শূন্যের কারবার

লেখক: মনি হায়দার

এ্যাই এ্যাই … তেড়ে এলেন সিরাজ মিয়া আমাদের দিকে। সিরাজ মিয়ার তাড়ায় আমরা চারজনে দরজা ঠেলে বাইরে এসে দাঁড়াই। হাসি। কিন্তু সিরাজ মিয়ার চোখেমুখে ক্রোধ। ঘরটার মধ্যে হাঁটছে আর ফুঁসছে। রুমটার মধ্যে দুটো খাট। পুবের দেয়াল ঘেঁষে বড় খাটটার নিচে সিরাজ মিয়ার বড় একটা টিনের ট্রাঙ্ক। ট্রাঙ্কের সামনে ঝুলছে বড় একটা তালা। বড় না কেবল, অনেক বড় তালা। অত বড় তালা কখনো দেখিনি। তালার চাবি সবসময় থাকে সিরাজ মিয়ার কোমরে। আমরা বুঝতে পারি, ট্রাঙ্কের মধ্যে গোপন কিছু গোপন রেখেছেন সিরাজ মিয়া। আমরা কখনো ট্রাঙ্কটার দিকে চোখ বড় করে তাকাই, সিরাজ মিয়াও চোখ বড় করে পালটা আমাদের দিকে তাকান।
সিরাজ মিয়া কে, আমরা জানি না। তিনিও আমাদের কাছে নিজের পরিচয় খোলাসা করেন না। ঘোড়ামুখো লম্বা সাইজের মুখের ওপর বিশাল থ্যাবড়া নাক, নাকের দুপাশে বেমানান আকারের ছোট ছোট দুটো চোখ। চোখের ওপর বেশ বড় আকারের কাঁচা-পাকা ভ্রু। ভ্রুর ওপর চওড়া কপাল। কপাল পার হয়ে বড় বড় চুল, অযতেœ পেছনের দিকে পড়ে থাকে। গায়ে অনেকদিন ধরে রং-ওঠা একটা হাফ পাঞ্জাবি। নিচের দিকে পাঞ্জাবির ময়লা অনুসরণ করে ততোধিক ময়লা লুঙ্গি। ময়লা লুঙ্গি ও জামার মধ্যে শরীরের আকারটা বেশ বড়। কিন্তু লম্বায় আবার ছোট। ছোটখাটো শরীরের মানুষটার মধ্যে একধরনের গোঁয়ার্তুমিও টের পাওয়া যায়।
সিরাজ মিয়া আমাদের মেসের কেউ নন।
রামপুরার উলন রোডের ভেতরের দিকে বড় একটা মসজিদ। মসজিদের পূর্বপাশে বেশ খানিকটা জমি। সেই জমিতে লম্বা টানা ঘর তুলে মসজিদ কর্তৃপক্ষ ভাড়া দিয়েছে। আমরাও মোটামুটি সস্তায় থাকতে পারছি। চারটে বড় মেস। দুটো তুলনায় ছোট। ছোট মেসে থাকি চারজন করে। বড় মেসে ছয়জন। মোটামুটি বত্রিশজন মানুষের আনাগোনা চলে সবসময়। মেসের একেবারে উত্তরের কোনার রুমে থাকেন মসজিদের মুয়াজ্জিন কারি সাইফুল ইসলাম।
সাইফুল ইসলামের গায়ের রং বেজায় কালো। মুখে চাপদাড়ি; কিন্তু মানুষটার মনটা বড় মানবিক। বিশেষ করে হুজুররা অন্যরকম হন। নিজের জগৎ নিয়ে মগ্ন থাকেন। সেদিক থেকে সাইফুল দিলখোলা মানুষ। মেসের মেম্বারদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। হাসি-তামাশায় যোগ দেন আমাদের সঙ্গে।
সাইফুলভাইয়ের কাছে সিরাজ মিয়া মাঝেমধ্যে আসেন। রুমের মধ্যে থাকেন। দুপুরের দিকে মাঝেমধ্যে মেসের বাথরুমে গোসলও সারেন। দুপুরে সাইফুলের যে খাবার আসে, সেই খাবার খেয়ে পাশের বড় খাটে ঘুমিয়ে যান সিরাজ মিয়া। বিকেলের দিকে উঠে চলে যান। রাতে কখনো থাকতে দেখিনি। এ-ঘটনা ঘটে মাসের মধ্যে দু-তিনবার। ফলে মেসের সবার সঙ্গে সিরাজ মিয়ার একটা সম্পর্ক না হলেও যোগাযোগ তৈরি হয়ে যায়।
মাসখানেক আগে সন্ধ্যার দিকে সাইফুলভাইয়ের রুমে ভিড় দেখে এগিয়ে যাই। ভেতরে ডাক্তার। রোগী সিরাজ মিয়া। সিরাজ মিয়ার শরীরে খুব জ্বর। ডাক্তার পালস দেখে ওষুধ লিখে বের হয়ে গেলেন। ডাক্তার উলন রোডের একটা ফার্মেসিতে বসেন। ডাক্তারের পেছনে পেছনে রুমমেট জহির যায়, ওষুধ আনার জন্য। সাইফুলভাই পাশে বসে খুব নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করছেন, কী খাবেন?
সিরাজ মিয়া হাত ইশারায় জানান, কিছু খাব না।
খালি পেটে ওষুধ খাওয়া যাবে না। জহিরভাই ওষুধ আনলে তো খেতে হবে। বলেন, রুটি আর গরুর মাংস আনাব?
সিরাজ মিয়া চোখ বড় করে তাকান সাইফুলের দিকে। সাইফুল আরো নরম গলায় প্রশ্ন করেন, গরম গরম খেলে ভালো লাগবে। আনাই?
সিরাজ মিয়া ঘাড় কাত করেন। সাইফুলভাই উঠে টেবিলের ওপর রাখা ঢাকনাসহ বাটি এগিয়ে দেন কামালের দিকে। কামাল মসজিদ কমিটির সভাপতির ছেলে। নাইনে পড়ে। কামালের হাতে বাটি আর টাকা দিয়ে বললেন, মোড়ের দোকান থেকে রুটি আর গরুর গোশত নিয়ে আয়।
কামাল বাটি নিয়ে চলে যায়। মোটামুটি সাইফুলভাইয়ের সেবায় সিরাজ মিয়া দুদিন পরই ভালো হয়ে যান। রাতে আমরা সাইফুলভাইয়ের রুমে যাই। দুজনে রাতের খাবার খেয়ে মাত্র মুখ মুছছেন। আমি বসলাম সিরাজ মিয়ার খাটে। জহির, আতিক, সুমন আর তারেক বসে সাইফুলভাইয়ের খাটে।
সিরাজ সাহেব, আপনার শরীর কেমন?
ভালো। এহন আমি ভালো আচি … ঠাস ঠাস কথা বলেন সিরাজ মিয়া।
কী হয়েছিল আপনার? প্রশ্ন করে সুমন। চারদিন আগে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল ও। জ্বরের ঘটনা শুনে আমাদের সঙ্গে খবর নিতে এসেছে সুমন।
জ্বর, জ্ব¦র অইছিল আমার। এহন ভালো আছি।
সাইফুলভাইয়ের খাটের নিচে পা ঝুলিয়ে বসেছে আতিক। বসে বসে আতিক পা দোলায়। পায়ের দোলা লাগে খাটের নিচে রাখা সিরাজ মিয়ার বিশাল ট্রাঙ্কে। আতিক নুয়ে ট্রাঙ্কটা দেখে ঘাড় সোজা করে তাকায় সাইফুলের দিকে, এতবড় ট্রাঙ্ক কবে আনলেন?
সাইফুল তাকায় সিরাজের দিকে, আমার না। ওনার ট্রাঙ্ক।
এত বড় ট্রাঙ্কের মইধ্যে কী আছে আপনার? খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন করে আতিক। কিন্তু প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে পাশের খাট থেকে বীরবিক্রমে উড়ে এসে ঘাড়ের ওপর পড়েন সিরাজ মিয়া, যান, যান আপনে, যান। ঘাড়, হাত, কাঁধ ধরে টানছে সিরাজ মিয়া। আতিক হতভম্ব। আমরাও অবাক। সাইফুলভাই উঠে ধরে সিরাজ মিয়াকে, আরে আপনে কী করছেন? ছাড়েন … ছাড়েন …
জোর করে সিরাজ মিয়াকে টেনে নিজের খাটের কাছে নিয়ে যায়। আতিক ঘাড় ডলতে শুরু করে। আমরা হতবিহ্বল হয়ে সাইফুলভাইয়ের রুম ছেড়ে আসি। কিন্তু আমাদের মাথার মধ্যে সিরাজ মিয়ার ট্রাঙ্কটা থেকে যায় রূপসীর নাচের টংকারে। কী আছে ট্রাঙ্কে? কী থাকতে পারে একজন হতদরিদ্র মানুষের ট্রাঙ্কের মধ্যে? লোকটা খায় ভিক্ষা করে। সিরাজ মিয়া কোথায় থাকে, কী খায় জানতে চাইলে সাইফুলভাই জানায়, ঢাকা শহর সে ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে যেখানে দেখে বিয়ের অনুষ্ঠান বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান, অপেক্ষা করে সে। ফাঁকে ফাঁকে ভিক্ষা তো আছেই। অনুষ্ঠান শেষ হলে জুঠা খাবার পায়। অনেক সময়ে আয়োজনকারীরা খাবার বেশি থাকলে ডেকে দেয়। সেই খাবারই খেয়ে বেঁচে আছে। ঢাকা শহরে ঘুরতে ঘুরতে প্রায় সব কমিউনিটি সেন্টার পরিচিত হয়ে গেছে। কমিউনিটি সেন্টারের অনেক কর্মচারীর সঙ্গে সম্পর্কও বানিয়েছে। বয়স্ক মানুষ, সবাই দয়া করে। এমন হয়, খাবার বেঁচে গেলে সিরাজ মিয়ার জন্য রেখে দেয়।
বোঝা যায় সিরাজ মিয়া খেয়ে-পরে ভালোই আছে, আমি ফোড়ন কাটি।
আমার ফোড়নের জটিল উত্তর দেয় জহির, ঠিক বললেন না রনি। একজন মানুষের জীবিকা ভিক্ষা করা। মানুষের কাছে হাত পাতে। দয়া করে কেউ এক বা দুই টাকা, বড়জোর পাঁচ টাকা, ভিক্ষা দেয়। সেই ভিক্ষার বা দয়ার জীবন ভালো থাকতে পারে না রনিভাই?
গোটা পরিবেশটা গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঝিমায় সিরাজ মিয়া। পাশের বাসার টেলিভিশন থেকে নাটকের সংলাপ শুনতে পাই, তুমি আমার বাসা থেকে বের হয়ে গেলে আর ফিরে আসার পথ থাকবে না। এখন ভেবে দেখ, কী করবে? কোন নাটকের কোন অভিনেতার সংলাপ, বুঝতে পারি না। কিন্তু নায়িকার সংলাপের আগেই টিভিতে গান ভেসে আসে। বুঝতে পারি, কারো হাতে রিমোট। এভাবেই ঘুরে যায় সংসার, কথা, সংলাপ আর পরিস্থিতি।
জহিরভাই ঠিক বলেছেন, সমর্থন করেন সাইফুল। মানুষটা খুব কষ্ট করে। কোথায় থাকে কিচ্ছু বলে না। যখন কোথাও বিশ্রামের দরকার হয়, আমার কাছে আসে, খুব দরদের সঙ্গে বলেন তিনি।
আমাদের আলাপের মধ্যে ঘুমিয়ে গেছেন সিরাজ মিয়া। হালকা নাক ডাকার শব্দ পাই। বুক ওঠানামা করছে। মানুষ ঘুমিয়ে গেলে নির্ভার লাগে।
সিরাজ মিয়াকে পেলেন কোথায়? প্রশ্ন করে তারেক।
ঠিক, আমারও জানার ইচ্ছে, মানুষটার ঠিকানা কোথায়? ধরুন, যদি বেশিদিন অসুস্থ হয়ে থাকে, আত্মীয়স্বজনকে খবর দিতে হবে তো! তারেকের সঙ্গে যুক্ত হয় সুমন।
বছর দুই আগে দুপুরের সময় আমি মসজিদে গিয়ে দেখি, একটা লোক ফ্যানের নিচে শুয়ে আছে। ডাক দিলাম। সাড়া মিলল না। আমি ভাবলাম, ক্লান্ত, ঘুমুচ্ছে ঘুমাক। ও মা আসরের সময়েও গিয়ে দেখি একইভাবে ঘুমুচ্ছে। গায়ে হাত দিলাম, সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকায়।
আপনি কে? আমি জিজ্ঞেস করি।
আমি অসুস্থ। ধীরে ধীরে বলে, আমারে একটু থাকতে দ্যান। লোকটা আবার শুয়ে পড়ে। আমি মসজিদ কমিটির সভাপতিকে ডেকে আনলাম। সভাপতি ওনাকে দেখে বললেন, আপনার রুমে নিয়া যান। আমি পড়লাম বিপদে। লোকটা উঠতে পারে না। স্বাস্থ্যবান, আমার একার পক্ষে রুমে নিয়ে আসা কঠিন। তখন মেসের তিন-চারজনকে ডেকে আমার রুমে নিয়ে আসি। ডাক্তার ডাকা হলো। সব দেখে ডাক্তার বললেন, মানুষটা কোনো কারণে ক্লান্ত। হয়তো না খেয়ে ছিল। আর পেটেও ঝামেলা আছে …
ডাক্তার ওষুধ লিখে দিলে এনে খাওয়াই। সভাপতির বাসা থেকে ভালো ভালো খাবার আসে, সেই খাবার খেয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়। সুস্থ হলে আমি জানতে চাই, আপনার বাড়ি কোথায়?
মাথা নাড়ায়, আমার কোনো বাড়ি নাই।
নাম কী?
নাম? অনেকক্ষণ ঝিম মেরে থাকার পর বলে, আমার নাম সিরাজ মিয়া। আমার বাপের নাম করিম মিয়া। আমার মায়ের নাম তাছলিমা বেগম। আমার গ্রাম …। আবার ঝিম মারে। বুঝতে পারি গ্রামের নামটা মনে করার চেষ্টা করছে; কিন্তু পারছে না। এক সময়ে দেখলাম কাঁদছে।
কাঁদছে? আমরা একসঙ্গে জিজ্ঞেস করি।
হ্যাঁ, নিঃশব্দে কাঁদছে। দুই চোখের কোল বেয়ে পানি নামছে। আমি বুঝতে পারলাম, মনের মধ্যে কষ্ট আছে। চেহারা দেখে, কথা বলে মনে হয়েছে আমার, মানুষটা কোনো ভালো পরিবারের। কোনো ঝামেলায় পড়ে জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। সেই থেকেই আমার সঙ্গে আছে।
আমরা সিরাজ মিয়ার জন্য মমতা অনুভব করি। কী হতে পারে সিরাজ মিয়ার জীবনে? বিয়ের পর সুখে সংসার করছিল কিন্তু বউ অন্য কারো সঙ্গে …। অথবা সিরাজ মিয়ার বড়ভাই চক্রান্ত করে ঘটনার জন্ম দিয়েছে? অথবা বাংলা সিনেমার সেই ঘটনা, সবই ঠিক ছিল, কেবল একটা দুর্ঘটনা?
প্রথমদিকে কোথায় যায়, কী খায় আমি জানতাম না। প্রশ্নও করতাম না। হঠাৎ হঠাৎ একদিন আসে, গোসল করে আমার সঙ্গে খায়। খাওয়ার পর একটা ঘুম দিয়ে চলে যায়। ধীরে ধীরে জেনেছি সিরাজ মিয়া এভাবে জীবনযাপন করে, সাইফুলভাই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দেখতে দেখতে প্রায় আড়াই-তিন বছর হয়ে গেল।
কোনো আত্মীয় কখনো খোঁজখবর নিতে আসেনি? আমি জানতে চাই।
মাথা নাড়ান সাইফুল, নাহ।
লোকটা, মানে সিরাজ মিয়া ঘুমিয়ে। আমরা দেখছি ওনার ঘুমন্ত কিন্তু ক্লান্ত বিষণœ মুখখানা। কোন গ্রামের কোন মায়ের সন্তান? কোন ভাইয়ের ভাই? কোন বোনের ভাই? কোন পিতার প্রিয়তম সন্তান? পরিচয়হীন ঠিকানায় এই মসজিদ মেসে ঘুমিয়ে আছে? ভাগ্যিস সাইফুল ভাইয়ের হাতে এসে পড়েছিল। না হলে কোথায় মরে পড়ে থাকত! এই তো জীবন? কে কার ঠিকানা রাখে?
অনেক রাতে আমরা বিষণœ বেদনার সঙ্গে সাইফুলভাইয়ের রুম থেকে বের হয়ে আসি। যে যার রুমে চলে যাই; কিন্তু সিরাজ মিয়ার নিঃশব্দ কান্নার বিষণœ সুর আমার তন্ত্রীতে বাজতে থাকে। আমার মনে হয়, সিরাজ মিয়ার জীবনের নিঃস্ব ধারায় আমিও হতে পারতাম। আমি এখন যুবক, টিউশনি করি, চাকরি খুঁজছি, একটা সরকারি অফিসে চুক্তিভিত্তিক কাজ করছি, নিয়োগের সময় এলে, নিয়োগ হতে পারে। আমার প্রেমিকা ফারহানা পাপিয়ার সঙ্গে ধুমধাড়াক্কা সময় কাটাই। একদিন আমাদের সংসার হবে। সন্তান হবে … সন্তান নিয়ে ফারহানার সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া হয়। আমি চাই একডজন ছেলেমেয়ে।
পাপিয়া তেড়ে আসে, আমি পারব না।
তোমাকে আমি সাহায্য করব, পাপিয়ার হাতের নরম মার খেতে খেতে বলি, আমার ক্রিকেট বা ফুটবল খেলার একটা টিম দরকার।
পাপিয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি ওর চুলে মুখ রাখি।
বিছানায় শুয়ে পড়ি। শুয়ে পড়তেই প্রশ্ন জাগে মনে, সিরাজ মিয়া কোনো দিন সংসার করেছিল? সন্তানের মায়া-মমতায় জড়িয়ে ছিল কখনো? স্ত্রী ভালোবেসে জড়িয়ে ধরে কখনো বলেছিল, আমি তোমার!
পরের দিন সকালে উঠে জীবনের সন্ধানে বের হয়ে যাই। মনে থাকে না সিরাজ মিয়ার কোনো ছবি বা প্রতিচ্ছবি। অফিসের কাজে তিনদিনের জন্য ঢাকার বাইরে যাই। ফিরে এসে পাপিয়াকে নিয়ে মাওয়ায় বেড়িয়ে আসি একদিন। মাওয়ায় ওকে নিয়ে স্পিডবোটে উঠেছিলাম। দারুণ রোমাঞ্চকর ভ্রমণ ছিল আমাদের। সন্ধ্যার আগে ঢাকায় ফিরে মেসে এলে দেখি, গোটা মেসে এক ধরনের শোক বিরাজ করছে।
রুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে জহির প্রশ্ন করে, কোথায় ছিলেন সারাদিন?
কেন? কী হয়েছে?
পাশ থেকে উত্তর দেয় আতিক, সিরাজ মিয়া মারা গেছেন।
সিরাজ মিয়া মারা গেছেন?
হ্যাঁ, ঘাড় নাড়ে সুমন।
কখন? আমি বিছানায় বসতে বসতে প্রশ্ন করি।
দুপুরের পর। লোকটা বাইরে থেকে শরীরে অসুখ নিয়ে এসেছিল সকালে। পেটের ব্যথায় ছটফট করছিল। আমরা ডাক্তার ডেকে আনলাম। ডাক্তার দেখে বলল, এখনই হাসপাতালে নিয়ে যান। আমরা একটা অটোতে করে নিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু রামপুরা পার হতে না হতেই আমার হাতের ওপর লোকটা মারা যায়। মেসে ফিরিয়ে এনে আপনাকে অনেক ফোন দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনার ফোন …
সুমন বাকিটা বলে না। কারণ ওরা জানে ফারহানা পাপিয়ার সঙ্গে থাকার সময় আমার মোবাইল বন্ধ থাকে।
সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি, মেসজুড়ে শোকের আবহ সংগীত কেন বাজছে! সিরাজ মিয়া আমার বা আমাদের কেউ নন, কিন্তু মৃত্যুর সব অপরাধ আমার ঘাড়ে চেপে বসেছে। গোটা মেস বা মসজিদের মধ্যে আতর-লোবানের গন্ধ ভেসে বেড়ায়। আমরা সেই নিঃশব্দ নিগূঢ় শোকমাখা শোকের মধ্যে হেঁটে বেড়াই।
কবর কোথায় দিয়েছেন? আমি অপরাধী গলায় জিজ্ঞেস করি।
জহির জানায়, আজিমপুরে। এই তো কবর দিয়ে ঘণ্টাখানেক হলো আমরা এসেছি।
আমার মুখ দিয়ে কথা সরে না। একটা মানুষ হারিয়ে গেল মানুষের চরাচর থেকে। আমি রুমের প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকাই। সবাই শোকার্ত সিরাজ মিয়ার জন্য। কেউ কি সিরাজ মিয়ার জন্য কেঁদেছিল? আমি কাকে এ-প্রশ্ন করব? করা যায়? আমি, আমি মরে গেলে কেউ কাঁদবে? মৃত্যুর পর লাশের জন্য কান্না কি জরুরি?
যথানিয়মে আমরা দিনকয়েকের মধ্যে সিরাজ মিয়াকে অনেকটা ভুলে গেলাম। এখন প্রশ্ন হলো, সিরাজ মিয়ার ট্রাঙ্ক! জলজ্যান্ত ট্রাঙ্কটা আমাদের করোটির মধ্যে ঘণ্টি বাজাচ্ছে। অদম্য কৌতূহল, প্রয়াত সিরাজ মিয়া কী রেখে গেছেন পরম যতেœ আগলে রাখা ট্রাঙ্কে!
সিরাজ মিয়ার মৃত্যুর দিনসাতেক পর মেসের যারা ছিল, সাইফুলভাই, মসজিদের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে ট্রাঙ্কের তালা খোলা হলো রুমের মাঝখানে পাটি বিছিয়ে। ট্রাঙ্ক খোলার পর নাকে তীব্র একটা গন্ধ এসে ধাক্কা মারল। গন্ধটা সয়ে যাওয়ার পর দেখলাম, ওপরে খবরের কাগজ একের পর এক সাজানো। খবরের কাগজ সরানোর পর দেখলাম, টাকা সাজানো থরে থরে। দুই, পাঁচ, দশ, পঞ্চাশ, একশ, পাঁচশো ও এক হাজার টাকার নোট। ট্রাঙ্কের মাঝখানে কয়েকশো কয়েক টাকা কয়েনের। আমরা ভেবেছিলাম কিছু টাকা-পয়সা হয়তো থাকবে; কিন্তু এত টাকা!
সভাপতি বললেন, সব ঢালেন পাটির ওপর।
সাইফুলভাই ঢাললেন। খালি ট্রাঙ্কটা খাটের ওপর রাখলেন। আমরা গোল হয়ে টাকা গুনতে থাকি। গুনি আর হিসাব দিই সভাপতিকে। সভাপতি একটা সাদা বড় কাগজে হিসাব লিখে রাখছেন। প্রায় ঘণ্টাদুয়েক গোনার পর টাকার পরিমাণ হলো আড়াই লাখ, তেত্রিশ হাজার আটশো নব্বই টাকা।
টাকার হিসাবের পর সভাপতি ঘোষণা দিলেন, মরহুম সিরাজ মিয়ার টাকার অর্ধেক পাবে মসজিদ আর অর্ধেক পাবেন সাইফুল। আমাদের পাঁচশো টাকা দেওয়া হলো মিষ্টি খাবার জন্য। আমরা মিষ্টি খেলাম উৎসব করে। সাইফুলভাই টাকা নিয়ে গ্রামে জমি রেখেছেন। সিরাজ মিয়ার টাকা দিয়ে পুরনো মিনার ভেঙে নতুন মিনার তৈরি করা হয়েছে মসজিদের। আমি মেস ছেড়ে দিয়েছি আরো বছরদশেক আগে। চাকরি পেয়েছি সরকারি অফিসে। ফারহানা পাপিয়ার সঙ্গে আমার সংসারের আট-নয় বছর। ছেলে একটি। আর একজন পেটে ওর। আমি চাই মেয়ে হোক, কিন্তু পাপিয়া আবারো ছেলে চায় …। এত চাওয়ার মধ্যে আমার মগজের কার্নিশে একটা প্রশ্ন ঘুরে ঘুরে ঘুঙুর বাজিয়ে যায়, কেন? কিসের নেশায়, কিসের আশায় সিরাজ মিয়া ভিক্ষা করে ট্রাঙ্কভর্তি টাকা জমাচ্ছিল? জানত সিরাজ মিয়া, এই টাকা কোনো কাজে লাগাতে পারবে না। এই টাকা ভোগও করতে পারবে না। জানার পরও সিরাজ মিয়া …
দশ বছর ধরে ঝুলে থাকা প্রশ্নের জবাব পেয়েছি গত সপ্তাহে, এই টাকা জমানোটাই ছিল সিরাজ মিয়ার বেঁচে থাকার একমাত্র সুখ বা অসুখ। টাকা জমানোর নেশাই সিরাজ মিয়াকে বাঁচিয়ে রেখেছিল শত দুঃখ-বেদনা, অপ্রাপ্তি-অপমান আর লাঞ্ছনার মধ্যেও …। জানত, এই টাকা আমার নয়। আমি এই টাকার নই। এই টাকা আমার কাজে লাগবে না। অন্যরা ভোগ করবে। তারপরও …।
সিরাজ মিয়ার জন্য এখন আমার সত্যি সত্যি কান্না পাচ্ছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: