অনাময় নিকেতন

তিন

‘মনের ভেতর অনেক বিষয় যখন ভার হয়ে চেপে বসে, তখন নির্ভার হওয়ার জন্যে কি জলের কাছে যাওয়াই উচিত? হাওয়ার কাছে যাওয়া যায়, পাথরের কাছেও; কিন্তু জলই বোধহয় বেশি ভালো। জলের ভেতর এমন ঈশ্বর জমে থাকে যে, ওই ভারটুকু পেলে শুধু আত্মস্থই করে না, তার কাছে প্রাণের যে সম্ভাবনা ঘুমিয়ে, সেটুকুও জাগিয়ে এক সচল শরীর বানায়। প্রকৃতির মনের ওপর যখন প্রথম এমন ভর চেপে বসেছিল, এবং ক্রমে তা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল, তখনই বোধহয় জল তা গ্রহণ করে প্রথম জীব তৈরি করেছিল।…’

নিয়ন আলোর নিচে ঢাকা মেডিক্যালের রাতরূপসী উঠান। অনেক লোকের সমাবেশ, তবু নিঃসঙ্গ। অশেষ শোরগোল, তবু নিশ্চুপ।

 উঠানকে একটা সরোবরের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তিনটা নদী বেরিয়ে তিন দিকে গেছে। একটা পথ চলে গেছে পশ্চিমের সদর দরজায়। ওদিকে চানখাঁরপুল। বাইরে গাড়িঘোড়ার জটলা। আরেকটা পথ গেছে উত্তর দিকে। হাসপাতালের কিছু জটালো অলিগলি আছে ওদিকটায়। গলিগুলো কি শহিদ মিনারের দিকে বেরিয়ে গেল? শেষটা দক্ষিণগামী। ওটা ধরে আমরা হাঁটছিলাম। পথটা মূল ভবনের দিকে গেছে।

 খানিক এগোতেই বাঁয়ে একটা অচর্চিত বাগান। সেখানে একটা মৃত কাঠগোলাপ গাছ। কেমন মন খারাপ করে সিকি শতাব্দী আগের কথা বলছে। পাশেই কবন্ধ আরেকটি অচেনা গাছ। এর সারা শরীরজুড়ে গত শতাব্দীর নীরবতা। গাছ দুটোর উল্টো দিকে অর্থাৎ ডানদিকে একটা পরিত্যক্ত দোতলা ভবন। নিচতলার প্রতিটা দরজায় মরচেপড়া তালা। ওপরতলাতেও নিশ্চয়ই। একসময় এখানে আবাসিক ছাত্ররা থাকত। এখন শূন্যঘরে ধুলোট বাতাস থমকে থাকে। সামনেই একটা সেতু। ছোট্ট। ঝাঁপ দিয়েছে জরুরি বিভাগের উঠানে।

এবং – 

সেই সেতুর ওপর আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি। আমি আর ময়ূখ। গোটা জায়গাটায় পুরান ঢাকার ঘ্রাণ। আদি ঢাকার একেবারে প্রান্তসীমায় দাঁড়ানো এ-হাসপাতাল। পুরনো ও নতুন দুটোর হৃৎপিণ্ড থেকেই দূরে। নতুন ঢাকার হৃৎপিণ্ড তো শুনেছি এখন আরো দক্ষিণে সরে গেছে। নিশ্চিত নই।

বাঁকানো ওই ছোট্ট সেতুর নিচ দিয়ে জলের কোনো ধারা বয়ে যাচ্ছে না। তবু আমার মন কল্পনায় একটা ধারা তৈরি করে নিল। দেখলাম, স্বচ্ছ জল নুড়িতে বাধা পাচ্ছে। রিনরিনিয়ে গান গাইছে। আমার মন তার কাছে আশ্রয় চাইল।

‘আমাকে তোমার গানের কাছে আশ্রয় দাও কল্পমিতা জল।’

আশ্রয়ের এমনই অভাব ছিল যে, আমাকে কল্পনা করে নেওয়া শব্দের কাছে দাঁড়াতে হচ্ছিল। কী এমন তাড়াচ্ছিল আমাকে?

দুই

তো ডক্টর ময়ূখ, কেমন আছ? মেডিক্যালের ভেতর তোমরা যে বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাও তাতে করে দুটো ব্যাপার ঘটতে পারে। এক, তোমরা পুরোপুরি নির্লিপ্ত হয়ে গেলে। দুই, ব্যাপারটা উন্মাদনার দিকে এগোল। মাঝামাঝি কিছু হওয়ার পথ খোলা নেই। যে নির্লিপ্ত সে ভালো বা খারাপ দুটোতেই নির্লিপ্ত। যে উন্মাদ তার অল্প আর বেশির সীমারেখা নাজুক। সুতরাং তোমরা কিন্তু বিপদে আছ। কিভাবে বেঁচে আছো? হিপোক্রেটিসের শপথ মৃত্যু থেকে তোমাদের রক্ষা করছে? তুমি এ নিয়ে কিছু ভেবেছো? আমি হলে বদ্ধপাগল হয়ে যেতাম ময়ূখ। বদ্ধপাগল।

এসব বললাম মনে মনে। মুখে বললাম, ‘এখানে থাকলে মাঝামাঝি কিছুর চান্স নেই। হয় নির্লিপ্ত, নয় বদ্ধউন্মাদ।’

ময়ূখ বলল, ‘কোনটা ভালো? নির্লিপ্ত হওয়া, নাকি উন্মাদ?’

‘ব্যক্তিভেদে। কেউ নির্লিপ্ততাকে চালিয়ে নিতে পারে, কেউ উন্মাদনাকে চালিয়ে নিতে জানে। যে পারে না সে একদিকের নির্লিপ্ততার ব্যালেন্স করতে গিয়ে আরেকদিকে হয়তো দারুণ উন্মাদ হয়ে উঠল। কেউ একদিকের উন্মাদনা সামলাতে গিয়ে আরেকদিকে ভীষণ উদাসীন! হতে পারে না?’

‘জানি না।’

‘এখানেই যত ডিসকোর্সের গোড়া। যত নষ্টের গোড়াও।’

‘নতুন কোনো বিষয়ের সামনে দাঁড়ালে তার কিছু অংশ হৃদয় নিতে চায়, কিছুটা চায় এড়াতে। যেটাই করুক আগে তো ওই বিষয়ের সংসর্গে যেতে হয়, বা বিষয়টিকে তার সংস্পর্শে আসতে দিতে হয়। ওই এক চূড়ান্ত মুহূর্ত। তখন যেটুকু চোখে দেখা, তা দিয়ে যেটুকু না-দেখা তার ব্যালেন্স গড়ো! তুমি মানুষ বলেই কি এমন সুচারু হওয়ার দায়টা বড়? … ”

এক

রিকশা ভাড়া মিটিয়ে ঢাকা মেডিক্যালের নতুন ভবনের পেছনের একটা অপরিসর উঠানের কাছে দাঁড়ালাম। সামনে কলাপসিবল গেট। মৃত্যুর খিড়কি দুয়ার। চিকিৎসকদের দাপটে এ-পথে সে নিত্য পালায়।

হেঁটে পৌঁছালাম সামনের উঠানে। কাচের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লাম। সেই ফিনাইলগন্ধী বিষণ্ন বাতাস।

নিচতলা বেশ সুপরিসর। ছড়ানো-ছিটানো মানুষ। লিফট দুটোর সামনে লম্বা লাইন।

আটতলায় উঠে এলাম। ময়ূখ লিফট থেকে বেরিয়ে উত্তর দিকে আসতে বলে দিয়েছিল। দরজা খুললে দেখি উত্তর দিকে পথ গেছে দুটো। সাহস করে পূর্বদিকেরটা ধরে এগোলাম।

ফরচুন ফেভার্স দ্য ব্রেভ। কাচ ও কাঠের দরজা, তার ওপর লাল রঙে লেখা –

ইমার্জেন্সি

উইমেন’স ওয়ার্ড

মেডিসিন বিভাগ

লেখার রং ফেটে ফেটে গেছে যেন বদ্বীপের নদীনালা নেমে গেছে সাগরের দিকে। দরজা ঠেলে ঢোকার পরও করিডোরটা শেষ হলো না। হঠাৎ মুক্ত হলো একটা হলরুমে। যেন মায়ের জঠর পার হয়ে হঠাৎ আমার জগৎদর্শন হলো।

চল্লিশটির মতো বিছানা। জানালাটা ছাদ থেকে প্রায় মেঝে অবধি। কাছে গিয়ে দাঁড়ালে শহরের প্রান্তরেখা দেখা যায়। কাচের ওপারে এমন স্বচ্ছ অন্ধকার, ঘরটাকে হঠাৎ মহাকাশযানের ককপিট মনে হলো। এত রোগাক্রান্ত আরোহী নিয়ে কোথায় চলেছে? 

ঘরের ডান দিকে একটা অভ্যর্থনা কোণ-মতোন। জায়গাটা খাটো দেয়াল দিয়ে আলাদা করা, দেয়ালটা অর্ধবৃত্তাকার। এখানে ডিউটি-ডাক্তাররা বসেন।

হলজুড়ে রোগী, স্বজন, নার্স, ডাক্তারদের ভেতর চেনা মুখটিকে খুঁজছি। কোথায় ময়ূখ? ঘুরেফিরে যখনই অভ্যর্থনার মতোন জায়গাটায় আবার চোখ পড়ল, চমকে উঠলাম। এর আগেরবার কেন ওকে দেখলাম না?

মানুষ যা দেখতে চায় না, সচরাচর তা দেখতে পায় না। হলঘরজুড়ে চওড়া পিঠ আর কেশবিহীন মাথাটা খুঁজে না পেয়ে অবাক হচ্ছিলাম, কারণ ভেবে নিয়েছিলাম ওখানে পাবো। তাই অভ্যর্থনার মতো সেই ডক্টর’স স্টেশনে তাকে দেখেও দেখিনি।

ময়ূখ একটা কাগজে কিছু লিখছিল। একমুহূর্ত সামনের দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল। আমাকে দেখতে পেল না। পেছনের ক্যালেন্ডারে ষোলো সালের ফেব্রুয়ারি মাস উড়ছে।

লেখালেখির আড্ডার ময়ূখ ও হাসপাতালের চিকিৎসক ময়ূখের চেহারা এক। কিন্তু মুখের পেশিতে কর্তব্যের কাঠিন্য আর পরনের সাদা অ্যাপ্রোন অনেক কিছুই বদলে দেয়।

‘ময়ূখ! এসেছি আমি।’

কাজী নজরুলের মতো বড় বড় চোখ তুলে ময়ূখ হাসল। ‘গাড়িঘোড়া পেলে? ভেবেছি আরো রাত হবে তোমার। কাল হরতাল – এ-কথা আমি এখানে এসে শুনেছি। জানলে তোমাকে আজ আসতে নিষেধ করতাম।’

‘আর আমি সেই নিষেধ শুনতাম, তাই না?’

‘কীভাবে এলে?’

‘কিছুই ছিল না প্রায়। ভেঙে ভেঙে এলাম। খিলগাঁও রেলগেটের কাছ থেকে টেম্পো। তাতে ধুঁকে ধুঁকে গুলিস্তান। এরপর ভিড় ঠেলে গোলাপ শাহ মাজার। তারপর দুবার রিকশা, মাঝখানে হণ্টন।’ 

‘কিছু খেয়েছো?’

‘খেলেও ক্ষুধা লেগে গেছে। তুমি?’

‘একই। একটু পর নামব আমরা। ভেতরে চলে এসো।’

ডাক্তারদের সঙ্গে বসব? সংকোচ হলো। ময়ূখ বলল, ‘আরে এসো, কোনো অসুবিধা নেই।’

পাশেই বসে কাজ করছে আরো একজন। দেখে প্রায় আমাদের বয়েসিই মনে হয়, ত্রিশ ঘেঁষে। তার সামনে একজন গ্রামের বয়স্ক মানুষ ঝুঁকে তাকিয়ে আছে। গ্রামের মানুষটা অনুমান। কারণ একমাত্র সেখানেই বয়স্ক পুরুষদের এমন বুকপকেটওয়ালা ঝুল পাঞ্জাবি পরতে দেখেছি।

মানুষটি কাগজ নিয়ে ডানদিকে এগোতেই ছেলেটি আমার দিকে তাকাল।

ময়ূখ বলল, ‘নূর, ও হলো কাজল। ওর কথা তোমাকে বলেছিলাম। আমার লেখক বন্ধু। আজ রাতে আমাদের সঙ্গে ইমার্জেন্সি করবে। আর কাজল, ও নূর, আমার ক্লাসমেট।’

চেয়ারের হেলানে সাদা অ্যাপ্রোন ভাঁজ করে রাখা ছেলেটার। পোশাকে আমাদের চেয়ে পরিপাটি। বুকের সবকটা বোতাম ভালো ছেলের মতো আঁটা। হেসে হাত বাড়িয়ে দিলো। হাতটা তুলতুলে।

বললাম, ‘আপনি কিন্তু দেখতে অবিকল ফার্স্ট বয়।’

ময়ূখ বলল, ‘হোলি কাউ, নূর আসলেই আমাদের ফার্স্ট বয় ছিল।’

‘চেহারা কথা বলে।’

লাজুক ছেলেটা। আমি যেভাবে আগ বাড়িয়ে সহজে এসব কথা বললাম, সে তেমনটা পারল না। কথা বলল ময়ূখের সঙ্গে। নিচু গলায় বলল, ‘কাজল নাম শুনে মেয়ে ভেবেছিলাম, সরি।’

শব্দ করে হেসে ফেললাম। রোগীর স্বজনেরা ঘুরে তাকাল আমার দিকে। ময়ূখ আর নূরও হেসেছে, তবে নিঃশব্দে। নিজের ওপর মেজাজ খারাপ হলো। প্রাণ এখানে হাতের মুঠোয়, মৃত্যু ছেলেখেলা। আর আমি –

বললাম, ‘ময়ূখ, একটু ঘুরে দেখি। পরে এসে বসব।’

‘তুমি হয়তো লিখতে পারো, তাই আমি সামান্য কাগজ এনে রেখেছি।’

হাসপাতালে এর আগেও থেকেছি। তখন বাবার কিডনি বিকল হয়েছিল। সে অন্য মাপের থাকা। কোনো চিকিৎসকের সঙ্গে থেকে তাদের চোখ দিয়ে দেখতে চেষ্টা করা, এ-অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি। বিশেষ করে তাঁদের রাতের লড়াইটা আমি দেখতে চাইছিলাম।  

ঘরের ছাদ বেশ উঁচু। ষাটের দশকের হাসপাতালগুলোর মতো। লম্বা ডাঁট ধরে নেমে আসা কিছু পাখা ক্লান্তিহীন ঘুরছে। দেয়ালে সাদা রং। যেটুকু মানুষের নাগালের ভেতর, সেটুকুর শ্রী অবশিষ্ট সেই। কলম-পেনসিলের দাগ, ছুরির কাটাকুটি তো আছেই। সঙ্গে পানের পিক আর সর্দিশ্লেষ্মার বর্ণনাতীত খবরদারি। দেয়ালের যেটুকু নাগালের বাইরে, সেটুকু বেমানানরকম পরিচ্ছন্ন।

সেই যে গ্রামের লোকটা, নূরের কাছ থেকে কিছু লিখিয়ে ডানদিকে এলো, কোথায় গেল? এগোতেই দেখি ওপাশটা নার্স স্টেশন। থামের আড়াল পড়ায় এপাশ থেকে বোঝা যায় না। নার্সদের পেছনে সাদা দেয়ালজোড়া লম্বা তাক। থরে থরে সাজানো রোগীদের ফাইলপত্র।

সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে নির্লিপ্ত মুখে বসে থাকা একটি মেয়ে ছোট ছোট টেস্টটিউবের গায়ে লেবেল সেঁটে একটা মেটালের খুপরিতে সাজিয়ে রাখছে। চলছে মেটাল আর কাচের মিষ্টি কথোপকথন। তার চারপাশে সহকর্মীদের কেউ নথিপত্র গোছাচ্ছে, কেউ প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ দিতে ব্যস্ত। একজনকে মোবাইল টেলিফোনে কথা বলতে দেখা গেল, ঠোঁটে অনুরক্ত হাসি। ওপারে হয়তো ভালোবাসার মানুষ। মেয়েটির অনামিকায় সোনার আংটি। 

অক্সিজেন সংযোগের জরুরি সরঞ্জামাদি পাশের এক কোণে জমা। সেখানে এক কিশোর আঙুলে কী হিসাব কষছে। আসার পর থেকে একে বেশ ক’বার দেখেছি। ঝনঝন করে ফাইলপত্রের ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, পরমুহূর্তে কারো টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে ফিরছে। হঠাৎ হাতভরা ডায়াপার। আমাকে কয়েকবার পেরিয়ে গেছে। চোখজোড়ায় ভালোমানুষি আলো।

পূর্ব থেকে পশ্চিমে সারি সারি বিছানা। প্রায় প্রতিটিতেই বিভিন্ন বয়সের নারী। কেউ শুয়ে, কেউ বসে। হঠাৎ একটা-দুটো বিছানায় শুয়ে আছে কোনো পুরুষ। অথবা ঘুমোচ্ছে কোনো শিশু। শিশুতে অসুবিধা নেই। কিন্তু এটা উইমেন’স ওয়ার্ড। এখানে এভাবে পুরুষ গড়ানোর কথা নয়। রোগিনী কোথায়?

পরমুহূর্তে চোখে পড়ল সে পা নামিয়ে বিছানায় বসে আছে। বা খাটের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নিজভূঁয়ে নির্বাসিত। হাতের ক্যানোলা দেখে তাদের রোগী বলে আলাদা করা যায়।

ডক্টরস স্টেশনে এলাম। নোটবুক সঙ্গে এনেছিলাম। কিন্তু ময়ূখের আনিয়ে রাখা এ-ফোর কাগজে লিখতে শুরু করি। 

‘হাসপাতালের থামে প্রতিটা আঁচড়েরও আছে এক হাজার এক রাতের গল্পশেকল। কল্পনার বশ-না-মানা ঘোড়া সারারাত ঘুমের ভেতর হ্যাঁচকা টানে সেই শেকল ছেঁড়ার চেষ্টা করছে। …”

ব্রেকের পর ময়ূখ আর নূর রাউন্ডে ব্যস্ত। আমাকে লিখতে দেখে রোগীর লোকেরা কেউ কেউ ডাক্তার মনে করছে। অকারণ সালাম পাচ্ছি। বিব্রতকর। একজন জানতে চাইল, ‘স্যার, আমার মেয়ে কি ভালো হবে?’

এটুকুর মানবিক উত্তর করতে নিশ্চয়ই ডাক্তার হওয়ার প্রয়োজন নেই। বললাম, ‘নিশ্চয়ই ভালো হবে!’

লোকটা কিছু না বলে আরেক দিকে তাকিয়ে থাকল। হয়তো তার চোখ ভিজে উঠেছে।

হঠাৎ মনে হলো আগুন নিয়ে খেলছি। এমন একটা মন্তব্য করার আমি কে? আমি তার মেয়েকে চিনি না। যদি সন্তানের পরিণতির কথা জেনেও মিথ্যা সান্ত্বনা চাইতে আমাকে এসে জিজ্ঞেস করে থাকে? সেক্ষেত্রে উত্তরটা নিশ্চয়ই তার কাছে নিষ্ঠুর কালো কৌতুক ঠেকেছে। অথবা গোটা ব্যাপারটা হতে পারে এরচেয়ে ঘোরাল।

লোকটা আবার আমার দিকে তাকায়। শুকনো একজোড়া চোখ। কান্নার চিহ্ন নেই। হাসিরও লক্ষণ নেই। আশাহীন মানুষের মুখ।

বললাম, ‘আপনার মেয়ে কোথায়?’

‘ওই যে -’

লোকটা পশ্চিম দেয়ালের দিকে দেখাল।

‘কিছু মনে করবেন না, আমি ডাক্তার না। আমার বন্ধু ডাক্তার। ও এলেই আপনার মেয়ের কথা বলব। নিশ্চয়ই দেখে আসবে।’

‘আচ্ছা।’

‘কী হয়েছে মেয়ের?’

লোকটা উত্তর না দিয়ে চলে গেল।

কাচঘেরা এই ঘরের বাইরে আরেক পৃথিবী। সেই পৃথিবীর মানুষের সাধারণ কল্পনায় এই ঘর আসে না। কিন্তু এই ঘরের মানুষগুলোর কল্পনায়, অপেক্ষায় সেই পৃথিবী সারাক্ষণ কথা বলছে। বিভব পার্থক্য। স্বাস্থ্য নামের বৈভবে।

‘পৃথিবীতে মানুষের ইতিহাস যে মোটা দাগে দ্বন্দ্বের ইতিহাস এর পেছনে প্রকৃতির অন্ধ ঝোঁক প্রতিনিয়ত কাজ করছে। এই ঝোঁক জন্ম ও গতিকে বাঁচিয়ে রাখে। যখন দুটি পৃথকের ভেতর দ্বন্দ্ব নেই, তখন লব্ধি নেই, অতএব জন্মও নাকচ হয়ে যায়। জন্ম না হলে গতির ধারণা স্থবির। অথচ জগৎ বেগবতী। জীবের সঙ্গে জীব, জীবের সঙ্গে জড়, জড়ের সঙ্গে জড়ের দ্বন্দ্বে জগৎ বেগবতী হয়েছে। দ্বন্দ্ব তৈরি করে বিভবের পার্থক্য। যতক্ষণ পার্থক্য বজায় থাকে, প্রবাহ সচল থাকে। যতক্ষণ প্রবাহ বজায় থাকে, ইতিহাসে রক্তসঞ্চারিত হয়। জল যদি মানুষের ভাষায় ইতিহাস লিখত, মানুষ দেখতে পেত জলের ইতিহাসও দ্বন্দ্বের আবেগসিক্ত ঘটনাপুঞ্জ। …’

লিখছিলাম। হঠাৎ সশব্দে দরজা ঠেলে ট্রলি নিয়ে একদল মানুষ ঢুকে পড়ল।

ট্রলিতে বছর পঁচিশের একটি মেয়ে শুয়ে আছে। শ্যামল মুখ। গাল দুটো ফোলা। লম্বা চুল। চোখ দুটো বন্ধ। তাকে ঘিরে আছে একদল ভূতে পাওয়া মানুষ।

আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। একটু কাছে থেকে দেখা দরকার। ঠোঁট ফাঁক হয়ে আছে মেয়েটির। ভেতরে ফুলে কালো হয়ে আছে জিভ। দেখে বুকে লাগল। ঠোঁট না নেড়েই পৃথিবীর সঙ্গে বিরল কোনো ভাষায় কথা বলছে মেয়েটি। ট্রলির পাশে পাশে ছুটছেন এক নারী। মেয়েটির মা। চিৎকার করে ডাকলেন, ‘ও মণি ও মণি!’ মেয়ে সাড়া দিলো না।

ট্রলিটা হলঘরের মাঝামাঝি এসে থামল। মেয়ের দুই বাহু চেপে ধরে আছে মা, আর একভাবে ডেকে যাচ্ছে। হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কিছু একটা আগের মতো নেই। আমি আবার মেয়েটির মুখের দিকে তাকাই। মুখটা খানিক আগেও ছিল শ্যামল। হঠাৎ অবিশ্বাস্য দ্রুততায় রং শুকিয়ে ফ্যাকাসে হতে শুরু করেছে। 

একটু আগেও যারা ঝড় হয়ে ঢুকেছিল, হঠাৎ নীরবতা নামলো তাদের ভেতর। মাকে কেউ পাশের একটি বিছানায় বসিয়ে দিলো। কিছু মানুষ ভিড় ঠেলে অভ্যর্থনার কাছে চলে এসেছে। রোগীর হিস্ট্রি নিতে সেখানে ময়ূখ পৌঁছে গেছে আগেই। আমি রোগিনীর পাশ ছাড়িনি। একটু আগে ত্বকে সামান্য হলেও জীবন ছিল। টের পাচ্ছি খুব দ্রুত জীবন উবে যাচ্ছে। আমি হতবুদ্ধি বোধ করতে থাকি।

আমার চারপাশে সময়ের বেগ কমে এলো কেন? বস্তুর বেগ তো থামেনি। পৃথিবী প্রতি সেকেন্ডে আঠারো মাইল বেগে ছুটেছে। তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মাথার ভেতর ধীরে কেন ঘটছে সমস্ত কিছু?

সাদা অ্যাপ্রোন উড়িয়ে সেবিকারা ছুটে এলো। বড় ধীরে। ময়ূখ এলো, নূর এলো। আমি সরে এসেছি আগেই। ওদের সঞ্চরণশীল শরীরের ফাঁক গলে মেয়েটিকেও আমি আর দেখতে পেলাম না। কেউ তার পা জোড়া ঘষছে, কেউ হাতের তালু ঘষছে। পাল্স দেখল ময়ূখ।

মেয়েটির বাবা বা ওই জাতীয় কেউ শিয়রে দাঁড়ানোর সুযোগে মেয়েটার দু-গালে চড় দিচ্ছে আর ডাকছে একটানা। ‘ফুল, ও ফুল!’

হলঘরের প্রায় প্রতিটি মানুষ পরিবারটির দিকে তাকিয়ে আছে। আমার ভুলও হতে পারে, মনে হলো, সবার চোখে একটা দুঃসংবাদ শোনার অপেক্ষা।

মেয়েটির মুখ ভীষণ দ্রুততায় বিবর্ণ হয়ে পড়ছে। চোখজোড়া শুরুতে বন্ধ দেখেছিলাম।  এখন আধখোলা চোখের সাদা অংশ খানিক দেখতে পারছি। বের হওয়ার আগে বোধহয় সারা শরীরের প্রাণ মুখের কাছে জড়ো হতে চায়। তাই  মৃত্যুর আগে শরীরে একবার শেষ সাড়া জাগে।

ময়ূখ ডানদিকে মেয়েটির নাকের ওপর একটা স্বচ্ছ মাস্ক চেপে ধরল। মাস্কের সঙ্গে একটা সবুজ ব্লাডার যুক্ত। মুঠোর ভেতর রেখে সেটা চাপতে শুরু করেছে। নূর মেয়েটির বাঁ দিকে। বুকে হাতের ওপর হাত রেখে সেও সিপিআর শুরু করে দেয়। হঠাৎ তাদের ঘিরে মানুষগুলো বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।

মাকে সবাই নানান কথা বলছে। সে শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষের ভাষার সঙ্গে বুঝি পরিচয় নেই। এই চোখ আমি দেখেছি।

কৈশোরে বন্ধু আরিফের মৃত্যু পর মেজো আপার আলোহীন চোখ দেখেছি। বড় খালুর মৃত্যুর পর খালামণির ভাষাহীন দৃষ্টি দেখেছি। তরুণ বয়সে ফারিয়া যখন নিজেকে হত্যা করল, তার মায়ের নির্বাক শুষ্ক চোখ দেখেছি। বন্ধু পলাশের মৃত্যুর খবর নিয়ে যখন রূপনগর গেছি, তার বাবার কেঁদে শুকিয়ে যাওয়া রক্তাশ্রু, পাথর চোখ দেখে আমার বুকে ভয় ধরে গেছে।

এমন চোখ আর দেখতে চাই না।

কিন্তু পৃথিবী আমার কথা শুনবে কেন? সবার সে ধাত্রী তবু কারো সে মা নয়।

মায়ের ওপর থেকে আমি আর চোখ সরাতে পারছি না। চোখজোড়া নির্লিপ্ত হলেও তার একটা হাত ধীরে ধীরে বুকের বাঁ পাশ স্পর্শ করল। মনে হলো আমাকে যেন তিনি পাতাল আর মর্ত্যরে মধ্যবর্তী কিছু দেখাতে চাইছেন। হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন – ‘ও মনি, না না না, মণি, না!’ 

যেন একটু আগেও অনিশ্চিত ছিল, কিন্তু এবার মণি সত্যি

কোথাও চলে যাচ্ছে। মায়ের কাছে সেই বার্তা চলে এসেছে। কেউ তাকে শান্ত করতে পারছে না।

ময়ূখ মুঠোর ভেতর সবুজ ব্লাডারটা সেকেন্ডে তিনবার করে চাপছে। নূরের হাতের নিচে মেয়েটির হৃদপিণ্ড। চাপ পড়ছে পনেরো সেকেন্ডে কুড়িবার বা তারও বেশি। চলছে, চলছে।

বললাম, ‘সবাই একটু সরে যান। একটু বাতাস আসতে দিন আল্লার দোহাই!’

সবাই সরার মতো ভঙ্গি করল। আদতে কেউ সরল কি না বুঝতে পারলাম না।

‘তিনতলায় থাকতেও তো কথা কইলো’, বলল মেয়ের সঙ্গে আসা তরুণ। 

মেয়েটির বাবা এসময় চিৎকার করে ওঠে, ‘পারভেজ, পারভেজ!’

পারভেজ নামে কেউ সাড়া দেয় না। লোকটা চুল খামচে ধরে। ‘মেয়েরে রাখলাম না সাভারে, পারভেজ!  কী করলাম! মেয়েরে রাখলাম না সাভারে!’

নৈঃশব্দ্যের ভেতর একটানা সিপিআর দিতে থাকা নূরের শ্বাসপ্রশ্বাস কামারশালার হাঁপরের মতো, হুফ, হুফ, হুফ … তার ঘামের দুটো বিন্দু মেয়েটির গালের ওপর পড়ল। ব্লাডারের ওপর থেকে ময়ূখের মুঠো কি এক সেকেন্ডর জন্য আলগা হয়ে এলো? ওর ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে। একটানা চাপতে থাকায় হাতের পেশিতে টান ধরেছে। মুহূর্তের ভেতর আবার সে তার পুরনো গতি অর্জন করল। মৃত্যুর বিরুদ্ধে এক আদিম ক্ষোভ চেপে বসেছে ওদের মনে। কেটে যেতে থাকে অনন্তকাল। 

নূরের শার্ট ভিজে উঠেছে। মুঠো সচল রেখেই ময়ূখ হঠাৎ এক সেবিকাকে বলল, ‘নাসরিন সুঁই নিয়ে এসো?’

অভিজ্ঞ মেয়েটি হাতভরে পাঁচটি সিরিঞ্জ আর বিশেষ কোনো ওষুধ নিয়ে এলো। মৃত্যুপথযাত্রীকে থামাতে শেষ চেষ্টা।

নূর কেমন ঘোরের ভেতর চলে গেছে। হঠাৎ মেয়েটির পায়ের কাছে চলে এলো। ময়ূখ সুঁই প্রস্তুত করছে। পকেট থেকে ঝনঝনিয়ে এক গোছা চাবি বের করে আনল নূর। বড় চাবিটা বেছে নিয়ে অমসৃণ দিকটা মেয়েটির পায়ের তালুতে নিষ্ঠুরভাবে ওপরনিচ টানল। একবার, দুবার। এক বাহুতে দুবার আরেক বাহুতে তিনবার ওষুধ পুশ করল ময়ূখ। এরপর ঝটিতে মেয়েটির শিয়রের কাছে এসে দাঁড়ায়। চোখের পাতা তুলে ধরে ভেতরে আলো ফেলে।

দুই বন্ধু পরস্পরের চোখে তাকায়।

‘স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতরে মানুষ বাইরে নিজেকে যখন আশাবাদী দেখাতে চায়, ভেতরে মন বলে – তুলাযন্ত্রের অপর দিকটাও আমি ঠিক রক্ষা করছি। নিরাশা দিয়ে, হতাশা জমিয়ে। দিনের শেষে তোমার ওই আশাবাদী অস্তিত্ব হতাশার কাছে গোপনে ঋণে ঋণী। … তারপর? কোনটা ভালো। নির্লিপ্ত, নাকি উন্মাদ? …’

ময়ূখ শান্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করে, ‘নেই।’

বাবা লুটিয়ে পড়ে মাতম করছেন। হাসপাতালের তৃতীয়তলা পেরোনোর সময়ও মেয়েটি ছিল, এখন আর নেই – এই ধাঁধার বৃত্ত থেকে সে বের হতে পারছে না। মৃত্যুপারের অধিবাসীরা মেয়েটিকে ঘিরে ধরেছে। নভোযানের বদ্ধ জানালা নির্বিঘ্নে পেরিয়ে ওরা হাসতে হাসতে অন্ধকারে মিশে গেল।

মা বলল, ‘ভালো থাকিস মা।’ 

ময়ূখ, নূর অভ্যর্থনার মতো সেই ডক্টর’স স্টেশনে ফিরে গেছে। নতুন রোগীর লোকেরা সেখানে ভিড় করে আছে।

ময়ূখ হিস্ট্রির ফরম আর কলম টেনে নিয়ে বলল, ‘রোগীর নাম?’

[বন্ধু মাহবুব ময়ূখ রিশাদ ও নূর মোহাম্মদ রাকিবকে উৎসর্গিত]