September
-

শিরোনামহীন
মুস্তাফা মনোয়ার জলরঙে সিদ্ধহস্ত এক চিত্রকর। জলরঙের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এদেশের একজন শীর্ষশিল্পী। নিসর্গ ও বাংলাদেশের শ্যামল রূপ তাঁর সৃষ্টিতে মনোগ্রাহী এক অবয়ব নিয়ে প্রতিবিম্বিত হয়। এই চিত্রাবলিতে দেশ আত্মার মর্মবেদনাও কখনো পরিস্ফুট হয়। তিনি তেলরঙের কাজেও পারদর্শী। পঞ্চাশের দশকের মধ্য পর্যায়ে তিনি কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে এই…
-

আমার যতীন স্যার
যতীন স্যারের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দিনটি এখনো স্পষ্ট মনে আছে। ১৯৯৫ সাল। ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র আমি। দৈনিক পত্রিকায় গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে চিঠি লিখি, এখানে-ওখানে বিতর্ক করি; ভালো ছাত্র হিসেবেও সুনাম রয়েছে। যতীন সরকার নামে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ময়মনসিংহে আছেন তা আমি জানতাম, বাবার মুখে তাঁর নাম শুনেছি একাধিকবার। কখনো তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের…
-

ছাঁচ ও ছাঁচের বাইরের যতীন সরকার
আধুনিক যুগ শ্রমবিভাজনের যুগ। যে-শ্রমিক কারখানায় জুতার তলা নিয়ে কাজ করেন, তিনি অন্য অংশের খোঁজ রাখেন না; দরকার পড়ে না। কারণ, তার কাজের সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় হুন্দাই কোম্পানির গাড়ি বানানোর কারখানায় গেলাম। দেখলাম, ক্রেনের মাধ্যমে নির্মিতব্য গাড়ি একটা লাইনের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। খানিক পরপর একজন করে শ্রমিক দাঁড়িয়ে আছেন। গাড়ি একেকজন…
-

যতীন সরকারের সংস্কৃতি-ভাবনা
যতীন সরকারের (১৯৩৬-২০২৫) পরিচয় বহুবিধ। তিনি শিক্ষাবিদ, সমাজচিন্তক, সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিমান। রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন কিছুকাল। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন গণমানুষের প্রতি নিবেদিত কণ্ঠস্বর। যতীন সরকার বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর কাজের জগৎ ব্যাপৃত। বিশেষ করে সংস্কৃতি নিয়ে তিনি আমৃত্যু কাজ করেছেন। সাংস্কৃতিক…
-

প্রেমের রঙে সুরের তান
‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কে কোথা ধরা পড়ে, কে জানে’ – কবিগুরুর অমোঘ সাবধানবাণী। বাস্তবিক অর্থে ফাঁদে আমরা কেই-বা পড়তে চাই? কিন্তু প্রেমের ফাঁদ বড় আকর্ষণীয়, – এতে পড়ার জন্য উন্মুখ নয়, এমন নিরস মানুষের দেখা মেলা ভার। এই জগতে আমাদের আটপৌরে জীবনের মর্মমূলে কিন্তু সেই প্রেম। আবার একদিকে সকল সৃজন, সকল লালন; অন্যদিকে সকল…
-

মহুয়া বনের পাখি
তাকে এখন খিদিরপুরের দিকে যেতে হবে। যেজন্য এসেছে এ-ঘটনার শুরু হয়েছে অনেক অনেক বছর আগে। একটা হ্যাপা। বলতে গেলে বড় হ্যাপাই আজ পোহাতে হচ্ছে দীপ্তকে। এটা সে ইচ্ছা করেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। না নিলেও পারতো। কাউকে সে বলেনি। বলার কথাও নয়। সাত-আট দিন আগে কলকাতায় এসেছে একটা ব্যবসায়িক কাজে। দীপ্ত ঢাকায় একটা বায়োমেডিক্যাল রিএজেন্টের…
-

মহাকালের বাতিঘর
চলমান এক অশরীরী, রহস্যময় এক প্রাণ, কখনো ছায়া, কখনো কায়া, হঠাৎ চমকে দেওয়া প্রাগৈতিহাসিক যুগের পাথরে খোদাই মুখচ্ছবি কালের ওপারে জেগে থাকা মহাকালের বাতিঘর, অযুত আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে আসা কোনো ভিনগ্রহের মানুষ যেন পৃথিবীর দরজায় এসে কড়া নাড়ছেন। নক্ষত্রসমান ঔজ্জ্বল্যে ভরা জাগর অপার্থিব মুখ, অন্ধকারের আলখেল্লা পরা এক আদিম গুহামানব – এস এম সুলতান। মাটি…
-

এস এম সুলতান স্বাস্থ্যবান কৃষকের সন্ধানে
৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৫। নদীর মধ্য দিয়ে আমরা ছুটে চলেছি। ঘণ্টা তিনেক হয়েছে। সকাল সোয়া ৮টায় রওনা দিয়েছি। একটানা ট্রলার ইঞ্জিনের শব্দ বেজেই চলেছে। চিত্রা নদী দিয়ে ছুটে চলা। নড়াইল শহরের পাশঘেঁষে চিত্রা নদীর প্রবাহ। অনেকেই বলেন, এই নদীর দু’কূল চিত্র বা ছবির মতো সুন্দর বলেই এর নাম হয়েছে চিত্রা। চিত্রা নদীর সঙ্গে কেমন নিবিড়ভাবে এস…
-
কৌশিক জোয়ারদারের নীৎশে : তেজি বাতাসের ঘ্রাণ
দর্শনের ইতিহাস কম-বেশি প্রায় তিন হাজার বছরের। এই দীর্ঘ সময়কালে ফ্রিডরিশ নীৎশের মতো এত বিপরীত চিন্তাধারার দ্বন্দ্বসংকুল উজান স্রোতে খুব কম দার্শনিককে তরী ভাসাতে দেখা গেছে। এত অশ্রুতপূর্ব কথা – এমন সৌন্দর্যময় কাব্যভাষায় দর্শনচর্চা – হাতেগোনা দু-একজন দার্শনিক ছাড়া বিরল। স্পষ্টতই নীৎশের চিন্তন, মনন, সৃজন আপাতবিরোধী। তিনি এমন এক চিন্তক যাঁকে একাধারে বইতে হয়েছে বহু…
-

আমিনা ফুপু
আমার বাবার মোট ভাইবোন ছিল আটজন। বড় পিসি বা ফুপু আনোয়ারা। তিনি বিবাহিত জীবনে বাইশ বছর বয়সে মারা যান। বাবা ছিলেন দাদা শেখ মোহম্মদ এহিয়া ও দাদি গুলেজান বেগমের দ্বিতীয় সন্তান। পুত্রসন্তান হিসেবে প্রথম। আনোয়ারা পিসিকে আমি দেখিনি। অর্থাৎ আমি জন্ম নেওয়ার আগেই তিনি ইহকাল ত্যাগ করেন। বাকি যাঁদের আমি দেখেছি ও জীবন কাটিয়েছি তাঁরা…
-

উড়ে যায় মনপাখি
তুমি যাবেই? বিছানার পাশে বসে সুপ্তি রাতের প্রসাধন সারছে। শরীরে হালকা লাল নাইটি। ভেতরে সাদা ব্রা। পুতুলের মতো সাজানো শরীর সুপ্তির। রাতের এই প্রসাধনের মুহূর্তে শাকিল যেখানেই থাকুক, সুপ্তির জন্য বসে থাকে। বেশ সময় নিয়ে প্রসাধন সারে নিজের। এই সময়টুকু তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে সুপ্তিও। আগামী সপ্তাহে চলে যাবে সুইজারল্যান্ড, এক বছরের জন্য। শাকিল হাসানের…
-

বিদীর্ণ দর্পণ
ঢাকা টু লন্ডনের ফ্লাইটগুলি সব সময়ই যাত্রীবোঝাই থাকে। আজ পর্যন্ত যতবার এই ফ্লাইটে উঠেছি, ততবারই সেই একই চিত্র – ফ্লাইট কানায় কানায় পূর্ণ। তাই আশ্চর্য হলাম যখন দেখলাম ফ্লাইট ছাড়ার আগমুহূর্তেও আমার পাশের সিটটা খালি পড়ে আছে। সম্ভবত সারা ফ্লাইটে এই একটি সিটই এখন পর্যন্ত বেদখল আছে। কেবিন ক্রুরা ব্যস্ত হয়ে সবকিছু দেখে নিচ্ছে ঠিক…
-

রায়েরবাজার পাল বংশের ইতিহাস
রায়েরবাজারে একসময় যখন ঘরে ঘরে পাল বংশের কুমার শিল্পীরা মাটি নিয়ে কাজ করেছে, তখন এরা কাদামাটির মধ্যে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকত। সে হিসাবে এদের গায়ে, ঘামে ও রক্তে কাদামাটি মিশে গিয়েছিল। এখন রায়েরবাজার শেরেবাংলা রোড তার ১৫ ফুট প্রশস্ত ক্ষতবিক্ষত বুক থেকে যে ধুলোবালির জন্ম দেয় তা দুই পাশের হাইরাইজ বিল্ডিং হাউস অ্যারেস্ট করে রাখে…
-

ঘুমন্ত পাখি
বাজান খোলা বারান্দায় বইসা জাল বুনতাছে। আমারে ডাইকা কইল, এইদিকে একটু আয় মা। আমারে এক গ্লাস পানি দে। উর্মি একটা ইস্টিলের গেলাসে পানি দিয়া কইল, বাজান, জোনাকি ঘরে নাই। – ক্যান, কই গেছে ভরদুপুরে? – খালের ঘাটে পানি আনবার গেছে বাবা। বাজান হুঁক্কা খাইতাছে আর জাল বুনতাছে। – জাল বুনার সময় হুঁক্কা না খাইলে শরীর…
-

হরিপুর জমিদারবাড়ির ইতিহাস ও ঐতিহ্য
সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন জনগোষ্ঠীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার নিদর্শন হলো পুরাকীর্তি। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় অতীতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের মাধ্যমে যেমন পাওয়া সম্ভব অতীত সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সন্ধান, তেমনই প্রত্নতত্ত্ব জনজীবনের ইতিহাসকে দিয়েছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। কোনো একটা নির্দিষ্ট অঞ্চল এবং সে-অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে মানুষের আগমন, তাদের সামাজিক,…
-
শব্দায়ন – এ স্ট্যান্ডআপ পোয়েট্রি প্ল্যাটফর্ম কবিতা পাঠ ও চর্চায় নতুন সংযোজন
আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে কবিতা নিয়ে এক নতুন ধরনের কর্মযজ্ঞ হলো ঢাকায়। কবিতার আনুষ্ঠানিক আবৃত্তি যেমন হয়, ঠিক তেমন কোনো আয়োজন নয়, আবার কবিতা পাঠেরই অনুষ্ঠান। কিন্তু কবিতা পাঠে নতুন যে-মাত্রা যোগ করা হলো তা রীতিমতো দর্শক-শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। প্রতিটি কবিতার ভাব ও গাম্ভীর্য অনুযায়ী মঞ্চে বেজে ওঠে আবহসংগীত। প্রয়োজনে যুক্ত হয় কনটেম্পরারি কোরিওগ্রাফি।…
-
রহস্যময়ী
কেটে গেছে অনেকগুলো বছর পদ্মদিঘির পাড়ে জমে উঠেছে শ্যামলা রঙের দিনগুলো নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে হেরে যাচ্ছি সমাজ-বন্ধুর কাছে অযথা নিজেকে লুকিয়ে রাখার নির্মম বাসনায় পালিয়ে বেড়াই। গভীর থেকে গভীরতার মধ্যেও তলিয়ে যায়, সে কি আশ্রয় চেয়েছিল হাতের তালুতে, জানি না তবে সে ফিরেছে নৈর্ব্যক্তিক আঙ্গিকে ঘন কুয়াশার ভেতরে মিশে যাচ্ছে দুধসাদা জোছনার পথে…
-
সে আশ্চর্য দহ
হৃদয় এক আশ্চর্য দহ বলেছি যেই খিলখিল, শ্যামা বউদির হাসি উল্লোল; হিল্লোল থামলে ঘোমটা নামিয়ে চোখের গহন কাজল তুলে টিপ আঁকলেন কপালে শরাহত পথিক সে-জন, বোঝে এক নয় – ভুবন, আঁচলে সামান্যই ঢাকে। তোলপাড় দহের জল শ্যামাবউটি দরজা সদরের।
-
রঙ্গন চুম্বন চায়
খোঁপায় বাগান সুন্দর হইল রঙ্গন ফুলের রংটা লাল সংযম ধইরা রাখতে কষ্ট মন কী ব্যাকুল হয় বেহাল। ছোঁয়া যায় না সেই ফুলে রে রই বেচইন কোন ভুলে রে দুঃখের নিশি কাটতে চায় না কিচ্ছুতে আর শান্তি পায় না দেখবে কবে ভোর সকাল। রঙ্গন পুষ্পের বর্ণিল ছটায় আবেগ-উচ্ছ্বাস ধুলায় লুটায় বুকের ভেতর দ্যায় সে মোচড় কাঁইপা…
-
বন্দি পাখি
পরিণাম যে নির্মম হবেই আগে থাকতেই জানা চারপাশে খুব কড়াকড়ি বিঘ্ন বিপদ নানা জাইনা-শুইনাই বিষ খাইয়াছি বিষের বর্ণ নীল দংশন ছোবল জান পেরেশান মৌচাকে দ্যায় ঢিল পরানপঙ্খি আমি তোমার খুলবা কবে খাঁচার দুয়ার ভালোবাইসা হইছি কঙ্কাল খাইতে দিচ্ছ সকাল-বিকাল একটু পানি দানা। ওড়াউড়ি আর কী হবে? মুক্ত স্বাধীন হই যে কবে বন্দি যে একটানা।
-
ছায়াতে বিলীন
যখন নিজের ছায়াকে আর দেখা যায় না চিত্ররূপ মনের ভেতরে থেকে প্রখর দুপুরবেলায় পারম্পর্য রেখে যে-ছবি ভেসে ওঠে চোখের সমুখে চোখের পেছনে ঠিক অন্যরূপ। মধ্যদুপুরে বদলে যায় ছায়া-প্রচ্ছায়া কখনো নিহিত হয় কিংবা নিহত হয় মিশে যাওয়া রোদের ভেতর নির্ণীত মুখের কাঠামো খুঁজতে গিয়ে নিজের ছায়ার সাথে নিজেকে মেলাতে ব্যর্থ এই আমি ছায়াতে বিলীন। কখনো কখনো…
-
ঢেউমন্ত্র
ফিরে গেলে এবার – মন্ত্র দেবো তোমায় কীভাবে ঢেউমন্ত্রে পার হতে হয় নৌ-যুবতীর গাঙ আমি যে বাড়তি দেহের মানুষ জানবে কোনো কোনো পারাপার কেন এত সহজ নয় যেমন এত সরল সমীকরণ নয় মালা গাঁথার ফুলপথ ওই অর্ঘ্যরে অঙ্গে লেগে আছে প্রজাপতিদের আকাশ নামানো বর্ষার গান মৌরানির ফুল থেকে ফুলে নিষিক্ত সময়ের ঘ্রাণ শত স্মৃতি স্মরণ…
-
মহাপ্রস্তুতি
আরো এক হাজার বিস্ময়কর কবিতা লেখার প্রস্তুতি চলছে এবং এক হাজার পিরামিড তৈরির পরিকল্পনা যে-সমস্ত বই এখনো লেখা হয়নি সেগুলো মুদ্রণের কার্যাদেশ চূড়ান্ত কারাগারের ফটকগুলো ফাঁক যেন বন্দিরা ইচ্ছেমতো ঢুকতে কিংবা বেরুতে পারে আর লাইব্রেরির দরোজা বন্ধ কেননা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব বই না পড়ে কেউ বেরুতে না পারে ব্যাংকগুলো তার প্রয়োজন হারিয়েছে ফলে এখন সবার…
-
প্রশ্ন
গভীর রাতের সাথে জলের কী কথা হয় সাগরমুখী সব নদী হয়তো জানে আমার জানার ইচ্ছে হলে আমি ডেকের জানালায় বাতাসের কাছে জানতে চাই সে কোনো উত্তর দিতে পারে না ঘনকুয়াশামাখা রাতে চাঁদের মৃত্যু হলে অন্ধকার আরো ঘনীভূত হয় চোখের সব শক্তি দিয়ে তাকিয়ে থাকি কোন দিকে পৃথিবী? কোনদিকে মানবজনম? অসীমের সাথে তার যোগ? নাকি নিবিড়…
