আমি চারুকলায় পড়াশুনো আর খানিক কর্মজীবনের কারণে গত শতকের
ষাট-সত্তরের দশকে প্রায় বছর
আট-নয়েক টানা ঢাকায় ছিলাম। তখন সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে চিনতাম না। তিনি আমার চেয়ে বেশ কয়েক বছরের ছোট, সম্ভবত এটিই কারণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর দেখলাম শিক্ষকতা করতে গেলে ছাত্রের চেয়ে শিক্ষকেরই বেশি পড়াশোনা করা দরকার পড়ে। বইপত্র খুঁজতে আর ঘাঁটতে গিয়ে একটি বই পেলাম – নন্দনতত্ত্ব, লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। বাংলায় নন্দনতত্ত্বের সহজবোধ্য উপস্থাপন হিসেবে এ-বই ছাত্রদের কাজে আসবে ভেবে পাঠ-সহায়ক তালিকায় যুক্ত করলাম। সংস্কৃতিমনস্ক পত্রিকা দৈনিক সংবাদ-এর
সাহিত্য-সাময়িকী বিভাগটি অগ্রবর্তী, এর জন্য আমরা সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতাম। সম্ভবত নব্বইয়ের দশকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সংবাদের ওই বিভাগে ‘অলস দিনের হাওয়া’ নামে একটি কলাম লিখতে শুরু করেন, যেটিতে বিশ্বের সাহিত্যজগতের সাম্প্রতিক নানা খবর পাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হলো, বলা যেতে পারে কলামটি বিশ্বসাহিত্যের একটি বাতায়ন হিসেবে কাজ করতে লাগলো। কলামটি আমার কাছে বিশেষ আগ্রহের হয়ে উঠলো বিষয়ের বৈচিত্র্য ছাড়াও ঋজু অথচ প্রাঞ্জল গদ্যের জন্য। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের নির্ভার গদ্যই প্রথমত আমাকে তাঁর সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে। ‘অলস দিনের হাওয়া’র প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যেত অক্টোবর মাসের দিকে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষিত হলে, পরের সপ্তাহান্তেই সে-লেখক সম্পর্কে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত হলেও একটি পরিচিতি তুলে ধরবেন এ-প্রত্যাশায়। গত শতকের ইন্টারনেটবিহীন দুনিয়ায় এ-কাজ সহজ ছিল না। তাঁর পঠনের পরিধি যেমন বিস্ময় জাগাতো, তাঁর মূল্যায়নেও ভাবাবেগবর্জিত মননের প্রকাশ অনুভব করা যেত। ফলে সাম্প্রতিকতম নোবেল বিজয়ীর বইটি পাঠের একটি তাগিদ ভেতরে আপনা থেকেই তৈরি হয়ে যেত।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে আমার চাক্ষুস আলাপ-পরিচয় এরও পরে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী, এশীয় দ্বিবার্ষিক শিল্পকলা প্রদর্শনী ইত্যাদি আয়োজনে আমার ডাক পড়তে শুরু করলে আমি এর নানাবিধ কমিটিতে, সেমিনারে ও বিচারকমণ্ডলীতে যুক্ত হতে লাগলাম। এসব কাজে যুক্ততার সুবাদেই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা ও আলাপ, বিশেষ করে সেমিনারের কর্মকাণ্ডে। অবশ্য এরও আগে দৃশ্যকলা বিষয়ে সৈয়দ মনজুরের লেখাজোখার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। আমি নিজে কেমন লিখতে পারি বলতে পারবো না, তবে অন্য যাঁরা ওই সময় দৃশ্যকলা বিষয়ে লিখতেন তাঁদের অধিকাংশের লেখায় কথার ফুলঝুরি ছাড়া বিশেষ সারবত্তা পেতাম না। মনে হলো, এই লেখকের মধ্যে বরং চিত্র-ভাস্কর্যের ভাষাকে অনুধাবনের চেষ্টা অনেকটাই পোক্ত। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখাপত্রের খোঁজ করে দেখলাম ইতোমধ্যেই গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিল্প-আলোচনা মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থের তালিকা বেশ পুষ্ট, এর বাইরে রয়েছে বহুবিধ রচনাবলি ও সংকলন সম্পাদনার কাজ। অধ্যাপনার দায়িত্বের ফাঁকে করছেন এত এত কাজ। একবার বাংলাদেশের শিল্পকলা বিষয়ে নরওয়েজিয়ান দূতাবাসের অর্থায়নে একটি বিশাল আর ভারতীয় দূতাবাসের উদ্যোগে আরেকটি সচিত্র পুস্তক প্রকাশিত হলো প্রায় একই সঙ্গে, দেখলাম দুটিরই লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। একইসঙ্গে দু-দুটি বড়সড় বইয়ে ভূমিকা বাদেও প্রত্যেক শিল্পী বিষয়ে লেখার কঠিন কাজটি তিনি সম্পন্ন করেছেন নির্দিষ্ট সময়েই। তবে অতিরিক্ত চাপ তার কিছু না কিছু পাশর্^প্রতিক্রিয়া তো রাখবেই। এ-দুটি গ্রন্থে তাঁর লেখা হয়তো প্রত্যাশিত মান বজায় রাখতে পারেনি, একই ধরনের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের পুনরাবৃত্তি ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। পত্রিকায় বই দুটির খানিক বিরূপ সমালোচনাও আমি করেছিলাম মনে পড়ছে। তবে বলতে হবে যে, সার্বিকভাবে দৃশ্যকলা জগতের মানুষ না হয়েও এ-শিল্পের গতিপ্রকৃতিকে অনুধাবনের একটি সচেতন প্রয়াস ও প্রয়োজনীয় জানাশোনা অর্জনের চেষ্টা আমি তাঁর মধ্যে প্রভূতভাবে দেখেছি। তাঁর গল্প ও উপন্যাস যেটুকু পড়েছি, তাতে আখ্যান ও উপস্থাপন-ভঙ্গিতে নতুন ও সাম্প্রতিকতম ভাবনার প্রয়োগের প্রয়াসে তাঁর স্বাতন্ত্র্য লক্ষণীয়। আমার স্ত্রী শিল্পী নাজলী লায়লা মনসুর তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে একটি বই প্রকাশের চিন্তা করছেন অনেকদিন ধরে। ওঁর চিত্রকর্মের অনুলিপিই এ-বইয়ের প্রধান দিক, তবে শিল্পী ও শিল্পকর্ম বিষয়ে কিছু ভাবনা-উদ্রেককারী নিবন্ধ ছাপানোও পরিকল্পনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে ভাবা হয়েছিল। গোটা তিনেক লেখকের নাম আমাদের ভাবনায় ছিল, তার প্রথম নামটি ছিল সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তাঁকে অনুরোধটি করাও হয়েছিল, তিনি সানন্দে ও উৎসাহের সঙ্গে সম্মত হয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য যে প্রত্যাশাটি পূরণ হলো না।
পরিপাটি পরিচ্ছদ, পায়ে কেডস আর মুখে স্মিত হাসি – এভাবেই তাঁকে দেখতাম। বিকেলে যেখানেই যাওয়ার যেতেন পদব্রজে, হাঁটার প্রয়োজনীয় কাজটিও হয়ে যেত। একবার তাঁর সঙ্গে এক হোটেলের কামরায় রাত্রিযাপনের অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করি। সন মনে নেই, এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। পরের দিন থেকে দুদিনব্যাপী সেমিনার চলবে। বিদেশি অতিথিরা রয়েছেন পূর্বাণী
হোটেলে। এর মধ্যে তখনকার বিরোধী দল থেকে বিভিন্ন দাবিতে পরদিন থেকে লাগাতার হরতালের ঘোষণা দেওয়া হলো। প্রয়াত সুবীর চৌধুরী, শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীন পরিচালক, দমবার মানুষ নন।
বিদেশিরা তো হোটেলেই রয়েছেন, সেমিনারের জন্য আমরা যে কজন দেশি বক্তা-আলোচক রয়েছি তাদেরকেও হোটেলে রেখে দিয়ে হোটেলেই সেমিনারের ব্যবস্থা করে ফেললেন, যাঁরা আসতে পারবেন তাঁরা এলেই চলবে। আমার আর মনজুরের ঠাঁই হলো এক কামরায়। ডিনারের আগে-পরে আর ঘুমানোর আগে অনেক রাত পর্যন্ত আমাদের গল্প চললো। বিষয়বস্তু কবিতা, উপন্যাস, দৃশ্যকলা ছাপিয়ে চলচ্চিত্র ছেড়ে রাজনীতিতে এসে থামতে থামতে ঘড়ির কাঁটা ডানে অনেকখানি হেলে পড়েছে। একটি আলোকিত আধুনিক আর যুক্তিবাদী মানসকে চিনে নিতে পেরে মনটা ভরাট হয়ে উঠল। তাঁর সঙ্গে আমার যোগ সামান্যই ছিল, কিন্তু বিনিময় ছিল অনেক ব্যাপ্ত। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমার সপ্রশংস অভিবাদন জাগরূক থাকবে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.