আমার সূর্যমুখীরা

আমার সূর্যমুখীরা

আবদুল ওয়াহাব

হাসপাতালের ছোট্ট কেবিনটার বাইরে বেশ ভিড়। করিডোরের একপাশে দুজন পুলিশ দাঁড়িয়ে। একটু দূরে দুজন নার্স চাপা গলায় কথা বলছিল। কয়েকজন সাংবাদিক দাঁড়িয়ে, কারো হাতে মাইক্রোফোন, কারো হাতে ক্যামেরা। ব্লগার ছিল, ইউটিউবার ছিল। তাদের চোখেমুখে অধৈর্য ভাব। রাজনৈতিক দলের দু-তিনজন কর্মী মুখ গম্ভীর করে কেবিনের সামনে রাখা একটা সোফায় বসে ছিল। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের এক নারী প্রতিনিধি কাগজপত্র হাতে অপেক্ষা করছিল। পরিচিতজন ছিল, প্রতিবেশী ছিল, এমন কিছু মানুষের উপস্থিতি দেখলাম, যাদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের তেমন কোনো যোগাযোগই ছিল না। কিন্তু শহরে এরকম খবর ছড়ালে কিছু মানুষ হঠাৎ খুব কাছের হয়ে ওঠে। সবাই ছোট্ট লবিটায় ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ চাপা গলায় কথা বলছিল, কেউ অনুমান করছিল, কেউ মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছিল, কেউ আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। অথচ কেবিনের ভেতর থেকে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে কোনো শব্দ বের হয়নি।

কেবিনের দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ নয়। আধখোলা। তবু ভেতরটা যেন আলাদা এক পৃথিবী। বাইরে গমগমে উৎকণ্ঠা, ভেতরে জমাট নীরবতা। জানালার সাদা মোটা পর্দাগুলো এমনভাবে টানা যে, ভেতরে আলো ঢোকার পথ প্রায় বন্ধ। জীবাণুনাশকের গন্ধে ভরা আধো অন্ধকার করে ঘরটা রাখা হয়েছে, যেন মেয়েটা চায় না পরিচিত মুখগুলোকে দেখতে। চায় না তাদের চোখে জমে থাকা অস্থিরতা দেখতে। সেই অস্থিরতা নিয়েই কেবিনে ছিল পাঁচজন। তার দাদি,  মা, যমজ বোন, বোনের স্বামী আর আমি – তার বাবা।

বিছানায় শুয়ে আছে আমার ছোট মেয়ে। তার শরীর সাদা চাদরের নিচে চাপা। মাথার ডান পাশে ব্যান্ডেজ। ঠোঁট ফেটে গিয়েছে। চোখ বন্ধ। নিশ্বাস চলছে, এইটুকুই বোঝা যায়।

আমার স্ত্রী খুব নিচু গলায় বলল, ‘জানালাটা খুলে দেব? মেয়েটা অনেক দিন আলো দেখেনি। একটু আলো এলে হয়তো ভালো লাগবে।’

ওকে অস্থির লাগছিল। ওর কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছিল, সে আসলে এই অন্ধকার সরাতে চাইছে, এই দমবন্ধ করা সময়টার ভেতর একটু সতেজ বাতাস ঢোকাতে চাইছে। আমি কী একটা বলেছিলাম, কিন্তু সেটা এত দুর্বল ছিল যে, কারো কাছে গিয়ে পৌঁছাতে পারল না। মাঝপথেই থেমে গেল।

স্ত্রী আবার বলল, ‘জানালাটা খুলে দেব?’

আমি শুনলাম। কিন্তু উত্তর দিলাম না। স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম। সে-ও আর তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না।

আমি জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সাদা বিছানার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। খুঁজছিলাম আমার ছোট মেয়ের কালো চোখদুটো। আমি জানতাম, পরেরবার যখন সে চোখ খুলবে, প্রথমেই আমাকে খুঁজবে। মাথাটা ধীরে ধীরে আমার দিকে ঘুরবে। ফেটে যাওয়া ঠোঁটগুলো নড়ে উঠবে। এলোমেলো কিছু শব্দ বের হবে। আমি সেগুলো মিলিয়ে বুঝে নেব, সে বলছে, ‘আলো আসুক।’

আর তখনই আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে পর্দাগুলো সরিয়ে দেব। বলব, ‘এই দেখো, মা, আমার ছোট্ট মেয়ে, আমার সূর্যমুখী, তোমার জন্য আমি সূর্য এনে দিয়েছি। তাকাও। বেঁচে থাকো, মা। আর, একদম ভয় পেয়ো না।’

কিন্তু ওর ভেতরে তখনো ওষুধের গাঢ় ঘুম। ওষুধগুলো তার শরীরকে বিছানার সঙ্গে চেপে রেখেছিল। নড়াচড়া বন্ধ। থেঁতলানো ঠোঁট দুটো চুপ করে রেখেছিল। শুকনো জিহ্বাটাকে চোয়ালের সঙ্গে যেন সেঁটে দিয়েছিল। আর চোখের পাতাগুলো নামিয়ে তাকে ডুবিয়ে রেখেছিল গভীর ঘুমে। সে নিথর পড়ে ছিল, যেন সাদা চাদরেরই অংশ। ডাক্তার বলেছে, ঘুমটা দরকার। শরীরের জন্য দরকার, মাথার জন্য দরকার। আমি ভাবছিলাম, ঘুম কি মানুষের যন্ত্রণা কমাতে পারে? শরীরেরটা হয়তো পারে; কিন্তু মনের ভেতর যে জায়গাগুলো ভেঙে যায়, সেগুলো?

আমি তাকিয়ে বড় মেয়েকে ইশারা করলাম। সে এগিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়াল। আমি আর কোনো ইশারা না করায় সে-ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

দুই

আমার যমজ মেয়েরা যখন তাদের মাথা শুধু এদিক-ওদিক নাড়াতে শিখেছে, তখন থেকেই তারা আমাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করত। আমার কথা তাদের কানে গেলেই তারা আমার দিকে তাকাত। আর তাই তাদের মা খানিকটা ঈর্ষা নিয়েই ওদের ডাকত – ‘তোমার সূর্যমুখীরা।’

হ্যাঁ, তারা আমার সূর্যমুখীই ছিল।

ওরা হাসতে শিখেছিল, কিন্তু হাসার আগেও যেন আমার সম্মতির দরকার হতো। ক্ষুধা পেলে কাঁদত। তাদের মা বুকের দুধ খাইয়ে কান্না থামাতে চাইত। কিন্তু দুধ মুখে দেওয়ার আগেই ওরা কান্না থামিয়ে আমার দিকে তাকাত, যেন জানতে চাইছে, খেতে পারি? হাঁটতে শিখেছিল, কিন্তু প্রতিবার পা তোলার পর অপেক্ষা করত, আমি হাত বাড়াই কি না। চোখে চোখ রেখে আমার কাছে সংকেত চাইত। বড় হতে হতে তারা খেতে শিখল, খেলতে শিখল, পড়তে শিখল। কিন্তু খাবার, খেলনা, বই, সবকিছুতেই শেষ পছন্দটা যেন আমারই হতে হবে, এই বিশ্বাস তাদের ভেতরে গেঁথে বসেছে।

তারা আমার সূর্যমুখী ছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আর আমার স্ত্রী? সে-ও কি আমার সূর্যমুখী ছিল না?

ছিল। অবশ্যই ছিল।

বিয়ের প্রথম রাতে সে আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আলোটা নিভিয়ে দেব?’ এত ছোট একটা প্রশ্ন, অথচ সেই প্রশ্নের ভেতরেই যেন তার পরের জীবনের ছায়া লুকিয়ে ছিল। আমি বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ।’ সে আলো নিভিয়েছিল।

বিয়ের প্রথম মাস শেষে সে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘চাকরিটা ছেড়ে দেব? তোমাকে আরো বেশি সময় দিতে পারব।’

আমি বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ।’

সে খুশিতে ভরে উঠেছিল।

বিয়ের প্রথম বছর পেরোতেই সে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘একটা বাচ্চা নেব?’

আমি বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ।’

স্ত্রী নিজের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তারপর থেকে প্রায় সবকিছুতেই সে আমার দিকে তাকিয়েছে। কোন কাপড় পরবে, কী রান্না করবে, কী করবে, কী করবে না। যেন শরীরের স্বাভাবিক কাজগুলো ছাড়া বাকি সবকিছুর আগে তাকে আমার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হয়। সে আমার পছন্দের কাপড় পরত। আমার পছন্দের খাবার রান্না করত। কিন্তু তার আগেও জিজ্ঞেস করত, ‘এটা পরব?’ ‘এটা রান্না করব?’

তাই আমার স্ত্রী আর মেয়েরা যে আমার সূর্যমুখী, তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ ছিল না।

কিন্তু আমার মা? তিনিও কি আমার সূর্যমুখী ছিলেন না? ছিলেন। অবশ্যই ছিলেন।

বাবার মৃত্যুর পর তার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষটি হারিয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে সব দায়িত্ব, সব দুশ্চিন্তা, সব সিদ্ধান্ত এসে আমার ওপর পড়ল। আমারো তখন ভালো লাগত। মনে হতো, এই পরিবারের কেন্দ্র আমি। আমি না থাকলে কিছুই নড়বে না।

এই ভালো লাগাটাই যে একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধবোধ হয়ে দাঁড়াবে, তা কখনো ভাবিনি।

তিন

বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েটা হঠাৎ একটু নড়ে উঠল।

ঘরের তিন নারী উৎকণ্ঠিত চোখে আমার দিকে তাকাল। আরেকজন পুরুষ, আমার জামাই, তাড়াতাড়ি বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। আমার এক ইশারায় তিন নারীও বিছানার কাছে চলে গেল। আমার স্ত্রী বিছানার একপাশে বসে পড়ল। মা বিছানার কিনারায় হাত রেখে দাঁড়ালেন। বড় মেয়ে সামনের দিকে ঝুঁকল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম একটু দূরে।

মেয়েটার ঠোঁট কাঁপল। তারপর খুব মৃদু একটা শব্দ এলো, ‘বাবা …’

আমার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। অদ্ভুত এক ঠান্ডা স্রোত মাথা থেকে পায়ের পাতায় নেমে গেল। আমি ভাবলাম, এ-সময়েও সে আমাকে ডাকছে। কেন? সান্ত্বনার জন্য? ভরসার জন্য? নাকি অভিযোগের জন্য?

সে আবার বলল, ‘বাবা …’

আমার মা আমার দিকে তাকালেন। স্ত্রীও তাকাল। বড় মেয়েও। ছয়টি চোখ এসে থামল আমার মুখে। আমি অস্বস্তি বোধ করলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমার ভেতরে কী হচ্ছে। আমি কি ভয় পাচ্ছি? আমি কি নিজেকে অপরাধী মনে করছি? আমি কি নিজের নামটা ওই ডাকের ভেতর সহ্য করতে পারছি না?

ঘরে এসি চলছিল, তাপমাত্রা বিশ ডিগ্রির নিচে, তবু দেখলাম আমার জামাইয়ের কপালে ঘাম। তার চোখ দুটো স্থির নয়। সে আমার দিকে তাকাচ্ছে না। কখনো বিছানার দিকে, কখনো মেঝের দিকে তাকাচ্ছে।

মা বললেন, ‘ও তো গত সাতদিন বাসাতেই ছিল। কোথাও বের হতে দেখিনি।’

আমার স্ত্রী বলল, ‘সারা সপ্তাহ কলেজেও যায়নি।’

বড় মেয়ে বলল, ‘কেউ বাসায়ও ঢোকেনি। আমি সিসিটিভির ফুটেজ দেখেছি। কে করেছে এটা? বল না! শুধু নামটা বল!’

ছোট মেয়ে তৃতীয়বার বলল, ‘বাবা …’

মনে হলো, পৃথিবীর সব শব্দ সে ভুলে গেছে, শুধু এই একটিই মনে আছে।

আমি এগিয়ে গেলাম। আমার যেন পা-দুটো আটকে যাচ্ছিল। গিয়ে ওর হাত ধরলাম। হাতটা ঠান্ডা, কিন্তু ডানাভাঙা পাখির মতো কাঁপছিল। আমি মেয়ের ডান হাতটা ধরে সাদা চাদরের বাইরে আনলাম। বললাম, ‘মা, কে এই কাজ করেছে, বলবে?’

সে চোখ খুলতে চেষ্টা করল। পুরো খুলতে পারল না। কিন্তু কষ্ট করে হাত তুলল। আমি হাতটা একটু উঠিয়ে দিলাম। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তারপর তার বাঁকানো আঙুল থেমে গেল এক জায়গায়। তার দুলাভাইয়ের দিকে। এরপরই তার সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে গেল। চোখ বুজে এলো। হাতটা বিছানায় পড়ে গেল। শ্বাস ধীর হয়ে এলো। কান বরাবর অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।

ঘরটা এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর সেই নিস্তব্ধতাকে ভেঙে আমার বড় মেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার স্বামীর ওপর। কী দ্রুত সবকিছু হয়ে গেল, আমি দেখেও বুঝতে পারিনি। সে তার স্বামীর কাছে গিয়ে নাকে পরপর কয়েকটা ঘুষি মারল। নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল। সে টিস্যু খুঁজছিল, নিজের রক্ত

থামানোর চেষ্টা করছিল। সে দু-হাতে মুখ ঢাকল। বলল, ‘থামো, শোনো, কোথাও ভুল হচ্ছে …’ 

কিন্তু আমার বড় মেয়ের কানে তখন আর কোনো কথা যাচ্ছে না।

সে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘চুপ! একটা

কথাও বলবে না। আজ থেকে তুমি এই পরিবারের কেউ নও। বের হয়ে যাও এখান থেকে। তোমার সঙ্গে কোর্টে দেখা হবে।’

আমার জামাই পালিয়ে গেল। বড় মেয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।

আমার মনে হলো, ও যদি আমার মুখেও দু-একটা ঘুষি মারত! আমি মনে মনে বললাম, ‘এই ঘটনার জন্য আমিও কম দায়ী নই।’

আমি কল্পনা করতে পারছিলাম, আমার ছোট্ট সূর্যমুখী হয়তো সেই সময়ও আমাকে খুঁজছিল। মনে মনে জিজ্ঞেস করছিল, ‘বাবা, আমি কি এই লোকটার বিরুদ্ধে দাঁড়াব? আমি কি তাকে বাধা দেব?’

সে হয়তো অপেক্ষা করেছিল। দেখেছিল, লোকটা তার গায়ের ওপর শরীর চাপিয়ে দিচ্ছে। আমার কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সে বুঝতে পারেনি কী করবে। নিজের ইচ্ছায় কিছু করা সে শেখেনি। তাই কিছুই করেনি। প্রতিবাদও করেনি। আর তার এই নীরবতাকেই লোকটা সম্মতি ভেবেছিল।

হঠাৎ আরেকটা চিন্তা মাথায় বিদ্যুতের মতো ঝলকে উঠল। আমার বড় মেয়ে? সে কীভাবে তার স্বামীর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল আমার সম্মতি ছাড়া? তখন আমার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, সে বারবার আক্রান্ত হয়েছে। শুধু শরীরে নয়, ইচ্ছায়ও। সিদ্ধান্তে। স্বাধীনতায়। কারণ আমি তাদের সূর্যমুখী ছাড়া আর কিছু হতে দিইনি।

আমি আমার ভেতরে যা কিছু এতদিন ‘দায়িত্ব’ বলে ভেবেছিলাম, তার ভেতরেই ছিল এক ধরনের শাসন। এক ধরনের দখল। আমি আমার পরিবারের সব নারীকেই এতদিন ভালোবেসেছি, সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যে আমি তাদের আলাদা মানুষ হিসেবে বড় হতে দিইনি। তাদের ইচ্ছা, দ্বিধা, সিদ্ধান্ত, ভুল করার অধিকার, না বলার শক্তি, কিছুই আমি আলাদা করে গড়ে উঠতে দিইনি। তারা আমার চারদিকে সূর্যমুখী ফুলের মতো ঘুরেছে। আমি সেই ঘোরাটাকে মমতা ভেবেছি। অথচ তাতে তাদের মেরুদণ্ড একটু একটু করে নরম হয়ে গেছে।

আমি বিছানার ধারে বসে ছোট মেয়ের মাথার দিকে তাকিয়েছিলাম। মনে পড়ছিল অনেক কথা।

একদিন বাড়িতে অতিথি এসেছিল। আমার ছোট মেয়ে তখন পাঁচ বছরের। সবার জন্য চা-নাস্তা দেওয়া হচ্ছে। সে একটা বিস্কুট হাতে নিয়েও দাঁড়িয়ে আছে। খাচ্ছে না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘খাচ্ছ না কেন?’

সে বলেছিল, ‘তুমি তো বলোনি।’ 

সবাই হেসেছিল। আমিও হেসেছিলাম। ভেবেছিলাম, কী মিষ্টি নির্ভরতা! আজ মনে হচ্ছে, সেই হাসির ভেতরেই একটা বিপদ ছিল।

আমার বড় মেয়ের বিয়ের দিনও একটা ঘটনা ঘটেছিল। সে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বিয়েটা কি একদম ফাইনাল?’ আমি তখন মজা করে বলেছিলাম, ‘এতদূর এসে আবার জিজ্ঞেস করছিস?’ 

সে হেসেছিল। কিন্তু এখন মনে হয়, প্রশ্নটায় মজা ছিল না। হয়তো সে শেষবারের মতো নিশ্চিত হতে চাইছিল, নিজের জীবন অন্য একজনের হাতে তুলে দেওয়ার আগে তার নিজের ভেতরে কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি না। আর আমি তার চোখের ভেতরের দ্বিধাটুকুও পড়িনি।

চার

ঘটনার পরের কয়েকদিন হাসপাতাল, থানা, কাগজপত্র, জবানবন্দি, ডাক্তার, আত্মীয়স্বজন, ফোনকল, সব মিলিয়ে জীবন এক অদ্ভুত চাকার মতো ঘুরতে লাগল। বাইরে লোকজন আসছে, যাচ্ছে, কথা বলছে, আর ভেতরে আমরা ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যাচ্ছি। আমার মেয়েটা কখনো ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছে, কখনো স্যালাইন আর ওষুধে ডুবে যাচ্ছে। আমার স্ত্রী কোনো সময় কাঁদে, কোনো সময় চুপ করে বসে থাকে। বড় মেয়ে এক রাতে আমার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, ‘বাবা, আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। আমি একই বাসায় ছিলাম, একই ছাদের নিচে। আমি কিছুই বুঝতে পারিনি।’

আমি তার মাথায় হাত রাখতে গিয়েও থেমে গেলাম। আমার মনে হলো, এই না-বোঝার ভেতরেও আমার অংশ আছে। আমি তাদের এমনভাবে বড় করেছি যে, তারা অন্যের কষ্টও শেষ পর্যন্ত আমার চোখ দিয়ে বুঝতে শিখেছে। নিজের চোখ দিয়ে নয়।

মা এক রাতে বললেন, ‘বাবা, পুরুষ মানুষ ঘরে থাকলে মেয়েরা নিরাপদ থাকে, এটাই তো এতদিন ভাবতাম।’

আমি উত্তর দিলাম না। কারণ আমার মাথার ভেতরেই তখন এই কথাটা ঘুরছিল। পুরুষ মানুষ ঘরে থাকলেই কি নিরাপত্তা আসে? নাকি অনেক সময় বিপদও ঘরের ভেতরেই বসে থাকে, শুধু চেহারা বদলে?

আমি অনেক রাত জেগে থাকতাম। ছোট মেয়ের বিছানার পাশে বসে তার নিশ্বাস গুনতাম। আমার মনে হতো, সে জেগে উঠলেই হয়তো আমাকে কোনো প্রশ্ন করবে। হয়তো বলবে, ‘সেই সময় তুমি কোথায় ছিলে?’

তিন সপ্তাহের অসহ্য যন্ত্রণা শেষে এক সুন্দর সন্ধ্যায় আমার ছোট সূর্যমুখীর জ্ঞান ফিরল।

বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। জানালার কাচে টুপটাপ শব্দ। ঘরে মøান আলো। সে চোখ খুলে অনেকক্ষণ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আমাকে দেখল। আমি সেই চাহনি আজো ভুলতে পারিনি। সেখানে কষ্ট ছিল, কিন্তু লজ্জা ছিল না। সেখানে আমি প্রথমবার দেখলাম, সে আর আগের সেই শিশু নেই।

আমি এগিয়ে গেলাম। বললাম, ‘কেমন লাগছে, মা?’

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘ব্যথা আছে।’

এটাই ছিল তার প্রথম সম্পূর্ণ বাক্য।

আমি বললাম, ‘ডাক্তার বলেছে ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।’

সে মাথা নড়াল না। শুধু আমার হাতের দিকে তাকাল। আমার হাত কাঁপছিল। হয়তো বয়সে, হয়তো ক্লান্তিতে, হয়তো অপরাধবোধে।

পরের দিনগুলোতে ওর শরীর একটু একটু করে সেরে উঠল। কথা বাড়ল। কিন্তু ওর চুপ থাকার ভেতর নতুন কিছু ছিল। আগে সে আমার চেহারা দেখে বুঝতে চাইত আমি কী ভাবছি। এখন সে নিজের ভেতরে তাকিয়ে থাকে। একদিন সকালে আমি ওকে ডাকলাম। বাইরে আকাশে হালকা মেঘ। আমি তার হাত ধরলাম। আমার হাত ঠান্ডা। সে চমকে তাকাল।

আমি বললাম, ‘আমার বেশ ভয় লাগছে, মা।’

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, ‘আমারও লেগেছিল। খুব ভয় পেয়েছিলাম, বাবা। খুব বেশি ভয় পেয়েছিলাম।’

শব্দগুলো আমাকে যেন ভেতর থেকে ছিঁড়ে ফেলল।

আমি বললাম, ‘আমি ছিলাম না। না?’

সে বলল, ‘তুমি ছিলে। কিন্তু আমি নিজের ভেতর ছিলাম না।’

আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই কথাটা আমি আগে কখনো ভাবিনি। শরীরের ওপর আঘাত মানুষকে শুধু ভাঙে না, নিজের ভেতর থেকে সরিয়েও দেয়।

সে আরো বলল, ‘নতুন কোনো পরিস্থিতি সামনে এলেই আমি সব সময় ভাবতাম, কী করব তা তুমিই বলবে। ছোটবেলা থেকে তাই শিখেছি। ওইদিনও মাথায় প্রথমে সেটাই এসেছিল। আমি কি চিৎকার করব? আমি কি ধাক্কা দেব? আমি কি দৌড়াব? আমি কি কাউকে ডাকব? আমি কি ভুল করছি? আমি কয়েক সেকেন্ড তোমাকে ভেবেছি। তারপর সব গুলিয়ে গেছে।’

আমি আর চোখ তুলে তাকাতে পারলাম না। মনে হচ্ছিল, আমার জীবনের সব গর্ব একসঙ্গে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে। অনেকক্ষণ পরে আমি বললাম, ‘আমাকে মাফ করতে পারবি?’

সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো না। জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল। বাইরে রোদ উঠছিল। পর্দার ফাঁক দিয়ে আলোর সরু রেখা বিছানায় এসে পড়েছে।

পাঁচ

আহারে অনিয়ম আর অনিদ্রা তো আছেই, তার সঙ্গে গত কয়েক সপ্তাহে এত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে যে, আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আর পারছিলাম না। তাই অপরিচিত মানুষের অপরিচিত প্রশ্ন থেকে দূরে থাকতে আমি সেই একই কেবিনে  পড়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একই কেবিনে আরেকটা বিছানা এনে দিলো। সাদা চাদরের ওপর সাদা কাপড় মুড়ি দিয়ে আমিও শুয়ে রইলাম। বাইরে থেকে নিথর, ভেতরে ভীষণ অস্থির।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি একটাই কথা ভাবতাম, ‘আমি না থাকলে আমার এই সূর্যমুখীদের কী হবে? কে তাদের পথ দেখাবে? কে তাদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করবে?’

আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না যে, আমার চলে যাওয়ার পর থেকেই এই চার নারী নিজেদের মতো চলতে শিখে যাবে।

এক বৃষ্টিভেজা সকালে আমি হাত তুলে ছোট মেয়েকে ডাকলাম। সে তার বিছানা ছেড়ে ধীর পায়ে আমার বিছানার পাশে এলো। আমি আমার ঠান্ডা হাত দিয়ে তার হাত ধরলাম। সে কিছু বলতে চাইল, পারল না। তার বদলে কেঁদে ফেলল।

আমার মনে পড়ল, ওর চার বছর বয়সে একদিন সে এমন করে কেঁদেছিল। বাড়ির পেছনের উঠোনে বাচ্চারা ফুটবল খেলছিল। সেও খেলতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তখন বাসায় ছিলাম না। আমাকে সে জিজ্ঞেস করতেও পারেনি, আর খেলতেও পারেনি। সে অনেক কেঁদেছিল। আমি ফিরে এসে সব শুনে সেদিনই তাকে একটা ফুটবল কিনে দিয়েছিলাম। বলটা হাতে নিয়েই সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আমি কি এটায় লাথি মারতে পারি?’

আমি হেসে বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’

ছয় বছর বয়সে জন্মদিনে আমি তাকে একটা বার্বি পুতুল দিয়েছিলাম। আনন্দে লাফিয়ে উঠে সে বলেছিল, ‘এটা কি রাতে পাশে নিয়ে ঘুমাতে পারি?’

আমি বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, কেন নয়?’

প্রথমবার পরীক্ষায় বসেও সে কোনো প্রশ্নের উত্তর লেখেনি। পরে আমাকে বলেছিল, আমি তো ছিলাম না, তাই লিখবে কি না বুঝতে পারেনি। তারপর থেকে আমি খুব সাবধান হয়ে গিয়েছিলাম। ওদের যা যা করতে হতে পারে, আগেভাগেই সেসবের অনুমতি দিয়ে রাখতাম। এটা করতে পারবে, ওটা করতে পারবে। কিন্তু সবকিছু কি আগে থেকে ভেবে রাখা যায়? প্রতিদিন নতুন নতুন ঘটনা আসে, নতুন নতুন প্রশ্ন আসে, নতুন নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সব সিদ্ধান্ত সময়মতো দেওয়া যায় না।

অনেকদিন ধরে ভেবেছিলাম, আমি এই পরিবারের সূর্য। এখন বুঝি, আমি সূর্য ছিলাম না, ছিলাম ছায়া। ছিলাম এমন এক কেন্দ্র, যার চারপাশে সবাই ঘুরতে ঘুরতে নিজের ভেতরের কম্পাস হারিয়ে ফেলেছিল। সেই ভুল বুঝতে আমার এত বছর লেগে গেল। আর তার চরম মূল্য দিলো আমার ছোট মেয়ে।

এই বোঝাটাই হয়তো আমার শেষ শাস্তি, আবার শেষ শিক্ষা।

এখন যখন বিকেলের আলো ঘরে ঢোকে, আমি আর কাউকে ডাকি না। আর বলি না, এটা করো, ওটা করো, এভাবে থাকো, ওভাবে বসো। আমি শুধু দেখি। দেখি আমার স্ত্রী নিজের পছন্দে কথা বলে। দেখি বড় মেয়ে আদালতে যাওয়ার কাগজ নিজে গোছায়। দেখি কখন ওষুধ খেতে হবে মা নিজেই মনে রাখে। আর দেখি আমার ছোট মেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়, কিন্তু কারো অনুমতির অপেক্ষায় থাকে না। তার চুলে আলো পড়ে। মুখে ধীরে ধীরে রং ফিরছে। চোখে এখনো গভীরতা আছে, ক্লান্তি আছে, কিন্তু সেখানে আর সেই পুরনো প্রশ্ন নেই। সেখানে এখন নিজের দিকে ফেরার পথ আছে।

আমি ছোট মেয়েটিকে দেখে এখনো মনে মনে সূর্যমুখী বলি। তারপর নিজেই ভুল শুধরে নিই। না, সে আর সূর্যমুখী নয়। সে এখন নিজের আকাশের মানুষ। আর আমি, বহু দেরিতে হলেও, আলো দেওয়ার ভান ছেড়ে শুধু জানালা খুলে দিতে শিখছি।

তারপরও বললাম, ‘আমি তোমার জন্য একটা আকাশ এনে দেব। একটা বড়, উজ্জ্বল সূর্যসহ।’

আগে হলে সে হয়তো বলত, ‘আমার জন্য এনে দাও।’

অথবা অন্তত জিজ্ঞেস করত, ‘আমি কি নিজে খুঁজে নেব?’

কিন্তু এবার সে যেন নিজের ভেতর থেকেই আলো খুঁজে পেয়েছে। কোনো অনুমতির অপেক্ষা না করে নিজেই হাসল। তারপর বলল, ‘আমি আমার আকাশ নিজেই খুঁজে নেব। আমার আর সূর্যের দরকার নেই।’

আমি এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে আবার খুললাম। এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমিই অনুমতি চাইলাম, ‘আমি কি আনন্দে কাঁদতে পারি?’

মেয়েটি আগে নিজের চোখের জল ফেলল। তারপর মাথা নেড়ে আমাকে অনুমতি দিলো। আমার চোখ বেয়ে আনন্দ নেমে এলো। সে আমার কপালে চুমু খেলো। নিজের হাতে আমার চোখের জল মুছে দিলো। তারপর এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, যেন আমাকেই বলছে, এবার থামো। আমি থেমে গেলাম। তার এই নির্দেশ মেনে নিতে আমার অদ্ভুত এক শান্তি হলো। মনে হলো, আহা, যদি আরো কয়েক বছর আমি ওরই সূর্যমুখী হয়ে বাঁচতে পারতাম!

কিন্তু ছোট্ট কেবিনটা তখন আমার কাছে আরো ছোট, আরো ঠান্ডা, আরো অন্ধকার হয়ে আসছিল।