গত কয়েক বছরে আমার পঠিত উপন্যাসগুলোর (বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে) ভেতর, যে-উপন্যাসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে, যার প্রতিটি চরিত্র, ঘটনা ও তার পরম্পরা, কাহিনির বাঁক, উত্থান-পতন, উপস্থাপনা, ভাষার সাবলীলতা আমার মনের মধ্যে স্থায়ী দাগ কেটেছে, সে-উপন্যাসটির নাম ঝঢ়ধপব ইবঃবিবহ টং (প্রথম প্রকাশ ২০০৭)| লিখেছেন ব¤ে^ (বর্তমানে মু¤^াই) থেকে এসে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী সাহিত্যের অধ্যাপক থ্রিটি উম্রিগর| প্রকাশলগ্নেই উপন্যাসটি বছরের সেরা উপন্যাসগুলোর অন্যতম বলে বিবেচিত হয়েছিল আমেরিকায়| বাণিজ্যিক দিক থেকেও খুব সফল এ-গ্রন্থ| এত বইয়ের ভেতর এই বিশেষ উপন্যাসটি বেছে নেওয়ার কারণ, এই উপন্যাসের মসৃণ বয়ানে মানুষের ˆবচিত্র্যময় জীবনের নানা অলিগলি, জটিলতা, উত্থান-পতনের চিহ্ন থাকা সত্ত্বেও প্রায় সকল চরিত্রকেই মনে হয় আমাদের প্রতিদিনের চেনা মুখ — প্রত্যেককেই মনে হয় বৃহৎ এক অন্তর্জালে বন্দি আমাদের অতিকাছের পরিচিত কোনো জন| অশুভের থাবা, অবিচারের আঁচড় শরীরে-মনে ধারণ করেও চরিত্রগুলো গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, কেননা, এক অন্তর্নিহিত মানবিক শক্তি, এক নিগূঢ় প্রজ্ঞা সবকিছু ছাপিয়ে দৃশ্যমান হয়|
আবার একই সঙ্গে দেখা যায় মানব সম্পর্ক — পারস্পরিক খাঁটি সৌহার্দ্যরে ভিতটিও শ্রেণিবিভেদের দুরবিনে, পারিবারিক অসম্মানের আশঙ্কায় মাঝে-মাঝে গোড়া থেকে দুলে ওঠে| শ্রেণিবিভেদের দরুন জীবনসংগ্রামের ¯^রূপ যতই ˆবচিত্র্যময় ও ভিন্নতর হোক না কেন, তার ভেতরেও, বিশেষ করে একটি নারীর সঙ্গে অসম অবস্থানের আরেকটি নারীর একটি অন্তর্নিহিত মিল থাকে, দুটোরই গভীরে প্রচ্ছন্ন ও অতিসূক্ষ্ম এক ঐকতান থাকে| সমাজের ভিন্ন স্তর থেকে আসা দুটি অনাত্মীয় নারীর ভেতর মানবিক বন্ধন রচনা, এবং একসময় তাদের এই দীর্ঘদিনের অনাবিল খাঁটি সম্পর্কের গভীরতা কোনো অনভিপ্রেত পারিবারিক জটিলতা কিংবা ব্যক্তি¯^ার্থপরতায় সৃষ্ট টানাপড়েনে অবশেষে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়া, এইসব জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয় ও ঘটনা নিয়েই মূল কাহিনি রচিত| সমাজের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই প্রান্তের দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর মধ্যে প্রকৃত টান ও বন্ধুতার জোয়ারে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন ভেসে যাবে গতানুগতিক জীবনের সকল ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছ বাছবিচার, ˆবষম্য| কিন্তু আসলেই কি এই এক জোড়া অসমবিত্তের, বিপরীত
শিক্ষা-সাংস্কৃতিক জগতের নারী, যারা রকমের দিকে আলাদা হলেও দুজনই মৌলিকভাবে নির্যাতিত, তাদের পারস্পরিক আস্থা, নির্ভরতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে তাদের সমস্ত ভিন্নতা, শ্রেণিবিভেদ পাশ কাটাতে, অগ্রাহ্য করতে সমর্থ হবে?
বইখানির ভেতর যে-শহর, যে-পরিবেশকে কেন্দ্র করে কাহিনি ডালপালা মেলে, তার অবস্থান আমাদের দেশ থেকে মোটেও দূরে নয়| ব¤ে^ শহরের এক পার্সি পরিবার, যেখানে এই কাহিনি বিকশিত হয়, সেখান থেকে ঢাকা মহানগরীর হৃৎস্পন্দন পর্যন্ত শুনতে পাওয়া যায় — এতটাই কাছে| বহুদিন ধরে একই গৃহস্থালিতে প্রতিদিন জাগ্রত সময়ের অধিকাংশটাই পাশাপাশি থাকার কারণে সমাজের অসম স্তর থেকে উঠে আসা দুই অনাত্মীয় নারীর মধ্যে এক ধরনের সখ্যের ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে ওঠে| আবার সেইসঙ্গে এই মানবিক সম্পর্ককে ঘিরে দৃশ্যমান হয় নানারকম দ্বন্দ্ব আর জটিলতা| আশপাশের অন্যান্য চরিত্রের অনুপ্রবেশ এবং আনুষঙ্গিক
ঘটনা-পরম্পরায় বিভিন্ন রকমভাবে পরিস্থিতি ঘোলা হয়, সম্পর্কের মধ্যেও দোলাচলের আভাস পাওয়া যায়|
থ্রিটি উম্রিগরের উপন্যাস ঝঢ়ধপব ইবঃবিবহ টং-এর অন্যতম প্রধান চরিত্র ব¤ে^র উচ্চমধ্যবিত্ত এক পার্সি পরিবারের মধ্যবয়সী গৃহকর্ত্রী| নাম সেরা| আরেক প্রধান চরিত্র হলো ভীমা, সেরার বাড়িতে বিশ বছরেরও বেশিকাল ধরে ঘরের কাজ করে আসা অত্যন্ত বিশ্বস্ত পরিচারিকা| ভীমা সারাদিন ধরে সেরার ঘরকন্নার কাজ ও তার সেবা করার পর সন্ধ্যায় নিজগৃহে বস্তিতে ফিরে যায়, যেখানে মাতা-পিতাহীন তার চোখের মণি নাতনি মায়া একা ঘরে তার প্রতীক্ষায় বসে থাকে| মায়া ভীমার একমাত্র কন্যার একটি মাত্র সন্তান| মায়ার মা-বাবা দুজনেই এইডস রোগে মারা গেছে প্রায় একই সময়ে ভীমার চোখের সামনে| বহুদিন থেকে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন মেয়ে, মায়ার মা, এবং তার ¯^ামীর মারাত্মক অসুখের খবরটা পেয়েছিল ভীমা একেবারে শেষ মুহূর্তে| অতি-অকস্মাৎ ওদের মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে| বহুদূরের সেই বিশেষভাবে নির্মিত এইডসের হাসপাতালে ছুটে গিয়ে মেয়ে এবং মেয়েজামাইয়ের শেষ দেখাটিই কেবল দেখতে পেয়েছিল ভীমা| সেই হাসপাতালে ভীমার পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা, অতি অসময়ে মেয়ে ও জামাইয়ের প্রায় একই সঙ্গে করুণ মৃত্যু এবং তাদের সৎকারের ঘটনার বর্ণনা এই গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়, যার বিষাদ ও হাহাকারে পাঠকের বুক গুমরে ওঠে| অন্ধকারে বা বৃষ্টির ছাঁটে তীব্রভাবে গায়ে কাঁটা দেয়|
আগেই বলেছি, সেরার বাড়িতে বছরের পর বছর কাজ
করতে-করতে অতি ধীরে-ধীরে ভীমার সঙ্গে এক ধরনের আত্মিক বন্ধন গড়ে উঠেছিল সেরার| যদিও নিজের সামাজিক অবস্থান ও আভিজাত্যের প্রতি সজাগ সেরা ও তার ¯^ামী কখনো ভীমাকে তাদের সঙ্গে একই সোফায় বসে টেলিভিশন দেখতে অথবা একই মগে করে চা পান করতে দেয় না| যে-সোফাসেট থেকে প্রতিদিন নিজের হাতে সব ধুলো ঝেরে ফেলে পরিষ্কার করে ভীমা, যে-গ্লাস নিয়ে নিজের হাতে ধোয় বেসিনে, সে-সোফায় বসা বা সে-গ্লাসে জল খাবার অধিকার নেই তার| তাই তো এ-গ্রন্থের পরিচয়পর্বে বলা হয়েছে, ‘ঞযৎরঃু টসৎরমধৎ’ং বীঃৎধড়ৎফরহধৎু হড়াবষ ফবসড়হংঃৎধঃবং যড়ি ঃযব ষরাবং ড়ভ ঃযব ৎরপয ধহফ ঢ়ড়ড়ৎ রহঃৎরহংরপধষষু পড়হহবপঃবফ ুবঃ াধংঃষু ৎবসড়াবফ ভৎড়স বধপয ড়ঃযবৎ, ধহফ যড়ি ঃযব ংঃৎড়হম নড়হফং ড়ভ ড়িসধহযড়ড়ফ ধৎব বঃবৎহধষষু ড়ঢ়ঢ়ড়ংবফ নু ঃযব ফরারংরড়হং ড়ভ পষধংং ধহফ পঁষঃঁৎব.’ এসব বাহ্যিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও সেরা আর ভীমার — দুই জগতের দুই নারীর পারস্পরিক নির্ভরতা ও বিশ্বস্ততা তুলনাহীন| তারা তাদের প্রাত্যহিক জীবন ও একে অন্যের ব্যক্তিগত সমস্যার ব্যাপারে এতটাই অবগত, সম্পৃক্ত ও উদ্বিগ্ন যে, এই আপাতবৈষম্য বা বিভাজনকে যুগ-যুগ ধরে চলে আসা বিনাবিচারে প্রশ্নাতীতভাবে গৃহীত সামাজিক রীতি বা সংস্কারের ধারাবাহিকতার রেশ বলেই মনে হয়| প্রকৃত অর্থে, ভীমার প্রতি আচরণে অন্তত সেরার পক্ষ থেকে অন্য কোনোরকম অবহেলা, ˆবষম্য বা তাচ্ছিল্যের প্রকাশ লক্ষ করা যায় না| মায়ার কলেজে পড়ার খরচ বা তার মা-বাবার চিকিৎসার জন্যে সেরা ভীমাকে যথেষ্ট পরিমাণে আর্থিক সাহায্য করে| তা সত্ত্বেও বাড়ির আরেক মুক্তমনা সদস্য আধুনিক বিদুষী তরুণী দিনাজ, সেরার একমাত্র কন্যা, যে বর্তমানে সন্তানসম্ভবা, ¯^ামী ভিরাফসহ যে এই বাড়িতেই থাকে, ভীমার প্রতি এই বাড়ির কিছু-কিছু আচরণ মোটেই পছন্দ করে না| এত বছর একসঙ্গে একই বাড়িতে কাটিয়ে দেওয়ার পরও ভীমাকে পরিবারের আরো একজন সদস্যের মতো মেনে না নিয়ে তাকে কাজের লোক হিসেবে গণ্য করা, তার প্রতি যে-কোনোরকম ˆবষম্য, ভিন্ন ব্যবহার বা আচরণ, যেমন নির্দিষ্ট একটি গ্লাসে জল খেতে দেওয়া, ¯^তন্ত্র আসনে বসতে দেওয়া, মোটেই গ্রহণযোগ্য নয় দিনাজের কাছে| আহত দিনাজ মায়ের কাছে তার এই মনোভাব প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না| শুনে তার মা যা বলে তাতে মনে হয়, এবং কথাটিতে সত্যতাও অনেকটা রয়েছে হয়তো, ভীমার সঙ্গে এতটুকুন পার্থক্য বজায় না রাখলে সেরার ¯^ামী সেটা কিছুতেই মেনে নিত না| অসময়ে মৃত্যুর কারণে এ-গ্রন্থে সেরার ¯^ামীকে ভালো করে যাচাই করার অবকাশ না থাকলেও তার পৌরুষত্ব ও আভিজাত্যের আস্ফালন তার এই ¯^ল্প উপস্থিতিতেও সহজে টের পাওয়া যায়|
দীর্ঘদিন এ-বাড়িতে থাকতে-থাকতে কালের সাক্ষী হয়ে ভীমা নিজেও অতি নীরবে এবং নিভৃতে অনেক কিছুই দেখে আসছে| কিন্তু সে কেবল দেখে, আর নিজের মতো করে বোঝে| কিন্তু সে যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে বোবা দর্শক ছাড়া আর কোনো ভূমিকা থাকতে পারে না তার| প্রতিবাদ বা সমালোচনা করা তার এখতিয়ারে নয়| ভীমা দেখতে পায়, কী ঘটে চলেছে এই আপাত সুখী এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারটির অভ্যন্তরে| সেরার মতো ব্যক্তিত্বশালী উচ্চশিক্ষিত ধনাঢ্য পরিবারের গৃহিণীকেও লোকচক্ষুর আড়ালে কীভাবে এক আত্মম্ভরী, অত্যাচারী, জটিল মানসিকতার ¯^ামীর দ্বারা মানসিক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে মাঝে-মাঝেই| যতদিন তার ¯^ামী বেঁচেছিল, কখনো এর থেকে রেহাই পায়নি সে| কতদিন গেছে সেরার ক্ষতস্থানে অথবা আঘাতে নীল হয়ে যাওয়া শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নিজের হাতে মলম মালিশ করে দিয়েছে ভীমা!
আর ওদিকে নিজের ঘরেও ভীমার ইদানীং বড়ই অশান্তি| অশান্তি আর দুঃখ একমাত্র নাতনি মায়াকে নিয়ে, যে-মেয়েটি পড়াশোনা করে তার মা বা দিদিমার থেকে ভিন্ন এবং উন্নত এক জীবনের অধিকারী হবে বলে ¯^প্ন দেখত ভীমা| বড় সখ করে কলেজে পাঠিয়েছিল তাকে পড়াশোনা করার জন্যে| কিন্তু অবিবাহিত অবস্থায় তার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনাটি ইদানীং ভীমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে, আঘাত করেছে| সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছে ভীমা, মায়ার তরফ থেকে তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃত্বের জন্যে দায়ী পুরুষটির পরিচয় আগাগোড়া গোপন করে যাওয়ার ব্যাপারটায়| তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছে ভীমা ওই অজানা ব্যক্তিটিকে আড়াল করতে মায়ার মতো মেয়ের জলজ্যান্ত মিথ্যার ও ছলনার আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায়| দিদিমার সঙ্গে এতখানি ঘনিষ্ঠ থাকা সত্ত্বেও মায়ার উচিত ছিল না এক নিরপরাধ সহপাঠীকে এই ব্যাপারে ইঙ্গিত করা, যার পেছনে ছুটে শেষ পর্যন্ত লজ্জিত ও অপমানিতই হয়েছে ভীমা| আর সেরা! বরাবরের মতো এই দুঃসময়েও ভীমা ও মায়ার সাহায্যে এগিয়ে আসে| ¯^তঃপ্রণোদিত হয়ে মায়ার জন্যে এই মুহূর্তে একমাত্র গ্রহণযোগ্য করণীয় বা খোলা পথ, গর্ভপাতের ব্যবস্থা করতে চাইলে কৃতজ্ঞতার বদলে সেরার প্রতি মায়ার অকস্মাৎ অত্যন্ত দুর্বিনীত ব্যবহার, দুর্বোধ্য কথাবার্তা এবং কঠিন ও নিষ্ঠুর অভিযোগ ও মন্তব্যে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে ভীমা| এই রহস্যের জাল ছিঁড়ে সত্য বেরিয়ে এলে দেখা যায় তা এতখানিই কুৎসিত ও অপ্রত্যাশিত যে, ভীমা কোনোমতেই সেটা মেনে নিতে পারে না| সেরার
সহজ-সরল গর্ভবতী কন্যা দিনাজের অনাগত সন্তানের পিতাই যে মায়ার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার জন্যেও দায়ী, আর সেটা যে ঘটেছে সেরার অসুস্থ শাশুড়ির বাসায়, যেটা সেরার বাসা থেকে মোটেই দূরে নয়, যেখানে মায়া এই বৃদ্ধার দেখাশোনা করতে যেত মাঝেমধ্যে, এ-সত্য প্রকাশিত হয়ে পড়লে ভীমা অত্যন্ত ক্রোধাšি^ত হয়ে পড়ে| সেরা বা তার কন্যাকে কিছু না জানিয়ে সোজা আসল অপরাধীর মুখোমুখি হয় সে, যে তার নাতনিকে প্রতারণা করেছে চরমভাবে| সেরার অপমানিত মেয়েজামাই ভিরাফ তখন মরিয়া হয়ে ভীমার ওপর প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হয়ে পড়ে| এত বছর ধরে যে-বাড়িতে এমন গভীর আস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত ভীমা, সেখানেও তাকে মিথ্যে টাকা চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পিছপা হয় না ভিরাফ| এই বিশাল অগ্নিপরীক্ষার সময় সেরা তার এতদিনকার পরিচিত ও প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন না করে অতিসাধারণ, বাস্তববাদী এবং মামুলি সংসারী মানুষের মতো আচরণ করে| ভীমাকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টার বদলে সেরা তার সঙ্গে এতদিনকার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে| সব জেনে-শুনে-বুঝেও আসল সত্যকে-ন্যায়কে অ¯^ীকার করে বসে সেরা| ভীমার বেতন পরিশোধ করে তাকে তার গৃহস্থালির চাকরি থেকে বহিষ্কার করে দেয়| এমনকি ভীমাকে তার বাড়ি থেকে তাৎক্ষণিক বিতাড়িত করতেও দ্বিধা করে না সেরা| পারিবারিক সম্মান বাঁচানো ও নিজের এবং কন্যার ঘর সামলানো এতটাই বেশি জরুরি ও বড় হয়ে দেখা দেয় সচ্ছল অভিজাত পরিবারের গৃহকর্ত্রী সেরার কাছে যে এত বছর ধরে তিল-তিল করে গড়ে ওঠা নিঃ¯^ার্থ মানবিক একটি সম্পর্ককে এক মুহূর্তে ছিঁড়ে ফেলতেও বাধে না তার| ভীমা যেন আসলেই সেরার বাড়িতে নিছক এক কাজের মেয়ে বই কিছু নয়, যারা প্রতিনিয়তই এই ধরনের অপবাদ মাথায় নিয়ে গৃহস্থালির কাজ করে যায়! সেরার বাড়িতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন গৃহকর্ম করার পর, আজ সকল বাঁধন ছিঁড়ে, একগাদা কলঙ্কের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে একাকী রাস্তায় বেরিয়ে আসে ভীমা| পড়ন্ত বেলায় ব¤ে^র ইন্ডিয়ান গেটের অদূরে সমুদ্রের জলে
নামতে-নামতে ভীমা তার গোটা জীবনের চেহারাটি ওলটপালট করে দেখে| ¯^ামী দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়ার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা, সেরার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের বন্ধুতা এবং অতিকরুণভাবে তার পরিসমাপ্তি, নিজের কন্যা ও জামাইয়ের অসময়ে মৃত্যু, মায়ার ভবিষ্যৎ, আগামী দিনের অনিশ্চয়তা ইত্যাদি বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত ভাবনা তার মন ছুঁয়ে যায়|
থ্রিটি উম্রিগরের ইংরেজি সহজ, সরল, সুখপাঠ্য| চরিত্রচিত্রণে, বিশেষ করে চরিত্রের জটিলতা সৃষ্টিতে এবং সম্পর্কের মোড় ঘোরাতে অসীম মুন&শিয়ানার পরিচয় দেন থ্রিটি| বইয়ের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে যেভাবে পরতে-পরতে এবং ধীরে-ধীরে উন্মোচিত হয়েছে মূল কাহিনি, চিত্রিত হয়েছে তার চরিত্রগুলো আর তাদের ব্যাপ্তি, তাতে সন্দেহ নেই থ্রিটি উম্রিগর এ-কালের একজন অতি দক্ষ ও শক্তিশালী লেখক| তিনি নিজে পার্সি পরিবার থেকে আসার কারণে সেই সমাজের চলাফেরা, ˆদনন্দিন জীবন, বিভিন্ন রীতিনীতি, খুঁটিনাটি ও মূল্যবোধ অতি বাস্তবতার সঙ্গে আঁকতে সমর্থ হয়েছেন এ-গ্রন্থে|
চলনে-বলনে-আহারে-পোশাকে-পার্টিতে পশ্চিমা ধারার সঙ্গে যত মিলই থাকুক ব¤ে^র উচ্চবিত্ত পার্সি সম্প্রদায়ের, প্রাচ্যের কুসংস্কার ও পারিবারিক আচার-আচরণ, রীতিনীতি ব্যাপকভাবেই উপস্থিত সেখানে| যেমন, বিয়ের অব্যবহিত পরে একসঙ্গে বাস করার কারণে শাশুড়ি-পুত্রবধূর মধ্যে বিদ্যমান অম্লমধুর সম্পর্ক ও বিস্তর টানাপড়েন, মাসিকের সময় শাশুড়ির নির্দেশে পুত্রবধূর রান্নাঘরে বা প্রার্থনাঘরে যেতে বা ঘরকন্নার কোনো কাজে অংশগ্রহণ করতে, এমনকি, গুরুজনের সান্নিধ্যে আসতেও বারণের রীতি গতানুগতিক উপমহাদেশীয় নিয়ম-নিষেধ, কুসংস্কার ও সংস্কৃতিরই অংশ| একই সঙ্গে ব¤ে^ নগরীতে সেরাদের মতো পরিবারের ঠিক উলটোদিকে যাদের অবস্থান, শহরের আরেক প্রান্তে ভীমার মতো বিশাল যে-জনগোষ্ঠী বস্তিতে বাস করে, তাদের প্রাত্যহিক জীবন, চতুষ্পার্শ্বের পরিবেশ ও বসবাসের উপকরণেরও নিখুঁত বর্ণনা রয়েছে এ-গ্রন্থে| আমরা দেখতে পাই, অত্যন্ত খরচসাপেক্ষ বাড়িভাড়ার কারণে ব¤ে^ মহানগরীর বস্তিগুলোতে কেবল সমাজের প্রান্তিক মানুষই বসবাস করে না, প্রচুর লেখাপড়া জানা, নিয়মিত অফিসে কাজ করা রোজগেরে নিম্নমধ্যবিত্ত ব্যক্তিও পরিবার-পরিজনসহ সেখানে বাস করে| তাই ভীমার কলেজে পড়া যুবতী নাতনি মায়া বস্তিতে নয়, প্রতারিত ও লাঞ্ছিত হয় ধনী, শিক্ষিত পরিবারের অন্দরমহলে, সুশিক্ষিত, তথাকথিত মার্জিত এক বিবাহিত যুবকের দ্বারা| উম্রিগর তাঁর গ্রন্থে সেরা ও ভীমার প্রতি এত বেশি নজর দিয়েছেন যে, কখনো-কখনো মনে হয়, উপন্যাসের অন্য চরিত্রগুলো যথেষ্ট পরিমাণে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি, তাদের জন্যে এ-গ্রন্থে যেন যথেষ্ট জায়গা ছিল না| বইটির কাহিনি যে খুব সম্ভবত সত্য ঘটনাকে ভিত্তি করে লেখা তার বড় প্রমাণ, বইখানি তিনি উৎসর্গ করেছেন, ‘সত্যিকারের ভীমাকে এবং তার মতো হাজারো নারীকে’ (ঋড়ৎ ঃযব ৎবধষ ইযরসধ ধহফ ঃযব সরষষরড়হং ষরশব যবৎ)| গ্রন্থটির পেছনের পৃষ্ঠায় বহুপ্রশংসিত মন্তব্যের ভেতর ডধংযরহমঃড়হ চড়ংঃ-এর উদ্ধৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ‘ঞযব ষরভব ড়ভ ঃযব ঢ়ৎরারষবমবফ রং যধৎংযষু সবধংঁৎবফ ধমধরহংঃ ঃযব ষরভব ড়ভ ঃযব ঢ়ড়বিৎষবংং, নঁঃ বসঢ়ধঃযু ধহফ পড়সঢ়ধংংরড়হ ধৎব বাড়শবফ নু নড়ঃয ংঃৎড়হম ড়িসবহ, বধপয ড়ভ যিড়স রং ভড়ৎপবফ ঃড় সধশব ধ ংবঢ়ধৎধঃব পযড়রপব. টসৎরমধৎ রং ধ ংশরষষবফ ংঃড়ৎুঃবষষবৎ, ধহফ যবৎ সবসড়ৎধনষব পযধৎধপঃবৎং রিষষ ষরাব ড়হ ভড়ৎ ধ ষড়হম ঃরসব.’
ঝঢ়ধপব নবঃবিবহ টং গ্রন্থের ভেতর আরো একটা জিনিস যা প্রাধান্য পায়, সেটি হলো, আমাদের দৃষ্টি মূল দুই চরিত্র থেকে সরিয়ে অন্যত্র একটু ফেললে দেখতে পাই, সেখানে রয়েছে বাড়ির অল্পবয়সী মেয়ে, দিনাজ, এই প্রজন্মের অত্যন্ত সহজ, সরল, জটিলতাহীন, মানবিক গুণে গুণাšি^ত সেরার বিবাহিত মেয়ে| সেরার সঙ্গেই থাকে ¯^ামীসহ| দিনাজ শ্রেণিগত পার্থক্য বোঝে না| মানুষে-মানুষে ˆবষম্যে-বিভেদে পূর্ণ এই সমাজের প্রতি, তার পিতা-মাতার ব্যবহারের প্রতিও সে বিরক্ত| দিনাজ অত্যন্ত উদার, উষ্ণ ও মুক্তমনের মানুষ; কিন্তু তার ¯^ামী? ঠিক বিপরীত চরিত্রের| এ-গ্রন্থে সে একরকম ভিলেনের ভূমিকাই পালন করে| ঝঢ়ধপব ইবঃবিবহ টং-এর ভিরাফ চরিত্র মানবিক বন্ধন, পারস্পরিক আস্থা ও সহমর্মিতার পরিপন্থী| ব্যক্তি হিসেবে সে অত্যন্ত ¯^ার্থপর, আত্মম্ভরী, অবিবেচক ও নিষ্ঠুর| তার উপস্থিতি, কথাবার্তা ও কার্যকলাপ আশেপাশের অনেকের মর্মবেদনা ও সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়| আর মায়া? নিজের মায়ের মতোই ঘটনাচক্রে এক জটিল পরিস্থিতির শিকার| মানুষের মহত্ত্ব, দয়া, সহমর্মিতায় বিশ্বাস হারাতে বসেছে সে, শিশুকালে পিতা-মাতার মর্মান্তিক মৃত্যু ও প্রথম যৌবনেই এক বিবাহিত লম্পটের দ্বারা প্রতারিত হয়ে|
এ-গ্রন্থের মোচড়ে-মোচড়ে দেখা যায়, নারীর সমস্যা ও যন্ত্রণা নারীই বেশি ভালো করে বুঝতে পারে, সমাজের যে-অবস্থানেই তারা থাকুক না কেন, কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতায়, সাংস্কৃতিক পরিশীলতায় বা অন্যসব অর্জিত গুণাবলিতে যতই পার্থক্য থেকে থাকুক তাদের ভেতর|
একেবারে শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, হতাশাপীড়িত সমাজের নিচের তলার নারী ভীমা সর্ব¯^ হারিয়ে শান্তির অšে^ষণে ধীরে-ধীরে ব¤ে^ গেটের পাশে তাদের বহুপরিচিত এবং আত্মার সঙ্গে গেঁঁথে যাওয়া, মিশে যাওয়া খোলা স্রোত¯ি^নী জলাশয়ের ভেতর নেমে পড়ে| ভীমা, জীবন তার যতই অকিঞ্চিৎকর হোক, তারও যে একটা দুর্বার অস্তিত্ব রয়েছে, এই পরিচিত জলধারা যেন সেই অস্তিত্বের মতোই সদা বহমান, যা কালের সাক্ষী হয়ে সেখানে নিরবধি দাঁড়িয়ে রয়েছে, থাকবে|
থ্রিটি উম্রিগর নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ গল্প-কথক| ঝুম্পা লাহিড়ীর মতো হয়তো তাঁকে নিয়ে আমেরিকায়, সমস্ত দেশজুড়ে, তেমন মাতামাতি নেই| কিন্তু দুজনের লেখা পড়েই আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, থ্রিটি উম্রিগরও একজন অত্যন্ত শক্তিশালী লেখক, এবং গ্রন্থ থেকে গ্রন্থে তাঁর লেখার চরিত্র এবং পরিবেশের ˆবচিত্র্য সহজেই ধরা পড়ে|
সাম্প্রতিককালে ভারত উপমহাদেশ থেকে বেশ কয়েকজন নারী লেখক ইংরেজিতে উপন্যাস লিখে জগৎজুড়ে নাম করেছেন| এঁদের মধ্যে কয়েকজন : অনিতা দেশাই, কিরণ দেশাই, থ্রিটি উম্রিগর, অরুন্ধতী রায়, চিত্রা ব্যানার্জি দেবাকরুণী, ঝুম্পা লাহিড়ী, অনিতা রাও বাদামি, অমূল্য মাল্লাদি, ইন্দু সুন্দরেশন, ভারতী মুখার্জি, কাশ্মিরা শেঠ, মনিকা আলী, তাহমিমা আনাম প্রমুখ| এঁদের
কেউ-কেউ নানাভাবে সম্মানিত হয়েছেন| আবার কেউ-কেউ ¯^ীকৃত হয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্মানজনক পুরস্কার বুকার কিংবা পুলিৎজার অর্জনের মধ্য দিয়ে| থ্রিটি উম্রিগর, এঁদের মধ্যে, নিঃসন্দেহে একজন উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্যিক|
লেখক-পরিচিতি
থ্রিটি উম্রিগর : জন্ম মু¤^াইয়ে| ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচ.ডি| বর্তমানে আমেরিকার ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যের কেইস ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন| ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিভিন্ন খবরের কাগজে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন| তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম ইড়সনধু ঞরসবং| ঞযব ঝঢ়ধপব ইবঃবিবহ টং তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস| তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘরবসধহ ঋবষষড়ংিযরঢ় পান| ওহাইয়োর ক্লিভল্যান্ড শহরে স্থায়ীভাবে বাস করছেন| তাঁর গ্রন্থের ভেতর ঞযব ডবরমযঃ ড়ভ ঐবধাবহ, ঞযব ডড়ৎষফ ডব ঋড়ঁহফ, ওভ ঞড়ফধু নব ঝবিবঃ, ঋরৎংঃ উধৎষরহম ড়ভ ঃযব গড়ৎরহম উল্লেখযোগ্য|
ঞযব ঝঢ়ধপব ইবঃবিবহ টং
ঞযৎরঃর টসৎরমধৎ
ঐধৎঢ়বৎ চবৎবহহরধষ
ঘবি ণড়ৎশ, ২০০৭
টঝ $ ১৩.৭০ ৎ


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.