শরৎচন্দ্রের শিল্পীসত্তার স্বরূপ ও অনন্যতা

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নানা কারণে আলোচিত ও বিতর্কিত কথাশিল্পী। তাঁর সাহিত্যসম্ভার নিয়ে বিতর্ক কম নয় – অতীতে যেমন ছিল, আজো আছে, একেবারে অস্তমিত হয়নি। শরৎচন্দ্র সুখপাঠ্য লেখক, সরসতায় তাঁর লেখা মনোগ্রাহী। তিনি হৃদয়প্রধান লেখক বলে হৃদয়ের কারিশমা দিয়ে বাঙালির হৃদয় অনায়াসে দখল করতে পেরেছেন। শরৎচন্দ্রের

গল্প-উপন্যাসের চরিত্রও প্রায়শ চেনা গণ্ডি থেকে আসে, পাঠকের সঙ্গে সখ্য হতে বিলম্ব হয় না। এদের জীবনযাপন,

আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্নকল্পনাও আমাদের অতিপরিচিত। তার ওপর রচনার কাহিনি ও ঘটনাপ্রবাহের উৎস এমন, পাঠক তার সঙ্গে দূরত্ব নয়, সহজে একাত্মতা অনুভব করতে পারেন। শরৎসাহিত্যের পাঠকপ্রিয়তার মূলে এসব উপাদানের অবদান অনস্বীকার্য।

শরৎচন্দ্রের প্রতিপক্ষের বক্তব্যও কম শক্তিশালী নয়। শরৎচন্দ্র অতিমাত্রায় ভাবাবেগাক্রান্ত কথাকার, জীবনের চিত্র রূপায়ণে তিনি অনেক সময় সংযমরক্ষায় ব্যর্থ হন, সস্তা সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে পাঠককে উদ্দীপ্ত করেন, এভাবে ঘটনার স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করেন। উপসংহারে রক্ষণশীলতায় প্রভাবিত হয়ে প্রচলিত মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রাখতে শিল্পের সফলতা বিপন্ন করে তোলেন। অর্থাৎ, উপন্যাসের অনিবার্য পরিণতিকে বিঘ্নিত করে আরোপিত পরিণতিতে রচনার সমাপ্তি ঘটান। কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের রচনা পর্যালোচনা করে আমরা এর সত্যাসত্য নিরূপণের চেষ্টা করব।

শরৎচন্দ্র বার্মা (বর্তমানে মিয়ানমার) বাসকালে তাঁর শিল্পীজীবনের সূচনা হয়। বড়দিদি নামক প্রথম উপন্যাস (বড়গল্পও) লিখে পাঠকমহলে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হন। শরৎচন্দ্র ভাগ্যবান লেখক। এর পর তাঁকে আর থেমে পেছনে তাকাতে হয়নি। তাঁর হাত দিয়ে যা বের হয়েছে, তাতেই সোনা ফলেছে, পাঠক লুফে নিয়েছেন। কালের পরিক্রমায় মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে জনপ্রিয়তায় তিনি বাঙালি লেখকদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। বাংলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্র সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, সন্দেহ নেই। জনপ্রিয়, বহুলপঠিত লেখকের ঝুঁকিও কিন্তু কম নয়। পাঠকের মনোরঞ্জন করতে গিয়ে, পাঠকের মন জয় করতে গিয়ে অনেক সময় লেখক এমনসব সুলভ, সস্তা, আকর্ষণীয় বিষয় অবলম্বন করেন, এমন সহজ কৌশল ও একঘেয়ে রীতি ব্যবহার করেন, যাতে লেখার শিল্পরূপ সর্বদা অক্ষুণ্ন থাকে না। সাহিত্যের যে প্রকৃত উদ্দেশ্য, আনন্দ সৃষ্টি করা, প্রসাদগুণ বজায় রাখা, তাতে প্রতিবন্ধকতা ঘটে।

আমরা জানি, শরৎচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে একাধারে জনপ্রিয় লেখক, সৃষ্টিশীল রসনির্মাতা। রবীন্দ্রোত্তর কথাশিল্পে তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ গদ্যশিল্পী, রসপিপাসু পাঠকসমাজে ও বোদ্ধা সুধীমহলে, উভয় স্থানে সমাদৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনায় তিনি যেমন সাধারণ পাঠকের চাহিদা মিটিয়েছেন, তেমনি সমঝদার রসজ্ঞের আবেদনও পূরণ করেছেন। শরৎচন্দ্রের এই দ্বৈত সাফল্যের অন্তর্নিহিত স্বরূপ পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।

শরৎচন্দ্র দরদি কথাশিল্পী। মানবপ্রেম তাঁর গল্প-উপন্যাসে স্বতঃস্ফূর্ত ও সুবিস্তৃত। অকৃত্রিম মানবপ্রীতি তাঁর সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি, পাঠকবন্দিত হওয়ার অন্যতম প্রেরণা। বিশেষ করে নারীর কোমলতা ও অন্তর্গত পেলব ভালোবাসাকে তিনি নিখুঁতভাবে ব্যবহার করেছেন, তাকে অপূর্ব ও মর্মস্পর্শী করে তুলেছেন। শরৎচন্দ্রের নারীরা তাই তাদের সামাজিক ও পারিবারিক সীমানা অনায়াসে অতিক্রম করে, সীমাবদ্ধতা ঘুচিয়ে সর্বজনীন আবেদন নিয়ে উপস্থিতি হয়, পাঠককে মুগ্ধ করে। এই বোধকে উন্মোচিত করতে আমরা শরৎচন্দ্রের কতিপয়

গল্প-উপন্যাসের নারী চরিত্রের ওপর দৃষ্টিনিবদ্ধ করব।

শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস শ্রীকান্ত। চার খণ্ডে এই উপন্যাস দীর্ঘ কলেবরে পরিণতি লাভ করেছে। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডটি বেশি উপাদেয় ও উপভোগ্য। মেজদার হাস্যোদ্রেককারী অধ্যবসায়, ছিনাথ বহুরূপীকে ঘিরে হাস্যকর নাটক, ভয়ানক অন্ধকার রাত্রে সাপখোপভরা স্রোতস্বিনী জলাশয়ে ইন্দ্রের মাছচুরির গা-ছমছম করা অভিযান আর কলকাতার বাবু, ‘ভয়ংকর বাবু’ ইন্দ্রের নতুনদার স্মরণীয় রসাত্মক আখ্যান এ-খণ্ডটিকে সমৃদ্ধ ও দীপ্ত করেছে। আবার এই খণ্ডেই আছে সাপুড়ে শাহজী ও তার স্ত্রী ইন্দ্রের স্নেহময়ী দিদির তথা অন্নদাদিদির বিচিত্র জীবনকথা। ব্রাহ্মণের ছেলে শাহজী বর্তমানে ধর্মান্তরিত মুসলমান, সাপুড়ের বৃত্তি বেছে নিয়ে সাপখেলা দেখিয়ে ছলচাতুরী করে বেড়ায়। ইন্দ্রের অন্নদাদিদিও স্বামীর কারণে ধর্মত্যাগ করেছে। আশ্চর্য ধৈর্যশীল, স্বামীর আনুগত্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছে। মিথ্যাচারী, গাঁজাতাড়িতে আসক্ত নেশাখোর শাহজী সাপধরার মন্ত্র ও বশীভূত করা গাছের তেলেসমাতি দেখিয়ে ইন্দ্রসহ অন্যদের ঠকিয়ে খায় (ইন্দ্র এসব আয়ত্ত করতে শাহজীকে অনেকবার টাকা দিয়েছে), স্ত্রীর ওপর কারণে-অকারণে অত্যাচার করে। সেই স্বামী, যার মিথ্যে ঠকবাজির কথা ইন্দ্রকে বলে দেওয়ায় তার হাতে নির্যাতিত হয়, তথাপি স্ত্রীর কাছে সে উপাস্য। এই নেশাখোর পাষণ্ড একদিন নেশায় উন্মত্ত হয়ে সাপকে চুমু দিতে গিয়ে দংশিত হয়, অকালমৃত্যু বরণ করে। ইন্দ্রের কোমলপ্রাণ দিদি, ভারতীয় চিরাচরিত আদর্শে তাড়িত হয়ে স্বামীভক্তিতে অটল থাকে, স্বামীর দায়দেনা নিজের মাথায় তুলে নেয়, সেটাকে কর্তব্য বলে মনে করে। এখানেই শরৎচন্দ্রীয় প্রাচীন মূল্যবোধ উঠে আসে – সে-মূল্যবোধে স্বামী নারীর ইহকাল পরকালের অচ্ছেদ্য দোসর, অবিভাজ্য জীবনসাথি। স্বামীর পথ অনুসরণেই নারীর মাহাত্ম্য, নারীজীবনের সার্থকতা – ভ্রষ্ট, বিপথগামী স্বামীও অন্ধভাবে অনুসরণীয়। শ্রীকান্তর অন্নদাদিদি চরিত্রটি সেই ছাঁচে গড়ে উঠেছে, আধুনিক মানবিক দৃষ্টিতে যতই তা অগ্রহণযোগ্য হোক।

শ্রীকান্ত উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রাজলক্ষ্মী ওরফে পিয়ারী বাইজি। পিয়ারীর জীবন সংগ্রামসংকুল, নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। শ্রীকান্ত তার ভালোবাসার পাত্র, সে-প্রেম বাল্যপ্রেম, সে-প্রেম অচ্ছেদ্য, অনন্ত। উপন্যাসে সম্পর্কের বিভিন্ন জটিলতার পরও রাজলক্ষ্মী প্রেমময়ী কোমল নারী, তার প্রেম অমলিন। মিলন না হয়েও, প্রেমের স্বাভাবিক পরিণতিতে না পৌঁছেও সে প্রেম অবিনশ্বর, তাকে রাজলক্ষ্মী মহীয়ান করে তোলে, একমাত্র সত্য বলে মনে করে। শ্রীকান্তে আমরা যে অন্নদাদিদিকে দেখি, রাজলক্ষ্মী তারই সগোত্রীয়, অভিন্ন পথের পথিক। একজন স্বামীর প্রতি আনুগত্যে অবিচল, স্বামীর শত পীড়নপ্রহারেও স্বামীভক্তি থেকে বিচ্যুত হতে রাজি নয়, আর একজন বাল্যপ্রেমের নির্যাসে এমনি অভিভূত, এমনি অন্ধ, আপ্লুত যে, কোনো বিপত্তিই তাকে শ্রীকান্তর ভালোবাসা থেকে বিযুক্ত করতে পারে না। রাজলক্ষ্মীর প্রেম-মিলনের স্বর্গসুধায় পূর্ণতা পায় না সত্য, কিন্তু আত্মত্যাগের, আত্মনিবেদনের মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

শরৎচন্দ্রের নারীচরিত্রের মহানুভবতা ও কমনীয়তা সুবিদিত। তাঁর নারীরা কমবেশি ত্যাগস্বীকারে অকুণ্ঠ, আত্মসুখ বিসর্জনে অকাতর, অপরের কল্যাণসাধনে সদাতৎপর। শরৎচন্দ্রে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মমতাবর্জিত, অপ্রীতিকর নারীও আছে, সমাজসংসারে যেমন থাকে – কিন্তু শরৎচন্দ্রের নারীভাবনার মূলে আছে ওই সদ্গুণসম্পন্ন নারীরা। তাঁর গল্প-উপন্যাস পাঠে আমরা এর যথার্থতা খুঁজে পাব।

শরৎচন্দ্রের নারীরা শুধু প্রীতিপূর্ণ নারী নয়, তারা মৌলিক অর্থে মানুষও বটে। তাদের চাওয়া-পাওয়া আছে, ঘাতপ্রতিঘাত আছে, মনের সঙ্গে দেহের সমস্যা আছে। নারী যেমন স্নেহময়ী তেমনি প্রেমময়ীও। সেসব প্রকাশে শরৎচন্দ্র কম প্রতিশ্রুতিশীল নন, কম সিদ্ধহস্ত নন। এটা অবশ্য ঠিক, তাঁর গল্প-উপন্যাসে নারী অধিকতর মাতৃভাবাপন্ন ও স্নেহপ্রবণ, তাই বলে অন্য দিকগুলো একেবারে উপেক্ষিত হয়নি। তাঁর নারীরা অতিমাত্রায় সেবাপরায়ণও। তাঁর সাহিত্যভুবনে পদচারণা করে আমরা এসব দিক পর্যালোচনা করব, তার সঙ্গে সাহিত্যের সাফল্য সীমাবদ্ধতার মানদণ্ডে এসব বিচারবিশ্লেষণ করে দেখব।

আমরা প্রথমে শরৎচন্দ্রের সুখ্যাত দুটি উপন্যাস বেছে নেব – পথের দাবী ও চরিত্রহীন। পথের দাবী দেশপ্রেমের উপন্যাস। বিদেশি স্বেচ্ছাচারী শাসক ইংরেজদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে একদল স্বাধীনতাকামী, নির্ভীক যোদ্ধার ত্যাগ ও বীরত্বের আখ্যান পথের দাবী। স্বাভাবিক অহিংস শান্তির পথে নয়, সহিংস, সশস্ত্র পথে, রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে এরা

মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে চায়। কিন্তু তাদের সুপরিকল্পিত কৌশল, দীর্ঘমেয়াদি গোপন যুদ্ধ স্বভাবত ঝুঁকিপূর্ণ। ডা. গিরীশ মহাপাত্র তথা সব্যসাচী এদের নেতা, চালক, পথপ্রদর্শক। সব্যসাচী সাক্ষাৎ রহস্যপুরুষ – তাঁর খ্যাতি দানবিক ও অতিমানবীয় রূপ লাভ করেছে। সাধারণ্যে তো বটেই, ইংরেজ পুলিশমহলে কি উচ্চমহলেও তিনি এক অদ্ভুত কিংবদন্তি। তাঁর ক্ষমতা, তাঁর আসুরিক শক্তিমত্তা, শৌর্যবীর্য এসবকে সত্য বলে, স্বাভাবিক বলে মানা কঠিন। সব্যসাচীর কর্মপরিধি বিস্তৃত, এশিয়ার দেশে দেশে, এমন কি ইউরোপেও তাঁর কর্মযজ্ঞ স্পন্দিত। ক্ষমতা তাঁর

আকাশছোঁয়া, ফেরারি আসামি হয়ে কালো তালিকাভুক্ত হয়েও তিনি অদৃশ্য, ভুতুড়ে ও শক্তিমান, নাগালের বাইরে, উন্মোচিত হওয়ার মতো নন। সামনে থেকেও একদম দূরবর্তী, রহস্যঘেরা – নাগালের মধ্যে থেকেও আবিষ্কারযোগ্য নয় সবসময়। সরকারি শক্তিশালী গোয়েন্দারা পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে গলদঘর্ম, হন্যে হয়ে খুঁজে মরে, চিহ্ন পায় না। মোটকথা, শরৎচন্দ্র এই স্বাধীনতাযোদ্ধার চরিত্রে শত বিশেষণ প্রয়োগ করে প্রলয়ংকরী করে তুলেছেন, তাঁকে অবিশ্বাস্য এক মূর্তি দান করেছেন।

প্রসঙ্গটি দীর্ঘায়িত করার আগে আমরা উপন্যাসের অন্যান্য দিকে মনোযোগ দেব। পথের দাবী দেশপ্রেমের কাহিনি হলেও এর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অন্য উপাখ্যান তাকে ছাপিয়ে উঠেছে, পাঠকের অন্তরে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। আমি পথের দাবীর নায়িকা ভারতীর কথা স্মরণপথে আনছি। ভারতী পথের দাবীরও সদস্য, (সেটা সব্যসাচীর সংগঠন) খুব কর্মিষ্ঠ, ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ। কিন্তু ভারতীর ব্যক্তিগত জীবনধারা, অপূর্বকে ঘিরে যা পল্লবিত ও ঘনীভূত, তাই পথের দাবী উপন্যাসের পুঁজি, প্রাণ। ভারতী ভূমিষ্ঠ হয়েছে বার্মায়, সেখানেই বাল্য, কৈশোর পেরিয়ে পরিণতি লাভ করেছে। ভারতী বাঙালি খ্রিষ্টান মা ও বিদেশি খ্রিষ্টান পিতার সন্তান। কলকাতাবাসী বঙ্গসন্তান, উচ্চশিক্ষিত অপূর্ব চাকরির সুবাদে বার্মায় এসেছে, ভারতীর বাসার সন্নিকটে তার বাসা, অবস্থান।

শিক্ষিত ভারতী জন্মসূত্রে, পারিবারিক আবহ থেকে আধুনিক, অকপট, বিশ-একুশ বছরের সুশ্রী তরুণী। অপূর্ব বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত হলেও বিপরীত চরিত্রের মানুষ – রীতিমতো রক্ষণশীল, নিষ্ঠাবান, আচারসর্বস্ব মায়ের সন্তান, তার অন্ধ ভক্ত। এমন আচারবিশ্বাসী, বিপজ্জনকরকম একগুঁয়ে, আধুনিক হিন্দুসন্তানের ওপরও অসাধারণ ভারতী ছায়াবিস্তার করেছে, ত্যাগে প্রীতিতে তাকে জয় করেছে। ভারতীর ক্ষমতার কোনো তুলনা নেই, ভারতীর মানবিকতার, ভালোবাসার শেষ নেই। সাধারণ বাঙালি সমাজ থেকে আগত কোনো যুবতীর পক্ষে স্বচ্ছন্দে এমন অসাধ্য সাধন করা সম্ভব ছিল না। শরৎচন্দ্র এ-সত্য উপলব্ধি করেই সচেতনভাবে ভারতীকে ভিন্ন সমাজ থেকে বেছে নিয়েছেন। শরৎচন্দ্রের জীবনে দীর্ঘ বার্মাবাস একটা স্মরণীয় অধ্যায়। এ-সময় ভারতের নানা প্রান্ত থেকে নানা ধর্মমতের ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ বার্মায় জীবিকার প্রয়োজনে সমবেত হয়, বিচিত্র এক সমাজ গড়ে তোলে। ভারতী সেই অদ্ভুত, জটিল সমাজের ফসল। শেষ প্রশ্নর কমলও কিন্তু শরৎচন্দ্রের বার্মায় দেখা সমাজচিত্র থেকে, সমাজদর্শন থেকে সৃষ্টি হয়েছে। আমরা ভারতী প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ভারতী পরিচয়ের সূচনা থেকে অপূর্বকে পছন্দ করেছে, কাছে টেনেছে। অপূর্বকে জয়ে তার অবলম্বন হলো পরার্থপরতা, নিঃস্বার্থ সেবা, অসংকীর্ণ, অসাধারণ মানবতা। শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রে যে স্বাভাবিক কোমলতা ও স্পর্শকাতর মাতৃভাব থাকে, পরের কল্যাণে

অকৃপণ আত্মদানের আকুতি থাকে, ভারতী তার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। নিজের পরিবার, সমাজ থেকে পাওয়া অসংকোচ আত্মত্যাগের কারণে স্বচ্ছন্দ, সাবলীল ভারতী অনূঢ়া যুবতী হয়েও রক্ষণশীল, নারীসান্নিধ্যে অনভ্যস্ত আড়ষ্ট যুবক অপূর্বর পাশে এসে দাঁড়াতে পেরেছে, তার মনে জন্ম দিয়েছে অনাবিল মুগ্ধতা। রেঙ্গুনে অপূর্বর ব্রাহ্মণ পাচক তেওয়ারী বসন্তে আক্রান্ত হয়ে (সেটা অপূর্বর অনুপস্থিতিতে, অপূর্ব তখন চাকরির কাজে বার্মার অন্য প্রান্তে) মরণাপন্ন হলে, ভারতী তার বাসা থেকে বিশেষ ছিদ্র দিয়ে দেখতে পেয়ে সেই দুঃসময়ে এসে তার পাশে দাঁড়িয়েছে, তাকে সেবা-শুশ্রƒষা দিয়ে সুস্থ করেছে। বসন্ত মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি, তেওয়ারীকে সেবাদানে ভারতীর ঝুঁকি কম ছিল না,

তথাপি ভারতী ভয় পায়নি, নিবৃত্ত হয়নি। তেওয়ারীর পাশে থেকে রাত জেগে ওষুধপথ্য করে অনাত্মীয়, মৃতপ্রায় তেওয়ারীকে সুস্থ করে তুলেছে। এমনকি, অপূর্ব ফিরে আসার পরও একনিষ্ঠভাবে লেগে থেকেছে, তার সেবায় ছেদ পড়েনি। আবার অপূর্ব হঠাৎ বমি করে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকেও অবহেলা করেনি, ফেলে আসতে পারেনি। শুধু তাই? সে-রাতে অপূর্বর বমি নিজ হাতে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করেছে, বাইরে থেকে ফল এনে নিজে অভুক্ত থেকে অপূর্বর খাবার ব্যবস্থা করেছে। নির্জন বাসায় (তেওয়ারী তখন একদম অজ্ঞান, আচ্ছন্ন) অসুস্থ যুবক অপূর্বর পাশে তার গায়ে ঠান্ডা কোমল হাত রেখে শুশ্রƒষা করছে, মুখে সান্ত্বনা দিয়ে ভালোবাসায় নির্ভরতায় ভরিয়ে তুলেছে। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, বিধ্বস্ত ভারতী ঘুমন্ত, শ্রান্ত অপূর্বকে পাশের ঘরে রেখে তেওয়ারীর পাশে মাদুরে গা এলিয়ে কাটায় রাত। একজন অনূঢ়া যুবতীর পক্ষে এভাবে একা যুবক অপূর্বর সঙ্গে একই বাসায় রাত্রিযাপন করা সংগত নয়, তা বুঝেও করেছে, বিপন্ন মানুষকে তবু ত্যাগ করে যায়নি। ভারতীয় সমাজের ভিন্ন পরিমণ্ডল থেকে ভারতী এসেছে বলেই তার পক্ষে এমনটা সম্ভব হয়েছে, ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এ শুধু ত্যাগ নয়, এ শুধু মানবপ্রেম নয়, এ এক মহৎ নারীহৃদয়ের সর্বোচ্চ প্রকাশ। ভারতী ভালোবাসা দিয়ে ভালোবাসা পেতে চেয়েছে, সেবা দিয়ে অপূর্বকে হৃদয়ে বরণ করতে চেয়েছে।

ভারতী যেমন সাহসী তেমনি বুদ্ধিমতী। তাঁর অন্তর্দৃষ্টি অসাধারণ, গভীর, বহুমুখী। চিন্তাচেতনায় উল্টোমেরুর বাসিন্দা হলেও, প্রাচীনপন্থী মায়ের অনুসারী হলেও অপূর্বকে চিনতে ভারতীর ভুল হয়নি। আচারনিষ্ঠ অপূর্ব ছিল শুদ্ধাচারী, নারীর সমান মর্যাদায় তার প্রতি শ্রদ্ধাবনত। কিন্তু ভারতী সুযোগসন্ধানী, হীনমন্য নারী নয়  – অপূর্বকে সে নারীর রূপসৌন্দর্যে নয়, নারীত্বের নির্মল মহিমায় প্রাণিত করতে চেয়েছে। ভারতীর সৌন্দর্য তথা রূপজমোহ থেকে হয়তো অপূর্ব মুক্ত হতে পারেনি, না হওয়া স্বাভাবিকও, কিন্তু অপূর্বর কাছে ভারতীর আসল মূল্য তার স্বার্থশূন্য সেবায়। সেবার সঙ্গে ভারতী পরিশ্রমী, দক্ষ, দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসায় তুলনাহীন। পুলিশের চাপে চাকরি হারানোর ভয়ে অপূর্ব পথের দাবীর (এর সদস্য হয়েও) গোপন কর্মকাণ্ড ও আস্তানার তথ্য ফাঁস করে দেয়। পরিণামে অপূর্ব তাদের হাতে ধৃত হয়ে, বন্দি হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়। কিন্তু ভাগ্যবান অপূর্ব, ভারতীর ভালোবাসাই তাকে প্রাণে বাঁচায়। সব্যসাচী মুহ্যমান ভারতীর কারণে, সবার বিরোধিতার মুখে অপূর্বকে মুক্ত করে দেয়। বহুদর্শী, প্রাজ্ঞ, অকুতোভয় সব্যসাচী দেশ নিয়ে, জনগণ নিয়ে, কৃষক-শ্রমিক নিয়ে, তাদের মুক্তি নিয়ে  – সর্বোপরি পথের দাবীর গোপন উদ্দেশ্য নিয়ে, কর্মপরিধি নিয়ে একমাত্র ভারতীর সঙ্গেই বারবার বিস্তারিত আলোচনায় উৎসাহী হয়, ভারতীর ওপর বিশেষ আস্থা রাখে। নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়ে অপূর্ব জীবন ফিরে পেয়েছে, মনের স্থিতি ফিরে পায়নি। ভারতীর মতো নিষ্ঠা ও ধৈর্য তার ছিল না, দৃঢ়তাও নয়। ফলে অপূর্ব ভেঙে পড়েছে, এত তছনছ হয়ে গেছে যে, কিছুতেই নিজেকে সামলে উঠতে পারছে না। সেই সময়েও আশ্রয় হয়েছে ভারতী। সান্ত্বনায়, সাহচর্যে, ভালোবাসায়, কোমল হাতের স্পর্শে মাথা টিপে দিয়ে শান্ত করেছে, তাকে প্রশান্তি দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছে। কিন্তু এত ত্যাগ সত্ত্বেও

ভারতী-অপূর্বর জীবন এক বিন্দুতে নোঙর করতে পারেনি, বিচ্ছেদের মরীচিকায় দিকভ্রষ্ট হয়েছে। বলা প্রয়োজন, শরৎচন্দ্রের সহজাত রক্ষণশীলতা এখানে ক্রিয়াশীল  – প্রাচীন মূল্যবোধ কাটিয়ে উঠতে পারেননি, সনাতন বিশ্বাস ত্যাগ করতে পারেননি। খ্রিষ্টান ভারতীর সঙ্গে হিন্দু অপূর্বর বন্ধন তাই সুদূরপরাহতই ছিল, বাস্তবে সম্ভব হয়নি। এ দুর্বলতা শরৎচন্দ্রের সহজাত, চরিত্রগত  – তাঁর উপন্যাসের সর্বত্র এমন সীমাবদ্ধতা আমরা লক্ষ করি। হিন্দুবিধবার বিবাহ যেহেতু শাস্ত্রমতে নিষিদ্ধ, সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য, শরৎচন্দ্রের বিধবারাও তাই

সে-বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে, তাকে অতিক্রম করতে পারেনি। আমরা তাঁর অন্য উপন্যাসেও এর দৃষ্টান্ত দেখতে পাব।

পরাধীন ভারতে দেশপ্রেমের যে মহামন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে শরৎচন্দ্র পথের দাবী রচনা করেন, তাতে আরো বিচ্যুতি চোখে পড়ে। সব্যসাচী এ-উপন্যাসে মহানায়ক – জ্ঞানে, কর্মে, সাহসে, দক্ষতায়, সততায়, আত্মত্যাগে তাঁর কোনো তুলনা নেই। তিনি অপ্রতিন্দ্বী, তিনি অতুলনীয়। কিন্তু এমন অজস্র বিশেষণে তাঁকে এমন মহত্ত্বমণ্ডিত করা হয়েছে, এমন গগনস্পর্শী শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর ওপর আরোপ করা হয়েছে যে, তিনি আর মাটির মানুষ থাকেননি, হয়ে উঠেছেন লৌহমানব, অতিমানব। এতে লৌকিক স্বাধীনতাযোদ্ধা না থেকে সব্যসাচী হয়ে উঠেছেন অলৌকিক, অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য এক মহামানব। তখন আমরা পীড়াদায়কভাবে লক্ষ করি, সব্যসাচীর মর্যাদা এর ফলে বাড়েনি, ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ-জাতীয় গোপন সশস্ত্র সংগঠনের সার্বিক বিষয়ে শরৎচন্দ্রের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল না, তাই পরিণামে এমন হয়েছে।

শরৎচন্দ্র সব্যসাচীকে প্রায় ঈশ্বরতুল্য করতে গিয়ে তাঁর স্বাভাবিকতা নষ্ট করেছেন, তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা বিপন্ন করেছেন। ভারতী বরং তুলনায়, পথের দাবী উপন্যাসে অনেক বস্তুনিষ্ঠ ও স্বাভাবিক চরিত্র। আমি নির্দ্বিধায় বলব, ভারতী এ-উপন্যাসের সম্পদ – যেমন তার ভালোবাসা, তেমনি তার সেবা, সহনশীলতা। যুবতী ভারতী যৌবনের আহ্বানেই অপূর্বকে ভালোবাসে, আবার নারীত্বের সহজাত সদগুণে অপূর্বর সেবা করে, বিপদে বাঁচায়, দেশেরও সেবা করে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়।

চরিত্রহীন শরৎচন্দ্রের আরেকটি বহুল আলোচিত উপন্যাস। নারী-পুরুষের হৃদয়গত সমস্যা চরিত্রহীনের সমস্যা। কিরণময়ী উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র, বিধবা সাবিত্রীও কম দীপ্তিমান নয়। কিরণময়ী, কি সাবিত্রী, উভয়ের জীবন নানা

বিপত্তি-সংকটের মধ্য দিয়ে গন্তব্য খুঁজে চলেছে। কিরণময়ী রূপসী, এমন রূপসী যে এককথায় তিলোত্তমা, তার তুল্য সুন্দরী সংসারে বিরল। সে-সৌন্দর্য তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে, অহংকার দিয়েছে, দিয়েছে ঈর্ষামিশ্রিত সম্ভ্রম। কিন্তু কিরণময়ী দুর্ভাগা, তার রূপ প্রেমের অর্থহীন চোরাবালিতে দিকহারা, স্বামীর সোহাগ থেকে বঞ্চিত। স্বামী সুস্থ থাকতেও কিরণময়ীর ভাগ্য খোলেনি, স্বামীর ভালোবাসা জোটেনি, তা পূর্ণ হতে সার্থক হতে দেয়নি। এখন সে-সুযোগও অস্তমিত, স্বামী হারান রোগে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। সে-লড়াই ক্ষীণ হতে হতে মৃত্যুর এত কাছে এসে পড়েছে যে, ভালোবাসা সেখানে নেহায়েত দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু কিরণময়ীর এই রূপের আড়ালে আছে জীবন্ত নারী কিরণময়ী  – নারীর চিরকালের আকাক্সক্ষা, প্রবৃত্তির চিরন্তন তাড়না। এত বুদ্ধিমতী কিরণময়ীকে দেখি  – কর্তব্যপালনে একনিষ্ঠ, স্বামীর প্রেমবর্জিতা এই নারী স্বামীসেবায় কখনো মনুষ্যত্বকে হেয় করেনি। অসুস্থ স্বামীর অক্লান্ত সেবা দেখে প্রথমবার সতীশ ও উপেন্দ্র অভিভূত হয়েছিল। কিরণময়ীর সামাজিক সৌজন্যবোধও কম বিস্ময়ের উদ্রেক করে না। তার সামাজিকতা ও শিষ্টতা প্রবাদপ্রতিম, তার অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তি একে আরো শাণিত করেছে, তীক্ষè করেছে। কিন্তু সবার উপরে কিরণময়ী নারী – সুন্দরী কিরণময়ীর সঙ্গে অচরিতার্থ যুবতীর প্রেমবঞ্চনা, সংঘর্ষ। ভাগ্য অপ্রসন্ন তার, উদাসীন, প্রণয়বিমুখ স্বামী আগেও কিছু দেয়নি, এখন দেওয়ার সব রাস্তা অবরুদ্ধ। তার ক্ষুধিত প্রবৃত্তির, বুভুক্ষু হৃদয়ের যন্ত্রণা যখন অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন অনন্যোপায় সে অনঙ্গ ডাক্তারের দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু অনঙ্গ ডাক্তারের সঙ্গে যত অসামাজিক সম্পর্কে জড়াক, ভালোবাসা খুঁজুক,

প্রকৃতপক্ষে কিরণময়ী ভালোবেসেছে উপেন্দ্রকে। পিপাসার্ত কিরণময়ী উপেন্দ্রর সাক্ষাৎ পেয়ে মুগ্ধ হয়েছে, তাকে আশ্রয় করে এতদিনের উপেক্ষাবঞ্চনাকে অতিক্রম করতে চেয়েছে। দুর্ভাগ্য, উপেন্দ্র বিবাহিত, সুরবালার মতো প্রেমময়ী, সেবাময়ী স্ত্রী তার ঘর আলো করছে। কিরণময়ীর সৌন্দর্যছটায়, কিরণময়ীর বুদ্ধির প্রভায় উপেন্দ্র হয়তো সাময়িকভাবে প্রভাবিত হয়, তবু সুরবালাই তার শেষ আশ্রয়, সন্দেহ নেই।

উপেন্দ্রলাভে বিফল কিরণময়ী ভয়ানক আক্রোশে ফেটে পড়ে, দিগি¦দিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এই টালমাটাল অবস্থায় কিরণময়ী উপেন্দ্রর কনিষ্ঠ, অপরিণত  পিসতুতো ভাই দিবাকরকে প্রলুব্ধ করে, তাকে সঙ্গে নিয়ে বার্মায় পালিয়ে যায়। সত্য, ক্রোধে, প্রতিশোধস্পৃহায় কিরণময়ী একসময় দিবাকরকেই কাছে টেনে নেয়। এবং স্বামীর অবর্তমানে (ততদিনে হারান মৃত) প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাকে নিয়ে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। যাকে ভালোবেসেছে, সে সাড়া দেয়নি, যাকে ভালোবাসেনি, নিছক অন্ধ আবেগে তাকে নিয়ে পালিয়ে কিরণময়ী নারীজীবনে মহাসংকট ডেকে আনে। কিরণময়ীর এই দোদুল্যমান, সংঘাতসংকুুল জীবনকে আমরা তলিয়ে দেখার চেষ্টা করব।

স্বামীর মৃত্যুর পর কিরণময়ী ও শাশুড়ি অঘোরময়ীকে দেখাশোনার জন্য দিবাকরকে এ-বাসায় আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। সুপুরুষ দিবাকর বউদি কিরণময়ীর রূপে মুগ্ধ হবে, তার বুদ্ধিদীপ্ত সান্নিধ্য সানন্দে উপভোগ করবে, এ আর অতিরিক্ত কী। কিরণময়ীর অতীত বিষাদময়, বর্তমান অনিশ্চিত, নৈরাশ্যপূর্ণ। স্বামীর অবহেলা, শাশুড়ির অত্যাচার, কোনোটাই তাকে কম জর্জরিত করেনি। শাশুড়ির অত্যাচারও ছিল এককথায় অসহনীয়। তপ্ত খুন্তির বা জ¦লন্ত কাঠের ছ্যাঁকা তার শরীর আজো বহন করছে। এই অভিশপ্ত জীবনে স্বামীর বন্ধু উপেন্দ্র এলো আশার আলো হয়ে, আনলো নবতর উন্মাদনা। কিন্তু সকলি গরল ভেল। সে-বিফলতা তাকে হিংস্র করে তোলে, দিবাকরকে নিয়ে স্বপ্ন রচনায় উৎসাহ দেয়। কিরণময়ীর রূপযৌবনের মাদকতায় দিবাকর ক্ষণিকের জন্য মোহাচ্ছন্ন হয়।

প্রকৃতপক্ষে দিবাকর প্রণয়াসক্ত হয়নি, কিরণময়ীকে ভালোবাসেনি। কিরণময়ীর এখানেই সমস্যা – দিবাকরকে উপেন্দ্রর আসনে বসাতে পারেনি, আবার দূরেও ঠেলে দিতে পারেনি। শেষমেশ তাই দেখা যায়, দিবাকর-কিরণময়ীর জীবন বার্মার আরাকানে বিশুষ্কতায় দুঃখজর্জর হয়ে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। কিরণময়ী যদিও অকপটে ব্যক্ত করেছে, সে বিধবা বলে তার ওপর অন্য কারো অধিকার নেই, সে মুক্ত। আর দিবাকর অবিবাহিত যুবক বিধায় স্বভাবত স্বাধীন, বন্ধনহীন। সুতরাং বন্ধনে মিলনে তাদের কোনো বাধা নেই। কিন্তু বাধা তাদের থেকেই গেছে, কিরণময়ী, দিবাকর কেউ সেটা ভেঙে বোধহয় বেরিয়ে আসতে পারেনি। এজন্য অবশ্য ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্রের ভূমিকা, জীবনবোধ, কোনোটাই কম দায়ী নয়। নারী-পুরুষের অসম প্রণয়ে কিংবা বিবাহবহির্ভূত অসামাজিক সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের কোনোদিনই আস্থা ছিল না। দিবাকর – কিরণময়ীর সম্পর্ক মসৃণভাবে অগ্রসর হতে না পারার সেও একটা বড় কারণ। ফলে আরাকানে তাদের দূরত্ব বেড়েছে, কেবল বেড়েছে। একই ঘরে ভিন্ন ভিন্ন শয্যায় দিনের পর দিন থেকেছে, মাঝখানে দূরত্ব অতি সামান্য, কিন্তু মনের দূরত্ব সীমাহীন। পরস্পরকে ভালোবাসতে পারছে না, স্পর্শ করতে পারছে না, দূরত্ব ঘোচাতে পারছে না। একজন পরমাসুন্দরী যুবতী নারী, অপরজন যৌবনদীপ্ত যুবক – তথাপি দৈহিক আসক্তি নেই, মিলনের আকাক্সক্ষা নেই। শীতল, নিষ্প্রাণ, কামনাবাসনাহীন একজোড়া অর্ধমৃত নরনারী। কিরণময়ী তার পুষ্পিত বক্ষে দিবাকরকে গভীরভাবে টেনে নিলেও সেই তিক্ততা, সেই প্রাণহীনতা। যে ধর্মসিদ্ধ, সমাজসিদ্ধ, নীতিসিদ্ধ মিলনে, নরনারীর দেহবিনিময়ে শরৎচন্দ্র আস্থাবান ছিলেন, তাও এদের দূরে দূরে রাখবে বইকি। শরীরের সান্নিধ্যে না এসে দেহজ পবিত্রতা রক্ষা করে কিরণময়ী-দিবাকর শরৎচন্দ্রের সনাতন বিশ্বাসকে উজ্জীবিত করেছে ঠিকই, তবে জীবনের সত্যকে অক্ষুণ্ন রাখতে পারেনি। আরাকানযাত্রার সময় জাহাজের নির্জন কেবিনে দুজনের অভিন্নশয্যায় শয়ন, রাত্রিযাপন, দিবাকরকে কিরণময়ীর নিবিড় আলিঙ্গন – আবার আরাকানে একই ঘরে দীর্ঘদিন তাদের নিকটবাস,

কোথাও যৌনশুচিতা বিঘ্নিত হয় না, বিস্ময়কর বইকি। শরৎচন্দ্র কি মানুষের স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত যৌনতাকে বিশ্বাসের আবরণে ঢেকে রাখতে চেয়েছেন? ঘটনাপ্রবাহ অন্তত তাই বলে। শরৎচন্দ্রের এ-মূল্যবোধ উপন্যাসের অন্য পর্বেও সমান সক্রিয়।

এ-পর্বে আছে সাবিত্রী-সতীশের উপাখ্যান। সাবিত্রী বালবিধবা, যৌবনবতী হলে অনিবার্যভাবে পুরুষসঙ্গ কাম্য হয়ে ওঠে। কিন্তু বিধবার যৌনচাহিদা যত বাস্তবিক হোক হিন্দু ধর্ম ও সমাজ তা সমর্থন করে না, তাকে স্বীকৃতি দেয় না। যৌবনের এ ঝঞ্ঝাসংকুল সময়ে সে ভগ্নিপতি ভুবন মুখুজ্জ্যের প্রলোভনে পড়ে, তার মিথ্যে আশ্বাসে পালিয়ে আসে। কিন্তু ভুবন মুখুজ্জ্যে তাকে দৈহিকভাবে চেয়েছে মাত্র, বৈধ স্বীকৃতিতে সামাজিক মর্যাদায় গ্রহণ করে সম্মানিত করতে চায়নি। সাবিত্রীর স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল – স্ত্রীর মর্যাদা মিলল না, ফিরে যাওয়ার পথও রুদ্ধ হয়ে গেল। অনন্যোপায় সাবিত্রী প্রাণ বাঁচাবার জন্য মেসে কাজ নিল। মেসে সাবিত্রীর জীবনের আর এক অধ্যায় – সতীশের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। সতীশ সুশ্রী সাবিত্রীর গুণমুগ্ধ, সান্নিধ্যও তার কামনা করে। সাবিত্রী অসাধারণ নারী – যেমন মর্যাদাবান, তেমনি ব্যক্তিত্ববান। তার তীক্ষèবুদ্ধি ও কঠোর আত্মসম্মানবোধ তাকে পুরুষদের অনাচার পরিহারে সর্বদা সাহায্য করেছে। কোনো সন্দেহ নেই, সাবিত্রী শরৎসাহিত্যে এক অতুলনীয় নারীপ্রতিমা। সে কোনোমতেই তার দেহমনের পবিত্রতা হারাতে রাজি নয়। ধনীর পুত্র অস্থির সতীশ তাকে ভালোবাসে – সাবিত্রীও মানবিক প্রবৃত্তিবশে সতীশের প্রতি কম দুর্বল নয়। সাবিত্রী ঝিয়ের বৃত্তিতে নিযুক্ত সত্য, সতীশের তুলনায় সামাজিক অবস্থানে হীনতরও। কিন্তু কোনোভাবে অনুপযুক্ত নয়, অসম্মানিত হওয়ার মতো নয়। কিন্তু এখানেও শরৎচন্দ্রের সেই পুরনো সমস্যা – বিধবার সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার নৈতিক প্রসঙ্গ। শরৎচন্দ্র নারীর নারীত্ব হৃদয়ঙ্গম করেন, তার অন্তর্গত উত্তাপ অনুভব করেন, শরীরের কান্না শুনতে পান, সেসব তুলে ধরতে তাঁর কার্পণ্য নেই। প্রকাশে তিনি নৈর্ব্যত্তিক, নিরপেক্ষ ও জীবনবাদী শিল্পী, উচ্চাঙ্গের রসস্রষ্টা। পাঠকের কাছে শরৎচন্দ্রের অসাধারণ আবেদনের মূলসূত্রও এখানে নিহিত। তিনি সমাজের চেনা মানুষের চেনা কণ্ঠস্বরই আমাদের শোনান, তাতে কোনো খাদ থাকে না, কৃত্রিমতা থাকে না। আবার তাঁর নারীরা সেবাধর্মেও নিবেদিত, অনন্যা। উপেক্ষিত কিরণময়ী স্বামী হারানের সেবায় কোনো ফাঁক রাখেনি, বিধবা সাবিত্রীও সেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সেবিকাবৃত্তির সঙ্গে নারী প্রেমিকাও, সহজাত বৈশিষ্ট্যে পুরুষকে ভালোবাসে, একান্তভাবে পেতে চায়। এই স্পর্শকাতর জায়গায় শরৎচন্দ্র সমস্যায় পড়েন ধর্ম, সমাজ, নীতি, মূল্যবোধ প্রভৃতি প্রাচীন ধারার বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়েন, তাকে ভেঙে সত্যকে গ্রহণ করার সাহস দেখাতে পারেন না।

কিরণময়ী-দিবাকরের দৈহিক ও জৈবিক দূরত্ব শরৎচন্দ্রের ওই বিশ্বাসের ফল। শরৎচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি আমরা চরিত্রহীনের দিবাকরের জবানিতে শুনতে পাই। প্রণয়ের বৈধতা-অবৈধতা প্রসঙ্গে কিরণময়ীর জেরার মুখে দিবাকর, ‘যাহা বিবাহের দ্বারা সুপবিত্র নহে, যাকে সমাজ স্বীকার করে না, যাকে আত্মীয় বন্ধুবান্ধব ঘৃণার চোখে দেখে, তাই অবৈধ।’

বিধবা সাবিত্রীর প্রণয় তাহলে সফলতা পাবে কী করে? ভগ্নিপতি সাবিত্রীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সতীশ তাকে প্রতারিত না করলেও এটা তো সত্য, বৈধব্য সেখানে বড় বাধা। সাবিত্রী তাই আগাগোড়া সেবাই দিয়ে যায়, মৃতপ্রায় উপেন্দ্রর সেবায় নিজেকে প্রায় বিলিয়ে দেয়, সতীশের প্রেয়সীর স্থান অধিকার করতে পারে না। সে-স্থান নির্ধারিত হয় ধনীর মেয়ে সুন্দরী সরোজিনীর জন্য। সে-সম্পর্ক চূড়ান্ত করেন মুমূর্ষু উপেন্দ্র, সরোজিনীকে গ্রহণে সাবিত্রীর সামনেই সতীশকে উদ্বুদ্ধ করেন, সম্মতও করান। বঞ্চিতা সাবিত্রীকে এ-সময় উপেন্দ্র যে-উপদেশ দান করেন, তা শরৎচন্দ্রীয় নৈতিক উপদেশই, ‘আসক্তির বন্ধন আর তোমার জন্য নয়, সাবিত্রী। দুর্ভাগ্য যদি তোমাকে কুলের বাইরে এনেই ফেলেছে, তার ভেতরে আর যেতে চেয়ো না। চিরদিন বাইরে থেকেই তাকে বুকে করে রেখো, এই আমার অনুরোধ।’

শরৎচন্দ্রের রচনায় সংস্কার-বিশ্বাসের সঙ্গে শৈল্পিক সত্যের দ্বন্দ্বও প্রকটিত। জীবনের সঙ্গে আচারসংস্কারের সংঘর্ষে তাঁর সাহিত্যের সততা বারংবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কিরণময়ী ধর্ম বিশ্বাস করে না, সংস্কার পালন করে না, তাতে আস্থাও রাখে না। কিরণময়ী অন্যভাবেও সমাজের চোখে নিন্দনীয়, অভিযুক্ত – পরপুরুষকে নিয়ে, দিবাকরকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে বলে। সেই কিরণময়ী সতীশের চেষ্টায় যখন আরাকান থেকে কলকাতায় ফিরে এলো, তখন তার অন্য মূর্তি, অনুশোচনায় অস্থির, দগ্ধ, জিজ্ঞাসাজর্জরিত। অর্ধোন্মাদের মতো, বিকারগ্রস্তের মতো কলকাতার রাস্তায় বেরিয়ে ঈশ্বর ও ধর্ম সম্বন্ধে নানাজনকে এলোমেলো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে চলেছে। এটা স্পষ্টত কিরণময়ীর আত্মসমালোচনা, তার ঈশ্বর অবিশ্বাসজনিত ক্ষত নিয়ে, বিচ্যুতি নিয়ে প্রায়শ্চিত্তের প্রয়াস। শরৎচন্দ্র কিরণময়ীকে এভাবে সর্বসমক্ষে উপস্থাপিত করে তাঁর নিজের বদ্ধ, শাস্ত্রগত বিশ্বাসের পক্ষে জোরালো সাফাই গেয়েছেন। একটু বিশ্লেষণী যৌক্তিক দৃষ্টিতে তাকালে বোঝা যায়, এ-দৃশ্য পূর্বাপর ঘটনাবিন্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি, হয়ে উঠেছে চাপানো বিষয়। এর ফলে শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে জবরদস্তির অভিযোগ ওঠে, তাতে শিল্প লক্ষ্য হারিয়ে কাহিনির সজীবতা নষ্ট করে। রসগ্রাহীর কাছে সাজানো এ-দৃশ্যটি স্বকল্পিত, অনভিপ্রেত – তাই আপত্তিকর।

শরৎচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে প্রথম আবির্ভূত হন বড়দিদি নামক উপন্যাস তথা বড়গল্প লিখে। বার্মা বাসকালে তাঁর এভাবে সাহিত্যজীবনের সূচনা। শরৎচন্দ্র দরদি কথাসাহিত্যিক, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম দরদ তাঁর সাহিত্যকে শ্রীমণ্ডিত করেছে। মানুষে মানুষে গভীর আকর্ষণ ও নৈকট্যের প্রকাশ তাঁর অনেক গল্পের প্রধান বিষয়। বিশেষ করে একটা সাধারণ বিষয়কে, সুকৌশলে অনেক কাহিনির বিষয়বস্তু করে তাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। রক্তসম্পর্কে আত্মীয় নয় কিংবা ঘনিষ্ঠ নয়, হয়তো দূরবর্তীই, তথাপি তার প্রতি কোনো নারীর ঐকান্তিক টান ও মমত্ব, তার জন্য সর্বপ্রকার ত্যাগস্বীকার ও আত্মদানে উন্মুখ, এমন ঘটনা বহুক্ষেত্রে বিষয়বস্তু হয়েছে। ব্যতিক্রমী বলে তা সহজে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, পাঠককে মর্মোদ্ধারে আগ্রহী করে তোলে। মানুষের ভালোবাসার কতগুলো ধারা আছে। সন্তান বাবা-মাকে, বাবা-মা সন্তানকে, ভাইবোনকে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে অথবা রক্ত সম্পর্কিত নিকটজনকে ভালোবাসে, ঠিক এমন ভালোবাসাই সংসারে স্বাভাবিক, এটাই অবধারিত রীতি। এর বাইরে যে মানুষ একে অপরের জন্য অনুভব করে, একাত্মতা বোধ করে, পৃথিবীতে বিশেষ করে দুর্বল, কোমলপ্রাণ নারীরা করে, তা স্বাভাবিক নয়। মানবপ্রেমে প্রাণিত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই ভিন্ন বিষয়কে ব্যবহার করে আমাদের মুগ্ধ করেছেন। আর এসব ব্যতিক্রম বলে হৃদয়ে সহজে সাড়াও জাগায়, দাগ কাটে।

শরৎচন্দ্রের প্রথম বড় গল্প ‘বড়দিদি’ ওই অভিনব জীবনভাবনার ফল। সুরেন্দ্রনাথ সম্পন্ন উকিলের ছেলে, নিজমাতা অকালে প্রয়াত হওয়ায় স্নেহবৎসল বিমাতার অগাধ আদর ও তত্ত্বাবধানে বড় হয়, এম.এ পাশ করে। এক শুভাকাক্সক্ষী বন্ধুর পরামর্শে বিলেত যাওয়ার সাধ জেগে উঠলেও বিমাতার বাধায় তা স্থগিত হয়। বুদ্ধিমতী বিমাতা সেটা বুঝেশুনেই করেছেন, কারণ উচ্চশিক্ষিত সুরেন্দ্রনাথের মধ্যে আত্মনির্ভরতার বড় অভাব, একা নিজের চেষ্টায় চলার ক্ষমতা নেই। অনবরত সৎমাতার দেখাশোনা ও আদরযত্নে সে এত নির্ভরশীল হয়ে ওঠে যে, একাকী চলতে অক্ষম হয়ে পড়ে। বিলেতে তার পক্ষে একা চলেফিরে জীবনযাপন করা সম্ভব নয় বলে বিমাতা তাকে নিরস্ত করেন। বিলেত যেতে ব্যর্থ হয়ে সে অন্য উপায় খোঁজে। সেই বন্ধু আবার তাকে কলকাতা গিয়ে পথ খুঁজে দেখার পরামর্শ দেয়। সুরেন্দ্রনাথ পরাধীনতা দূর করতে সবার অলক্ষে একদিন একা কলকাতায় গিয়ে হাজির হয়। বাড়ির বার যে কখনো হয়নি, তার কাছে কলকাতা তো মহাসমুদ্র। পথে-প্রান্তরে নির্বান্ধব অবস্থায় ঘুরে খেয়ে না খেয়ে এখানে-সেখানে রাত কাটিয়ে সে যখন বিধ্বস্ত, তখন একটু আলো দেখা দেয়। একজনের উপদেশে চাকরির আশায় জমিদার ব্রজরাজবাবুর আশ্রয়ে গিয়ে পড়ে। ব্রজরাজবাবু দীর্ণজীর্ণ সুরেন্দ্রনাথকে দেখে সহানুভূতিশীল হন, নিজের ছোটমেয়েকে পড়ানোর বিনিময়ে তাকে আশ্রয় দেন। তাঁর স্ত্রী বেঁচে নেই, সংসার দেখাশোনা করে তাঁর ষোলো বছরের বড়মেয়ে বিধবা মাধবী। মাধবীকে সেও বড়দিদি বলে। এই বড়দিদি অন্তঃপুর থেকে তার যত্নআত্তি কম নেয় না। তার পোশাক, বিছানাপত্তর, আহার সবকিছুর প্রতি তীক্ষè নজর রাখে। কিন্তু সুরেন্দ্রনাথের তো কোনো ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠেনি, দায়িত্ববোধও নয়। সে একই রকম উদাসীন, অন্যমনস্ক, হাবাগোবা প্রকৃতির। কোনো কাজে তেমন মন নেই, উদ্যোগ নেই। ছোটমেয়েকে পড়ানোর বেলায় যেমন, নিজেকে গুছিয়ে মানিয়ে চলায়ও তেমন  – ফলে বিদ্ঘুুটে স্বভাবদোষে সে খাপ খাওয়াতে না পেরে এ-বাড়ি ত্যাগ করে। তারপর ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয়। গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হয়ে সুরেন্দ্রনাথ হাসপাতালে নীত হয়, ব্রজরাজবাবু জানতে পেরে হাসপাতালে যান। এর পরের ঘটনা দ্রুত, সংক্ষিপ্ত। পিতা খবর পেয়ে সুরেন্দ্রনাথকে সুস্থ করে তোলেন, বাড়িতে নিয়ে যান।

এরপর সুরেন্দ্রনাথের জীবনে আর এক নাটকীয়তা। মাতামহ, অপুত্রক ধনী জমিদার, তাঁর অকস্মাৎ মৃত্যু হলে নাতি সুরেন্দ্রনাথ সেই জমিদারির উত্তরাধিকারী হয়ে বসে। এরকম উল্লম্ফনে কিন্তু কিছু প্রশ্ন দেখা দেয়।

সুরেন্দ্রনাথের রাতারাতি ভাগ্যপরিবর্তন হলেও, পাঠক সন্তুষ্ট হতে পারে না। সুরেন্দ্রনাথের মাতামহ যেন অপ্রত্যাশিতভাবেই হঠাৎ আবির্ভূত হন। সুরেন্দ্রনাথ মাতৃহীন একমাত্র দৌহিত্র, মাতামহের বিশাল জমিদারির একমাত্র উত্তরাধিকারী, অথচ এতদিন ধরে তাঁর অস্তিত্ব আমাদের কাছে একদম অজানা। অনাথ নাতির প্রতি মাতামহের ভালোবাসা তো দূরের কথা, কোনো কারণে নাতির সঙ্গে কোনো যোগাযোগও গড়ে উঠতে দেখি না। জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার মতো গাড়ি দুর্ঘটনা এবং তারপরই সেই অজ্ঞাতকুলশীল মাতামহর মৃত্যু – সবই যেন প্রয়োজনে ঘটানো হয়েছে। আরো খুলে বললে, ঘটনাকে একটা নির্দিষ্ট পথে চালিত করতে যেন শরৎচন্দ্র এমন নাটকীয় আয়োজনের আশ্রয় নিয়েছেন; অশৈল্পিক, অবিশ্বাসযোগ্য পথে পা বাড়িয়েছেন।

আমরা আবার মূল ঘটনাপ্রবাহে ফিরে আসি।

মাধবীর পিতা ব্রজরাজবাবুর মৃত্যু হয়, সংসারের কর্তৃত্ব যায় দাদার স্ত্রীর হাতে। স্বভাবত কোণঠাসা, কর্তৃত্বশূন্য মাধবী অস্বস্তিতে পড়ে, শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু সেখানে আর এক বিপর্যয়। শ্বশুরের যে পঁচিশ বিঘা জমি ছিল, তা সুরেন্দ্রনাথেরই জমিদারি এলাকায়। সেই জমি শ্বশুরের বন্ধু, এতদিনের হেফাজতকারী, কৌশলে আত্মসাৎ করে। সুরেন্দ্রনাথের কুচক্রী নায়েব মথুরানাথের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ষড়যন্ত্র করে দেড় হাজার টাকা খাজনা বাকি দেখিয়ে আদালতে মামলা করে এবং সেই বন্ধু পরে নিলামে কিনে নেয়। মাধবী শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়। ঘটনাক্রমে সুরেন্দ্রনাথ এটা জেনে ফেলে, খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয় যে, ওই বিতাড়িত বিধবা নারী আর কেউ নয়, সেই কলকাতার আশ্রয়দাতা বড়দিদি মাধবী। সুরেন্দ্রনাথের মাথায় বাজ ভেঙে পড়ে। তখন সে অসুস্থ, নানা রোগে জীর্ণশীর্ণ, ঘোড়ায় চড়ার সামর্থ্য নেই  – তবু মরিয়া হয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে মাধবীকে উদ্ধার করতে যায়। মাধবীকে তার শ্বশুরবাড়িতে না পেয়ে দুর্দান্তবেগে উন্মাদের মতো পথে ছোটে, তাকে ধরতেই হবে, তার সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতেই হবে এমন প্রতিজ্ঞায়। বড়দিদির যাত্রাপথে নৌকায় তাকে ধরলো বটে, কিন্তু ততক্ষণে সুরেন্দ্রনাথের অন্তিম দশা, আর আশা নেই।

সুরেন্দ্রনাথ নিজের গৃহে ফিরল সত্য, বড়দিদির প্রাণপণ সেবাও পেল, শত চিকিৎসায়ও তবু তার উদ্ধার হলো না, রক্তবমি করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।

আগেই বলেছি, গল্পটি শরৎচন্দ্রের প্রথম গল্প। আরো প্রণিধানযোগ্য, পূর্বোক্ত ভিন্নধারার গল্প হওয়ায় বিষয়গুণে, আবেগাতিশয্যে ও সরসতায় তা জনপ্রিয় হয়েছিল। শরৎচন্দ্র, বলা বাহুল্য, জনপ্রিয় লেখক, প্রথম গল্পেই পাঠকের হৃদয় জয় করে বাজিমাত করেছেন। পরে তাঁর জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বেড়েছে, এখনো বর্তমান প্রেক্ষাপটে অজনপ্রিয় নন। কিন্তু জনপ্রিয়তা ও শিল্পসার্থকতা এক বিষয় নয়। বরং তাদের মধ্যে দূরত্বই বেশি, দ্বন্দ্বই অধিক পরিলক্ষিত হয়। ‘বড়দিদি’ গল্পের রসবিচারে এ-সার্থকতা আমরা পরীক্ষা করে দেখব।

‘বড়দিদি’ গল্পের প্রধান চরিত্র সুরেন্দ্রনাথ। বাল্যকালে

মাতৃহীন, কিন্তু সৎমায়ের অতিরিক্ত যত্নে, অপরিমেয় বাৎসল্যে ভালোবাসায় তার ব্যক্তিত্ব ও আত্মশক্তি বিকশিত হতে পারেনি। সৎমা তার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করায়, সবকিছুর পরিচালক হওয়ায়, পথনির্দেশক হওয়ায় সে জড়ভরতে পরিণত হয়েছে, স্বাধীনভাবে চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। কলকাতায় ব্রজরাজবাবুর আশ্রয়েও অবস্থার উন্নতি হয়নি। সময়মতো চেয়ে খেতে পারে না, প্রমীলাকে (ছোটমেয়ে) নিয়মমাফিক পড়াতে পারে না, নিজের বিছানা, পোশাক-আশাক গুছিয়ে চলতে পারে না। মাধবী, অন্যকথায় বড়দিদি, আড়াল থেকে তার দেখাশোনা করে, তার যত্নআত্তি করে, সব করে দেয়। জমিদার হওয়ার পরও, মাতামহর সম্পত্তির জোরেও সুরেন্দ্রনাথের চরিত্রে গুণগত কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, ব্যক্তিত্ব জাগ্রত হয়নি। আগের মতোই উদাসীন, অন্যমনস্ক, অসচেতন, পরনির্ভর – সেই একই ধারা। চরিত্রটি নির্মাণে লেখকের ত্রুটি আছে। এরকম আত্মভোলা, নির্জীব একটা ছেলে এম.এ পাশ করল কী করে, সেটা একটা প্রশ্ন। বয়স বাড়ছে, প্রতিকূলতা সামনে আসছে, কলকাতায় পরের বাড়িতে আশ্রিত থেকে ঝামেলাঝক্কিও কম আসছে না, তবু সেই বদ্ধতা, সেই নিষ্ক্রিয়তা, কোনো উন্নতি নেই। শরৎচন্দ্রের এ-জাতীয় চরিত্রনির্মাণ স্বাভাবিক হয়নি, হতে পারেনি। স্বেচ্ছায় বিকশিত হতে না দেওয়ায় চরিত্রটি স্বাভাবিক পথ ধরে আদৌ এগোয়নি। এ যেন একজন জন্মগত ছেলেমানুষ। আবেগ নেই, উৎসাহ নেই, তরুণবয়সের কোনো প্রবৃত্তিগত উদ্দামতা নেই। অভিভাবকত্ব দেখিয়ে, দায়িত্বশীল গিন্নিপনা করে, কর্ত্রীর আচরণ করে তাকে দেখে রাখে বয়োকনিষ্ঠ মাধবী। আর ক’বছরের বড় পুরুষ সুরেন্দ্রনাথ ছেলেমানুষই থেকে যায়। সুরেন্দ্রনাথকে এভাবে অবিকশিত রেখে, অপরিণত রেখে, তার সারল্য কাজে লাগিয়ে শরৎচন্দ্র হয়তো সাধারণ পাঠকের অনুকম্পা লাভ করেছেন, তবে সচেতন পাঠকের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছেন।

‘বড়দিদি’তে সুরেন্দ্রনাথের সর্বশেষ মানবিক পদক্ষেপটিও বিভ্রান্তিকর। মাধবীকে ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করতে অসুস্থ সুরেন্দ্রনাথ যেভাবে পাগলের মতো ঘোড়া ছুটিয়ে তাকে খুঁজে মরছে, পেয়ে মিলিত হয়েছে ও দুর্বলতায় জ্ঞান হারিয়ে তার কোলে আশ্রয় নিয়েছে – এ-দৃশ্যটি খাপছাড়া, মেলোড্রামাটিক। এই নাটকীয়তার অবতারণা করে লেখক পাঠকের বেশি সহানুভূতি পেতে চেয়ে বরং বিরক্তির কারণ হয়েছেন। এতে মানবিক উচ্ছ্বাস আছে, আবেগের আধিক্য আছে; কিন্তু শিল্পের যে-সততায় শিল্প মর্যাদায়, সার্থকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তার কোনো অস্তিত্ব নেই। সত্যি বলতে, এটা গল্পের একটা অত্যন্ত দুর্বল সংযোজন।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই বিশেষ ধারাটি প্রয়োগ করে আরো একাধিক গল্প রচনা করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটা গল্পকে আমরা আলোচনায় আনবো। ‘রামের সুমতি’, ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘মেজদিদি’ ও ‘মামলার ফল’ – এই চারটি গল্প আমাদের আলোচ্য তালিকার অন্তর্র্ভুক্ত হবে।

প্রথমে ‘রামের সুমতি’র ওপর দৃষ্টি দেব। রাম শ্যামলালের বৈমাত্রেয় ভাই – মাত্র আড়াই বছর বয়সে বিধবা মা তাকে নববধূ শ্যামলালের স্ত্রী নারায়ণীর হাতে রেখে পরলোকে যাত্রা করেন। স্বভাবত নারায়ণীর স্নেহ-ভালোবাসায় রাম বড় হয়েছে, আদরযত্নের সঙ্গে প্রশয়ও হয়তো কম পায়নি। কিন্তু রাম নারায়ণীর প্রশ্রয়ে দুরন্ত হয়ে ওঠে – যেমন তার দুষ্টামি, তেমনি তার দুরন্তপনা। সামান্য কারণে কাউকে জ¦ালাতন করা, অত্যাচার করা – এককথায় তার উপদ্রবের শেষ নেই। নারায়ণীর জ¦র ছাড়ছে না বলে চিকিৎসক নীলমণি ডাক্তারের বাড়ি গিয়ে তাকে তিরস্কার করে। ডাক্তার রামের প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে ‘ওষুধ দিচ্ছি’ বলায়ও রাম থামে না, ‘ছাই দিচ্ছ, পচা ময়দার গুঁড়োতে অসুখ ভালো হয়।’ ডাক্তার এতে রেগে গেলে রাম তোয়াক্কা করে না, বউদিকে দেখে ভালো ওষুধ না দিলে ডাক্তারের কলমের আমবাগান রাতের আঁধারে কেটে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দেয়। এমনি উগ্র মেজাজ রামের, তার সঙ্গে আবার আছে বাগদী ছোকরাদের একটা দল, কাজেই তাকে সবাই ভয় পায়। নীলমণি ডাক্তারও ভীত হয়ে অবশেষে অনিচ্ছায় নারায়ণীকে দেখতে আসে, ভালো ওষুধে চিকিৎসা দেয়।

রামের উপদ্রব পদে পদে। সাতরাদের মাচা থেকে শসা খেতে গিয়ে গালি দেওয়ায় সে সব শসাগাছ গোপনে কেটে সাবাড় করে দেয়। এতে নারায়ণী তাকে অবশ্য শাস্তি দেয়, কান ধরিয়ে এক পায়ে অনেকসময় দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করে। স্মরণীয়, একমাত্র মাতৃসমা নারায়ণীকেই সে মান্য করে, অন্য কাউকে নয়।

নারায়ণীর মা বিধবা দিগম্বরী আশ্রয়দাতা ভাইয়ের মৃত্যুর পর কন্যার কাছে এসে আশ্রয় নেয়। নারায়ণী যতটা সহজ ও নরম প্রকৃতির, দিগম্বরী ঠিক তার উল্টো। কর্তৃত্বপরায়ণ, পরশ্রীকাতর, কুটিল – রামকে শুরু থেকেই দেখতে পারে না। রাম এমনিতে একরোখা, জেদি কিছুটা বিশৃঙ্খলও, দিগম্বরী এই সুযোগে তার দোষ খুঁজে বেড়ায়। রাম একটা অশ্বত্থ গাছের চারা এনে উঠোনের মাঝখানে লাগিয়ে জল ঢেলে কাদা করে ফেলছে, অশ্বত্থের ছায়া নাকি খুব সুবিনিড়, প্রশান্তিময়। রামের এটা নিছক ছেলেমানুষি, উদ্ভট খেয়াল। এত বড় চারা লাগবেও না, ঝামেলাও হবে না – নারায়ণী সেটা বোঝে। কিন্তু উদ্ধত দিগম্বরী তা নিয়ে অযথা হুলস্থুল বাধায়, রামের অলক্ষে অশ্বত্থের চারা উপড়ে ভেঙে ফেলে একটা হাঙ্গামা সৃষ্টি করে।

রামকে যে নারায়ণী অযাচিত আদর করে, কোলে বসিয়ে খাওয়ায়, তাও দিগম্বরীর অসহ্য। তরকারিতে অস্বাভাবিক ঝাল হওয়ায় রাম খেতে পারল না, সে-কথা নারায়ণী মাকে বলতে গেলেও বিপদ, দিগম্বরী ক্ষেপে যায়, ‘চুপ কর নারাণি, চুপ কর। রান্না শিখাতে আসিসনে আমাকে, চুল পাকালুম এই করে, এখন পেটের মেয়ের কাছে রান্না শিখতে হবে।’ দিগম্বরীর স্বভাবটাই এ-রকম, অকারণে গোলমাল লাগায়, অশান্তি সৃষ্টি করে। এজন্য নানা কারণে রামও দিগম্বরীর ওপর চটা, তাকে ডাইনিবুড়ি বলে গালি দেয়।

দিগম্বরী ঝালের তুচ্ছ বিষয় নিয়ে জামাই শ্যামলালের কাছে রামের বিরুদ্ধে নালিশ করে। শ্যামলাল ক্রুদ্ধ হয়ে রামকে পৃথক করে দিতে চায়, যদিও নারায়ণীর হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়। কিন্তু অশান্তি থামে না। দিগম্বরী শান্তভাবে থাকার মানুষ নয়, সুতরাং ঝামেলা লেগেই থাকে। দিগম্বরী তার স্বর্গীয় পিতার প্রেতাত্মার মুক্তির উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণভোজনের আয়োজন করে। তাতে মাছ দরকার। জামাইয়ের পুকুর থেকে সে মাছ ধরা হলো।

কার্ত্তিক-গণেশ নামে এমন বিরাট দুটো রুইমাছ আছে পুকুরে, রাম তাদের চোখে চোখে রাখে, নিজের বলে দাবি করে, কাউকে ধরতে দেয় না। তার একটা দিগম্বরীর কূটকচালে ধরা হয়। দিগম্বরী এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করে রামকে অপদস্ত করতে চায়। ফল যা হওয়ার হলো। রাম শুনে ক্রোধে কান্নাকাটি করে, নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে।

রামের চরিত্রে বাড়াবাড়ি আছে, হঠকারিতা আছে, কিন্তু দিগম্বরীর মতো জটিলতা নেই। সে আশ্চর্য সরল ও অকপট। ভান করতে জানে না, অভিনয় করতে জানে না, ছলনা করতে জানে না। তবে একগুঁয়ে ও দুর্দান্ত হওয়ায় তাকে নিয়ে সমস্যাও আছে। স্বভাবদোষে অনেকসময় অকাণ্ড করে বসে। জমিদারের ছেলেকে তুচ্ছ ঘটনায় একদিন রাম মেরে আহত রক্তাক্ত করে। জমিদার এটা মাফ করলেও নিজবাড়িতে হয় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া। শ্যামলাল ক্ষুব্ধ হয়ে নারায়ণীর কারণে থামে সত্য, কিন্তু বিদ্বেষী দিগম্বরী এতে হইচই বাধায়, রামকে ঘায়েল করতে উঠেপড়ে লাগে। পরিণামে স্নেহময়ী নারায়ণী বিগড়ে যায়, রাগেদুঃখে রামকে বেত দিয়ে নির্দয়ভাবে প্রহার করে।

এ-গল্পের পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। দিগম্বরী রামের পিছনে একটানা লেগে থাকায় রাম একদিন খেপে ‘ডাইনিবুড়িকে’ পেয়ারাগাছ থেকে কাঁচা পেয়ারা দিয়ে ঢিল ছুড়ে মারে; কিন্তু ঢিল লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে লাগে নারায়ণীর চোখে, নারায়ণী মারাত্মক আহত হয়। মাতৃস্নেহের যে-অবারিত ছায়ায় নারায়ণী এতদিন রামকে জড়িয়ে রেখেছিল, তাতে ভাটা পড়ে। রাম বিপাকে পড়ে যায়। অনুশোচনায় রাম ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে ক্ষমা পায় না, হতাশায় ভেঙে পড়ে। কোনোভাবে বউদির সহযোগিতা না পেয়ে বিপর্যস্ত রাম বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার উপক্রম করে।

তখনি জেগে ওঠে নারায়ণী, জেগে ওঠে তার সুপ্ত সত্তা – মাতৃত্ব। সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সে উঠে নিজহাতে রান্না করে রামকে কোলে বসিয়ে খাওয়ায়, ভারমুক্ত হয়। এসবে ক্রুদ্ধ হিংসাজর্জর দিগম্বরী প্রতিবাদ করে মেয়ের বাড়ি ছাড়তে চাইলে নারায়ণী আর মাকে তোয়াজ করে না, মায়ের নীচতা মেনে নেয় না, ‘আমিও এই কথাটাই তোমাকে মুখ ফুটে বলতে পারছিলুম না মা, সত্যি তোমার এখানে থাকা হবে না। তোমার চোখে চোখে আমার এত বড় ছেলে আধখানা হয়ে গেছে। ও দুষ্ট হোক যা হোক, আমার বাড়িতে আমার চোখের সামনে ওকে শাস্তি দিতে আমি কাউকে দেব না।’

কোমল, দুর্বল নারায়ণীর এ জাগরণ অবশ্যই বিস্ময়কর।

নারায়ণী দিনের পর দিন মায়ের কপটতা, ভণ্ডামি, নীচতা আর নীরবে সহ্য করতে রাজি হয়নি, দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ করেছে। তবে সরল রামের মহত্ত্বে এ-জটিলতার একটা মধুর সমাপ্তি ঘটে, ‘না বৌদি, উনি থাকুন, আমি ভাল হয়েছি, আমার সুমতি হয়েছে – আর একটিবার তুমি দেখ।’

‘রামের সুমতি’ মূলত বাৎসল্যের প্রদীপ্ত ভাষ্য, মাতৃত্বের জয়গান। রক্তের নৈকট্য বড় কথা নয়, বড় কথা হৃদয়ের নৈকট্য। আড়াই বছর বয়স থেকে রাম নারায়ণীর কাছে মানুষ, তার চিত্ত জয় করে আপন হয়ে ওঠে। রাম নারায়ণীর এমন একটি অবিচ্ছেদ্য সত্তায় পরিণত হয়েছে, কোনোকিছুই, কোনো বাধা-দুর্ঘটনাই তাতে চিড় ধরাতে পারেনি। রামের দিক থেকেও বৌদির প্রতি আনুগত্য অপরিসীম, ভক্তিভালোবাসা সমস্তকিছুর ঊর্ধ্বে।

এ-গল্পের সীমাবদ্ধতার ওপর এবার দৃষ্টি দেব। রামের দুষ্টামি সবসময় স্বাভাবিক হয়নি, আবার নারায়ণীর ভালোবাসাও সবসময় ভারসাম্য রাখতে পারেনি। উঠোনে রামের একটা বড় বটের চারা লাগানোর ঘটনা বাড়াবাড়ি বলেই মনে হয়। তেরো-চোদ্দ বছরের একটা ছেলের পক্ষে এরকম খাপছাড়া কাজ কোনোভাবে শোভন নয়, সংগতও নয়। রামের শত সারল্যের দোহাই দিয়েও এটাকে স্বাভাবিক বলা যাবে না। কার্ত্তিক-গণেশ নামক পুকুরে দুটো বিশাল রুইমাছের কাহিনিও যথার্থ হয়নি, এতে প্রশ্ন দেখা দেয়। কার্ত্তিক-গণেশ রামের নিজস্ব দুটো মাছ, পুকুরে তাদের চোখে চোখে রাখে, তাদের গতিবিধি, সৌন্দর্য সবাইকে ডেকে ডেকে দেখায়। লেখকের বিবরণ থেকে পাঠকমনে প্রচ্ছন্নভাবে এমন একটা প্রতীতি জন্মায়, মৎস্যযুগলের সঙ্গে রামের বুঝি একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মাছের স্বভাববৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল, তাদের বুঝতে দেরি হয় না, অসম্ভব এ-ব্যাপারটি নিছকই কষ্টকল্পিত। মাছ প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘আদরিণী’ গল্পের হস্তী নয়, কিংবা শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পের গবাদিপশু নয় যে, এটাকে সংগত ও স্বতঃস্ফূর্ত বলে গ্রহণ করা যায়। মাছের সঙ্গে পশুর মতো ব্যক্তিগত নৈকট্য গড়ে ওঠা নিছক একটা উদ্ভট কল্পনা বই কিছু নয়।

নারায়ণীর রামের প্রতি ভালোবাসায় অনেক সময় আতিশয্য পরিলক্ষিত হয়। মাত্র আড়াই বছরের শিশু রামকে সে কোলেপিঠে মানুষ করেছে, ভালোবাসা দিয়েছে, মায়ের মতো তার আবদার-অনাচার-দুরন্তপনা সহ্য করেছে, সুতরাং রামের জন্য তার দুর্বলতা অস্বাভাবিক নয়, অমূলক নয়। তাই বলে রামের মতো একটা ‘বুড়ো খোকাকে’ (তখন তার বয়স তেরো-চোদ্দ) কোলে বসিয়ে আদর করা, ভাত মাখিয়ে নিজ হাতে খাওয়ানো, এসবে ভালোবাসার চেয়ে ভাবোচ্ছ্বাস বেশি ফুটে উঠেছে। আমরা একটা দৃষ্টান্ত দিতে পারি। রাম ভুলক্রমে নারায়ণীর চোখে পেয়ারা ছুড়ে মারে, তাতে নানা হাঙ্গামার পর অনন্যোপায় রাম গৃহত্যাগের তোড়জোড় করে, এ পর্যন্ত যথার্থই হয়েছে। পরে নারায়ণীর শারীরিক অসুস্থতা অগ্রাহ্য করে উঠে এসে বিভিন্ন ব্যঞ্জন নিজ হাতে রান্না করে অনুতপ্ত, অভুক্ত রামকে খাওয়ার জন্য ডেকে এনে কোলে বসানো, আদর করা, চোখের জলে ভেসে যাওয়া, এটা যেন স্বাভাবিক নয়, অতিরঞ্জন। দিগম্বরীর চোখ দিয়ে আমরা দৃশ্যটা দেখতে পাই, ‘… সাজানো থালার সম্মুখে নারায়ণীর কোলের উপর বসিয়া রাম বুকের মধ্যে লুকাইয়া আছে এবং তাহার মাথার ওপর, পিঠের ওপর আর একজনের অশ্রু বৃষ্টির ধারার মত ঝরিয়া পড়িতেছে।’

এতে অপার বাৎসল্য প্রকাশ পেয়েছে, ভাবালুতাও কম প্রকাশ পায়নি। নারায়ণীকে এ-গল্পে আমরা পুনঃপুন অশ্রু বিসর্জন করতে দেখি। এও অনেক সময় শিল্পশোভন ও সংযত, সুন্দর হয়নি, দৃষ্টিকটু হয়েছে।

মেজদিদি শরৎচন্দ্রের অনাত্মীয় দুজন মানুষের মধ্যে নিবিড় আত্মীয়তার মর্মস্পর্শী ইতিবৃত্ত। বিধবা মায়ের মৃত্যুর পর উন্মূল, নিরুপায় কেষ্ট, চোদ্দো বছরের কেষ্ট সৎবোন কাদম্বিনীর বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়। কিন্তু কাদম্বিনী সৎভাইয়ের আগমনকে ভালো চোখে দেখেনি, তার প্রতি কোনো সহানুভূতিও নেই। ফলে বোকা, নির্বোধ কেষ্টর উঠতে বসতে বিড়ম্বনা। সে একটু পেটুক বলে বিদ্রƒপের শিকার হয়, ক্বরিৎকর্মা নয় বলে জোটে নিত্য তিরস্কার। কাদম্বিনীর দুর্ব্যবহার, নির্যাতনের মুখে সে তার মেজো জা হেমাঙ্গিনীর চোখে পড়ে। হেমাঙ্গিনী দয়ালু, স্নেহপরায়ণ, পরের দুঃখে সহজে গলে যায়। কাদম্বিনীর চাপিয়ে দেওয়া একগাদা কাপড় পরিষ্কার করার সময় হেমাঙ্গিনী কেষ্টকে প্রথম আবিষ্কার করে। সাদামাটা, সারল্যভরা নিরীহ কেষ্ট তাকে সহজে প্রভাবিত করে। তার প্রতি দুর্বলতাবশত হেমাঙ্গিনী দুপুরে তাকে পাঁচুগোপালের সঙ্গে খেতে বলে (পাঁচুগোপাল কাদম্বিনীর ছেলে)। হেমাঙ্গিনীর প্রথম আদরযত্নেই লুচি-মিষ্টিসহ বিভিন্ন সুখাদ্য খেয়ে কেষ্ট অনায়াসে তার উষ্ণ হৃদয়কে চিনে ফেলে। ভালোবাসার ধর্ম এমন, এমন তার সম্মোহিনী শক্তি যে,

কুকুর-বিড়ালও তা চিনতে পারে, কেষ্ট তো মানুষ। এরপর দুজন রক্তবন্ধনহীন মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে, তা বেড়ে চলে, অন্তরঙ্গতায় পরে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। হেমাঙ্গিনী কেষ্টর সুখদুঃখে খেয়াল রাখে, কেষ্টও এই অনাত্মীয়, আপনজন মেজদিদিতে অনুরক্ত হয়ে পড়ে। মেজদিদির জ¦র, কেষ্ট লুকিয়ে তাকে দেখে আসে, তার সর্বদা খোঁজ রাখে। জ¦রের মধ্যে খেতে ভালো লাগে বলে অনেক কষ্ট করে ঘুরে ঘুরে দুটো আধপাকা পেয়ারা সংগ্রহ করে সে দিদিকে দেয়। এর জন্য দুপুরে দোকান থেকে সরে থাকার অপরাধে ভাগ্নে পাঁচুগোপালকে দিয়ে তাকে কানমলা দেওয়া হয়, রাতে খাবার বন্ধ রাখা হয়। রাতে অনাহারে থাকার কথা শুনে হেমাঙ্গিনী কষ্ট পায়, সহানুভূতিতে তাকে খেতে দেয়। কিন্তু এটাও হেমাঙ্গিনীর অপরাধ, কোপনস্বভাব কাদম্বিনী এ নিয়ে হেমাঙ্গিনীর সঙ্গে ঝগড়া বাধায়। স্বামী বিপিনও তার বিপক্ষে। হাজার হলেও বউদির ভাই কেষ্ট, কেষ্টকে নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কাদম্বিনীর সঙ্গে বিরোধসৃষ্টির পক্ষে নয় বিপিন। কেষ্ট হেমাঙ্গিনীর আত্মীয় নয়, কেউ নয় – তাই তাকে নিয়ে নাক গলানো বিপিনের পছন্দ নয়। এর আগেও হেমাঙ্গিনী এমনটা করেছে, কাদম্বিনীর রাখালকে নিয়ে দ্বন্দ্ব বাধিয়েছে। কাজেই বিপিন হেমাঙ্গিনীর স্বভাবকেই এজন্য দায়ী করে, তাকে পরের ব্যাপার থেকে বিরত থাকতে বলে। কিন্তু হেমাঙ্গিনী পরদুঃখে চিরকালই দুর্বল, আপনপর নির্বিশেষে বিপন্ন ব্যথিতের পাশে দাঁড়ানো তার স্বভাব। কাজেই বিপিন যখন বলে ‘তোমার এ স্বভাব কবে যাবে’, তখন হেমাঙ্গিনীর জবাব লক্ষ করার মতো, ‘আমার স্বভাব যাবে মরণ হলে, তার আগে নয়। আমি মা – আমার কোলে ছেলেপুলে আছে, মাথার ওপর ভগবান আছেন।’

সেদিন দুপুরে ক্ষুধার কষ্টে কেষ্ট মেজদির কাছে ভাত চায়। প্রথমে হেমাঙ্গিনী রাগেদুঃখে ফিরিয়ে দিলেও পরে ক্ষুধার্ত কেষ্টর শুকনোমুখ দেখে ভাত না দিয়ে পারে না। এ সময় কন্যা উমা ছুটে এসে বাবা আসছে বলায়, কেষ্ট ভাত ফেলে দরজার আড়ালে গিয়ে লুকায়, কারণ কাদম্বিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব এড়াতে আগের দিন সতর্ক বিপিন কেষ্টকে গালমন্দ করে তাড়িয়ে দিয়েছে, আর না আসতে বলেছে। কেষ্ট এজন্য বিপিনের সামনে পড়তে ভয় পাচ্ছে, আড়ালে সরে পড়ছে। ভাতের থালায় কেউ নেই দেখে বিপিনের কৌতূহল হয়, এর কারণ জানতে চায়। কিন্তু হেমাঙ্গিনী সত্যবাদী, সে নির্ভয়ে সত্যকথা বলে দেয় এবং এজন্য বিপিনকে সরাসরি দায়ী না করেও ছাড়ে না, ‘… কেষ্ট পরের ছেলে, সে ত লুকাবেই। পেটের মেয়েটা পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারলে না যে, তার মায়ের কাউকে ডেকে একমুঠো ভাত দেবার অধিকারটুকুও আছে।’

হেমাঙ্গিনীর কথায় ক্ষোভ আছে, সততার সঙ্গে প্রতিবাদের ঝাঁজও কম নেই।

হেমাঙ্গিনীর ফের জ¦র এসেছে, জ¦র ছাড়ছে না, বুকে সর্দি বসে জ¦র আরো গুরুতর আকার নিয়েছে। খাঁটি ভালোবাসার সম্মোহনী শক্তি এত প্রবল যে, তা কিছুতেই হার মানে না, নিঃশেষ হয় না। তাই দেখি, কেষ্টকে তাড়িয়ে দিলেও কেষ্ট স্নেহময়ী, জননীতুল্য মেজদিকে ছাড়তে রাজি নয়, ভয়ে ভয়ে কেষ্ট হেমাঙ্গিনীকে দেখতে আসে, বুকে সর্দি বসার কথা শুনে মুষড়ে পড়ে, মারাত্মক মনে করে কেঁদে ফেলে। মেজদি পুনরায় কেষ্টকে আসতে নিষেধ করলেও সে শোনে না, ব্যাকুল হয়ে মেজদির খবর নেয়। কেষ্টর অন্য বিপদও কম নেই। এখানে বারবার আসায় কাদম্বিনীর অত্যাচার ক্রমেই বেড়ে চলে। তাচ্ছিল্য তো আছেই, অমানুষিকভাবে খাটিয়ে নেওয়া, পেটপুরে খেতে না দেওয়া, এসবের সঙ্গে দৈহিক নির্যাতন, যখন তখন স্বামীকে দিয়ে নির্দয়ভাবে প্রহার করানো। তবু মেজদি হেমাঙ্গিনীর ভালোবাসায় কেষ্ট এমনি মুগ্ধ ও অভিভূত যে, তাকে ছাড়তে সম্মত নয়। শুধু কি তাই? হেমাঙ্গিনীকে ভালো করার চেষ্টাও তার কম নয়। জ¦র ছাড়ছে না দেখে কেষ্ট তাদের দেশে গিয়ে বিশালাক্ষী দেবীর পূজা দিয়ে প্রসাদ এনে মেজদিকে খাওয়াতে চায়। নিজের টাকা নেই, আদায় করা নবীনের টাকা থেকে তিনটি টাকা ভেঙে সে টাকায় দেবীর পূজা দেয় এবং তার প্রসাদ, ফুল, বেলপাতা, সন্দেশ নিয়ে আসে। কিন্তু এতে উল্টো ফল হয়, সে টাকা চুরির অপবাদে পড়ে, নির্মমভাবে আবার নবীনের হাতে প্রহৃত হয়। এই অনভিপ্রেত টাকার বিষয় নিয়ে বিদ্বেষী, চক্ষুলজ্জাহীন কাদম্বিনী হেমাঙ্গিনীর সঙ্গে ঝগড়া বাধায় এবং কেষ্টকে চুরি করতে প্রলুব্ধ করার জন্য হেমাঙ্গিনীকে দায়ী করে। কিন্তু হেমাঙ্গিনী সত্যবাদী, হেমাঙ্গিনী বলিষ্ঠ চরিত্রের নারী ও নির্ভীক, এই মিথ্যে অপবাদ নীরবে সহ্য করে না, কঠোর প্রতিবাদ করে, কাদম্বিনীর স্বরূপ সবার সামনে উন্মোচিত করে, ‘তুমি এতবড় চামার যে, তোমার সঙ্গে কথা কইতেও আমার ঘৃণা বোধ হয়। তুমি এতবড় বেহায়া মেয়েমানুষ যে, ঐ ছোড়াটাকে ভাই বলেও পরিচয় দিচ্ছ। মানুষ জানোয়ার পুষলে তাকেও পেট ভরে খেতে দেয়, কিন্তু ঐ হতভাগাটাকে দিয়ে যত রকমের ছোট কাজ করিয়ে নিয়েও তোমরা তাকে আজ পর্যন্ত একদিন পেটভরে খেতে দাও না।’

হেমাঙ্গিনীর কেউ না হয়েও গোবেচারা কেষ্ট হেমাঙ্গিনীর আপন হয়ে গেল।

পরদুঃখে দুর্বল হেমাঙ্গিনী কেষ্টর ভোগান্তি সইতে পারেনি, কেষ্টকে হৃদয়ের কাছে টেনে নিয়েছে। মিথ্যে চুরির দুর্নামে কেষ্টর প্রহারকে মেনে নিতে পারেনি হেমাঙ্গিনী, ভেঙে পড়েছে, অসুস্থ হয়ে পুনরায় জ¦রে বেঁহুশ হয়েছে। আর স্বামী বিপিন বৌদি কাদম্বিনীর কথায় প্ররোচিত হয়ে সে অবস্থায় স্ত্রীকে শাসন করতে আসে, কেষ্টর ব্যাপার থেকে নিবৃত্ত থাকতে বলতে চায়, কিন্তু স্ত্রীর অসুস্থাবস্থা দেখে উল্টো উদ্বিগ্ন হয়, নির্বাক হয়ে যায়। হেমাঙ্গিনী সে সুযোগে স্বামীকে মিনতি করে বলে, ‘কেষ্টকে আশ্রয় দাও, নইলে এ জ¦র আমার সারবে না। মা দুর্গা কিছুতেই আমাকে মাফ করবেন না।’

দুর্বল বিপিন (বিপিন স্ত্রীকে খুব ভালোবাসত) তখনকার মতো কথা দিলেও পরে কথা রাখে না। পরে অকথ্য প্রহারে কেষ্টর প্রচণ্ড জ¦র আসে, বেসামাল হয়ে পড়ে। হেমাঙ্গিনী নিজেকে ধরে রাখতে পারে না, কেষ্টকে আশ্রয় দিতে উদ্যত হয়। কিন্তু বিপিন দাদা-বউদির ভয়ে বেঁকে বসে। অসহায়, আশ্রয়চ্যুত কেষ্টর জন্য হেমাঙ্গিনী ততদিনে এত দিশেহারা, উতলা হয়েছে যে, কেষ্টর জন্য সকল ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত হয়। তাই তো গরুর গাড়ি ভাড়া করে হেমাঙ্গিনী বিপিনকে অগ্রাহ্য করে কেষ্টকে নিয়ে স্বামীগৃহ ত্যাগ করে, কেষ্টকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে চায়।

গল্পের উপসংহার বেশ চমকপ্রদ। বিপিন স্ত্রীর এ বিদ্রোহ অবগত হয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে, ঘর্মাক্ত দেহে আরক্ত মুখে হেমাঙ্গিনীর চলন্ত গাড়ি থামায়, নত হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করে। শুধু তাই নয়, বিপিন ‘… কেষ্টর ডানহাতটা ধরিয়া ফেলিয়া বলিলেন কেষ্ট, তুই তোর মেজদিকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আয় ভাই, শপথ করছি, আমি বেঁচে থাকতে তোদের দুই ভাইবোনকে আজ থেকে কেউ পৃথক করতে পারবে না।’

রামের সুমতির সঙ্গে মেজদিদি গল্পের সাদৃশ্য সহজলক্ষ। দুটো গল্পই কমবেশি পরকে আপন করার, মনুষ্যত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার গল্প। মেজদিদিতে কেষ্ট রামের চেয়ে আরো দূরের মানুষ, প্রায় আত্মীয়সম্বন্ধবর্জিত ও বন্ধনহীন। হেমাঙ্গিনীর কেষ্টর জন্য এখানে যে আকুতি, অস্থিরতা দেখি, তাতে নারায়ণীর মতো কর্তব্যপালনের তাগিদ তেমন নেই। আছে একান্ত হৃদয়গত ব্যাকুলতা, মানুষের প্রতি মানুষের চিরকালীন ভালোবাসার প্রকাশ। অবশ্য সমস্যা হলো, এ-গল্পেও শরৎচন্দ্রের স্বভাবগত ভাবোচ্ছ্বাস আছে, যথেষ্টই আছে। হেমাঙ্গিনীর বুকে সর্দি বসার কথা শুনে কেষ্টর বিচলিত হওয়া, কান্নায় ভেঙে পড়া, আত্মসংবরণ করতে না পারা, এর স্বাভাবিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কেষ্টর অন্য একটা আচরণও দৃষ্টিকটু হয়েছে। কাদম্বিনীর মুখের উপর অন্যায়ের প্রতিবাদে ‘আমার মেজদি থাকতে কাউকে ভয় করিনে’ – কেষ্টর এ-জাতীয় বক্তব্য তার নিরীহ, নির্বিরোধ চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। অন্যখানেও আমাদের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। দুর্বল মুহূর্তে দুঃখকষ্টে চোখের জল ফেলা শরৎচন্দ্রের নারীদের একটি পরিচিত প্রবণতা। উক্ত গল্পে কেষ্ট-হেমাঙ্গিনীর ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। কিন্তু অশ্রুবিসর্জন সবসময় অনিবার্য বলে মনে হয় না। হেমাঙ্গিনীর ক্ষেত্রে এ-কথা আরো বেশি সত্য, অনেকসময় মনে হয় অনাকাক্সিক্ষত। হেমাঙ্গিনী কেষ্টকে ভালোবাসে, তার জন্য গভীরভাব অনুভব করে, উদ্বিগ্ন হয়, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। আপত্তি অনিয়ন্ত্রিত আকুলতার প্রকাশে। হেমাঙ্গিনী নারীসুলভ কোমলতায় মাঝে মাঝে এত কাতর হয়, এত আত্মহারা হয় যে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সংযম হারিয়ে ফেলে, শিল্পের স্বাভাবিকতা নষ্ট করে। গল্পের শেষ ঘটনাটিও এভাবে যথাযথ হয়নি।

এ-ভাবোচ্ছ্বাস আমাদের পীড়িত করে, বিরক্ত করে। কেষ্টকে নিয়ে হেমাঙ্গিনীর গরুর গাড়িতে যাত্রা, তা শুনে বিপর্যস্ত বিপিনের দৌড়ে চলে আসা, ঠেকাতে গতিরোধ করা, ভেঙে পড়া – এ-দৃশ্য বাস্তবতার চেয়ে নাটকীয়তায় বেশি আক্রান্ত হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে শিল্পরস ক্ষুণ্ন হয়েছে।

‘বিন্দুর ছেলে’ নারীর বুভুক্ষু মাতৃত্বের ও গভীর অপত্যস্নেহের শৈল্পিক দলিল। যাদবের কনিষ্ঠ বৈমাত্রেয় ভাই মাধবের স্ত্রী বিন্দু। দরিদ্র যাদব জমিদারবাড়িতে গোমস্তাগিরি করে কায়ক্লেশে মাধবকে সুশিক্ষিত করেছে। মাধব বর্তমানে ওকালতি পেশায় নিযুক্ত। শিক্ষার বদৌলতে মাধবকে ধনী জমিদারের একমাত্র রূপসী কন্যা বিন্দুর সঙ্গে দশ হাজার টাকার যৌতুকে বিবাহ দেওয়া হয়েছে। বিন্দু নিঃসন্তান, আঠারো-উনিশ বছর বয়সেও মাতৃত্বের স্বাদ পায়নি। বিন্দু স্বভাবত একটু দেমাগি, মেজাজে অল্পবিস্তর তিরিক্ষিভাবও আছে। মনের যে অভাবের কারণে হোক, বিন্দুর ফিটের ব্যামো, যখন-তখন হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে মূর্ছা যায়। ফলে তাকে নিয়ে বাড়িতে দুর্ভাবনা। একদিন বিন্দুকে একা চুপচাপ ও চিন্তামগ্ন দেখে যাদবের স্ত্রী অন্নপূর্ণা চিন্তিত হয়, কি মনে করে তার দেড় বছরের ছেলে অমূল্যকে এনে বিন্দুর কোলে ফেলে দেয়। বন্ধ্যা বিন্দুর ফিট ঠেকাতে সরল অন্নপূর্ণা সহজাত বুদ্ধিতে এটা করে, কিন্তু ফল হয় হাতে হাতে। বিন্দু সেই যে অমূল্যকে বুকে তুলে নিয়ে নিজ ঘরে গেল, অমূল্যকে নিজ সন্তানের মতো ভালোবেসে মানুষ করে চলল, সেই থেকে তার তৃষিত, ঘুমন্ত মাতৃত্বও হয়তো শান্ত হলো, ফিট থেকে রেহাই পেল। এখন থেকে বিন্দুর একমাত্র কাজ অমূল্য – তাকে খাওয়ানো, আদরযত্ন করা, পোশাক পরানো, ঘুম পাড়ানো। সে মাতৃস্নেহ এত অতলস্পর্শী, অনির্বচনীয় যে, অমূল্য কাকিমাকে মা ও মাকে দিদি বলে সম্বোধন করতে লাগল। পাঁচ বছর বয়সে অমূল্যকে স্কুলে পাঠানো হলো, কিন্তু অমূল্যকে নিয়ে বিন্দুর পদে পদে মাথাব্যথা, প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা এমনি তীব্র যে, স্কুলে অমূল্যকে কোনো বেয়াড়া ছেলে প্রহার করে কি চোখে কলমের খোঁচা মারে, সর্বদা এই ভয়। এসব উদ্ভট কল্পনা থেকে গঙ্গাপণ্ডিতের পাঠশালা বাইরে থেকে উঠিয়ে এনে বাড়ির মধ্যে স্থানান্তর করা হয়। এর মধ্যে অন্নপূর্ণার সুপারি কাটার জাঁতি নাড়াচাড়া করতে গিয়ে অমূল্যর হাত কেটে যায়। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড, অতি স্পর্শকাতর বিন্দু এজন্য অন্নপূর্ণাকে দায়ী করে, যেখানে-সেখানে জাঁতি রাখার জন্য মৃদু তিরস্কার করে। এতে অন্নপূর্ণার উপলব্ধি কিন্তু সংগত, ‘… কি আদুরে ছেলেই কচ্ছিস ছোটবউ, শেষে টের পাবি।’

নিজের গর্ভে সন্তান ধারণ করতে পারেনি, কিন্তু জায়ের সন্তান নিয়েই বিন্দুর মাতৃসত্তা উদগ্রভাবে জেগে উঠেছে, তাকে পূর্ণতাদানে উন্মুখ, উন্মত্ত হয়েছে। অমূল্যর কল্যাণভাবনাই তার দিনরাতের ভাবনা, অমূল্যকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলাই তার একমাত্র, একাগ্র সাধনা। অমূল্যর মানসগঠন, অমূল্যর শিষ্টাচার গড়ে তোলা ও ভদ্রতা শেখানো, কোনোকিছুতে তার অবহেলা নেই। কিন্তু বাড়িতে নরেনের আগমন অশনিসংকেত নিয়ে এলো। নরেন যাদবের পিসতুতো বোন এলোকেশীর ছেলে,  ইঁচড়েপাকা, অশিষ্ট ও দুর্বিনীত প্রকৃতির ছেলে। যেহেতু বাড়িতে অমূল্যর একমাত্র সঙ্গী নরেন, তার সঙ্গ পেয়ে জ্যেষ্ঠ নরেনকে সে নানাভাবে অনুসরণ করতে লাগল। সে নরেনের মতো অদ্ভুত করে চুল ছাঁটতে চায়, তার মতো চলতে চায়। বাড়িতে পুরনো নাপিত কৈলাস এসেছে। তাকে ধরে সে নরেনের সেই আশ্চর্য চুলের ছাঁট বোঝায়, সেভাবে তার চুল ছেঁটে দিতে বলে। বিন্দুর হস্তক্ষেপে যদিও সে ছাঁট হয় না, অমূল্য তাতে যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়। অবোধ, একান্ত ছোট ছেলে অমূল্যর এ ফ্যাশনপ্রিয়তা বিন্দুকে চিন্তিত করে তোলে। বিন্দু বুদ্ধিমতী, দূরদর্শী, এর অশুভ দিক তার চোখ এড়ায় না। নরেনের কুপরামর্শে অমূল্য জমিদারবাড়িতে যাত্রা দেখতে যায়, বিন্দু বুঝেও অমূল্যকে ঠেকাতে পারে না। কিন্তু বিন্দু সবচেয়ে অবাক হয়, অমূল্যর মুখে এমন কথা শুনে। সন্ধেয় সেখানে নাকি খেমটা নাচ হবে এবং বিন্দুর মতো সুন্দর চেহারার একজন সে-নাচ নাচবে। এটা যে নরেনের শিক্ষা, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবু সে-নোংরামি থেকে অমূল্যকে নিবৃত্ত করা যায় না। বিন্দুর ভয়ে গোপনে অন্নপূর্ণাকে ধরে অমূল্য নরেনের সঙ্গে নোংরা নাচ দেখতে যায়। আবার ফিরে এসেও বিন্দুর বকুনির ভয়ে লুকিয়ে বাবা যাদবের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে। এটা তো স্বাভাবিক নয়, কারণ অমূল্য বরাবরই রাতে বিন্দুর পাশে শুয়ে ঘুমায়। ছোট্ট সরল বালক অমূল্য নরেনের পাল্লায় পড়ে যে বিপথে যাচ্ছে, গোল্লায় যাচ্ছে, তা বুঝে দুর্ভাবনায় দারুণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে বিন্দু। অবস্থা আরো খারাপের দিকে যায়। একদিন বিন্দু আবিষ্কার করে, অমূল্যর ময়লা জামার পকেটে দুটো পোড়া সিগারেটের টুকরো। অর্থাৎ সেয়ানা, অকালপক্ব নরেন অমূল্যকে সিগারেটেও হাতেখড়ি দিয়েছে। বিন্দু অমূল্যর ভবিষ্যৎ ভেবে তাকে ধ্বংস থেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে, নরেনকে বাড়ি থেকে বিদায় করতে চায়। কিন্তু এতে বিন্দু একান্তই একা; সরল, নির্বোধ অন্নপূর্ণার সহযোগিতা পায় না। বিন্দু খুব অসহায় বোধ করে। অন্নপূর্ণা পুরনো ধাঁচের মানুষ, বিন্দুর মতো অন্তর্দৃষ্টি নেই, অমূল্যর বিপদের ঝুঁকি আদৌ উপলব্ধি করতে পারে না। স্বামী যাদবের পিসতুতো দরিদ্র বোনকে সে বিতাড়িত করবেই বা কি করে? অমূল্যর চিন্তায় বিন্দু মহাসংকটে পড়ে, সমাধান খুঁজে পায় না।

অন্যদিক দিয়ে ঘটনা দ্রুত জট পাকিয়ে ওঠে। অবোধ শিশুকিশোররা তো স্বভাবগতভাবে অনুকরণপ্রিয়, কাছের কাউকে সঠিক ভেবে অনুসরণ করে। নরেনের প্ররোচনায় একদিন অমূল্য নরেনসহ আরো কটা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এক উড়েমালির বাগানের অসময়ের আম পাড়ে, গাছ ভাঙে, মালিকে মারধর পর্যন্ত করে। নালিশ হলো, হেডমাস্টারের কাছে বিচারে দশ টাকা জরিমানা গুনতে হলো তাদের। বলা বাহুল্য, সে-টাকা অমূল্যকে জোগাতে হলো। অমূল্য বিন্দুর ভয়ে তাকে না জানিয়ে অন্নপূর্ণাকে ধরে আবদার করে টাকাটা নিল এবং অন্নপূর্ণাকে সত্য না লুকিয়েই নিল। স্নেহপরায়ণা মা, নরম মানুষ অন্নপূর্ণা একমাত্র সন্তানের আবদার অগ্রাহ্য করতে পারল না। বিন্দু গৃহশিক্ষকের কাছে ঘটনা অবগত হয়ে অনুমান করল, অন্নপূর্ণা সম্ভবত এ-টাকা জুগিয়েছে।

অন্নপূর্ণাকে ধরে বসতে সব ফাঁস হয়ে গেল। অমূল্যকে নিয়ে এর মধ্যে মনোমালিন্য হয়ে আছে, দুজনের কথাবার্তা বন্ধ, তার ওপর এই কাণ্ডজ্ঞানহীন বোকামি। বিন্দু হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রাগে, দুঃখে, অমূল্যর মঙ্গলচিন্তায় তার আর সংযম থাকে না, অন্নপূর্ণার প্রতি কটূক্তিতে, তিরস্কারে ফেটে পড়ে। অন্নপূর্ণা নিজের ছেলেকেও দুটো টাকা দিতে পারবো না বলায় বিন্দু আরো অশালীন হয়, ‘তাইবা দেবে কেন, নষ্ট করবার টাকা আসে কোথা থেকে?’ কিংবা আরো নোংরাভাবে, ‘… কার পয়সা খরচ কর সেটা দেখতে পাওনা? কার রোজগারে খাচ্ছ-পরছ সেটা দেখতে পাওনা?’

গোবেচারা, ভালোমানুষ অন্নপূর্ণাও ক্ষণিকের ক্রোধে অসংযত হয়ে পড়ে, অশিষ্ট বাক্য প্রয়োগ করে। বিন্দু তো আগেই নিয়ন্ত্রণহীন, ‘হঠাৎ কথাটা বলিয়া ফেলিয়া বিন্দু স্তব্ধ হইয়া থামিল।’ কিন্তু বাণ তো নিক্ষেপ করা হয়ে গেছে, পরিণতি যা হবার তাই হবে। লজ্জায়, অপমানে অন্নপূর্ণা ভেঙে পড়ল, ‘বলিতে বলিতেই তাহার দুইচোখ দিয়া দরদর করিয়া জল ঝরিয়া পড়িল।’ শপথ করে বসল, দেবর-জায়ের ভাত আর না খাবার।

যাদব আগে জমিদারবাড়িতে চাকরি করতো, ইদানীং ছেড়ে দিয়ে মাধবের সঙ্গে সংসার দেখাশোনা করছিল। কিন্তু স্ত্রী অন্নপূর্ণার অশ্রুসিক্ত দোহাই শুনে, (‘আজ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে এই শপথ কচ্চি, ওদের ভাত খাবার আগে যেন আমাকে ব্যাটার মাথা খেতে হয়’।) তারও নবজন্ম হলো, সেই যাদবকে আবার অন্নসংস্থানের জন্য কয়েক মাইল দূরের কাছারিতে মাত্র বার টাকা মাইনের কাজ নিতে হলো।

ইতোমধ্যে মাধবের টাকায় আলাদা বড় বাড়ি তৈরি হলো। সেখানে পূজা দিয়ে জাঁকজমকের সঙ্গে উঠবে বিন্দুরা, তারই চলছে সমারোহ। দিনমত মাধব ও বিন্দুর আত্মীয়স্বজন এসে পড়ল, নতুন বাড়ি সরগরম। কিন্তু বিন্দুর মনে শান্তি নেই, হতাশা – অন্নপূর্ণা আসেনি। বিন্দু খিটখিটে হয়ে উঠেছে, প্রতিটা কাজে বিরক্ত, নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না, অন্নপূর্ণাকে ছাড়া যে পূজা-ভোজ সুচারুরূপে কিছুই হবে না। অবস্থা বেগতিক দেখে মাধব নিজে গিয়ে বৌদিকে নিয়ে এলো। অন্নপূর্ণা এলো বটে, কিন্তু সব গুছিয়ে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে জলস্পর্শ না করে চলে গেল।

অনুষ্ঠান হলেও বিন্দুর স্বস্তি নেই। বিন্দুর মন খারাপ দেখে বিন্দুর মা বিন্দুকে নিয়ে যেতে চাইল, মাধব অনুমতিও দিলো, বিন্দু যেতে নারাজ। স্বামীর হুকুম নয়, বিন্দু পরোক্ষভাবে অন্নপূর্ণার কথা উল্লেখ করছে। যত মান-অভিমানই থাক, অন্নপূর্ণাই অভিভাবক, মনে মনে তাকে পথনির্দেশক মনে করে। ‘… আর যাই করি মা, তাকে না বলে বাড়ি ছেড়ে যেতে পারব না।’ বিন্দুর আত্মস্বীকৃতি স্পষ্ট, এতে দ্বন্দ্ব নেই, অন্নপূর্ণাই তার অভিভাবক। বিন্দু এত বিভ্রান্ত, এত আত্মগ্লানিতে ভুগছে যে, অস্থির হয়ে দিশা খুঁজে পাচ্ছে না। বাড়ির কাজের মেয়ের সঙ্গে, পাচিকার সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ করছে, সাক্ষী মানছে, কখনো নিজের পক্ষে সাফাই গাইছে। সত্যি বলতে, এভাবে বিন্দু তার মনের অসহ্য ভার আর বেদনা লাঘব করতে চাইছে। আরো লক্ষণীয়, এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে পুত্রসম অমূল্য, যাকে

ভৃত্য পাঠিয়ে ডেকেও অনুষ্ঠানে আনা যায়নি। অমূল্য তার গর্ভজাত সন্তান নয় সত্য, কিন্তু যাকে দেড় বছর বয়স থেকে ভালোবেসে বড় করেছে, মাতৃস্নেহ উজাড় করে দিয়েছে, তাকে দূরে রাখবে কী করে? বিন্দুর যন্ত্রণা সেখানেই সবচেয়ে তীব্র। অমূল্যর মা বিন্দু অমূল্যকেই পেতে চায়। সব তিতিক্ষার মাঝে অমূল্যই তার লক্ষ্য।

বিন্দু নানান মানসিক জ¦ালায় জর্জরিত। যাদবের এই বয়সে চাকরি নেওয়ার কথা শুনে বিন্দু মুষড়ে পড়েছে, স্বামীকে এর প্রতিকার করতে বলছে। মাধবের কাছে যাদবের কষ্টের কথা শুনে সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না। ভগ্ন, ব্যথিত বিন্দু স্বামীকে কাকুতি-মিনতি করছে, পায়ে ধরে একটা ব্যবস্থা করতে বলেছে। কিন্তু বিন্দুই যেহেতু অন্নপূর্ণার হেনস্তার জন্য দায়ী, সুতরাং বিন্দুরই অন্নপূর্ণার কাছে যাওয়া উচিত বলে মাধব মনে করে। বিন্দু এতে আরো সংকটে পড়ে যায়।

বিন্দুর উপর আরোা দুঃখযন্ত্রণা আসে। অমূল্য বিন্দুর কাছে নেই বটে, তবে প্রতিদিন তাদের নতুন বাড়ির সামনে দিয়ে ছাতি ফুটিয়ে স্কুলে যায়-আসে, বিন্দু আড়াল থেকে তাকে দেখে দেখে হৃদয় জুড়ায়। কিন্তু দুদিন অমূল্যর দেখা নেই, ছাদ থেকে উদগ্রীব হয়ে অমূল্যকে খুঁজে খুঁজে সে হয়রান। পরে নরেনের কাছে রহস্য জানতে পারে। থার্ডমাস্টার অমূল্যকে আচ্ছামতো কান মলে দিয়েছে, সেই লজ্জায় অমূল্য আর এ-পথ মাড়ায় না, ঘুরপথে স্কুলে যায়। এতে কলকাঠি নেড়েছে নরেনের মা এলোকেশী। বিষয়টা এরকম – চাকর হেবো প্রতিদিন নরেনের টিফিন নিয়ে যায়, অমূল্য ছুটে এসে নরেনের কাছে কী টিফিন এনেছে, জানতে চায়। এটা এলোকেশী জানতে পারে, তার কাছে এর ব্যাখ্যা হলো, নরেনের টিফিনে নজর দেওয়া, চোখ দেওয়া। সে-ঘটনাটা হেবোকে দিয়ে থার্ডমাস্টারের কানে ওঠায়। থার্ডমাস্টার শাস্তিস্বরূপ অমূল্যর কান ভালোমতো মলে দেয়। বিন্দু এতেও ভেঙে পড়ে। বিন্দু আরো জানলো, যাদবের অক্ষমতার জন্য অমূল্য সামান্য ছোলাভাজা দিয়ে টিফিন সারে। এ-খবরে বিন্দু দিশাহারা হয়ে পড়ে। সে অমূল্যর কোনোকিছুতে অভাব রাখেনি, বরং সবকিছুতে ছিল প্রাচুর্য। দামি দামি পোশাক, ভালো ভালো অপরিমেয় খাদ্য, নিজ হাতে আদরযত্ন, নিজে সবকিছুর দেখাশোনা করা – বিন্দুর স্নেহধন্য, আদুরে সেই অমূল্যর আজ এই দুর্দশা, সামান্য ছোলাভাজা দিয়ে টিফিন। ‘বিন্দুর চোখের উপর ঘরবাড়ি সমস্ত সংসার দুলিতে লাগিল, সে সেইখানে বসিয়া পড়িয়া বলিল, নরেন, তুই যা।’ বিন্দু চোখে অন্ধকার দেখে, অনন্যোপায় হয়ে স্বামী মাধবের দ্বারস্থ হয়, একটা বিহিত করতে, অন্নপূর্ণার সঙ্গে দ্বন্দ্ব চুকিয়ে ফেলতে উঠেপড়ে লাগে। অমূল্যর জন্য হার মানে, স্বামীর কাছে অমøানবদনে দোষ স্বীকার করে, ‘আমি ত বলছি, আমার দোষ হয়েছে – আমি ঘাট মানছি, তুমি তাদের বলগে।’ কিন্তু মাধব অনড়, মধ্যস্থতা করতে রাজি হয় না। বিপর্যস্ত, অনুশোচনাদগ্ধ বিন্দু পথ পায় না। এর মধ্যে একদিন বিন্দুর পিতা অসুস্থ হয়ে পড়লে বিন্দুকে পিতৃগৃহে যেতে হয়। বিন্দুর কোনোকিছুতে শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। পিতৃগৃহে গমনকালে বামুনঠাকুরণের কাছে তার প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়, ‘আশীর্বাদ কর, যেন আর ফিরতে না হয়, এই যাওয়াই যেন আমার শেষ যাওয়া হয়।’

এরপর বিন্দু দ্রুত আত্মনিধনের পথে এগিয়ে যায়। ঠিকমতো আহার করে না, ঠিকভাবে চলে না, সবকিছুতে অবহেলা, অনীহা, সবখানে বিমুখতা। স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে, মন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়, শেষমেশ খাওয়াও একসময় ছেড়ে দেয়। দুঃখে, কষ্টে, অভিমানে অমূল্যর অভাবে আত্মঘাতীই হতে চায় বিন্দু। যদিও দুঃসংবাদ পেয়ে মাধবের সঙ্গে যাদব ও অন্নপূর্ণাও অমূল্যকে নিয়ে শেষমুহূর্তে হাজির হয়, বিন্দু অন্নপূর্ণার হাতে খেতে সম্মত হয়। এখানেও সবচেয়ে বড় কথা অমূল্য, বলা নিষ্প্রয়োজন, শেষ কথাও অমূল্য, ‘… অমূল্যকে আমার কাছে শুইয়ে দিয়ে (অমূল্য তখন ঘুমন্ত) তোমরা সবাই বাইরে গিয়ে বিশ্রাম করগে। আর ভয় নেই, আমি মরব না।’

বিন্দুর ছেলে বিন্দুর কাছে ফিরে এসেছে, বিন্দু আর মরতে চায় না।

‘বিন্দুর ছেলে’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অসাধারণ সৃষ্টি, সন্দেহ নেই। মাতৃত্বই গল্পটির প্রধান সম্পদ। গর্ভজাত হোক কিংবা অন্যের সন্তানই হোক, মাতৃত্বের তথা চিরায়ত নারীপ্রবৃত্তির পূর্ণতাদানই বড় কথা, ক্ষুধিত মাতৃস্নেহের নিবৃত্তিই আসল বিষয়। অমূল্য নিজের ছেলে কি পরের ছেলে এটা কোনো প্রসঙ্গ নয়, অমূল্য ঘটনাক্রমে বিন্দুর ছেলে হয়ে গেছে, বিন্দু তার মা  – আর সব এখানে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। অমূল্যর বিচ্ছেদ তাই বিন্দু মেনে নেবে কী করে? অমূল্যর অনুপস্থিতিতে বিন্দুর জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে, হাহাকারে বিপর্যস্ত হয়েছে। শিল্পী শরৎচন্দ্র বিন্দুর এসব মনোবেদনার ক্রমাভিব্যক্তি সফলভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

অবশ্য গল্পটিতে কতিপয় সীমাবদ্ধতাও আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না। অমূল্যর কল্যাণচিন্তায় নিবিষ্ট বিন্দুর সাময়িক স্খলন – অন্নপূর্ণাকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ ও পরিণামে বিচ্ছেদ, এ পর্যন্ত গল্পের ছন্দে ছেদ পড়েনি। কিন্তু এতে যাদবের পৃথক হওয়া, কষ্টকর চাকরি নেওয়া এবং তাতে বিমুখ মাধবের বিরতিহীন বিস্ময়কর নীরবতা, একে স্বাভাবিক বলা যায় না। বড়ভাই যাদবের প্রতি মাধবের  যে সীমাহীন ভক্তিশ্রদ্ধা, অবর্ণনীয় কৃতজ্ঞতা, সব সত্ত্বেও মাধব কেন অনাহূতভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে, বরফ গলানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না, নিতে পারে না, তা অবোধগম্য। আবার অপমানিত, ক্রুদ্ধ অন্নপূর্ণার কারণে যাদব যে-পথে অগ্রসর হয়, আত্মনিগ্রহ বেছে নেয়, তাও বোধগম্য নয়। এতবড় বিপর্যয়েও যাদব বা মাধব কেন কোনো পদক্ষেপ নিল না, পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করল না, তাও ধোঁয়াটে হয়ে থাকে। আর সর্বোপরি, ছিন্নভিন্ন বিন্দু নিজের কাছে পরাজিত হয়ে আত্মহননের যে পথ বেছে নেয়, অনাহার ও অন্তর্যাতনার মধ্য দিয়ে নিজেই নিজেকে শেষ করতে চায়, তাতে কিছুটা অস্বাভাবিকতা আছে। অন্যদিকে, বিন্দুর এই হৃদয়বিদারী, বিধ্বংসী রুগ্ণতায় একমাত্র কন্যার জন্য বিন্দুর মায়ের কেন কোনো হাহুতাশ নেই, কাতরতা নেই, এটাও প্রশ্ন জাগায়।

এ-বাস্তবতায় আমরা অমূল্যকেও বিচার করতে পারি। বিন্দুর জন্য অমূল্যর বিকারহীন নীরবতা আমাদের আহত করে। দেড় বছর বয়স থেকে অমূল্য বিন্দুর কোলে মানুষ, তাকে মা বলে, আপন মায়ের চেয়ে বেশি আপন বলে জানে। তার ছায়ায়ই বড় হয়, আদর-ভালোবাসায় বেড়ে ওঠে, পরিপুষ্ট হয়। সেই অমূল্য বিন্দু-অন্নপূর্ণার ঝগড়ার কারণে স্থায়ীভাবে অন্নপূর্ণার কাছে চলে যাবে, বিন্দুকে একদম ভুলে যাবে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে – মানবিক বিচারে তা বিশ্বাসযোগ্য হওয়া কঠিন। অমূল্যর যে-বয়স, যে-বয়সে আবেগ ও সারল্য নিত্যসঙ্গী, সে-বয়সে অমূল্য হৃদয় দিয়ে মানুষ ও পৃথিবীকে দেখবে, হৃদয়ের ভালোবাসাকে সবার ওপরে স্থান দেবে। বুদ্ধি সে-বয়সের চালক হতে পারে না। তাই অন্নপূর্ণার তিক্ততা ও মর্মান্তিক বাস্তবতা অমূল্যর মধ্যে পরিপূর্ণভাবে সঞ্চারিত হওয়া সম্ভব নয়, হওয়ার কথা নয়। তথাপি বিচ্ছেদের পর, অমূল্য ছোটমা বিন্দুর জন্য কোনো আকুলতা দেখাবে না, বিন্দুকে অনুভব করবে না, তা কী করে সম্ভব? অথচ অমূল্য তাই করেছে, নির্দয়ভাবে নিশ্চুপ থেকেছে, সব এড়িয়ে গিয়েছে। নতুন বাড়ির সামনে দিয়ে স্কুলে গেলেও ভুলেও কখনো বিন্দুর কাছে আসেনি, তার জন্য দুর্বল হয়নি, এমনকি অনুষ্ঠানের দিনও বিন্দু নিজের কথা বলে চাকর পাঠিয়েও ডেকে অমূল্যর সাড়া পায়নি, বাড়িতে আনতে পারেনি, এসব অমূল্যর চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। এগুলো স্পষ্টত পর্যালোচনার দাবি রাখে। এবং গভীর মানবিক দৃষ্টিতে স্পষ্ট, অমূল্যর চরিত্রনির্মাণে এ-দিকটি খুব পীড়াদায়ক। অমূল্য ‘বিন্দুর ছেলে’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র, তাই তার চরিত্রগত সীমাবদ্ধতাকে ছোট করে, নগণ্য করে দেখার অবকাশ নেই।

আমাদের আলোচ্য সর্বশেষ গল্প শরৎচন্দ্রের ‘মামলার ফল’। ‘বিন্দুর ছেলের’ সঙ্গে ‘মামলার ফল’ – এর সাদৃশ্য সহজে চোখে পড়ে। দুটো গল্পই দুজন বন্ধ্যা নারীর সহজাত মাতৃত্বের এক অসাধারণ শিল্পরূপ। মাতৃত্ব যে কেবল রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ নয়, হৃদয়াবেগ ও নৈকট্যই বড় কথা, সম্পর্কের গভীরতাই তার প্রকৃত সঞ্জীবনী শক্তি, নিয়ামক – উভয় গল্প তার সার্থক পরিচয়। নিজের সন্তান না থাকায় দুজনেই আপন জায়ের সন্তান কোলে তুলে নিয়েছে, আপন সন্তানের মতো মানুষ করেছে। বিন্দু জীবিত বড়জা অন্নপূর্ণার ছেলে অমূল্যকে ভালোবেসেছে, ‘মামলার ফলে’ গঙ্গামণি অকালপ্রয়াত ছোটজায়ের একবছরের সন্তান গয়ারামকে বক্ষে স্থান দিয়েছে। কিন্তু দুজন মাতারই মাতৃস্নেহ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, নানা ঝঞ্ঝাটে বিড়ম্বিত। বিন্দু অমূল্যর কল্যাণ কামনায় সর্বতোভাবে নিবেদিত হয়েও সমস্যামুক্ত থাকতে পারেনি, গঙ্গামণি গয়াকে বিপদে স্নেহচ্ছায়ায় রাখতে গিয়ে শত হাঙ্গামায় পড়েছে।

এটা সর্বজনবিদিত যে, শরৎচন্দ্র হৃদয়বাদী লেখক। ‘মামলার ফল’ গল্পেও হৃদয়ের কথা নানাভাবে পুষ্পিত ও সুরভিত হয়েছে। গল্পটির সূচনা অবশ্য পারিবারিক বিবাদ-বিসম্বাদ দিয়ে। শিবু ও শম্ভু সামন্ত – দুই ভাইয়ের কলহ একটা অমীমাংসিত, এজমালি বাঁশঝাড় নিয়ে। শিবুর স্ত্রী গঙ্গামণি ক’টা বাঁশপাতা ছিঁড়তে গিয়ে অপদস্থ হলো, দেবর শম্ভু তার হাত থেকে বাঁশপাতা কেড়ে নিল। শম্ভু এটা করে বেশ খোশমেজাজে মাঠে গেলে খবর পেয়ে এবার শিবুর নাট্যমঞ্চে আগমন। শম্ভুব উদ্দেশে খানিকক্ষণ চিৎকার আস্ফালন করে রাগে জমিদারবাড়িতে নালিশ করতে গেল। ফল দাঁড়াল এই, দু-আঙিনায়ই রান্নাবান্না বন্ধ, দুই জা’ই বিরসবদন, বিক্ষুব্ধ।

কিন্তু এটা গৌরচন্দ্রিকা মাত্র। এ-গল্পের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় গয়া ও গঙ্গামণির সম্পর্কের টানাপোড়েন। গয়া সবে স্কুল থেকে ফিরেছে, ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। নিজবাড়িতে বিমাতার খাবার বন্দ্যোবস্ত না দেখে জ্যাঠাইমা গঙ্গামণির দুয়ারে এসে জুটেছে। কিন্তু অবস্থা তথৈবচ, জ্যাঠাইমা গঙ্গামণিও হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে, গয়া রাগে জ¦লে উঠল। গয়া এমনিতে বদমেজাজি, দুরন্ত প্রকৃতির, লেখকের ভাষায়, ‘… এই বয়সেই ক্রোধ এবং ভাষাটি তাহার বাপকেও ডিঙাইয়া গিয়াছিল।’ তার ওপর, ক্ষুধায় তার মাথা ঠিক নেই, হিতাহিত জ্ঞান নেই। সরাসরি জ্যাঠাইমার কাছে ভাত চেয়ে এবং জবাব না পেয়ে মাটিতে পা ঠুকে তর্জনগর্জন করতে থাকে। গঙ্গামণি এমনিতে বিগড়ে ছিল, গয়াকে হাঙ্গামা না করে সৎমার কাছে যেতে বলে। সৎমার সঙ্গে তার কোনোকালে সদ্ভাব ছিল না, ওদিকে জননীসম গঙ্গামণির কাছে দাবি করার অধিকার তার ষোলো আনা। গয়া আরো ক্ষেপে যায়, তৎক্ষণাৎ ভাত না দিলে গঙ্গামণির সব হাঁড়িকুড়ি ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেয়। আর তা করতে একটা চ্যালাকাঠ পর্যন্ত উঠিয়ে এগোতে থাকে। অস্থির গয়ার হঠাৎ কি মনে পড়ায় বিরত হয় এবং গঙ্গামণিকে সাফ জানিয়ে দেয়, ভাত না দিলে নদীর ঘাটে পূজা উপলক্ষে বামুনের মেয়েদের বিলানো মুড়িমুড়কি নিয়ে সে খাবে। তখনি গোল বাঁধল, ‘গঙ্গামণির তৎক্ষণাৎ মনে পড়িয়া গেল, আজ অরণ্যষষ্ঠী এবং এক মুহূর্তে তাহার মেজাজ কড়ি হইতে কোমলে নামিয়া আসিল।’ গঙ্গামণি তখন কিন্তু গয়ার বেপরোয়াভাব, গামছা নিয়ে মাথায় তেল মেখে উদ্ধতভাবে গমন, এসবে চিন্তিত হয়ে হয়ে পড়ে। অরণ্যষষ্ঠীতে পরের কাছে চেয়ে খাওয়া যে অমঙ্গল, গয়াকে বলে তা থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে, ‘দস্যি কোথাকার। ঠাকুর দেবতার সঙ্গে গোঁয়ার্তুমি! ডুব দিয়ে ফিরে না এলে ভাল হবে না বলে দিচ্ছি। আজ আমি রেগে রয়েছি।’

কিন্তু গয়ার পরোয়া নেই, সে ভ্রƒক্ষেপ করছে না দেখে গঙ্গামণি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিনে ভাত যে খেতে নেই, এসব বলে গয়ারামের পিছু পিছু রাস্তা পর্যন্ত আসে, তাকে ঠেকাতে মিথ্যে নানা সুখাদ্যের লোভ দেখায়। ঘরে পাটালিগুড়ের সন্দেশ আছে, চাঁপাকলা, দুধদই সব আছে বলে জানায়। উচ্ছৃঙ্খল গয়া তবু গলছে না দেখে গয়ার মঙ্গলচিন্তায় গঙ্গামণি আরো অধীর হয়, নরম হয়, পয়সার লোভও দেখায়, ‘সে হনহন করিয়া চলিয়া যায় দেখিয়া গঙ্গামণি সেইখানে দাঁড়াইয়া কাঁদ-কাঁদ গলায় চেঁচাইতে লাগিল, আজ ষষ্ঠীর দিনে কারো কাছে চেয়ে খেয়ে অমঙ্গল করিসনে গয়া, লক্ষ্মী বাপ আমার – না হয় চারটে পয়সা দেবরে, কোনো -।’

গঙ্গামণির ভালোবাসা, কল্যাণচিন্তা যে কত গভীর, কত সীমাহীন, তা বুঝতে কষ্ট হয় না। এতকিছুর পরও অবাধ্য, একরোখা গয়া ফিরলো না, গঙ্গামণি দারুণ হতাশায় নির্জীবের মতো দাওয়ায় বসে গয়ার বিমাতাকে এসবের জন্য দায়ী করে গালাগাল দিতে লাগল। ঝোঁকের মাথায় গয়া নদীতে স্নানে গেলেও জ্যাঠাইমার লোভনীয় ফলার আর নগদ দক্ষিণার কথা ভুলতে পারে না, ফিরে আসে। জ্যাঠাইমা খুশি হয় সত্য, প্রমাদও গুনলো সঙ্গে। গয়াকে ফিরাতে তখন মুখে যা এসেছে বলে গেছে, কিন্তু ঘরে তো সব নেই। দুধ-দই মুড়ি-গুড় আছে ঠিকই, পাটালিগুড়ের সন্দেশ নেই, চাঁপাকলাও নেই। গয়ার ক্ষুধা প্রচণ্ড, নিজেই আসন টেনে বসে পড়ে। জ্যাঠাইমা সব পরিবেশন করলেও চাঁপাকলা সন্দেশ দিতে পারছে না। কতক্ষণ বৃথা খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ইঁদুরের দোষ দেয়। শুনে গয়ার মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে, নিজেকে সামলাতে পারছে না। চাঁপাকলার অভাব না হয় মানা যায়, কিন্তু সন্দেশ? পাটালিগুড়ের সন্দেশ নিয়েও গঙ্গামণির একই অভিনয়, একই ভান, ‘… যা, – এও ইঁদুরে খেয়ে গেছে বাবা, একফোঁটাও নেই – কখন মনভুলে হাঁড়ির মুখ খুলে রেখেছি।’ এতক্ষণ যাও সংযম ছিল, এবার বাঁধ ভেঙে পড়ে। জ্যাঠাইমার ফাঁকি ধরতে পেরে ক্রুদ্ধ, ক্ষুধার্ত গয়া খাবার থালা লাথি দিয়ে ফেলে ছড়িয়ে চ্যালাকাঠ হাতে রান্নাঘরের দিকে ছোটে, হাঁড়িপাতিল ভেঙে লণ্ডভণ্ড করে। গঙ্গামণি দৌড়ে ঠেকাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়, উল্টো হাতে আঘাত পায়। এসময় অকস্মাৎ শিবু ফিরে আসে, গয়া চ্যালাকাঠ ফেলে পালিয়ে যায়, ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয়। এত বেলা পর্যন্ত শিবু অনাহারে, বাঁশপাতা নিয়ে জমিদার বাড়িতে সুবিচার মেলেনি, এমনিতে মেজাজ চড়া, তার ওপর এই কাণ্ড। সঙ্গে আসা কূটবুদ্ধিসম্পন্ন শ্যালক পাঁচুর উস্কানিতে আগুনে ঘি পড়ে। পাঁচু বোঝায়, এ নিশ্চয় শম্ভুর চক্রান্ত, সেই ছেলেকে দিয়ে ষড়যন্ত্র করে গঙ্গামণিকে মার খাইয়েছে। গঙ্গামণিও রাগের মুহূর্তে পাঁচুর কথায় সায় দেয়, এবং এর বিহিত না হলে গলায় দড়ি দেওয়ার হুমকি দেয়। শিবু আর কি করে, পাঁচুকে নিয়ে নালিশ জানাতে থানায় ছোটে।

গঙ্গামণিও বসে থাকে না। মনের ঝাল মেটাতে শম্ভুর দুয়ারে গিয়ে তাকে ধিক্কার দেয়, তিরস্কার করে এবং শাসিয়ে বলে যে, শিবু এইমাত্র থানায় গিয়েছে, এবার পিতা-পুত্রকে একসাথে ফাটকে যেতে হবে। শম্ভু স্বভাবত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

ওদিকে ক্ষুধায় গয়ার অবস্থা তখন শোচনীয়। ক্লান্ত হয়ে, উপায়ান্তর না দেখে খুব সতর্কভাবে জ্যাঠাইমার কাছে ফিরে আসে, সরাসরি খাবার চায়। ধপাস করে বসে পড়ে বিপর্যস্ত গয়া এবার আর সন্দেশটন্দেশ নয়, যা আছে তাই দিতে বলে। গঙ্গামণি ভর্ৎসনা করে দূর হতে বললেও গয়া কিন্তু গায়ে মাখছে না, তার জবাব লক্ষ করার মতো, ‘দূর হব তোর কথায়?’ অর্থাৎ গঙ্গামণির কাছে যে অধিকার আছে, তাতে পিছু সে হটতে রাজি নয়। আরো লক্ষণীয়, বিমাতা শিবুর থানায় যাওয়ার খবর দিয়ে তাকে শিগগির ফাটকে যাওয়ার ভয় দেখালেও সে কিন্তু নির্বিকার। জ্যাঠাইমা এর সত্যতা নিশ্চিত করার পরও সে বিচলিত হয় না, গঙ্গামণি নিজে ভয় দেখালেও গয়া টলছে না। তার এ সময়ের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য, ‘ইঃ, তুই আমাকে ফাটকে দিবি? দে না, দিয়ে একবার মজা দেখ না। আপনি কেঁদে কেঁদে মরে যাবি, – আমার কি হবে?’ গঙ্গামণি এসব অগ্রাহ্য করে শত্তুর বালাই বলে গালি দিয়ে সামনে থেকে সরে যেতে বললেও গয়া অনড়, নাছোড়বান্দা। গায়ে মাখলে এমন উক্তি করে, ‘তুই আগে খেতে দে না, তবেত যাব। কখন সাত সকালে দুটো মুড়ি খেয়েছি বলতো, খিদে পায় না আমার?’

এর আগে গঙ্গামণিকে মারার একটা কৈফিয়তও দিয়েছে গয়া, রাগের সময় তাকে আটকাতে যাওয়া ঠিক হয়নি বলে গঙ্গামণিকে বলেছে। এর মধ্যে শিবু পাঁচুকে নিয়ে থানা থেকে বাড়ি ফেরে, গয়া-গঙ্গামণির বাদানুবাদে ছেদ পড়ে। গয়া স্বাভাবিকভাবে পালিয়ে যায়, কিন্তু পাঁচুকে ঠ্যাং ভাঙার হুমকি দিয়ে শাসিয়ে যায়। শিবুর এ-সময়ের প্রতিক্রিয়ার দিকে আমরা মনোযোগ দেব। গয়ার এই ঔদ্ধত্য, উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য গঙ্গামণিকে শিবু দায়ী করে, অতিরিক্ত আদরপ্রশ্রয়কেই দোষ দেয়, ‘তোর আস্কারা পেয়েই ও এমন হচ্ছে।’

শিবুর ধারণা অমূলক নয়। আমরা গয়া ও গঙ্গামণির এ-সময়ের কথোপকথনেও তার সমর্থন পাই। সবচেয়ে বড় কথা, গঙ্গামণি সন্তানহীনা নারী, বন্ধ্যত্ব তাকে মাতৃত্বের গৌরব থেকে বঞ্চিত করেছে এবং সে-শূন্যস্থান পূরণ করেছে গয়া। অকালমৃত মায়ের সন্তান গয়া, এক বছর বয়স থেকে গঙ্গামণির কোলে এবং গঙ্গামণির মাতৃত্বজনিত ভালোবাসার, অপূর্ণতার সবটুকু জয় করে নিতে সক্ষম হয়েছে।

শিবুর অভিযোগে পরদিন পুলিশ আসে তদন্তে। জোরপূর্বক ঘরে ঢুকে ভাঙচুর, চ্যালাকাঠ দিয়ে স্ত্রীলোককে প্রহার ইত্যাদি সব গুরুতর অভিযোগ – প্রধান আসামি গয়ারাম। গয়াকে কৌশলে আনা হলে সে পুলিশ দেখে ভড়কে যায়, ভয়ে কেঁদে ফেলে। দারোগা বৃদ্ধ মানুষ, আসামি নিতান্ত ছেলেমানুষ দেখে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং গয়াকে কেউ ভালোবাসে কি না এমন প্রশ্নে গয়া অমøানবদনে বলে, ‘আমাকে শুধু আমার জ্যাঠাইমা ভালবাসে, আর কেউ না।’ এবার দারোগা জ্যাঠাইমাকে মারার কথা বললে গয়া অস্বীকার করে এবং আড়ালে থাকা জ্যাঠাইমাকেই তার স্বপক্ষে সাক্ষী মানে। এখানে গয়ার আত্মবিশ্বাস কিন্তু অনুধাবনযোগ্য। জ্যাঠাইমাকে সে স্বেচ্ছায় মারেনি, রাগের মাথায় ভাঙচুরের সময় একটু আঘাত লেগেছে। এটা যে তার অনিচ্ছাকৃত, তাৎক্ষণিক ভুলের ফল, কাজেই মাতৃপ্রতিম জ্যাঠাইমা বাৎসল্যবশত তাকে দায়ী না করে বরং রক্ষা করবে, এটা তার বিশ্বাস।

আমরা জানি, গয়া একটু উদ্ধতপ্রকৃতির, গঙ্গামণির প্রশ্রয়ে অবাধ্য ও একরেখাও। কিন্তু গয়া চরিত্রের যে-দিকটি আমাদের আকৃষ্ট করে, তা হলো গয়ার সীমাহীন সারল্য। জ্যাঠাইমার সঙ্গে সে যে বাড়াবাড়ি করেছে, হাঁড়িপাতিল ভেঙে একাকার করেছে, তা যে এতদূর গড়াবে, থানাপুলিশ হবে, তা তার কল্পনারও অতীত। বাঁশপাতা নিয়ে শম্ভুর হাতে গঙ্গামণির লাঞ্ছনা যে এতকিছুর মূল ইন্ধন, তা সরল গয়া বুঝবে কী করে? কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গয়াই এখন প্রধান আসামি, প্রধান অভিযুক্ত। ছেলেমানুষ গয়া অনিচ্ছায় এমন বিপাকে পড়ে তাই তো ভেঙে পড়েছে। এই বিপদে, এই দুঃসময়ে কেন জানি তার মনে আসছে তার নিজের বিস্মৃত মাকে, ‘… গয়া চোখ মুছিতে মুছিতে বলিল, আমার মা নেই, তাই। নইলে – এবারেও কথাটা তাহার শেষ হইতে পারিল না। যে মাকে তাহার মনেও নাই, মনে করিবার কখনো প্রয়োজনও হয় নাই, আজ বিপদের দিনে অকস্মাৎ তাহাকেই, ডাকিয়া সে ঝর ঝর করিয়া কাঁদিতে লাগিল।’

গয়ার এ-কান্না, এ-সজল আকুতি কি কাউকে স্পর্শ করেছে? উপস্থিত কেউ কি গভীর বেদনায় নির্বাক হয়ে পড়েছে? বলার প্রয়োজন নেই, সে গয়ার মাতৃসম জ্যাঠাইমা গঙ্গামণি। যে-বয়সে গয়া মাকে হারিয়েছে, মায়ের কথা তার মনে আসার কথা নয়। সেই মায়ের জায়গা দখল করেছিল গঙ্গামণি। সেই অচেনা, বিস্মৃত মা যখন দুঃখের মুহূর্তে গয়াকে কাঁদায়, তখন গঙ্গামণির মাতৃত্ব সবচেয়ে বেশি আহত হয়। গঙ্গামণি গয়ার এ-দুর্ভোগে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখালেও তার হৃদয় গোপন অশ্রুতে ভেসে গেছে। গঙ্গামণির পরবর্তী আচারব্যবহার ও পদক্ষেপে তা আমরা স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারব।

গ্রামে পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া হয়। তিলকে তাল করার জন্য গ্রামবাসী শিবুর বদনাম করতে থাকে। শুধু নির্বিকার গঙ্গামণি, সে একদম চুপচাপ হয়ে ভিতরে ভিতরে দগ্ধ হতে থাকে, কষ্টে পুড়তে থাকে। গঙ্গামণি মুখ ফুটে কিছু বলছে না, সরাসরি প্রতিবাদও করছে না, কিন্তু পরবর্তী দুটো ঘটনায় তার প্রতিবাদ স্পষ্ট।

গয়া পুলিশের ভয়ে গা-ঢাকা দিলো, তার পাত্তা নেই। গঙ্গামণি ভয়ানক ক্ষুব্ধ, উদ্বিগ্নও কম নয় গয়ার জন্য। গয়াকে নিয়ে এলাকায় একপ্রকার তোলপাড় চলছে। ঘটনা শুনে গয়ার দূরসম্পর্কীয় এক মাসি উপযাচক হয়ে বাড়িতে এসে গঙ্গামণিকে দোষী সাব্যস্ত করে ইচ্ছেমত গালিগালাজ করে যায়। গঙ্গামণি নীরব, অনুতপ্তচিত্তে সব তিরস্কার হজম করে। শিবু পরে শুনে প্রতিবাদহীন, নিশ্চুপ গঙ্গামণিকে ভর্ৎসনা করে। এও বলে, আমি বাড়ি থাকলে তাকে ঝাঁটাপেটা করে ছাড়তাম। গঙ্গামণি কি এতে শিবুকে ছেড়ে কথা বলেছে? গঙ্গামণির তাৎক্ষণিক জবাবটি মজার, ভেবে দেখার মতো, ‘তাহলে আজ থেকে বাড়িতেই বসে থেকো, আর কোথাও বেরিও না।’

অন্য একদিনের ঘটনা। শিবুর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে শম্ভু বিবাদের হেতু বাঁশঝাড় থেকে কয়েকটি বাঁশ কেটে নেয়। গঙ্গামণি শব্দ শুনে দেখেও এতটুকু প্রতিবাদ করে না, মুখ খোলে না। শিবু দুদিন পর জেনে খুব নাখোশ হয়। গঙ্গামণিকে তিরস্কার তো করেই, কেন সে দেখলো না, তাও বলতে ছাড়ে না। গঙ্গামণি অকপটে জানায়, দেখবে না কেন, তার চোখের সামনেই তো শম্ভু বাঁশ কেটে নিয়ে গেছে। শিবু আরও চটে গিয়ে তাকে না জানাবার জন্য স্ত্রীর কাছে কৈফিয়ত চায়। গঙ্গামণি এবার যে জবাব দিলো, তা শুধু শিবুকে নয়, আমাদেরও স্তব্ধ, বিস্মিত করে, ‘জানাব আবার কি? বাঁশঝাড় কি তোমার একার? ঠাকুরপোর তাতে ভাগ নেই?’

দুটো ক্ষেত্রেই গঙ্গামণি মুখ খোলেনি, প্রতিবাদ করেনি, মনে হয় যেন পিছু হটে এসে আত্মরক্ষা করছে। আসলে গঙ্গামণি কিন্তু প্রতিবাদ করছে, পরোক্ষ প্রতিবাদ করছে – নিজের বিরুদ্ধে, সঙ্গে স্বামী শিবুর বিরুদ্ধেও। গয়ার প্রতি অবিচার করার জন্য তার মাতৃহৃদয় নিজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছে, স্বামীর প্রতিও বিদ্রোহী হয়েছে। গয়ার বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা, তাকে ফাটকে ঢোকানোর চেষ্টা, কোনোটাই গঙ্গামণি সমর্থন করছে না, মেনে নিচ্ছে না। গয়াকে ধরতে কোর্টের ওয়ারেন্ট বের করে পাঁচু ফিরলে গঙ্গামণি আরো ক্ষুব্ধ হয়েছে। তবে আমাদের বুঝতে হবে, গঙ্গামণি নারী, স্বামী শিবুর অধীন, সামাজিকভাবে দুর্বল, তার প্রত্যক্ষ প্রতিবাদের শক্তি নেই। তাই রক্তাক্ত গঙ্গামণিকে ভিন্নপথ অবলম্বন করতে দেখি। গয়াকে ধরানোর জন্য পাঁচুর ষড়যন্ত্র ও শিবুর মিথ্যে জেদ গঙ্গামণিকে এতটা পীড়িত, মর্মাহত করে যে, ঘরকন্নায়, রান্নাবান্নার কাজে আর তার আগ্রহ থাকে না। একরাত্রে স্পষ্টত গঙ্গামণি রান্নায় যায় না, শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে রান্না করতে পারবে না বলে সাফ শিবুকে বলে দেয়। এতে শিবু ক্রুদ্ধ হয়ে লাথি মারলেও গঙ্গামণি গ্রাহ্য করে না। ফল এই, শিবু-পাঁচু সে-রাতে থাকে অনাহারে।

পরদিন সকাল থেকে গঙ্গামণিকে বাড়িতে পাওয়া যায় না, গয়ার মতো নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। শিবু নির্বোধ নয়, গঙ্গামণির এসব অসংলগ্ন, খাপছাড়া আচরণের হেতু বুঝতে বাকি থাকে না। সে গঙ্গামণির চিন্তায় ভেঙে পড়ে, পাঁচুর শত উসকানিও তাকে মামলা-মোকদ্দমায় উৎসাহ দেয় না।

আমরা গল্পের ক্লাইমেক্সে এসে পৌঁছেছি।

গঙ্গামণির হদিস কোথাও মেলে না। তার বাবার বাড়িতে নয়, ধনী এক পিসির বাড়িতে নয় (যে-পিসির বাড়িতে তার যাতায়াত ছিল), কোথাও নয়। গঙ্গামণি লাপাত্তা, পুরোপুরি লাপাত্তা। শিবু চোখে অন্ধকার দেখে, সংসার অচল, ঘরদোর শূন্য, শ্রীহীন। স্ত্রীর প্রতি শিবুর ভালোবাসা কম ছিল না, স্ত্রীর চিন্তায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। কিন্তু পেচুক পাঁচু বসে নেই, সে গয়ার সন্ধান পেতে চেষ্টার কসুর করছে না। ওদিকে স্ত্রীকে খুঁজে খুঁজে না পেয়ে হতোদ্যম, শ্রান্ত, বিমুখ শিবু বিধ্বস্ত, পাঁচুর উৎসাহেও কোনো শক্তি পায় না। শিবুর এখন গঙ্গামণিকে নিয়েই যত ভাবনা, গয়া এখন নিতান্ত তুচ্ছ। পাঁচুর পীড়াপীড়িতেও সে অসম্মত, ‘এখন থাক না পাঁচু। আগে সে ফিরে আসুক – তারপর।’

পাঁচু নাছোড়বান্দা। গয়ার খোঁজ পেয়ে পাঁচু দারুণ উৎসাহী হয়। দিদি তো আসবেই একদিন, কিন্তু গয়াকে ধরার এমন সুযোগ হাতছাড়া করা কি উচিত হবে? শেষে অনিচ্ছায়, পাঁচুর চাপে অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো শিবু রাজি হয়। জানা যায়, নামপরিচয় গোপন করে শম্ভু গয়াকে পাঁচলার সরকারি পুলের কাজে নিযুক্ত করে দিয়েছে। গয়াকে ধরতে পাঁচু ও শিবু আদালতের পেয়াদা নিয়ে রওনা দিলো। একটা বিরাট মাঠে পুলের কাজ হচ্ছে, সেখানে লোহালক্কড়ের সঙ্গে অনেক লোকজন, মজুর, ছোট ছোট অসংখ্য ঘর। ধূর্ত পাঁচু অনেক খুঁজে জিজ্ঞাসাবাদ করে গয়ার ঘরের সন্ধান পেল এবং খুব হুঁশিয়ার হয়ে এগোল। কিন্তু কপাল মন্দ, ‘পাঁচু পুলকে উচ্ছ্বসিত হইয়া পেয়াদা ও শিবুকে লইয়া বীরদর্পে অকস্মাৎ কুটীরের উন্মুক্ত দ্বার রোধ করিয়া দাঁড়াইবা মাত্র তাহার সমস্ত মুখ বিস্ময়ে, ক্ষোভে, নিরাশায় কালো হইয়া গেল। তাহার দিদি ভাত বাড়িয়া দিয়া একটা হাতপাখা লইয়া বাতাস করিতেছে এবং গয়ারাম ভোজনে বসিয়াছে।’

গঙ্গামণি তাদের একটু জিরিয়ে নিয়ে স্নান করে আসতে বলে। তাদের সবার ভাত প্রস্তুত করার জন্য গঙ্গামণি এটুকু অবকাশ চায়।

গল্পটির উপসংহার আমাদের গভীরভাবে আলোড়িত করে, চমকে দেয়।

গঙ্গামণি আত্মগোপন করেছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে যায়নি। সে যথাস্থানে এসে ঠাঁই নিয়েছে। তার হৃদয়, তার অন্তরাত্মা, তার মাতৃত্ব যেখানে তাকে আসার আহবান জানিয়েছে, সেখানে এসেছে।

‘মামলার ফল’ প্রকৃতপক্ষে ছোটগল্প, এর পরিসর সীমিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটগল্পের যে-চিত্র এঁকেছেন তাঁর ‘বর্ষাযাবন’ কবিতায়, মামলার ফল তার সার্থক প্রতিচ্ছবি। কিন্তু ‘মামলার ফলে’র প্রকৃত সার্থকতা শুধু গঠনগত সার্থকতা নয়।

গঙ্গামণি-গয়ার মধ্যে মাতাপুত্রের নৈকট্য গভীর হলেও অভিনব নয়। ‘বিন্দুর ছেলে’তে এমন বাৎসল্যের পরিচয় আমরা পাই। গল্পটির সাফল্যের বীজ লুকিয়ে আছে এর অন্তর্নিহিত সামগ্রিক শক্তিতে। একবছর বয়স থেকে গঙ্গামণির কাছে আশ্রয় পেয়ে গঙ্গামণির উদার স্নেহপ্রশ্রয়ে পালিত হয়ে গয়া হয়ে উঠেছে অবাধ্য ও দুরন্ত। ফলে গয়ার আবদারের কমতি নেই, অন্যদিকে গঙ্গামণির প্রশ্রয়ও যথেষ্ট। ফলার নিয়ে গয়া গঙ্গামণির সঙ্গে যে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে, রাগেদুঃখে ক্ষিপ্ত গঙ্গামণি স্বামীর কাছে তার প্রতিকার চেয়েও স্থায়ী বিচ্ছেদকে গ্রহণ করতে পারে না। আমরা বুঝতে পারি, গয়া ও গঙ্গামণির মধ্যে একটা অচ্ছেদ্য বন্ধন আছে, সন্তানের সঙ্গে জননীর বন্ধনের মতো। গয়া যত বাড়াবাড়ি করুক, দুর্ব্যবহার করুক, গয়ার কল্যাণচিন্তা গঙ্গামণিকে কখনো ছেড়ে যায় না। অরণ্যষষ্ঠীতে মুড়িমুড়কি (তাতে অমঙ্গল হবে বলে) খেতে গয়াকে তাই সে বারবার নিষেধ করছে, বিরত রাখার চেষ্টা করছে। আমরা দেখি, হাঁড়িকুড়ি ভেঙে একাকার করার পরও প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত গয়া আবার এসে খেতে চাইলে, ভাতের জোর দাবি জানালে রুষ্ট গঙ্গামণি অগ্রাহ্য করেও, একেবারে তাড়িয়ে দিতে পারছে না। গয়া সেটা বোঝে বলে সেও সরে না, সরতে চায় না  – জ্যাঠাইমার কাছে ভাতের আবদার করতেই থাকে। এ-সময়ের চিত্রটা পুরোপুরি মা-ছেলের মান-অভিমানের চিত্র। ক্ষুধায় গয়ার কাহিল অবস্থা দেখে মাতা গঙ্গামণির রাগও পড়ে আসছে, আস্তে আস্তে সে সহজ ও নরম হচ্ছে। কিন্তু এ-মুহূর্তে শিবু আর পাঁচু থানা থেকে ফিরে আসায় আপাতত তাতে ছেদ পড়ে।

গয়ার অনাচারে যত ক্ষোভ হোক, অভিমান হোক, গয়াকে গঙ্গামণি স্থায়ীভাবে দূরে ঠেলে দিতে চায় না, পারে না। বাড়িতে দারোগা-পুলিশের আগমনে গয়ার কান্না, জ্যাঠাইমার ভালোবাসার কথা প্রকাশ্যে বলা, (দারোগাকে গয়ার বক্তব্য স্মরণীয়, ‘আমাকে শুধু আমার জ্যাঠাইমা ভালবাসে, আর কেউ না।’) তার অসহায়ত্ব – এসব গঙ্গামণিকে স্পর্শ না করে পারে? তার নারীহৃদয়, মাতৃহৃদয় ভীষণভাবে বিগলিত হয়েছে। গয়ার নিরুদ্দেশ গঙ্গামণিকে একেবারে ছারখার করে দিয়েছে, গয়ার কান্নার সঙ্গে তার নিজের আত্মগ্লানিও হচ্ছে, অপরাধবোধ তাকে ছিঁড়েকুরে খাচ্ছে। গয়ার দুর্দশার জন্য সে নিজেকে দায়ী করছে, শিবুকেও দায়ী করছে। পরবর্তীকালে তাই তার চরিত্রে দেখি দৃঢ় নির্বিকারত্ব, পীড়াদায়ক নিষ্ক্রিয়তা। গয়ার মাসির গালিতেও

রা’টি করে না, শম্ভুর বাঁশ কাটাতেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না।

গয়া আসলে গঙ্গামণির অস্তিত্বের অংশ, তার সঙ্গে অবিভাজ্য। গয়ার কল্যাণচিন্তায় তাই গঙ্গামণির বিদ্রোহ আর সুপ্ত থাকেনি, প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। হতাশায়, যন্ত্রণায় গঙ্গামণি একদিন রাতের আহার প্রস্তুত না করে স্বামী-ভাইকে অভুক্ত রেখেছে, অসুস্থতার অজুহাতে সবকিছু এড়িয়ে গেছে।

চূড়ান্ত পর্যায়ে, গঙ্গামণি স্বামী-সংসার ছেড়ে বিদ্রোহ করে নিরুদ্দেশ হয়েছে।

গয়ার অবস্থানের তথ্য সে আগেই গোপনে সংগ্রহ করে তার নিকট গিয়ে উপস্থিত হয়। নিজের অপরাধের ভার কমাতেও বটে, গয়াকে মাতৃত্বের ছায়া দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে মামলার হাঙ্গামা থেকে বাঁচাতেও বটে। গঙ্গামণির এখানেই জয়, এখানেই তার মাতৃত্বের দৃপ্ত মহিমা।

‘মামলার ফল’ গল্প নিয়ে আরো কিছু বলার আছে। এ-গল্পের প্রতিটা বিষয়, প্রতিটা ঘটনা অত্যন্ত সংযতভাবে বিবৃত হয়েছে, তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও বাহুল্য নেই, কোথাও আতিশয্য নেই। একটা বাদ দিয়ে আর একটার পূর্ণতা যেন সম্ভব নয়। এমন নিখুঁত, নিটোল, সর্বাঙ্গসুন্দর মানবিক গল্প শরৎচন্দ্র আর লিখেছেন কি না, আমার জানা নেই।

গল্পটির উপসংহারও কম নাড়া দেয় না। নাটকীয়তা বর্জন করে, চমক সৃষ্টির সস্তা পথে না গিয়ে গল্পটি স্বাভাবিকভাবে, স্বচ্ছন্দে সমাপ্ত হয়েছে। আর গল্পটির যবনিকা এমনি সুশৃঙ্খল ও পরিপাটি যে, আমরা বিমোহিত হই, পুলকিত হই, পাঠকচিত্ত আনন্দে আপ্লুত হয়ে যায়। গল্পের এই চূড়ান্তপর্যায়ে এসে কথাশিল্পীর শিল্পসাফল্য যেন শিখর স্পর্শ করে।