বাংলাদেশের বৃদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের নানা পথপরিক্রমা এবং এর ধারাবাহিকতা লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, আমাদের জাতীয় মানস কখনো সুগঠিত হয়ে থিতু হতে পারেনি। বহু চিন্তাশীল ও মহৎ ব্যক্তি বাঙালি মুসলমানের মানসোৎকর্ষে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠন যে ভূমিকা রেখেছিল তা বিবেচনায় নিয়ে এবং এর তাৎপর্যকে স্বীকার করেও বলা যায় স্বাধীন বাংলাদেশে কিংবা পরাধীন আমরা পাকিস্তানি আমলে আমরা সুস্থির কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক পথ বা চিন্তাধারা আমরা পাইনি। কখনো কখনো আলো জ্বেলে দিয়েছেন কেউ কেউ, কখনো বুদ্ধি চেতনা যুক্তি একসঙ্গে চলেছে, আবার তা আক্রমণের স্বীকারও হয়েছে। ফলে বাঙালি মুসলমানের জীবনে বা সংস্কৃতিতে স্বাধীন যুক্তিনিষ্ঠ প্রগতিশীল বৈজ্ঞানিক পথরেখা কখনো আমরা ধারাবাহিকভাবে পাইনি। এর নেপথ্যে নানাবিধ কারণ রয়েছে। সেসব কারণ ব্যাখ্যা করা সহজ নয়।
বাঙালি মুসলিম সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি নানাভাবে বিভক্ত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে; ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে, তারও আগে। ফলে জাতির মনন গঠনে ধর্মীয় আবেগ প্রধান ভূমিকা পালন করতে থাকে। সারা পৃথিবীতে এরকম সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ কোথাও আছে কিনা আমাদের জানা নেই। বলতে দ্বিধা নেই যে, এর সঙ্গে আমাদের অজ্ঞানতার যোগ স্পষ্ট। স্বাধীনতার আগে ও পরে নানান বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরেও আমরা দৃশ্যমান কোনো উন্নতি দেখতে পাই না।
সন্দেহ নেই বাঙালি মুসলিম বিদ্বতশাহী মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই অজ্ঞানতা থেকে সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে; তাদের লেখালেখি, সম্পাদিত পত্রিকা, সেমিনার, কর্মশালার মাধ্যমে। অপরিসীম কষ্টও তারা স্বীকার করেছেন। তবু বারবার আমরা পরাজিত হয়েছি সত্য, তবে একটা পক্ষ সেই শাণিত যুক্তিবাদের বা মানবতাবাদের পক্ষে ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পেরেছেন। এখনো মূলধারার সাহিত্য সেই
সাংস্কৃতিক চেতনা নিয়েই বিকশিত হচ্ছে। এর নেপথ্যে আছে সেই ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। চিন্তা ও বুদ্ধির প্রয়োগ ও স্বাধীনতা মানুষকে আলোকিত করে, মানবিক করে তোলে, প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষ করে তোলে এই সত্য তারা আমাদের শিখিয়েছিলেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের (১৯২৬) কর্মীরা আমাদের আলোর ধারায় স্নাত করিয়েছিলেন এবং সেটিই আমাদের জ্ঞানভিত্তিক চিন্তার মুক্তির প্রথম সোপান। শিখা গোষ্ঠী বা মুসলিম সাহিত্য সমাজের অপেক্ষাকৃত তরুণযোদ্ধা আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩) বাঙালি মুসলমানের চিন্তারাজ্যে যে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন তা প্রজন্ম পরম্পরায় মনে রাখবে এদেশের মানুষ। আবুল ফজল তাঁর মননশীল গদ্য ও সৃজনশীল রচনার মধ্য দিয়ে এবং মুসলিম সাহিত্য সমাজের কাজে অংশগ্রহণ করে তাঁর নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক মননকে ঋদ্ধ করেছেন। তিনি মুক্তবুদ্ধির আদর্শকে লালন করেছেন, বিকশিত করেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্ভিকভাবে নিজের কথা স্পষ্ট করে বলেছেন।
সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আবুল ফজল। বাবা ছিলেন মসজিদের ইমাম; শিক্ষিত, সৎ মেধাবী। তবে আবুল ফজলের প্রগতিধারার চিন্তাচেতনার সঙ্গে তাঁর স্পষ্ট দূরত্ব থাকলে জীবদ্দশায় বড় ধরনের কোনো বিরোধের খবর আমরা জানতে পারিনি। লেখক জীবনের শুরুতে ইসলাম ধর্মের সমালোচনামূলক একটা লেখার জন্য বাবার বিরাগভাজন হলেও। কৌশলে তিনি বাবাকে থামাতে সমর্থ হয়েছিলেন।
আবুল ফজলের লেখকমানস গঠিত হয়েছিলো তিনটি পর্যায়ে অথবা অন্যভাবে বললে তিনটি উৎস থেকে তাঁর মানসজাত হয়েছিলো। প্রাথমিক অবস্থায় তিনি মাদ্রাসায় পড়েছিলেন, ফলে প্রগতিশীল ধারায় স্নাত হলেও ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর গভীর অন্বিষ্টতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বলবৎ ছিল। তবে সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি, পঠনপাঠন, সহযোগী সহযোদ্ধাদের চিন্তার প্রভাব তাঁকে বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিনিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার জগতে অনুপ্রবেশে সহায়তা করে। বাবার ধর্মপরায়ণতা নিয়ে তিনি গর্ববোধ করলেও এটা যে তাকে খানিকটা অস্বস্তিতে ফেলেছিলো তাতে কানো সন্দেহ নেই। তাঁর একটি মন্তব্য থেকে এ-বিষয়ে জানা যায় : বাবার সত্যনিষ্ঠার জন্য সাময়িকভাবে আমি হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, প্রথম চাকরিতে কিছুটা অসুবিধা ভোগ করতে হয়েছে বইকি, কিন্তু এজন্যে আমার মনে একমুহূর্তের জন্যও আফসোস জাগেনি। বরং তার সত্যনিষ্ঠা চিরকালের জন্য আমার মনে একটা অপূর্ব আত্মমর্যাদাবোধ সঞ্চারিত করে দিয়েছে। – রচনার ক্ষেত্রে সত্যনিষ্ঠ হওয়ার মূল্য যে অপরিসীম সাহিত্যিক জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় এটুকু আমার লাভ হয়েছে।’
পারিবারিকভাবে অর্জিত ধর্মবোধকে তিনি সব সময় বহন করে চলেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। বরং শেষের দিকে তিনি ধর্মীয় পুস্তক রচনা ও অনুবাদের কাজে হাত দিয়ে প্রমাণ করেন যে ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর আস্থা অটুট ছিল। তিনি ধর্মের সমালোচনা করেছেন তাঁর বিভিন্ন লেখায় যেখানে ধর্ম যুক্তি ও স্বাধীনতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। তবে আবুল হুসেন বা কাজী আবদুল ওদুদের মতো তিনি ধর্মের এই সব অংশ নিয়ে খুব বেশি খোলামেলা মন্তব্য করেননি। তাঁর ফিকশনের চরিত্ররা কখনো কখনো বুদ্ধি ও যুক্তির পক্ষে তীব্র মন্তব্য করেছে। সেই মন্তব্যকে তাঁর মন্তব্য ধরে নেওয়া চলে, সেখানে তাঁর মুক্ত বুদ্ধি চর্চার নমুনা বোঝা যায়। ধর্ম মানলেও তিনি গোঁড়া ছিলেন না। আবার সাহিত্য ও শিল্প করতে গিয়ে যতটুকু উদার হওয়া প্রয়োজন সেটুকু উদার তিনি ছিলেন। একটা দ্বিধা তাঁর মধ্যে সব সময় ছিলো। বামপন্থার দিকে তিনি ঝুঁকেছিলেন একসময়, তবে বাল্যকাল থেকে ধর্মীয় বাতাবরণে বড় হওয়ার কারণে ধর্মের প্রতি নিরাসক্ত হতে চাননি বা পারেননি কখনো। তবে ধর্ম নিয়ে তাঁর যে নিজস্ব অবস্থান তাঁর ব্যাখ্যা তিনি বিভিন্ন লেখায় দিয়েছেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজও ধর্মের সরাসরি বিরোধিতা করেনি, তবে যুক্তিহীন আবেগীয় অধ্যায়কে তাঁরা যুক্তির দ্বারা ব্যাখ্যা দিয়ে মুসলিমদের আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গে তালমিলিয়ে চলার উপযোগী করার চেষ্টা করেছিলেন। এই চেষ্টাও কট্টরপন্থীরা মেনে নিতে পারেননি। আবুল ফজল নিজের ধর্মবোধ সম্পর্কে এক লেখায় বেশ খোলাখুলি মন্তব্য করেছেন। সেখানে তাঁকে বোঝা যায় যে ধর্মের যাবতীয় নিয়মের নিগড় নিতে মানতে পারতেন না সব সময়। বাবার শাসনের ভয় বা তাকে মান্য করার বাধ্যবাধকতা না থাকলে তাকে আরো বেশি সাহসী হতে হয়তো দেখা যেত বলে মনে হয়। তিনি লিখেছেন : সাধারণত আনুষ্ঠানিক ধর্ম সম্বন্ধে আমি কিছুটা উদাসীন, অনেক সময় তার নিষ্করুণ বুদ্ধিহীনতা আমাকে পীড়া দেয়। আমার অনেক রচনায় তার দেদার প্রতিবাদ রয়েছে। তবে মুখে বা কলমে আমি বলি বা লিখি না কেন, মনে হয় আমার ভেতরে একটা ধর্ম-চেতনা ফল্গুধারার মতো নীরবে প্রবাহিত রয়েছে। এ-ব্যাপারে আমার মধ্যে স্ববিরোধিতার অন্ত নেই।’
তবে বাঙালি মুসলিম সমাজকে অন্ধকার ও কুসংস্কারের নিগড় থেকে মুক্ত করতে যে সাহিত্যধর্মী আন্দোলন মুসলিম সাহিত্য সমাজ শুরু করেছিল তা আবুল ফজলকে সবচেয়ে উজ্জীবিত করেছিল। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এ-সময় তিনি স্থির করে নিয়েছিলেন যে, তাঁর চলার পথ কী হবে, এক আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী মুসলিম হিসেবে তাঁর পথচলা শুরু হতে যাচ্ছে সে-কথা ১৯২৭ সালের ১৫ মার্চে বন্ধু দিদারুল আলমকে তিনি লিখেছিলেন :
‘শিখা’ নাম দিয়ে সাহিত্য সমাজের একটি বার্ষিক সংখ্যা বের হচ্ছে। ঢাকায় খুব সুন্দর এক নতুন চিন্তাশীল দল গড়ে উঠতেছিল – এরা মুসলমান বাঙলার চিন্তায় এক নতুন যুগ খুলে দিয়েছিল – ‘শিখা’তে তার কিছু পরিচয় পাবে, চিন্তার জড়তা থেকে মুক্ত না হলে বাঙালি মুসলমানের মুক্তি নাই – এইটাই আমাদের ধারণা। – আজ মুসলমানের জাতীয় জীবনের সিংহদুয়ারে আঘাত পড়েছে। নব সৃষ্টির এসব বেদনায় আজ আমাদের ভেতর বাহির গড়িয়া উঠিয়াছে। এই শুভ মুহূর্তে আমাদের জন্ম হয়েছে। এতে আমি আমার নিজেকে ধন্য মনে করি।’
আবুল ফজল তাঁর বন্ধু দিদারুল আলম (১৯০৩-১৯২৯) ও শিখা গোষ্ঠীর বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকদের দ্বারা বেশ প্রভাবিত হয়েছিলে। তাঁর লেখকমানস তৈরিতে এদের বিশেষ ভূমিকা ছিল। দিদারুল আলম খুব প্রতিভাদৃপ্ত ছিলেন, তাঁর লেখা আবুল ফজলকে প্রণোদিত করেছিল। শিখাগোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচতি হওয়ার আগেই এই বন্ধু তাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন বলা যায়। তিনি অল্প বয়সে অসুস্থ হয়ে মারা গেলে তিনি খুব মর্মাহত হয়েছিলেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের তরুণ সদস্য হিসেবে তিনি সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র শিখাতে তিনি নিয়মিত লিখতেন। একটি সংখ্যা তিনি সম্পাদনাও করেছেন। সত্যিকার অর্থে মুসলিম সমাজকে আধুনিক বিজ্ঞানঋদ্ধ শিল্পসাহিত্যসভ্যতাঋদ্ধ হয়ে, মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ করে তোলার যে কাজ শিখা গোষ্ঠী শুরু করেছিল তা প্রবল বাধার মুখে পড়ে। এই গোষ্ঠির প্রধান কর্মবীর (যিনি শুধু লিখতেন না যাবতীয় খরচও নির্বাহ করতেন) আবুল হুসেন এবং অন্য ব্যক্তিবর্গের কার্যক্রম ও মতাদর্শকে তিনি ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। ঢাকাকেন্দ্রিক গোঁড়া মুসলিম সমাজ শিখা গোষ্ঠীর কাজকর্মকে ভালো চোখে দেখেনি। আধুনিকতার নামে ইসলাম ধর্মের সামান্য সমালেচনাকে তারা সহ্য করতে পারতেন না। আবুল হুসেন ও কাজী আবদুল ওদুদকে মুচলেকাও দিতে হয়েছে তাঁদের লেখার জন্য। আবুল ফজল তাদের সহযোগিতা করেছেন যুক্তিপূর্ণ লেখা দিয়ে। শিখার বাইরে অন্য পত্রিকায়ও তিনি লিখেছেন। শিক্ষা সংস্কৃতি সাহিত্য শিল্প নিয়ে তাঁর প্রবন্ধ শিখা গোষ্ঠীর লেখকদের পক্ষে কাজ করে। ইসলাম ধর্মের সংস্কার, বিশেষত আধুনিক শিক্ষা সাহিত্য নারীর অধিকার নিয়ে তারা যে যুক্তিপূর্ণ কথা বলতেন আবুল ফজল তা বিশ্বাস করতেন অকপটে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তি মুসলিম সাহিত্য সমাজের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বিভিন্ন
সময়ে, তাদের বক্তব্য, লেখালেখিও তরুণ আবুল ফজলকে প্রগাঢ়ভাবে জাগিয়ে তুলেছিল। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পরবর্তীকালে এই সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন এদের ইসলামী ধারণায় অসন্তুষ্ট হয়ে। আবুল ফজলের শিল্পমানস গঠনে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তিনি পরে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা সংস্কৃতি সভ্যতা ও শিল্পচেতনাকে আবুল ফজল খুব তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেছিলেন তার নিজের জীবনের ক্ষেত্রে। নজরুল মানবতাবোধ ও উদারনৈতিক চেতনা তাকে প্রাণিত করেছিলো।
আবুল ফজলের মানস যেভাবে বিকশিত হয়েছিল এর প্রকাশ ঘটে তাঁর নানাধর্মী রচনায়। কলেজে শিক্ষকতা করেছেন, অবসরের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। তবে তিনি মূলত একজন আধুনিক মুসলিম বাঙালি বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবি। বাঙালি মুসলিম বিশেষত বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। সারা জীবন তিনি আলোর শিখা জ্বালিয়েছেন। বাঙালি মুসলমানের জীবনে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন তা তিনি শনাক্ত করেছেন এবং সে-সম্পর্কে লিখেছেন যুক্তি তর্ক ব্যাখ্যসহ। তাঁর সৃজনশীল রচনার প্রজাতি ও সংখ্যা অনেক। আমাদের ধারণা তাঁর সৃজনশীল রচনার চেয়ে মননশীল প্রবন্ধ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ জাতীয় রচনা বিবেচনা করলে তাঁর লেখক সত্তার বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। বাঙালি মুসলিম বুদ্ধিজীবী হিসেবে তার দায়ের কথা সেখানে বলেছেন, এই উদ্দেশ্যমূলকতা তাঁর রচনার মানকে অনেক সময় ক্ষুণ্ন করেছে।
সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যরচনার মাধ্যমে একটা দীর্ঘ সময় ধরে আবুল ফজল তাঁর চিন্তাবিভূতিকে সবিস্তারে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন এবং বাঙালি পাঠককে প্রাণিত করেছিলেন। তাঁর মধ্যে কিছু দ্বিধা ছিলো যা প্রতিটি বাঙালি মুসলমানের জন্য মৌলিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবু সাহিত্য
সংস্কৃতি চর্চায় তিনি মৌলিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন, তিনি স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন একজন প্রগতিশীল লেখকের ভূমিকা কেমন হওয়া বাঞ্ছনীয়, এবং দায় কতটুকু। মানবতাবোধকে থেকেই তার শিল্পমানস জাত হয়েছিল বলেই তিনি সঠিক পথে চলতে পেরেছিলেন। তিনি লিখেছেন : মানুষের জীবনে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সাহিত্যের এক বিশেষ ভূমিকা আছে। সে-ভূমিকা সম্বন্ধে আমি সচেতন ছিলাম। তাই দেশের মানুষ ও সমাজের সমস্যা বারবার আমার লেখায় ছায়াপাত করেছে। ভয়ে বা প্রলোভনে আমি কখনো আমার কথাকে সাহিত্যের তথা সত্যের পথ থেকে বিপথগামী হতে দিইনি। দেশ ও সমাজের কথা ভেবেই যখনই আমার মন আলোড়িত হয়েছে তখন আমি তা নির্ভয়ে প্রকাশ করেছি – আমার কণ্ঠস্বর কখনো চাপা থাকেনি। চেষ্টা করেছি লেখায় যথাসম্ভব যুক্তি ও বুদ্ধিনির্ভর হতে। যা তার খেলাপ তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে কোনোদিন দ্বিধা করিনি … মানুষের মন কত রকম ভূতের যে আড্ডা তার ইয়ত্তা নেই – ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায়, দেশ, জাতি, শাস্ত্র ও দেশাচারের হাজারো রকমের ভূত তথা সংস্কারের বন্ধনে মানুষের মন বাঁধা।’ যদিও এই বক্তব্য খুব বস্তুনিষ্ট ও যৌক্তিক তবে তিনি একই সঙ্গে ইসলামের মহান শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করার কারণে তাঁর বক্তব্য একটা জায়গায় বাধাগ্রস্ত হয়, তার মুক্তবুদ্ধির জানালা কখনো কখনো একটু বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের সার্বিক পটভূমি ও ধর্মীয়
পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁর অবস্থানকে বেশ সুবিধাজনক মনে হয়। বিশ্বমানবতার শিক্ষা তিনি ধর্ম থেকে নিতে চেয়েছেন, সেটা সব সময় সবার কাছে যৌক্তিক নাও মনে হতে পারে। আবুল ফজল দীর্ঘ জীবনে যে-জীবনরেখা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন এর শক্তি সম্ভাবনা বাঙালি মুসলমানের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে-পথরেখা তিনি নির্মাণ করেছিলেন তার সহযোদ্ধাদের সহায়তায় তা হয়তো আমরা পুরোপুরি গ্রহণ করার মতো উদারতা দেখাতে পারিনি বা সেই সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.