জ্বর থেকে সেরে ওঠা যেমন কঠিন, তেমনি কঠিন পুনর্বাসন। ঠিকমতো সেবা আর পথ্য না পেলে অসুখ আবার ফিরে আসার সুযোগ থাকে। দ্বিতীয়বার অসুস্থ হলে বাঁচার আশা যায় কমে। কারণ শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তখন থাকে শূন্যের কোঠায়।
তো আমার পুনর্বাসন।
টাইফয়েড থেকে উঠেছি মানে জ¦র গেছে, কিন্তু গায়ে একফোঁটা জোর নেই। উঠে বসারও জো নেই। শুধু শুয়ে শুয়ে মামাবাড়ির কড়িকাঠ গোনা। এক-দুই-তিন করে একশ। অনেক আগেই শিখেছি, এখন আর নতুন করে কী গুনব। তবু গুনে চলতাম। যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ করে চলি। কড়িবরগা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়ি টের পাই না। অসুখের পর গভীর ঘুম শরীরের জন্য ভালো। শরীর তখন পুনর্বাসন-প্রক্রিয়া চালায়। বিশেষ করে এরকম বড় একটা অসুখ থেকে উঠলে। টাইফয়েড তখন খুবই বড় অসুখ। অনেকটা তখনকার যক্ষ্মার সমান্তরাল। তবে কর্কট রোগ এখন আর তখন ছিল একই। এখন শুধু চিকিৎসা সম্ভব প্রথম পর্যায়ে ধরা পড়লে। ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রচুর। তবে মাঝরাস্তা পার হয়ে গেলে বলা কঠিন, ভালো হবে কি না। তখন ডাক্তার বলেন, প্রে টু গড। আল্লাহ বা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করুন। স্রষ্টা অনেক সময় প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। সব সময় করেন না। একেই বলে ওপরওয়ালার খেলা। সুযোগ পঞ্চাশ পঞ্চাশ – হ্যাঁ বা না। মুদ্রার কোন পিঠ পড়বে কেউ জানে না। হেড না টেল। চিত না পুট। এসবই অঙ্কের খেলা বা পরিসংখ্যানতত্ত্বের আওতায় চান্স অ্যান্ড প্রোবাবিলিটি।
আমি ভাত খেতে চাই, কিন্তু ভাত দেবে না। সেই বার্লি আর সাগু। দুধও নয়। হজম হবে না।
নাক চিপে বার্লি আর সাগু গিলতাম। চোখ দিয়ে বের হতো জল। ক্যালসিয়াম কার্বোনেট যেত কমে। এভাবে বেশ কয়েক দিন গেল। অবশেষে সপ্তাহখানেক পরে ডাক্তারবাবু ভাত খাবার নির্দেশ দিলেন। মহা আনন্দের দিন এসে গেল। তখনি শুরু হলো গন্ধমাদালি বা গ্যাঁদাল পাতার খোঁজ। তা-ও মিলল জয়পুরে। যেন মহারাজের ভোজ তৈরি হচ্ছে। এই ঝোল রান্নার তোড়জোড়ে মহাব্যস্ত সবাই।
আর ভাত?
ভাত কোথায়!
এ তো জাউভাত।
অনেকটা দানাদার ফ্যান।
দানাদার কথাটা মনে হতেই আমার মুখে লালা কাটছে। আজ লিখতে গিয়েও। আমার সবচেয়ে প্রিয় মিষ্টি হলো দানাদার। ছানার রসাল কোয়ার ওপর চিনির গাঢ় প্রলেপ। কড়মড় করে চিবিয়ে খাবার মজাই আলাদা। তবে আমার কাছে এর সমান্তরাল লোভনীয় মিষ্টি রসমালাই। পুরো বাংলায় গাইবান্ধার রসমালাই সেরা। ওরা নাম দিয়েছে রসমঞ্জরি। এটা অবশ্য আমার পছন্দের কথা বলছি। সর্বজনীন নয়। সর্বজনীন বলতে গেলে টক দইয়ের ওপর বুঁদে। এ এক মহামিলন। টক-মিষ্টি। লোকে এটাকে সবচেয়ে এগিয়ে রাখবে। তারপর আসছে অন্যান্য মিষ্টি। কারো গুড়ের সন্দেশ – কারো রসকদম্ব – কেউ নিছক ছানার জিলেপি বা শুধু সন্দেশ বা রসগোল্লা। পানতোয়াই বা নারকেল! বাঙালির মিষ্টির ফর্দ অনেক বড়। অঞ্চলভেদে আছে মিষ্টির তারতম্য। ঢাকার প্রাণহরা ও আমৃত্তি লা জওয়াব। বর্ধমানের মিহিদানা-সীতাভোগ। টাঙ্গাইলের চমচম। নাটোরের কাঁচাগোল্লা। নেত্রকোনার বালিশ। শক্তিগড়ের ল্যাংচা। কেউ কম যায় না। তাছাড়া জিলেপি একেবারে বাঙালির জাতীয় চরিত্রের প্রতীক। চাণক্য।
দুপুর সাড়ে বারোটা। আসলে এত তাড়াতাড়ি কেউ দুপুরের খাবার খায় না। বিশেষ করে গাড়ি ধরতে হলে আগে আগে খেতে হয়। তাছাড়া দুপুরের খাবার দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যে সমাধান হয়। অবশ্য মা-মাসি বা মা-খালাদের আড়াইটা-তিনটে পর্যন্ত বেজে যায়। সংসার গুছিয়ে সবার আহার শেষে তাঁদের খাওয়া। এটা অবশ্য রোজকার ব্যাপার। তাই
হা হতোস্মি করার দরকার নেই। কেন মেয়েরা পরে খাবে – এ-প্রশ্ন তোলা যাবে না বিবাহিতাদের জন্য। কুমারীদের কথা ভিন্ন। তারা এখনো সাম্যবাদ বজায় রাখে। বিয়ের পর অসাম্যবাদ। তবে মূলত এটা কার্যকারণঘটিত। সামাজিক জীবন ও
সংস্কৃতিজাত। দাঙ্গা-ফ্যাসাদের কিছু নেই। ধরা যাক একটা প্রশ্ন তোলা হলো, মেয়েরা কেন গর্ভ ধারণ করে? এর জবাব – প্রকৃতির বিধান। তাই সব জায়গায় প্রশ্ন ছুড়ে ব্যাপারটা জটিল করা যায় না। শেষ উত্তর প্রকৃতি। প্রকৃতির কাছ থেকে জবাব বের করবে কে? কারণ যে-প্রশ্ন করে সে-ও প্রকৃতির সৃষ্টি। এইখানে মানুষ অনেকটা অসহায়। হোক সে যত বড় সমাজবিদ বা বিজ্ঞানী। গীতিকার-দার্শনিক তাই গান বেঁধেছেন : তোমার ইচ্ছা তুমি করো মা, লোকে বলে করি আমি …। আরো আছে – এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া এত যত্নে বানাইয়াছে সাঁই …। আরো আছে : লোকে বলে বলে রে, ঘরবাড়ি বালা না আমার …। আরো আছে : বাউলা কে বানাইল রে … হাছন রাজারে বাউলা কে বানাইল রে …। এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই।
থাক এসব বাউলতত্ত্ব, আমি আসি আমার রোগমুক্তির পর পুনর্বাসন ক্ষেত্রে।
প্রথমত, হাঁ। ভাত চামচে তুলে ধরলেন মা … কিন্তু কোনো লালা এলো না … হাঁ করে বসে আছি। মা তাড়া দিলেন, কই খাও …। মুখে লালা কাটছে না – মিউ মিউ করে উত্তর দিই।
– মুখে দাও, লালা ঠিক আসবে।
মায়ের কথা ফলল।
মুখে দিতে কিছু লালা নিঃসরিত হলো। কিন্তু এত বিস্বাদ লাগল যে, প্রায় বমি করার উদ্রেক। কিন্তু বমি করব কী, পেটে তো কিচ্ছু নেই।
এক চামচ ভাত মুখে নিয়ে বসে আছি। ন যথৌ ন তস্থৌ অবস্থা। চিবানোর চেষ্টা করি। চোয়াল যেন শক্ত হয়ে জমে আছে। কোনো রকমে এক চামচ গলা দিয়ে নামাই।
মা মনে হয় ব্যাপারটা ধরতে পেরেছেন। তিনি বাটি থেকে এক চামচ সিংগি মাছের ঝোল ঢেলে আমার মুখে ধরলেন।
এবার একটু ভালো লাগল। নোনতার বদৌলতে।
তা-ও খুব কম নুন দেওয়া। কিন্তু নুন তো! ওর গুণের শেষ নেই। সোডিয়াম কার্বোনেট ছাড়া তরকারি হয় নাকি? নুন ছাড়া আমাদের অঞ্চলে তরকারিকে বলে ‘আন্না’। মানে নুন ছাড়া। তামিল ভাষায় ‘আন্না’ মানে আমাদের। ভাষা মজার বিষয়।
খাবার পর্বে আমি। মা এবার ভাত না দিয়ে একটা সিংগি মাছের টুকরো ভেঙে কাঁটা বেছে মুখে তুলে দিলেন। একটু ভালো লাগল। মুখে লালা কিছুটা বেশি কাটল।
কিন্তু বাদ সাধল সেই গ্যাঁদাল পাতার পচা গন্ধটা। আমি বলেই ফেলি, মা গন্ধ। মাছ কি পচা?
– পচা মাছ! কি বলিস! তোর মানিক মামাকে দিয়ে নিজেদের পুকুর থেকে মাছ ধরিয়েছি!
– তবে গন্ধ কেন?
মা এবার ব্যাপারটা আঁচ করতে পারলেন … বাইশ বছরের জোয়ান সুন্দরী মায়ের মুখে একটা স্মিত হাসির রেখা দেখতে পেলাম। বুঝেছি। গন্ধ কেন। না রে বাবা, মাছ পচা নয়। গ্যাঁদাল পাতা দিয়ে রান্না তো, তাই অমন লাগছে।
– তো গ্যাঁদাল পাতা দিতে গেলে কেন!
– এই পাতা দুর্গন্ধ হলে কী হবে শরীরের জন্যে খুব উপকারী। বিশেষ করে রুগীর পথ্যে।
– আমি তো রুগী নই। আমি তো ভালো হয়ে গেছি!
মায়ের চোখটা ছলছল করে উঠল। বললেন, হ্যাঁ ভালো হয়ে গেছো। কিন্তু গায়ের জোর না হলে সবার সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করবে কি করে!
আমার মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। জেনেশুনে পচাগন্ধ খাবার দেওয়া। দুদিন পরে দিলে কী হতো! আজই দিতে হবে!
মা তার প্রথম সন্তানকে ভালো করে চেনেন।
বললেন, বাবা আজ খেয়ে নাও, কাল আর এটা দেব না।
আমার চোখ দিয়ে তখন লোনা জলের ধারা ভাতের ওপর পড়ছে।
মা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আজ খেয়ে নাও … তাড়াতাড়ি সেরে না উঠলে সবার সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করবে কি করে!
মায়েরা তো জাদু জানেন। সব মা-ই সন্তানের কাছে জাদুকর। আমার রাগ প্রশমিত হলো। চোখ মুছে খেতে শুরু করি।
খাওয়া মানে কী।
দু-চামচ।
মা জোর করায় আর এক চামচ। যে-ভাতের জন্যে কাঁদতাম সেই ভাতই আমাকে কাঁদিয়ে ছাড়ল। শুধু মায়ের শেষ কথাটা আমাকে দারুণ উৎসাহ জোগায়। ভাত না খেলে সবার সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করবে কি করে!
নানার হাতে তৈরি ঝামটিয়ার এই তিনতলা বাড়িটা আমার পদভারে শোভিত। প্রতিটি সিঁড়ির ধাপ আমার পায়ের শব্দ চেনে। আমি বড়। ছোটরা আমার পেছনে। আমরা যখন ছাদে যাওয়ার জন্যে দৌড় লাগাতাম, দুড়দাড় শব্দ হতো। গোটা বাড়ি ভরে যেত সে-আওয়াজে। প্রতিটি কোনায় ধ্বনি-প্রতিধ্বনি ফিরে বেড়াত। সেই দলপতি আমি রোগগ্রস্ত। বাড়িটা নিঝুম হয়ে গেছে।
ছোটভাইয়েরা উঁকি মেরে দেখে চলে যায়।
জ¦র ছেড়ে যাওয়ায় সবাই এবার এক এক করে কাছে আসতে লাগল।
হাত ধরত।
আমি জিজ্ঞেস করতাম ছোট বাগানের কথা। কটা কলা গাছে মোচা এসেছে। বিলেতি বাবলা গাছটায় ফল পাকতে শুরু করেছে কি না। ওরা সব রিপোর্ট করত। তবে আমার অসুস্থতার জন্যে মা ওদের বেশি বাইরে যেতে দিতেন না। ঘরটা ছিল নিঝুম, বড়দেরও মুখ কালো। কারো মুখে হাসি নেই। সবাই যেন অজানা শেষ মুহূর্তের জন্যে তৈরি হচ্ছিল। কখন সেই ক্ষণ আসবে। খাঁচার পাখি উড়ে যাবে মহাদিগন্তে। আর একসময় সবার মুখে লেপ্টে থাকা কালো মুখোশ পরার দিন সমাপ্ত হবে। জীবন আবার চলবে আগের মতো।
আমার মনে হয়, মৃত্যুও একটা স্বস্তি ডেকে আনে। এই জন্যে দ্বিতীয়বার আর বুকে ভার বইতে হবে না। মুক্ত। নতুন কোনো ভার বহনের জন্যে একটা ফারাক। জীবন বড় জটিল। মৃত্যু একটা ক্ষণ মাত্র। মাত্র একটা ঘটনা। বাকি জীবন সবই চলতে থাকে আগের মতো। কেউ অপরিহার্য নয়। হয়তো একদিন স্রষ্টাও এই মহাশূন্য ত্যাগ করে অন্য কোনো মহাশূন্যে স্থান নেবেন। আজ আর কাল সবই আপেক্ষিক। স্রোতের কোনো বিচ্ছেদ নেই। কালস্রোত অবিরাম। অবিচ্ছিন্ন। অনন্ত। এই মহাজগতের রহস্য হয়তো মানুষ কোনোদিন ভেদ করতে পারবে না। আবার জানার চেষ্টাও ছাড়তে পারবে না। এটাই মানুষের প্রকৃতি। অজানাকে জানার স্পৃহা। কর্ম শুধু কর্ম – ফল হোক নিষ্ফল।
নিজের কথা লিখতে গিয়ে নিজ বাঙালি জাতির কথাও মনে উঁকি দেয়। এ-জগতে বাঙালির কি নেই : তার আছে অতীশ দীপঙ্কর, শীলভদ্র, রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন বোস, কাজী নজরুল, নেতাজি সুভাষ, শেখ মুজিব … তারপরও বাঙালি জাতি কেন আজ এত হতশ্রী, আমার বোধগম্য হয় না। সভ্যতার কি সামান্যতম অর্জন আমরা করিনি? উঁচু বাড়ি, দামি গাড়ি, – এই কি আমাদের সভ্যতা? সভ্যতা তো মানবিক বোধ। সবার মঙ্গল কামনা। এক কথায় ভালোবাসা। সর্ব প্রাণীর জন্যে। বৌদ্ধধর্মে এর পুরো নির্দেশ। স্রষ্টাভিত্তিক ধর্মেও এর ব্যতিক্রম নেই। তবে কেন এই দুর্দশা। বিশেষ করে বাঙালি জাতির মধ্যে মানবিকবোধ বর্তমানে সবচেয়ে কম। বিশ্বকবি তো কাবুলিওয়ালাকে তাঁর মনের মানুষ পেয়েছিলেন। আমরা কেন নিজেদের শত্রু? পুতুল নাচের কাঠপুতলি হয়ে দাঁড়িয়েছি। বিদেশি প্রভুদের কথায় উঠি-বসি। অথচ আমরাই তো সর্বস্ব খুইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছি? এ-প্রশ্নের মীমাংসা আমার কাছে নেই।
যাক এসব কথা। আসি আমাতে।
প্রথম দিন ভাত মুখে দিয়ে আনন্দের বদলে বেদনা পেলাম। অথচ ভাত খাবো, ভাত খাবো বলে কত ঘ্যানঘ্যান করেছি।
ভাতপর্ব শেষে আবার সেই বিছানা। কবে যে উঠে বসতে পারব। দৌড়াবো – ভেবে ভেবে মন আরো খারাপ হয়ে যেত।
এই সময় উদ্ধারকর্তা হলেন আমার নানা-নানি। হিমানী বা স্নোর একটা কাচের ছোট কৌটোয় একটা ঝকঝকে সিকি দিয়ে বললেন, দেখো কী সুন্দর সিকিটা। মানে আজকের পঁচিশ পয়সা। তাতে রাজা সপ্তম জর্জের মাথার ছবি। মুকুট মাথায়।
আমার বেশ ভালো লাগল। কৌটোটা বন্ধ করে ঝুনঝুনি দিয়ে বাজাতে লাগলাম। মনটা নিজের দুর্দশা থেকে কিছুক্ষণের জন্যে মুক্ত হলো। আমি একটা চার আনার অধিকারী। বেশ একটা ভার অনুভব করি।
তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। পাশে পড়ে আছে আমার এক সিকি সম্পদ।
আসলে শিশু কেন সব মানুষেরই মানসিক প্রশান্তির আয়োজন থাকা উচিত। খেলাধুলা তার মধ্যে অন্যতম মাধ্যম। তা হোক ডাংগুলি বা ক্রিকেট। তালপাতার তৈরি বল হোক বা ফুটবল। মার্বেল খেলা বা লাটিম। মানুষ এরকম কত ধরনের বিনোদনের শাখা তৈরি করেছে। ঘরে বসে চারজনে তাস পেটানো বা দুজন মিলে দাবায় বুঁদ হয়ে থাকা। গোটা দুনিয়া যাক – রাজাকে বাঁচাতে হবে। এসেছে সিনেমা : শতরঞ্জ কি খিলাড়ি।
অপু-দুর্গার পথের পাঁচালি। এসবই মানুষ বিনোদনের জন্যে তৈরি করেছে। হার-জিত থাকলেও আনন্দের ঘাটতি নেই।
আর একটা বড় উপাদান হলো শিল্পকলা। দেয়ালে কয়লা দিয়ে ছবি আঁকা। নদীর পাড়ে বালি দিয়ে পায়ের ওপর চেপে ঘর তৈরি করো। তারপর নিজেই আবার লাথি মেরে ভেঙে ফেল। একেই মনোবিদ ফ্রয়েড বলেছেন : প্লেজার ইন্সটিংক্টস। ভারতীয় দর্শনে আনন্দবাদ। ধর্ম-কর্মও একটা আনন্দের কাজ। মনে প্রশান্তি আনে। এ-থেকে এসেছে মেডিটেশনে বা ধ্যান। এখন আমরা ঋষিদের বুঝতে পারি। তারা সব জ্ঞানচর্চা করতেন। ঈশ্বরকে খোঁজা মানে জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন। আছে নাম-কীর্তন বা জিকির। সুফিবাদের দু-বাহু তুলে নৃত্যগীত।
বেশ কদিন চলল ভাত খাবার ঘ্যানঘ্যানানি। রাতে দেওয়া হতো বার্লি – সুতরাং নাক বন্ধ করে চোঁ-চোঁ টানা। ফলে লেবুর গন্ধটা হারাতাম। মা মানা করতেন ওভাবে খেতে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। আমি অসুস্থ হলে কি হবে আমি হলাম নায়ক। নায়ক কোনোদিন হারতে পারে না।
আরো মজার একটা ঘটনা ঘটল। তৃতীয় দিন মামা আমাকে একটা আধুলি দিলেন। আমার আনন্দ দ্বিগুণ। আধুলিটা বেশ বড়। বাঘ মার্কা। এটা নতুন মুদ্রা। আর একটা সিকি পেলেই আমার এক টাকা রোজগার হয়ে যাবে। কোনো পরিশ্রম না করে এক টাকা রোজগার অনেক বড় ব্যাপার। তখন এক টাকায় ছিল কুড়িটা কমলা। মানুষ তখন বাজার করতে যেত এক টাকা বা বড়জোর দু-টাকা নিয়ে। তাতেই সপ্তাহের বাজার। সে এক শায়েস্তা খানের যুগ। আমার শুধু যপ করা চলছে, আর একটা সিকি বা আধুলির চিন্তা। দুটো কয়েন নিয়ে বানর খেলার মতো ঝুনঝুনি বাজাই। খুব মজা লাগে। বাড়ির বাকি সবাই মুচকি হাসে। এতদিন বাড়িতে যে চাপা গুমোট ছিল তা কেটে গেছে। সবার মুখে একটা চাপা আনন্দ। যেন অনেক বড় একটা যুদ্ধ জয় করে তৃপ্ত। আসলে এটা যুদ্ধই ছিল। একে তো অভিশাপ : এ-বাড়ির প্রথম সন্তান দশ বছরের আয়ু নিয়ে জন্মাবে। দ্বিতীয়ত, এমন এক অসুখ যার ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। সবদিক দিয়ে অভিশাপ কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু রাখে আল্লা বা রাখে হরি তো মারে কে।
পরদিন আরো একটা মজার ব্যাপার ঘটল। মা একটা সিকি এনে দিলেন। আর যায় কোথায়! আমি তখন পচা-গন্ধমাখা গ্যাঁদালপাতা মার্কা ভাতও খেতে শুরু করলাম। আর কারো প্রতি কোনো রাগও নেই। এক টাকা পূর্ণ হওয়ার সুখ তখন আমাকে জান্নাতুল ফিরদাউস বা স্বর্গের প্রথম সারিতে জায়গা করে দিয়েছে।
আমি আরো জোরে জোরে ঝুনঝুনি বাজাই। দোতলা থেকে তিনতলা ও একতলা পর্যন্ত আওয়াজ শোনা যেত। মাঝে মাঝে নিজেকে মহাদেব মনে হতো। যিনি ডমরু বাজান। কৈলাসে সে-শব্দ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে জগৎ মাতাত।
ডমরু বাজাতে বাজাতে আমার ডান হাতে জোর ফিরে আসতে লাগল। স্নান করার মানে কুসুম-গরম জলে তোয়ালে দিয়ে গা মোছার সময় ডান হাত দিয়ে তোয়ালে ধরে মাকে সাহায্য করতাম। মায়ের মুখে স্মিত হাসি। প্রথম সন্তান। অভিশাপ কাটিয়ে লখিন্দর হয়ে উঠেছে। চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা ও লখিন্দর-বেহুলার গল্প আমি নানিকে পড়ে শুনিয়েছি। তাই নিজেকে লখিন্দর ভাবতেই পারি।
ডান হাতে জোর ফেরায় ডমরুটাকে বাঁ-হাতে চালান করে দিলাম।
এইসব যখন ভাবি তখন আমার মনে হয়, আমার আসলে ডাক্তারি পড়া উচিত ছিল। কে জানে, হয়তো দ্বিতীয় বিধান রায় হয়ে উঠতে পারতাম।
ডাক্তারি পড়ব কী করে। বাড়িতে বাবা সাহিত্যিক – সব বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ ক্লাসিকস কাহিনি এনে দিতেন। তাই ম্যাট্রিকুলেশন বা মাধ্যমিক পরীক্ষায় পর বিজ্ঞানে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, বাবা বললেন, তুমি আর্টস নাও।
তিনি অনেক দূরদর্শী মানুষ ছিলেন। ঠিকভাবে দিয়ে গেছেন সবকিছুর দিকনির্দেশনা। তো পুনর্বাসন পালা।
হিসাব করে সবাই বললে মোট ৪৫ দিন পর আমি বিছানা থেকে উঠে মাটিতে পা ফেলেছি। মায়ের লেগেছিল এক মাস।
এর মধ্যে মাথার চুল সব বিসর্জনে। পুরো টেকো মাথা। এমনিতে নানা-মামা সব টেকোর দল, আমি সেই অল্প বয়সেই মাতৃকুলধারা বহন করে ফেললাম। ঘটল আরো একটা মজার ব্যাপার।
নানার একটা বাঁকানো হাতল লাঠি ছিল। সেটা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো। এবার পরিপূর্ণতা পেলাম মাতৃকুলের।
বুড়ো মানে কি হদ্দ বুড়ো।
অল্পবয়সী বুড়োদের অনেক বেশি বুড়ো মনে হওয়ার কথা। বুড়োদের ওটা একটা সাজ, কিন্তু শিশু বুড়ো মানে সার্কাসের ক্লাউন বা ভাঁড় ছাড়া আর কী?
নিচে বাকুলে বা উঠোনে আমাকে হাঁটানো হতো। হাতে আছে লাঠি। প্রতিটি পদক্ষেপ মানে পায়াভারী রোগ গোদের মতো। মনে হতো আমার পায়ে অনেক ওজন বাঁধা।
মা ছেড়ে দিলে ছোটভাইয়েরা আমাকে সাহায্য করত। তারা খুব খুশি। বড়ভাই বলে কথা। তাকে ছাড়া তারা ক্যাপ্টেনশূন্য। দলনেতা না থাকলে দলের কী অবস্থা হয় তা সবার জানা।
তিনতলা বাড়ির বাকুল বা উঠোনটা চৌকো। পশ্চিমে একটা টালি ছাওয়া কামরা : সব ধরনের জ¦ালানি ও পুরনো আসবাবের ঘর। এরপর বাইরে বের হওয়ার দরজা। তারপর বড় চৌকো ঘর – এটা পাকা গোলাঘর। ধান রাখা হতো। তারপর এর পাশে দক্ষিণে রান্নাঘর। এরপর বাইরে যাওয়ার দরজা। পুবদিক আগে খোলা ছিল। পরে মধ্যে দু-ঘরের দেয়াল ওঠায় চৌকো রূপ নেয়। দক্ষিণের দরজা রান্নাঘরের পাশে। ও-পাশে অদূরে একচালা গোয়ালঘর। তারপর ভিটে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। অদূরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে পাকা ল্যাট্রিন। সবই খুব গোছান। পরিকল্পিত।
এর মধ্যে একটা মজার ঘটনা বলতে ভুলে গেছি।
আমি আমার ব্যাংক মানে কাচের কৌটোয় সিকি-আধুলি-টাকা জমিয়ে চলেছি। প্রায় ভরে গেছে। এখন ঝুনঝুন করা যায় না। কৌটোর পেট প্রায় ভরে গেছে।
এক রোববারে নানা সকালে আমাকে দেখতে এলেন। আর তার হাতে ঝকঝকে এক টাকার একটা কয়েন।
আমার চোখে আনন্দ।
নানা পাশে বসলেন। তারপর বললেন, দেখি তো দাদা, তোমার কত টাকা জমা হয়েছে।
নানা সব মুদ্রা বিছানায় ঢাললেন। তারপর সিকি, আধুলি সবকিছু গুনতে শুরু করলেন – এক, দুই, তিন করে গুনতে গুনতে দশে এসে থামলেন।
তিনি চমকে উঠলেন। কী রে দাদা, তুমি তো আমার এক মাসের মাইনে জমা করে ফেলেছ!
নানা খুব উচ্চশিক্ষিত মানুষ ছিলেন না। ক্লাস এইট পাশ। তারপর জীবিকার খোঁজে কলকাতা। তিনি প্রথম যেখানে চাকরি পেয়েছিলেন মাস-মাইনে ছিল দশ টাকা। অবশ্য নানাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি তিনি প্রথম কোন কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
পরে নানা এক ব্রিটিশ জাহাজ কোম্পানিতে যোগ দেন ডাক্তারের সহকারী হিসেবে। গোরা ডাক্তার। ডাক্তারের সহকারীকে তখন বলা হতো কম্পাউন্ডার। কারণ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ধরে সহকারীকে নানা ধরনের ওষুধের মাপ ধরে একটা শিশিতে গুলে শিশির গায়ে ক’বার কতটুকু খেতে হবে সেই খাঁজ লেভেলটা লাগিয়ে দিতে হতো। এইসব ওষুধের অনুপাত ধরে শিশিতে ভরতে হয় বলেই সহকারীকে বলা হতো কম্পাউন্ডার। নানা খুব চৌকোষ মানুষ ছিলেন। ব্রিটিশ সাহেবদের সঙ্গে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারতেন। নানাদের পূর্বপুরুষ ইউপি থেকে বাংলায় হিজরত করেন। কিন্তু গায়ের রং ও চেহারার ধরন বাঙালি হয়নি। বংশধারা তাকে অবাঙালির মতো করে গড়ে তোলে। দু-এক পুরুষে এই বদলটা সম্ভবও নয়। কথায় বলে না চৌদ্দ-পুরুষ আসলেই তাই – বংশধারা বা জেনেটিকস একটা বড় ব্যাপার। শুধু মানুষ নয়, সব প্রাণীর মধ্যে তা পরিব্যাপ্ত।
নানা ছিলেন খুব সৎ মানুষ। ব্রিটিশদের বিশ্বস্ত কর্মী, আমি যখন অসুস্থ, তখন নানা মাসে ৩০০ রুপি মাইনে পেতেন। তখনকার দিনে এ-টাকা উচ্চবিত্তের সমান। আর নানা ছিলেনও উচ্চবিত্ত। কিন্তু পরণের পরিচ্ছদে ছিলেন খুব সহজ-সরল। সাদা ফতুই আর সাদা ধুতি ছিল সব সময়ের পরিচ্ছদ। সর্বভারতীয় মনে হলেও বাঙালি মনে হতো না। ফর্সা উজ্জ্বল রং – কিছুটা গোলাপি আভা।
এই রং পেয়েছিলেন আমার বড়খালার বড় মেয়ে মমতাজ বুবু। মা-খালারাও ছিলেন উজ্জ্বল ফর্সা ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী।
লাঠি হাতে বাকুলের মধ্যে পা টেনে টেনে চলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আমার পুনর্বাসন পালা।
ধীরে ধীরে গায়ে শক্তি সঞ্চয় হতে থাকে। মাথায় নতুন করে গজাতে থাকে চুল।এভাবে একসময় বাকুলের লক্ষ্মণরেখা ডিঙিয়ে দক্ষিণের খিড়কি দরজা ছাড়িয়ে বাইরে যাওয়ার সুযোগ আসে। আর আমি আমার সেই পুরনো পরিচিত গাছপালা, বাগান, বড়খাল … বড়বাগান … এসব ফিরে পাই।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.