মেহমানরা সময়ের আগে চলে আসেন। ড্রয়িংরুমে এসে বসেন। সঙ্গে তাঁদের মিষ্টির প্যাকেট।

শিউলিদের বাড়িতে পা দিয়েই ফুফু সরব হয়ে ওঠেন। তিনি সামান্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভেতরবাড়িতে ঢুকে যান।

‘কই গো বুজি … কই গো আমার শিউলি মা … তোমরা কোথায়?’ ছোট চাচি তার পেছন পেছন এগিয়ে আসেন। তারা শিউলিকে মায়ের ঘরে পেয়ে যান। ফুফু সোজাসুজি ঘরে ঢুকে পড়েন।

‘কই গো মা … তোমরা কেমন আছো? তোমাদের খোঁজখবর নিতে আইলাম।’

মা বাথরুম থেকে বেরিয়ে মাথায় আঁচল টানেন।

‘আপনারা এসে গেছেন … আমরা তো এখনো তৈরি হয়ে উঠতে পারিনি।’

‘তৈরি আবার কী? আমরা কি পর কেউ? যেমন আছেন তেমনি ভালো। কই গো শিউলি মা, আসো তো আমার সঙ্গে। তোমার ফুফা তোমার জন্য মিষ্টিহাতে বসে আছেন … নিজ হাতে খাওয়াবেন তোমাকে।’

শিউলি ঘটনার আকস্মিকতায়, লজ্জায় ঘেমে উঠে কুঁকড়ে যেতে থাকে। চাচি এগিয়ে আসেন। শিউলিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।

‘মনে কর শুধু আমি ও তোর চাচা এসেছি। ঘাবড়ানোর কিছু নেই। তুই আমার কাছে থাক। অন্য কারো কথা ভাবার দরকার নেই।’

এরই মধ্যে চাচাও এগিয়ে আসেন।

‘ভাবি আসেন। আমরা আমরাই তো। এসেছি … এই একটু গল্পগুজব করব। ভালো সময় কাটবে আমাদের … এই তো।’

শিউলির চাচা-চাচির ওজর-আবদার অনুসরণ করে সবাই ড্রয়িংরুম গিয়ে বসে। শিউলির মা বারবার মেয়েকে দেখেন। তাকে বড় সাদাসিধা সাধারণ লাগছে। ঘরের কাপড়ে অগোছালো চুলে শংকাজড়িত চোখ-মুখ তাঁর ভালো লাগছে না বলে মনে হতে থাকে মায়ের।

চাচা শিউলিকে টেনে তাঁর পাশে বসান। নিজের হাতে শিউলির এলোমেলো চুল কিছুটা গুছিয়ে দেন। তিনি অন্য প্রসঙ্গ টানার চেষ্টা করেন।

‘আজ বাইরে গিয়েছিলে মা … কাঁকন এসেছিল?’

শিউলি মাথা নাড়ে।

‘হ্যাঁ … ও বেচারারও তো কলেজ করতে হয়। ঘরসংসার …।’

চা-পানির পর্বটা অনেকক্ষণ ধরে চলে। শিউলিকেও মায়ের অনুরোধে বুয়ার সঙ্গে চা-নাশতার আয়োজনে যোগ দিতে হয়। কিন্তু তার হাত-পা কাঁপছিল। থেকে থেকে। একসময় ফুফু বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। শিউলির মাকে ধমকে দেন।

‘আপনি কী? দিলে আপনার একেবারে কোনো মায়াদয়া নেই। ছোট্ট মেয়েকে কি এত কাজ করতে হয়? … এই মেয়ে তুমি ছাড়ো তো এসব। আমরা কি মেহমান? আমরা এ-বাড়িরই মানুষ। এই মেয়ে আমার কাছে বসো তো।’

ফুফু নিজ হাতে ছানার সন্দেশ ভেঙে শিউলির মুখে তুলে দেন। তার এ-অবস্থায় কিছু বলারও থাকে না, করারও থাকে না।

রাত বাড়তে থাকে। আড্ডা জমে উঠেছে। চাচা হাতঘড়ি দেখেন। ‘ফুফু রাত বাড়ছে। এবার যেতে হয়।’

শিউলির মা সেকেলে মানুষ। লৌকিকতার সুরে তাকে বলতে হয়।

‘রাত যখন হয়েই গেছে আর একটু বসেন। রাতের খাবারটা সেরে যান।’

ফুফা-ফুফু যেন আরো বসার এই অজুহাতই খুঁজছিলেন।

ফুফু বলে ওঠেন, ‘শিউলি মাকে ছেড়ে একেবারেই উঠতে ইচ্ছে করছে না। তবে শর্ত একটা, আপনাদের সাধারণ যে রাতের খাবার করে রেখেছেন। তাই খাবো। অন্য কিছু করতে পারবেন না।’

মা এক সংকটে পড়ে যান।

প্রথম মেহমান। ঘরে সবজি চ্চচড়ি, ডাল ছাড়া যে তেমন কিছু  নেই। তা কেমন করে হয়। তিনি পাকের ঘরের দিকে যেতে চাইলে চাচা বাধা দেন।

‘আপনি বসুন।’ তিনি বুয়াকে ডাকেন।

‘শোনো বুয়া … আমরা কোনো মেহমান নই। আধা ঘণ্টা পর ঘরে যা আছে তাই বেড়ে দেবে। আমাদের পেট ভরা … শুধু ভাবি আবদার করেছেন বলে …।’

তারপরও শিউলির মা বলেন, ‘ফ্রিজে যা আছে সব বের করে গরম কর। আমি আসছি।’

রাত প্রায় ১২টার কাছাকাছি সময় বাড়ি থেকে বের হন তারা সবাই। অনেক আমোদ-আহ্লাদ, হাসি-তামাশার মধ্য দিয়ে।

 

মা শিউলিকে জড়িয়ে ধরে আদর করেন।

‘মানুষগুলো খুব ভালো … সহজ-সরল-মিশুক।’

শিউলির ছোট্ট উত্তর। ‘হ্যাঁ।’

এর দিনদুই পরে, দুপুরের টানটান সূর্য পুবে টাল খেতে শুরু করলে শিউলি পশ্চিমের ঝুলবারান্দায় বসে সময় কাটাতে যায়। প্রায় প্রতিদিনের মতো। চারপাশের গোলাপ ফুলগুলিও যেন তার অপেক্ষায় থাকে। তারা বোধকরি কোনো সুখের কথা কইতে চায় দুঃখী মেয়েটির সঙ্গে। এ-সময়ে মা ও বুয়ার অবসর। তাঁরা তখন ঘুমায়, না হয় ঝিমায়। এমন সময় কলিংবেল বেজে ওঠে। শিউলি বিরক্ত হলেও তাকে উঠতে হয়।

দরজা খুলে শিউলি চমকে উঠে দু-পা পিছিয়ে যায়। তার চিনতে অসুবিধা হয়নি এতটুকু। রবীন এক বুকভরা লাল তরতাজা গোলাপ ফুল নিয়ে দরজাজুড়ে দাঁড়িয়ে। শিউলি হুট করে পালাতে চাইলেও পারে না। রবীন তাদের ভেতরকার দরজা আগলে দাঁড়ায়।

‘পালানোর মতো এমন কোনো অবস্থা হয়নি। আপনি থামেন ও বড় একটা ফ্লাওয়ার ভাস নিয়ে আসেন। ফুলগুলো গুছাই তো আগে।’

তারা দুজনে মিলে পানিভর্তি ভাসে ফুলগুলো সাজিয়ে রাখে।

‘এবার বসুন।’

‘মাকে ডাকি।’

‘না, আপনি একটু আরাম করে বসুন। ক্লান্ত লাগছে আপনাকে।’

‘আমাকে আপনি বলছেন যে!’

‘আপনি আমার বড় তাই।’

‘আমি আপনার বড়!’ হেসে ফেলে শিউলি।

‘এই তো … এমনভাবে হাসলে আপনাকে যে কত সুন্দর লাগে আপনি জানেন না।’

লজ্জারাঙা হয়ে ওড়নায় মুখ মোছে শিউলি।

রবীন ধরে নেয় আলাপের জের ধরে রাখার দায়িত্ব তার।

‘আপনি গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসেন। তাই না?’

শিউলি মাথা তোলে। রবীনের চোখ বরাবর চেয়ে থাকে।

‘আপনি কীভাবে জানলেন?’

‘আপনার বাড়ির চারপাশের বাতাস তো তাই বলে।’

কথাটা শিউলিকে যেন কেমনতর একটা মোহময় বার্তা দিলো। সে রবীনের সামগ্রিক আদল ধরে চেয়ে চেয়ে অন্য একটা মানুষের প্রতিচ্ছায়া দেখতে থাকে। সেই ফুলপাগলা-গাছপাগলা একটা মানুষ ভেসে বেড়াতে থাকে তার চারপাশ ধরে। নিভৃতে-নীরবে। ঘরভরা সুরভিত গোলাপের আশ্রয়ে ভর করে। কিছুটা সময় তার কেটে যেতে থাকে একমুখী সেই মানুষটির স্মৃতির আবর্তে। আর তখনই শিউলির মা ড্রয়িংরুমের দুয়ারে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে উচ্চকিত হয়ে ওঠেন।

‘এ কি রবীন যে … তুমি কখন এলে? সারা বাড়িজুড়ে গোলাপের গন্ধের মৌতাত আমাকে টেনে এনেছে এদিকে। তাই বলে এতো ফুল!’

উঠে দাঁড়ায় রবীন। ‘এই এ-পথে যাচ্ছিলাম … ভাবলাম আপনাদের সঙ্গে একটু দেখা করে যাই। আসুন … বসুন …।’

শিউলি বাস্তবতায় ফিরে আসে।

‘মা তুমি বসো, আমি চা করে নিয়ে আসি।’

মা তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বুয়াকে ডাকেন গলা চড়িয়ে। ততক্ষণে শিউলি ঘর ছেড়ে আড়াল হয়ে গেছে।

তারা একত্রে চা-নাশতা খায়। মা নানা ছলে তাদের একা একা বসে গল্পসল্প করার সুযোগ করে দিতে চাইছিলেন। তা হয়ে ওঠেনি। রবীন কিসের এক তাড়া দেখিয়ে চলে যায়। সেদিনকার মতো।

 

পরের দিন সকাল সকাল শিউলি মাকে জানিয়ে দেয়, ‘মা আজ বুয়া আমার সঙ্গে কাজ করবে। গতকাল আমি দারোয়ান ছেলেকে দিয়ে জৈব সার এনে রেখেছি। কতদিন ভালো যত্ন হয়নি বারান্দার গাছগুলোর।’

মা বরং উৎসাহিত হন।

‘বুয়ার আজ রান্নাবান্নার কোনো দরকার নেই। ফ্রিজে যা আছে তাতেই চলে যাবে আমাদের।’

নাশতার পরপরই বুয়া ও শিউলি চলে যায় ঝুলবারান্দায়। কত কাজ … কাজের কি শেষ আছে। তারা প্রতিটা টব ধরে ধরে খুঁচিয়ে আরো বালি-মাটি-সার মিশিয়ে গুছিয়ে রাখতে থাকে। বিকেলবেলায় পানি দেবে। বুয়াও তাতে সায় দেয়।

‘দুপুরের গরমে পানি না দেওয়াই ভালো।’

কাজ সারতে সারতে দুপুর গড়িয়ে যায়। মা দুপুরের খাবারের প্রস্ত্ততি নেন। ফ্রিজে জমে থাকা ভাজাভাজি-তরকারি-ডাল সব গরম দিয়ে টেবিলে সাজিয়ে রাখতে থাকেন।

কাজশেষে শিউলি তড়িঘড়ি করে খাবারের টেবিলে এসে ঢকঢক করে পানি খায়। পেস্নট টেনে খেতে বসে যায়।

‘ওহ্ … যা ক্ষুধা পেয়েছে।’ মাকে পেস্নলট এগিয়ে দেয় সে।

তাদের খাবারের প্রায় শেষ পর্যায়ে কলিংবেল বেজে ওঠে। বুয়া দরজা খুলে দেয়। আর রবীন ত্বরিতে হাতের সাদা গোলাপের বুকেটটা নামিয়ে খাবারের টেবিলে বসে যায়।

‘আমার বড্ড খিদা পেয়েছে আম্মা। দুপুরে খাবারের সময় পাইনি। ফরেন মিনিস্ট্রিতে গিয়েছিলাম। পেস্নলট দিন তো।’

রবীনের সরাসরি আম্মা সম্বোধনটা শিউলিকে খানিক অপ্রস্ত্তত করে। সে লাজনম্রও হয়। মা পাশের খালি পেস্নলটটা তাকে এগিয়ে দেন খানিকটা অপ্রস্ত্তত হয়ে।

‘কিন্তু বাবা আমরা যে আজ রান্নাবান্না করেনি। গতদিনের খাবার তাও আমরা প্রায় শেষ করে এনেছি।’

রবীন পেস্নলটে ভাত নেয়। ইশারায় ডালের বাটি দেখায়।

‘কেন ওই যে …।’

‘শুধু ডাল দিয়ে …।’

‘নাহ্ বুয়াকে ডাকেন। খালা বেশি করে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে একটা ডিমের অমলেট করে নিয়ে আসেন।’

‘ডিম ভাজা আর ঘন ডাল আমার প্রিয়। আর যদি ডাল বাসি হয় সে তো আরো মজার।’

শিউলি বিস্ময়াভূত হয়ে রবীনের দিকে চেয়ে থাকে। তার কীর্তিকলাপে সে অবাক হতে থাকে।

মা লজ্জায় অবনত হয়ে বলার চেষ্টা করেন,

‘বাবা একটু খবর দিয়ে এলে হতো না?’

‘না আম্মা, এভাবে হুট করে হাজির হয়ে চমকে দেওয়ায় আরেক মজা।’

মা-মেয়ে দুজনই না হেসে পারে না।

বিকেলের বাতাসে গরম উত্তাপ কমে আসতে থাকলে চা খেয়ে ওঠার আগে এমন সহজভাবে রবীন খবরটা দিলো যেন এটা কোনো ব্যাপার নয়।

‘আম্মা আমার পোস্টিং হয়েছে মালেতে। এ-মাসের শেষের দিকে যেতে হবে।’

শিউলি বিস্ময় প্রকাশ করে।

‘মালে! মালে আবার কোথায়?’

‘মালদ্বীপ … দ্বীপমালার এক সমারোহ … ১,১৯০টি কোরাল দ্বীপ নিয়ে সেই দেশ। সিংহলের কাছে। বঙ্গোপসাগরে …।’

‘সাগরে!’ চমকে ওঠে শিউলি।

‘সাগরে নয়।’ …

‘আরে, সাগরে কি মানুষ থাকে নাকি?’

মিটিমিটি হাসে রবীন। ‘এ-দেশটার আর একটা সুন্দর নাম আছে।’

‘কী?’

‘হানিমুন আইল্যান্ড।’

সলজ্জ হেসে মাথা নোয়ায় শিউলি।

মাকে চিন্তিত দেখায়।

‘এ-মাসের শেষের দিকে যেতে হলে হাতে যে সময় নেই একেবারে।’

‘এই সপ্তাহতিনেক।’

‘আজ আসি আম্মা। বাড়িতে যেতে হয়। খবরটা অবশ্য তারা পেয়েছে। ফোন করেছিলাম।’

রাতে শুতে গিয়ে মা-মেয়ের কারো চোখে ঘুম নেই। কান্নাভেজা কণ্ঠে ধীরে ধীরে মা বলে যান।

‘তুই হওয়ার পর থেকে আলস্নলাহর দুয়ারে হাত তুলে কত-না কেঁদেছি … আমার কোলে একটা ছেলে দাও। সে সময় সেই কপাল আমার হয়নি। পরওয়ারদিগার আমার কাছে ছেলে বানিয়ে রবীনকে পাঠিয়েছেন … দেরিতে হলেও।’

শিউলি কোনো কথা বলে না। চুপচাপ কাত হয়ে শুয়ে থাকে।

 

আট

পরদিন থেকে চাচা-চাচির হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। টেলিফোন তো বেজেই চলেছে। এরপরও সন্ধ্যার দিকে তারা এসে হাজির। চাচি মাকে খবরটা জানান।

‘আগামীকাল সন্ধ্যায় ফুফা-ফুফু আসছেন। পাকাপোক্ত কথাবার্তা বলার জন্য। হাতে সময় তো মোটেই নেই।’

মায়ের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।

‘আমি একা মানুষ … কেমনে কী করি?’

ছোট চাচার সহজ উত্তর, ‘আপনাকে কিছুই করতে হবে না। আমি আছি কোনদিনের জন্য।’

সন্ধ্যার আগেভাগে তারা আসে। ছোট চাচা-চাচি, ফুফা-ফুফু। আজ চাচির স্কুলে পড়া ছেলেমেয়েও সঙ্গে। তাদের এই পুরো ব্যাপারটাতে প্রচুর আগ্রহ-উত্তেজনা। তারা মুরুবিবদের কথাবার্তায় মনোযোগ না দিয়ে ভেতরবাড়িতে প্রায় লুকিয়ে থাকা শিউলিকে খুঁজে বের করে। ‘এই তো বউ।’ তখন সে-ঘটনার আকস্মিকতা ও এর দ্রম্নত এগিয়ে যাওয়াকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে। খানিক পরে আসে কাঁকন। সে আসাতে শিউলি অনেকটা আশ্বস্ত বোধ করে।

ড্রয়িংরুমে রবীন-শিউলির বিয়ের কথাবার্তা চলছে। ছোট চাচা ও ফুফা-ফুফুর মধ্যে এসব নিয়ে একটা খসড়া আলোচনা হয়ে গেছে। তারা ঠিক করে, যেহেতু রবীনকে অচিরেই চলে যেতে হবে মালদ্বীপে, সুতরাং শুভস্য-শীঘ্রম। তারা ঠিক করে, আজ থেকে সপ্তাহখানেকের মাথায় আগামী শনিবার রবীন ও শিউলির বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ফেলতে হবে। এই অনুষ্ঠান যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত হবে। সকালে কাজি ও দু-চারজন মুরুবিবর উপস্থিতিতে বিয়ের নিকাহনামার কাগুজে পদ্ধতি সম্পন্ন হয়ে যাবে। আর সন্ধ্যালগ্নে হবে ছেলেমেয়ের পক্ষের অতি ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা – খানাদানা ও জামাই-বউকে তুলে দেওয়া।

এ-পর্বে শিউলির মা হু হু করে কাঁদতে শুরু করেন। ‘তোমরা বাবারা আর যা-ই করো না কেন … শিউলিকে আমার বাড়ি থেকে সরিয়ে নিও না। ছেলেও এ-বাড়িতে থাকবে।’

রবীনের মা আবদারটা ভালোভাবে নিতে পারেননি।

‘বউ তো জামাই বাড়িই যায়। আমাদের থাকার জায়গা না থাকত একটা কথা ছিল। হতে পারে, আমরা আপনার মতো ধানম–তে থাকি না…।’

ছোট চাচা ব্যাপারটা চট করে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

‘আগে তো বিয়েটা হোক। পরের ব্যাপার-স্যাপার পরে …।’

ততক্ষণে পুরো ড্রয়িংরুম শাহি খাবার-দাবারের গন্ধে মম করতে থাকে। ঢাকার প্রসিদ্ধ খানাঘর থেকে অর্ডারি খাবার-দাবার চলে আসে। ততক্ষণে রবীনও এসে যায়।

‘যাক ভালোই হলো … অনেকদিন ভালো কাচ্চি বিরিয়ানি খাইনি।’

 

সপ্তাহখানেক পরে প্রোগ্রামমাফিক কাজ এগিয়ে যায়। দুপক্ষের হাতেগোনা দু-চারজন মুরুবিবর উপস্থিতিতে কাজি তাঁর কাজ সম্পন্ন করেন। তাঁরা মিষ্টিমুখ করে বিদায় নেন।

দুপুরের পর থেকে ঢাকার প্রসিদ্ধ ডেকোরেটর ও বাবুর্চিদের কর্মকা- শুরু হয়ে যায়। শিউলিদের ড্রয়িং-ডাইনিং রুম ধরে চেয়ার-টেবিল বিছিয়ে কিছু আলোকসজ্জারও আয়োজন করে তারা। উভয়পক্ষের হাতেগোনা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের সংখ্যা ৩০-৩৫ নয়তো বড়জোর ৪০-এর বেশি তো নয়। আর ছোট চাচা তার জানিস্তর বাবুর্চিকে জানিয়ে দেন, ‘খানা যেন হয় এক নম্বর। এর ব্যতিক্রম হলে …।’

হেড বাবুর্চি চাচাকে আশ্বস্ত করে।

খানাদানা শেষ হতে হতে ১০টা প্রায় বেজে যায়। আমন্ত্রিত সবাই সন্তুষ্ট হয়ে মুখে সুগন্ধি-মিষ্টি পান চিবোতে চিবোতে বিদায় নেয়। খানিক অসন্তুষ্ট হয়ে বিদায় নেয় রবীনের মা-বাবাও। চাচা তাদের আশ্বস্ত করেন, ‘কয়েকটা দিনই তো মাত্র। পরে তো মেয়ে আপনাদেরই। শুধু কয়েক দিন আগে মেয়েটার বাবা মারা যাওয়াতে …।’

বর-কনের ফুলসজ্জার ঘর সাজায় কাঁকন ও শিউলির ছোট চাচাতো ভাইবোনেরা মিলে। ঘরজুড়ে রাজ্যের ফুল জড়ো করেছে তারা। ফুল যে বড় ভালোবাসে শিউলি।

রবীন ফুলসজ্জার ঘরে গিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিক জামা-কাপড় ছেড়ে হালকা হয়ে বসে। অনেক রাত পর্যন্ত বিছানায় গড়াগড়ি দেয়। একপর্যায়ে শিউলির খোঁজ করতে গিয়ে সে দেখে, শিউলি পুরোপুরি কনের সজ্জায় ঝুলবারান্দায় বাবার গোলাপবাগিচার মাঝখানে বসে আছে। দু-চোখ তার জলে ভরা। তার তখন মনে হতে থাকে, বাবার নামটা যে শুধু কাবিননামায় রয়ে গেল। আর কোথাও নয়।

সহানুভূতিশীল হয়ে রবীনও শিউলির পাশের মোড়ায় গিয়ে বসে। রাত গভীরতর হয়। প্রায় মধ্যরাত। রবীন তার কর্তব্য স্থির করে। সে সমব্যথী হওয়ার চেষ্টা করে।

‘দেখো শিউলি, তোমার বাবাকে আমি পাইনি … আমার দুর্ভাগ্য। তিনি যে বড়মাপের মানুষ ছিলেন এতে সন্দেহ নেই।’

খানিক থেমে আবার বলে যায় রবীন।

‘শিউলি রাত অনেক হয়েছে। শরীর খারাপ করবে। সামনে আমাদের অনেক কাজ। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের যেতে হবে বিদেশ … এর প্রস্ত্ততি … কাজের কি অভাব আছে? না ঘুমালে আবার … ওঠো শিউলি …  ওঠো।’

শিউলিকে হাত ধরে ওঠায় রবীন। ধীর-ইতস্তত সংকুচিত পদক্ষেপে শিউলিকে এগোতে হয়। রবীনের কথাগুলো তো অমূলক নয়।

পরের দিনদশেকের মধ্যে শিউলি রবীনের সঙ্গে মালদ্বীপ চলে যায়। চলে যাওয়ার দুদিন আগে থেকে বুয়ার পাকের ঘরের কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল শিউলি। বুয়ার ঝুলবারান্দার ফুলবাগিচার যাবতীয় তত্ত্বতালাফি শিখিয়ে দিয়ে তবে বাড়ি ছেড়েছে শিউলি। তারপরও মাকে দিব্যি দিয়ে গেছে যেন তিনিও খেয়াল রাখেন। আরো জানিয়ে যায়, প্রতিদিন সে ফোনে খোঁজখবর নেবে।

 

নয়

মালদ্বীপ যাত্রার পেস্নলনে চড়ে শিউলি মনে মনে একা হয়ে যেতে থাকে। সঙ্গে রবীন। তার সঙ্গেও ঘটনাচক্রে পরিচয় অল্পদিনের। একাকী মা, বাড়িঘর, দেশ, পরিশেষে তার বাবার হারিয়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ে যেতে থাকলে সে কেমনতর এক বিষণ্ণতার জটাজালে জড়িয়ে যায়। মনে পড়ে তার বাবার রেখে যাওয়া ঝুলবারান্দার কথা। রবীন তার পাশে বসা। আড়চোখে সে তাকে দেখে। সে সামনের টিভির বোতাম টিপছে। রয়ে রয়ে শিউলির একটা দুর্ভাবনা আতংকও কাজ করে চলেছে। নতুন জায়গা, নতুন দেশ … কেমন সেখানকার অবস্থা, কেমন করে সে নতুন সংসার গুছিয়ে নেবে ভেবে পায় না। সে যে এসব ব্যাপারে নেহায়েত আনাড়ি।

বিমান উড়ে চলেছে। শিউলি দুর্বল স্বরে কথা পাড়ে!

‘শুনছো?’

‘হ্যাঁ বলো।’ তার চোখ টিভির পর্দায়।

‘বলছিলাম কী, সেখানে আমরা কোথায় থাকব। যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে … খাওয়া-দাওয়া … কেমন করে?’

‘চিমন্তার কিছু নেই। মালদ্বীপ এয়ারপোর্টে নামলেই সব ঠিক হয়ে যাবে দেখবে।’

সন্ধ্যার আগেভাগে মালদ্বীপ বিমানবন্দরে পৌঁছে ইমিগ্রেশন ইত্যাদি ফর্মালিটি সেরে বের হতে হতেই রবীনের চোখে পড়ে একজনের উঁচিয়ে ধরা পস্নল্যাকার্ড। তাতে লেখা, ‘ওয়েল কাম মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রবীন মজুমদার।’

রবীন ইশারায় শিউলিকে দেখায়, ‘বলেছিলাম না সব ঠিক হয়ে যাবে। এয়ারপোর্টে পৌঁছলেই …।’

রবীন এগিয়ে গিয়ে তাদের সঙ্গে হাত মেলায়। তারাও হেসে এগিয়ে আসে, ‘আমি করিম,’ … ‘আমি সুজন’ …।

তারা জানায়, ‘গাড়ি রেডি। আপনাদের মিশন এলাকার কটেজও আমরা গুছিয়ে রেখে এসেছি যতটা পেরেছি। বাকিটা গিয়ে দেখা যাবে।’

রবীন তাদের ধন্যবাদ জানায়।

শিউলি বাড়ি পৌঁছে দেখে, দুই রুমের ছোট্ট বাড়ি। মোটামুটি সামলানো-গোছানো। পাকের ঘরে গিয়ে সে আরো বিস্মিত হয়। চাল-ডাল-তেল-লবণ কিছু মসলাপাতি ডাইনিং টেবিলে সাজানো।

করিমরা চলে যায়।

‘কাল সকাল সকাল চলে আসব। আপনাকে অফিসে নিয়ে যাওয়ার সময় কাছের মল থেকে দৈনন্দিনের অন্যান্য জিনিস কিনে নেওয়া যাবে।’

লাগেজপত্র অগোছালো রেখেই রবীন কিচেন বার্নারে ভাত-ডাল চড়িয়ে দেয়। ভাতের পানির সঙ্গে দুটি বড় আলুও ছেড়ে দেয়। শিউলির ব্যাপারটা মন্দ লাগেনি।

পরক্ষণে রবীন তাদের বেডরুমে গিয়ে শিউলিকে জাপটে ধরে বিছানায় গড়িয়ে পড়ে। শিউলি বাধা দিতে গিয়ে পেরে ওঠে না।

‘কাপড়-জামা সব অগোছালো হলে হোক। ঠিক করা যাবে। আমরা হানিমুন আইল্যান্ডে এসেছি না?’

 

ঘন ডাল, কাঁচামরিচ, সরষে তেলের আলু ভর্তা, গরম-গরম ভাত খেয়ে তারা তাদের নতুন বাসার আঙিনার ছোট্ট লনে পাতা চেয়ারে গিয়ে বসে। চারপাশ থেকে কেমনতর উতলা ঘূর্ণিমতো ঠান্ডা বাতাস এসে তাদের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে থাকে। শিউলির গা শীতে শিরশির করে উঠলে সে উঠতে চায়।

‘বাববাহ্ এ তো দেখি শীতের দেশ।’

‘অনেকটা তাই তো। সাগরের লোনা জলে ধোয়া প্রবালদ্বীপ। কিছুটা ঠান্ডা তো হওয়ারই কথা। অবশ্য এখানকার ঋতুচক্র আমার ভালো জানা নেই।’ বলতে বলতে শুধু শাড়ি পরা শিউলির লতানো দেহে রবীন তার গায়ের পশমি চাদরটা জড়িয়ে দেয়। তার এই সোহাগী অন্তরঙ্গ আচরণটা মন্দ লাগেনি শিউলির। সে অনুনয়ের সুরে বলে, ‘বা রে … তোমার বুঝি শীত লাগবে না।’

‘হ্যাঁ … লাগবে।’ বলে রবীন হেসে একই চাদরে দুজনকে পেঁচিয়ে নেয়।

পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করে শিউলি। সে আরো অন্ধকারে রবীনকে দেখে। তার মনে হতে থাকে, লোকটা তো মন্দ না। অকালে বাবাকে হারিয়ে সে যে অপার শূন্যতায় তলিয়ে যেতে বসেছিল, এর খানিকটা বিহিত হয়তো হতে চলেছে। সে খানিকটা আশ্বস্ত হয়। আবার তার দেশের কথা, মায়ের কথা … পরিশেষে ঝুলবারান্দার কথাও মনে পড়ে যেতে থাকে।

তাদের চারপাশের উত্তাল জলের, বাতাসের এলোমেলো ঝাপটার মধ্যে তারা দুজন একে অপরকে জাপটে ধরে কাটিয়ে দেয় রাতটা। মাঝে মাঝে আধো ঘুমে, আধো জেগে এলোমেলো কত মিষ্টিমধুর কথাও বলে গেল রবীন।

সকালে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে গিয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়েছিল। কলিংবেল বেজে উঠলে ধড়ফড়িয়ে ওঠে।

রবীন তাদের বসতে দেয়। শিউলিকে চায়ের পানি চড়াতে বলে সে বাথরুমে ঢুকে যায়।

শিউলিও কোনোরকমে সালোয়ার-কামিজে নিজেকে গুছিয়ে নেয়।

রবীন ঝটপট গোসল দিয়ে এসে স্যুট-টাই পরে তৈরি হয়। শিউলি বাটার টোস্ট, ডিম সেদ্ধ দিয়ে নাস্তা সাজায়। রবীন সুজন-করিমের জন্য দুকাপ দিয়ে আসে ড্রইংরুমে।

সুজন বিনীত হয়।

‘স্যার আমাদের হাতে যথেষ্ট সময়। অফিসও দূরে নয়। আপনি বরং বউদিকেও সঙ্গে নিন। মলটা সামান্য দূরে। সংসারে কখন কী লাগে … ঠিক তো নেই।’

শিউলিকে সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাবনায় সে প্রথমটায় অপারগতা  জানায়। তা কেমন করে হয়?

শিউলির কথা শুনে রবীন হাসে।

‘তুমি তো এমনিতেই সুন্দরী। শুধু তোমার চুল-মুখ একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে নাও। তাতেই হবে।’

তাদের চারজনের কঙ্ক অ্যান্ড শেল মলে পৌঁছতে ১৫-২০ মিনিট সময় লাগে। মিশন এলাকা। রাস্তাঘাট সুন্দর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সেখান থেকে সাগরের খানিকটা দেখাও যায়।

‘শিউলি দেখো কী নেবে?’

‘এ সবই যে সাগরের মাছ …?’

‘এর মধ্য থেকে বেছে নাও দু-এক পদ। পরে সময় করে আরো দেখা যাবে।’

‘তাই স্যার, এসব মলে সারাদিনই সাপস্নলাই আসতে থাকে। বিশেষ করে মাছ।’

শিউলি ছোট পদের একটা ও বড় কাঁটা মাছের টুকরো দেখিয়ে দেয়। পরে সামান্য কিছু তরিতরকারি, কিছু মসলাপাতি কিনে মল থেকে বের হয় তারা।

কাউন্টারে পয়সা দিতে গেলে করিম এগিয়ে আসে।

‘স্যার, আপনার কাছে তো লোকাল কারেন্সি নেই। পরে দিয়ে দিয়েন।’

‘তাই তো আমাদের তো টাকা-পয়সা নেই।’

সবার সঙ্গে শিউলিও হাসে সহজ হয়ে। কেনাকাটা শেষে শিউলিকে তাদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে বাকি সবাই অফিসে চলে যায়।

 

দুপুর বরাবর কল দেয় রবীন।

‘শিউলি অফিসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তুমি খেয়ে বিশ্রাম নিও। সারারাত তো তোমার ঘুম হয়নি। … রাখি।’ শিউলির হাসি পায়।

‘ঘুমাওনি তো তুমিও … তোমার বিশ্রাম?’

‘হবে … বাড়ি ফিরি তো।’

এমন একটা কলের জন্যই যেন অপেক্ষায় ছিল শিউলি। তার শরীর-মন তখন খানিকটা অবসাদ কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে।

সে মাকে ঢাকায় কল দেয়। ফোন ধরে বুয়া। ‘শিউলি … মা-মণি তুমি ভালো আছো তো। আমরা কত চিমন্তা করতাছি। মা … আপামণি … ধরেন।’

মা হাঁপাতে হাঁপাতে টেলিফোন রিসিভার হাতে নেন।

‘মা হাঁপাচ্ছো কেন?’

‘ঝুলবারান্দা থেকে আসতে আসতে …।’

‘তুমি বারান্দায় কেন? সেখানে তো কাজ করার কথা বুয়ার।’

‘একা একা কি সব হয় মা? বিশেষ করে তোমার বাবার সাজানো বাগান …।’

‘তোমার শরীর কেমন? বাতের ব্যথা?’

‘তোমার গলাটা শুনেই তো আমার সব ব্যথা-কষ্ট চলে গেছে।’

‘তো মা তুমি কেমন আছো একা একা?’

‘কেন রবীন আছে না।’

‘সে তোমার সমাদর আদর-যতন করে তো?’

‘সব ঠিক আছে মা। তুমি অতশত ভাবনা ছেড়ে দাও।’

‘তাই বলো। এই কথাটাই আমার ভালো থাকার জন্য যথেষ্ট।’

মা-মেয়ের কথাবার্তা আরো খানিকক্ষণ চলে।

এরপর কিচেন গোছগাছ করে, ফ্রিজে যা যা রাখার তা রেখে শোয়ার ঘরে এসে বিছানায় একটু গড়াগড়ি দেয়। আর কোন ফাঁকে যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে তা সেও বলতে পারবে না।

একটানা সুরেলা কলিংবেলের শব্দে শিউলির ঘুম ছুটে যায়। সে তাড়াহুড়ো করে উঠে দরজার দিকে এগোয়। তার মেইন গেট খুলতে একটু দেরি হয়।

‘আর বলো না। নতুন জায়গার সবকিছুই আজব ধরনের। দরজার তালা-চাবিটাও জানি কেমনতর।’

দরজা না ভেজিয়েই রবীন শিউলিকে টেনে উঁচুতে তুলে ঘনঘন চুমু খেতে থাকে।

‘ছি … ছি … দরজা যে খোলা। বাইরে থেকে সব দেখা যায়।’

‘চুমুর সময় কি সবসময় হয়। এদিকে সাগরজলে যে সূর্যের বিদায় চুম্বনের পালা শেষ হতে চলেছে। ডুবে যাবে খানিক পরে। … চলো চলো দেরি করো না। বস গাড়ি দিয়ে দিয়েছে। দ্বীপপুঞ্জে নতুন এসেছি, ঘুরেফিরে দেখব না … হানিমুন আইল্যান্ড।’

‘চা করছি। একটু সময় দাও। গায়ে একটু জল ঢেলে রেডি হই। হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’

খোলা জিপগাড়িতে চড়ে অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ায় তারা। সুন্দর এই দ্বীপমালার দেশ। রাজধানী শহর মালে। তারা দেরিতে রাত করে ভাত খায়। রবীন শিউলির রান্নার প্রশংসা করে।

‘বাহ্ তুমি তো দেখছি পাকা রাঁধুনি।’

‘আর লজ্জা দিও না। আমি কি রান্না জানি নাকি?’

খাওয়ার পরে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি প্রহর তারা এক পশমি চাদরের আবরণে রাত কাটিয়ে দেয়। চতুর্পার্শ্বের এলোমেলো বাতাসে বেপরোয়া সাগরজলের শব্দ তার কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে থাকে।

প্রায় সপ্তাহ দু-এক তারা একই ধারার জীবনযাত্রা, চলাচল, কথাবার্তা, খানিক হাসি-তামাশায়ও অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। হাঁটাদূরত্বে ‘কঙ্ক অ্যান্ড শেল’ মল থেকে সে একা একা ঘুরে আসে। সামান্য বাজারসদাইও করে। এছাড়া দৈনন্দিনের রান্নাবান্না, ঘরসংসার গোছানো, দিনে অন্তত একবার মায়ের সঙ্গে ঢাকায় কথা বলা, সুযোগ বুঝে রবীনের সঙ্গে কোথাও থেকে ঘুরে আসে। নতুন জায়গা-পরিবেশ, মানুষ দেখার-জানার সুযোগ মন্দ লাগছিল না শিউলির। তখন তার মনে হতে থাকে, নিদারুণ বিষাদময় কোনো পরিস্থিতির শিকার হয়ে গেলে, কাউকে আঁকড়ে ধরে সইয়ে ওঠার চেষ্টা বোধহয় মানুষের সহজাত একটা কিছু।

 

সময়ের সঙ্গে শিউলির জীবনযাত্রার পরিবর্তন হতে থাকে। রবীন ঘরে ফেরে বেশ দেরি করে। রাত নয়টা-দশটাও হয়ে যায় কোনো কোনো দিন। ফিরে অবসন্ন হয়ে কোনো রকমে সে চারটা মুখে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তার প্রতিদিনকার অজুহাত একটাই। কাজের চাপ বড় বাড়ছে দিন দিন। এ-দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দাঙ্গা-হাঙ্গামার এক অবস্থা চলছে। অ্যাম্বাসাডর ব্যাটা বদমেজাজি। ছুটিছাঁটা, উইকএন্ডে অবশ্য কিছুটা অবসরে জীবন কাটে তাদের। কিছুটা ঘোরাঘুরি করে। একবার হেলিকপ্টারে চড়ে তারা অন্য এক দ্বীপে বেড়াতে গিয়েছিল। তা যথেষ্ট ব্যয়বহুলও। তখন তার সাগরের উথালি-পাথালি দেখে বাবার কথা খুব মনে হয়েছে। সে তো জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছে জাহাজে জাহাজে। সময় পেলে সে সেসব গল্প করতো তার সঙ্গে। কেমন করে কোথায় চলে গেল সে-মানুষটি।

শিউলির মনের অবস্থাটা তেমন ভালো কাটছে না আজকাল। মায়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে খানিকটা মানসিক ভার লাঘব হয়। আর তখন তার মনে হতে থাকে, রবীন সময়ের গতি ধরে খানিকটা যেন বদলে যেতে শুরু করেছে।

 

দশ

মালদ্বীপে রাজনৈতিক দাঙ্গা-হাঙ্গামার আসন্ন ব্যাপকতার অজুহাতে রবীনকে ঢাকায় বদলি করা হয়। প্রায় এক বছরের মাথায়।

 

গত রাতে দেরিতে এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি এসে শিউলি রাতের অন্ধকারেই পুবের ঝুলবারান্দায় একবার উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিল। একরাশ অন্ধকার জমে আছে সেখানে। বাবার হাতে লাগানো ফুলের গাছগুলো ঠিক আছে তো? সে তখন ভালো দেখতে পারেনি।

তাই ভোর হওয়ার আগেই উঠে পড়ে শিউলি। সে থাই অ্যালুমিনিয়ামের পার্টিশনটা টেনে বাইরে আসে। আর সঙ্গে সঙ্গে এক ঝলক শীতের কুয়াশাভেজা রোদের আভা তার চোখমুখ ছুঁয়ে যায়। বাইরের হালকা আবহটা তাকে আনমনা করে। খানিকটা উৎফুলস্নলও করে। সে যে এতো সহজে দেশে ফিরে আসতে পারবে ভাবেনি। পরক্ষণে তাকে এক বিষাদের আস্তরণ যেন জড়িয়ে ধরতে থাকে। সেই কুয়াশার আস্তরণ ছেঁড়াখোঁড়া দুর্বল হলেও তা যে বড় নির্মম। স্মৃতিঘেরা স্টিমারের মতো। ডুবে যাওয়া টাইটানিকের
মতো ভার নিয়ে তলিয়ে গেলেও তা যেন কেবলই ভেসে উঠছে। যখন-তখন।

ঝুলবারান্দাটা তেমন বড় নয়। আকার-আঙ্গিকে তেমন বিশিষ্টও নয়। তবে এক অর্থে তা বৈশিষ্ট্যম–ত হতেও পারে। তা হলো, এটি ধানম– লেকঘেঁষা খানিক ঝুলন্ত বলে মনে হয়। অন্তত দূর থেকে। ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যানের একাংশ যেন। শিউলি ব্যাবিলন যায়নি কোনোদিন। তা দেখেওনি। কিন্তু কেন জানি তার মনে হয়, সেখানে সে গেছে। এবং দেখেছে, পৃথিবীর সেই ব্যাবিলনের শূন্যের উদ্যান। পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি!

 

বেশ দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে রবীন। সকালে কফি খাওয়া তার অভ্যাস। শিউলিকে খোঁজে সে। অবশেষে তাকে সে পেয়ে যায়। লেকের ঝুলবারান্দায়। থাই শাটার টেনে সেও বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। সে দেখে শিউলি জ্বলজ্বলে গোলাপে গাল লাগিয়ে আনমনা হয়ে বসে আপনমনে কথা বলে চলেছে। … ‘কতদিন তোমাদের ছেড়ে ছিলাম। তোমরা ছিলে একা … আমারও কি কম মন খারাপ হয়েছে। যাক এখন আমি এসে গেছি … বাবারই তো মেয়ে। তোমাদের আর কষ্ট হবে না।’

রবীন হাসে।

‘এখন যে আমার কষ্ট হচ্ছে। আমার কফি?’

ধীরে ধীরে উঠে যায় শিউলি। রবীনকে কফি পরিবেশন করে।

বছরখানেকের প্রায় নিঃসঙ্গ-নিরিবিলি জীবনযাপনের পর দেশে ফিরে শিউলির ভালো লাগে। তার ফেলে যাওয়া বাগান, বাবার
স্মৃতি, মায়ের আহ্লাদ, আত্মীয়স্বজনের অহরহ আনাগোনায় সে অভ্যস্ত-সতেজ হয়ে উঠতে থাকে। একদিন কাঁকন-অলকেশও ঘুরে যায়। কাঁকন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে চাকরি খুঁজছে। নাইটে গ্র্যাজুয়েশন করার পস্নল্যান। শিউলিও ভাবে, আবার সে কলেজে ভর্তি হবে।

রবীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হেড অফিসে যোগ দেয়। যোগ দেওয়ার তৃতীয় দিনের মাথায় বাড়ি ফিরে চা খেতে খেতে শিউলিও মায়ের কাছে কথাটা পাড়ে।

‘কূটনৈতিক মিশনের কাজ তো … অনেক গোপনীয় ড্রাফট ঘরে করতে হয়। তাই আমার একটা ‘হোম অফিস’ লাগবে। একবার ভেবেছিলাম কোনার খালি ঘরটায় তা করে নিই। কিন্তু আমার বাবা-মা এলে কোথায় থাকবেন? তারাও এদিকে চলে আসতে চাচ্ছেন। মালিবাগের দূর গলিপথে চলাচলের অসুবিধা। তাই ভেবে দেখলাম, সবচেয়ে ভালো হয় যদি গাছগাছালি ভরা বারান্দাটা খালি করে নিই। গাছগুলো অবশ্য অন্য কোথাও যত্ন করে রাখা যাবে … তেমন অসুবিধা হবে না।’

শিউলি প্রথমটায় রবীনের কথা অনুসরণ করতে পারেনি। পরে বুঝতে পারলে তার চা খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। মা-ও উঠে চলে যান।

পরদিন অফিস থেকে ফিরে রবীন তার পাকাপাকি প্রস্তাবটা জানায়।

‘জানো শিউলি, আমাদের ডিপার্টমেন্টের ওয়ার্কশপে আলাপ করেছি। ওরা এ-কাজে এক্সপার্ট … অলরেডি ওরা কয়েকটা বানিয়েছে।’

একটু থেমে আবার বলে।

‘মিস্ত্রিরা মালসামান নিয়ে কালই আসবে। দিনে দিনে কাজ সেরে চলে যাবে।’

শিউলি রবীনের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না।

পরের দিন সকাল সকাল শিউলি ছোট চাচার বাড়ি চলে যায়।

সন্ধ্যার আগেভাগে ছোট চাচা শিউলিকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। তার মনের অবস্থাটা চাচা ভালো বোঝেন। তাকে হাত ধরে গাড়ি থেকে নামান। সে জবুথবু হয়ে আছে। শিউলির জামাই তখন মিস্ত্রি ও তার অফিসের দুজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলছিল। চাচা-শিউলিকে দেখে সে এগিয়ে আসে।

‘শিউলি আমার হোম অফিসের কাজ শেষ। কম্পিউটার, আলাদা স্ক্রিন বসিয়ে ফেলেছি। সুন্দর লাগছে। রিভলবিং চেয়ার-কুশন অর্ডার করেছি। অর্ডার করেছি একটনি একটা এসিও।’

সে কথা বলতে থাকা কর্মচারীদের দিকে ফিরে যেতে যেতে আবার ফিরে আসে।

‘ওহ্ ভালো কথা। তোমার ওই গোলাপ ফুলের টবগুলো প্রথমে ছাদে নিয়েছিলাম। সেখানে দেখলাম, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ক্রিকেট খেলছে। ওগুলো নিচের গ্যারেজের পুবদিকের ফাঁকা জায়গায় সরিয়ে রাখতে গিয়ে বুঝলাম এখানে রোদ আসবে না। তাই মেইন গেটের দুপাশে রাখাই ভালো হলো। এখানে আলো-বাতাসের অভাব হবে না। দারোয়ান বলল, ‘এখানে পুবের রোদ আসে লেকের পানি ছুঁয়ে।’

সে একটু থেমে আবার বলে, ‘তবে শিউলি … তোমাদের অর্কিডগুলোর ব্যবস্থা করতে পারিনি। ওটা তুমি দেখো…।’

শিউলি ছোট চাচার হাত ধরে অসহায়ের মতো ফ্যালফ্যাল করে রবীনের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে গেট পেরিয়ে লিফট পাশ কাটিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠে যেতে থাকে। তার বাবাও বরাবর তাই করতেন। দুচোখ ফেটে তার জল গড়িয়ে নামে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: