আহমদ রফিক : সংগ্রামে-সৃজনে এক ভাষাসংগ্রামী

(আহমদ রফিক : জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামে)

স্বদেশ এখন মানচিত্রে আঁকা

সুশ্রী রঙিন পতাকায় লেখা,

তবু খুঁজে ফিরি সবার স্বদেশ

জানি না সে চাওয়া কবে হবে শেষ।

                – আহমদ রফিক

কবিতায় প্রতিফলিত চেতনা ধারণ করেই আহমদ রফিক জীবনজুড়ে নিজের সৃজনপ্রতিভাকে সক্রিয় রেখেছেন মননশীল ধারায়। সৃজনশীল মানুষেরা আবশ্যিকভাবেই দেশপ্রেমিক হয়ে থাকেন। নিজস্ব ‘দেশ’ এবং ‘ভূখণ্ড’ স্বাধীনচেতা যে-কোনো সৃষ্টিশীল ব্যক্তির জন্য অত্যন্ত কাক্সিক্ষত। খ্যাতিমান শিল্পমনস্ক ব্যক্তিদের সাফল্য ও প্রতিষ্ঠার আদিতে দৃষ্টি দিলে তাঁদের শিশুবেলার এমন কিছু কর্মতৎপরতা পাওয়া যায়, যার মধ্যে নিহিত থাকে তাঁদের জীবনের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য এবং সাফল্য। উনিশশো সাতচল্লিশে ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম, আটচল্লিশেই পাকিস্তানের পূর্বাংশে শুরু হওয়া ভাষা-আন্দোলন যখন বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে যায়, তখন ঘটনার প্রাতিস্বিকতা সময়ের সন্তান ও প্রতিশ্রুত তারুণ্যের শক্তিকে প্রবলভাবে জাগিয়ে দেয়। ধর্মভিত্তিক পরিচয়ে দেশপ্রাপ্তির স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। জনজীবনের নানা ঘটনার প্রভাবে আলোড়িত হয় তাঁদের মনপ্রাণ। প্রভাবিত হয় তাঁদের মননজাত সৃজনপ্রতিভা। করণীয় হিসেবে ইতিহাসের পথরেখা নির্মাণ করে ফেলেন তাঁরা। ভাষাসংগ্রামের শুরুতে করণীয় নির্ধারণ এবং তার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন যে-কজন তরুণ, ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। 

ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম এই সংগঠক বাংলাদেশের সাহিত্যের মননশীল ধারার সমৃদ্ধি ঘটিয়েছেন, সাধনা করেছেন নান্দনিক শিল্পভাষ্যের। তাঁর প্রধান অবলম্বন ছিল সত্য ও সুন্দরের সাধনা, ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চায় আত্মনিমগ্নতা। জীবনের শুরু থেকেই তিনি সচেতন এবং নির্মোহ ছিলেন কেবল হিন্দু-মুসলমান দ্বিধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তথা দেশভাগের ব্যাপারে। কারণ, ভারতে কেবল দুটি ধর্মের অনুসারী যেমন ছিল না, তেমনি কেবল দুটি জাতি-পরিচয়ের মানুষেরই বসবাস ছিল না। ভারত হলো বহুভাষী, বহু ধর্ম, তথা বিচিত্র সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের ভূখণ্ড। তাই তিনি ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের মিছিলে অংশগ্রহণ করেছেন। সহপাঠীরা মুসলিম লিগের পাকিস্তান আন্দোলনে সম্পৃক্ত হলেও আহমদ রফিক তাতে অংশ নেননি। সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এমন ঘটনায় মুসলমান কিশোরদের অংশগ্রহণ না করাটা ছিল বিরল। অথচ ১৯৪৮ সালে মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজের ছাত্র থাকাকালে ভাষা-আন্দোলনের মিছিলে অংশগ্রহণ করে প্রহৃত হয়েছেন মুসলিম লিগ-সমর্থিত ছাত্রনেতাদের হাতে। ঝুঁকিপূর্ণ এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সময়ে কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিবেচনায় আনেননি তিনি। স্কুলের ছাত্র থাকতে যেমন, তেমনি মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নকালেও গভীর তাগিদ থেকে জড়িত হয়েছিলেন প্রগতিশীল ও কমিউনিস্ট চিন্তার সংগঠনের সঙ্গে। প্রভাবিত হয়েছেন তারুণ্যের রাজনৈতিক প্রতীক সুভাষ বসুর কর্ম-চিন্তা দ্বারা আর উজ্জীবিত হয়েছেন কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যসৃজনের সাম্যবাদী দর্শন দ্বারা। কমিউনিস্ট পার্টির ডেলিগেট হিসেবে ১৯৪৬ সালে তিনি অংশ নিয়েছেন ফরোয়ার্ড ব্লকের সম্মেলনে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় ভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততাই তাঁকে করে তুলেছে কিংবদন্তিতুল্য। কিন্তু আহমদ রফিক কেবল তাতেই তৃপ্ত থাকেননি। দেশ ও জাতির প্রতি তিনি আজীবন দায়বদ্ধ। ফলে বয়সজনিত সমস্যায় শরীরের নানা অসহযোগিতা সত্ত্বেও প্রতিমুহূর্তে মগ্ন থাকেন সৃষ্টিশীল চিন্তার ভেতরে।

আহমদ রফিক জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন পেশায় সম্পৃক্ত হলেও লেখক সত্তার বিচারে পূর্ণকালীন লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। ষাটের দশকে তিনি প্রকাশ করেন নাগরিক নামে শিল্প-সাহিত্যের এক নান্দনিক ত্রৈমাসিক। প্রতিষ্ঠা করেছেন রবীন্দ্রর্চচাকেন্দ্র ট্রাস্ট (১৯৮৯)। পাশাপাশি জীবনব্যাপী নানা উদ্যোগ ও শুভকর্মের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। দেশের শিল্পমনস্ক মানুষের কাছে তিনি একাধারে ভাষাসংগ্রামী, কবি, প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্রগবেষক, সাহিত্য-সমালোচক, কলাম লেখক হিসেবে এক বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত।

ব্যক্তিজীবনে এবং সৃজনশীল মানুষ হিসেবে আহমদ রফিক ব্যতিক্রমী এবং সফল। শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে কর্মীজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে অসংখ্য অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিকূলতা। তবু থেমে থাকেননি তিনি। বরং সাহসের সঙ্গে তিনি জীবনবাস্তবতার মুখোমুখি হন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক হয়েও ‘চিকিৎসাপেশা-বহির্ভূত’ অনেক কাজে নিজেকে মেলে ধরেন। শিল্পিত মননশীল সাহিত্যচর্চার জন্য তিনি সক্রিয় রাজনীতিও ছেড়ে দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, পূর্ণকালীন লেখক হয়ে সমাজেরই চিকিৎসা করবেন তিনি, ‘যিনি উপলব্ধি করেছিলেন চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কতজন মানুষের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করবেন, তার চেয়ে অধিক প্রয়োজন এই জাতির মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা। ফলে পশ্চাৎপদ এই জাতিকে আলোকিত করার মহান ব্রতে আত্মোৎসর্গী হয়ে তিনি জ্ঞানচর্চায় আত্মনিবেদন করেছিলেন।’ (আহমদ রফিক সম্মাননা গ্রন্থ, পৃ ১৩৩)। কারণ, ‘ত্রিকালদর্শী’ আহমদ রফিকের কাছে সাতচল্লিশের দেশভাগ বড় পীড়াদায়ক, কারণ, ব্রিটিশ উপনিবেশমুক্ত হোক ভারত, তা প্রত্যাশিত হলেও পূর্ববাংলার মুসলমানদের চাওয়া পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্যে মুক্তির নিশ্চয়তা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

স্কুলে পড়ার সময় থেকে রাজনীতিসচেতন আহমদ রফিক বয়সে শতক ছোঁয়ার কাছাকাছি পৌঁছেও মনে করেন, জীবনের নানা পর্যায়ের ঘটনা-দুর্ঘটনা তাঁর জীবনকে কেবল সময়সৃষ্ট প্রতিক‚লতারই মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। হরগঙ্গা কলেজ থেকে আইএসসি সম্পন্ন করে ঢাকায় আসা আহমদ রফিকের প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাধ্য হন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে। এ-বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন :

আমি কিন্তু ভর্তি হতে চেয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সুযোগ পেয়েছিলাম কেমিস্ট্রিতে অনার্স পড়ার। ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে দরখাস্ত করেছিলাম। কিন্তু আমি যেহেতু তদবিরে অভ্যস্ত নই, পছন্দও করি না, সেহেতু আমাকে সুযোগ দেওয়া হলো না। অথচ আমার এসএসসি এবং এইচএসসিতে যে রেজাল্ট, তাতে অনায়াসে তারা আমাকে আবাসিক ছাত্র হিসেবে ভর্তির সুযোগ দিতে পারত। তা না করে অনাবাসিক ছাত্র হিসেবে আমার দরখাস্ত গ্রহণ করেছিল। সেখানে সুযোগ পেলে আমার গ্রহণযোগ্যতা বিদ্বৎসমাজে আরও বেশি হতো। … ঘটনাই মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। … সারা জীবন আমি লক্ষ করেছি, ঘটনা যেন আমাকে টেনে পেছনের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর আমি চেষ্টা করেছি, ঘটনার মুখোমুখি হয়ে তাকে প্রতিহত করতে। একটা বিপরীত স্রোতে গতিশীল থেকেছি সারাটা জীবন। নইলে মেডিকেল কলেজে কারও নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলো না, আমার নামেই হলো – ইস্কান্দার মির্জার গভর্নর ৯২-ক ধারায়। দেড় বছর নিজের খরচও নিজেকে জোগাতে হয়েছে। কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। না পরিবার, না কোনো স্বজন। আত্মগোপনে থাকতে হলো। আমার দল একবার আমার খবরও নেয়নি, কোনো আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করেনি। 

                  (আজকের পত্রিকা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১)

মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৫৩ সালে আহমদ রফিক পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। প্রায় দুই বছরের ফেরারি জীবন শেষে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পান এবং ১৯৫৭ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। কিন্তু ভাষা-আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার ‘অপরাধে’ ইন্টার্ন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল একমাত্র তাঁকেই। তাই ম্যাট্রিক ও আইএসসি’র পর চিকিৎসাশাস্ত্রেও মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া এক অদম্য মেধাবীকে চিকিৎসক হিসেবে পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। ফলে তাঁর চিকিৎসকের পেশাভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ হয়নি। তবে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ওষুধ কোম্পানি। কিন্তু নানা ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে আপস করতে পারেননি বলে নিজেকে সেখানে টিকিয়েও রাখতে পারেননি বেশিদিন। কাজ করেছেন বাংলাদেশের ওষুধনীতি প্রণয়নেও। চাকরি করেছেন বিসিআইসি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে। একসময় তা ছেড়ে দেন পূর্ণকালীন লেখালেখি এবং শিল্পসাহিত্য চর্চার নেশায়। তিনি যখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র তখন সাহিত্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতিচর্চার উর্বর পরিবেশ ছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজেও। ফলে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন আহমদ রফিকের বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে সক্রিয় হতে কোনো দ্বিধা ছিল না। একুশে ফেব্রæয়ারির ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে যাঁরা ছিলেন, তিনি তাঁদেরই একজন। মিছিলের সারিতে ছিলেন বলে মৃতদেহের সারিতেও থাকতে পারতেন তিনি। খুব কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন পাকিস্তানি পুলিশের বর্বরতা। সংগ্রামী সাথীদের হারিয়ে হয়েছেন বিষণ্ন। কিন্তু মনোবল হারাননি। তিনি লক্ষ করেছেন, আগুনে ঘি ঢালার মতোই প্রতিবাদী মিছিলের দৈর্ঘ্য বাড়ছিল। আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে সারি সারি জমায়েত তাঁর মতো আরো অনেককেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলেছিল। কয়েকজন মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, শহিদদের স্মৃতি রক্ষা করতে হবে। তিনি লিখেছেন :

দিনটা ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি সকাল। মেডিকেল ব্যারাকের (হোস্টেলের) বারান্দায় কয়েকজন নেতৃস্থানীয় মেডিকেল ছাত্র জড়ো হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে মেডিকেল কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের ভি. পি. গোলাম মাওলা, জিএস শরফুদ্দিন আহমদ, আলী আছগর, বদরুল আলম, সাঈদ হায়দার প্রমুখ এবং স্বয়ং লেখক। আলোচনা গত দুদিনে পুলিশের গুলিতে নিহত ভাষাশহিদদের নিয়ে। বিশেষ করে ‘শহিদ স্মৃতি অমর হোক’ এই স্লোগানের বাস্তবায়নে কিছু করা যায় কি না তাই নিয়ে ভাবনা। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের এবং তা সেদিনই। … সে রাতে মেডিকেল হোস্টেলবাসী ছাত্র, বিশেষ করে রাজনীতিমনস্ক ছাত্রদের এক রাতের শ্রমে তৈরি হয় ১০ ফুট উঁচু, ৬ ফুট চওড়া শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ – নামফলকটি বদরুল আলমের হাতে সুশ্রী অক্ষরে লেখা। বারো নাম্বার ব্যারাকের সামনে, হোস্টেল গেট থেকে রক্তভেজা স্থানে স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি। (‘পিয়ারু সরদার : ভাষা আন্দোলনে যার রয়েছে অসামান্য ভূমিকা, আহমদ রফিক, প্রথম শহিদ মিনার ও পিয়ারু সরদার, বাংলা একাডেমি, ২০১৬)

উল্লেখ্য, ভাষা-আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন আহমদ রফিকের আরো সতীর্থ। কিন্তু জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময়ই যেন হয়ে ওঠে তাঁর চরম প্রতিপক্ষ। তাই ভাষা-আন্দোলনে সম্পৃক্ততার কারণে আহমদ রফিককেই চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এমন জীবন-বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে মানসিকভাবে পরিত্রাণ পেতেই হয়তো লিখে ফেলেন, ‘বাঙালকে নিয়ে যত উপহাস/ সয়নি আমার ভাষা ও স্বদেশ।/ বাঙাল আমি, বঙ্গাল চর্যার/ গর্ব আমার অহংকার।’ (‘বাঙাল স্বদেশ’, কবিতাসমগ্র, অনিন্দ্য প্রকাশ, ২০১৩, পৃ ৬৪)। তাই তিনি পথ হারাননি, বরং নতুন নতুন পথ নির্মাণ করে গেছেন আত্মশক্তি দিয়ে। সৈয়দ শামসুল হক বলেছিলেন, বায়ান্নোর ভাষা-আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে একটি দুর্বল কবিতাও প্রতিবাদ হিসেবে, সময়ের সাক্ষ্য হিসেবে ইতিহাসের অনন্য দলিল হয়ে রয়েছে। আহমদ রফিক কেবল কবিতায় নয়, পঞ্চাশের দশকের এক অবিকল্প কথক হিসেবে নিরন্তর নিজ কর্তব্য পালন করে গেছেন। তাই পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখালেখির ক্ষেত্র হয়ে ওঠে ভাষা-আন্দোলন, রবীন্দ্রসাহিত্য, জাতিসত্তার অন্বেষণ, বাংলাদেশের কবিতার পর্যবেক্ষণ এবং সাহিত্য-সমালোচনার বিবিধ দিক। এছাড়া ভাষা-আন্দোলনের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে সাংগঠনিকভাবে এর তাত্ত্বিক প্রয়োগ ঘটানোর প্রয়াসেও নিজেকে সচেষ্ট রেখেছেন কয়েক দশক ধরে। সেই তাড়না থেকেই ভাষা-আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাসসহ এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে লিখেছেন অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং বই। বর্তমানে শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও প্রচারমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে নতুন তথ্য ও ধারণা দিয়ে চলেছেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি ভাষা-আন্দোলন নিয়ে গবেষণার কারণ ও তাৎপর্য সম্পর্কে কিছু কথা বলেছেন। যেমন :

সিরাজুদ্দিন নামেও একজন শহীদ হয়েছিলেন, যাঁর কথা আমিই প্রথম জানতে পারি। বাসাবাড়ি লেন তাঁতীবাজারে তাঁর বাড়ি। তিনিও গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। মৃত্যুর আগে বিড়বিড় করে বলে গিয়েছিলেন নাম-ঠিকানা, যেন তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। কলতাবাজারের নান্না মিয়া ওই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। তিনিই জানিয়েছেন। তবে আমার মনে হয়, ২২ তারিখে আরও বেশিসংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, যাঁদের কথা আমরা জানতেই পারিনি। … আমরা একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিলাম শহীদ মিনারের ওপর। আমি মনে করি, ভাষা আন্দোলনের একটা বড় অনুষঙ্গ হলো শহীদ মিনার। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার তো এখন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলের
দাবি-দাওয়া ও প্রতিবাদের যজ্ঞভ‚মি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তেমনি সারা দেশেও শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে, বহুবার ভাঙা হয়েছে, আবার নির্মিত হয়েছে। সরকার বা পুলিশ বারবার সেগুলো ভেঙে দিয়েছে। … ভাষা আন্দোলন গবেষণায় এসেছি এর চরিত্র এবং এর তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরতে। ঘটনাপ্রবাহই ভাষা আন্দোলনের সব নয়। আন্দোলনের সফলতা, সীমাবদ্ধতা, ব্যর্থতা এ তাত্তি¡ক বিষয়গুলো আমাকে আকর্ষণ করেছিল। কেউ কেউ অবশ্য এ বিষয়ে লিখেছিলেন। এগুলো নিয়ে আমি অনেক প্রবন্ধ লিখেছি।

                 (প্রথম আলো, ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০২২)

আহমদ রফিক মনে করেন, উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষা তথা রাষ্ট্রভাষায় জ্ঞানচর্চা না হলে, রাষ্ট্রভাষা জাতীয় ভাষা কিংবা জীবিকার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হলে উন্নত জাতিগঠন সম্ভব নয়। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর প্রয়াসে তিনি দেশব্যাপী সভা-সমাবেশ করেছেন। মাতৃভাষা বাংলায় মেডিসিন ও অ্যানাটমির টেক্সট প্রণয়ন করেছেন ভাষাসংগ্রামীর দায় থেকে। এ-উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় কিছু অধ্যাপক-চিকিৎসকের বিরোধিতায়। তাঁর তেমন সিদ্ধান্ত এবং কার্যক্রমের মধ্যে ব্যক্তিগত নয়, ছিল জাতীয় দায়িত্ব পালনের স্পৃহা। সুতরাং তাঁর পক্ষেই উচ্চারণ করা সম্ভব, ‘দেশ খুঁজেছি, মানুষ খুঁজেছি/ শতকের পর শতক শেষ/ ভূখণ্ড ঘিরে ভাষাও পেয়েছি/ তবুও জোটেনি কল্যাণী দেশ।’ (‘বাঙাল স্বদেশ’, কবিতাসমগ্র, অনিন্দ্য প্রকাশ, ২০১৩, পৃ ৬৪)। ব্যক্তিগত সাফল্যের লক্ষ্য বিসর্জন দিয়ে, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে তিনি নিজেকে ধাবিত করেছেন ভাষা-আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নের কাজে। এ-বিষয়ে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট :

আমাদের দেশ ভাষিক জাতিরাষ্ট্র। ইউরোপের দিকে যদি তাকাই, দেখা যায় মাতৃভাষাই রাষ্ট্রভাষা, এরপর তাকে জাতীয় ভাষা করা হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রয়োগ। এ চরিত্রই জাতিরাষ্ট্রের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন – সর্বত্রই কিন্তু তা-ই। অথচ আমরা নামেই কেবল জাতিরাষ্ট্র। আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা কিন্তু তা জাতীয় ভাষা বাংলা নয়। সেটা হলে আমাদের উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞানশিক্ষা, উচ্চ আদালতে বাংলা নেই কেন? চীন, জাপান, কোরিয়ার মতো দেশ প্রাচীন আদি চিত্রলিপির বর্ণমালার ভাষা নিয়ে যদি মহাকাশ বা আণবিক গবেষণা করতে পারে, তাহলে আমাদের বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নত বাংলা ভাষা নিয়ে কেন বিজ্ঞান গবেষণা করতে পারব না? সর্বত্র বাংলা চালু না হওয়ার পেছনে আসলে সদিচ্ছার অভাবটাই দায়ী। আর দায়ী পৌনে দুই শ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব।   

                     (প্রথম আলো, ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০২২)

ষাটের দশক থেকে আহমদ রফিক পরবর্তী সময়ে ভাষা

আন্দোলন বিষয়ে নৈর্ব্যক্তিক গবেষণা, গ্রন্থ প্রণয়ন, ভাষা-আন্দোলনের সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে নানা পর্যায়ে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছেন। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যনির্ভর আলোচনা-গবেষণা, ভাষা-আন্দোলনের ঐতিহাসিক দায় থেকে তাত্তি¡কতা, তাৎপর্য ও গুরুত্ব বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন, বাংলা কবিতা ও বাংলাদেশের কবিতাবিষয়ক আলোচনা-সমালোচনা নিয়ে গ্রন্থ প্রণয়ন তাঁর অন্যতম আনন্দের জায়গা বলে মনে হয়। ভাষা-আন্দোলন বিষয়ে তিনি বই লিখেছেন সাংস্কৃতিক ও চেতনাগত দায়বোধ থেকে। এর জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে ভাষা-আন্দোলনবিষয়ক গবেষণায় তেমন কোনো পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা স্বীকৃতিও প্রত্যাশা করেননি। একের পর এক লিখেছেন গুরুত্বপূর্ণ সব বই। এসব বই বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও উচ্চতর শ্রেণির পঠনপাঠনে। তিনি নিজে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকলেও ভাষা-আন্দোলনবিষয়ক প্রতিটি গ্রন্থই তিনি লিখেছেন নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। নিজেকে রেখেছেন দর্শক বা পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়; যেন কর্মী আর লেখক আহমদ রফিকের মধ্যে দূরত্বের নৈকট্য বিরাজমান। বহু ভাষাসংগ্রামীকে পাদপ্রদীপের আলোয় এনেছেন তিনি। কেবল ঢাকা নয়, মফস্বলের অনেক শহর এবং গ্রামপর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছিল ভাষা-আন্দোলনের উত্তাপ। জীবনের শেষ দিকে পৌঁছে সে-বিষয়েও গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করে নতুন প্রজন্মের ভেতরে জাগিয়ে তুলেছেন বিস্তৃত গবেষণার তৃষ্ণা।

ভাষা-আন্দোলন, একুশের মুহূর্তগুলো, ভাষা-আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন : স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও অনুষঙ্গ, একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও উত্তরপ্রভাব, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ইতিহাস বিকৃতি : তমদ্দুন মজলিস ও কমিউনিস্ট পার্টি, ভাষা আন্দোলন : টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া প্রভৃতি ভাষা-আন্দোলন বিষয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

দুই

১৯৫৮ সালে আহমদ রফিকের জীবনে দুটি ঘটনা ঘটে। এক. কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কছেদ। তবে জীবনের শুরুতে মার্কসবাদের প্রতি যে আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল, তা আজো অপরিবর্তিত। দুই. শিল্প সংস্কৃতি জীবন নামে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ এক প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় ঘটনাটি কেবল ব্যক্তি আহমদ রফিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি বাংলাদেশের প্রবন্ধসাহিত্যের জন্যও এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে-স্বপ্ন তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী হিসেবে দেখেছিলেন, সেই দর্শন বিস্তার ও বিকাশের কাজটি করতে থাকলেন মননশীল চিন্তা এবং সৃজনশীল ও শৈল্পিক প্ল্যাটফর্মকে অবলম্বন করে। ওই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাবন্ধিক আহমদ রফিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্তে¡ও তিনি তেমন আলোচনায় আসেননি। পঞ্চাশের দশকের কবি ও কথাসাহিত্যিকগণকে ভাষা-আন্দোলনের সন্তান হিসেবে আমরা গণ্য করে বাংলাদেশের সাহিত্যের পথনির্মাতা হিসেবে আমরা আলোচনায় রাখি। যেমন বাংলাদেশের সাহিত্যের ইশতেহার হিসেবে বিবেচিত হাসান হাফিজুর রহমান-সম্পাদিত একুশে ফেব্রæয়ারী। এ-সংকলনে অন্তর্ভুক্ত কবি-লেখকগণ পঞ্চাশের দশক এবং এর পরবর্তী সময়ে যতটা পাদপ্রদীপের আলোয় ছিলেন, অন্যদের ক্ষেত্রে তা কঠিনই ছিল বৈকি! আগে থেকেই লেখালেখিতে যুক্ত থাকলেও ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত সংকলনটিতে আহমদ রফিকের লেখা অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তিনি খানিকটা বিস্মিত হয়েছিলেন। এ-বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, ‘আমাদের হোস্টেলে বসেই ওই সংকলনের সমস্ত পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনার সঙ্গে আমিও যুক্ত ছিলাম। তাঁর সাথে আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। তা সত্ত্বেও সালেহর কাছ থেকে, জামালুদ্দিন বলে আমার আরেক জুনিয়র … তাঁর কাছ থেকেও লেখা নিয়ে ছেপেছিল। অথচ আমার সাথে দিনে একবার-দুবার-তিনবার করে দেখা হয়েছে, কখনো বলেনি কবিতার কথা।’

                          (আহমদ রফিক সম্মাননা গ্রন্থ, পৃ ২৭৮)

আহমদ রফিক ছিলেন বাংলাদেশের সমালোচনাসাহিত্য বা প্রবন্ধসাহিত্যের অন্যতম অগ্রপথিক। পঞ্চাশের অনেক খ্যাতিমান কবি ও লেখকের বই প্রকাশের আগেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ শিল্প সাহিত্য জীবন। বাংলাদেশের সমালোচনাসাহিত্যের অগ্রগণ্য রচনা হলেও বইটি বিদ্বৎজনদের খুব একটা দৃষ্টি কাড়তে পারেনি। আমাদের সাহিত্য অঙ্গনে স্বীকৃতিদানের এমন দীনতার নজির আরো আছে। তবে এক্ষেত্রে আহমদ রফিকের স্বভাবজাত আত্মপ্রচারবিমুখতাকেও অনেকে দায়ী করে থাকেন, যদিও সাহিত্যবিচারে এমন ধারণা মূল্যহীন। তাঁর এ-গ্রন্থটি সম্পর্কে একটি সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ : ‘তাঁর সমসাময়িক বাংলাদেশের অনেক কৃতী সাহিত্য সমালোচকের কোনো গ্রন্থ তখনও প্রকাশ পায়নি যখন রফিকের প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ বেরিয়ে গেছে – আর তা রীতিমতো পাকা হাতেই পরিশীলিত রূপ পেয়েছে। … আহমদ রফিক শিল্প সংস্কৃতি জীবন রচনার কাল থেকেই নিজস্ব ভঙ্গি গড়ে বাংলা সাহিত্য বিশ্লেষণে সচেষ্ট হন। তাঁর এই প্রচেষ্টায় প্রথাবদ্ধতা থেকে দূরে থাকার আগ্রহ যেমন স্পষ্ট তেমনি ভাষার কারিগরিতে প্রচলিত অনেক ধারণাকে পুনর্মূল্যায়নের আন্তরিকতাও এতে লক্ষণীয়।’ (সৈয়দ শাহরিয়ার রহমান, আহমদ রফিক সম্মাননা গ্রন্থ, পৃ ১৬৭-১৬৮)। গ্রন্থটিতে কেবল প্রতিষ্ঠিত লেখকদের গ্রন্থ

সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনাই অন্তর্ভুক্ত হয়নি, সম্ভাবনাময় তরুণ কবি-লেখকদেরও পাঠকের সামনে তুলে ধরাকে দায়িত্ব জ্ঞান করেছেন তিনি। তিনি একদিকে যেমন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের কঠোর সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে তেমনি নিজের সমসাময়িক কবি শামসুর রাহমানের প্রকাশিত কয়েকটি কবিতার ভিত্তিতে তাঁর তুমুল সম্ভাবনা, ত্রুটি ও দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছেন (উল্লেখ্য, আহমদ রফিকের প্রবন্ধগ্রন্থটি প্রকাশের আরো দুই বছর পর শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়)। পাশাপাশি লিখেছেন বাংলা কথাশিল্প, কালীপ্রসন্ন সিংহ, দীনবন্ধু মিত্র, মীর মশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম তথা বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে। সেই সময়ের তরুণ প্রাবন্ধিকের বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর রূপরেখায় বঙ্কিম বিচার’ শীর্ষক প্রবন্ধটি অত্যন্ত সাহসী কাজ হিসেবে পরিগণিত হতে পারত। এর ভাষা যথেষ্ট পরিপক্ব ও প্রাঞ্জল। আনন্দমঠ, সীতারাম, চন্দ্রশেখর ও দেবীচৌধুরাণীর যে পাঠ-সমালোচনা ও বিশ্লেষণ তিনি করেছেন, তার সাহিত্যমূল্য মোটেও অকিঞ্চিৎকর নয়, বরং তা আজো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের কয়েকটি উপন্যাসকে সুচারুরূপে ব্যাখ্যা করে দীর্ঘ প্রবন্ধটির শেষ দিকে তিনি বলেছেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষাশৈলীতে, প্রথম জাত ঔপন্যাসিক হিসাবে তাঁকে পেয়ে যেমন উৎফুল্ল হই, তেমনি সেই সঙ্গে বেদনা অনুভব না করে পারিনে তাঁর প্রতিভার অধস্তনবৃত্তিতে। বঙ্কিম যা হতে পারতেন, আর বঙ্কিম যা হয়েছেন, এই দুয়ের মধ্যে পর্বত-প্রমাণ তফাৎ।’ উপন্যাসে প্রতিফলিত বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি বলে আহমদ রফিক তাঁর শিক্ষক অরবিন্দ পোদ্দার-প্রণীত
বঙ্কিম-মানসকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন :

আনন্দমঠ উপন্যাসে বঙ্কিম বলেছেন, ‘আমরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে নই, ইংরেজ মিত্র রাজা। আমরা মুসলমানদের বিনাশ করিবার জন্যই সন্তানবাহিনীর বিদ্রোহ উপস্থিত করিয়াছি।’ এখানে ইতিহাসের একটা বিরাট বিকৃতি ঘটেছে। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে। কর্মহীন বেকার সেনাবাহিনীর লোকজন এবং কারিগর শ্রেণি, যাদের হাতে কোনো কাজ নেই, তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল কৃষক শ্রেণি – এই নিয়ে ওই বিদ্রোহটা হয়েছিল। এর একদিকে ফকির মজনু শাহ আর অন্যদিকে ছিলেন সন্ন্যাসী ভবানী পাঠক। … এমন একটি প্রগতিশীল আন্দোলনকে বঙ্কিমচন্দ্র হিন্দু রিভাইভালিজমের আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধের আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।’

                                  (পূর্বোক্ত, পৃ ২৬৬-২৬৭)

বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ভাষা-আন্দোলনের পর এবং ষাটের দশকেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানাভাবে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর নানা অপতৎরতা চালিয়ে গেছে। এর অন্যতম ছিল উর্দু হরফে বাংলা লেখা, আরবি হরফে বাংলা লেখা ইত্যাদি। একপর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য-সংগীত প্রচারমাধ্যমে নিষিদ্ধও করে দেয় পাকিস্তানি সরকার। এর শুরুটা হয় ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে। একদিকে সরকারের রবীন্দ্রবিরোধী অবস্থান, অন্যদিকে বাঙালি সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের রবীন্দ্রানুরাগ। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আহমদ রফিকের মননশীল সাহিত্যসাধনার বড় অংশজুড়ে আসীন হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, চিত্রকর্ম নিয়ে রচনা করেছেন পৃথক পৃথক গ্রন্থ। এক্ষেত্রে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রতিষ্ঠানতুল্য। কারণ রবীন্দ্র-সাহিত্য বিষয়ে তিনি প্রণয়ন করেছেন প্রায় দুই ডজন গ্রন্থ। ষাটের দশক থেকে তাঁর ধারাবাহিক রবীন্দ্র-অধ্যয়ন সুবিদিত হয়ে ওঠে। ফলে সত্তরের দশকের শুরুর দিকে রচিত প্রবন্ধ নিয়ে ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে তাঁর গ্রন্থ আরেক কালান্তরে। গ্রন্থটি তাঁর এবং বাংলা একাডেমির প্রথম রবীন্দ্রসাহিত্য-বিষয়ক গ্রন্থ। ষাটের দশকে সরকারিভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে রবীন্দ্রবিরোধিতা তাঁর মনে যে প্রভাব বিস্তার করেছিল, সংগত কারণে তা-ই প্রাধান্য পায় গ্রন্থটিতে অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধসমূহে। এর ‘ভূমিকা’ অংশে তিনি তা ব্যক্ত করেছেন এভাবে : ‘সাহিত্যের
গণ-সচেতন ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পস্রষ্টা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চল্লিশ দশক থেকে যে বিতর্কের সূচনা, বিভিন্নরূপে তার ধারা বর্তমান দশকেও বহমান; যদিও এই বিতর্ক এক অর্থে তাঁর সৃষ্টির সমকালিক সজীবতার ইঙ্গিতবহ, তথাপি সাধারণভাবে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি রাজনীতিসম্পৃক্ত বিষয়ে রৈবিক ভূমিকার বাস্তব পরিচয় তুলে ধরা – এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশের পূর্ব-চৈতন্যের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্র-মানসের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ধ্যান-ধারণার বিশ্লেষণ ও তাঁর ঐতিহ্যাশ্রয়ী প্রকৃতি নির্ধারণের প্রচেষ্টা বর্তমান গ্রন্থের প্রধান উদ্দেশ্য।’ গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধসমূহের শিরোনামগুলোও আহমদ রফিকের রাজনৈতিক রবীন্দ্রচিন্তারই স্মারক – ‘বিতর্কের আলোয়’, ‘রাজনীতির জটিল উদ্যানে’, ‘কবি স্বভাব : শৈল্পিক সততায়’, ‘স্বদেশ ও সম্প্রদায় : উদার ভাষ্যে’, ‘মাটির ভুবন : গভীর মননে’, ‘বিশ্বচৈতন্যের ঘাটে’, ‘রবীন্দ্র-মানস : পর্বান্তরে’, ‘মানুষের সপক্ষে : কালান্তরে’। কেবল আলোচনার জন্য আলোচনা নয়, রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রদর্শনকে সাহিত্যরসিকদের সামনে নতুন পর্যবেক্ষণসহ হাজির করার কৃতিত্বও তাঁর। ছোটগল্পের বিষয় ও কলাকৌশল নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যাপকদের মতো যেমন তিনি রচনা করেছেন ছোটগল্পের শিল্পরূপ : পদ্মাপর্বের রবীন্দ্রগল্প, তেমনি সমৃদ্ধ উপাত্ত সংগ্রহ করে মাঠের নিষ্ঠাবান গবেষকের মতো তিনি প্রণয়ন করেছেন রবীন্দ্রভাবনায় গ্রাম : কৃষি ও কৃষক, রবীন্দ্রভুবনে পতিসর প্রভৃতি গ্রন্থ। শেষোক্ত গ্রন্থটির মাধ্যমে তিনি ভিন্ন এক রবীন্দ্রনাথকে পরিচয় করিয়ে দেন পাঠকের সামনে। তিনি মনে করেন, ‘পতিসরেই রবীন্দ্রনাথের পল্লিচিন্তা ও স্বদেশভাবনার বিকাশ ঘটে। দেশের সত্যিকারের রূপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন পতিসরে। রবীন্দ্রজীবনধারায় পতিসরের দিনলিপি, স্মৃতি, সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি।’ একসময়ের রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠকের চিন্তায় রবীন্দ্রনাথ কেবল সাহিত্যিক-শিল্পী হিসেবে ধরা পড়েন না। তাঁকে তিনি দেখেন নিবিড় দৃষ্টি ও সচেতন চিন্তায়। ফলে তাঁর রবীন্দ্র-সাহিত্যবিষয়ক গ্রন্থের নামকরণ করেন রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ, রবীন্দ্র-সাহিত্যের নায়িকারা : দ্রোহে ও সমর্পণে, রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প, বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার একটি অধ্যায়, রবি বাউল ও তার বিচিত্র ভাবনা, নানা আলোয় রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি নামে। বাংলা একাডেমি-পরিকল্পিত চার খণ্ডের রবীন্দ্রজীবনের দুই খণ্ডও রচনা করেছেন তিনি। এত যত্নে
রবীন্দ্র-অধ্যয়নের পরও তাঁর উপলব্ধি, তিনি কেবল একজন রবীন্দ্র-অনুরাগী ব্যতিরেকে অন্য কেউ নন।

তিন

আহমদ রফিকের সাহিত্যসাধনার সমৃদ্ধি এনে দিয়েছে বাংলাদেশের কবিতা। কবিতাবিষয়ক বহু প্রবন্ধ রচনা করেছেন তিনি। সেসব প্রবন্ধের বিষয় ও আঙ্গিকে রয়েছে বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের কবিতার জন্মযাত্রা থেকেই তিনি একজন সক্রিয় কবি এবং একজন চিন্তাশীল প্রত্যক্ষদর্শী। ফলে তিনি তাঁর সমালোচনায় বাংলাদেশের কবিতার উত্তরাধিকার শনাক্ত করতে পারেন নির্মোহভাবে। তাঁর এ-বিষয়ক চিন্তার বিশেষত্ব হলো, তিনি চল্লিশ দশককে অবজ্ঞা করে বাংলাদেশের কবিতার যাত্রাকে বিবেচনায় নেন না। বরং চল্লিশের দশককে তিনি আখ্যা দেন দামাল দশক হিসেবে। বাংলাদেশের কবিতার চারিত্র্য নির্ধারণে চল্লিশের দশককে তিনি সাঁকো হিসেবে গণ্য করতে চান। তাঁর এই প্রয়াস অ্যাকাডেমিক তাত্তি¡ক-গবেষকের চেয়ে আলাদা। কারণ, তিনি একদিকে কবিতার এক অনুসন্ধিৎসু পরিব্রাজক; যিনি বাংলাদেশের মননশীল সাহিত্যকে সমৃদ্ধিদান করতে গিয়ে নিজের কবিসত্তার প্রতি অনেকটা অবিচার করেছেন, অন্যদিকে সাহিত্য-সংস্কৃতির একজন যোদ্ধা হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছেন প্রতিশ্রুশীল তরুণদের কবি হয়ে ওঠা। তাই বাংলাদেশের কবিতা বিষয়ে তাঁর সাধনার বয়সও ছয় দশকের মতো। ত্রিশের দশকের জীবনানন্দ দাশ ও বিষ্ণু দে-র কবিতা নিয়ে যেমন রচনা করেছেন জীবনানন্দ কবি প্রেমিক ও গৃহী এবং বিষ্ণু দে : কবি ও কবিতা, তেমনি বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে প্রণয়ন করেছেন কবিতা আধুনিকতা ও বাংলাদেশের কবিতা, বাংলাদেশের কবিতা : দশকভাঙা বিচার, কবিতার বিচিত্র ভাষ্য শীর্ষক অসামান্য গ্রন্থসমূহ। বাংলাদেশের কবিতা বুঝতে এবং তার ধারাবাহিক উত্তরণ ও সমৃদ্ধি জানতে এ-বিষয়ে তাঁর গ্রন্থ তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কবিতা যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সচেতনতাকে সামনে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, তার শৈল্পিক ভিত্তি ও যৌক্তিকতা নিয়ে অধুনা বিস্তর আলোচনা চলছে। এ-বিষয়ে আহমদ রফিকের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুচারু : ‘কবিতার সামাজিক অঙ্গীকারের প্রত্যয় বা দেশাত্মবোধের গভীর উচ্চারণ কবিতার শুদ্ধতা নষ্ট করবে এমন অর্বাচীন ধারণার পেছনে যুক্তি নেই। শুদ্ধ কবিতা বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে কি না তাই বরং প্রশ্ন-সাপেক্ষ। আসলে কবিতার কবিতা হয়ে ওঠাই সবচেয়ে বড় কথা। … বাংলাদেশের কবিতা তার ভাষিক ও প্রাকরণিক উভয় দিক থেকেই বিভাগপূর্ব সময় থেকে দ্বৈত চরিত্রের অভিসারী। রাজনৈতিক নিয়তির টান এর অন্যতম কারণ। তাই পূর্ব ঐতিহ্যের পাশাপাশি নব ঐতিহ্যসৃষ্টির আকর্ষণ প্রকৃতপক্ষে চল্লিশের দশকের প্রথম পর্ব থেকে পাকিস্তানযাত্রী কবিদের মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ভ‚কম্পন এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। কবিতাকে শিকড়নিষ্ঠ চৈতন্যে ফিরে যেতে সাহায্য করে।’

(বাংলাদেশের কবিতা : দশকভাঙা বিচার, সময় প্রকাশন, ২০১৪, পৃ ৮)

বাংলাদেশের কবিতাবিষয়ক গ্রন্থগুলোতে আহমদ রফিক কেবল সমালোচনার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। বরং কবিতার নানা তাত্তি¡ক আলোচনায় নিজের পঠন-পর্যবেক্ষণের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন, যে-কারণে তাঁর কবিতা আধুনিকতা ও বাংলাদেশের কবিতা শীর্ষক গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধের মধ্যে পৃথকভাবে নজর কাড়ে ‘কবিতার সংজ্ঞা, কবিতার সৃষ্টি’, ‘কবিতার ইতিহাস কবিতার বৈচিত্র্য’, ‘কবিতার তত্ত্ব, তত্ত্বনির্ভর কবিতার বিবেচনা’, ‘আধুনিকতার চরিত্র বিচার ও আধুনিক কবিতা’, ‘বাংলা কবিতার ঐতিহ্য-চরিত্র : দ্বৈতরূপে দ্বন্দ্ব’ প্রভৃতি।

চার

আহমদ রফিকের চিন্তাচর্চার দিগন্ত বিপুল এবং বিস্তৃত। কেবল দু-চারটি বিষয়ের মধ্যে নিজের লেখকসত্তাকে আটকে রাখেননি তিনি। ভাষা-আন্দোলনের একজন সংগঠক হিসেবে এর তাত্ত্বিক বিষয়াদি নিয়ে যে গবেষণা ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তিনি  দেশ ও জাতির আদর্শ-চেতনার যে-অন্বেষণ শুরু করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতায় দৃষ্টিনিবদ্ধ করেছেন বাঙালির সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দিকেও। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বন্দি ঢাকায় অত্যন্ত সংগোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছেন চিকিৎসা-সহায়তা। আর প্রত্যক্ষ করেছেন পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের বর্বরতা। সেই বেদনাকে গ্রন্থরূপ দিয়েছেন ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো, একাত্তরে পাকবর্বরতার সংবাদভাষ্য, বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ শিরোনামে। গ্রন্থগুলোর মধ্যে বাঙালির স্বাজাত্যবোধ, দেশাত্মবোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং তাদের সামষ্টিক স্বার্থে আত্মত্যাগের যে তাগিদ, তার উপলব্ধি ও পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর একটি বইয়ের নাম জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা। কলকাতা থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটিতে। জাতিগত সত্তার অন্বেষণের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব সন্ধানের প্রয়াস পেয়েছেন। এ-সূত্রেই তিনি দেখতে পেয়েছেন, ‘বাঙালি জাতিসত্তা ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রগঠনের বীজটি ভাষা-আন্দোলনের মধ্যেই গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।’ তবে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা যতটা মাধুর্যমণ্ডিত, তার বাস্তবায়ন যে ততটা নয়, সেই দিকেও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। ফলে সেই তাড়না থেকেই তিনি রচনা করেছেন আরেক অনবদ্য গ্রন্থ বাংলাদেশ : জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্রের সমস্যা।

সাতচল্লিশের দেশভাগ, ভাষা-আন্দোলন হয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের যে বাস্তবতা রাষ্ট্রে-সমাজে বিরাজমান, তার অনুসন্ধানে রয়েছে আহমদ রফিকের চিন্তাচর্চার একটি ধারাবাহিক ব্যাপ্তি। ফলে তাঁকে রচনা করতে হয় এক বড় পরিসরের ইতিহাসগ্রন্থ দেশবিভাগ : ফিরে দেখা। পঞ্চাশের দশকে ইতিহাসের যে বাঁক পরিবর্তন হয়েছিল আমাদের ভ‚খÐের, সেই সময়ের অন্যতম সক্রিয় কর্মী-পুরুষ আহমদ রফিক। ফলে ‘জীবনের দীর্ঘ সময় যে-বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়েছে, আন্দোলিত-আলোড়িত ও ব্যথিত করেছে, যৌবনের সবচেয়ে মূল্যবান দিনগুলোতে সংঘটিত
আনন্দ-বিষাদে ভরা সেই ঘটনা নিয়েই জীবনের পড়ন্ত বেলায়’ রচনা করলেন এ-গ্রন্থ। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল মানুষ পরিচয়ের মধ্যেই যেন মানুষের সমস্ত অধিকারপ্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা থাকে, তেমন নির্মোহ বিশ্লেষণ এবং সেই সময়ের নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণই গ্রন্থটিতে প্রাধান্য পেয়েছে। এ-গ্রন্থেই তিনি প্রশ্ন তুলেছেন দেশভাগের অনিবার্যতা নিয়ে। তিনি মনে করেন, দেশভাগ এড়ানো গেলে সেটাই হতো বৃহত্তরভাবে মানুষের জন্য কল্যাণকর। বইটিতে তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট যুক্তি দিয়ে তৎকালীন নেতৃত্বের ভুলগুলিকে চিহ্নিত করেছেন। অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন ‘বাঙালি রেনেসাঁর মহান পুরুষ’ হিসেবে। কবিসত্তা ও কথাশিল্পীসত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি আহমদ রফিক সম্পর্কে বলেছেন, ‘ইউরোপীয় রেনেসাঁ যেমন বিজ্ঞানী দার্শনিক সাহিত্যিক শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে উদ্বুদ্ধ করেছিল নতুন নতুন গবেষণা, সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতা তথা ব্যাপক জ্ঞানচর্চায়, তেমনি বাংলাদেশেও বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন আমাদের সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতার সকল ধারাকে বিপুলভাবে উজ্জীবিত করেছিল নবনির্মাণের প্রেরণায়। আহমদ রফিক হলেন এই রেনেসাঁ-উদ্বুদ্ধ মহৎ ব্যক্তিত্ব। … মার্কসবাদী সমাজাদর্শে আলোকিত এই লেখক সর্বদা প্রগতিভাবনায় ভাবিত। নিজ মাতৃভূমিতে একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তিনি দেখেন। তাঁর এই কবি ও কথাশিল্পীসত্তার সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবী সত্তা তাঁকে শুধু কবিতা ও কথাশিল্প রচনায়ই উদ্বুদ্ধ করে না, মার্কসবাদী সমাজসচেতন কবিতা বিশ্লেষণেও সমানভাবে আগ্রহী করে তোলে।’ (আহমদ রফিক সম্মাননা গ্রন্থ, কথাপ্রকাশ, ২০১৮, পৃ ১৩২-১৩৫)। তাঁর প্রগতিভাবনার সক্রিয়তা এতটাই বুদ্ধিবৃত্তিক তাড়নাসঞ্জাত যে, বয়স এবং অসুস্থতার ক্লান্তি উপেক্ষা করে উনিশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁস-পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশতজন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রণয়ন করেন নবজাগরণের ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব বিদ্যাসাগর; যাতে তিনি বিদ্যাসাগরের শিক্ষাভাবনা, মাতৃভাষাভিত্তিক স্বাদেশিকতা, তাঁর সাহিত্যসাধনার বৈচিত্র্য, সমাজে আধুনিকতার ভিত তৈরিতে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তৈরি, সাহিত্যকর্মে অনুবাদের প্রাধান্য, ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্যচর্চা, বিদেশি তথা ইংরেজি সাহিত্যের অনুবাদের উদ্দেশ্য, বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনায় ভিন্নমাত্রিক জাগরণ ঘটানোর আপসহীন প্রয়াস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনা অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এছাড়াও বিবিধ বহু বিষয়ে রয়েছে আহমদ রফিকের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বুদ্ধিজীবীর সংস্কৃতি, মৃত্যুহীন বিপ্লবী চে গুয়েভারা, ইলা-রমেন কথা : প্রাসঙ্গিক রাজনীতিক, সংঘাতময় বিশ্বরাজনীতি, সংস্কৃতিকথা : যুক্তিবাদ মুক্তচিন্তা, বাঙলা বাঙালি আধুনিকতা ও নজরুল প্রভৃতি। লিখেছেন স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনী। আত্মজীবনীর প্রসঙ্গ দিয়ে এ-লেখার ইতি টানা যাক।

আহমদ রফিকের আত্মজীবনীর নাম দুই মৃত্যুর মাঝে নান্দনিক একাকিত্বে। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই সত্ত্বেও দীর্ঘ এক নান্দনিক জীবন কাটিয়েছেন আহমদ রফিক। কিন্তু দুটি মৃত্যু তাঁর জীবনকে আমূল পাল্টে দিয়েছিল, যাদের প্রভাব আজ অবধি বিদ্যমান। এক. তাঁর বাবার মৃত্যু। দুই. স্ত্রীর মৃত্যু। পিতাকে নিয়ে তাঁর কোনো স্মৃতি নেই। কারণ, পিতার মৃত্যুকালে তাঁর বয়স দুই কি আড়াই বছর। তিনি লিখেছেন, ‘এত অল্প বয়সী শিশুর তা থাকার কথা নয়। পিতা আবদুল হামিদ আমার চেতনায় একজন অস্তিত্বহীন মানুষ, একটি নামমাত্র, আমার জন্মদাতা। আমার জীবনে তাঁর কোনো ইতিবাচক প্রভাব নেই। যা আছে, তার সবটাই নেতিবাচক।’ মারফতি গানের এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে মেঘনার বুকে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হন তিনি। একদিন পর জানা গিয়েছিল নৌকাডুবির খবর। সহযাত্রীর মরদেহ পাওয়া গেলেও তাঁর পিতার হয়েছিল সলিলসমাধি। ২০০৬ সালে ঘটে স্ত্রীবিয়োগ, যা তাঁর শেষ জীবনকে করে তুলেছে অসহনীয়। পিতা ও স্ত্রীর মৃত্যুর মাঝখানে তাঁর যে-জীবন, তা বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামমুখর এক নান্দনিক জীবন। বয়সের ভার তাঁর শরীরকে আক্রান্ত করেছে বটে। কিন্তু স্মৃতি এখনো প্রখর। তাঁর ভাষায়, স্মৃতির তারুণ্য কমেনি এতটুকুও। শ্রুতিলেখকের সহায়তায় লিখছেন উপন্যাস। তাঁর অনন্য এ-সৃষ্টিযাত্রা আজীবন অব্যাহত থাকুক।

গ্রন্থসূত্র

১।             আহমদ রফিক, দেশবিভাগ : ফিরে দেখা, অনিন্দ্য প্রকাশ, ২০১৪।

২।             আহমদ রফিক সম্মাননা গ্রন্থ (সম্পাদনা : ভীষ্মদেব চৌধুরী), কথাপ্রকাশ, ২০১৮।

৩।            আহমদ রফিক, দুই মৃত্যুর মাঝে নান্দনিক একাকিত্বে, এই সময় পাবলিকেশন্স, ২০২১।

৪।             আহমদ রফিক, আরেক কালান্তরে, বাংলা একাডেমি, ১৯৭৭।

৫।             আহমদ রফিক, রবীন্দ্রভুবনে পতিসর, সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৮।

৬।            আহমদ রফিক, শিল্প সংস্কৃতি জীবন, কোহিনুর লাইব্রেরি, ১৯৫৮।

৭।             আহমদ রফিক, কবিতা আধুনিকতা ও বাংলাদেশের কবিতা, অনন্যা, ২০০১।

৮।            আহমদ রফিক, কবিতাসমগ্র, ২০১৩।

৯।            দৈনিক প্রথম আলো।

১০।          দৈনিক আজকের পত্রিকা। ৎ

আহমদ রফিক

বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের সক্রিয় ভাষাসংগ্রামী, কবি, প্রবন্ধকার, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুরে ১৯২৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর। বাবা আবদুল হামিদ, মা রহিমা খাতুন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক (এমবিবিএস) সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনে প্রধানত বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির জ্যেষ্ঠ নির্বাহী। রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সৃষ্টিসাধনা-বিষয়ক গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য ‘টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ ২০১১ সালে তাঁকে ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করে। সম্মাননা : একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতি। উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা – কবিতা : নির্বাসিত নায়ক, রক্তের নিসর্গে স্বদেশ, একগুচ্ছ রাজনৈতিক কবিতা; প্রবন্ধ : শিল্প সংস্কৃতি জীবন, নজরুল কাব্যে জীবনসাধনা, রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ, একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস, রবীন্দ্রভুবনে পতিসর, ভাষা আন্দোলন : গ্রাম : কৃষি ও কৃষক; গল্প : অনেক রঙের আকাশ; শিল্পকলা : রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প; বিজ্ঞান : কেমন আছেন, আদিমানবের সন্ধানে; অনুবাদ : জীবনরহস্য, বিজ্ঞানের জয়যাত্রা; সম্পাদনা : নাগরিক (ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র), পরিভাষা ইত্যাদি।