সুখবাস

লেখক:

জ্যো তি প্র কা শ  দ ত্ত

সব ভোরে পাখি ডাকে না

চলে আসার সময় বারবার তাকিয়ে পেছনের দৃশ্যাবলি হৃদয়ে তুলে নিতে হয়। যেন কখনো ঝাপসা হয়ে না যায়। প্রিয়জনের সাশ্রম্নবিদায়, বন্ধুর শেষ আলিঙ্গন, পরিচিতজনের মুখে শুভেচ্ছার স্মিত হাসি, সব মনে আছে। মাত্র কটি বছর দেখতে-দেখতে কেটে যাবে চিরকালের এই সান্তবনা মনে প্রবল না-হলে মূল ছিঁড়ে আসা কত কষ্টের সে আরো ভালো বুঝত।

কিন্তু উত্তেজনাও ছিল – আশার স্বপ্নের অজানার, আদর্শের। কৈশোর ও যৌবনের সমাজকল্যাণচিন্তা মনে প্রবল ছিল। আহরিত জ্ঞান স্বার্থসেবী হবে না এই বোধ তীব্র ছিল। তাই সে ভেবেছিল ফিরবেই একদিন।

 

দুই

চলে আসার অনুমতি পেতে সময় লেগেছিল তিন বছর। কত জন, কত দপ্তর, কত জিজ্ঞাসার জবাব। মনে হয় সবই বুঝি তারই জন্যে। সেসবের তিক্ততা এখন প্রায় তিরোহিত। যাদের শাসনে প্রাক্যৌবনে প্রিয় শহর ছাড়তে হয়েছিল তাদের কথা এখন যেন মনেই পড়ে না। যাদের নির্দেশে যোগ্য কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত ছিল, তাদের প্রতি কোনো বিতৃষ্ণাও আর নেই।

ক্ষোভ, বিষাদ, ভিন্ন এক হতাশা এখন সঙ্গী। তুলে-রাখা সেইসব দৃশ্যাবলির অবিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে নিজেকে আর দেখা যায় না। তাই সে দুঃখী।

করণীয় কী ভেবেছে সে অনেকবার। নিজেকে সেই দৃশ্যে প্রোজ্জ্বল করার চিন্তাও তাকে কখনো ছাড়ে না। এভাবেই নিজ

সীমায় আবদ্ধ সে।

ধূলিমুঠি তার হাতে সোনামুঠি হয়নি। অতিপরিশ্রম ও ব্যয়সংকোচের সমাহারে সঞ্চয়ী অর্থবানও সে নয়। তাই ইচ্ছা

করলেও লোকবিশ্রম্নত দানবীর সে হতে পারবে না।

প্রবল প্রতাপী পরিবারে তার জন্ম নয়। নিজেও কখনো প্রতাপী হতে পারেনি। লোকমুখে তার নাম কখনো শোনা যাবে না। তবু সে জানে করণীয় কিছু ছিল। অজ্ঞানে, সজ্ঞানে সেই করণীয় থেকে সে দূরে রয়ে গেছে। তাই আত্মবিকারের মূঢ়তাকে অস্বীকারও করতে পারে না।

ফেলে-আসা দৃশ্যাবলি কত স্পষ্ট। স্কুলের শেষ ক্লাসে প্রিয় শিক্ষক একদিন সতীর্থদের সামনে যে নির্যাতন করেছিলেন দীর্ঘকাল সে তার কোনো অর্থ খুঁজে পায়নি। অপরাধ ছিল নিশ্চয়ই। কৈশোরের চপলতা তখনো ত্যাগ করেনি। তবু ক্লাসের অন্য কোণে বসা বন্ধুর সঙ্গে হাসি বিনিময়ের জন্যে ওই কঠোর শাস্তি তাকে স্তম্ভিত করেছিল। ভাববার চেষ্টা করেছিল আসল অপরাধ কোথায়?

কিছুকাল আগে তারা কজন এক সজ্জন প্রতিবেশীর অব্যবহৃত বাইরের ঘরে নিজেদের সমিতির অফিস করেছিল। প্রাথমিক কয়েক সপ্তাহের উৎসাহই সম্ভবত তাদের প্ররোচিত করেছিল দেয়ালে তাদের আদর্শ ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি ঝুলিয়ে দেওয়ায়। ওই ব্যক্তিরা শাসকদের প্রিয় নন তারা জানত, তবু ওই সজ্জন প্রতিবেশী যে তাদের চলে যেতে বলবেন মাত্র কয়েকদিন পরেই সে বুঝতে পারেনি। আসল অপরাধ কি সেখানেই ছিল?

কিন্তু তার দুবছর পরে গোপনে শহর ছেড়ে চলে আসার আগের রাত্রি যে বন্ধুর বাড়িতে কেটেছিল সেই বন্ধুর পিতাই ছিলেন সেই প্রিয় অত্যাচারী শিক্ষক। তিনি ভোরের আঁধারে তাকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলেন। প্রায় অস্ফুটস্বরে তাকে বলেছিলেন কালো পতাকা হাতে বাইরে ছুটে যাওয়ার কী প্রচ- লোভ তিনি সামলেছিলেন উনিশশো আটান্নর সেই কালরাত্রিতে। সে বুঝেছিল হাসি বিনিময় নয়, ঘরের দেয়ালে নিষিদ্ধ ব্যক্তিবর্গের ছবি টাঙানোও নয়, – এসব কোনো অপরাধই ছিল না। ক্রোধের কারণ অন্য কিছু, অন্য কোথায়ও।

ক্ষীয়মাণ ফেব্রম্নয়ারির সেইসব ভোর, খালি পায়ে সারা শহর ঘুরে বেড়ানো, ফুলের সত্মূপ, সব সেই দৃশ্যে আছে। অযুত মানুষের সমাবেশে সেই শ্বেতশ্মশ্রম্ন বর্ষীয়ান; বজ্রকণ্ঠী পুরুষের মুক্তিমিছিল সবই সেই দৃশ্যাবলির অঙ্গ। অতি সাবধানে, বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধরত প্রদীপ শিখাটিকে বাঁচানোর মতো সেইসব দৃশ্যাবলি হৃদয়ে ধরে রাখতে হয়।

ফেলে-আসা দৃশ্যের সব বর্ণই ক্রমে ঝাপসা হয়ে যায়। তাই বারবার পেছনে তাকিয়ে সেইসব দৃশ্যকে যত্নে হৃদয়ে তুলে রাখে সে। ক্ষীণ একটি প্রদীপের শিখাকে কোনোমতেই যেন অন্যায়ী বাতাস নিভিয়ে না দেয়।

 

তিন

সেই প্রথম বুঝেছিল সব ভোরে পাখি ডাকে না। সেই প্রথম বুঝেছিল রাত্রিশেষেও অনেককাল অন্ধকার থাকে।

কালো পোশাক স্বেচ্ছাকৃত নয়। বড় দোকানের নিচের তলায়ও অন্য রঙের পোশাক কেনা তার সামর্থ্যে কুলোয়নি। কালো প্যান্টের ওপর কালো রঙের সব-মৌসুমি লম্বা কোট তাকে অন্ধকারে মিশিয়ে দিত। প্রথম শীতের ধারালো দাঁত তার সারা গায়ে কাঁপুনি

ধরালেও উপায় ছিল না। বাসের জন্য তাকে দাঁড়াতেই হত। আর সেই অন্ধকারে, কৃষ্ণবর্ণে অমলের চোখে ভূপতির আঁকা স্বপ্নের কথা মনে পড়ত : কুয়াশায় জুতোর আওয়াজ তুলে, বুক ফুলিয়ে হেঁটে চলেছ তুমি ইয়ং বেঙ্গল। হয়তো-বা ও-রকম কখনো ছিল।

কর্মস্থলে, টেলিপ্রিন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে সে পঁচিশে মার্চের সাক্ষী হয়েছিল। বহির্বিশ্বের প্রথম কয়েকজনের মধ্যে। প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকের বিবরণ বহু টুকরো হয়ে সামনে আসে। তার নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ ছিল। যেন অন্য জীবন। খবরের টুকরো আসার সঙ্গে-সঙ্গে স্বভূমির পরিচিত সব জনকে জানাতে থাকে। সান্ধ্য বৈঠকের পরে দূরশহরে, আরো দূরশহরে সমমনাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। মিছিল, প্রচার, অর্থসংগ্রহ ইত্যাকার কর্মসূচিতে সাফল্যের আশায় সে প্রিয়জন হারানোর দুঃখ মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আর তখনই দেখেছিল, সঙ্গে যাদের আসবার কথা ছিল তাদের সবাই আসেনি। তারা দূর থেকে দেখেছে, সরে গেছে।

কিন্তু কী আশ্চর্য, নতুন দেশে পূর্বে অনুপস্থিত সবাই আড়াল থেকে বেরিয়ে ছুটে এসে কল্পিত কৃতিত্বের পুরস্কার মাথায় তুলে নিয়েছিল। সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ মেলে না তার – চায়ওনি সে কিছু। কৃষ্ণবর্ণে সে তাই আবার পাখি-না-ডাকা ভোরে বাসের

প্রতীক্ষায় পথিপার্শ্বে দাঁড়ায়।

দূরে আসার সময়ে তার কাঁধে কেউ কোনো গুরুদায়িত্ব দেয়নি। ফিরে-যাওয়ার জন্যও কেউ তাকে বারবার ডাকে না। তবুও কেন ওইসব ব্যর্থ প্রচেষ্টার গস্নানিতে সে বোধহীন?

বহুকাল আগেই তো সে জেনেছিল সব ভোরে পাখি ডাকে না। অনেক রাতের শেষেই অন্ধকার চলে যায় না।

চার

কখনো-কখনো নিজেকে অচেনা মনে হয়। সে কখনো অন্যায়ী নয়। অথচ অন্যায়ের প্রতিবাদে চিরকাল সোচ্চার এমন কথা বলতে পারে না। সে মিথ্যাবাদী নয়। কিন্তু সত্যের খাতিরে জীবন বিসর্জন দেওয়ার মতো প্রতিজ্ঞাও নেই। সে অপরের অনিষ্ট কামনা করে না, অসৎ দুর্জনের ক্ষতিতে অশ্রম্নপাতেও ব্যস্ত নয়। সে তাহলে কী?

 

পাঁচ

সকলেরই স্বপ্ন থাকে। তারও ছিল। কিন্তু সকলেই যা পারে না, সে পেরেছিল। অশেষ যত্নে নিজেকে প্রস্ত্তত করেছিল দেয়ালপঞ্জির ছবিতে দেখা স্বপ্নকে জীবনে নামানোর জন্য।

 

ভিন্ন দৃশ্য, ভিন্ন দিন

 

এক

সীমাহীন অন্ধকারে অকস্মাৎ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আলোর কণা জনপদের সন্ধান দেয়। ক্রমে বিন্দু-বিন্দু আলো শ্রেণিবদ্ধ হয়, কখনো বিক্ষিপ্তই থাকে, জোনাকির রাশি যেন, দীপ্ত আভায় একত্রে আলোকিত করে। সে বোঝে নিচে শহর।

ছোট্ট বিমানবন্দর মুহূর্তে জনহীন হয়ে যায়। প্রায় নিঃশব্দ যানে শরীরের সামান্য আন্দোলন পার্শ্ববর্তী অপরিচিতা সঙ্গিনীর অস্তিত্ব জানালে দুপাশে তাকিয়ে সে কিছু দেখেনি। পরে জেনেছিল দুপাশে পাথরের দেয়াল, শ্রেণিবদ্ধ জোনাকি কেবল বিমান অবতরণের রাস্তা দেখায়। বিমূঢ় সে আকাশভ্রমণ শেষে, অন্ধকারের শেষে, এক অজ্ঞাত বোধে আচ্ছন্ন হয়ে বহুশ্রম্নত স্বপ্নের ভূমিতে পা রেখেছিল। অজস্র আলোর পস্নাবনে হারিয়ে যেতে পারে এই ভেবে সে বুঝি এই সীমার শেষে পাহাড় আর বনের মাঝে আশ্রয় খুঁজেছিল।

ট্যাক্সি তাকে হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলে সে কিছু সময় দিশাহারা হয়ে পড়ে। শেষে অনভ্যস্ত বাক্ভঙ্গিতে, ভিন্ন ভাষায় নিজের জন্যে একটি হোটেলে ঘর খুঁজে নেয়। জানালা দিয়ে তাকিয়ে একটি আলোকিত প্রশস্ত রাস্তা, এবং কিছু গাছপালা ও দালান ছাড়া আর কিছু দেখেনি। আলো, গাছপালা কোনো কিছুই তার অপরিচিত নয়। একটু দূরে, আলো আর অন্ধকারের মাঝে দুপাশে দুটি গাছের ঝোপের আড়ালে লুকানো ছোট বাড়িটিতে অন্য এক গৃহের অভ্যন্তরে কয়েকটি উষ্ণ, ক্রন্দমান হৃদয় দেখে সে। দূরদেশে প্রথম রাত্রি তার নিদ্রাহীন যায়।

শৈশবে, প্রাক্যৌবনে, যৌবনে দূরযাত্রার কোনো মোহের কথা তার স্মরণে আসে না। দেয়ালের পঞ্জিকায় রঙিন শহর মোহ সৃষ্টি করেছিল নিশ্চয়ই, তবু সেই স্বপ্নে নিমজ্জিত ছিল না সে।

পরকল্যাণে, সর্বহারার সেবায় জীবন উৎসর্গের প্রতিজ্ঞাও ছিল না তার। যদিও প্রাক্যৌবনে মহামারীর সময়ে গ্রামে-গ্রামে মুমূর্ষুর কাতরতা সে কখনো ভুলতে পারে না।

মনে পড়ে সতীর্থদের সঙ্গে ভ্রমণকালে কোনো দ্বিপ্রহরে এক অন্যায়ী যানের ধাক্কায় দরিদ্র ঝাঁকামুটের সব বেসাতি মাটিতে পড়ে যায় তাদের সামনে। তারা সকলে মিলে ছড়িয়ে-পড়া সব কিছু ঝাঁকাতে ভরে দিয়েছিল। রিক্ত স্বজনের সেই কৃতজ্ঞ চাহনি আজো তাকে অনুসরণ করে।

প্রভাতে সে চারপাশ ঘুরে দেখে। বিশাল ছায়াময় বৃক্ষকুল তখন কেবল সেই প্রিয় শহরের কৃষ্ণচূড়া, অশোক, শিরীষে আচ্ছন্ন স্মৃতির চিহ্ন হয়ে যায়। যে-শিক্ষালয় তাকে জীবনের উঁচু পথে তুলে দেবে মনে করে সে আজ এখানে, তার প্রতিটি ভবন ক্রমাগত অন্য এক বিদ্যাভবন, অন্য কারুকাজ অন্য প্রাঙ্গণ স্মরণ করায়। সেই স্মৃতিতে দীর্ঘবাসী সে। তাই সেই প্রথম নিদ্রাহীন রাত্রিও আজ স্মৃতিবাসী।

নদী কখনো উৎসে ফেরে না। তবু মূর্খের মতো উৎসের বিপরীতে গিয়ে ফেরার পথের সন্ধান করে সে। মনে আছে অপরিচিত সেই জনপদে স্বগোত্রের কাউকে খুঁজে বের করার জন্যে কী আকুলতা! টেলিফোন বইয়ের পাতা খুঁজে যে স্বদেশবাসীর ঘরে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল তার বিষণ্ণ দিনযাপন তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ভিন্ন শহরে হঠাৎ খোঁজ পাওয়া সহপাঠীর সঙ্গে দেখা করার জন্যে সারারাত গাড়ি চালানোর সময়ে সে একবার প্রায়-ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘ অদর্শনের পরে সুহৃদের সান্নিধ্য সেই জীবনসংশয়ী ঘটনাকেও তুচ্ছ করে দেয়।

মনে আছে কী কঠোর নিয়মে সে ফেলে-আসা পরিজন, বান্ধবদের সঙ্গে যোগসূত্র রাখায় ব্যাপৃত ছিল। ক্রমে সেই সূত্র ক্ষীণ হয়ে যায়। একান্ত পরিজন ছাড়া ক্বচিৎ কেউ এখন তাকে চিঠি লেখে। বন্যাত্রাণের জন্যে দুসপ্তাহ অক্লান্ত পরিশ্রম করে তারা পাঁচ জন সামান্য উপার্জনের বিশাল অংশ ব্যয় করে চলিস্নশ বাক্স ব্যবহৃত কাপড় পাঠিয়েছিল। অতিরিক্ত শুল্ক দেওয়ার ক্ষমতা না-থাকায় উদ্দিষ্ট জনসেবী প্রতিষ্ঠান সেইসব বাক্সের চেহারাও দেখতে পায়নি বলে জানিয়েছিল। প্রতিকারের আশায় দূতাবাসে যোগাযোগ করলে ‘আপনাদের পত্র ত্রাণ-মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে’ এই জবাব এসেছিল সে আজ থেকে বারো বছর আগের কথা। ত্রাণ-মন্ত্রণালয়ে কারা যোগাযোগের দায়িত্বে থাকেন আজো সে জানে না।

ফেরার পথের সন্ধানের জন্যে বারবার চেষ্টা করেছিল সে। কখনো কল্যাণকামীদের নিষেধ, কখনো ভবিষ্যৎ সহকর্মীদের বৈরিতা, কখনো অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ভয় দেখিয়ে তাকে সেইসব চেষ্টা থেকে নিরস্ত করেছিল।

উৎস ভুলে ভিন্ন স্রোতে মিশে মোহনায় পৌঁছতে হয় এ-ও ভেবেছিল সে। কিন্তু যতবার তনয়াকে তুষারশুভ্র কন্যা আর সাত বামনের গল্প শোনাতে যায়, ততবার নীলকমল-লালকমল এসে পথ রোধ করে দাঁড়ায়। আববাসউদ্দীন ক্রমাগত উইলি নেলসনের কণ্ঠরোধ করে দেন। নিরুপায় সে তখন দূর পাহাড়ের মাথায় জমে-থাকা কুয়াশার দিকে চেয়ে আসন্ন সন্ধ্যায় বসে থাকে। বহুদূরে কোথায় তখন ‘এই দূর পরবাসে’ গীত হয়। এভাবে আছে সে।

 

দুই

গানটির সুর বড় বিচিত্র। আজ সারাদিন ধরে শুনে চলেছে, পাশের বাসায় বাজে। একবার শেষ হলে আবার গোড়া থেকে শুরু হয়। গানের সঙ্গের বাজনা অশ্রম্নতপ্রায়, কথা বহু চেষ্টাতেও কিছু বোঝা যায় না, শুধু একটি দীর্ঘ, বিলম্বিত সুর, যেন করুণ ধ্বনি, যেন কোনো বিলাপ, ‘ও-ও-ও, ও-ও-ও, ও-ও-ও, ও-ও-ও’ অন্তত চার-পাঁচবার শোনা যায়। এবং ওই লয়ের মধ্যেই গানটি শেষ হয়। আবার প্রথম থেকে বেজে চলে।

পাশের অ্যাপার্টমেন্টে যে বাজায় তার গ্রামোফোনে রেকর্ড সে তাকে চেনে না। দুপুরে বাইরে যাবার মুখে এক তরুণকে দেখেছিল অবিন্যস্ত মাথাভরা চুল, ঈষৎ কোমল শ্মশ্রম্নর আবরণে কৈশোরোত্তীর্ণ মনে হয়েছিল, হয়তো সে। হয়তো রেকর্ডটি সে সদ্য কিনেছে, সুরে বিমোহিত সে বারবার শোনে, ‘ও-ও-ও, ও-ও-ও, ও-ও-ও, ও-ও-ও-ও।’ তারা এই বাসায় আজই এসে উঠেছে, দুপুরের কিছু আগে। ঘরের চাবি হাতে পেয়েছে বেলা দশটার দিকে। চাবি পেয়ে তিন মাইল দূরের পুরনো বাসা থেকে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে এসেছিল, তারপরে রুবীকে রেখে আবার গেছিল আরও কিছু আনতে। ফিরেছিল প্রায় দুটোর দিকে। মনে পড়ে প্রথম দরজা খুলে ঘরে ঢুকে ওই গানই সে শুনেছিল অস্পষ্ট। কিন্তু রুবীর মুখের দিকে তাকাতে পারবে না বলে স্যুটকেস খোলার দিকে মন দিয়েছিল। কোনো শব্দ তার কানে যায়নি। অসম্ভব ক্লান্ত, তিনদিন আগে সারা দিন সারা রাত বাসে কাটিয়েছে। গত দুরাত কেটেছে ভিনদেশি সহৃদয় পরিচিতের আশ্রয়ে, ঘরে বিছানা পাতাই ছিল, স্যুটকেস খোলা শেষ না করেই শুয়ে পড়েছিল, কিন্তু তখন ওই গান কানে আসে, বারবার, আর শুয়ে থাকা যায় না।

ঘরের দরজা ঈষৎ খুলে রেখে বাইরে এসে দাঁড়ায়। সে রুবীকে এখান থেকে দেখতে না পেলেও শোবার ঘরের কিছু অংশ এখান থেকে দেখা যায় – সে বিছানা থেকে উঠলেই বুঝবে। তিন ঘণ্টা আগেই তার বিছানা থেকে ওঠা উচিত ছিল। অনেকক্ষণ ধরেই ভাবছে সে উঠে আসবে, তারা রান্নাঘরে যাবে, সেখানেই খাবার টেবিল, এবং সে যা রান্না করে রেখেছে, খাবে প্রায় চবিবশ ঘণ্টা অনাহারের পরে। গতকাল সন্ধ্যায় দোকান থেকে কেনা স্যান্ডউইচ, আর আজ সকালে চা-বিস্কুট ছাড়া তারা কিছু খায়নি।

এখান থেকে দেখতে না পেলেও রুবী জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে, সে জানে। জানালায় পর্দা নেই, ভেনিশিয়ান বস্নাইন্ড মাঝজানালায় আটকে রাখা, খোলা জানালা দিয়ে শুধুই শেষ আগস্টের পোড়া আকাশ, কয়েকটি রো-হাউসের ছাদের উঁচু অংশ, দুবাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ণকায় বার্চ দেখা যায় কিন্তু রুবী তিন ঘণ্টা হলো সেদিকেই তাকিয়ে আছে। সে জানে তার চোখ ভেজা নয়, সে জানে তার দিকে তাকালে বিবর্ণ, মৃতপ্রায় কোনো মুখের দিকে চোখ পড়বে, সে জানে সহস্র দিনের অশ্রম্নবিসর্জনেও তার পক্ষে শান্ত হওয়া সম্ভব নয় কিন্তু ওই রকম ঘটবার কোনো কারণ সে তার হাতে তখনো তুলে দেয়নি।

আজ দুদিন হলো চিঠিটি তার পকেটে। রুবী, তার স্ত্রী, রুবীর পিতার মৃত্যুসংবাদ আজ দুদিন হলো সে বয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে দিতে পারেনি। শহরে ফেরার প্রথম রাত্রিতেই চিঠিটি পেয়েছিল কিন্তু রুবীর হাতে তুলে দেবার মতো স্থান ছিল না। সামারের শেষে শহরে ফিরে পুরনো বাসায় গিয়ে দেখে বাসাটি হাতছাড়া হয়ে গেছে। এ রকম হবে জানত সে এবং হলে যে পূর্বপরিচিতের কাছে সাময়িক বাসস্থান হবে বলে স্থির ছিল তাঁকে টেলিফোনও করেছিল। তিনি তাকে একলা দেখা করতে বলে কেবল চিঠিটিই তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন – দেশ থেকে আসা তাঁর ঠিকানায়, তাঁরই নামে, খবরটি যেন বিবেচনা করে রুবীকে দেয় সে, শোক সইবার ক্ষমতা সকলের সমান নয়। ভেবেছিল, কাঁদবার জন্যেও তো জায়গা চাই, দুদিন ধরে তাই খুঁজেছে। রুবীর কিছু জানবার, কিছু বোঝবার কথা নয়।

শেষ আগস্টের প্রখর তাপ, গাছের ছায়া কেবল দীর্ঘ আকার নিচ্ছে। সামনের রাস্তার দুপাশে মেপ্ল্-এর সারিতে এ-গাছ ও-গাছ করে বেড়াচ্ছে কয়েকটি নাম-না-জানা পাখি। রাস্তার ওপারে হাসপাতালের গাড়ি রাখার মাঠ ঘিরে এল্ম্ আর ওয়ালনাটের বিস্তার। দিনের কাজ শেষে প্রায় সবাই ঘরে ফিরে গেছে। কাউকে দেখা যায় না। তাদের বাসার সামনের রাস্তা শূন্য। দরজার বাইরে, রাস্তা থেকে উঠে আসার সিঁড়িতে ঘরের ছায়া পড়েছে কেবল। সে সেখানে বসবার চেষ্টা করে তপ্ত সিমেন্ট অগ্রাহ্য করেই প্রায়। কিন্তু সেই গান ‘ও-ও-ও, ও-ও-ও, ও-ও-ও, ও-ও-ও।’ দরজা টেনে বন্ধ করে রাস্তা ধরে ধীরে এগোতে থাকে হাসপাতালের দিকে।

বেলা দুটোর দিকে ঘরে ফিরে দেখেছিল রুবী শুয়ে আছে। সে তখন খুব ক্লান্ত, তাই তার পাশে শুয়ে পড়েছিল আর তখনই ওই গান দীর্ঘ, বিলম্বিত সুর, কানে আসতে থাকে, বারবার। অবশেষে উঠে কার্ড-বোর্ডের বাক্স খুলে একটি পাত্র বের করে ভাত রান্না করেছিল। ঘরে ফেরার পথে মোড়ের দোকান থেকে কিছু উপকরণ এনেছিল, বাইরে যাওয়া হয়তো আর সম্ভব হবে না ভেবেই।

রান্না হলে রুবীকে গিয়ে বলেছিল ‘খাবে চলো’। সে তার কথা শুনেছে বলে মনে হয়নি। শূন্যে তাকানো। আবারো বলেছিল পাঁচ মিনিট পরে, তখনো সে জবাব দেয়নি।

সামারে খরচ কমাবে বলেই, বাসা ছেড়ে দিয়ে যায় অন্য শহরে, দক্ষিণের এক ভিন্ন দেশে, ছসপ্তাহের সেমিনারে। রুবীকে রেখে গেছিল এই জায়গা থেকে ছয়শো মাইল পশ্চিমে এক বন্ধুর পরিবারে। ভেবেছিল ফিরে এলে ওই বাসাই পাবে আবার। না পেলেও দু-চার দিন থাকবার কোনো অসুবিধে হবে না, পরিচিতরা আশ্বাস দিয়েছিলেন। সে চলে যাওয়ার প্রথম সপ্তাহেই রুবী তার পিতার গুরুতর অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তাকে জানায়। ছসপ্তাহের কাজ সে চার সপ্তাহে শেষ করে সোজা চলে গেছিল রুবীর কাছে। তারপরে তাকে নিয়ে বাসে ফিরেছে এই শহরে।

হাসপাতালের দরজার ঠিক পাশে একটি টেলিফোন আছে। সামনে অনেক বড় মাঠ। কিন্তু তার দিয়ে ঘেরা বলে সম্পূর্ণ

মাঠটিকে ঘুরে টেলিফোনের কাছে যেতে হবে। ফলে রাস্তা থেকে আর এক রাস্তায় উঠে ডাইনে মোড় নিতে হয়। এটি বড় রাস্তা। ডাইনে ঘুরতেই সেই রাস্তা ঢালু হয়ে সোজা দূরে নেমে গেছে। হাসপাতাল ও মাঠ তার পাশের অঞ্চল থেকে কিছু উঁচুতে। এখান থেকে সোজা প্রায় আধ মাইল দেখা যায়, এ-দিকটা প্রায় শহরতলি, ছাড়া-ছাড়া ঘরবাড়ি, কিছু দূরে, রাস্তার ঢালুতে সুপার হাইওয়ে চলে গেছে। এই হেনরি এভিনিউ হাইওয়ের ওপরে পুল হয়ে ওপারে মিশেছে অ্যালিঘেনি এভিনিউর সঙ্গে। এক্সপ্রেসওয়ে থেকে শোঁ-শোঁ শব্দ শুনতে পাচ্ছে দূরপালস্নার গাড়ি আর ট্রাকের, হেনরি এভিনিউ ধরেও গাড়ি যাচ্ছে মাঝে-মাঝে, কোনো লোক দেখে না, অবশেষে ফক্স স্ট্রিট থেকে ব্যারেন হিল – এর বাস এসে হাসপাতালের সামনে দাঁড়াল। দুজন নার্স নেমে হাসপাতালের দরজার দিকে যেতে থাকে। সে তাদের পেছনে-পেছনে চলে আসে টেলিফোনের কাছে।

তারা আজ সকালেই হাসপাতালের এই বাসাটি পেয়েছে। পুরো দুদিন সমস্ত শহর খুঁজে বেড়াবার পরে শেষ উপায় হিসেবেই রুবী তার অধ্যাপককে তাদের সমস্যার কথা বলেছিল। তাঁরই আগ্রহে এবং মেডিক্যাল কলেজ-প্রধানের সহৃদয়তায় হাসপাতালের ডাক্তারদের জন্যে রাখা এই সাময়িক বাসস্থান এখন তাদের। বিদেশি মেধাবী ছাত্রী, স্বামীও ছাত্র, অর্থের অপ্রতুলতা, সবই তাঁরা বুঝেছিলেন।

টেলিফোনে পয়সা ঢুকিয়ে যে পরিচিত দম্পতির নম্বর ঘোরায় সে। তাদের ডাকবার কোনো ইচ্ছে ছিল না। দুদিন শহরে ফিরেছে জেনেও তাঁরা খোঁজ করেননি। প্রথম রাতে যে পরিচিতের বাসায় চিঠি আনতে যায় সে, তারা এবং এই দম্পতি গত ছমাস প্রচুর সময় কাটিয়েছে একসঙ্গে। তাদের সাময়িক শহর ত্যাগের সমস্ত কারণ ও ঘটনা তাঁরা জানতেন। রুবী মাত্র আট মাস আগে আজন্মের নিরাপদ আবাস ছেড়ে এসেছে এই দূরদেশে। পিতার প্রতি তার

ভালোবাসার কথা তাঁরা জানতেন, তাঁর মৃত্যুসংবাদও শুনেছিলেন, দুরাতের আশ্রয়দাতা ভিনদেশি সেই ছাত্রের টেলিফোন নাম্বারও তাঁদের জানা ছিল। অথচ তার একজন কাউকে চাই, যে সামনে থাকলে সে পকেটের ভারমুক্ত হতে পারত, কেন গত দুরাত ঘুমোতে পারেনি, রুবীর উদ্বিগ্ন সেই প্রশ্নের জবাব দিতে পারত।

তার গলা শুনেই তাঁরা বললেন, খবরটি তাঁরা শুনেছেন।

‘আপনারা আসবেন আমাদের এই বাসায় একটু’ সে অনুরোধ করে ‘আমি কিছুতেই বলতে পারছি না।’

টেলিফোন রেখে দিয়ে ঘরের দিকে ফিরতে থাকে সে।

হাসপাতালের বড় দালানের ছায়া পড়তে শুরু করেছে সামনের মাঠে। সূর্য পেছনে চলে যাচ্ছে। আগস্টের দীর্ঘ, তপ্ত অপরাহ্ণেরও শেষ আছে। সে মাঠের পাশ দিয়ে, রাস্তার ধার ঘেঁষে, রাস্তায় মোড় নিয়ে,

আকাসিয়া, মেপ্ল্-এর বিসত্মৃত হতে থাকা ছায়ার নিচে দিয়ে আবার বাসার সামনে এসে দাঁড়ায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে, দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে, রুবী তেমনি শুয়ে আছে। তাকে আবার বলে, ‘খাবে চলো’। সে ওঠে না। ঠিক তখনই ওই গানের সেই অস্ফুট, টানা বিলাপ, ‘ও-ও-ও, ও-ও-ও, ও-ও-ও, ও-ও-ও’ খুলে রেখে আসা দরজা দিয়ে অক্লেশে ঢুকে পড়ে।

সে রুবীর পাশে বিছানার ওপরে বসে। হাসপাতালের বাসা, তাদের বিছানা-চাদর, বিকেলের রোদ জানালা থেকে নেমে যাওয়ায় ওইসব চাদরের অসম্ভব সাদা রং সমস্ত ঘরকে কেমন অশরীরী

আলোয় ঢেকে দেয়। ছোট দুটি বিছানা জোড়া দিয়ে বড় করা, যেন বেশি বড়, রুবী জানালার দিকে মুখ ফেরায়, সে একটু ঝুঁকে তার মুখ দেখার চেষ্টা করে, আবার সেই গান। হঠাৎ তার খুব রাগ হয়। সে কেন এমন করছে? তাকে তো সে কিছু বলেনি, সে তো কিছু জানে না, তবে?

সে কিছু বুঝেছে নিশ্চয়ই, তাকে রেখে সেই প্রথম রাত্রিতে

বেরিয়ে যাওয়া, ফিরে এসে রাতে না-ঘুমানো, ‘দেশের কোনো খবর পেলে’ তার এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর না দেওয়া, এসবই তাকে অনেক বোঝাতে পারে। কিন্তু তার তখন সে কথা মনে থাকে না। সে তো তাকে কিছু বলেনি, সে যদি পারে সব নিজের মধ্যে ভরে

দিন-রাত পার করে দিতে, রুবী কেন পারবে না কোনো ভার না নিয়েও? বিছানার পাশ ঘুরে তার মুখের সামনে দাঁড়ায় সে, তারপরে ‘খাবে না কেন’ বলে প্রায় জোরেই তার গালে আঘাত করে। রুবী একবার চোখ বন্ধ করেই আবার খুলে দেয়, জানালার দিকে চোখ মেলে ধরে একবার তার দিকে তাকায়, ঠোঁটদুটি সামান্য কাঁপে হয়তো, হয়তো সে দেখার ভুল, আবার বাইরের দিকে তাকায়, সে দেখে তার চোখে কোনো জল নেই।

সে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ায়, যেন কিছু দেখতে পায় না, সামান্য পা কাঁপে, হাত দিয়ে খোলা দরজার পালস্না ধরতে গেলে হাতও, সিঁড়ির দুপাশে লতানো গোলাপের ঝাড়, ফুল আছে কিনা দেখতে পায় না, সিঁড়ি তখনো গরম, সে নিচের ধাপে পা রেখে বসে পড়ে, সমস্ত রাস্তায় বা দূরে গাড়ি রাখার মাঠে কাউকে দেখা যায় না, পাশের বাড়ির জানালা বন্ধ, এয়ার কন্ডিশনারের একটানা আওয়াজ, আবার সেই গান। সে কাঁদতে থাকে।

 

তিন

দিনটি যেন বড় দীর্ঘ। কাজ শেষ করেও অনেকক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসেছিল সে। মনে হয় তখনো দ্বিপ্রহরের তাপ। বাইরে এসে দেখে খররৌদ্রে যেন জ্যৈষ্ঠের তেজ।

পার্কিং লটের প্রায় শেষ মাথায় আজ গাড়ি রেখেছে। হেঁটে সেদিকে যেতে সহকর্মী কয়েকজনের সঙ্গে কুশলবিনিময় করে, দুটি ছাত্রের সঙ্গে মৃদু হাস্যবিনিময়। সশ্রদ্ধ অভিবাদনে এরা অভ্যস্ত নয়।

প্রতিবেশীর বাড়িতে স্কুল থেকে ফেরা তনয়া অপেক্ষায় ছিল। তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে একবার চারপাশ দেখে নেয় সে। সূর্যের আলো হয়তো একটু পরে মস্নান হবে। দূরের পার্কে, পাশের বাড়িতে, সামনের রাস্তায় কোথাও কাউকে দেখা যায় না। রাস্তা থেকে উঠোনে ঢোকবার মুখে মেপ্ল্ গাছটিতে দুটি অজানা পাখি এসে এ-ডাল ও-ডাল করলে মনে হয় ওরা দুটি শিস-দেওয়া দোয়েল।

বাইরের ঘরে ঢুকে আগের রাতের ছড়ানো খেলনা, সকালের না-খোলা কাগজ গুছিয়ে রাখে। মেয়েকে তার ঘর গোছাতে বলে সে এসে শোবার ঘরে বিছানাটি ঢেকে দেয়। অ্যালার্ম দিতে ভুলে গেছিল বলে তাড়াতাড়িতে রাতের পোশাকগুলোও মেঝে থেকে তোলা হয়নি।

রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের জল আগুনে বসিয়ে বাইরের ঘরে আসে। জানালা দিয়ে দেখে স্ত্রী ছোট গাড়িটি রাস্তাতেই রেখে দরজা দিয়ে ঢোকে। দোকানে যেতে হবে এক্ষুনি।

দিনের সব কাজ শেষ করতে পারেনি, আগের রাতে ঘরে কাগজপত্র নিয়ে এসেছিল দুজনেই। ফলে রান্নাঘরের সিঙ্কে আ-ধোওয়া বাসনের সত্মূপ। কিছু মেসিনে ঢুকিয়ে কিছু হাতে ধুয়ে চা তৈরি করার ফাঁকে স্ত্রীর ক্লান্ত কণ্ঠস্বর কানে আসে। মেয়েটি মা-কে তার স্কুলের সারাদিনের ঘটনা বর্ণনায় ব্যস্ত। সঙ্গে পরদিনের জন্যে নানা আবদার। মা তার দু-একটি মেনে নিয়ে দু-একটিতে ‘না’ করলে মেয়ে মুখ ভার করে স্কুলের পড়া তৈরি করতে যায়। আর কিছুদিনের মধ্যে তার স্কুল শেষ হলে সামার ক্যাম্পে যাবে বলে বায়না ধরেছে। ‘ডিসেম্বরে দেশে যেতে হবে’ এই সঞ্চয়ী যুক্তি তার মনে ধরেনি।

দু-একটি জিনিসের ছোট ফর্দ স্ত্রী তার হাতে দিলে সে বাইরে এসে দাঁড়ায়। গাছের মাথা থেকে রোদ নেমে যাচ্ছে। তাদের বাড়িটি শহরের শেষ মাথায়, কাছের দোকানটিতেও হেঁটে যাওয়া যাবে না। মনে পড়ে, খেলার মাঠ থেকে দৌড়ে গিয়ে পাড়ার দোকান থেকে মাকে এরকম কত কিছু এনে দিত সে।

বড় রাস্তায় নামতেই হঠাৎ তার মনে অদ্ভুত এক প্রশ্ন আসে। গাছের মাথা থেকে রোদ নেমে গেলে মাঠে কি তখনো রোদ থাকে? আলোকদিয়া পার হয়ে নুনপোলার হাটে পৌঁছনোর মুখেও ঠিক এই রকম সময়ে রোদ নেমে যেত গাছের মাথা থেকে। আলোকদিয়ার মাঠে কি তখনো রোদ থাকত? সে কিছুতেই মনে করতে পারে না।

অকস্মাৎ গাড়িটিকে পাশের ছোট রাস্তায় ঢুকিয়ে দিয়ে পিছু হটে আবার বড় রাস্তায় নেমে আসে। তারপর উল্টোদিকে, শহরের বাইরে যে-রাস্তা গেছে সেই দিকে চলতে শুরু করে।

জনবসতি ক্রমে হালকা হয়ে আসে। বড়-বড় গাছের সত্মূপ তার পেছনে পড়ে থাকে। তার দুপাশে তখন খোলা মাঠ। আর একটু দূরে গিয়ে রাস্তার পাশে খানিকটা জায়গা পেয়ে গাড়িটিকে রাস্তা থেকে নামিয়ে থামায়।

মাঠে তখন কোনো আলো ছিল না। সামনে সবুজ কিসের ফসল দিগন্তবিসত্মৃত হয়ে আছে। মাঝে-মাঝে সেই সবুজ কিছু হালকা, কখন রুক্ষ। বাঁয়ে অন্য শহরের সীমানার আলো। বহু দূরে বড় শহরের আলোয় আকাশের কোল আর একটু পরে স্বচ্ছ হয়ে আসবে। এই রকম আসন্ন সন্ধ্যায়, কিছু আঁধারে অন্য এক মাঠে হেমন্তের ফসল তুলতে গেছিল সে।

হাঁটু-সমান সয়াবিনের একটি চারা থেকে দুটি পাতা তুলে নিয়ে সে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

 

 

আঁধার-আলোর মাঝখানে

 

এক

অন্ধকার আর আলোর মাঝখানে এক ধূসর অস্তিত্ব আছে। সেখানে কিছু ঘটে না, কিছু নেই। মনে হয় সে সেই আলো নয় – আঁধার নয় অস্তিত্ব ‘পিনামব্রা’র হাত ধরে বসে আছে।

চলে আসার সময়ে কেউ তাকে বলেনি, ‘ফিরে এসো’।

না-ফিরলে কারো কিছু বলার নেই। তবু কেন সে ওই অবোধ্য আবেগের বাইরে যেতে পারে না। আলো-আঁধারের যে-কোনো দিকে

চলে-যাওয়া কতই না কাম্য। অথচ সে পারে না।

কেন এমন হয় ভেবে দেখার চেষ্টা করেছে সে। আসলে কি এই সত্য যে সন্ধিক্ষণের যাত্রীর গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই। কোনো যান নেই, বাহন নেই। আর এই কি সত্য যে একবার সেই দূরদেশ পেছনে ফেলে এলে তার মতো সন্ধিক্ষণের যাত্রীর কোনো গন্তব্যও নেই?

তবু অন্বিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা থামে না তার।

 

দুই

সব রাত্রিই এমন কিছু আঁধারে হারিয়ে যায় না, কিছু স্পষ্ট থাকে ওই অন্ধকারের জন্যেই।

যখন এই ঘরে ঢুকেছিল সে তখন আকাশে ঘন মেঘ, মাটিতে অন্ধকার। তবু টেলিফোন করে স্থির করা সাক্ষাৎসূচি না-মেনে উপায় ছিল না।

ঘরে ঢুকে সে অন্ধকারই দেখেছিল। যে দরজা খুলে দেয় তার অস্বস্তি না দেখে উপায় ছিল না। যার সঙ্গে সাক্ষাতের কথা তিনি ঘরে নেই। এ-কথা জেনেও বাইরের আসন্ন দুর্যোগ ও অন্ধকার তাকে অবাঞ্ছিত অভ্যর্থনা গ্রহণে বাধ্য করে।

আলো এবং গৃহস্বামী প্রায় একত্রেই গৃহে প্রবেশ করেন এবং আলোর মতোই বিন্দুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে বলেন, ‘ও, আপনি’।

বিস্মিত সে ভাবে তার তো আসবারই কথা ছিল। সামান্য আপ্যায়নের পরেই তিনি কথা তোলেন, ‘দেখুন ব্যাপারটি তো কেবল আমার ওপরে নয়।’ বলেই তিনি জানালার দিকে তাকান। তাঁর কপালের রেখা পড়া যায়। রেখা অস্বস্তির, অস্থিরতার। হোক না এককালের সহপাঠী, কার্যকারণ সম্বন্ধে কোনো সখ্য জন্মে না।

গৃহস্বামীর অস্থিরতা বুঝেছিল আগেই। দরজা দিয়ে ঢোকার

মুহূর্তে সচকিত ভাব এখন আরো স্পষ্ট। এখন বাইরে বুনো হাওয়ার বেগ বড়-বড় ফোঁটায় দেয়ালের গায়ে জল ছেটানোর শব্দে সেই ভাব ক্রমে অস্থিরতায় উঠে আসে।

‘কিন্তু’ উপাচার্যের নাম নিয়ে বলে সে, ‘তিনি বলেছেন আপনার একটি চিঠি পেলেই একটি অস্থায়ী নিয়োগ দিয়ে দেবেন তিনি।’

‘ও-রকম ঘটলে আমরা বিভাগের সকলে একযোগে পদত্যাগ করব।’ এককালের সহপাঠীর দিকে বিস্মিত দৃষ্টি তার। বিদেশে

অর্জিত তার মতো যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, ডিগ্রি বিভাগের কারো নেই, তবু? কথাটি বলবে ভেবেও বলে না সে। বরং বলে, ‘দেশে ফেরার সুযোগ – ’ শ্রোতার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে যায় সে। অপমানিত, ধিক্কৃত তার আর কী বলার থাকে।

জানালার সার্শিতে বৃষ্টির আওয়াজ কমে আসে। যদিও হাওয়ার শব্দ তখনো প্রবল। নিজেকে আরো স্পষ্ট করার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না। কোনো জ্ঞানগর্ভ আলোচনার সূত্রপাতেও নয়। দীর্ঘকাল প–তের মেলায় অংশগ্রহণ তাকে শিখিয়েছে, জ্ঞান স্বাভাবিক, সর্বদা প্রকাশমুখী নয়। অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল সে। ভাবে যোজনবিসত্মৃত সমুদ্রপারের মাটি কি এমন চেহারা দেয় যে কিছুতেই

ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য আসে না। উভয়েরই। অথবা সাক্ষাতের বিষয়টিই কি? ‘আচ্ছা, আমি চলি এবারে’, উঠে দাঁড়ায় সে।

‘হ্যাঁ রাত হচ্ছে, আপনাকে যেতেও হবে অনেক পথ।’ স্বস্তির

চিহ্ন অপরের মুখে। ‘কিন্তু বৃষ্টি তো আছে এখনো। ছাতা আছে?’

‘হ্যাঁ, আছে।’ হাতের ব্যাগটি দেখিয়ে বলে সে, যেন নিশ্চিন্ত করে গৃহস্বামীকে ‘খুব ছোট করে ভাঁজ করা যায়। বিদেশি ছাতা।’ হেসে বলে। ‘কাউকে দিয়ে গাড়ি ডাকতে পাঠাব একটা?’ ঘনিষ্ঠ সুর তাঁর। ‘তবে কতক্ষণে পাওয়া যাবে কে জানে?’

‘না, না, আমি রাস্তায় নেমেই কিছু একটা পেয়ে যাব।’ পা বাড়ায় সে দরজার দিকে। এবারে গৃহস্বামী সহাস্যে করমর্দন করেন তার, ‘তা আপনি ফিরছেন কবে। ব্যাপারটি নিয়ে আমরা নিজেরা – ’

দ্রম্নত সে থামায় তাকে। ‘কাল রাত্রিতেই। প্রথমে লন্ডন। তারপর নিজ আস্তানায়। নিউইয়র্কে।’

রাস্তার মোড়ে বন্ধ দোকানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যানবাহন খোঁজে সে। ভ্রূক্ষিপহীন কোনো যানচালক কখনো তার শরীর ভিজিয়ে দিয়ে যায়।

বদলে-যাওয়া দেশের মহানগর। রীতিও হয়তো পালটেছে। এই ভেবে সামনের দিকে এগোয় সে। আর তখনই হলুদ রঙের গাড়িটি তার পাশ দিয়ে গেলে থামায় সেটিকে।

প্রায় সিক্তবসনে গাড়িতে উঠে গন্তব্য জানায় সে। আকাশের মেঘ, দূরে-দূরে দাঁড়ানো নিষ্প্রভ বাতি অন্ধকারকে বাড়ায়ই বরং। ভাবে সে, চিনবে তো সেই রাস্তা – এতকাল পরে ফিরে-আসা পুরনো শহরের নতুন রাস্তা।

 

তিন

আটশো টাকায় বড় ঘরের চালাটি বিক্রি হয়ে যাওয়ার পরেই সে শূন্যে ভেসেছিল। তার পিতা স্ত্রী, পুত্র, কন্যার মৃত্যু এবং অকস্মাৎ বৈভব হারানোর শোকে উন্মাদ না হলেও, অমন বিশাল ঘরের টিন ওই সামান্য টাকায় বিক্রি করে খুব সুস্থ চিন্তার পরিচয় দেননি। কিন্তু তাঁর উপায় ছিল না। কয়েক দিন আগে বড় সড়কে আর্ত স্বজনের ছোটাছুটি এবং নঈমুদ্দিন প্রেসিডেন্টের ঘোড়ায় চড়ে ‘ভয় নাই’ ‘ভয় নাই’ বলে ছুটে এসে ছুটে চলে যাওয়া তাঁকে বরাভয় দেয়নি।

নঈমুদ্দিনই ওই বড় ঘরটির ক্রেতা।

দীর্ঘকাল তার মনে বাসনা ছিল শূন্য ভিটের ওপরে বেশ কয়েক বান্ডিল ঝকঝকে টিন কিনে বড় ঘরটি তুলবে। তা আর হয়নি। ভূমিতে পা রাখবার অনেক আগেই সম্পূর্ণ ভিটেমাটি

হোরাসাগরের গর্ভে চলে যায়। সে-কথা তার পিতা শুনে যাননি। আর শুনলেই-বা কি? গ্রাম ছেড়ে-যাওয়া শহরে চারবার বাসা বদলাতে হয়েছিল তাঁকে তেরো বছরে। বেশি ভাড়া থেকে কম ভাড়ায়। নতুন

টিনের বান্ডিলই তো কেবল নয়, মাটিরও প্রয়োজন হতো। এ দুয়ের

কোনোটি সংগ্রহেই তিনি পারদর্শী ছিলেন না। সে-ও ছিল না। কিন্তু প্রায় বিস্ময়করভাবে মধ্যযৌবনে সবচেয়ে বড় শহরের সব সেরা অঞ্চলে বাড়িসহ একখ- ভূমির ওপরে তার অধিকার জন্মায়, ওয়ারিশানসূত্রে। এই ওয়ারিশানের ব্যাপারটি খুব সহজ ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ওয়ারিশান নয়, শেষ ইচ্ছাপত্রই বরং বলা যায় তার অধিকারের মূল ছিল। যেহেতু সে ছিল অনেক দূরে, ভিন্ন দেশে, তাই এমন ক্ষেত্রে যা হয়, আদালত তার মালিকানা মেনে নিলেও শূন্যে ফুল ফুটবে যার জন্যে অপরের অসূয়া বিদ্বেষ তার ভাগ্যে লেখা থাকে, নিজের হিস্যাও সে কখনো পায় না। তার কপালেও তেমনি ঘটল। তবু ওই মাটিতে যেহেতু তার ন্যায্য অধিকার, ঝকঝকে আটচালার স্বপ্ন তার চোখে সাঁটা রইল।

 

চার

আর কিছুক্ষণ পরে আকাশে আলো আর রঙের ফুল ফুটবে। শব্দে কাঁপবে মেদিনী। তখন চার হাওয়াই জাহাজ একসঙ্গে ধোঁয়ার কু-লী পেছনে ছাড়তে-ছাড়তে পাক খাচ্ছে আকাশে, ঠিক নদীর দুপারের সীমায় বদ্ধ তারা কখনো হঠাৎ নেমে এসে যেন নদীর বুক ছুঁয়ে আবার উঠে চলে যায়।

বিকেলের অনেক আগে এসে বসে থাকতে হয় এসব দেখার জন্যে। নইলে হাজার মানুষের কাতার সামনে রেখে বাচ্চাদের যতই উঁচু করে তুলুক না, তারা কিছু দেখতে পায় না, কাঁদে। নদীর এই পারে বাস হলে অবশ্য অনেক সুবিধে কিন্তু এখানে বাসস্থান পাওয়া বড় সহজ নয়। কেবল অর্থসামর্থ্য নয়, ভাগ্যও প্রয়োজন। তেমন ভাগ্যই তাদের হয়েছে এই কথা স্ত্রী তাকে অনেক বুঝিয়েছিল। নদীর ওপার থেকে দেখলে এ-পারের ওই সহস্র সুদৃশ্য হর্ম্যের সারি, প্রশস্ত রাস্তা, যানবাহনের স্রোত, আলো এমন মোহের সৃষ্টি করে যে, কিছুই মানবিক নয় এমন ভাবা স্বাভাবিক। তবু বাড়িটি দেখতে এসে, অমন আতশবাজি আর আলোকসজ্জার দিনেও সে কেবল খুঁতখুঁত করতে থাকে। সম্পূর্ণ বাড়ি হলে কথা ছিল না, চারভাগ করা অংশের একটি, তা-ও পেছনের দিকে, আলো-হাওয়ার না-জানি কত অভাব। এসব কথাই বারবার বলে সে।

কাঠের পালিশ করা মেঝের ওপরে বারবার হেঁটে দেখে। কোনো-কোনো জায়গায় কাঠের আলগা বাঁধুনী বেশ শব্দ করে। সে সেখানটা পা দিয়ে বারবার টিপে দেখতে থাকে। রান্নাঘরের মেঝে, বাথরুমের দেয়াল, সণানঘরের ফোয়ারা কিছুই তার মনে ধরে না। সবশেষে ‘পুরো বাড়িই বরং খোঁজা যাক একবার’ বলে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ‘সে সাধ্য নেই তুমি তো জানো’, বলে বাচ্চা দুটিকে সামলে রাস্তায় উঠে আসে। সে-ও পেছনে-পেছনে মুখ নিচু করে আবার নদীর ধারে ফিরে আসে। আলোর সহস্র হাত তখন ঝলকে-ঝলকে ওপরে ওঠে হাজারো রঙের মশাল জ্বালিয়ে, আকাশে আলোর ফোয়ারার বিভ্রম জাগিয়ে মুহূর্তে মিলিয়ে যায়। শিশুদুটি আরো সহস্র সম্মিলিত আনন্দরোলের সঙ্গে গলা মেলায়। স্ত্রী নদীর ঠিক মাঝখানে যে জাহাজের ওপর থেকে বিদ্যুৎ ঝলকের সঙ্গে হাউই উঠে যাচ্ছে, অনেক দূর উঠে ময়ূর বানিয়ে, ফুলঝুরি ছিটিয়ে, শব্দে সারা আকাশ ভরিয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে, সেদিকে তাকিয়ে থাকে। দুপাশে যতদূর দেখা যায় বাঁধানো নদীর পারে জনতা রেলিঙে ভর দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছে, সে কেবল নিচে কালো নদীর ছলছলাৎ জলের দিকে তাকানো। ওই নদী হোরাসাগর নয়।

রাতে ঘরে ফিরে পুরনো কাগজপত্র নিয়ে বসে সে। দানপত্রের কপি, যাতে তার মালিকানা স্বীকৃত, তার সঙ্গে কয়েকটা চিঠিও আছে। জবরদখলকারীদের এক সময়ের প্রস্তাব : তার অংশ একটা কিছু দাম ধরে নিয়ে নিতে রাজি তারা, আইন এসব ক্ষেত্রে কাউকে কখনো কোথাও নিয়ে যায়নি, সে যেন বোঝে; টাকাটা সে যেখানে চাইবে সেখানেই তার হাতে তুলে দেওয়া হবে। চিঠিগুলো উল্টেপাল্টে দেখে সে। সঙ্গে অন্য কিছু দলিলও আছে। একটি বাতিল বায়নাপত্র – কয়েক বছর আগে এরকম এক দুর্বল সময়ে সম্পাদন করা। শেষ অবধি রেজিস্ট্রি করা হয়নি। এক সেট ছাপানো ফরম – সরকারি জমি বরাদ্দের। অঋণী, অপ্রবাসী সবচেয়ে সুখী হলেও সরকারি জমি পাওয়া প্রবাসীদের জন্যে সহজ ভেবে সে ফরমগুলো আনিয়েছিল। কিন্তু ছোট অক্ষরে ওই শহরে যাদের জমি আছে তারা যোগ্য নয় এই ঘোষণাটি চোখে পড়লে সে আর দরখাস্ত পাঠায়নি। স্ত্রী বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিল, কখনো দখলে ছিল না, আদৌ কখনো দখল পাবে কিনা এমন জমির মালিক নিজেকে সে কীভাবে বিবেচনা করে! স্ত্রীর প্রতি রুষ্ট দৃষ্টিপাত করা ছাড়া আর কোনো জবাব তার মুখে জোগায়নি সেদিন।

আয়নায় ইদানীং নিজের দিকে আর বেশি তাকায় না। হালকা চুলই কেবল নয়, তাদের সাদা রং-ও তাকে প্রীত করে না। সময় এমনি করে শেষ হয়ে যায়। ক্রয়েচ্ছু পক্ষের শেষ চিঠির তারিখ বছরদুয়েক আগের। দেরাজ থেকে অ্যারোগ্রাম বের করে চিঠি লিখতে শুরু করে : পুরনো প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখছে সে।

আগামী ডিসেম্বরে আলাপ-আলোচনার জন্যে যাবে।

 

পাঁচ

সাজানো ঘরের চারপাশ জুড়ে সোফা, চেয়ার। আইন-ব্যবসায়ীর ঘর। যে ধর্মাত্মা তার জমি দখল করে রেখেছে তার প্রিয় শিষ্য এই আইনজীবী। মিষ্টভাষী। তার সঙ্গে অনেক বছর আগে এই ব্যাপারটির সূত্রপাতকালে কিছু আলাপ-আলোচনা হয়েছিল বলে সামান্য পরিচয় আছে।

সে দরজার মাঝপথে দাঁড়াতেই উকিল সাহেব উঠে এসে সাদরে তাকে ঘরে তুলে নিলেন। লম্বা পোশাকে মূল প্রতিপক্ষ ঠিক মাঝখানে সবচেয়ে জাঁকালো সোফাটিতে বসা। উঠে তার সঙ্গে করমর্দন করে তার শুভকামনা করেন তিনি সশব্দে। আরো দুজন লোকও ঘরে বসা। সম্ভবত তারা সাক্ষী হবে বায়নাপত্রে সই করার সময়ে।

সে ঘরের চারপাশ ভালো করে দেখে। জানালার যে গ্রিল নিজে পছন্দ করেছিল, সেই গ্রিল আছে এখনো। ঘরের দরজার সেই

‘ইয়েল’ লক আজো কাজ করছে। সোফায় বসবার আগে জানালা দিয়ে দেখে পঁচিশ বছরে শেফালীর চারা মহীরুহ না-হলেও, প্রাচীর বরাবর লাগানো সেই সুপারি গাছ কটি আজ ‘গুবাক তরুর সারি’ অবশ্যই।

কুশল বিনিময়ের শেষে আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি রাখেন না গৃহস্বামী। দূরদূরান্ত থেকে আনা মিষ্টির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কদিনের টানা ভ্রমণে ক্লান্ত সে, আপ্যায়নের আকাঙক্ষী নয়। এ-কথা মুখে বলা যায় না। তবু যথাসম্ভব দ্রম্নত সারতে চায় সব। উকিল সাহেব আগে থেকে তৈরি করা বায়নানামা তার হাতে তুলে দেন। অবিশ্বাস্য অঙ্কটির দিকে সে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। গত দুবছরের মধ্যে দাম নিয়ে আর কথাবার্তা না বললেও সে জানে এই অঞ্চলে জমির দাম অন্তত পাঁচগুণ বেড়েছে এই সময়ে।

উকিল সাহেব তার মনের কথা বোঝেন মনে হয়। সোফায় একটু হেলান দিয়ে আবার একটু উঠে বসেন, ‘দেখুন, আপনাকে আগেই বলেছি, দামটা তো অনেক আগেরই ঠিক করা। আর তা ছাড়া, সত্যি কথা বলতে কি, আপনার মুখ চেয়েই কেবল আমরা এই টাকাটা দিতে চাইছি।’

সে কিছু বলে না। পনেরো বছরের বাদ-প্রতিবাদ নথিতে লেখা আছে। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ আছে।

কাগজটি হাতে নিয়ে তাকে দেরি করতে দেখে উকিল সাহেব আবারও বলেন, ‘পনেরো বছরেও তো কিছু পাননি, আগামী পনেরো বছরেও যে কিছু পাবেন, এমন আশা দেখি না। সইটা করে ফেলুন।’

সে আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়, বাইরে সন্ধ্যা ক্রমে রাত্রির দিকে গড়াচ্ছে। ওপরের দিকে আকাশ অস্পষ্ট দেখা যায় এখনো। সারিবাঁধা সুপারিগাছের পাতা হালকা হাওয়ায় সরসর শব্দ করছে। শীত এখনো তেমন ধারালো দাঁতে চামড়া কাটতে

না-শিখলেও ঘর থেকে বেরোনোর সময়ে গায়ে একটি মোটা সোয়েটারই চাপিয়েছিল সে। তখন মনে হলো সেটা খুললেই বোধহয় আরাম হতো।

সাক্ষীরা চুপ করে বসে আছে। দুপক্ষের সই হয়ে গেলে সাবুদ করবেন তাঁরা। সে মুহূর্তে কলমটি তুলে নিয়ে সই করে দেয়।

 

ছয়

বারান্দা থেকে নামে সে। বেলিফুলের ঝোপ এখন আরো বড়। গেটের দুপাশে কামিনী আর হাসণাহেনার ঝাড়। স্থলপদ্ম তেমনি স্থির দাঁড়িয়ে আছে। বাগানের দক্ষিণ কোণে জুঁইয়ের ঝাড় ছিল। কামিনীর ঝোপ বেয়ে উঠেছিল অপরাজিতা। মনে পড়ে ঝুলত চামেলিও। কিন্তু এখন অন্ধকারে আর কিছু দেখা যায় না।

উকিল সাহেব সপারিষদ নেমে এসেছিলেন তার সঙ্গে। রাস্তা অবধি সঙ্গে এলেন। তাঁর গাড়ি দাঁড় করানো ছিল, ঘরে পৌঁছে দেবেন বলে অনেক পীড়াপীড়িই করলেন। সে উকিল সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে একটি রিকশা ডেকে নিল।

বড় রাস্তা দিয়ে একটু গিয়ে রিকশা ডাইনে মোড় নিল, তারপরে আবার ডাইনে। সামনে লম্বা এপাশ-ওপাশ চলে-যাওয়া বাঁকা ঝিলের ওপরে সাঁকো। সাঁকো পেরোনোর সময়ে সে জলের দিকে তাকায় আবারো। মাঝখানের চরের বেড়া ভেঙে যমুনা এক সময়ে

হোরাসাগরের সঙ্গে মিশেছিল বলেই সে সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

 

সাত

এক সময়ে মানুষের নাগালের বাইরে, ধরাছোঁয়ার বাইরে এক মনোরম উদ্যান ছিল। সেই উদ্যানের খ্যাতি সহস্র যোজন সহস্র বর্ষব্যাপী বিসত্মৃত ছিল। কিন্তু এখন সেই বাগানের একটি কল্পচিত্রও খুঁজে পাওয়া যায় না।

 

যদি কেউ ফেরে

 

এক

দিনের আলোয় পথ চিনে পুরনো ঠিকানায় গিয়ে ওঠা যাবে না সে জানত। কিন্তু অন্ধকার গাঢ় হয়ে নামবে যেতে-যেতে বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারেনি মধ্যশীতেও কখনো স্বেদের চিহ্ন দেখা যায়।

আদর করে তাকে ডেকে নিয়ে যাবার কেউ থাকবে বিমানবন্দরে সে জানত। তবু অত আনন্দিত স্বজনের মধ্যে একটি পরিচিতি মুখও দেখা যাবে না সে বুঝতে পারেনি।

পথের আলাপি ভদ্রলোক তার বিমূঢ় অবস্থা বুঝেছিলেন।

বলেছিলেন, ভাববেন না, আমার গাড়ি আসবে। আপনাকে পৌঁছে দেব। আপত্তি করে সে বলেছিল, না, না, আমি ট্যাক্সি নিয়ে নেব। তিনি হেসে বলেছিলেন। সাত বছর বড় দীর্ঘ সময়। আপনি

জানেন না।

 

কখনো আলোয় কখনো মৃদু অন্ধকারে কখনো বিশাল বৃক্ষের ছায়ায় আচ্ছন্ন প্রিয় শহরকে সে প্রায় চিনতেই পারে না। হয়তো সবই ঠিক। সাত বছর বড় দীর্ঘ সময়।

কিছু স্বপ্ন, কিছু মহিমা, কিছু গৌরব তারও প্রাপ্য ছিল। যেমন সুকর্মের সহযাত্রী সকলেরই থাকে। তবে সে জানে অপরের মাহাত্ম্য বর্ণনায় কেউ পঞ্চমুখ নয়, গৌরবের পাত্র পূর্ণ না হলে সকলের চোখে পড়ে না, একদা মহিমান্বিত কেউ কত সহজে গস্নানিময় জীবনে ফিরে যায়। সে কখনো ক্ষুব্ধ নয়। তবে আশা, হঠাৎ কেউ কখনো তাকে চিনে নিয়ে উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে বলবে ‘এই যে আপনি’।

এক সুখদ গৃহে বাস ছিল তার। কিন্তু ঈশান কোণের দমকা হাওয়া প্রচ- ঝড় হয়ে উঠবে আশঙ্কায়, দূরের আকাশে আগুনের আভা সিঁদুরের রং নয় জেনে, অনেকের সঙ্গেই সে-ও দূরে গেছিল। তারপর ঝড়ে উপড়ানো গাছ সোজা করে, উড়িয়ে নিয়ে-যাওয়া চালা পোড়া দেয়ালের মাথায় বসিয়ে ঘরে ফেরার সময় সকলের সঙ্গে ছিল না। এজন্যে বড় গস্নানি তার। এবং গস্নানিমুক্ত এক স্বপ্নও ছিল।

 

দুই

এমন সময়ে কেউ ফেরে না, শুভাকাঙক্ষীরা তাকে বলেছিল। মাটি, পাহাড়, বন ভেসে গেছে যে-স্রোতে তা সহজে মজে যাবে না। মানুষ ফুঁসছে আগুনের মতোই, জ্বালিয়ে দিচ্ছে এতকালের আবর্জনা। সেই ঘূর্ণিতে পড়লে সবাই বেসামাল হবে। হোক না নিজের মানুষ।

তবু ঘর ছেড়ে দিয়ে, বাস তুলে চলে যাচ্ছিল সে। বাক্স বাঁধা। তখনই শুনেছিল দূরের সেই শহরে বিমান না-ও পৌঁছাতে পারে। বাড়ির নতুন মালিক ভোরবেলায় উঠে আসবে। বাধ্য হয়ে সব সরিয়ে শূন্যঘরের মেঝেতে শুয়েছিল সে। অন্ধকার থাকতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যেই যেন নতুন মালিক সদ্য-পাওয়া চাবি দিয়ে দরজা খুলেছিল। ত্রাসে ঝটিতি উঠে বসেছিল সে। বুঝেছিল দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলে আবার ফিরে এসে বসা ঠিক নয়।

নিজের হাতে বুনে-দেওয়া লালপাতার চারাগাছ আজ ছায়া দিচ্ছে, দেখে। এক সময়ে বিশাল মহীরুহ হবে, কিন্তু সে জানে এই ছায়ায় সে বসতে চায় না। মেঘের নিচে নামলে প্রিয় ভূমির

জলরাশির মাঝে-মাঝে সবুজ দৃশ্যে ভেসেছিল ক্রমে সহস্র দালানকোঠা, দিগন্তবিসত্মৃত। মাথা উঁচু-করা স্কাইস্ক্র্যাপার ওড়া-পথেও দেখা যায়। সে কেবল ব্যাকুল চোখে খুঁজছিল সেই ছোট্ট লাল দালানটি। এক সময়ে দেখা যেত এই এত উঁচু থেকেও। শহরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খোলা জায়গা ঘোড়দৌড়ের মাঠের পাশেই, চোখে পড়বে না কেন? এখন সেই মাঠ ঘন সবুজে ঢাকা।

 

তিন

কাস্টমস অফিসার একবার তার মুখের দিকে, তারপরে চারপাশে মালামালের সত্মূপ, স্ত্রী-পুত্র-কন্যার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘এ সবই আপনার!’

‘ষোলো বছরের আবর্জনা’, সে হেসে বলেছিল।

‘ষোলো বছর পরে ফিরছেন বুঝি?’ তারপরে থেমে বলেছিলেন, ‘তবু এত নেওয়া যাবে না।’

‘কিন্তু সবই তো সংসারের জন্যে। ব্যবহারের – ’, আশ্চর্য হয়ে বলেছিল সে, ‘কনস্যুলেট থেকে আমরা খবর নিয়েছি কোনোরকম অসুবিধে হবে না তাঁরা বলেছেন।’

‘তাহলে ব্যাগ, স্যুটকেস সব খুলুন, কী আছে দেখি।’

গত সাত রাত্রি ঘুম ছিল না প্রায়। চবিবশ ঘণ্টার বেশি পেস্ননে উড়ে আসা। সব খুলে দেখিয়ে আবার সব বন্ধ করার ক্লেশ, হয়রানির কথা ভেবে সে বাধ্য হয়ে মেনে নিয়েছিল বিজ্ঞ সহযাত্রীর উপদেশ। ‘ওদের হাতে কিছু দিয়ে দেবেন।’

কিন্তু সেই কিছুর পরিমাণ যে এত সে বুঝতে পারেনি।

 

চার

সেই একতলা লাল দালানের জায়গায় বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট এখন। একদিন সেখানে যায় সে। ভেবেছিল দেখবে গেটের দুপাশ থেকে উঠে এসে তোরণ বানিয়েছে মাধবীলতা, বাঁয়ে হাসণাহেনার ঝাড় বেয়ে উঠেছে কি অক্লেশে নীল অপরাজিতা, সাদা ফুলে ছড়ানো জমিতে তেমনি দাঁড়িয়ে আছে কামিনী। সিঁড়ির পাশে দোলনচাঁপা, জুঁই। সেসব কিছুই ছিল না।

 

পাঁচ

‘চল তোমার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিই’, বন্ধু বলেছিল। ‘একই সঙ্গে পড়েছি আমরা, চিনবে না কেন?’

কিন্তু সংশয় তবু কাটেনি। কারণ ছিল সন্দেহের। একসঙ্গে ক্লাসরুমের বারান্দাই নয়, রাস্তায় মিছিলেও ছিল তারা। পরে সে শুনেছিল মিছিলের সহযাত্রী এখন ভিন্ন মতে, ভিন্ন পথে, মিছিলের মানুষের উল্টোদিকে দাঁড়ানো।

দেয়ালের ওপারে যাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধুই করে রেখেছিল।

পরিচিত সাংবাদিক, সব দরজায় ঢোকার সাহস আছে তার।

‘আপনারা বসুন, মিনিস্টার সাহেব এখনো পৌঁছাননি।’ মন্ত্রীর সহকারীর নির্দেশ।

দুঘণ্টা বসে থেকে অবশেষে বন্ধু চলে গেছিল, তাকে অফিসে ফিরতেই হবে। কিন্তু সে যায়নি, দেখা যাক, সে ভেবেছিল, এককালের সহপাঠী। প্রায় সারাদিন পরে চারপাশে সাড়া তুলে পারিষদপরিবৃত মন্ত্রী এসেছিলেন। পাশের ঘরে বসে সে বুঝেছিল। পরে ডাক পড়লে হাস্যমুখে সহপাঠী চেয়ার ছেড়ে উঠে তার হাত ধরেছিলেন।

‘চেহারা বেশ পালটেছে কিন্তু, অন্যখানে হলে চিনতেই পারতাম না’ হেসে বলেন তিনি।

‘আপনাদের কথা আমরা শুনেছি সব। অনেক কিছু করেছেন আপনারা’, আর সকলের সঙ্গে নানা কথার ফাঁকে-ফাঁকে বলেছিলেন তিনি। ‘দূরে থাকলে কি, আপনারাও তো মুক্তিযোদ্ধা। ফিরে আসুন, দেশ তো আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা করছে’, উদাত্ত কণ্ঠ তাঁর।

‘তাই তো ফিরে এলাম’, খুশির স্বর তার। এত কালের গস্নানি থেকে মুক্ত ‘রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।’

‘কবে জয়েন করতে পারবেন’, তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন।

‘যখনই বলবেন’, সে জবাব দিয়েছিল।

‘আরো কিছুদিন সময় লাগতে পারে’, দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারের পরে কথা তাঁর। তারপরে বলেছিলেন, ‘কি একটা কাগজের সঙ্গে নাকি জড়িত আপনি, লোকে নানা কথা বলে, আপনারা নাকি আমাদের বিরুদ্ধে লেখেন?’

‘আপনাদের বিরুদ্ধে তো নয়, আমরা দেশের লোকের পক্ষে লিখি, মানুষের কথা লিখি, সকলের মঙ্গলের জন্যে’, হেসেই বলেছিল সে।

তৃতীয় সাক্ষাতের নির্দিষ্ট দিনে তিনি বিদেশে ছিলেন। মহিমান্বিত সহপাঠীর সঙ্গে আর কখনো দেখা হয়নি তার।

 

ছয়

কিছু স্বপ্ন, কিছু মহিমা, কিছু গৌরব তারও প্রাপ্য ছিল, যেমন সুকর্মের সহযাত্রী সকলেরই থাকে। তাই সকলের মাঝখানে বসে স্মিত হাসির সঙ্গে সেসব দিনের কথা বলার চেষ্টা করেছিল সে। বুঝি তার দিকে সবাই ফুলের তোড়া এগিয়ে দেবে।

 

সাত

এমন সময়ে ঘুম ভেঙে গেলে আবার সহজে স্বপ্নে-ফেরা যায় না। পাখা থেমে আছে। শোবার আগে বন্ধ করে দিয়েছিল। বিছানা থেকে উঠে চালাতে গিয়ে কি ভেবে সে দরজা খুলে বারান্দায় চলে আসে। বন্ধুগৃহে অতিথি সে। সামান্য সাংবাদিকের বাসা, তেতলার এই ছোট বারান্দা আরো বড় দালানের আড়ালে পড়ে আছে। সামনে কিছু দেখা যায় না। শুধু বদ্ধ জানালার সারি। মাথা বাড়িয়ে তাকালে তরল আকাশ চোখে পড়ে। আলো ফুটবে একটু পরেই। দিনের শব্দ উঠে আসছে আসেত্ম-আসেত্ম। আর চলে না, আশ্রয়হীন কেউ বাঁচে না। সে স্বপ্নে ফিরে যায়।

শিরীষ, অশোকের ছায়া ছেড়ে পাড়ার রাস্তায় ঢুকে যাচ্ছে সে। আদালতের সামনে বট-অশ্বত্থের নিচে পানদোকান সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শম্ভু। সোনা মিয়া তার ক্যাশবাক্সের সামনে বসে তাকিয়ে দেখছে নতুন ছেলেটি চায়ের কাপ ধুতে গিয়ে ভেঙে ফেলে কিনা। বৈঠকখানার বাইরে হেলান-দেওয়া বেঞ্চে সারিসারি বসে মুহুরির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিচারপ্রার্থী। জানালা ঘেঁষে লিচুগাছটির নিচে গ্রাম ছেড়ে-আসা দম্পতি সারা দিনের জন্যে সংসার পেতেছে। জমির দলিল করাবে। কাজলের বাবা উকিল সাহেব বেরিয়ে এসে তাকে রিকশায় দেখে খুশিমুখে হাত নাড়ালেন। মণিকার এস্রাজের মাস্টার সামনে বসা, ছড় টেনে চলেছে সে। দরজার সামনে দাঁড়ালে সব ফেলে ছুটে এসে এক্ষুনি মণিকা বলবে, ‘এসেছ’।

 

যেন এক বাগানবাড়ি

 

এক

মাদুর বিছানোর জায়গা মিললে সেটিই তোমার বাড়ি, এই চিন্তা তার ছিল না কোনোকালে, আবার স্ফটিক প্রাসাদে কিংখাবের চাদরে ঘুমোবে এমনো নয়। তবু পছন্দের একটি বাসস্থান, দিনের কাজ শেষে যেখানে সাগ্রহে ফিরবে, তার চিন্তায় ছিল সর্বদাই। সকলে সে কথা মানে না। বলে শুধু এই জন্যেই কি এই ঘর থেকে ওই ঘর, এই বাড়ি থেকে ওই বাড়ি, এই দেশ থেকে ওই দেশ করে কেউ?

এই বাসাটিও মন্দ নয়। চারপাশ খোলা, একাধিক ঘর, বারান্দা, বাথরুম; প্রয়োজনের জন্য চেয়েও যেন বেশি। তবু দিনের কাজ শেষে ঘরে ফেরার আগ্রহ থাকে না। দূরবাসী পরিবারের কথা বলা যায় কিন্তু সে এমন কিছু স্থায়ী অবস্থা নয়। তাহলে? নিজের মাদুর সে বিছাবে কোথায়?

আগের সবকটি বাসা থেকেই এটি ভিন্ন চরিত্রের। সচ্ছল বনেদি মানুষের অঞ্চল ছিল আগের সবকটি বাসা। এটি তেমন নয়। ঘন বসতি চার পাশেই। সর্বদা ব্যস্ত যানবাহন – মাঝখানে ভাগকরা রাস্তার এই পাড়া। অন্যান্য রাস্তাও তেমনি। নানা ব্যবসায়, দোকানপাট, উজ্জ্বল নিয়নের আলো সবই আছে। তবু তার কাঙিক্ষত বাসস্থান নয় এটি।

সুহৃদসঙ্গে একদিন বলেই ফেলে, ‘ভাবছি এই বাসাটিও পাল্টাব।’ বিস্ময়ের সঙ্গে জবাব দেন একজন, ‘এখনো ছমাস হয়নি, এ-বাসায় এসেছেন।’ আর একজন হেসে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি কি এক বাসা পাল্টানোর সময়েই আর এক বাসায় চলে যাওয়ার কথা ভাবেন?’

ভিন্নজনের প্রশ্ন, ‘আজ পর্যন্ত কত বাসা বদলেছেন।’

ভাবে সে। বাল্য ও কৈশোরে নিঃসম্বল পরিবারের চার-পাঁচ বাসায় ওঠানামা তার নিজের কীর্তিতে পড়ে না। একাধিক ছাত্রাবাসে থাকাও নয়, তবে যৌবনের শহরে বারবার স্থানবদল হিসেবে তো আসবেই। আর তার পরের দীর্ঘ সময়ে অযুত ঘরের চেহারা যেন মনেও পড়ে না। শুধু মনে পড়ে স্থায়ী ঠিকানা থাকলেও সেখানে কখনো ওঠা হয়নি।

বায়নাপত্রটি এখনো তোলা আছে। দুর্বল কোনো সময়ে সই করা। রেজিস্ট্রেশন হয়নি। অবিশ্বাস্য অল্প দামে ধার্য করা তবু নয়। দখলীস্বত্বই বড় এই শেষ কথাই শোনা তার।

 

দুই

চোখ বুঁজলে স্বপ্ন আসে। কখনো গভীর রাতে ঘুম ভেঙে দেখে সমস্ত ঘর তীব্র আলোয় উজ্জ্বল। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বিশাল ঘরে পাশাপাশি পাতা খাটে, চৌকিতে নিদ্রারত পরিবার। জানালার পাশে সরে যেত সে। কাঁঠালগাছটার সামান্য আড়ালের পরে আর কিছুই নেই –

প্রতিবেশীর ছেড়ে-যাওয়া পড়ো ভিটেমাটি, ধানের জমি, থানা সদরে যাওয়ার রাস্তা, তারপর হোরাসাগর, বিনানইয়ের চর, ওপারের যমুনায় ভেসে-যাওয়া স্টিমারের সার্চলাইট শ্বেত আলোর বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে তাকে।

মুহূর্তের দুর্বলতায় সইকরা সেই দলিলটিই এখন পূর্ণদখলের দলিল বলে দেখানো হবে – যদি কেউ দেখতে চায়। একবার সেও দেখবে বলে ভেবেছিল। কি লাভ ভেবে কখনো আর দেখা হয়নি।

হোরাসাগরের তীরে আর একবার দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল তার – যে হোরাসাগরে পা ভিজিয়ে নৌকায় ভেসেছিল ঘরভাঙা পরিবারের সঙ্গে। ভেবেছিল, দেখবে বাঁয়ে দূরে থানা শহর, ডাইনে লেডলি কোম্পানির পাটের আড়ত, গাঁট বাঁধবার কারখানা। হোরাসাগরের বুকে সারিসারি দাঁড়ানো বার্জ। তীরে নোঙর আটকানো তাদের। সময় হলে ক্যাপস্টানে হাতল ঢুকিয়ে ঘোরাবে সুরে-সুরে খালাসির দল। আর খানিক ভাসলেই পাওয়া যাবে বন্দর, মহাজনের গদি, ‘যেখানে সেখানে থুথু ফেলিবেন না’ – টিনের দেয়ালে সতর্কবাণী। গমগমা বাজারে সাদা তাঁবুর নিচে চায়ের দোকানি। সুখী পানকারীর হাতে পেয়ালা – ‘ইহাতে নাহিক কোনো মাদকতা দোষ, খাইলে হয় অতি চিত্ত পরিতোষ’।

আরো একটি দৃশ্যও আসে, যেন স্বপ্নই। সেই ঘর। জানালার যে গ্রিল নিজে পছন্দ করেছিল, সেই গ্রিলই আছে এখনো। নিজের ফরমায়েশি মোজাইকের রং এখনো তেমনি মনে ধরে। পঁচিশ বছরে শেফালির চারা মহীরুহ না-হলেও প্রাচীর বরাবর লাগানো সেই সুপারিগাছ কটি আজ ‘গুবাক তরুর সারি’ অবশ্যই। ফেলে-আসা হোরাসাগরতীরে সেই গৃহের ছবি। বেলিফুলের ঝোপ এখন আরো

বড়। ফটকের দুপাশে কামিনী আর হাসণাহেনার ঝাড়। স্থলপদ্ম তেমনি স্থির দাঁড়িয়ে আছে। বাগানের দক্ষিণ কোণে জুঁই ফুটত। কামিনীর শরীর বেয়ে উঠেছিল অপরাজিতা। মনে পড়ে ঝুলত চামেলিও।

 

তিন

ঘরমোছা শেষে জানালা বন্ধ করতে আসে নতুন লোকটি। আর বসে-থাকা যায় না। অফিসের দরজা বন্ধ করতে বলে বেরিয়ে আসে। লিফট খুললে দেখে সে একাকী যাত্রী।

গাড়ি রাখবার জায়গা প্রায় শূন্য। তার ব্যবহারের জন্যে বরাদ্দ গাড়িটির পাশেই চালক দাঁড়ানো। বহুতল ভবনের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। প্রহরী, দরজায় দাঁড়ানো রক্ষী ছাড়া আর কেউ নেই।

সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গাড়িটি বাঁদিকে মোড় নেয়। এটিই তার বাসায় যাওয়ার সহজ এবং ভালো পথ। হঠাৎ ড্রাইভারকে বলে, ‘ডানদিকেই যাই বরং।’ অথচ কী আছে সেদিকে মনে করতে পারে না। সোজা রাস্তায় অনেক দূর যাওয়ার পরে চালক বলে, ‘এবারে কোন দিকে যাব?’ সে চেয়ে দেখে বড় রাস্তা এসে মিশেছে সেই পুরনো পথে। পুরনো ঠিকানায় ওঠা যায়, পুরনো পাড়ায়। যেন ফেরবার পথ নেই, সেদিকে যেতে বলে।

এ-পথ সে-পথ ঘুরে বাড়িটির সামনে এসে গাড়ি থামায়। দেখে তেমনি আছে গুবাক তরুর সারি, তেমনি গাড়িবারান্দা, জানালা, দরজাই কেবল মলিন। পূর্বের শূন্য জায়গায়, যেখানে অন্দরমহল হবে ভাবা ছিল, নতুন স্থাপনা। ওই অংশে তার মালিকানাও স্বীকার করে না পুণ্যাত্মা দখলকারী। পুরনো অংশ নিয়েই মামলা।

ছয় মাসের বাড়িতে যখন ফিরে আসে তখন রাত্রি নেমেছে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠা আর সহজ মনে হয় না। এ-ও আর এক ভুল। বাসা নেবার সময়ে ভেবে দেখেনি। বাগানঘেরা একতলা বাংলো এটি নয়। খেয়াল করেনি। অফিসের পোশাক পালটে ঝুলবারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সামনে খানিক খোলা জায়গার পরে নানা আকারের দালান কিছু। ক্বচিৎ কোনো গাছের ছায়া দেখা যায়।

টেলিফোনের শব্দে ফিরে আসে বসবার ঘরে। ভিন্ন প্রান্তে ভুল উচ্চারণে কেউ তার নাম বলে। তবু ‘হ্যাঁ’ বলে সে।

‘আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, আপনি তথ্য পাচার করেন, রাষ্ট্রদ্রোহী। আপনার স্ত্রীও।’ আঞ্চলিক টানে বলে কেউ।

‘কে আপনি? কী বলছেন এসব?’ বিস্মিত প্রশ্নে ‘মৃত্যুর জন্য প্রস্ত্তত হোন’ প্রত্যুত্তরে শোনা যায়। টেলিফোন নিঃশব্দ হয়।

স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে থাকে সে এক জায়গায়। কুয়াশা কাটে।

টেলিফোন তুলে সুহৃদকে ডাকে। সব জানালে তিনি বলেন, ‘আপনি কি ওইদিকে গেছিলেন? তারপর হাসতে থাকেন। হেসেই বলেন, ‘মানে, আবার বাসা পাল্টাতে হবে আপনাকে।’

 

ফেরবার শেষ গাড়ি

 

এক

জানালার কাচে এখন তার মাথা ঠেকানো। অনেক-অনেক কাল পরে এই একটি গাড়ি পেয়েছিল সে। ছুটে চলে দূর-স্টেশনের দিকে। তখন হতে পারে রাত্রির তিন প্রহর। তবু এটি মধ্যরাত্রির গাড়ি। শেষ গাড়ি। এক সময়ে ঠিক মাঝরাতে নদীর পুলে শব্দ তুলে চলে যাবে এই মাঝরাতের অধরা ট্রেন। হোক সে শেষরাতেই। শিহরিত শরীরে সেই শব্দ শুনেছে সে। ঘষা কাচের আকাশ তার জানালার বাইরে। জ্বলে নেভে অযুত তারার কিছু চোখে পড়বে নিশ্চয়ই চোখ খুললে। কিন্তু এখন সেসব কিছু দেখবে না সে।

দূরের স্টেশনে নামবে কোন যাত্রী? সেটিই কি তার গন্তব্য? গাড়ির ঝাঁকুনি, নিরবচ্ছিন্ন মোহ ও হাওয়ার বুক কেটে চলে-যাওয়া শোঁ শোঁ শব্দের শেষে অন্ধকার পস্ন্যাটফর্মে নামবে সে।

দুই

কিছু স্বপ্ন কিছু মহিমা কিছু গৌরব তারও প্রাপ্য ছিল, যেমন সুকর্মের সহযাত্রী সকলের থাকে। তবে সে জানে অপরের মাহাত্ম্য বর্ণনায় কেউ পঞ্চমুখ নয়, গৌরবের পাত্র পূর্ণ না হলে সকলের চোখে পড়ে না; একদা মহিমান্বিত কেউ কত সহজে গস্নানিময় জীবনে ফিরে যায়। তাই সে কখনো ক্ষুব্ধ নয়। ফেলে-আসা কেউ কখনো তাকে চিনে নিয়ে বলবে, ‘এই যে আপনি’। তেমন ঘটেনি।

 

তিন

এক সুখগৃহে বাস ছিল তার। কিন্তু ঈশান কোণের দমকা হাওয়া প্রচ- ঝড় হয়ে উঠবে আশঙ্কায়, দূরের আকাশে রক্তিম আভা সিঁদুরের নয় জেনে অনেকের সঙ্গে সেও দূরে গেছিল।

তারপরে ঝড়ে উপড়ানো গাছ সোজা করে, উড়িয়ে নিয়ে-যাওয়া চালা পোড়া দেয়ালের মাথায় বসিয়ে ঘরে ফেরার সময় সকলের সঙ্গে সে ছিল না। এ জন্যে বড় গস্নানি ছিল তার এবং গস্নানিমুক্ত স্বপ্নও ছিল :

গাড়ি থেকে নামবে সে। নিচু প্ল্যাটফর্মে পা রেখেই দেখবে লাল রঙের শেডের নিচে চায়ের দোকানে বসে আছে অনুগত কেউ। তাকে দেখে উঠে আসবে, হেসে বাক্সটি হাতে নিয়ে বলবে, ‘চলুন’।

দেখবে স্টেশন থেকে বেরিয়ে পথটা তেমনি বাঁধানো। সিমেন্টের দুপাশ পাথরকুচিতে ঢাকা। এই আসন্ন খররৌদ্রে, রিকশায়, মৃদু

ঝাঁকুনিতে শিরীষের ছায়ায় যাচ্ছে সে। অজস্র বেগুনি ফুলে ভরে আছে নয়ানজুলি। স্টেশনের মাঠের শেষে বাংলা স্কুলের দেয়াল। খেলার মাঠে কালো গোলপোস্ট দাঁড়িয়ে আছে। সেই দেয়াল আরো বিসত্মৃত হয়ে চলে গেছে সিনেমা হলের পেছনে, অয়েল মিলের জেনারেটর তেমনি ধ্বক্ ধ্বক্ শব্দ করে চলেছে তাকিয়ে দেখবে। মাঠের ওপারে রেললাইন ঝাউতলার ওপর দিয়ে, রাজাবাজারের বুক কেটে, ফতে আলী বাজারের পাশ দিয়ে করতোয়াকে নিচে রেখে চলে যাচ্ছে গাবতলী। স্টেশন থেকে নেমে শহরে ঢোকার মুখেই তাকিয়ে দেখবে সেই পলাশফুলের গাছ একটি ডাল নিয়ে তেমনি দাঁড়িয়ে আছে এডওয়ার্ড পার্কের সীমানায়। আছে সেই পাতাবাহার আর অর্কিডে মোড়া মাটির পাহাড়টি। জলপাইগাছের ফাঁক দিয়ে একটু কষ্ট করে তাকালেই সে দেখতে পাবে টলটলে পুকুরের বাঁধানো ঘাটটি, দেখবে পান্থপাদপের সারি, লতানো গোলাপের কেয়ারি, বেলিফুলের ঝোপ, দাঁড়ানো শ্বেত গন্ধরাজ, স্থলপদ্মের গাছদুটি, ডালিয়া আর মৌসুমি ফুলের রংবাহার। দেখবে আছে সেই আমবাগানে ছড়ানো গাছের ছায়া। একটু পরেই আসবে বাদামওয়ালা বিজয়ী তার বিক্রির ডালা নিয়ে। আজ বিকেলে, সে নিশ্চিত জানে, এখানে জনসভা আছে।

কিছু স্বপ্ন, কিছু মহিমা, কিছু গৌরব তারও তো পাওনা ছিল।

 

চার

দূরের স্টেশনে গাড়ি এখন এসে দাঁড়াচ্ছে নিঃশব্দে। যেন রাত্রির ঘুম না ভাঙে। চোখ না-খুলেও স্পষ্ট পড়া যায় স্টেশনের নাম। শেষ

গাড়িতে কেউ ওঠে না। কেউ নামে না। মৃদু আলোর রেললণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে পয়েন্টসম্যান। ইঞ্জিনের একটানা হিসহিস শব্দ  – অন্ধকার কামরার দরজায় কেউ এসে দাঁড়াল। লম্বা পস্ন্যাটফর্ম

এদিক-ওদিক তাকালে কিছু দেখা যায় না। কোনো লোক না, দোকান না, ফেরিওয়ালা, চা-ওয়ালা কিছু না, কর্মহীন কুলিটিও নয়। সীমানার ওপারে বুঝি কেবল মসীময় প্রান্তর। কেউ আসেনি। তাকে নিতে কেউ আসেনি।

লোকটি দাঁড়ানো দরজায়। পয়েন্টসম্যান তার অপ্রাকৃত ঘণ্টা বাজায়। জানালার কাচ থেকে মাথা না-তুলে চোখ না-খুলে সে দেখে, শেষ গাড়ি আসেত্ম পার হয়ে যাচ্ছে দূর-গন্তব্যের স্টেশন। r

 

[এই রচনাটি একটি ‘ছোট উপন্যাস।’ ‘উপন্যাস’ নয়, ‘গল্প’ নয়, ‘বড় গল্প’ নয়, ‘ছোটগল্প’ও নয় – ‘ছোট উপন্যাস’, যেন ভিন্ন একটি শিল্পমাধ্যম।]