সাময়িক ব্যাপার

লেখক:

 

ঝুম্পা লাহিড়ি

অনুবাদ : আনোয়ারুল হক

 

নোটিশ দেখে তারা জানতে পারল ব্যাপারটা সাময়িক। আগামী পাঁচদিন প্রতিরাতে আটটা থেকে নয়টা বাসায় বিদ্যুৎ থাকবে না। গেল তুষারঝড়ে একটা লাইন ছিঁড়ে গেছে। সেটা ঠিক করার জন্য শান্ত সন্ধ্যাকেই বেছে নিয়েছে মেরামতকারীরা। কাজ চলার সময় শুধু স্নিগ্ধ গাছের সারিওলা রাস্তার সারিবদ্ধ বাড়িগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে। বাড়িগুলোর অবস্থান ইট বের হয়ে থাকা দোকানগুলো থেকে ট্রলি স্টপ পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া যায় এমন দূরত্বের মধ্যে। তিন বছর ধরে এখানেই বাস করছে শোভা আর সুকুমার।

‘ব্যাপারটা ভালো যে তারা আমাদের সতর্ক করেছে’, নোটিশটা উচ্চৈঃস্বরে পড়ার পর শোভা মন্তব্য করল। সুকুমারের চেয়েও খবরটা জানা তার জন্যই দরকারি। নানা ফাইলে ভরা চামড়ার ব্যাগের ফিতাটা কাঁধ থেকে সরিয়ে ঘরে যাওয়ার পথে তা নামিয়ে সে রান্নাঘরে ঢোকে। তার পরনে নেভি বস্নু রঙের পপলিনের রেইন কোট, তার নিচে ধূসর সোয়েট প্যান্ট আর পায়ে সাদা জুতো। তেত্রিশ বছর বয়সে তাকে দেখাচ্ছে এমন মহিলার মতো, যা সে কখনোই হতে চায়নি।

জিম থেকে ফিরেছে সে। শুধু ঠোঁটের চারপাশে ক্র্যানবেরি লিপস্টিকের আভা তখনো বোঝা যাচ্ছে। কাজল লেপ্টে আছে চোখের নিচের পাতায়। পার্টি শেষ হলে অথবা বারে পুরো রাত কাটানোর পর মাঝেমধ্যেই তাকে এ-রূপে দেখা যেত, সুকুমার ভাবে। তখন এমন অলস হয়ে পড়ত যে, মুখ ধোয়ার চেয়ে বরং সুকুমারের আলিঙ্গনে ধরা দিতেই বেশি উৎসাহ থাকত তার। ডাকে আসা চিঠিপত্রের দিকে না তাকিয়েই টেবিলের ওপর সেগুলো রাখল শোভা। তার দৃষ্টি তখনো অন্য হাতে ধরা নোটিশটার দিকে। ‘কিন্তু তারা দিনেও মেরামতের কাজটা করতে পারত।’

‘তুমি বলতে চাইছ, যখন আমি বাসায় থাকি’, সুকুমার বলল। ভেড়ার  মাংসভর্তি পাত্রটা সে কাচের ঢাকনা দিয়ে এমনভাবে ঢাকে যেন খুব সামান্য বাষ্প বেরোতে পারে। গত জানুয়ারি থেকে সুকুমার বাসায় বসেই কাজ করছে। ভারতে কৃষিভূমি নিয়ে সংঘটিত বিপস্নব তার গবেষণার বিষয়বস্ত্ত। এখন গবেষণার চূড়ান্ত অধ্যায়গুলো সমাপ্তের চেষ্টা করছে সে। ‘কখন থেকে মেরামত শুরু হবে’ – জানতে চাইল সুকুমার।

‘উনিশে মার্চ, এতে বলা রয়েছে। আজই কি উনিশ?’ ফ্রিজের পাশে ঝোলানো ফ্রেমে বাঁধা কর্কবোর্ডের দিকে এগিয়ে গেল শোভা। উইলিয়াম মরিসের ওয়ালপেপারের মতো একটা ক্যালেন্ডার সেখানে ঝোলানো। এমনভাবে  সেটা দেখতে থাকল যেন প্রথমবারের মতো দেখছে সে। সবশেষে তার দৃষ্টি পড়ল নিচের দিকে থাকা তারিখটার ওপর। বড়দিনের উপহার হিসেবে তার এক বন্ধু ডাকযোগে পাঠিয়েছে ক্যালেন্ডারটা। অবশ্য শোভা আর সুকুমার এ-বছর বড়দিনের উৎসবে শরিকই হয়নি। ‘তাহলে আজই’, শোভা ঘোষণা করল । ‘তবে যাই হোক, আগামী শুক্রবার কিন্তু তোমার ডেন্টিস্টের সঙ্গে দেখা করার কথা।’

শোভার মুখে একথা শোনার পরই সুকুমার তার দাঁতের ওপরের অংশে জিহবা বোলায়। আজ সকালেও সে দাঁত মাজতে ভুলে গেছে। এ-ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত দুদিন বাসা থেকে বেরই হয়নি। শোভা যত বেশি বাসার বাইরে সময় কাটাচ্ছে, তত বেশি ঘরকুনো হচ্ছে সে। এমনকি চিঠিপত্র আনতে বাড়ির গেটে বা ফলমূল অথবা ওয়াইন কিনতে ট্রলি স্টপের পাশের দোকানে যাওয়াও সে বন্ধ করে দিয়েছে।

ছ-মাস আগে, গত সেপ্টেম্বরে, সুকুমার বাল্টিমোরে একটা অ্যাকাডেমিক কনফারেন্সে যোগ দেয়। তখনই শোভার প্রসব বেদনা ওঠে। শোভাকে এ-অবস্থায় ফেলে কনফারেন্সে সে অবশ্য যেতে চায়নি। বউই তাকে ঠেলে পাঠিয়েছে। তার কথা, এখন যোগাযোগ রাখাটা জরুরি। কারণ আগামী বছরই চাকরির বাজারে নামতে হবে তাকে। শোভা সুকুমারকে আশ্বস্তকরে বলেছিল, তার কাছে কনফারেন্সের কার্যসূচি ও ফ্লাইট নাম্বার রয়েছে। দরকার হলে যোগাযোগ করা যাবে। তাছাড়া তার বন্ধু জিলিয়ানকে বলা রয়েছে। জরুরি কিছু ঘটলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটুকু সে-ই পালন করতে পারবে। ক্যাবে করে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেওয়ার সময় শোভা হাত তুলে বিদায় জানিয়েছে। সেই সকালে বিদায়ের মুহূর্তে তার এক হাত ছিল স্ফীত হওয়া পেটের ওপর। যেন সেটাও তার শরীরের স্বাভাবিক অংশ।

অমত্মঃসত্ত্বা শোভার সঙ্গে বিদায়ের দৃশ্যের কথা মনে এলেই ফিরে আসে ক্যাবটির ছবি। লাল রঙের ওপর নীল লেখা স্টেশন ওয়াগন। সুকুমারদের কারটির তুলনায় প্রশস্তগুহার মতো। সুকুমার লম্বায় ছ-ফুট। হাতগুলো এতো দীর্ঘ যে জিন্সের পকেটে ঢোকালে তার অস্বসিত্ম বোধ হয়। এ-শরীর নিয়েও পেছনের সিটে বসে নিজেকে তার বামন মনে হচ্ছিল। কারটি বিকন স্ট্রিটে ওঠার পর সে কল্পনা করে – একদিন তার এবং শোভারও একটা স্টেশন ওয়াগনের প্রয়োজন পড়বে। গানের স্কুলশেষে দাঁতের ডাক্তার দেখিয়ে বাচ্চাদের পেছনে বসিয়ে তারা বাড়ি ফিরবে। গাড়ির হুইল ধরা থাকবে তার হাতে। আর শোভা পেছনে ফিরে বাচ্চাদের হাতে ফলের রসের প্যাকেট তুলে দেবে। পঁয়ত্রিশ বছরেও ছাত্র থাকার কষ্টের বোঝাটা এর আগে আরো ভারী হতো পিতৃত্বের এ-রকমের কাল্পনিক দৃশ্যে। কিন্তু হেমমেত্মর প্রথমভাগের সেই সকালে প্রথমবারের মতো সে-দৃশ্যকে স্বাগত জানিয়েছিল সুকুমার। সেই সকালে যখন গাছ ছেয়ে ছিল ব্রোঞ্জের মতো ভারী পাতায়।

কর্মচারীদের একজন তাকে খুঁজে পেয়েছিল সভাকক্ষে। তাকে সে একখানা চৌকোনা শক্ত কাগজ ধরে দিয়েছিল, যাতে লেখা ছিল একটামাত্র টেলিফোন নাম্বার। কিন্তু সুকুমার জানত এটা হাসপাতালের। সুকুমার যখন বস্টনে ফিরল ততক্ষণে সবশেষ। মৃত শিশু এসেছিল পৃথিবীতে। হাসপাতালের বেডে শোয়া শোভা তখন ঘুমে অচেতন। সেই প্রাইভেট রুমটা এতো ছোট ছিল যে, শোভার পাশে দাঁড়িয়ে থাকার জায়গাটুকু পর্যন্ত ছিল না। হাসপাতালের এই অংশে সমত্মানসম্ভবা শোভাকে নিয়ে সে এর আগে কখনো আসেনি। শোভার গর্ভপরিস্রব দুর্বল থাকার কারণে ডাক্তার ছুরি-কাঁচিও চালিয়েছিলেন। কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার সুকুমারের দিকে তাকিয়ে পেশাদার সদয় হাসি উপহার দিয়ে বলেছিলেন, এমনটা অনেক সময় হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শোভা হাঁটতে পারবে। কিন্তু তাতে এমন ইঙ্গিত ছিল না যে, ভবিষ্যতে শোভা আর মা হতে পারবে না।

সুকুমার বিছানা ছাড়ার আগেই এখন শোভা বেরিয়ে যায়। চোখ খুলেই সে দেখতে পায় বালিশের ওপর শোভার পড়ে থাকা দীঘল কালো চুল। কল্পনায় দেখে পরিপাটি শোভা শহরতলিতে তার অফিসে বসে এরই মধ্যে তিন কাপ কফি নিঃশেষ করেছে। পাঠ্যবইয়ে টাইপজনিত ভুল-ভ্রান্তি খুঁজে বের করাই তার দাফতরিক কাজ। শনাক্ত করার সময় রঙিন পেনসিল দিয়ে সে যেসব কোড লেখে তা একসময় সুকুমার বুঝে নিয়েছিল শোভার কাছ থেকে। লেখা শেষ হলে তার গবেষণাপত্রটিও দেখে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শোভা। কাজের সুনির্দিষ্টতার কারণে শোভার প্রতি এক ধরনের হিংসা অনুভব করত সুকুমার। কারণ তার চরিত্রটা ঠিক এর উলটো। সে একজন মাঝারি মানের ছাত্র, যে কিনা কোনো ধরনের কৌতূহল ছাড়াই হজম করে ফেলতে পারত অনেক কিছু। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পড়াশোনায় নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ না করলেও অধ্যায়ের সারাংশ এবং যুক্তিতর্কের আউটলাইনগুলো অত্যন্ত পরিশ্রমের সঙ্গে সে তুলে রাখত হলুদ লাইন আঁকা প্যাডের পাতায়। আর এখন সে বিরক্তিভাব না আসা পর্যন্ত বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকে। জামা-কাপড় রাখার আলমিরার পালস্না শোভা সবসময় অর্ধেক খোলা রাখে। সেই খোলা পালস্না দিয়ে সে পশমি জ্যাকেট ও মোটা সুতি কাপড়ের পাজামা রাখা তাকের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এই সেমেস্টারে ক্লাস নিতে এখান  থেকে কিছু বের করে পরতে হচ্ছে না তাকে। বাচ্চাটা এমন সময় মারা গেল যখন শিক্ষকতা থেকে সরে দাঁড়াবার মতো সময়টুকুও ছিল না। তবে তার উপদেষ্টা সবকিছুর ব্যবস্থা এমনভাবে করেছে যে, গ্রীষ্মকালীন সেমেস্টারে সে যোগ দিতে পারবে। গ্র্যাজুয়েট স্কুলে এটা সুকুমারের ষষ্ঠ বছর। ‘এই গ্রীষ্ম তোমাকে এগিয়ে নেবে’, তার উপদেষ্টা এ-কথাই বলেছেন। ‘আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে তুমি সব শেষ করতে পারবে।’

কিন্তু এখন আর কোনো কিছুতেই উৎসাহ পায় না সুকুমার। এর বদলে সে ভাবে কীভাবে এই তিন কামরার বাসায় সে আর শোভা পরস্পরকে এড়িয়ে চলতে শিখেছে। তারা যথাসম্ভব চেষ্টা করে পৃথক ফ্লোরে থাকার। সে ভাবে, এখন আর সে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে না সাপ্তাহিক ছুটির দিনটির জন্য। ছুটির দিনেও এখন শোভা রঙিন পেনসিল আর ফাইল নিয়ে সোফায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটায় প্রম্নফ রিডিংয়ের কাজ করে। সে-সময় একটা রেকর্ড চাপাতেও সুকুমারের ভয় করে পাছে শোভা ভাবে তার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করা হচ্ছে। সে ভাবে, কতদিন আগে সর্বশেষ শোভা তার চোখের দিকে তাকিয়েছিল আর হেসেছিল। ঘুমানোর আগে এখনো তারা মাঝেমধ্যে মিলিত হয়। সুকুমারের মনে নেই, এ-রকম মুহূর্তে সর্বশেষ কবে শোভা ফিসফিসিয়ে তার নাম নিয়েছিল।

প্রথমদিকে সে বিশ্বাস করত, এ-অবস্থার অবসান ঘটবে। এসব কাটিয়ে তারা আবার ফিরতে পারবে স্বাভাবিক সম্পর্কে। শোভার বয়স মাত্র তেত্রিশ। আবার সে শক্তভাবে চলাফেরা করতে শুরু করেছে। কিন্তু সেটা সান্তবনা নয়। অবশেষে সুকুমার যখন বিছানা ছাড়ল তখন প্রায় লাঞ্চের সময়। বিছানা ছেড়ে সে সোজা চলে যায় কফিপটের দিকে। শোভার রেখে যাওয়া বাড়তি কফিটুকু সে ঢেলে নেয় খালি মগে।

হাতের মধ্যে পেঁয়াজের খোসা জমিয়ে তা আবর্জনার বালতির মধ্যে ফেলে সুকুমার। ভেড়ার মাংস থেকে বের করা চর্বিযুক্ত তেনা রয়েছে বালতির ওপরের দিকেই। সিঙ্কের পানি ছেড়ে তাতে ছুরি ও কাটিং বোর্ড ধুয়ে ফেলে। তারপর আধখানা লেবু চিপে দেয় হাতের আঙুলের ডগায়। উদ্দেশ্য হাত থেকে পেঁয়াজের গন্ধ তাড়ানো। এ কৌশলটা সে শিখেছে শোভার কাছ থেকে। সন্ধে সাড়ে সাতটা। জানালা দিয়ে নরম কালো আকাশটা দেখতে থাকে সে। রাস্তার ধারে এখনো এবড়ো-খেবড়ো কিছু তুষার জমে আছে। তবে হ্যাট বা গস্নাভস ছাড়াই চলাফেরার মতো গরম পড়েছে। গেল তুষারঝড়ে রাস্তার প্রায় তিন ফুট ভেঙে পড়েছে ধারের সরু নর্দমায়। এলাকার লোকজনকে গত সাতদিন তাই এক লাইনে সরু পথে সারিবদ্ধভাবে চলাফেরা করতে হয়েছে। গত সপ্তাহে ঘর ছেড়ে না বের হওয়ার অজুহাত হিসেবে একেই দাঁড় করিয়েছিল সুকুমার। কিন্তু এখন নর্দমা প্রশস্তহয়েছে। স্বাভাবিকভাবে পানিও যাচ্ছে তা দিয়ে।

‘আটটার মধ্যে মাংস রান্না শেষ হবে না। আমাদের মনে হচ্ছে অন্ধকারে বসেই খেতে হবে’, বললো সুকুমার।

‘আমরা মোমবাতি জ্বালাতে পারি’, শোভা উত্তর দিলো। চুল ছেড়ে দিলো। দিনের বেলা সে চুল খোঁপা করে রাখে। ফিতা ঢিল না করেই পা থেকে খুলে ফেলে জুতোজোড়া। সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বলে, ‘বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগেই গোসল সেরে নেব। তারপর নিচে নামব।’

শোভার ব্যাগ ও জুতোজোড়া সুকুমার ফ্রিজের পাশে সরিয়ে রাখে। আগে এরকম ছিল না শোভা। বাসায় ফিরে কোট রাখত হ্যাঙারে, জুতো বাক্সে। যে-কোনো বিল আসার সঙ্গে সঙ্গে তা পরিশোধ করত। আর এখন এমনভাবে চলাফেরা করে যেন বেড়াতে এসে হোটেলে উঠেছে। নীল ও মেরুন রঙের তুর্কি কার্পেটের সঙ্গে হলুদ কাপড়ে আচ্ছাদিত আর্মচেয়ারটি যে বেমানান তা নিয়েও তার মাথাব্যথা নেই। বাসার পেছনের বারান্দায় থাকা নড়বড়ে শেইজটিতে এখনো পড়ে আছে সাদা কোঁচকানো ব্যাগটি। লেইস লাগানো ব্যাগটি অনেকদিন আগে শোভা কিনেছিল পর্দা বানাবে বলে।

শোভার গোসলের সময় সুকুমার গেল নিচের বাথরুমে। সিঙ্কের নিচে নতুন এক বাক্স টুথব্রাশ খুঁজে পেল। সস্তা ব্রাশ। ব্রিসল শক্ত। ব্রাশ করতে গিয়ে মাড়িতে ব্যথা পেল। সামান্য রক্ত বেরিয়েছে তা বোঝা গেল বেসিনে। লোহার বাক্সে এ-ধরনের আরো ব্রাশ জমানো। মূল্যহ্রাসের সময় শোভা কিনেছিল এগুলো। ভ্রমণকারীরা শেষ মুহূর্তে কোথাও রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেই কেবল এ-ধরনের ব্রাশ কেনে।

শোভার স্বভাবটাই এরকম। তার চরিত্রের ধরনটাই অবাক করার – কখনো ভালো, কখনো মন্দ। যদি কখনো তার কোনো স্কার্ট বা পার্স পছন্দ হয়ে যায় সে কেনে দুটো। নিজের নামে যে স্বতন্ত্র ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে সেখানে সে জমায় চাকরির বোনাসের সব টাকা। সুকুমারের অবশ্য এ নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই। বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা পড়েছিলেন অকূল পাথারে। যে-বাড়িতে সে বড় হয়েছে তা বিক্রি করে মা ফিরে গিয়েছিলেন কলকাতায়। সুকুমার থেকে গিয়ে বাড়ি বিক্রির টাকায় তার পড়াশোনা, থাকা-খাওয়ার খরচ চালিয়েছে। শোভা যে তার মায়ের মতো অগোছালো নয়, ব্যাপারটা সে পছন্দই করে। সুকুমার বিস্মিত হয় তার আগাম ভাবনার এ ক্ষমতায়। ইতালিয়ান, না ইন্ডিয়ান – কী রান্না হচ্ছে, তার ওপর বাজার-সদাই করত শোভা। হেঁসেল ভরা থাকত অতিরিক্ত অলিভ ও কর্নঅয়েলের বোতলে। বিভিন্ন সাইজের নানা রঙের পেস্তার  অসংখ্য বাক্স, চেন লাগানো বাসমতি চালের বস্তা, মুসলমান কসাইদের কাছ থেকে কেনা ভেড়া আর ছাগলের মাংস টুকরো টুকরো করে কেটে ভরানো থাকত অসংখ্য পস্নাস্টিকের ঠোঙায়। পক্ষকাল পরপর প্রতি শনিবার তারা এমনসব দোকানে যেত যার দিকে হয়তো কোনোদিন দৃষ্টিই পড়েনি সুকুমারের। অনেক অনেক খাবার কিনত শোভা। আর সুকুমার অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। ভিড়ের মধ্যে ক্যানভাসের ব্যাগ হাতে শোভার পেছন পেছন ঘুরত সুকুমার। দাড়ি-গোঁফ গজায়নি এমন ফোকলা দাঁতের ছেলেরা বাদামি কাগজে মোড়া আলুবোখারা, আদা ও ইয়াম পালস্নায় তুলে একের পর এক গছিয়ে দিত শোভার ব্যাগে। সকালের রোদে দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে দরদাম করত সুকুমার। বাজারের ভিড়ে কনুইয়ের গুঁতোকে এমনকি অমত্মঃসত্ত্বা অবস্থায়ও পাত্তা দিত না শোভা। দীর্ঘকায় সে। কাঁধ চওড়া। ভারী নিতম্ব দেখে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছিলেন মা হওয়ার উপযুক্ত তার শরীর। বাজার থেকে ফেরার পথে গাড়ি যখন চার্লসের পথে বাঁক নিত ক্রয় করা খাবারের পরিমাণ দেখে চমকে যেত দুজনই।

তাই বলে এ-খাবার কখনো নষ্ট হতো না। বন্ধুরা বেড়াতে এলেই শোভা খাওয়াত। তার আয়োজন চলত পুরো আধাবেলা জুড়ে। ফ্রিজে ও বোতলে রাখা খাবার বেরিয়ে আসত তখন।

সস্তা খাবার নয়। জাহাজে করে রোজমেরির সঙ্গে আনা খাবার আর প্রতি রোববার টমেটো এবং আলুবোখারা সেদ্ধ করে বানানো চাটনি বের করত শোভা। রান্নাঘরের বিভিন্ন তাকে নানা লেবেল আঁটা জার থাকত সারি সারি। সিল করা পিরামিডের মতো সাজানো অসংখ্য জারভর্তি খাবার দেখে মনে হতো, তাদের নাতি-নাতনিরাও বোধহয় এসব খাবারের স্বাদ নিতে পারবে। অথচ আজ খাবারের সে-স্টক নিঃশেষিত। সুকুমার এখন ধীরেসুস্থে দুজনের খাবারের জোগাড়যন্ত্র করে। চাল মাপে কাপ দিয়ে। দিনের প্রয়োজনের নিরিখে মাংসের ঠোঙা ছেঁড়ে। প্রতিদিন বিকেলে শোভার রান্নার বইটা খুঁটে খুঁটে পড়ে সে। পেনসিলে লেখা শোভার নির্দেশ অনুসরণ করে এক চা চামচের বদলে দু-চা চামচ ধনে বা মসুর ডালের বদলে অন্য ডাল দেয় সে। প্রতিটি রেসিপিতে প্রথমদিনের রান্নার তারিখ লেখা। ২ এপ্রিল তারা ফেনলের সঙ্গে ফুলকপি রেঁধে খেয়েছে। ১৪ জানুয়ারি ছিল কাজুবাদাম আর কিসমিস দিয়ে রাঁধা মুরগির তরকারি। সুকুমারের মনে নেই এসবের কথা। প্রম্নফ রিডার শোভার হাতে লেখা রয়েছে এসব। রান্না করাটা এখন সুকুমার উপভোগ করে। রান্না করে সে কাজের কাজ কিছু একটা করার অনুভূতি পায়। সে জানে, তার নিজের জন্য রান্না না করলে শোভা শুধু সেরিয়াল গরম করে খেয়েই ডিনার সারত।

আলোবিহীন বাসায় আজ রাতে দুজনকে একসঙ্গে ডিনার খেতে হবে। নিজেদের খাবারটা স্টোভ থেকে তুলে নিজেদের মতো খেয়ে মাসের পর মাস কাটিয়েছে তারা। সুকুমার পেস্নট নিয়ে সোজা চলে যায় পড়ার টেবিলে। ডেস্কে রেখে অপেক্ষা করে ঠান্ডা হওয়ার জন্য। তারপর পটাপট মুখে তোলে। আর শোভা পেস্নট নিয়ে যায় লিভিংরুমে। গেম শো দেখতে দেখতে কিংবা রঙিন পেনসিল হাতে  প্রম্নফ রিড করতে করতে সে ডিনার শেষ করে।

সন্ধ্যায় কোনো এক সময়ে শোভা যায় সুকুমারের সঙ্গে দেখা করতে। তার আসার সাড়া পাওয়ামাত্রই উপন্যাস ফেলে লেখা টাইপ শুরু করে সুকুমার। শোভা তার ঘাড়ে হাত রাখে। তারপর সুকুমারের মতোই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে কম্পিউটারের পর্দার নীল আভার দিকে। এক বা দু-মিনিট গেলে মন্তব্য করে, ‘খুব বেশি পরিশ্রম করো না।’ তারপর শোভা চলে যায় বিছানায়। সারাদিনে কেবল এটুকু সময়ই  সুকুমারের খোঁজ নেয় সে। অথচ এ-সময় সুকুমারের আচরণটাও শীতল। সে জানে, শোভার এ-খোঁজ নেওয়া ইচ্ছের বিরুদ্ধে। শোভা ঘরের দেয়ালের দিকে তাকায়। গত গ্রীষ্মে তারা দুজনে মিলে কুচকাওয়াজরত হাঁস ও ট্রাম্পেট-ড্রাম হাতে আনন্দরত খরগোশের ছবি দিয়ে ঘরটা সাজিয়েছিল। আগস্টের শেষের দিকে জানালার নিচে নকল চেরি, মিন্ট্রগ্রিন নবের একটি সাদা টেবিল এবং চেকার কুশনওলা একটি রকিং চেয়ার স্থান পায় ঘরটিতে। শোভাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসার আগেই সুকুমার ঘরটিতে পরিবর্তন আনে। সাঁড়াশির সাহায্যে খুলে ফেলে খরগোশ ও হাঁসের  ছবিগুলো। এ-রুমে ঢুকলেই শোভার কেমন যেন ভয় ভয় করে। সুকুমারের অবশ্য তা করে না। গত জানুয়ারিতে লাইব্রেরতে কাজ বন্ধের পর সে পরিকল্পিতভাবে এ-রুমেই বসায় পড়ার টেবিল। এর একটা কারণ ঘরটিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে সে। অন্য কারণটা হলো শোভা ঘরটা এড়িয়ে চলে।

রান্নাঘরে ফিরে সুকুমার ড্রয়ার খোলে। কাঁচি, ব্রাশ আর হামানদিস্তার ভিড়ে সে মোমবাতি খোঁজে। শোভা যখন রান্না করত, রসুন আর এলাচ থেঁতলাতে কলকাতা থেকে আনা হামানদিস্তাটা কাজে লাগত। সুকুমার ব্যাটারিবিহীন একটা ফ্ল্যাশ লাইট আর অর্ধেক খালি জন্মদিনের মোমবাতির বাক্স খুঁজে পায়। গত মে মাসে তার জন্মদিনে হুটহাট পার্টির আয়োজন করে তাকে অবাক করে দিয়েছিল শোভা। পার্টিতে এসেছিল একশ বিশ জন। সবাই বন্ধু অথবা বন্ধুর বন্ধু। আর এখন এই বন্ধুদের পরিকল্পিতভাবে এড়িয়ে চলে তারা। বরফভরা পাত্রে ভিনহো ভাদ্রের বোতল উপুড় করে ভরা হয়েছিল। শোভার তখন পাঁচ মাস। মার্টিনি গস্নাসে সে জিঞ্জার এলে পান করেছিল সেদিন। পার্টি উপলক্ষে কাস্টার্ড আর স্পান সুগার মিলিয়ে সে বানিয়েছিল ভ্যানিলা ক্রিম কেক। সুকুমারের আঙুলে আঙুল জড়িয়ে সারারাত পার্টিতে কাটিয়েছিল এই শোভা।

সেপ্টেম্বরের পর তাদের একমাত্র অতিথি শোভার মা। অ্যারিজোনা থেকে তিনি এসেছিলেন। শোভা হাসপাতাল থেকে ফেরার পর দু-মাস তিনি ছিলেন। প্রতিরাতে ডিনার তৈরি, সুপার মার্কেটে যাওয়া, কাপড় ধোয়া – সব কাজ সে-সময় তিনিই করতেন। ধার্মিক ছিলেন। ফ্যাকাসে বেগুনি চেহারার এক দেবীর ছবি দিয়ে তিনি একটি ছোট্ট সমাধি বানিয়েছিলেন। গেস্টরুমের বেডসাইড টেবিলের পাশে রাখা সমাধিটিতে থালায় করে হলুদ পাপড়ি রাখা হতো। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবান নাতি-নাতনির কামনায় দিনে দুবার প্রার্থনায় বসতেন তিনি। বন্ধুসুলভ না হয়েও সুকুমারের সঙ্গে নরম ব্যবহার করতেন। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ করার অভিজ্ঞতাটা বোঝা যেত যখন তিনি সুচারুভাবে ভাঁজ করতেন সুকুমারের সোয়েটারটা। উইন্টার কোটের হারিয়ে যাওয়া বোতামটা লাগানোর দায়িত্বটাও তিনিই পালন করেছিলেন। জামাইয়ের জন্য বুনেছিলেন ধূসর বাদামি রঙের একটা স্কার্ফ। কোনো ভনিতা ছাড়াই তা সুকুমারকে এমনভাবে দিয়েছিলেন যেন মনের ভুলে সুকুমারই কাপড়ের ভাঁজে স্কার্ফটা রেখেছে। সুকুমারের সঙ্গে শোভা বিষয়ে কখনোই কোনো কথাবার্তা হয়নি তার। বাচ্চার প্রসঙ্গ তিনি একবারই তুলেছিলেন। বুননের কাজ থামিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি তো তখন শোভার পাশে ছিলে না।’

মোমবাতি খুঁজে না পেয়ে সুকুমার একটু কষ্ট পেল। জরুরি মুহূর্তের জন্য সামান্য প্রস্ত্ততিও নেয়নি শোভা। জন্মদিনের মোমবাতি দাঁড় করানোর জন্য একটা কিছু খুঁজতে থাকে। সিঙ্কের ওপরে উইন্ডোসিলে রাখা আইভি গাছের গোড়ায় মোমবাতিগুলো স্থান পায়। ট্যাপ থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে গাছটা রয়েছে। তারপরও পানির অভাবে শক্ত হয়ে আছে এর মাটি। এতোটাই শক্ত যে, মোমবাতি বসানোর আগে পানি ঢালতে হয়। রান্নাঘরের টেবিলে থাকা জিনিসপত্র সে একদিকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। এর মধ্যে আছে চিঠিপত্রের সত্মূপ, আছে লাইব্রেরির বই। তার মনে পড়ে এ-টেবিলে দুজনের প্রথম আহার গ্রহণের স্মৃতি। বিয়ের পর একই বাসায় থাকতে পারবে – এ-কল্পনায় তখন তারা ভীষণ রোমাঞ্চিত। খাওয়ার চেয়ে ভালোবাসার আগ্রহটাই তখন ছিল প্রবল। লখনৌ থেকে বিয়ে উপলক্ষে তার এক চাচার পাঠানো এমব্রয়ডারির কাজ করা ম্যাট সে নামিয়ে ফেলে। অতিথিদের জন্য তুলে রাখা পেস্নট ও গস্নাসগুলোও নামায়। টেবিলের মাঝে আইভিটাকে রাখে। দশটি ছোট ছোট মোমবাতির আলোয় ঘেরা থাকে তারার মতো সাদা আইভি পাতা। ডিজিটাল ক্লক রেডিওটার সুইচ অন করে সে একটি জ্যাজ স্টেশন টিউন করে।

‘কী ব্যাপার, এসব কী?’ নিচে নেমে শোভা জিজ্ঞেস করে। পাতলা সাদা একটি তোয়ালেতে তার চুল পেঁচানো। তোয়ালেটা খুলে চেয়ারে রাখে। ভেজা কালো চুল ছড়িয়ে পড়ে তার কাঁধে। স্টোভের দিকে আনমনে এগিয়ে যাওয়ার সময় তার আঙুলে জড়িয়ে থাকে চুলের জট। পরনে পরিচ্ছন্ন সোয়েট প্যান্ট, টি-শার্ট এবং পুরনো ফ্লানেলের কাপড়ের গাউন। এখন তার পেট সমান, নিতম্ব শুরুর আগে কোমর সরু। গাউনের ফিতা আলগা করে সরু কোমরে লাগানো।

প্রায় আটটা বাজে। ভাতের থালা টেবিলে রেখে গত রাতে মাইক্রোওয়েভে রাখা ডাল গরম করতে টাইমার ঠিক করে সুকুমার। চকচকে লালমরিচের ঝোল দেখে শোভা বলে ওঠে, ‘তুমি তো রগান জোশ বানিয়ে ফেলেছ।’

সুকুমার গরম এক টুকরো মাংসে দ্রম্নত আঙুল চালিয়ে দেয়। চামচের সাহায্যে আরেকটা বড় টুকরো তুলে নিশ্চিত হয় হাড় থেকে মাংস ছাড়ানোর মতো নরম হয়েছে কিনা। তারপর ঘোষণা করে, ‘মাংস রেডি।’

লাইট নিভে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বিপ করে ওঠে মাইক্রোওয়েভ। তারপরই থেমে যায় এর মিউজিক। ‘চমৎকার টাইমিং’, শোভা বলে ওঠে। আইভির পাশে রাখা মোমবাতিগুলো জ্বালাতে জ্বালাতে সুকুমার বলে, ‘জন্মদিনের মোমবাতিগুলোই খুঁজে পেয়েছি।’ বাদবাকি মোমবাতি আর ম্যাচের বাক্সগুলো সে তার নিজের পেস্নটে রাখে।

ওয়াইনের গেলাসের সরু অংশে আঙুল বোলাতে বোলাতে শোভা বলে, ‘এটা কোনো ব্যাপার না। দেখতে দারুণ লাগছে।’

স্বল্প আলো। তবু সুকুমার জানে শোভার বসার ভঙ্গিটা কেমন। চেয়ারের একটু সামনের দিকে বসেছে। চেয়ারের সবচেয়ে নিচের ডাসাটি অতিক্রম করে গেছে গোড়ালি। বাঁ-কনুইটা টেবিলে ঠেস দেওয়া। মোমবাতি খুঁজতে গিয়ে সুকুমার খুঁজে পেয়েছে ওয়াইনের বোতলটা। অথচ ফাঁকা ভেবেই ঝুঁড়িতে হাত দিয়েছিল সে। দুই গোড়ালির ফাঁকে বোতলটি রেখে কর্ক স্ক্রু দিয়ে ছিপি খোলে। উপচিয়ে পড়তে পারে ভেবে কোলের কাছে গেলাস রেখে সে ভরায়। নিজেরাই তুলে নিয়ে খায় তারা। ভাত তুলে নেয় কাঁটা চামচ দিয়ে। ঝোল থেকে তেজপাতা ও লবঙ্গ আলাদা করার সময় পরস্পরের দিকে আড়চোখে তাকায়। কিছুক্ষণ পরপর আইভি পটে পুঁতে জ্বালায় জন্মদিনের মোমবাতি।

এসব দেখে শোভা বলে, ‘মনে হচ্ছে ভারতে আছি। সেখানে মাঝেমধ্যেই এরকম টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। আমি একবার এক অন্নপ্রাসন উৎসবে ছিলাম, পুরো উৎসবটাই হলো অন্ধকারে। যে-শিশুর মুখে ভাত দেওয়া হবে গরমে নাজেহাল বেচারা শুধু চিৎকার করেই কাঁদছিল। যা গরম পড়েছিল সেদিন।’

সুকুমার ভাবে, তাদের বাচ্চা কখনো কাঁদেনি। তাদের বাচ্চার অন্নপ্রাসন উৎসবও হয়নি। শোভা কিন্তু অন্নপ্রাসন উৎসবে কাদের নিমন্ত্রণ করবে তার একটা তালিকাও করেছিল। তার তিন ভাইয়ের মধ্যে কে বাচ্চার মুখে প্রথম শক্ত খাবার তুলে দেবে তাও ঠিক হয়েছিল। ছেলে হলে ছ-মাস বয়সে আর মেয়ে হলে সাত মাস বয়সে এ-উৎসব হবে বলেও ঠিক করেছিল শোভা।

‘খাবার কি খুব গরম?’ সুকুমার শোভার কাছে জানতে চায়। জ্বলন্ত আইভি পটটাকে সে টেবিলের অপর প্রামেত্ম ঠেলে দেয়। সত্মূপ করা বইপত্র আর চিঠিপত্রের দেয়ালে আলো আটকে যাওয়ায় দুজনের চাওয়া-চাওয়ি আরো কঠিন হয়ে পড়ে। ওপরে গিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসতে না-পারায় সুকুমারের মেজাজ ক্রমশ তেতে উঠতে থাকে।

‘খেতে বেশ লাগছে’, শোভা উত্তর দেয়। পেস্নটে কাঁটা চামচের টোকা দিয়ে সে বলে ওঠে, ‘সত্যিই খুব সুস্বাদু।’

সুকুমার ওয়াইনের খালি গেলাস ভরে দিলে সে ধন্যবাদ জানায়।

আগে তারা এ-রকম ছিল না। শোভা আগ্রহ নিয়ে শুনবে এমন কিছু বলতে এখন সুকুমারকে রীতিমতো লড়াই করতে হয় – এমন কিছু যা শুনে সে পেস্নট অথবা প্রম্নফ রিডিং ফাইল থেকে চোখ তুলে তাকাবে। আসলে আনন্দদায়ক কিছু করার চেষ্টাই সে ছেড়ে দিয়েছে।

‘আমার মনে পড়ছে, দাদিবাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের সবাইকে কিছু না কিছু বলতে হতো’, শোভা বলে চলে। সুকুমার চেষ্টা করেও তার মুখ দেখতে পায় না। কিন্তু কথা বলার ভঙ্গিতে সে অনুমান করছে শব্দ উচ্চারণের সময় শোভার চোখ ছোট হয়ে আসছে। যেন অনেক দূরের কোনোকিছুতে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। এটা তার অভ্যাস।

‘সেটা কেমন?’

‘আমি জানি না। ছোট কোনো চুটকি। পৃথিবীর বাস্তবতায় অকপট কোনো সত্যকথন। আমার আত্মীয়রা অজ্ঞাত কোনো কারণে সবসময় আমার কাছে জানতে চাইত আমেরিকান বন্ধুদের নাম। শেষ যেবার আমার ফুফুর সঙ্গে দেখা হলো, তিনি আমার চার বান্ধবীর নাম জানতে চেয়েছিলেন। তখন আমি টাকসনে এলিমেন্টারি স্কুলে পড়ি। সেই বান্ধবীদের কারো নামই এখন আমার মনে নেই।’

শোভার মতো সুকুমারের ভারতে থাকার অভিজ্ঞতা নেই। নিউ হ্যাম্পশায়ারে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী তার বাবা-মা তাকে রেখেই ভারতে যেতেন। শিশু অবস্থায় প্রথম ভারত যাওয়ার পর সে কঠিন আমাশয়ে আক্রান্ত হয়। এতে প্রায় মরতেই বসেছিল সে। নার্ভাস প্রকৃতির বাবার তাকে আর ভারত দেখার সাহস দ্বিতীয়বার হয়নি। আবার কোন অঘটন ঘটে – এই ভয়ে কনকর্ডে তাকে এক চাচার বাসায় রেখে ভারতে ঘুরতে যেতেন বাবা-মা। তরুণ বয়সে কলকাতায় গ্রীষ্ম কাটানোর চেয়ে সেইলিং ক্যাম্পে যোগ দিয়ে বা স্কুপিং আইসক্রিম খেয়ে সময় কাটানোই অবশ্য তার পছন্দ ছিল। কলেজে শেষ বর্ষে পড়ার সময় বাবা মারা যাওয়ার পর সুকুমার ভারত সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়। কোর্স বুক থেকে ভারতের ইতিহাস সে এমনভাবে পড়তে শুরু করে যেন তার সাবজেক্ট এটিই। এখন তার মনে হয়, ভারতে শৈশব কাটানোর গল্প যদি সেও করতে পারত।

‘এসো আমরাও সে-রকম করি’, হঠাৎ শোভা বলে ওঠে।

‘কী করব?’

‘এই অন্ধকারে পরস্পরকে কিছু বলা।’

‘কী বলব? আমি চুটকি-ফুটকি কিছু জানি না।’

‘না, না, কোনো চুটকি না।’ মিনিটখানেক ভেবে শোভা বলল, ‘আগে বলিনি বা বলব বলে ভাবিনি এমন কিছু যদি পরস্পরকে জানাই, কেমন হয়।’

‘হাইস্কুলের ছাত্রাবস্থায় মাতাল হলে আমি এরকম খেলায় অংশ নিতাম’, সুকুমার মন্তব্য করে।

‘তুমি সত্যি কথা বলার সাহসিকতার সঙ্গে বিষয়টি গুলিয়ে ফেলছ। ব্যাপারটা তা নয়। ঠিক আছে, আমিই শুরু করছি।’ এক চুমুক ওয়াইন গলায় ঢেলে শোভা বলল, ‘তোমার এই অ্যাপার্টমেন্টে প্রথম একা হওয়ার সুযোগ পেয়েই আমি তোমার অ্যাড্রেস বুক ঘেঁটেছিলাম। ভেবেছিলাম, তুমি আমার ঠিকানা লিখে রেখেছ। যতদূর মনে পড়ে এটা আমাদের পরিচয়ের দু-সপ্তাহ পরের ঘটনা।’

‘তখন আমি কোথায় ছিলাম?’

‘টেলিফোন ধরতে অন্য ঘরে গিয়েছিলে। তোমার মায়ের ফোন ছিল। বুঝতে পেরেছিলাম কলটা লং ডিস্ট্যান্সের। ঠিকানা ঘেঁটে আমি বুঝতে চেয়েছিলাম তুমি আমাকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছ।’

‘তা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলাম কি?’

‘না, তবে তখনো আমি তোমার ব্যাপারে হাল ছাড়িনি। এবার তোমার বলার পালা।’

সুকুমার বলার মতো কিছু খুঁজে পায় না। অথচ শোভা প্রতীক্ষা করছে। বিগত মাসগুলোতে কোনো ব্যাপারেই এতোটা প্রত্যয়ী ভাব শোভার মধ্যে আর দেখা যায়নি। সুকুমারের তাকে কিইবা বলার আছে? প্রথম দেখা হওয়ার কথা মনে পড়ল তার। কেমব্রিজে চার বছর আগে তার দেখা হয়। একদল বাঙালি কবি সেখানে কবিতা আবৃত্তি করছিল। কাঠের ফোল্ডিং চেয়ারে তারা পাশাপাশি বসা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুকুমার বিরক্ত বোধ করছিল। কবিতার মর্মকথা সে কিছুতেই ধরতে পারছিল না। ফলে অন্য দর্শকরা যেমন আবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে বা কোনো আবৃত্তাংশ শুনে আবেগে মাথা নুইয়ে ফেলছে, সে-রকমটা তার হচ্ছে না। কোলে থাকা সংবাদপত্রে ছাপা বিভিন্ন শহরের তাপমাত্রার ওপর সে চোখ বুলায়। গতকাল সিঙ্গাপুরে একানববই ডিগ্রি, স্টকহোমে একান্ন। মাথা ঘুরিয়ে বাঁয়ে তাকিয়ে সে অবাক হলো। পাশে বসা সুন্দরী মেয়েটা ফোল্ডারের পেছনে মুদির দোকানের খরচের তালিকা তৈরিতে ব্যস্ত।

‘বেশ’, স্মৃতি ঘেঁটে সুকুমার বলতে শুরু করল। ‘পর্তুগিজ এলাকায় একসঙ্গে করা আমাদের প্রথম ডিনার সারার পর আমি ওয়েটারকে বখশিশ দিতে ভুলে যাই। পরদিন সকালেই আমি  সেখানে আসি এবং বের করে ফেলি ওয়েটারের নাম। তারপর ম্যানেজারের কাছে বেচারির প্রাপ্য বখশিশ রেখে আসি।’

‘শুধু ওয়েটারকে বখশিশ দিতে তুমি সমারভিল পর্যন্ত এতোটা পথ ফিরে গিয়েছিলে?’

‘ক্যাব ভাড়া করেছিলাম।’

‘ওয়েটারকে বখশিশ দিতেই বা তুমি ভুলে গিয়েছিলে কেন?’

জন্মদিনের মোমবাতিগুলো নিঃশেষ হয়ে গেছে। শোভার  মুখাবয়ব তারপরও সুকুমারের কাছে স্পষ্ট – প্রশস্তজ্বলজ্বলে চোখ, আঙুরের মতো ঠোঁট, দু-বছর বয়সে চেয়ার থেকে পড়ে থুঁতনি থেঁতলে যাওয়ার চিহ্ন বহনকারী কমা-চিহ্ন; সব সে দেখতে পাচ্ছে স্পষ্ট। সুকুমার ভাবে, দিনকে দিন শোভার সৌন্দর্য ম্রিয়মাণ হচ্ছে। অথচ এই সৌন্দর্য একদিন তাকে বিমোদিত করেছিল। একসময় মনে হতো, এই সৌন্দর্যের জন্য কসমেটিক্স বাড়াবাড়ি। এখন সৌন্দর্য বাড়ানো নয়, মোটামুটি একটা আদল দাঁড় করাতেই কসমেটিক্স অপরিহার্য।

‘ডিনারের পর আমি একধরনের মজা অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারি’, প্রথমবারের মতো সুকুমার এ-ঘটনা নিজের কাছে, একই সঙ্গে শোভার সামনে প্রকাশ করল। সে বলল, ‘এ-অনুভূতির কারণে হয়তো আমি ভুলে গিয়েছিলাম বখশিশ দিতে।’

পরের রাতে শোভা বাসায় ফেরে স্বাভাবিকের চেয়েও আগে। গত সন্ধ্যায় রান্না করা ভেড়ার মাংস রয়েই গেছে। সুকুমার তা এমনভাবে গরম করছে যেন সাতটার মধ্যে খাওয়া যায়। গলতে থাকা তুষারের মধ্য দিয়ে হেঁটে গিয়ে সেদিন সে কোনার দোকান থেকে কিনে এনেছে এক প্যাকেট মোম আর ফ্ল্যাশলাইটের ব্যাটারি। মোমবাতিগুলো পদ্মফুলের মতো দেখতে। ব্রাশহোল্ডারে দাঁড় করিয়ে কাউন্টারের ওপর তৈরি রেখেছে সে। তবে তারা দুজনে ডিনার সারে টেবিলের ওপর ঝোলানো তামার শেড দেওয়া সিলিং ল্যাম্পের আলোয়।

ডিনারের পর শোভা তার পেস্নটের ওপর সুকুমারের পেস্নট রেখে নিয়ে যায় সিঙ্কে। সুকুমার তা দেখে বিস্মিত হয়। তার ধারণা ছিল, ডিনারশেষে শোভা চলে যাবে লিভিংরুমে, আর ব্যস্তহয়ে পড়বে প্রম্নফ রিডিংয়ের ফাইল নিয়ে।

‘ডিশ নিয়ে ভেব না’, শোভার হাত থেকে সেগুলো নিতে নিতে সুকুমার বলে।

স্পঞ্জে সামান্য ডিটারজেন্ট ফেলে শোভা উত্তর দেয়, ‘না ভাবাটা ঠিক হবে না। প্রায় আটটা বাজে।’

সুকুমারের হৃৎস্পন্দন বাড়ে। সারাদিন ধরে সে অপেক্ষা করছে কখন বিদ্যুৎ যাবে। গত রাতে শোভা ঠিকানা দেখা নিয়ে যা বলেছে তা নিয়ে ভেবেছে সে। সে-সময়েরর শোভা সম্পর্কে ভাবতেই তার ভালো লাগছিল। প্রথম দেখার সময় কত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অথচ নার্ভাস, একইসঙ্গে আশাবাদী মনে হয়েছিল শোভাকে। সিঙ্কের সামনে তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। যেন জানালার ফ্রেম ধরে রেখেছে মুহূর্তটা।  সুকুমার লজ্জা পায়। আয়নার সামনে প্রথম যেদিন তারা দুজনে একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল সেদিনও এরকম লজ্জা পেয়েছিল সে। শেষ কবে একসঙ্গে ছবি তুলেছে, তার মনে নেই। পার্টিতে যাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে। কোথাও এখন তারা একসঙ্গে যায় না। অমত্মঃসত্ত্বা অবস্থায় উঠোনে তোলা শোভার ছবির ফিল্ম এখনো তার ক্যামেরায়।

পেস্নটের খাবার শেষ করার পর খানিকটা মাথা নুইয়ে কাউন্টারে রাখা তোয়ালের দু-প্রামেত্ম হাত মুছল দুজনে। ঠিক আটটার সময় আঁধার নেমে এলো। সুকুমার জ্বালালো মোমবাতি। মোমবাতির দীর্ঘ আলো তাকে বিমোহিত করল।

‘বাইরেই বসি। আমার মনে হয় সন্ধের এখনো ঢের বাকি’, শোভা প্রস্তাব দিলো।

দুজনের হাতে মোমবাতি। সিঁড়িতে বসল তারা। বাইরে তখনো ছোপ ছোপ তুষার জমা। এমন আবহাওয়ায় বাইরে বসাটা আশ্চর্যের বইকি। আজ রাতের সতেজ বাতাস সবাইকে ঘরছাড়া করেছে। উচাটনও বোধ করছে সবাই। ভিড় বাড়ছে সিনেমায়। ফ্ল্যাশলাইট হাতে দলবেঁধে ঘুরতে বেরিয়েছে প্রতিবেশীরা।

‘বই নেড়েচেড়ে দেখতে দোকানে যাচ্ছি’, রুপালি চুলের এক প্রতিবেশী বলে উঠল। সঙ্গে আঁটসাঁট পোশাক পরা শুকনো চেহারার বউ। হাতে তার কুকুরের শেকল। ব্র্যাডফোর্ডস হিসেবে পরিচিত তারা। গত সেপ্টেম্বরে এই দম্পতি তাদের ডাকবাক্সে সহানুভূতি জানিয়ে কার্ড ফেলেছিল। ‘শুনেছি বইয়ের দোকানে বিদ্যুৎ থাকে’, যুক্তি দেয় প্রতিবেশী। ‘হ্যাঁ, তাই। তা না হলে অন্ধকারেই তোমাদের বইয়ে চোখ বোলাতে হতো’, উত্তর দিলো সুকুমার।

এ-কথা শুনে হেসে ফেলল মহিলা। স্বামীর কনুইয়ের ওপর হাত বুলিয়ে বলল, ‘তোমরা কি যোগ দিতে চাও আমাদের সঙ্গে?’

‘না, ধন্যবাদ’, শোভা ও সুকুমার একসঙ্গে বলে উঠল। শোভার সঙ্গে কণ্ঠ মিলে যাওয়ায় বিস্মিত হলো সুকুমার।

অন্ধকারে শোভা আজ কী বলতে পারে ভেবে সে রোমাঞ্চিত হচ্ছে। সবচেয়ে মনভাঙা কী বলতে পারে সে ইতোমধ্যেই তা ভেবে রেখেছে। শোভা হয়তো বলবে তার আরেকটা সম্পর্ক রয়েছে। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেও ছাত্র সুকুমারের প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। শাশুড়ির মতো দুর্ঘটনার সময় বাল্টিমোরে থাকার জন্য হয়তো তাকে দুষবে শোভা। তবে সুকুমার জানে বাস্তবে এসবের কিছুই ঘটবে না। শোভা কখনো প্রতারণা করবে না, অবিশ্বাসী হবে না। যা তার ক্ষেত্রেও সত্য। শোভা তাকে বিশ্বাস করে। সে-ই তাকে সেসময় বাল্টিমোরে যেতে উৎসাহিত করেছিল। তারা পরস্পরের  সব জানে না কি? ঘুমানোর সময় আঙুল বাঁকিয়ে শক্ত করে রাখে শোভা, সে তা জানে। আরো জানে, দুঃস্বপ্ন দেখলে ঘুমের ঘোরেই তার শরীর মুচড়ে ওঠে। সে জানে, ফুটির ওপর মধু ছড়িয়ে খাওয়া শোভার পছন্দের। হাসপাতাল থেকে ফিরে বাসায় ঢুকেই শেলফ থেকে বই, দরোজার গোড়া থেকে গাছ, দেয়াল থেকে পেইন্টিং, টেবিল থেকে ফটো, স্টোভের ওপর থেকে হুকে ঝোলানো পট ও প্যান সরিয়ে হলঘরে যাওয়ার পথে পালা করে শোভা। সুকুমার সরে গিয়েছিল সামনে থেকে। সে দেখছিল, শোভা ভীষণ হিসাব করে একঘর থেকে অন্যঘরে যাচ্ছে। একসময় জমা করা জিনিসের সত্মূপের সামনে দাঁড়িয়ে সন্তুষ্টি বোধ করে শোভা। ঠোঁট ওলটানো শোভাকে দেখে মনে হয় বিস্বাদে ভরা মুখ থেকে থুথু বেরিয়ে আসবে এক্ষুনি। এমন অবস্থায় কাঁদতে শুরু করে সে।

সিঁড়িতে বসে সুকুমারের শীত বোধ হচ্ছে। প্রথম কথাটা শোভার মুখ থেকেই বেরোনো দরকার। তাহলে সেও কথা বলতে পারবে, সে বুঝতে পারল। অবশেষে শোভা বলল, ‘তোমার মা যখন বেড়াতে এসেছিল, একদিন অফিস থেকে ফিরতে দেরি হবে বলে আমি জানিয়েছিলাম। সেদিন আসলে আমি জিলিয়ানের সঙ্গে মার্টিনি পান করতে গিয়েছিলাম।’

শোভার দিকে সে তাকায়। সরু নাক, চোয়াল অনেকটা পুরুষালি। তার মনে পড়ে যায় সে-রাতের কথা। পরপর দুটো ক্লাস নিয়ে ফিরে ক্লান্ত অবস্থায় মায়ের সঙ্গে খেতে বসেছিল। ভেবেছিল শোভা থাকবে এবং কথাবার্তা দিয়ে মাতিয়ে রাখবে খাবার টেবিল। সে এ-কাজে আনাড়ি, পটু অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলতে। বারো বছর আগে তার বাবা মারা গিয়েছে। তিনি এসেছিলেন তাদের সঙ্গে দু-সপ্তাহ থাকতে। সবাই মিলে বাবার স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল সে-সময়। প্রতি রাতেই বাবার পছন্দের কোনো তরকারি রান্না করতেন মা। কিন্তু এতো মন খারাপ থাকত যে, সেই তরকারি মুখেই তুলতে পারতেন না তিনি। বিষণ্ণ চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে শোভা তার হাত ধরত এবং সহানুভূতি প্রকাশ করে বলত, ‘বিষয়টি খুবই মর্মস্পর্শী।’ এখন সে স্পষ্ট দেখছে শোভা ও জিলিয়ান বারের স্ট্রাইপ কাভারের সোফায় বসে। জিলিয়ানকে সিগারেট অফার করছে। সিনেমা দেখে এই বারে যেত সে আর শোভা। সে কল্পনা করে, শাশুড়ির ব্যাপারে শোভা অনুযোগ করছে জিলিয়ানের কাছে। আর জিলিয়ান সহানুভূতি দেখাচ্ছে সেসব শুনে। এই জিলিয়ানই তাকে গাড়িতে করে হাসপাতাল নিয়েছিল।

‘তোমার পালা’, সুকুমারের কল্পনার রথ থামিয়ে শোভা বলে।

রাস্তার মাথা থেকে আসা ড্রিল মেশিনের শব্দ তার কানে বাজছে। সে সঙ্গে ইলেকট্রিশিয়ানদের চিৎকার। রাস্তা বরাবর এক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোর অন্ধকার মুখ দেখছে সে। এক বাড়ির জানালায় মোমবাতির আলো। এই উষ্ণ আবহাওয়ায়ও বাড়ির চিমনি থেকে বের হচ্ছে ধোঁয়া।

‘কলেজের প্রাচ্য সভ্যতা পরীক্ষায় আমি অসদুপায় অবলম্বন করেছিলাম’, সে বলে। ‘শেষ সেমেস্টারের শেষ পরীক্ষা ছিল সেটি। এর কয়েক মাস আগে বাবা মারা গিয়েছিল। পাশে বসা ছেলেটির খাতা আমি দেখতে পারছিলাম। ছেলেটি একটা আমেরিকান ম্যানিয়াক। উর্দু ও সংস্কৃত ভালো জানত। প্রশ্নপত্রে দেওয়া কবিতাংশটা গজল কিনা আমি তা বুঝতে পারছিলাম না। ওর খাতা থেকে আমি উত্তরটা নকল করেছিলাম।’

পনেরো বছরের বেশি সময় আগের ঘটনা। শোভাকে বলতে পেরে সে হালকা বোধ করছে।

শোভা তার দিকে তাকাল। মুখের দিকে নয়, তার জুতার দিকে। পুরনো মোকাসিনো। এমনভাবে সে ব্যবহার করে যেন জুতা নয়, এগুলো সিস্নপার। পেছনের চামড়া স্থায়ীভাবে বসে গেছে। যা বলল তাতে কি শোভা বিব্রত বোধ করছে, সুকুমার ভাবে। শোভা তার হাত টেনে নিয়ে চাপ দেয়। তার কাছে সরে আসতে আসতে সে বলে, ‘কেন করেছিলে তা আমাকে বলার দরকার নেই।’

নয়টা পর্যন্ত তারা দুজনে একসঙ্গে বসে থাকে। বিদ্যুৎ এলে রাস্তার অপর পারের বাড়ির বারান্দা থেকে হাততালির শব্দ আসে। টেলিভিশন অন হওয়ারও শব্দ বোঝা যায়। ব্র্যাডফোর্ড দম্পতি আইসক্রিম খেতে খেতে বাড়ি ফেরে। তাদের দিকে হাত নাড়ায়। উত্তরে তারাও হাত নাড়ে। এরপর উঠে দাঁড়ায় এবং ভেতরে যায়। তখনো শোভা সুকুমারের হাত ধরে থাকে।

ব্যাপারটা নিঃশব্দে এরকম রূপই নেয় শেষ পর্যন্ত। অনুশোচনা, ছোটখাটো কষ্ট অথবা পরস্পরের অজানা হতাশাগুলোর বিনিময়। এরপর কী বলবে তা নিয়ে পরদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবে সুকুমার। শোভা নিয়মিত গ্রাহক এমন একটা পত্রিকা থেকে সে এক মডেলের ছবি ছিঁড়ে সপ্তাহখানেক বইয়ের মধ্যে রেখেছিল। তাদের বিবাহবার্ষিকীতে শোভার উপহার দেওয়া সোয়েটারটা সে হারিয়ে ফেলেনি, বেচে দিয়েছে। সেই টাকায় সে মদ খেয়ে ভরদুপুরে মাতাল হয়েছে। প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে শোভা তার জন্য রাতে রান্না করেছিল দশ পদের তরকারি। সে তুলনায় এ বিবাহবার্ষিকীতে শুধু সোয়েটার পেয়ে সে হতাশ। কগনাকের কারণে ভারী মাথা নিয়ে সে বারটেন্ডারের কাছে অভিযোগ করে, ‘দেখ বিবাহবার্ষিকীতে বউ আমাকে সামান্য সোয়েটার দিয়েছে।’ বারটেন্ডার তা শুনে জবাব দিয়েছিল, ‘তুমি বিবাহিত। বউয়ের কাছে আর কী আশা করো?’ দুটো ঘটনার কোনটা আজ বলবে তা নিয়ে দ্বন্দ্বে ভোগে সুকুমার।

মহিলার ছবি কেন রেখেছিল তার উত্তর সে জানে না। সেই মডেল শোভার মতো সুন্দরী নয়। পরনে ছিল চুমকি বসানো সাদা পোশাক। চেহারা শক্ত এবং গড়নে কিছুটা নুইয়ে পড়া ভাব। আর পা জোড়া পুরুষালি নগ্ন হাত ওপরে তোলা, মাথার ওপর মুঠো করা। দেখে মনে হয় যেন নিজের কানে নিজেই ঘুষি মারতে উদ্যত। মোজার বিজ্ঞাপন ছিল এটি। শোভার পেটে তখন বাচ্চা। হঠাৎ করে বেশ ফুলে উঠেছে তার পেট। এ-অবস্থায় সুকুমার আর তাকে ছুঁতে চায় না। বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় প্রথমে ছবিটার দিকে তার নজর পড়ে। শোভা পত্রিকাটা পড়ছিল। রিসাইক্লিংয়ের জন্য জমা করা বিভিন্ন জিনিসের মধ্যে সে পত্রিকাটা পেয়ে যায়। মডেলটির ছবি বের করে যত্নের সঙ্গে সে ছিঁড়ে রাখে এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন একবার ছবিটা দেখত সুকুমার। মহিলার প্রতি প্রচ- কামবোধ করত। এক বা দু-মিনিট পরেই এই কামনা বিরক্তিতে পরিণত হতো। শোভার প্রতি তার অবিশ্বাসী হওয়া এটুকুই।

তৃতীয় রাতে সে শোভাকে সোয়েটার বিক্রির ঘটনাটা বলে। চতুর্থ রাতে ছবিটার কথা। এসব শুনতে গিয়ে শোভা প্রতিবাদ বা ক্ষোভ কিছুই প্রকাশ করেনি। শুধু শুনে গেছে। তারপর হাতটা টেনে নিয়ে আগের রাতের মতো চাপ দিয়েছে। তৃতীয় রাতে শোভা বলেছে, ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করার সময় একবার তার চিবুকে পেস্ট্রির দাগ লেগেছিল। দেখেও সে তা মুছতে বলেনি। কারণ, কোনো একটা বিষয়ে সে তখন মহাবিরক্ত ছিল, তার ওপর চেয়ারম্যানের সঙ্গে সুকুমার পরবর্তী সেমেস্টারে ফেলোশিপ পাওয়ার উপায় নিয়ে আলাপ করতে গিয়েছিল। শোভা তখন একবারো নিজের চিবুক দেখিয়ে ইশারা করে বলেনি পেস্ট্রির দাগের কথা। চতুর্থ রাতে শোভা বলেছে, সারাজীবনে সুকুমারের লেখা একমাত্র প্রকাশিত কবিতাটা তার ভালো লাগেনি। সাহিত্য পত্রিকা উতাহতে প্রকাশিত কবিতাটা সুকুমার লিখেছিল শোভার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের পর। শোভার মতে, কবিতাটি আবেগের আতিশয্যের কারণে কবিতা হয়ে ওঠেনি।

বাসায় আলো না থাকলে কিছু না কিছু ঘটে। শোভা ও সুকুমার আবার নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু করতে পেরেছে। তৃতীয় রাতে খাওয়ার পর দুজনে সোফায় বসে। বিদ্যুৎ চলে গেলে সুকুমার শোভার কপালে, গালে চুমু খেতে শুরু করে। অন্ধকার সত্ত্বেও তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। সে জানে, শোভাও চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। চতুর্থ রাতে তারা ওপরতলার বিছানায় যায় একসঙ্গে। বিছানায় শরীর এলানোর ঠিক আগের পদক্ষেপেই তারা একাত্মতা অনুভব করে। তারপর ভুলতে বসা উন্মত্ততায় মিলিত হয়। নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে শোভা। ফিসফিসিয়ে সুকুমারের নাম নেয় আর আঙুল দিয়ে খুঁজে ফেরে তার ভ্রম্ন। ভালোবাসতে বাসতে সুকুমার ভাবে পরের রাতে কী বলবে, শোভাই বা তাকে কী শোনাবে। এই ভাবনায় শিহরণ অনুভব করে সে। ‘আমাকে ধরো’, সুকুমার ফিসফিসিয়ে বলে, ‘আমাকে জড়িয়ে থাকো’। যখন বিদ্যুৎ এলো, গভীর ঘুমে অচেতন দুজনে।

পঞ্চম রাতের সকালবেলা ডাকবাক্সে বিদ্যুৎ কোম্পানির আরেকটা নোটিশ পেল সুকুমার। নোটিশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই লাইন মেরামত করা গেছে। হতাশ হলো সে। শোভার জন্য আজ সে চিংড়ির মালাই রাঁধার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু দোকানে আসার পর সে-ইচ্ছা উবে গেল তার মন থেকে। ব্যাপারটা আর আগের মতো নেই, সে ভাবে। সে জানে আজ আর বিদ্যুৎ যাবে না। দোকানের চিংড়িগুলো ধূসর এবং হালকা। নারিকেলের দুধের টিনে ময়লা জমা আর দামও বেশি। তারপরও সে কিনল। সঙ্গে নিল মৌমাছির চাক থেকে তৈরি মোমবাতি, আর দু-বোতল ওয়াইন।

শোভা ফিরল সাড়ে সাতটায়। তাকে নোটিশটা পড়তে দেখে সুকুমার বলে উঠল, ‘মনে হচ্ছে, আমাদর খেলা আজ এখানেই শেষ।’

‘তুমি চাইলে এখনো মোমবাতি জ্বালাতে পারো’, শোভা বলল। আজ রাতে শোভা জিমে যায়নি। রেইনকোটের নিচে সে পরেছে স্যুট। সম্প্রতি তার মেকআপেও পরিবর্তন এসেছে।

কাপড় ছাড়তে শোভা ওপরে গেলে সুকুমার নিজের জন্য কিছুটা ওয়াইন ঢালে। তারপর চালু করে শোভার প্রিয় থেলনিয়াস মঙ্ক অ্যালবামের রেকর্ডখানা।

শোভা নেমে আসার পর দুজনে একসঙ্গে ডিনার সারে। রান্নার জন্য কোনো ধন্যবাদ বা সৌজন্যমূলক কোনো কথাবার্তা বলল না শোভা। মোমের আলোয় আধো আঁধারে নীরবে ডিনার শেষ করে। একেকদিনে এ-মুহূর্তটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। চিংড়ি সাবাড় করে দুজনে এক বোতল ওয়াইন পান করে ফেলে। তারপর খোলে দ্বিতীয় বোতলটা। মোমবাতিটা প্রায় নিঃশেষ হওয়া পর্যন্ত দুজনে একসঙ্গে বসে থাকে। তারপর শোভা বসে চেয়ারে। সুকুমার ভাবে, হয়তো কিছু বলতে চাইছে শোভা। তার বদলে সে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দেয় মোমবাতিটা। তারপর লাইট অন করে বসে পড়ে।

‘আমরা কি লাইট অফ রাখতে পারি না?’ সুকুমার জানতে চায়।

পেস্নট সরিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত টেবিলে রাখে শোভা। তারপর শান্তভাবে বলে, ‘আমি চাই, এখন যা বলব তা শোনার সময় যেন আমার মুখ দেখতে পাও তুমি।’

সুকুমারের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। তার মনে পড়ে, একই ভঙ্গিতে একই উচ্চারণে শোভা তাকে দিয়েছিল পেটে বাচ্চা আসার খবর। সুকুমার তখন টিভিতে বাস্কেটবল খেলা দেখছিল। টিভিটা বন্ধ করে খবরটা দেয় শোভা। তখন তা শোনার জন্য সে মোটেও প্রস্ত্তত ছিল না। তবে আজ সে প্রস্ত্তত।

শোভার পেটে বাচ্চা আসুক এখন তা সে চায় না মোটেই। সুখী হওয়ার অভিনয়ও আর সে করতে চায় না।

‘আমি একটা অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজছিলাম এবং তা পেয়ে গেছি’, মনে হচ্ছে সুকুমারের বাঁ কাঁধের পেছনে থাকা কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে দু-চোখ কুঁচকে কথাগুলো বলছে শোভা। সে বলতে থাকে, ভুলটা দুজনের কারোরই নয়। সম্পর্ক যথেষ্ট গড়িয়েছে। এখন একা থাকার জন্য তার কিছুটা সময় দরকার। নিরাপত্তা ডিপোজিটে সে কিছু টাকা জমিয়েছে। অ্যাপার্টমেন্টটা বিকন হিলে। অফিসের কাছে হওয়ায় সে হেঁটেই যাতায়াত করতে পারবে। আজ রাতে বাড়ি ফেরার আগে সে লিজের কাগজে স্বাক্ষর করে এসেছে।

শোভা সুকুমারের দিকে তাকায় না। কিন্তু সুকুমার তার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে। কথাগুলো বলার আগে শোভা অনেকবার  রিহার্সেল দিয়েছে – এ-ব্যাপারে সুকুমার নিশ্চিত। আর তারই ফাঁকে অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজেছে, বাসায় বাসায় ট্যাপ খুলে পানির চাপ পরীক্ষা করেছে। ভাড়ার মধ্যে গরম ও ঠান্ডা দু-ধরনের পানি সরবরাহের খরচ ধরা হয়েছে কিনা রিয়েলটারের কাছে তা জানতে চেয়েছে। গত কয়েকদিনে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সন্ধ্যা কাটানোর সময়ই সে তাকে ছাড়া জীবনযাপনের প্রস্ত্ততি নিচ্ছিল – এটা বোঝার পর সুকুমারের মনে বিতৃষ্ণা ভর করে। শোভার কথা তাকে স্বসিত্ম দিয়েছে। আবার একই সঙ্গে মনটা তেতেও উঠেছে। তাহলে গত চার সন্ধ্যা ধরে এ-কথাই তাকে বলতে চেয়েছে শোভা। খেলা চালানোর উদ্দেশ্য তাহলে এই।

এবার সুকুমারের বলার পালা সে প্রতিজ্ঞা করেছিল বিষয়টা শোভাকে কোনোদিন জানাবে না। মন থেকে বিষয়টা যেন বেরিয়ে না আসে সে-ব্যাপারে গত ছ-মাস সতর্ক ছিল সে। আলট্রাসাউন্ড করার আগে শোভা ডাক্তারকে বলেছিল সমত্মানের লৈঙ্গিক পরিচয় ফাঁস না করতে। সুকুমারেরও সম্মতি ছিল তাতে। শোভা সারপ্রাইজ হিসেবেই দেখতে চেয়েছিল বিষয়টিকে।

তারপর সামান্য যে-কয়বার বিষয়টা নিয়ে কথা হয়েছে, শোভা বলেছে, অন্তত এ-বিষয়টা আমরা জানি না। বলার ধরনটা দেখে সুকুমারের মনে হয়েছে সে তার সিদ্ধামেত্মর কারণে গর্ববোধ করে। আসলে বাচ্চার লৈঙ্গিক পরিচয়ের মধ্যে থাকা রহস্যের মধ্যে সে ভুলতে চায় বাচ্চা হারানোর দুঃখ। সুকুমার জানে, শোভার ধারণা তার কাছেও ব্যাপারটা সমান রহস্যময়। সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর সে ফিরেছিল বাল্টিমোর থেকে। শোভা তখন হাসপাতালের বিছানায় শায়িত। কিন্তু সুকুমার তো সুস্থ। শেষকৃত্যের আগে বাচ্চাটিকে একনজর দেখার মতো পর্যাপ্ত সময় সে পেয়েছিল। শোভার সিদ্ধামেত্মর প্রতি সম্মান জানাতে প্রথমে বাচ্চাটিকে দেখা থেকে বিরত থাকতে চেয়েছিল সে। কিন্তু ডাক্তার উপদেশ দিয়েছিলেন, বাচ্চাকে ধরলে তার কষ্ট কিছুটা লাঘব হতে পারে। শোভা ঘুমে অচেতন। বাচ্চার শরীর পরিষ্কার করা হয়েছে। পৃথিবীর আলো দেখা থেকে বিরত রাখতেই যেন শিশুটির চোখের পাতা শক্ত করে বন্ধ।

সুকুমার বলে, ‘আমাদের ছেলে হয়েছিল। ধূসরের চেয়েও লালচে ছিল তার ত্বক। মাথায় কালো চুল। ওজন ছিল প্রায় পাঁচ পাউন্ড। রাতে ঘুমানোর সময় তোমার আঙুল যেমন কু-লী পাকানো থাকে, তেমনি পাকানো ছিল বাচ্চার আঙুল।’

শোভা এখন তাকায় তার দিকে। শোভার মুখাবয়বে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। কলেজের এক পরীক্ষায় সে  নকল করেছে, ম্যাগাজিন থেকে ছিঁড়ে রেখেছে এক মডেলের ছবি, সোয়েটার বেচা টাকায় মদ খেয়ে ভরদুপুরে মাতলামো করেছে। এসব কাহিনি সে শোভাকে বলেছে। সে তার ছেলেকে কোলে নিয়েছিল। মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় যে ছেলের শরীরে স্পন্দন ছিল। হাসপাতালের অজানা এক অন্ধকার ঘরে সে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকে নার্স বাচ্চাটিকে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সুকুমার জড়িয়ে রেখেছিল তাকে। শোভাকে ঘটনাটা জানাবে না বলে সেদিনই সে প্রতিজ্ঞা করেছিল। কারণ তখনো শোভাকে ভালোবাসত সে। তাছাড়া শোভা বিষয়টাকে ‘সারপ্রাইজ’ হিসেবে চেয়েছিল।

সুকুমার উঠে দাঁড়ায়। শোভার পেস্নটের ওপর নিজের পেস্নটটা রাখে। সেগুলো সিঙ্ক পর্যমত্ম নিয়ে যায়। তারপর ট্যাপটা না ছেড়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। বাইরে তখনো সন্ধের ঢের বাকি। ব্র্যাডফোর্ডস দম্পতি হাতে হাত রেখে হাঁটছে। এ-দৃশ্য দেখার সময়ই ঘরে অন্ধকার নেমে আসে। ঘুরে দাঁড়ায় সে। শোভা লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। তারপর টেবিলে ফিরে বসে পড়ে। কয়েক মুহূর্ত পর সুকুমারও যোগ দেয় তার সঙ্গে। একটু আগে জেনে যাওয়া বিষয়গুলো কাঁদাতে থাকে দুজনকে।