মীরের অনুসন্ধান, অনুভাবনা ও অনুপ্রেরণা

মীর মশাররফ হোসেন : নতুন তথ্যে, নতুন ভাষ্যে

শামসুজ্জামান খান

অবসর

ঢাকা, ২০০৪

দাম : ১১০ টাকা

এক

বাঙালি মুসলিম-সমাজে যে-বিষাদগাথা অমলিন অক্ষর মতো আজও উজ্জ্বল, চন্দ্রজ্যোৎস্নার মায়াময় আলোর রহস্য প্রদীপ জ্বেলে চলত যার পুঁথিপাঠ, কারবালার সেই হৃদয় আকুল করা কান্নার কাহিনী আমাদের নতুন সুরে শুনিয়েছেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১) বিষাদ-সিন্ধু (১৮৯১) গ্রন্থে। উপন্যাসটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি পাঠক মুগ্ধ হয়েছে এর বর্ণনার ইন্দ্রজালে, বিস্মিত হয়েছে মীরের মণিমাণিক্যখচিত গদ্যের ঠিকরে-পড়া আলোর দ্যুতিতে। কেবল সমকাল নয়, তাঁর গদ্যকরোজ্জ্বল কাহিনীর সুললিত বর্ণালি শতাব্দী পেরিয়ে আজও সমানভাবে আবেদনক্ষম। যদিও তাঁর রচিত জমিদার দর্পণ (১৮৭৩), বসন্ত কুমারী (১৮৭৩), উদাসীন পথিকের মনের কথা (১৮৯০), গাজী মিয়ার বস্তানী (১৮৯৯), আমার জীবনী (১৯১০) ইত্যাদি গ্রন্থে লক্ষণীয় গদ্য-রচনায় তাঁর স্বাতন্ত্র্য, কাহিনী ও দৃষ্টিভঙ্গি-নির্মাণে অসাম্প্রদায়িকতা ও বাঙালিমনস্কতা এবং এই দৃষ্টি ও চেতনার স্বাতন্ত্র্যে মীর মশাররফ হোসেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য ও অনির্বাণ।

দুই

মীর মশাররফ হোসেনের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে গবেষণা, রচিত হয়েছে বিচিত্র অভিসন্দর্ভ ও মূল্যায়ন-গ্রন্থ। যাঁরা দীর্ঘকাল সুগভীর নিষ্ঠায় মীর-মানসের স্বরূপ স্বাতন্ত্র্য ও নান্দনিক বিষয়াবলি নিয়ে গবেষণামগ্ন শামসুজ্জামান খান তাঁদের মধ্যে অন্যতম নিঃসন্দেহে। এবং সন্দেহাতীতভাবেই প্রায় তিরিশ বছর ধরে সুকঠিন কর্মাশ্রয়ী পথ পরিভ্রমণ করেছেন তিনি, যার সুকীর্তিত প্রয়াস মীর মশাররফ হোসেন : নতুন তথ্যে, নতুন ভাষ্যে গ্রন্থটি। মীর মশাররফ সম্পর্কে গবেষণা, অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ, আবিষ্কার ও মূল্যায়ন নিয়ে বইটি লেখকের সাম্প্রতিক প্রকাশনা। বইটি মীর মশাররফ হোসেন সম্পর্কে আমাদের ভাবনাকে প্রসারিত করে আগ্রহে, কৌতূহলী করে তোলে তাঁর সৃষ্টিশীলতা ও ব্যক্তিগতজীবনের আলো-অন্ধকার সম্পর্কে।

তিন

আমাদের আলোচনা বইটি শামসুজ্জামান খান তিনটি অংশে বিন্যাস করেছেন। ‘প্রথম ভাগ : অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত রচনা’ অংশে রয়েছে— ১. মশাররফ হোসেনের আমার জীবনীর অপ্রকাশিত অংশ; ২. ‘ফাঁস্ কাগজ’ — প্রহসন এবং ৩. গাজী মিয়ার বস্তানীর অপ্রকাশিত অংশ — এই তিনটি রচনা। দ্বিতীয় ভাগে আছে বিবি কুলসুমের ‘অপ্রকাশিত রোজনামচা’ শিরোনামের একটি রচনা এবং তৃতীয় ভাগ : মূল্যায়ন অংশে সংকলিত হয়েছে মীর মশাররফ হোসেন সম্পর্কে শামসুজ্জামান খানের বিশ্লেষণধর্মী সাতটি প্রবন্ধ।

চার

মীর মশাররফ হোসেন : নতুন তথ্যে, নতুন ভাষ্যে গ্রন্থের আমার জীবনীর অপ্রকাশিত অংশটি ২০০৩ সালের প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় লেখকের ‘পটভূমি’সহ প্রকাশিত হয়। কেবলমাত্র এইটিই নয়, অপ্রকাশিত সবকটি লেখাই লেখক সংগ্রহ করেছেন মীর-দৌহিত্র সৈয়দ সাদুল্লাহর নিকট থেকে। প্রাপ্তিস্বীকার এবং কৃতজ্ঞতার প্রকাশ আছে, কিন্তু লেখাগুলোর রচনাকাল লেখক কোথাও উল্লেখ করেননি, এমনকি সম্ভাব্য রচনাকাল সম্পর্কেও তিনি মন্তব্য করেননি (একমাত্র ‘বিবি কুলসুমের অপ্রকাশিত রোজনামচা’ ব্যতীত)। আমার জীবনীর উল্লেখযোগ্য অংশ মুনীর চৌধুরী লন্ডনস্থ কমনওয়েলথ রিলেশনস্ লাইব্রেরিতে রক্ষিত গ্রন্থ থেকে লিখে আনেন এবং তাঁর মীর-মানস গ্রন্থের পরিশিষ্টে সংযোজন করেন, সেখানে এটির রচনাকাল ১৩১৫ সাল, ১লা আশ্বিন উল্লিখিত। মীর মশাররফ হোসেন তাঁর আত্মজীবনীতে ‘বাল্য জীবন হইতে আমার ৬৫ বছরের ঘটনা’ (আমার জীবনী, পৃ. ৩) লিপিবদ্ধ করতে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন, যে-আত্মজীবনী তিনি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। সেই সূত্রে আলোচ্য গ্রন্থভুক্ত আমার জীবনীর অপ্রকাশিত অংশ ১৩১৫ বঙ্গাব্দের পরে বা সমসাময়িককালে সম্ভবত রচিত। আমার জীবনীর অপ্রকাশিত ক্ষুদ্র রচনাটি মীর মশাররফ হোসেনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমাজমনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। আত্মজীবনের টুকরো টুকরো ঘটনার ধারাবাহিক বর্ণনার আলোছায়াতেই কেবল নয়, তৎকালীন মুসলিম নবাবদের জাকজমক, বিদ্যার আন্তররিকতা সমস্তই যে শেষ পর্যন্ত অন্তঃসারশূন্য মীর মশাররফ চাকরিরজনিত ঘনিষ্ঠতাসূত্রে ভেতরের সেই সত্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি সম্ভব হয়েছে তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশীলতার কারণে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ:

নবাব আমীর আলী কলিকাতার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মান্য-গণ্য ছিলেন। বিদ্বান, বিচক্ষণ তাহার পর, বয়োবৃদ্ধ সকলেই তাহাকে ভক্তির সহিত মান্য করিত। আমরা ভাবিতাম, কত বড়ই যেন লোক। সে সময় আমার ধারণা ছিল বেশী পরিমাণ সুখ স্বচ্ছন্দে থাকা গাড়ী ঘোড়া জুড়ি সাজগোজ করা, জারির পেটি বুকে বাঁধা থোপোপরি রূপার চাপতান, কোমরে কিরীট সর্বদা বড় ২ গাড়ী দরজায় লাগিতেছে। … হায়! মুসলমানের সকলি উপরি চটক। ঘুণে কিছুই নাই অন্তঃসার শূন্য। সত্যর যেন জয় ঢাক। নবাব আমির আলীর মৃত্যুর পর তাহাই প্রমাণ করিয়া দিল। (পৃ ৫)

‘ফাস কাগজ’ শিরোনামের প্রহসনটি লেখকের ভূমিকাসহ দৈনিক ভোরের কাগজের সাময়িকীর বিশেষ সংখ্যায় (১৪ এপ্রিল ১৯৯৮) প্রকাশিত হয়। ভূমিকাংশে শামসুজ্জামান খান জানিয়েছেন, ‘লেখাটিকে গাজী মিঞার বস্তানীর অনুষঙ্গী রচনা বলা যেতে পারে। একে কেউ কেউ ‘প্রহসন’ বলেছেন— মীরের জীবদ্দশায় বিজ্ঞাপনেও ‘প্রহসন’ কথাটির ব্যবহার ছিল। প্রকৃতপক্ষে ‘ফাস কাগজ’ নাটক বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ প্রহসন নয়। নাটকের সিকোয়েন্স, মঞ্চায়ন-কৌশল এমন কি সংলাপ-সংগঠন কোনোটিই এতে রক্ষিত হয়নি। এ-কারণে শামসুজ্জামান খান বলেছেন, ‘নাটকের আঙ্গিকে একটি নকশা জাতীয় লেখা এটি।’ তাঁর মূল্যায়ন যথার্থ।

পাঁচ

বর্তমান বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে সংযোজিত হয়েছে ‘বিবি কুলসুমের অপ্রকাশিত রোজনামচা’, যেটি সম্পর্কে লেখকের অভিমত, ‘সম্ভবত বর্তমান বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং বিস্ফোরক তথ্য।’ রোজনামচাটির তাৎপর্য ও গুরুত্বের দাবি রাখে। কেননা রোজনামচাটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে লেখক আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগী ও অনুসন্ধানী করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। প্রথমত, ‘বাঙালি মুসলমান-সমাজের একজন স্বল্পশিক্ষিতা গৃহবধূ এক শতাব্দী বছর আগে নিয়মিতভাবে ডাইরি রচনা করেছেন’— এই তথ্যই বিস্ময়কর। দ্বিতীয়ত, মীর মশাররফ হোসেনের পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনের অনেক অজ্ঞাত তথ্য এই রোজনামচায় উন্মোচিত হয়েছে। এক শতাব্দী বছর পূর্বে ভারতবর্ষীয় মুসলিম নারীর নারীত্বচেতনা, ব্যক্তিত্ববোধ ও আত্মমর্যাদা সম্পর্কে সচেতনতা; তাঁর প্রেম, তাঁর যন্ত্রণা-বঞ্চনা সত্ত্বেও মীরকে ভালোবাসা— প্রেমের মধ্য-দিয়ে তাঁর নারীসত্তার প্রকাশ যেমন তাৎপর্যবহ তেমনি ‘বর্তমান জেডার প্রেক্ষাপটেও তাঁর উক্তি বিশেষ মূল্য’ বহন করে। তৃতীয়ত, ‘মীর বিবি কুলসুমকে যে-ধরনের শিক্ষিতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে অবহিত ও রুচিশীলা হিসেবে চিত্রিত করেছেন ডাইরির ভাষা, বানান ও রুচিবোধে তার প্রতিফলন নেই। অন্যদিকে ‘মশাররফ-কুলসুম দাম্পত্য সুখের সন্ধান পেয়েছিলেন।’— এই মিথটিও ভেঙে যায়। লেখকের এই মূল্যায়নের যথার্থতা নিম্নের উদ্ধৃতিদ্বয়ে মুদ্রিত (লেখিকার ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ বানান অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে):

ক. গুণনিধী স্বামীর পত্র পড়িয়া গায় [গা] মাখা দিয়া আগুন জ্বলিয়া [জ্বলিয়া] উঠিল। [।] আমি তাহাকে চটাইছি— তাহাই আমাকে লিখিয়াছেন— আমি মেয়ে মানুষ কিনা তাহাতেই আমার অপরাধ। [।] কেন ঠিক কথা লিখিলাম। আমি যদি পুরুষ হইতাম তাহা হইলে ঠিক হইত। [।] পুরুষের অপরাধ নাই। [।] যত অপরাধ মেয়ে মানুষের।

খ. স্বামী সেই মাগিটার বাড়ি [রি] ঠিকানা লিখিয়া রাখিয়াছেন। হায়রে মিথ্যাবাদী। [।] খোদা তালা কি আমার কাছে একটা সত্য কথা বলিতে দেন নাই। আবার একখানা কাগজে পর্দা লিখিয়াছেন তাহা [র] মধ্যে তিনি যাহা ২ করিয়াছেন তাহাই সাফাইয়া পর্দাতে [তে] লিখিয়াছেন। সে পর্দা পড়িলে যে স্ত্রী স্বামী ভালবাসে সেই স্ত্রী কখন এই পর্দা পড়িলে তখনই তাহার মরিতে ইচ্ছা হয়। আর যে ভালবাসিতে জানে না তাহার আলাদা কথা। সেই পর্দা পড়িলে সমস্ত শরীর হইতে আগুন বাহির হইতে থাকে। (পৃ. ৩৫)

শামসুজ্জামান খান বিবি কুলসুমের ডায়েরির সংগৃহীত যে-অংশ প্রকাশ করেছেন তার প্রায় সর্বত্রজুড়ে রয়েছে একজন নারীর ব্যক্তিত্বচেতনার বিকাশ, প্রেমাঙ্ক্ষায় স্বাধীন নারীসত্তার উন্মোচন এবং মীর মশাররেফের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস। পারিবারিক পরিমণ্ডল, বংশীয় ঐতিহ্য এবং শিক্ষাগত কারণে বিবি কুলসুমের পক্ষে একজন বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২) হয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না সত্য, কিন্তু উপর্যুক্ত প্রথম উদ্ধৃতির ঘোষণা থেকে নারী-জাগরণের সূপ্ত বীজ অঙ্কের সম্ভাবনাকে কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া ডায়েরিতে বিবি কুলসুমের ‘মীর সাহেব’ সম্বোধন তৎকালীন মুসলিম নারীর আধুনিকমনস্ক হয়ে ওঠার লক্ষণাক্রান্ত।

দ্বিতীয় উদ্ধৃতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বিষাদ-সিন্ধুর জাহেদা চরিত্রটিকে। ইমাম হাসানের তৃতীয় বিয়ের কারণে স্বামীকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অধিকার-সচেতন নারীত্বের চেতনাজারিত জাহেদা। মীর মশাররফ আজীজননাহার (প্রথম স্ত্রী)-এর সঙ্গে দাম্পত্য জীবনযাপনকালেই ১২৮১ সালের পৌষ মাসে কুলসুমকে বিয়ে করেন। মীর-কুলসুমের দাম্পত্য জীবন যে বিশ্বাস-সন্দেহ ও যন্ত্রণাকাতর ছিল ‘বিবি কুলসুমের অপ্রকাশিত রোজনামচা’ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাহেদা চরিত্র-নির্মাণে মশাররফ হোসেনের দাম্পত্য জীবনের কোনো প্রভাব ছিল কি? এ-প্রশ্ন একেবারে অবান্তর নয়। এ-সমস্ত কারণেও ডায়েরিটি গুরুত্বপূর্ণ। ‘বিবি কুলসুমের অপ্রকাশিত রোজনামচা’য় বাংলা মাসের নাম ও তারিখ থাকলেও সালের উল্লেখ নেই। তবে ‘মীর শেখ দফায় পদ্মদীর ওয়াকফ এস্টেটের কাজে যোগ দেবার সময়ে তাঁরা যখন কলকাতায় অবস্থান করছিলেন এবং মীর কলকাতা-পদ্মদী করছেন তখনই এ-রোজনামচা লেখা হয়েছে’ বলে লেখক ‘প্রসঙ্গকথা’য় (পৃ. ২৬) অভিমত প্রকাশ করেছেন। বিবি কুলসুমের ডায়েরি-রচনার এই কালিক বিবেচনা তাৎপর্যপূর্ণ।

ছয়

বর্তমান গ্রন্থের তৃতীয় ভাগে সংকলিত হয়েছে সাতটি ‘মূল্যায়ন’ রচনা। লেখাগুলো যথাক্রমে— ১. মীর মশাররফ হোসেন ও বাংলাদেশ; ২. মশাররফ হোসেনের আমার জীবনী ৩. ‘মীর মশাররেফের গদ্য রচনা’ প্রসঙ্গে; ৪. বিষাদ-সিন্ধু; ৫. স্ত্রী ও পত্রিকার একই নাম— আজীজনাহার; ৬. হিতকারী পত্রিকার আলোকে মীরের চিন্তাধারা ও ৭. মীর মশাররফ হোসেন: জীবনকথা— কিছু নতুন তথ্য। উল্লিখিত রচনাসমূহের মধ্যে দিয়ে শামসুজ্জামান খানের পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতা এবং মনীষার পরিচয় পাওয়া যায়। বিশেষত ‘মীর মশাররফ হোসেন ও বাংলাদেশ’ রচনাটির বক্তব্য মীর-মানস সম্পর্কে গবেষকদের নতুন করে ভাবনার অনুপ্রেরণা দান করবে। মীর-মানস সম্পর্কে লেখকের অভিমত প্রণিধানযোগ্য। ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের নিজস্ব মানবিক ও অপ্রচারী চিন্তার কোন ধারাটি শোষণ করে মীর তাঁর নিজস্ব মনন-জগৎটি তৈরি করে নিলেন? দেশী না বিদেশী? এই প্রশ্ন-পরিপ্রেক্ষিতে লেখকের অভিমত, মীর মশাররফ হোসেন ‘গ্রামীণ বাংলাদেশের মানবিক সচেতনতার অমূল্য সম্পদকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে নির্মাণ করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন তাঁর মানস-ভুবনের ভিত্তি’। তাই লেখক বসন্তকুমারী, জমিদার-দর্পণ, বিষাদ-সিন্ধু থেকে টালাঅভিনয় ও হিতকরীর নানা লেখায় যে-বাঙালি ঐতিহ্যের সামগ্রিক উত্তরাধিকার লক্ষ্য করেছেন, মীর শুধু তার ‘পথিকৃৎ নন, একালেও প্রাসঙ্গিক এবং সমকালীন’।

অন্য প্রবন্ধগুলো থেকেও মীর মশাররফ হোসেন সম্পর্কে শামসুজ্জামান খানের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যায়নের মৌলিক ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। বিশেষত মশাররফ হোসেনের ‘আমার জীবনী’ প্রবন্ধে আত্মচরিত রচনার নানাবিধ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নান্দনিক সাহিত্যকর্ম হয়ে ওঠার বৈশিষ্ট্যসমূহ চিহ্নিতকরণে লেখক শ্রমনিষ্ঠ।

সাত

শামসুজ্জামান খানের আলোচ্চ গ্রন্থের ভাষা সহজ, সাবলীল। যদিও কখনো কখনো দীর্ঘ বাক্যবিন্যাস এবং একই বাক্যে কোনো কোনো শব্দের দ্বিতীয়বার প্রয়োগ গদ্যের গতিকে অলসমন্থর করে তুলেছে। এছাড়া সর্বত্র তাঁর ভাষা অনাক্রমণীয়, গীতল এবং সুখপাঠ্য।

আলোচ্য গ্রন্থে মীর মশাররফ ও তাঁর পত্নী বিবি কুলসুমের প্রতিকৃতি, কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়ায় তাঁর জন্মভিটা, স্ত্রী কুলসুম ও মীরের সমাধির আলোকচিত্র, আমার জীবনের অপ্রকাশিত অংশ, কুলসুমের ডায়েরি, হিতকারী পত্রিকার প্রতিচিত্র এবং অন্যান্য চিত্র-সংনিবেশের ফলে বইটির গ্রহণযোগ্যতা ও আবেদন বৃদ্ধি পেয়েছে। নিঃসন্দেহে শামসুজ্জামান খানের এই আবিষ্কার ও মূল্যায়ন মশাররফ-গবেষকদের জন্য প্রদান করবে নতুন অনুভাবনা ও অনুপ্রেরণা।