জোছনা ও জননীর গল্প
হুমায়ূন আহমেদ
অন্যপ্রকাশ
ঢাকা, ২০০৮
দাম : ৪০০ টাকা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে ১৯৭১ সাল থেকে এ-যাবৎ অনেক সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে বাস করেও আনোয়ার পাশা (১৯২৮-৭১) রচনা করেন রাইফেল রোটি আওরাত (১৯৭৩) উপন্যাস। তারও আগে ১৯৭১-এর মার্চ মাসে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে মঞ্চায়নের জন্য রচিত মমতাজউদ্দীন আহমেদের (জ. ১৯৩৫) স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা, এবার সংগ্রাম প্রভৃতি নাটকের কথাও এক্ষেত্রে স্মরণীয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সাহিত্যরচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ-ধারারই সর্বশেষ সৃষ্টি ২০০৪ সালের সালের উপলক্ষে বইমেলায় প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের (জ. ১৯৪৮) উপন্যাস জোছনা ও জননীর গল্প। বর্তমান আলোচনায় আমরা জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও আদ্দিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলব।
দুই জোছনা ও জননীর গল্প হলো হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘ পরিকল্পনা, অনেক পরিশ্রম, বিপুল পাঠ ও অনেককাণ্ড সাধনার ফসল। বিপুল্লায়তন এই মহাকাব্বিক উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাসে উঠে এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুসঙ্গ। আলোচ্য রচনায় হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসের আধারে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্রমিক ইতিহাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কোনো প্রসঙ্গই হুমায়ূনের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার ও গণহত্যা, নারীধর্ষণ, রাজাকার-আলবদর বাহিনীর দালালি, সাধারণ মানুষের দুঃসহ জীবন, ভারতে শরণার্থী শিবির, পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বন্দিজীবন, কলকাতায় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ, বুদ্ধিজীবী হত্যা, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম, ভারতীয় সেনাবাহিনীর কার্যক্রম—সব বিষয়ই সতর্কতার সঙ্গে শিল্পিত পরিচর্যায় আলোচনা উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন হুমায়ূন আহমেদ।
জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসের সব ঘটনাই সত্যাশ్రয়ী। কখনো আত্মজৈবনিক উপাদান, কখনো যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা, কখনো-বা গ্রন্থপাঠ বা অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে উপাদান সংগ্রহ করে লেখক নির্মাণ করেছেন আলোচ্য উপন্যাসের কেন্দ্রীয় কাহিনী।
প্রসঙ্গ স্মরণীয় লেখকের ভাষায়— ‘উপন্যাসে বর্ণিত প্রায় সব ঘটনাই সত্যি। কিছু নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া। কিছু অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে ধরে নেওয়া।’ লেখক কখনো উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ—দলিলপত্র শীর্ষক গ্রন্থমালা থেকে, কখনো সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে, কখনো যুদ্ধ-বিষয়ক নানা গ্রন্থ থেকে, কখনো-বা আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতা থেকে। নানা উৎস থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করে এক অখণ্ড মালা রচনা করেছেন ঔপন্যাসিক।
উপন্যাসের ভরকেন্দ্র অবস্থান করেছে মুক্তিযুদ্ধ। ফলে খণ্ড খণ্ড ঘটনা ও অনুঘটনাগুলো কখনো বিচ্ছিন্ন মনে হয়নি, বরং মনে হয়েছে পরস্পর পরিপূরক। শিল্পের লেখক মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু ঘটনা ও ব্যক্তিচরিত্র ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। লেখাই বাহুল্য যে, এ-স্বাধীনতা একজন ঔপন্যাসিক সর্বদা ভোগ করে থাকেন। ঔপন্যাসিকের কল্পনা বাস্তবতাকে কখনো বিকৃত বা বিপন্ন করেনি, বরং বাস্তবতাকে আরো প্রাণবন্ত করেছে—এখানেই স্রষ্টা হিসেবে হুমায়ূনের প্রাতিভিকতা।
উপন্যাসের মুখবন্ধে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘জোছনা ও জননীর গল্প ইতিহাসের বই না, এটি একটি উপন্যাস। তারপরেও ইতিহাসের খুব কাছাকাছি থাকার চেষ্টা আমি করেছি।’ লেখকের এই মন্তব্যের আলোকে পাঠক হিসেবে আমরা স্পষ্ট করেই বলতে চাই, জোছনা ও জননীর গল্প কেবল উপন্যাস নয় — তা একই আধারে উপন্যাস এবং ইতিহাস। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এমন সৃষ্টিশীল ইতিহাস ইতিপূর্বে কখনো রচিত হয়নি। ইতিহাস-রচনার এই সৃষ্টিশীল কৌশল একান্তই হুমায়ূনের নিজস্ব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত ইতিপূর্বে কোনো উপন্যাসেই ইতিহাসকে এমন বিশ্বস্ততার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। হয়তো পূর্বগামী লেখকদের সে-উদ্দেশ্যও ছিল না। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ সতর্কতার সঙ্গেই উপন্যাসের শরীরে ইতিহাসের ধারা উৎকীর্ণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের ক্রমিক ইতিহাস, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সীমিত অপূর্ণতা সত্ত্বেও, আলোচ্য উপন্যাসের শব্দস্রোতে বন্দি হয়ে আছে। ইতিহাসকে হুমায়ূন আহমেদ কীভাবে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন, তা বোঝা যায় উপন্যাসের টীকাটিপ্পনি ও পরিশিষ্টে সংযোজিত সহায়ক গ্রন্থাবলির তালিকা দেখে। বাংলা সাহিত্যের কোনো উপন্যাসের পরিশিষ্টে, আর কেবল বাংলা সাহিত্যই বা বলি কেন, বিশ্বসাহিত্যেও তো বটে, সহায়ক গ্রন্থের তালিকা সংযোজিত হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ করতে যারা অনীহ, অথচ তারা উপন্যাস পাঠ করতে অভ্যস্ত — তারা জোছনা ও জননীর গল্প পাঠ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেই জানবে। এ-উপন্যাস পাঠ করে তারা বিস্মিত হবে, বিশ্বমিত হবে আমাদের আগামী প্রবংশ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভয়ংকর অত্যাচার ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা পড়তে পড়তে তারা লাভ করবে যুদ্ধদিনের উত্তাপ, আশঙ্কা ও আনন্দ। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায়, হুমায়ূনের এই ভাষ্য, ‘প্রকাশিত হবার আগেই এই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি অনেককে পড়িয়েছি। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি (এই প্রজন্মের পাঠকদের কথা বলছি) তারা পড়ার পর বলেছে — উপন্যাসের অনেক ঘটনাই তাদের কাছে কাল্পনিক বলে মনে হচ্ছে, এরকমও কি হয়?’ যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যাদের আছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, তারা অবশ্য বলবেন, উপন্যাসে তেমন কাল্পনিক ঘটনা তেমন নেই, এবং এর কল্পনার অংশটুকুও বাস্তবতের মতো সত্য।
যদি ধরে নেওয়া হয় জোছনা ও জননীর গল্প ইতিহাস, তাহলে উপন্যাস হিসেবে এর সার্থকতা কোথায়? হুমায়ূন আহমেদের কৃতিত্ব এ-ই, তিনি ইতিহাসকে দান করেছেন উপন্যাস-অবয়ব। মুনীর চৌধুরীর (১৯২৫-৭১) বাক্যবন্ধ ধার করে বলা যায়, জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ ‘ইতিহাসের দাস নন, শিল্পের বশ’। আরিস্টটল বলেছেন, ইতিহাস হচ্ছে সত্য ঘটনার বিবরণ, আর ইতিহাস- আশ্রিত সাহিত্য হচ্ছে ইতিহাসের কঙ্কালের উপর কবি-কল্পনার ঐশ্বর্য। ইতিহাসনির্ভর সাহিত্যে ইতিহাস ও কল্পনার মধ্যে একটি আনুপাতিক সম্পর্ক লেখককে সর্বদা রক্ষা করতে হয়। জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ ইতিহাস ও কল্পনার আনুপাতিক সম্পর্ক-রক্ষায় ঈর্ষণীয় সিদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। ইতিহাসের সত্য আর কল্পনার বাস্তবতা এ-উপন্যাসে মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেছে — কোনটি ইতিহাস আর কোনটি কল্পনা, তা পাঠকের কাছে কোনো পার্থক্যই সৃষ্টি করে না। ইতিহাসের সত্যের সঙ্গে কল্পনার সত্যের এই জৈব-ঐক্যমিলনই আলোচ্য উপন্যাসের শৈল্পিক সার্থিকতার প্রধান শক্তি-উৎস। জোছনা ও জননীর গল্প ইতিহাসের আধারে উপন্যাস, কিংবা উপন্যাসের শব্দস্রোতে ইতিহাসের কথকতা — এককথায় ইতিহাস ও উপন্যাসের যুগলবন্দি।
তিন
জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসের ক্যানভাস বিশাল, মহাকাব্যিক বিস্তৃতিই আলোচ্য উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য শিল্পবৈশিষ্ট্য। শহর ও গ্রাম — উভয়-অঞ্চলে বিচরণ করেছে এ-উপন্যাসের চরিত্রাবলি; কখনো তারা উপনীত হয়েছে আগরতলার শরণার্থী-শিবিরে, কখনো পশ্চিম পাকিস্তানের লায়ালপুর জেলখানায়, কখনো কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে — এবং এভাবেই তারা ঘুরে আসে বারাসাত, পার্ক স্ট্রিট, নীলগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোণা, পিরোজপুর, বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ময়মনসিংহসহ কত বিচিত্র জায়গায়। বহু মানুষের আনাগোনা এ-উপন্যাসে। আসমানী, শাহেদ, ইরতাজউদ্দিন, মোবারক, মরিয়ম, নাইমুল, জোহর, মনোয়ারা, কংকন, সোবহান, ফয়জুর রহমান, কলিমুল্লাহ, আসগর, মজনু মিয়া, রুনি, সরফরাজ, ছদরুল আমিন, কমলা, কালিপদ, গৌরাঙ্গ, মাসুমা — এইসব গড়পড়তা মানুষের পাশাপাশি এ-উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাসে উপস্থিত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমেদ, ইন্দিরা গান্ধী, জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। উপন্যাসে চরিত্র হয়ে এসেছেন কবি শামসুর রাহমান, কবি নির্মলেন্দু গুণ, লেখক জাফর ইকবাল, মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী এবং স্বয়ং ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ। পরোক্ষভাবে উপন্যাসে উপস্থিত হয়েছেন চীনের চৌ এন লাই, রাশিয়ার পোদগর্নি, আমেরিকার নিক্সন, উপস্থিত আছেন জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্ট; আছেন বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ হাসিনা, মেজর জিয়া, কর্নেল তাহের, গোলাম আজম, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। এইসব ব্যক্তির উপস্থিতিতে বোঝা যায়, কত বিশাল প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধকে অবলোকনের চেষ্টা করেছেন হুমায়ূন আহমেদ।
জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসে লেখক নির্মাণ করেছেন অসাধারণ কিছু চরিত্র। এসব চরিত্র বিশ্বস্ততার সঙ্গে ধারণ করে আছে মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্মম বাস্তবতা। এ-সূত্রেই স্মরণ করতে পারি ইরতাজউদ্দিন, মরিয়ম, নাইমুল, সোবহান, ফয়জুর রহমান, কলিমুল্লাহ, ছদরুল আমিন, আসগর এবং আত্মভোলা পণ্ডিত ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীর চরিত্র। আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত এইসব মানুষের চরিত্র-রূপায়ণে লেখক অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। লক্ষ্যণীয়, একাধিক চরিত্র পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে মৃত্যু অবধারিত জেনেও দেশপ্রেমের কথা স্পষ্টভাষায় নির্ভীক চিত্তে ব্যক্ত করেছে — প্রকাশ করেছে পাকিস্তানি ঘাতকবাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও প্রতিশোধের বাণী। এ-প্রসঙ্গে ইরতাজউদ্দীন, কয়েস আলী প্রমুখ চরিত্রের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। অনেক চরিত্রের ভিড়ে উপন্যাসের দু-একটি চরিত্র পাঠকমনে বিশেষভাবে দাগ কেটে যায়। শাহ কলিম, ইরতাজউদ্দীন, ছদরুল আমিন, ফয়জুর রহমান, ‘সুরমা বাবা’, হেডমাস্টার মনসুর সাহেব এবং পাখাপুড়ার রশিদের চরিত্র-নির্মাণে হুমায়ূন আহমেদের শক্তির পরিচয় প্রতিভাত।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মমতা, তাদের পানাসক্তি ও নারী-লোলুপতা এবং অসহায়-নিরীহ বাঙালিদের নিয়ে রসিকতা হুমায়ূন আহমেদ বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্য হিসেবে বাংলাদেশে এলেও পাঠান রেজিমেন্টের সৈনিকরা যে-মানবিকবোধের পরিচয় দিয়েছে, সে-কথা উল্লেখ করতেও লেখক ভুলেননি। পাকিস্তানি সেনা-কর্তৃক বাঙালি নারীদের লাঞ্ছনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক বেদনার্ত পরিচ্ছেদ। এ-প্রসঙ্গটি হুমায়ূন আহমেদ তাঁর উপন্যাসে সরাসরি আনেননি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় লেখকের ভাষ্য, ‘আমার এই বইটির অসম্পূর্ণতার মধ্যে একটি হলো আমি পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা অত্যাচারিত নারীদের বিষয়টি আনতে পারিনি। বিষয়টি এতই স্পর্শকাতর এবং এতই কষ্টকর যে, কিছুতেই লিখতে পারলাম না। আশা করছি অন্যরা লিখবেন। তাদের কলমে এইসব হতভাগা তরুণীর অশ্রুজল উঠে আসবে।’ হুমায়ূন আহমেদের এ-কথা মেনে নিয়েও বলা যায়, এ-উপন্যাসে লাঞ্ছিতা-অত্যাচারিতা নারীদের কথা যে একে বারে নেই, তা বলা যাবে না। এ-প্রসঙ্গের উল্লেখ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না ইতিহাসনির্ভর মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস। নিজে না বলে ঔপন্যাসিক তাই কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিকল্প পথ। ফুলবাড়িয়ার মোছা: চানভ্যান, বাঘেরহাটের আলেয়া বেগম ও শত্রুর মুখে যন্ত্রণাদগ্ধ [যন্ত্রণাদগ্ধ?] মণ্ডলের বয়ানে লেখক উপস্থাপন করেছেন পাক-বাহিনীর ওই বর্বরতার ইতিহাস। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ — দলিলপত্র গ্রন্থের অষ্টম খণ্ড থেকে সংকলিত মোছা: চানভানের যন্ত্রণাকথাতেই ফুটে উঠেছে পাক-বাহিনীর অত্যাচারের ছবি —
‘পাঁচদিন পাক নরপিশাচরা আমাকে তাহাদের শিবিরে ও বাংকারে আটকাইয়া রাখে ও আমার দুর্বল দেহের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করে ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংবাদ জানি কি-না জিজ্ঞাসা করে। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বন্ধে জানি না বলিলে আমার ওপর ক্রুদ্ধ হইয়া প্রহার করে। এই পাঁচদিন তাহারা আমাকে গোসল করিতে পর্যন্ত দেয় নাই।
আমাকে ধরিয়া দিবার পরিবর্তে রাজাকারগণ পাক নরপিশাচদের হইতে প্রচুর মদ ও গ্রামে গ্রামে লুণ্ঠন করার অনুমতি পাইয়াছিল। সৈন্যদের অত্যাচারে বহুবার আমি জ্ঞান হারাইয়া ফেলিয়াছি। জ্ঞান ফিরিয়া পাইলেও দেখি ও অনুভব করি আমার এই দুর্বল শরীরে অত্যাচার করিতেছে। সেই কথা ভাবিতে আজও আমার ভয় হয় (পৃ. ৩৩৮-৩৯)।
পূর্বেই বলেছি, এ-উপন্যাসের ভরকেন্দ্রে অবস্থান করছে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধই এ-উপন্যাসে পালন করেছে কেন্দ্রানুগ শক্তির ভূমিকা। ফলে বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন অনেক ঘটনা, অনুষঙ্গ ও প্রসঙ্গ একক মোহনায় মিলিত হতে পেরেছে। উপন্যাসে অনেক স্বতন্ত্র কাহিনী আছে, যেগুলো থেকে পৃথক পৃথক পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস কিংবা ছোটগল্প রচিত হতে পারে। প্রসঙ্গত বলা যায়, আসগর-মজনু মিয়ার কাহিনী উপন্যাসে যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, কোনো ধরনের সংস্কার ছাড়াই তা বিবেচিত হতে পারে একটি সাধারণ ছোটগল্প হিসেবে। উপন্যাসে বর্ণিত স্বতন্ত্র কাহিনীগুলোকে ঔপন্যাসিক শিল্পিত সতর্কতায় আবদ্ধ করেছেন একটি একক বৃত্তে।
জোছনা ও জননীর গল্প, সূচনালগ্নেই বলেছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত এক মহাকাব্যিক উপন্যাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে এত বড় ক্যানভাসের আর কোনো উপন্যাস এখনো রচিত হয়নি। উপন্যাসের প্রথাচল ফর্ম বা আঙ্গিকও হুমায়ূন এখানে ভেঙে দিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ — দলিলপত্র শীর্ষক গ্রন্থমালা থেকে প্রাসঙ্গিক নানা উপাদান-ব্যবহার নানা মানুষের ভাষণ ও বিবৃতির উল্লেখ, চিঠিপত্রের ব্যবহার ইত্যাদি কৌশলের আশ্রয়ে উপন্যাসের ফর্ম-নির্মাণে নতুন এক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ এবং আমাদের বিবেচনায় সে-পরীক্ষায় তিনি সফল। হুমায়ূনের অন্যান্য উপন্যাসের মতো এ-উপন্যাসের ভাষাও সহজ, সাবলীল ও আকর্ষণীয়, যা খুব সহজেই পাঠককে ধরে রাখতে পালন করে কার্যকর ভূমিকা। ভাষার অন্তরাশ্রয়ী গতিবেগই হুমায়ূন আহমেদের ভাষাচেতনার প্রাণবৈশিষ্ট্য, যা আলোচ্য উপন্যাসেও বিশেষভাবে পরিলক্ষিত।
জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ এত বিপুল পরিমাণ ঐতিহাসিক তথ্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন যে, মাঝে মাঝে সাল, তারিখ ও নানা প্রসঙ্গ নিয়ে মতান্তর দেখা দিতে পারে। এ-রকম দু-একটি তথ্য উপন্যাসের দ্বিতীয় সংস্করণে লেখক সংশোধনও করেছেন। তথ্যের খুঁটিনাটি বিষয় ইতিহাসের জন্য যতটা জরুরি, শিল্পের জন্য বোধকরি ততটা নয়। লেখক, ইতিহাসের প্রতি নিষ্ঠ থেকেও সচেতনভাবে এরূপ দু-একটি ক্ষেত্রে শিল্পীর স্বাধীনতা গ্রহণ করেছেন। আলোচ্য উপন্যাসের পরিশিষ্টে সংযোজিত মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ বীরত্ব ও সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা কৌতূহলী পাঠকের জন্য ভিন্ন এক উপহার। উত্তর-প্রজন্মের পাঠকের কাছে উপন্যাসটির সঙ্গে সঙ্গে এ-তালিকাও মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক জ্ঞান-আহরণে সহায় হবে।
জোছনা ও জননীর গল্প বাংলাদেশের সাহিত্যের ধারায় একটি বিশিষ্ট সংযোজন, বাংলা উপন্যাসের ধারায় সম্পূর্ণ এক নতুন নির্মাণ। এ-উপন্যাস হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রয়াসের ফসল — দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতাপ্রকাশের সফল শব্দশিল্প। প্রসঙ্গত স্মরণ করি এ-উপন্যাস বিষয়ে হুমায়ূন আহমেদের অকপট ভাষ্য —’একদিন হঠাৎ টের পেলাম অনেক সময় আমার হাতে নেই। সময় শেষ হয়ে গেছে। জোছনা ও জননীর গল্প আর লেখা হবে না। তখন আমি শুয়ে আছি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালের একটা ট্রলিতে।… যখন অচেতন হতে শুরু করেছি, তখন মনে হলো জোছনা ও জননীর গল্প তো লেখা হলো না। আমাকে যদি আর একবার পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয় — আমি এই লেখাটি অবশ্যই শেষ করব। … দেশে ফিরে লেখায় হাত দিলাম। শরীর খুব দুর্বল। দিনে দুই তিন পাতার বেশি লিখতে পারি না। এইভাবেই লেখা শেষ করেছি। এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমি দেশমাতার ঋণ শোধ করার চেষ্টা করেছি। এই আনন্দের কোনো সীমা নেই।’

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.