আবুবকর সিদ্দিক ও গণমানুষের গান

১৯৪২ সালে চীন বিপ্লব চলাকালীন ইউনানের মুক্তাঞ্চলে মাও সে তুং শিল্প-সাহিত্য প্রসঙ্গে একটি বিখ্যাত রচনা পাঠ করেছিলেন| সেখানে তিনি বিপ্লবের বিজয়ের জন্য দুই ফ্রন্টে লড়াইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন| একটি হলো সামরিক ফ্রন্ট, আরেকটি সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট| মাও সে তুংয়ের ভাষায়, বন্দুকের যুদ্ধ এবং কলমের যুদ্ধ| বিপ্লবের মহানায়ক মাও সে তুং নিজেই যখন
সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট বা কলম-যুদ্ধের তাৎপর্য এভাবে তুলে ধরেছেন, তখন আমরা যাঁরা বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী, যাঁরা সমাজের ˆবপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করছি, তাঁরা নিশ্চয়ই লেখনী ও বিপ্লবী গানের বিষয়টিকে হালকা করে দেখতে পারি না|
আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেও বলতে পারি, সেই উত্তাল ষাটের দশকে শ্রমিক-কৃষকের ও ছাত্রের সংগ্রাম যখন তুঙ্গে, তখন বিপ্লবী গান আমাদের মনে কী ধরনের প্রেরণা জোগাতো| ১৯৭১ সালে যখন সশস্ত্র জাতীয় সংগ্রাম চলছে, তখনো রাতের বেলায় কিছুটা বিশ্রামের সময় মুক্তিযোদ্ধারা গোপনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে পরিবেশিত মুক্তির গান শুনতেন| শুনতে কত যে ভালো লাগতো| এই ভালো লাগাটাই যুদ্ধে শক্তি জোগাতো| আমি প্রায়ই একটা কথা বলি, অনেক সময় ইংরেজি এটঘ-এর চেয়ে বাংলা ‘গান’ অনেক বেশি শক্তিশালী|
কলম যে তরবারি হতে পারে, বিপ্লবী সংগীত রচয়িতা কবি আবুবকর সিদ্দিকের গানও সে-কথা বলছে,
কলমখানা তরবারী
শক্ত মুঠোয় ধরা তারই
অবাক মাটি সেলাম জানায়
মুগ্ধ চোখে শির ঝোকে ॥
(রুদ্র পদাবলীতে সংকলিত, পৃ ৪৩)
অথবা,
কড়া হাতে ধরে আছি কবিতার
হাতিয়ার কলমের তলোয়ার
সংগ্রামী ব্যালাডে —
ডাক দেয় কমরেড কবিয়াল|(ওই, পৃ ৭৩)
ষাটের দশকের সেই ঝড়ের দিনগুলোতে আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছিলেন, আমাদের মধ্যে লড়াইয়ের শক্তি জুগিয়েছিল যাঁদের গান, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও গান-রচয়িতা ছিলেন আবুবকর সিদ্দিক| আমাদের সময়ের এক অসাধারণ প্রতিভাবান কবি ও সাহিত্যিক| হ্যাঁ, তিনি আমাদের সময়েরই কবি| বয়সে আমার চেয়ে সামান্য বড়| আট বছরের বড়| যে-ষাটের দশক ছিল সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, শ্রমিক-কৃষকের শ্রেণিসংগ্রাম ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে ভরপুর এক বিশেষ ঐতিহাসিক কালপর্ব, সেই দশকেরই প্রত্যক্ষ সংগ্রামের কবি ও সংগীত-রচয়িতা ছিলেন তিনি| আমার কাছাকাছি বয়সের বিপ্লবী কমরেডরা সকলেই ছিলেন ষাটের দশকের সৃষ্টি| তাই আবুবকর সিদ্দিককে আমি আমাদের সময়ের কবি বলছি| ষাটের দশক বলতেই একগুচ্ছ সংগ্রামী কবি,
সংগীত-রচয়িতা, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীর নাম মনে আসে| আবুবকর সিদ্দিক তাঁদের প্রথম কয়েকজনের একজন| কবি ও গীতিকার সিকান&দার আবু জাফর লিখলেন ‘জনতার সংগ্রাম চলবে, আমাদের সংগ্রাম চলবেই|’ তরুণ কবি সাধন ঘোষ ডাক দিলেন —
বাংলার কমরেড বন্ধু
এইবার তুলে নাও হাতিয়ার
ভূমিহীন কৃষক আর মজদুর
গণযুদ্ধের ডাক এসেছে…|
(সুরও দিয়েছেন সাধন ঘোষ নিজেই)
প্রায় একই সময় খুলনা থেকে আরেক কবি ও সংগীত-রচয়িতা আবুবকর সিদ্দিক নিয়ে এলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ¯^াদের গান| রক্ত টগবগ করা গান| মনে পড়ে ষাটের দশকের শেষের দিকে
ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক বিভিন্ন গণসংগঠনের সম্মেলন বা অনুষ্ঠানে যখন লাল পতাকা ওড়ানো হতো, তখন গাওয়া হতো আবুবকর সিদ্দিকের অমর সৃষ্টি সেই গানটি —
বিপ্লবের রক্তরাঙ্গা ঝান্ডা ওড়ে আকাশে…|
(ওই, পৃ ৭০)
আমরা মনে-মনে ভাবতাম অথবা কেউ-কেউ প্রকাশ্যে উচ্চারণও করেছেন, এটিই হবে ¯^াধীন বিপ্লবী বাংলার জাতীয় সংগীত| (অবশ্য তখনো রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা…’ জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষিত হয়নি, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসেই তা হয়েছিল)| সেসব দিনের ¯^প্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি| কিন্তু ¯^প্ন তো হারিয়ে যাওয়ার নয়| আবুবকর সিদ্দিকের গানগুলো এখনো উদ্দীপ্ত করবে অগুনতি মুক্তিকামী মানুষকে|

দুই
কবি ও লেখক আবুবকর সিদ্দিক জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৩৪ সালে| জন্মস্থান বাগেরহাট জেলায়| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেছেন ১৯৫৮ সালে| বরিশালের চাখার, দৌলতপুর, কুষ্টিয়া, বাগেরহাট সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন ১৬ বছর| রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন| সেখানে কেটেছে ২০ বছর| ১৯৯৪ সালে সেখান থেকে অবসরগ্রহণের পর ঢাকায় নটর ডেম কলেজ ও কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে বাংলা ভাষায় অধ্যাপনা করেছেন| প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩০টি| আরো পাঁচটি বই এখনো প্রকাশিত হয়নি| ঢাকা ও কলকাতা দুই জায়গা থেকেই তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে| প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে আছে কাব্যগ্রন্থ ১৫টি, উপন্যাস চারটি, ছোটগল্প সংগ্রহ ১০টি| আরো আছে স্মৃতিকথা, গবেষণাধর্মী রচনা এবং অবশ্যই গান — প্রধানত গান, মানুষের গান| তাঁর গল্পে ও উপন্যাসে ধরা পড়বে প্রখর শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গি| এ ছাড়া সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী তরবারির মতো ঝলসে উঠেছে বিভিন্ন রচনায়| কামাল লোহানীর মতে, ‘আবুবকরের গদ্যের ভাষা, শব্দ বাছাই কঠিন হলেও দারুণ আকর্ষণীয়, ¯^াতন্ত্র্য আছে যেমন দৃষ্টিভঙ্গিতে, তেমনি কলমের কালিতে একটা ভিন্নতার ¯^াদ মেলে|’ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন| সবচেয়ে বড় পুরস্কার পেয়েছেন বিপ্লবী কর্মীদের কাছ থেকে| তাদের মনের মধ্যে গেঁথে আছে তাঁর গান — ‘বিপ্লবের রক্তরাঙ্গা ঝান্ডা ওড়ে আকাশে’ অথবা ‘পায়রার পাখনা বারুদের বহ্নিতে জ্বলছে|’ (রুদ্র পদাবলী, পৃ ৬০)| এ-গানটি ১৯৭১ সালে ¯^াধীন বাংলা বেতারে নিয়মিত গাওয়া হতো|
এ-রচনার সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আবুবকরের সমগ্র সাহিত্য নিয়ে আলোচনা সম্ভব হচ্ছে না| এখানে শুধু তাঁর গান নিয়েই সংক্ষিপ্ত আলোচনার সূত্রপাত করা হবে| প্রধানত তাঁর গণসংগীতের সংকলন রুদ্র পদাবলী : গণমানুষের গান এ-গ্রন্থটিকে ধরে আলোচনা করা হবে|

তিন
গণমানুষের কথা থাকলেই তাকে গণসংগীত বলা যাবে না| এমন মন্তব্য রেখেছেন বিশিষ্ট গবেষক (বর্তমানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক) শামসুজ্জামান খান (দেখুন তাঁর লেখা গ্রন্থ বাংলার গণসংগীত)| বাংলার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা চর্যাপদের আমলেই আমরা দেখতে পাই| শামসুজ্জামান খান লিখেছেন (ওপরে উল্লিখিত গ্রন্থে, পৃ ১৪-১৫) — ‘প্রাচীনকালের ‘মানবমুখী’ গান থেকে শুরু করে নজরুলের বিপ্লবী গানকে পর্যন্ত আমরা ‘গণসংগীত’ বলি না| বলি দেশাত্মবোধক গান, ¯^দেশগীতি, দেশের গান, কখনো-বা বলি ‘অগ্নিঝরা গান’| তবে ¯^ীকার করতেই হবে, একালে প্রচলিত গণসংগীতের আগে দীর্ঘকাল ধরে যেসব গণমুখী লোকসংগীত বাঁধা হয়েছে বা লিখিত গান সৃষ্টি হয়েছে, তা অবশ্যই আমাদের গণসংগীতের উত্তরাধিকার|’ এখানে উল্লেখ্য, নজরুল তো অনেক বিদ্রোহী গান রচনা করেছেন| রবীন্দ্রনাথেরও আছে অনেক দেশাত্মবোধক গান| তাছাড়া আমাদের লোকসংস্কৃতির মধ্যে আছে ¯^াধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী গান| আমাদের দেশে ভাষা-আন্দোলন নিয়ে বহু গান রচিত হয়েছে| ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতেও প্রেরণা-উদ্দীপক গান সৃষ্টি হয়েছিল| এসবই গণমানুষের গান| আবুবকর সিদ্দিকের গানের মধ্যেও একুশের চেতনাসমৃদ্ধ গান, মুক্তিযুদ্ধের গান এবং সাধারণভাবে দেশাত্মবোধক গান বেশ আছে| সেগুলির মানও উন্নত| কিন্তু শামসুজ্জামান খানের সংজ্ঞা অনুযায়ী আমরা সেগুলিকেও গণসংগীত বলছি না এবং আমাদের আজকের আলোচনায় সেই সকল গান নিয়েও বিশেষ আলোচনা সম্ভব হচ্ছে না, এই নিবন্ধের সীমাবদ্ধ গণ্ডির কারণে| আমরা প্রধানত যাকে গণসংগীত বলি, সেই সকল গানের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো|
তাহলে আবার ফিরে আসি সেই প্রশ্নে — গণসংগীত কাকে বলে? আমরা আবার শামসুজ্জামান খানের সংজ্ঞায় ফিরে আসি| ‘… রুশ বিপ্লবের (১৯১৭) পর থেকেই ‘গণ’ কথাটা দ্রুত সামনে আসতে থাকে| বিশেষ করে শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে ম্যাক্সিম গোর্কি যে তত্ত্ব তুলে ধরেন, তার সঙ্গে-সঙ্গেই ‘গণসাহিত্য’ বা ‘গণসংগীতে’র ধারণা বিশ্বব্যাপী একটা রূপ নিতে থাকে| গোর্কির সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার তত্ত্বের মধ্যেই এর মূল সূত্রটি নিহিত|’
এই ধরনের গণসংগীত যার সঙ্গে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির প্রত্যক্ষ যোগ থাকবে, তা বাংলা ভাষায় গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকেই প্রথম রচিত হয়েছিল| প্রধানত কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবে| পার্টির উদ্যোগে গঠিত গণনাট্যসঙ্ঘ ও অনুরূপ সংস্থাসমূহ গণসংগীতের প্রচার ও বিস্তৃতি ঘটিয়েছিল| সেই সকল গানে যেমন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ছিল, তেমনি ছিল মেহনতি মানুষের মুক্তির আবেদন ও সমাজতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার| এর একটা আন্তর্জাতিক চরিত্রও ছিল — ফ্যাসিবাদবিরোধী গান, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির সপক্ষে গানও গণসংগীতের অন্তর্ভুক্ত| গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে অবিভক্ত ভারত বা বাংলায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছিল তার মধ্যে ছিল ¯^াধীনতার জন্য গণসংগ্রাম, শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রাম এবং তার বিপরীতে যুদ্ধের বীভৎসতা, ফ্যাসিবাদের হুমকি, যুদ্ধজনিত কারণে দুর্ভিক্ষ, সামাজিক অবক্ষয় এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা| শামসুজ্জামান খান লিখেছেন, ‘নগরবাসী শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক-সচেতন অংশ ইতিপূর্বে ¯^দেশী আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, ¯^াধীনতাহীনতার জ্বালা থেকে দেশমাতৃকার বন্দনা করে রোমান্টিক জাতীয়তাবাদী আবেগযুক্ত মনোরম গানও লিখেছেন অনেক| সেই ধারার গানের পরে যুদ্ধ,
চোরাচালান-মজুদদারি, মূল্যবোধের অবক্ষয়কে অবল¤^ন করে ˆতরি হয়েছে সামাজিক-চেতনা-দীপ্ত নবভাব ও আঙ্গিকের গান| তবে সেসব গানও — যাকে আমরা ‘গণসংগীত’ বলে গ্রহণ করেছি — তার মর্মবস্তু ও দীপ্রচৈতন্যকে পরিপূর্ণরূপে ধারণ করেনি| আরো পরে
১৯৪৩-এর মš^ন্তর, দেশবিভাগ, দাঙ্গা, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং ফ্যাসিবাদের নগ্ন বহিঃপ্রকাশের পর যে ¯^চ্ছ রাজনৈতিক বোধ ও আন্তর্জাতিক চেতনাসমৃদ্ধ নতুন ধরনের গান সৃষ্টি হলো তাতেই গণসংগীতের অন্তঃসার (বংংবহপব) অনুসন্ধেয়|’
সে-সময়ের শ্রেষ্ঠ গণসংগীত রচয়িতা ও শিল্পী ছিলেন দুজন দিকপাল — হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সলিল চৌধুরী| সে-সময়ের কয়েকজন শ্রেষ্ঠ গণসাহিত্য রচয়িতার নামও উল্লেখ করতে হয়| কবি বিষ্ণু দে, সুকান্ত ভট্টাচার্য ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়| মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ছোটগল্প লিখেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মহৎ উপন্যাসও তিনি রচনা করেছেন — তাঁকে বাংলা ভাষার গোর্কিও বলা যেতে পারে) এবং শহিদ সোমেন চন্দ| এছাড়া শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের বাইরে গ্রামের গরিব শ্রমজীবীর প্রতিনিধি হিসেবে নতুন ধাঁচের গণসংগীত রচনা করেছিলেন নিবারণ পণ্ডিত, কবিয়াল রমেশ শীল, শেখ গোমানি, গুরুদাস পাল প্রমুখ|
কবি আবুবকর সিদ্দিক হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সলিল চৌধুরীর উত্তরাধিকার বহন করে ষাটের দশকে আমাদের বাংলাদেশের বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন ধাঁচের গণসংগীত রচনা করলেন| পঞ্চাশের দশকে ভাষা-আন্দোলন ও মুসলিম লীগবিরোধী সাহিত্য রচিত হয়েছিল| গানও রচিত হয়েছিল| তখনো একঝাঁক তরুণ কবি ও সাহিত্যিক অসাম্প্রদায়িক চেতনা তুলে ধরেছিলেন| কামাল লোহানী লিখেছেন (লড়াইয়ের গান গ্রন্থে), সেই সময় ‘গণসংগীত বা দেশপ্রেমমূলক গান গাইতেন হাকিমভাই, শেখ লুৎফর রহমান, আবদুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ, আবদুর রাজ্জাক, নজরুল এমনই কজন|’
গণআন্দোলন তীব্রতর হয়েছিল ষাটের দশকে| পাকিস্তানবিরোধী বাঙালি জাতীয় চেতনা, ¯^াধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পাশাপাশি শ্রেণিশোষণমুক্তি তথা সমাজতান্ত্রিক চেতনা আরো তীব্র ও ঘনীভূত হয়েছিল ষাটের দশকে| উত্তাল ষাটের দশকের সৃষ্টি আবুবকর সিদ্দিক নিজেই| আবার তিনিই সৃষ্টি করেছেন সেই যুগের উপযোগী গণসংগীত| ষাটের দশকে তিনটি সংগ্রাম এক মোহনায় এসে মিশেছিল — সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ধরনের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ¯^াধিকার তথা ¯^াধীনতার সংগ্রাম এবং শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের মুক্তির তথা জনগণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম| এই তিনটি সংগ্রামেরই কবি ছিলেন আবুবকর সিদ্দিক| তাঁর কবিতা ও গানে উঠে এসেছে ষাটের দশকের মর্মবস্তু|
ষাটের দশকের এই সকল সংগ্রাম এবং সংগ্রামী সাহিত্য ও গান রচনার ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট সংগঠনসমূহের ভূমিকা অন¯^ীকার্য (যদিও তখন কমিউনিস্ট পার্টি ছিল বহুধাবিভক্ত)| গণসংগীত রচনার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল ক্রান্তি ও উদীচী — এই দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠন — যারা মার্কসবাদী আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হতো|
১৯৪৭ সাল-পরবর্তী পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে (আজকের বাংলাদেশ) প্রকৃত অর্থে গণসংগীত রচিত হয়েছিল ষাটের দশকে| পূর্বোক্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী চল্লিশের দশকের পর ষাটের দশকেই এই বাংলায় গণসংগীত লেখা ও গাওয়া হয়েছিল| বিশেষ করে ক্রান্তি গণসংগীতকে নিয়ে গিয়েছিল শ্রমিকের কলোনিতে, কৃষকের পল্লিতে, গরিব-মেহনতি মানুষের মধ্যে, যেটা পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত দেখা যায়নি| প্রখ্যাত গণশিল্পী স্রষ্টা হেমাঙ্গ বিশ্বাসও বলেছেন, ‘¯^দেশিকতার ধারা যেখানে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের সাগরে গিয়ে মিশেছে, সেই মোহনায় গণসংগীতের জন্ম|’
সেই গণসংগীত আমাদের দেশে ষাটের দশকেই ˆতরি হয়েছিল এবং সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, কবি আবুবকর সিদ্দিক ছিলেন অগ্রগণ্য| সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ছিল প্রকাশ্য, সরাসরি ও বলিষ্ঠ| বহু উদাহরণ দেওয়া যায়| কিন্তু তাতে নিবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি পাবে| এখানে তাঁর গানের সংকলন থেকে একটি গানের কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করছি মাত্র|
বিশ্বব্যাপী সর্বহারার
একটি মুক্তিমন্ত্র
কিষান মজুর দুস্থদলের
দিশারী সমাজতন্ত্র ॥
… … …
মার্কস ও লেনিন সর্বহারা দুনিয়ার ¯^াধিকার
ঐতিহাসিক অঙ্গীকার
বিপ্লবের রক্তলাল পতাকাটা হাতিয়ার
মাও সে তুং সঙ্গী তার
লং মার্চ দুর্নিবার
অঙ্গীকার ¯^াধিকার হাতিয়ার সঙ্গী তার দুর্নিবার|
(ওই, পৃ ৩৯)
চার
কবি আবুবকর সিদ্দিক বাংলার লড়াকু মানুষের জন্য দুই শতাধিক গান লিখেছেন, যার মধ্যে অধিকাংশ গণসংগীত| বাকিগুলোকে বলা যেতে পারে দেশাত্মবোধক গান| যেমন মুক্তিযুদ্ধের গান ও একুশের গান — সেগুলি পূর্বোক্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী গণসংগীত না হলেও গণমানুষের সংগীত, সংগ্রামের গান তো বটেই| অবশ্যই দেশাত্মবোধক| রুদ্র পদাবলী : গণমানুষের গান এই শিরোনামের গ্রন্থটিতে যেসব গানের সংকলন করা হয়েছে, তার মধ্যে কবি নিজেই গানগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন, যথা গণআন্দোলনের গান, মুক্তিযুদ্ধের গান, একুশের গান, দেশের গান ও বিবিধ| অধিকাংশ গানে তিনি নিজে অথবা সাধন সরকার সুর দিয়েছেন| ‘গণসংগীত লেখার দিনগুলি’ শিরোনামে একটি ভূমিকা সংযোজন করেছেন গ্রন্থটিতে| সেখানে লেখক আক্ষেপ করে বলছেন, ‘এই বইয়ের অনেক গানের শীর্ষে সুরকারের নাম দেয়া আছে| বিষয়টি এখন অর্থহীনতায় পর্যবসিত| কারণ সাধন সরকারকৃত পঁচিশটি গানের ¯^রলিপি ছাড়া আমার আর কোনো গানের ¯^রলিপি করা হয়নি| যার ফলে সুরগুলি হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে|’ তারপর তিনি বলেছেন, ‘এসব গানে যোগ্য ব্যক্তি নতুন করে সুর বসাতে চাইলে আমার দিক থেকে আপত্তি থাকবে না|’
‘পায়রার পাখনা বারুদের বহ্নিতে জ্বলছে’ (১৮ সেপ্টে¤^র ১৯৬৬), ‘বিপ্লবের রক্তরাঙ্গা ঝান্ডা ওড়ে আকাশে’ (১১ নভে¤^র ১৯৬৮) এবং ‘ইয়াংকিরা চায় কী হে/ রক্ত হে’ (২৫ জুলাই ১৯৬৮) — এই তিনটি গানের অসাধারণ সুর দিয়েছিলেন শেখ লুৎফর রহমান (তিনি নিজে কণ্ঠও দিয়েছেন)|
কবি আবুবকর সিদ্দিককে আমরা ষাটের দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোর কবি ও সংগীত-রচয়িতা হিসেবে জানলেও তাঁর কাব্যচর্চা ও গান রচনার শুরুটা হয়েছিল পঞ্চাশের দশকেই| কবি লিখছেন, ‘আবদুল গাফ&ফার চৌধুরীর বিখ্যাত একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’তে বিষাদের প্রাধান্য| অথচ আমাদের চাই জঙ্গি ঝাঁঝ| নিজেই লিখে ফেলি : ‘একুশের ভোরে জেগে উঠে দেখি রক্ত/ রক্তিম সূর্যের ফিনকি|’ প্রথমে তিনি নিজেই সুর দিয়েছিলেন| গাওয়া হয়েছিল বাগেরহাটের রাস্তায় প্রভাতফেরিতে| পরে এতে অসাধারণ সুর দিয়েছিলেন শেখ লুৎফর রহমান|
আবুবকর সিদ্দিক প্রথম একুশের গান লিখেছেন ১৯৫৭ সালে| তাতে সুর দেন ওস্তাদ আখতার সাদমানী| তাঁর অধিকাংশ গানের সুরকার ছিলেন সাধন সরকার| শেখ লুৎফর রহমানও বেশ কয়েকটি গানে সুর দিয়েছেন| এছাড়া আরো যাঁরা তাঁর কোনো-কোনো গানে সুর দিয়েছেন, তাঁদের নাম লেখক ভূমিকায় (‘গণসংগীত লেখার দিনগুলি’) উল্লেখ করেছেন| তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাজশাহীর আবদুল আজিজ বাচ্চু, সংগীতশিল্পী নাসির হায়দার, প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর প্রমুখ|
আবুবকর সিদ্দিক রাজপথের কবি, মাঠের কবি, সংগ্রামের কবি| মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী কমিউনিস্টদের সশস্ত্র যুদ্ধের প্রধান ঘাঁটি নরসিংদী জেলার শিবপুরে (প্রয়াত মান্নান ভূঁইয়া ও শহীদ আসাদের এলাকা) মওলানা ভাসানী ডেকেছিলেন কৃষকের লালটুপি সমাবেশ ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে (তারিখটা মনে নেই)| শিবপুরের মাটিতে যুদ্ধের রক্তের দাগ তখনো মুছে যায়নি| মঞ্চে দাঁড়িয়ে লক্ষাধিক লালটুপি-পরিহিত জনতার সামনে ভাসানী আগুন-ঝরানো বক্তৃতা দিয়ে চলেছেন| মঞ্চে বসেই আবুবকর সিদ্দিক ‘একটুকরো কাগজে কলম ঘষে সৃষ্টি করলেন এক অগ্নিবর্ষী কবিতা’, যা আবার তৎক্ষণাৎ আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন কামাল লোহানী| ১৯৬৮-৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলিতে মওলানা ভাসানী যখন বিদ্রোহের আগুন ছড়াচ্ছেন, স্লোগান উঠছে ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো’ তখন কবি আবুবকর সিদ্দিকও এর বাইরে থাকতে পারেননি| তিনিও গান লিখলেন ‘জ্বালো জ্বালো| আগুন জ্বালো|’ (ওই, পৃ ৮৫)
সংগ্রামের দিনগুলিতে তিনিও থাকতেন মিছিলে, জনসভায়| তৎক্ষণাৎ গান রচনা করতেন| ১৯৭১ সালের মার্চের সেই অবিস্মরণীয় উত্তাল দিনগুলিতে একটার পর একটা বিপ্লবী গান রচনা করে চলেছেন| খুলনা শহরে বিক্ষুব্ধ লেখক-শিল্পী-সাংবাদিকদের সম্মেলনের জন্য এক বসাতেই রচনা করেছিলেন ছয়টি গান| মিছিলে চলতে-চলতে তিনি গান রচনা করেছেন| ক্রান্তির সঙ্গে গেছেন শ্রমিক বস্তিতে অথবা কৃষক পল্লিতে এবং তৎক্ষণাৎ গান রচনা করেছেন| গানের কথা ও সুর যখন ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তখন তিনি আর অপেক্ষা করতে পারেন না| এমনি এক সংগ্রামের দিনে খুলনার রাস্তায় পথচলতি অবস্থায় রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিয়ে সিগারেটের প্যাকেটের ওপর লিখেছেন সংগ্রামী গান| খুলনা থেকে বাগেরহাটে ফেরার পথে রূপসা নদী পাড়ি দেওয়ার সময় টাবুরে নৌকোর ছইয়ের ওপর খাতা রেখে ঢেউয়ের দোলার সঙ্গে তাল রেখে লিখেছেন একটার পর একটা গান| তিনি ছিলেন প্রতিভাবান জাতশিল্পী|
১৯৬৭ সালের ২৮ অক্টোবর তেমনি খুলনার রাস্তায়
হাঁটতে-হাঁটতেই লিখেছিলেন ‘ব্যারিকেড বেয়নেট বেড়াজাল’| এই গানের সুর দিয়েছিলেন সাধন সরকার| ‘খুলনার সংগীত ওস্তাদ কালীপদ দাস একাত্তরে কলকাতায় পালিয়ে যাবার সময় গানটি কণ্ঠস্থ করে নিয়ে যান| তাঁর কাছ থেকে এ-গান ¯^াধীন বাংলা বেতারে চালান হয়ে যায় যুদ্ধকালে|… গানটির ক্যাসেট মুক্তিযুদ্ধের সময় ¯^াধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে রোজ বাজানো হতো|’ এটি জানাজানি হয়ে গেলে রাজাকাররা তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছিল| ডান হাতের নার্ভের স্থায়ী ক্ষতি করেছিল শত্রুরা| এরপর তিনি দেশের মধ্যে থাকলেও দূরগ্রামে পালিয়ে থাকতেন| বাগেরহাট ছেড়ে যাওয়ার সময় কিছু গানের পাণ্ডুলিপি ক্যাসেট করে মাটিতে পুঁতে রেখে এসেছিলেন| কিন্তু পরে তা নষ্ট হয়ে যায়| হারিয়ে যায় অমূল্য সৃষ্টি|
কবি আবুবকর সিদ্দিক দুই বাংলাতেই জনপ্রিয় ছিলেন| কলকাতার বামপন্থী কবি ও লেখকরা সেখানকার পত্রপত্রিকায় তাঁর সংগ্রামী গান ও কবিতা ছাপাতেন| সেটা ষাটের দশকেই| ১৯৮৪ সালে সলিল চৌধুরী তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনার গান নিয়ে আমি কলকাতা থেকে রেকর্ড বের করব|’
সাধন ঘোষের গলায় গাওয়া ২৫-৩০টা গানের ক্যাসেট ও ¯^রলিপি পাঠিয়ে দিতে অনুরোধ করেছিলেন সলিল চৌধুরী| কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি|
পাঁচ
আগেই বলেছি, কবি আবুবকর সিদ্দিক একটু ভিন্নধর্মী গণসংগীত রচনা করেছিলেন| তার মধ্যে ˆবচিত্র আছে| ¯^াদেরও ভিন্নতা আছে| তাঁর রচিত গণসংগীতসমূহের সকল ˆবশিষ্ট্য এই ক্ষুদ্র রচনায় তুলে ধরা সম্ভব নয়| তবে কয়েকটি বড় দাগের ˆবশিষ্ট্য উল্লেখ করার চেষ্টা করা হবে|
প্রথমত, তাঁর অধিকাংশ গানের মধ্যে বিপ্লবী উদ্দীপনা আছে| একটা-দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক|
‘লক্ষ মানুষ যদি গর্জে ওঠে’ গানটির (আলোচ্য গ্রন্থের পৃ ৭৬) শেষ দুটি স্তবক এইরূপ :
একটি চোখে যদি আগুন জ্বলে
সে আগুন থেকে কিছু তাপ নিয়ে
লক্ষ মশাল চলে দলে দলে|

    ভয়ের কিনারে যারা বাসা বেঁধেছে
    চাবুকের মুখে যারা শুধু কেঁদেছে
 একবার যদি তারা দাঁড়ায় রুখে
    ধমনী-শোণিত হবে কেমন দাপায়|

‘চাই চাই চাই’ আরেকটি গান| ’৬৯ সালের মার্চ মাসে আগুন-ঝরা দিনে লেখা| (ওই, পৃ ৮১)
পুরো গানটি নিচে উল্লিখিত হলো :
চাই চাই চাই
চাই রাজবন্দীদের মুক্তি চাই|
মানুষের বাঁচার অধিকার চাই|

 খাদ্য চাই ক্ষুধিতের
 আশা চাই বঞ্চিতের
 গারদের গারদগুলো ভাঙ্গতে চাই|

 বদলা চাই আসাদের
 সালামের শহীদের
 ছাত্রদের জখমের বদলা চাই ॥

 হিস্যা চাই মেহনতের
 মুর্দাবাদ মালিকের
 পুঁজিবাদ বরবাদ সাম্য চাই ॥

 নতুন লাল সূর্য চাই
 শতফুলের ফোটা চাই

পতাকাটার মাথা উঁচা রাখতে চাই ॥
কবি আবুবকর সিদ্দিক মার্কসবাদে বিশ্বাসী সচেতন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও বটে| তাই তাঁর গানে আছে সমাজ-পরিবর্তনের ডাক| শোষিত মানুষের মুক্তির আহ্বান| সংগ্রামের আহ্বান| আরো আছে সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা| তার অনেক গানকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বলে সহজেই চিহ্নিত করা যায়| দুই-একটি এখানে উদ্ধৃত করা যাক| কয়েকটি গানের দুই-এক লাইন বা অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা হলো :
মার্কিনী লাল ইয়ারকিরা চায় কী হে
— রক্ত হে
জোঁকগুলোসব রক্তচাটা ভক্ত হে
ভক্ত হে|(পৃ ৪৯)
এই গানের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদের ¯^রূপ ও কৌশল উদ্ঘাটন,
(যথা ঋণের ফাঁস, মিথ্যা ধর্মনীতি ইত্যাদি) করা হয়েছে|
আরেকটি গানের শেষ স্তবকটি এই রকম (পৃ ৫০)
ভুলো না ডলারের খোলা হাত বাড়ালে
পুতুল মার্কা সরকারের সুতো খেলে আড়ালে
লড়াই লাগায় দেশে দেশে বোমা বেচে মারে দাঁও
ধরিয়ে দাও ধরিয়ে দাও
মানবতার খুনিদের
ঠিকঠাক চিনে নাও॥
আরেকটি গানের (ওই, পৃ ৫১) প্রথম দুই লাইন
সাম্রাজ্যবাদীর চোরা কারসাজিটা দ্যাখো মিয়া
ˆ¯^রাচারের ছোরা মেরে গণতন্ত্র গুম খুন কিয়া ॥
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দুনিয়া জোড়া তেলসম্পদ লুণ্ঠন করছে| তেলের জন্য যুদ্ধ বাধায়| আমাদের দেশেও গ্যাসসম্পদ লুট করে নিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী দেশের করপোরেট পুঁজি| এর বিরুদ্ধে আমাদের দেশেও প্রবল আন্দোলন গড়ে উঠেছিল| ২০০৪ সালে যখন
গ্যাস-তেল রক্ষার আন্দোলন খুব তীব্র হয়ে উঠেছিল, তখনই আবুবকর সিদ্দিক লিখলেন কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক সুরে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গান :
আমার চাকায় তেল নাইকো
বুশের মাথায় চপচপে তেল|
বিশ্ব জুড়ে তেলচোরাদের
ভানুমতির শয়তানি খেল ॥

এই গানের আরেকটি লাইন হচ্ছে এই রকম :
আমার ঘাড়ে কাঁঠাল ভাঙে
আমার মাথায় ফাটায় যে বেল ॥

আবুবকর সিদ্দিক প্রধানত মেহনতি মানুষের সংগ্রামের কবি| তাই তাঁর গানে আছে মেহনতি মানুষের কথা, তার ওপর যে শোষণ-নির্যাতন চলছে, তার প্রতিবাদ এবং একই সঙ্গে সংগ্রামের ডাক|
‘বাংলার ঘরে ঘরে সংগ্রাম জ্বলন্ত’ গানটির একটি স্তবক নিচে উদ্ধৃত হলো :
বাংলার মানুষের মেহনৎ জ্বলে গেল
ফোঁটা ফোঁটা শোষণের ঘামেতে
বাংলার হাট জুড়ে ছারখার বিকিকিনি
সস্তায় উপসোর দামেতে|
কিন্তু কবি এই জায়গায় থামেননি| পরের স্তবকে আছে সংগ্রামের দৃশ্য|
তবু আজ মারমুখো বাংলার বঞ্চিত নিঃ¯^
বাংলার জাগরণে চমকায় বিপ্লবী বিশ্ব
বাংলার পথে পথে মিছিল যে চলন্ত
জানো কি?
এই গানটি লেখা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে| তখনো সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়নি| কিন্তু দেশজোড়া চলছে বিদ্রোহ| সেটি ছিল জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহ| কিন্তু কবি আবুবকর সিদ্দিক তখনো ভোলেননি মেহনতি মানুষের কথা| শোষিত-মেহনতি মানুষের আর্তনাদ ফুটে উঠেছে তাঁর কণ্ঠে|
মেহনতি মানুষের কবি আবুবকর সিদ্দিক অনেক কৃষকের গান লিখেছেন| কবি নিজেও বলেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে, নকশালবাড়ির ঘটনা তাঁকে উজ্জীবিত করেছিল| তখনি তিনি লিখেছেন :
হো ধান দিয়ো না
হো পাট দিয়ো না
হো দিয়ো না ধন তোমার আগলে রাখো|
হো পরান শেখ পীত¤^র হো
চাষী ভাই বাংলার
হাজার হাতে আজ হুমকি হাকো ॥(ওই, পৃ ৫৫)
বাংলার কৃষকের ¯^প্ন তাঁর গানে কি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে
ও ধান —
তুমিই আমার মান গো সোনা
তোমায় নিয়ে ¯^পন বোনা
ˆচতী খরায় তোমার সবুজ শীতল ছোঁয়া আনে|
(ওই, পৃ ৫২)
কিন্তু সেই ¯^প্ন তো ভেঙে দেয়| ¯^প্ন কেড়ে নেয় শোষকশ্রেণি| তাই আবার দেখি কবি নিজেই বিদ্রোহে জ্বলে ওঠেন| নিপীড়িত কৃষককে তিনি সংগ্রামের ডাক দেন —
ও ভাইরে —
শান দিয়ে নে শাণিত ইস্পাতে
কাস্তেগুলোর দাঁত-চকচক পাতে
ঘামের দামটা ছিনিয়ে নিবি হাতে
জোট বেধে চল& বেচে ওঠার
খেলা খেলি রে|(ওই, পৃ ৫৩)
আবার দেখি চাষির পোড়া নিয়ে দুঃখের গান| এই গানটি একেবারে ভিন্ন সুরে বাঁধা|
শোনেন শোনেন ভাইগণে
শোনেন সর্বজনে
শোনেন চাষার মন্দকথা
শোনেন সরল মনে|
… … …

   চাষার কপাল এমন পোড়া
   লাগে না তায় জোড়াতাড়া
 বিধি আমার নিতুই বাম
            মারেন ধনেজনে|(ওই, পৃ ৫৪)

ভণ্ড রাজনৈতিক নেতাদের মুখোশ উন্মোচন করে ব্যঙ্গাত্মক (ঝধঃরৎব) কবিতা ও গানও লিখেছেন| দু-একটি উদাহরণ দেওয়া যাক —
পৌরপিতার এই ঢাকার শহরে ভাই
কী যে দায় ঝঞ্ঝাট হল পথ চলা|
… … …
চুপ চুপ সন্ত্রাস দমনের বেলাতে
টুপ টুপ ঝরে প্রাণ দিবালোকে হেলাতে

           জনতার ভোট গিলে ফুলে ওঠে নেতারা
           পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলে মূল অভিনেতারা|

এই ধরনের গান হাল আমলে লেখা| ওপরের গানটি ২০০৪ সালে লেখা হয়েছিল| সমসাময়িক রাজনীতির প্রসঙ্গ এসেছে এমনি আরেকটি ব্যঙ্গাত্মক গান : ‘মা ওগো মা/ আমি মন্ত্রী হবো’|
(ওই, পৃ ২৭৬)
বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতা, এমনকি ভোল পালটানো (ভণ্ড) কমরেডদেরও তিনি ছেড়ে দেননি| ব্যঙ্গাত্মক গান লিখেছেন| ‘হুলোগুলোন ন্যাজ নুকিয়ে মোচ মুচকে’ গানটি বেশ দীর্ঘ| তার থেকে একটি স্তবক উদ্ধৃত করা যাক —
ছোটলোকের দরদী ছিল
আঙুল ফুলে হল কলাগাছ
লেবার গিলে হবে এবার
ভুঁড়ি ফোলা রাঘববোয়াল মাছ|(ওই, পৃ ২৮০)
আবুবকর সিদ্দিক বিচিত্র ¯^াদের গান লিখেছেন| মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, মাও সে তুং, হো চি মিন, সুকান্ত, নূর হোসেন — ইতিহাসের এই সকল মহান ব্যক্তিকে নিয়ে কবিতা ও গান লিখেছেন|
আমার খুব ভালো লেগেছে রাস্তার এক ছোট্ট টোকাই মেয়েকে নিয়ে লেখা একটি গান| নান্দনিক বিচারেও অতি উঁচুমাপের রচনা| গানের শুরুটি এইভাবে —
ও বাসি গোলাপ দুঃখী গোলাপ
যাও যাও বাড়ী ফিরে যাও|
কিশোরী টোকাই মেয়ে রাস্তায় গোলাপ ফুল বিক্রি করে ক্ষুধার অন্ন জোগায়| গাড়ির ভেতরে সুন্দরী নারী, ধনী পরিবারের নারী| সে ‘টিস্যু পেপারে হাত মোছে/তোমাকে ছোঁবে না ও কালো মেয়ে|’ তাই টোকাই কিশোরীর আজ উপোস থাকতে হবে| গানের শেষ স্তবকটি এই রকম —
হুশ করে গাড়ি ছুটে চলে যায়
চোখে ধূলিঝড় দিয়ে
জানি জানি আজ টোকাই মেয়েটি
মরবে উপোস দিয়ে
ও দুখী গোলাপবালা উপোসী জঠরে
পাথর চিবিয়ে খাও|(ওই, পৃ ২৮৭)
এটি হাল আমালের লেখা| ২০০৪ সালে|
আবুবকর সিদ্দিক এখনো লিখে চলেছেন| রাজনৈতিক মতাদর্শে তিনি এখনো অনড়| তাঁর লেখায়, কি গদ্যে, কি কবিতায়, কি গানে শ্রেণিপ্রসঙ্গটি বারবার আসে| তবু যেন মনে হয়, ষাটের দশকের সেই ঝড়ের গান কোথায়?
এর উত্তর কবি নিজেই দিয়েছেন| অতীতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, ‘…সমস্ত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পক্ষপুট ছিল মার্কসবাদী চেতনাসমৃদ্ধ বাম পার্টিগুলি|’ তিনি আরো বলেছেন, ‘একেবারে বাস্তব সত্য জনগণের শোষণ-পীড়ন-নির্যাতন-প্রতিবাদ-লড়াই, এই শক্ত ভিত থেকেই ¯^তঃস্ফূর্ত তাগিদে বেরিয়ে আসে গণসংগীত| লড়াকু সংগঠনের অভিভাবকত্বে ঘটে তার নির্মাণ প্রসার ও প্রচার|’ (কবির লেখা প্রবন্ধ ‘গণসঙ্গীত : সাম্প্রতিক ভাবনা’)
কবির আক্ষেপ সেই ধরনের গণসংগ্রামও এখন আর নেই| কমিউনিস্ট পার্টিগুলির দুর্বলতার প্রতিও তিনি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন| তিনি আরো বলেছেন ‘… গরীব দেশগুলোতে ষাটের দশক পর্যন্ত যে বাম ধারার বিপ্লবী আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছিল, তা মন্দাক্রান্ত হয়ে পড়ে| এই উপমহাদেশের ট্র্যাজেডিটা খুব প্রকট|’
এ-কথা সত্যি যে, বাইরে তীব্র গণসংগ্রামের জোয়ার না
থাকলে সেরকম গণসংগীত সৃষ্টি হতে পারে না| কমিউনিস্ট শক্তি যে আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে, এটাও অ¯^ীকার করা যাবে না| তবে আমি আশাবাদী| মেহনতি মানুষ, নিপীড়িত মানুষ
শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আবার জাগবে| এখনো আবার সেই সংগ্রামী মানুষ আবুবকর সিদ্দিকের গানের মধ্যে খুঁজে পাবে লড়াইয়ের সেই হাতিয়ার, যে-হাতিয়ারের কথা ¯^য়ং মাও সে তুং বলে গেছেন| ৎ