ফিরে দেখা : একটি জীবনের কিছু চিত্র
ছবি বসু
প্রকাশক : স্ত্রী
কলকাতা, ২০০৪
দাম : ১১০ টাকা
ছবি বসু আত্মকথা বলতে ব্রতী হয়েছেন নিজের কথা বিশেষ না বলে। তিনি মুক্তচিন্তার মানুষ, সমাজবদলের বামপন্থি-আয়োজনে একদা নিয়েছিলেন সক্রিয় ভূমিকা, জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে যখন পেছন ফিরে তাকান তখন নিজের কথা নয়, অতিক্রান্ত সময়ের প্রধান সড়কের বর্ণনা নয়, দাখিল করতে চেয়েছেন জীবনপথের অলিগলির বিবরণ। ছবি বসু কথাশিল্পীও বটে। খুব বেশি নয় তাঁর রচনার পরিমাণ, তবে ছোট গল্পকার হিসেবে নিজ-ভূমিকা তিনি সবসময়ই বহাল রেখেছেন, ফলে তাঁর স্মৃতিকথার বয়ান মাঝে-মধ্যে গল্পের চরিত্র নিয়ে হাজির হয়। কথাশিল্পীর দৃষ্টি নিয়ে তিনি তাকিয়েছেন জীবনের দিকে, সেই সঙ্গে নিজের প্রতি আশ্চর্য নিস্পৃহতা এবং চারপাশের সকল কিছুকে গভীর ভালোবাসা দিয়ে বরণের চেষ্টা। ফলে তাঁর ‘স্মৃতিভাষ্য’ হয়ে উঠেছে এক আশ্চর্য মানবিক দলিল এবং বিপুল আত্মদানে মণ্ডিত বিপুলতর সংখ্যক মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা-সাধনায় সমাজে বামপন্থার ‘প্রভাবশালী’ হয়ে-ওঠার সময়কে যেমন আমরা পাই তাঁর জীবনচিত্রে, তেমনি পাই চরম হঠকারী এক পর্বে দলের ভেতরের অন্যতম চিত্র, নেতৃত্বের বাইরের বলয়ের তালিম-মানা কর্মী-বাহিনী তথা নেতৃত্বের হেজিমনিতে পিষ্ট কমিউনিস্ট দলের অভ্যন্তরের নিম্নবর্গীয়দের দুঃখময় সাধনার পরিচয়। এদিক দিয়ে বাংলার বামপন্থি-আন্দোলনের স্মৃতিভাষাধারায় ছবি বসু সম্পূর্ণ আলাদা এক মাত্রা বয়ে এনেছেন। এটা এতটাই আলাদা যে, মাঠ-পর্যায়ের বাস্তবতা ও পীড়ন থেকে মুক্ত নেতৃত্ব বলয়ের কারো পক্ষে তার পুরো তাৎপর্য বুঝে-ওঠা মুশকিল। যেমন ঘটেছে খ্যাতমান বামপন্থি বুদ্ধিজীবী ও বাম-আন্দোলনের প্রবীণ নীলচক্ষুবালক অশোক মিত্রের ক্ষেত্রে। ছবি বসুর এই ব্যতিক্রমী স্মৃতিকথনের শিরোধার্য হিসেবে কোনো মুখবন্ধের প্রয়োজন বোধকরি ছিল না, আর থাকলেও সেখানে দরকার ছিল লেখিকার জীবনের কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য হাজির করা, যা বিনয়কুণ্ঠ স্বভাব থেকে ছবি বসু বিশদ করে কখনো বলেননি। কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্বের অহমিকা থেকে অশোক মিত্র লিখতে পারেন বিশ শতকের মধ্যবর্তী দশকগুলোতে বাঙালি উজ্জীবন ঘটেছিল কমিউনিস্ট পার্টির ‘নায়কত্ব ও প্রেরণায়’, কিন্তু ছবি বসুর স্মৃতিচিত্রণে পার্টির নায়কত্বের কোনো প্রমাণ আমরা পাই না। বরং উজ্জীবিত বাঙালি সমাজ আপন অন্তর্তাগিদ থেকে কী বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিকে বরণ করেছিল, কত শত অকীর্তিত অস্বীকৃত আত্মদানের মাধ্যমে পার্টির মহিমাকে উজ্জ্বল্য যুগিয়েছিল, তার অনন্যপরিচয় পাই ছবি বসুর রচনায়। নায়করা অবশ্য ছিলেন তরুণী ছবি বসুর চারপাশে, বাড়িতে দাদার কাছে আসতেন জ্যোতি বসু, ভূপেশ গুপ্ত, স্নেহাশু আচার্য, হীরেন মুখার্জি। কিন্তু পার্টির আহ্বান তাঁর কাছে পৌঁছেছিল ভিন্নতর প্রেরণা থেকে, যে-প্রেরণাকে অশোক মিত্র সঠিকভাবেই বলেছেন ‘বিবেকের দায়’ এবং এই দায়বদ্ধতার সম্মানটুকু তিনি দিতে চেয়েছেন বিত্তশীল গুটিকয় মহিলাকে, যাঁরা শ্রেণিভাগের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু যাঁরা শোষিত শ্রেণির অন্তর্গত তাঁরাও তো ‘বিবেকের দায়’ থেকেই মুক্তি-আন্দোলনে শামিল হন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চয় এটা ঘটে না। নেতৃত্বের কাছে কর্মী, বিশেষভাবে যে-কর্মী হয়ে পড়ে নিষ্ক্রিয়, তার মূল্যায়নে উচ্চবাচ্য বোধকরি অনভীপ্রেত। তাই অশোক মিত্র মহাশয়ের কাছে ছবি বসু স্মৃতিকথাটি যেন প্রতিভাত হয়, ‘মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত সমাজভুক্ত মহিলাকুল’-এর একজন হিসেবে, শ্রেণি সমস্যার নানা দায়বদ্ধতা সত্ত্বেও, ‘শ্রেণিভাগের মহড়ায়’ যিনি খেলেছিলেন বেশ। বাম-আন্দোলনের স্ফীতি অর্জনের পেছনে বহু মানুষের বিবেকের দায় যুক্ত হয়েছিল, যে-দায় মেটানোর তাগিদ পার্টি নেতৃত্বের এজেন্ডায় কখনো ছিল বলে মনে হয় না এবং বামপন্থার অনেক দুর্ভাগ্য সেখান থেকেই উৎসারিত। বাঙালি উজ্জীবনে বামপন্থার ভূমিকার পার্টিসংগীত নেতারা গাইবেন, তবে ছবি বসু তাত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করার কোনো চেষ্টা নেননি, তিনি বলতে চেয়েছেন মানুষের কথা, যে-অসংখ্য মানুষ মিশে থাকে সমাজের যে-কোনো মহৎ জাগরণের পরতে পরতে; কিন্তু সুখপাঠ্য-ইতিহাসে তাঁদের কেউ কখনো খুঁজে পাবেন না।
যেমন ছবি বসু লিখেছেন উত্তাল চল্লিশের দশকে তাঁর রাজনীতি সম্পৃক্ত হওয়ার কথা। তাঁর নিজের ভাষায় : ‘যখন পার্টিতে আসি, সম্পূর্ণ নিজের বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে পার্টির সদস্যপদ পাই। দাদা বা স্বামীর আশ্রয়ে সে-বিশ্বাস আমার সেদিন পুষ্ট হয়নি। আমার স্বাধীন মতামত একেবারেই ব্যক্তিগত প্রভাবহীন।’ একান্ত ঋজু এই বক্তব্য তাঁর বিনয়ী স্বভাবের বিপরীত মেরুর মনে হতে পারে, আসলে তো তিনি আপন জীবনদৃষ্টিভঙ্গি-প্রশ্নে দৃঢ়চেতা, কিন্তু অপর জীবনের সঙ্গে মিলবার ও মেলাবার ক্ষেত্রে একান্ত নমনীয়। সাম্যের আদর্শের সংগঠনে যোগ দেওয়ার প্রেরণা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন দুটি নাম, দুজনই আটপৌরে মানুষ, অখ্যাত, অজ্ঞাতজন। এঁদের একজন বিমল চৌধুরী। ১৯৪৬ সালে সারা ভারত ডাক-তার ধর্মঘটের মহাস মিছিলে তাঁকে ছবি বসু দেখেছেন সম্মুখভাগে, ‘লাল ঝান্ডা হাতে নিয়ে দৃপ্ত পায়ে চলেছেন অতি সাধারণ একটি মানুষ, বিমল চৌধুরী, যিনি আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। পার্টির প্রতি সমর্পিত প্রমাণ এই মানুষটিকে দিনে দিনে চিনেছি নতুন আলোকে। খুব কম দিনই পারিবারিক সূত্রে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। … তিনি পরবর্তীকালে ডাক-তার কর্মচারী বিভাগ থেকে এই ধর্মঘট-হেতু ছাঁটাই হয়েছিলেন। চেহারায় কিছু অসাধারণত্বের ছাপ নেই। বিশাল আয়তন, লম্বাচওড়া হাফশার্ট আর ধুতি পরনে।’ অপরজন সুধা রায়, যাঁকে দেখে লেখক বুঝেছিলেন ‘একটাই ত্যাগ ও নিষ্ঠার দীপ্তি তাঁর মুখে ছড়িয়ে আছে।’ তিনি পড়াতেন পাড়ার স্কুলে, কাজ করতেন বলশেভিক পার্টিতে। তাঁর সঙ্গে সখ্য অবশ্য পরে আর বিকশিত হয়নি।
আলোচনার অবতরণিকা অনেক দীর্ঘ হয়ে গেল ছবি বসুর কথকতার রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতটুকু বুঝে নেওয়ার স্বার্থে। তবে এরও বিশেষ প্রয়োজন ছিল না, কেননা ব্যক্তিমানুষের জীবনের এক হার্দিক আখ্যান আমাদের সবার জন্য হাজির করেছেন ছবি বসু, যেখানে ইতিহাসের এক সংবেদী পরিচয় আমরা পাই এবং বুঝতে পারি মানবিক জীবনের বিশালতা।
বাল্য, কৈশোর ও যৌবনের সূচনার দিনগুলোর আনুপূর্বিক বর্ণনা দিয়েছেন লেখিকা, পরের চিত্রসমূহ ধারাবাহিক নয়, বরং আভাসে ইঙ্গিতে বলেছেন সে-কথা। যে-চাড়সুরে বাঁধা ছিল প্রথম যৌবনের বিপ্লবকামনা, সেই উচ্চগ্রামে বাঁধা তার একসময় ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ছিন্ন ঘণ্টাটির মধ্যে যে নাটকীয়তা রয়েছে ঠিক তেমনভাবে নয়, বরং কমিউনিস্ট পার্টির প্রেরণার ধারা জল শুকিয়ে আসায় নায়কতার প্রতি অবিচল থাকায় বুঝি চিড় ধরেছিল। মানবিক সাধনা তাঁর অব্যাহত রইলো, তবে এর ক্ষেত্র সমাজ-আন্দোলনের নিত্যকার ঘটনাধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত না থেকে চলে এলো অনেকটা আড়ালে, নিভৃতির অবকাশে। তাই বলার কথাগুলো এখানে আর ঘটনাকে অবলম্বন করেনি, সময়ের বিচারে ধারাবাহিকতা থাকেনি, হয়ে উঠেছে টুকরো টুকরো, সেই টুকরোও অনেক ক্ষেত্রে একেবারেই ছোটগল্প এবং অসাধারণ সেইসব গল্প, যেমন দেখতে পাই একাদশ অধ্যায়ে, রফিক আর মকবুলকে নিয়ে তাঁর ধানাকুল গ্রামে যাওয়ার কাহিনীতে।
ছবি বসুর পিতা ছিলেন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, চাকরির সুবাদে ঘুরেছেন বাংলার বিভিন্ন জনপদে, খেতাব পেয়েছেন রায়বাহাদুর। লেখিকার বাল্যস্মৃতিতে অথচ বাংলার অনেক শহরের জীবনের টুকরো ছবি পরিস্ফুট হয়। ১৯২৬-২৭ সালের ভোলার চিত্র দেখতে পাই আমরা এক কিশোরীর চোখে, একেবারেই গৃহকোণের ছবি, কিন্তু সেখানেও হানা দেয় সমাজের অভিঘাত, মাঘদুপুরে গাঁটরি কাপড় নামিয়ে হাঁক দেয় খদ্দরদাদা, ‘কৈ গো, মা জননী কোথায়’। হাওয়ার গান শুনে কিংবা মায়ের মুখে ছড়াগান শুনে বালিকার জগৎ হয়ে ওঠে স্বপ্নময়, ‘বৈশাখ মাসে পুষেছিলাম ছোট টিয়ার ছানা/ জ্যৈষ্ঠ মাসে ফুটলো তাহার ছোট দুটো ডানা।’ এর মধ্যে ডামাফোলের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে অন্দরে, মা আকুল হয়ে মাথা কুটছেন, বাবা গেছেন দাঙ্গা থামাতে, উভয় পক্ষকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঠান্ডা করছেন, মিউজিক ক্যাফের মঞ্চ, মসজিদের সামনে বাদ্য বাজানো চলবে না।
ভোলার পর নওগাঁ, রানাঘাট, দিনাজপুর, মুন্সিগঞ্জ ও জলপাইগুড়ি। গৃহকর্তার বদলির চাকরির সুবাদে ঘুরছে পরিবারটিও, আর বালিকা মনে গেঁথে তুলছে কতো না ছবি। নওগাঁতে গানে হাতেখড়ি হয় চিতু সেনের কল্যাণে। তুলির সামান্য আঁচড়ে চিতু সেনের অবিস্মরণীয় ছবি তিনি ফুটিয়ে তোলেন, লেখেন, ‘চিতু সেনের কথা একদিন যাঁরা সে সময় নওগাঁতে থেকেছেন, কেউ ভুলতে পারবেন না। আমাদের কাছে নওগাঁ মানে চিতুদা, চিতুদা মানে নওগাঁ। রাজশাহী জেলার একটি মহকুমা নওগাঁ। রবীন্দ্রনাথ তখন গানের পর গান রচনা করছেন। কিছু কিছু গীতিনাট্যও অভিনীত হচ্ছে। কিন্তু মফস্বলের মানুষের কাছে রবীন্দ্রসংগীত তখনো তেমন সমাদর পায়নি। সেই সুদূর মফস্বল শহরে, সান্তাহার জংশন স্টেশনের অদূরে এই ছোট্ট নতুন গড়া শহরে বসে চিতু সেন যেন একবংশের সাধনায় স্বরলিপি সংগ্রহ করে অজস্র রবীন্দ্রসংগীত নিজের গলায় তুলেছেন, বহু ছেলেমেয়েকে রবীন্দ্রসংগীত শিখিয়েছেন। চিতুদাকে দেখেছি কতো ভালোবেসে। এখনো তাঁর টানা টানা ভাবুক চোখ, খদ্দর পরা চেহারাটি মনের এক জায়গায় বাঁধা পড়ে আছে।’
আরেক দিনের কথা তিনি লিখেছেন, ‘জোৎস্না রাত, আমাদের ফুলবাগান পেরিয়ে লিচু গাছের পাতার ঝালর ডিঙিয়ে চাঁদের আলোয় রাত যেন দিন হয়ে যেত। নদীর জলে কখনও-সখনও দুটি-একটি ডিঙি বেয়ে চলেছে। হঠাৎ সেখান থেকে গান ভেসে আসত। তিনটি গলা এক হয়ে গাইছে— ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে…।’ কে গাইছে? বাবা বললেন, চিতু, রবি আর শান্তি। চিতুদা আর রবি কাকা, শান্তি কাকা। ওরা সুভাষদার (সুভাষ মুখোপাধ্যায়) কাকা।’ লেখিকা আরো জানান, ‘চিতু সেন তরুণ বয়সেই যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।’
এমনি টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতাই তো মানুষকে মানবিক করে তোলে, সংস্কৃতিসাধনার শক্তি অজান্তে ছুঁয়ে যায় কতো অয়ুত মানুষের অন্তর, কে কীভাবে তার হদিস করতে পারবে! দুঃখ প্রকাশের যুগে কজনই-বা জানবে চিতু সেনের কথা, চিতুর খবর। কিন্তু আমাদের জন্য আরো বেদনাবহ পূর্ববঙ্গের প্রতিটি ছোট শহরের যে-সাংস্কৃতিক আবহ একদা গড়ে উঠেছিল বহু মানুষের একাগ্র সাধনায়, সেটা তো মুহূর্তে টলে উঠলো দেশভাগের মতো হিংসাত্মক ঘটনায়। সমাজের ধারাবাহিকতা ছিন্ন করে দিল রাজনীতির অভিমুখকারিতা। আজকের নওগাঁ অতীতকে নিয়ে বিকশিত হতে পারেনি, অতীতের শেকড় ধরে টান দিয়েছিল দেশভাগ এবং অসংখ্য মানুষ কেবল ছিন্নমূল হলো না, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাও হলো ছিন্নমূল। আজকের নওগাঁয় চিতু সেন ও আরো অগণিতজনের সংস্কৃতিসাধনার জোর কীভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে, সেটা এক জিজ্ঞাসা বটে।
মফস্বলের স্কুলজীবন শেষ করে কলকাতায় পড়তে আসেন ছবি বসু, প্রথমে ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন ও পরে আশুতোষ কলেজে। সেখানকার স্মৃতিমুখর বিভিন্ন ছবি, কতো মানুষের কতো কথা! বলেছেন সহপাঠী সুকুমারী দত্তের কথা, সেন্ট মার্গারেট থেকে আসা মেয়ে, দেখে প্রথমে ভেবেছিলেন বুঝি কোনো পণ্ডিত ঘরের মেয়ে, বুদ্ধাদীপ্ত উজ্জ্বল চেহারা, অথচ বড়ই সাদাসিধে চালচলন। সংস্কৃত পণ্ডিত মহাশয়ের সঙ্গে একনাগাড়ে সংস্কৃতে কথাবার্তা বলে, শুনে মুগ্ধ হই।’ এই সুকুমারীই পরবর্তীকালের খ্যাতমান প্রাচীন ভারত-বিশেষজ্ঞ সুকুমারী ভট্টাচার্য। আরেক সহপাঠী রেবা ঘোষ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ও পরত খদ্দরের শাড়ি। আর আমি তো খদ্দর দেখলেই গলে যাই।’ এমনি কৌতুকবোধ অবশ্য আমাদের আরো অনেক বড় সামাজিক বোধের পরিচয় জোগায়। তেমনি আরেক বর্ণনা পাই শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রদর্শনের ঘটনায়। লিখেছেন, ‘শান্তিনিকেতনে আসবার আগে শুনেছিলাম ওখানে মেয়েদের খুবই সাধারণ সাজসজ্জা। কোনো বাহুল্য বা চমক নেই, তাই মায়ের কস্তাপেড়ে অতি সাধারণ শাড়ি আমাদের পরনে।’ ‘উদীচী বাড়ির সামনে হেলান দেওয়া চেয়ারে বসে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, মৃদুকণ্ঠে কথা বলছিলেন ছাত্রী দলের নেতা কলেজের শিক্ষিকা সুরমা দাশগুপ্তের সঙ্গে। প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, ‘নবীনাদের প্রবীণা সাজা আমি পছন্দ করিনে।’
কতো অজস্র ঘটনায় ঠাসা এক জীবনের খণ্ড খণ্ড ছবি! এর মধ্যে চকিতে ভেসে ওঠে আমাদের দুই আপনজন শহীদুল্লা কায়সার ও নাজমুদ্দীন হাশেমের প্রসঙ্গ। একদা প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়নকারী এই দুই অনন্য ব্যক্তিত্ব আজ প্রয়াত। শহীদুল্লা কায়সার মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়েছেন ঘাতক মৌলবাদী গোষ্ঠীর হাতে। সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেম প্রয়াত হয়েছেন ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে। আমার কেবলই মনে হয়, ছবি বসুর এই আত্মজীবনী পাঠ করার সুযোগ পেলে তিনি কতই না উদ্দীপ্ত বোধ করতেন। শহীদ ও হাশেম ছিলেন ছবি বসুর কনিষ্ঠ ভ্রাতা খ্যাতনামা সাহিত্যিক অসিত রায়ের কলেজ-জীবনের বন্ধু। ছবি বসু লিখেছেন, ‘অসীম আমার ছোটভাই। সাহিত্য, কবিতা ওর প্রাণ, সেই সঙ্গে নতুন যুগধারায় অর্থাৎ কমিউনিস্ট ভাবধারায় তার আদর্শ সিক্ত। এই সঙ্গে প্রেসিডেন্সি কলেজের দুই ছাত্র নাজমুদ্দীন হাশেম আর শহীদুল্লা কায়সার। ওদের সঙ্গে আমি। এই চারজন মিলে তখন স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধের হিটলার নয় রেড গার্ড (আসলে হবে রেড আর্মি, লাল ফৌজ, রেড গার্ড তো চীনের ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের’ অপগণ্ড কিশোরবাহিনী- লেখক), কে কত দূর এগোচ্ছে আর মার খাচ্ছে, এই নিয়ে তুমুল আলোচনা।’ বোন এবং ছোটভাই ও তার কলেজ-পড়ুয়া বন্ধুদের নিয়ে সাম্যের আদর্শে উদ্বেলিত এই যে বৃত্ত, তারুণ্যের উচ্ছলতা ও ত্যাগের আদর্শে প্রাণিত হয়ে বিশ্বজয়ের সাধনায় মেতে-ওঠা,
সেই আবহ খানখান হয়ে পড়েছিল উপমহাদেশের রাজনীতির সংঘাত-দ্বন্দ্ব-হানাহানিতে। বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশের ধারা মুসলিম তরুণদের একাংশকে বাংলার সর্বাঙ্গণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেমন বয়ে নিয়ে এসেছিল, তেমনি তাঁদের পৌঁছে দিয়েছিল, পিকাসো-কথিত, সাম্যের আদর্শের স্বর্ণধারার কোলে। প্রেসিডেন্সি কলেজে পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ কিংবা মফস্বলী পটভূমি থেকে আগত মুসলিম ছাত্রদের এমনি সম্পৃক্তি চল্লিশের দশকে বিশেষ প্রসারতা অর্জন করেছিল, কিন্তু সেই ধারা বিকাশের স্বাভাবিক পথ বেয়ে এগোতে পারেনি এবং পঞ্চাশের দশকে তা প্রায় বিলুপ্তির দশা প্রাপ্ত হয়। এর ফলে পূর্ববঙ্গের তথা বাংলার জীবনসংস্কৃতির সহজিয়া বিকাশ যেভাবে রুদ্ধ ও বিকৃত হয়, সে-প্রশ্ন বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। তবে কী ঘটতে পারত সেটা নয়, কী ঘটেছিল তার চিত্র হিসেবে আমরা পাই লেখিকার মাধুর্যময় বর্ণনা, দীর্ঘ হলেও যে-উদ্ধৃতিদানের লোভ সংবরণ দায়। ছবি বসু লিখেছেন :
‘বেশ মনে পড়ে আমাদের বাড়িতে সূর্যাস্তের শেষ আলো পড়েছে ছাতের এক কোণে, সেখানে আমাদের কতদিন কত রঙিন কল্পনা জল্পনা। স্টালিনগ্রাদে রাশিয়ার বিজয় শুনে আমরা একথালা মুড়ি আর চানাচুর ফরমাস করে ফেললাম। হঠাৎ শহীদুল্লা বলে, ‘আপা, তুই একটা যা তা। সেদিন ওয়েলিংটন স্কোয়ারে লাহিড়ী যা একখানা বক্তৃতা দিল। তুই তো যাননি। যা তা নয়ত কী। কী যুক্তি, কী উত্তাপ! একেবারে জ্বালা ধরিয়ে দেয়।’
এই হচ্ছে শহীদুল্লা কায়সার। ছোট্টখাট মানুষটি। টিওটিতে রোগা, মুখে যেন তুবড়ি ফুটছে। বলে, ‘বাবা তো হজ করতে যাচ্ছেন। ভাবছেন ছেলেরাও তাঁরই মতো ধর্মে মতি হবে।’ বলতে বলতে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে এক পাক ঘুরে নিল।
দেশবিভাগের পর ওদের আর কোনো খবর রাখিনি। আমার জীবনধারাও কত পরিবর্তনের মুখে। ভূপেন বোস অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে বহুদিন বাদে পাকিস্তান থেকে আঁটা খামে পরপর শহীদদের দুটি চিঠি পেলাম।
রাজশাহী জেলের সেন্সরবন্দি চিঠি। কালো ঢ্যাবডা আঁচড়ে চিঠি প্রায় পড়াই যায় না। এইটুকু কোনোমতে পড়েছি, ‘আপা, আমার জন্য ভাবিসনে। বেঁচে আছি। তোর ভাই অসীম (খোকন) কি এখন প্রাইমারী টিচার্স ফ্রন্টে রয়েছে? আহা রে, তোর বাবা! কোথায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ছেলে বিলেতে গিয়ে আই. সি. এস. হবে, তা নয় কমিউনিস্ট পার্টি? তুই নিশ্চয়ই আমাকে অনেক বই, ম্যাগাজিন, পত্রপত্রিকা পাঠাবি। কতটা পাব জানিনে। তবে জানিস আমাদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখবার চাবিকাঠি তোদের হাতে। তোরাই তো এইভাবে আমাদের বাঁচিয়ে রাখবি। কী রে হাসছিস? জানি তোর হাসিতে যে কত কান্না লুকিয়ে থাকে। কবে আবার আমাদের দেখা হবে, আপা? ভাল থাকিস।’ কিছু কিছু এখানকার বইপত্র শহীদুল্লাকে পাঠাই, জানিনে পৌঁছল কিনা। কিন্তু সত্যি পেয়েছে। কী আনন্দ হল, কী বলব! খুশীতে গান গেয়ে উঠি। তারপর আবার দীর্ঘ নীরবতা। আবার চিঠি আসে, ‘কত কিছুই যে জানতে চাই। তুইও তো জানতে চাস। এমন একটা ধোঁয়াড়ে আছি যেখানে আকাশ দেখা যায় না। এক মুঠো আলোও আসে না।’ সব কিছু তারপর কালির আঁচড়ে ঢাকা।‘
এই যে সবকিছু ঢেকে গেল কালির আঁচড়ে, তা উভয় বাংলার হিন্দু-মুসলিম মধ্যবিত্তের মিলিত জীবনসাধনার সকল সম্ভাবনা লণ্ডভণ্ড করে দিল। নববিকশিত বাংলাদেশের মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজে এখন হিন্দু বন্ধুবৃত্তের ব্যাপক সংকোচন ঘটেছে। অপরদিকে প্রেসিডেন্সির ঝকঝকে তরুণ-তরুণীরা হয়তো অনেক কিছু পাচ্ছেন, কিন্তু ঘরোয়া আড্ডায় এক থালা থেকে মুড়ি চানাচুর ভাগ করে খাওয়ার মতো কোনো মুসলমান বন্ধুর দেখা পাচ্ছেন না। ইতিহাসের ছুরি এক জাতিগোষ্ঠীর দুই সম্প্রদায়কে এমনিভাবে পৃথক করে ফেলল, এতটাই পৃথক যে, কেউ কারো নাগাল আর পাচ্ছেন না। পার্টির কাজের সঙ্গে ছবি বসুর সম্পৃক্তি প্রথমে ঘটে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সংবাদে। সেই সময়ে বহুখ্যাত ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটেও যাতায়াত শুরু করেছেন, সেখানকার রমরমা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন, দায়িত্ব পান ‘সোমেন চন্দ পাঠাগার’ দেখাশোনার। ছবি বসু জানিয়েছেন, সমসাময়িক প্রগতিবাদী অনেক বই ও সাময়িকীর সাথে সাথে এখানেই তিনি প্রথম পড়েন টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট। কমিউনিস্ট নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই স্বর্ণযুগে যে উদার ও সার্বজনীন আবহ প্রভাবশালী ছিল তা বেশিদিন কার্যকর থাকেনি। আই পি টি এ কিংবা ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ’-এর সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের নায়কত্ব ও কৃতিত্ব অবশ্য কমিউনিস্ট পার্টি সর্বদাই দাবি করে এসেছে কিন্তু সেই উদার সাংস্কৃতিক আবহ পরবর্তী সময়ে তাদের দ্বারা বিশেষ গ্রাহ্য হয়নি। টি এল এম আর কখনো কোনো কমিউনিস্ট পরিচালিত পাঠাগারে স্থান পাওয়ার কথা ভাবা যায়নি, এখন তো কমরেডরা এর সঙ্গে মোটেই পরিচিত নন। গঠনকাহামো-বিচারের দলের মধ্যে বিভিন্ন মতের ও চিন্তার সহাবস্থান ছিল অসম্ভব এক ব্যাপার। আর দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে বি টি রণদিভের নেতৃত্বের বিভিন্ন হঠকারী সিদ্ধান্ত তো বহু কমরেডের জীবন তছনছ করে দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকা দুরূহ করে তুলল। নানান কর্মব্যস্ততার মধ্যে বি টি পরীক্ষা দিলেন ছবি বসু ১৯৪৮ সালে। ‘বাংলার নারী আন্দোলন’-বিষয়ে তাঁর পথিকৃৎ বইটি ও তখন বের হয়েছে। পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে বিলেত থেকে এডুকেশনে এম.এ করবার অফার পেয়েছিলেন। খুলে বলেননি, কিন্তু পার্টির দায়িত্বের কথা ভেবে সেই সুযোগ গ্রহণের কথা মোটেই ভাবেননি। সেই বছরের ডিসেম্বরে তাঁর বিয়ে হলো কলকাতার বনেদি পরিবারের মার্ক্সবাদী সন্তান সুনীলকুমার বসুর সঙ্গে, পার্টির প্রকাশনা সংস্থা ন্যাশনাল বুক এজেন্সির সঙ্গে যিনি যুক্ত ছিলেন। বিয়ের চার মাসের মধ্যে গ্রেপ্তার হলেন স্বামী এবং প্রেসিডেন্সি জেল, দমদম জেল হয়ে নীত হলেন ভূটান সীমান্তের বক্সা জেলে। সদ্য-বিবাহিত স্বামী জেলে, পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, পার্টি-নেতৃত্ব দেখছেন রাতারাতি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধানের অলীক স্বপ্ন, জেলা কমিটির সম্পাদক ঘোষণা করেছেন — কারাকক্ষ থেকে গোটা দক্ষিণ বাংলা এখন মুক্তাঞ্চল, সামনে সমাজবাদী বিপ্লব, কমরেডরা শ্রেণিসংগ্রামে ত্বরান্বিত করুন। আর শ্রেণিসংগ্রামের পদাতিক বাহিনীর একজন ছবি বসু দাঁত কামড়ে নেমেছেন সেই চেষ্টায়, থাকছেন পালিয়ে পালিয়ে, ডালহৌসি স্কোয়ার বোম কেসের আসামি হিসেবে কঠিন রাজপ্রবাসও করে এসেছেন। বামপন্থার তীব্রতা তখন শিল্প-সংস্কৃতির জগতেও আঘাত হেনেছে, রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করে নতুন প্রলেতারীয় সাহিত্যের বন্দনায় মুখরিত হচ্ছেন নেতৃত্ব, প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না কেউ। সবকিছুই বলেছেন ছবি বসু, উচ্ছ্বসিত অতিশয় ছাড়াই, লিখেছেন, ‘সময়টা ১৯৪৯-১৯৫০ সাল — রণদিভে পিরিয়ড নামে পরিচিত সময়, বাম সঙ্কীর্ণতার যুগ।’ ঘটনাধারার বিচ্ছিন্ন বর্ণনার মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন বাস্তব কিছু ছবি, আর সমাজবিশ্লেষকরা এর মধ্যে খুঁজে পাবেন আরো অনেক বড় সত্য। এই যে হঠকারিতাকে চিহ্নিত করা হলো ‘রণদিভে পিরিয়ড’ হিসেবে, তাতে সমষ্টিগত দায়কে চাপানো হয় ব্যক্তির উগ্রতার ওপর। অপরদিকে প্রাগ থেকে প্রকাশিত সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক মুখপত্র For a Lasting Peace for People’s Democracy-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধের কল্যাণে ভারতের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি প্রত্যাহার করে নেয় উগ্রতার নীতি, সেটাও ভারতীয় কমিউনিস্টদের জন্যে কোনো কৃতিত্বের পরিচয় বহন করে না। ছবি বসু অবশ্য এইসব রাজনৈতিক বিবেচনায় অগ্রসর হননি, তিনি বলেছেন মাঠপর্যায়ের সংকটের কথা, লিখেছেন, ‘রণদিভে পিরিয়ডে এই হঠকারী নীতি আমরাও মনেপ্রাণে সমর্থন করতাম। না করে উপায় কি? আমরা তো নগণ্য ক্যাডার। নিজস্ব চিন্তাভাবনা তো থাকার কথা নয়।’ হঠকারিতা যখন নামলে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথ ও বাঙালি সংস্কৃতির সুকৃতির ওপর — সেই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথের চরিত্রহননের চেষ্টা দিনের পর দিন চলেছে। তখনও তার প্রতিবাদ হয় নি। মনে মনে হয়তো গুমরেছেন কেউ কেউ। কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস বামপন্থী মহলে হয়নি। কখন যে কে ‘ধনতন্ত্রের দালাল’ আখ্যা পাবে, নিশ্চয়ই তা আশঙ্কার একমাত্র কারণ ছিল।” তবে এই হঠকারী নীতির জন্য বিপুল মূল্য দিতে হয়েছিল সাধারণ কমরেডদের, তাঁদের অনেকের পরিচয় রয়েছে ছবি বসুর স্মৃতিভাষ্যে এবং তাঁদের সম্পর্কে তিনি গভীর বেদনা নিয়ে লেখেন, ‘এই ভুল পথে কত মানুষের জীবনই তো শেষ হয়ে গেছে। বহু কমরেডই তখন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। অনেকের মনোবল ভেঙে যায়।’ বিস্তারিত খুলে বলেননি তিনি, কিন্তু বুঝতে পারা যায় এই পর্বের পর আগের সেই উদ্যম নিয়ে দলের কাজে আর সম্পৃক্ত হতে পারেননি ছবি বসু।
ছবি বসু তাঁর জীবনের আরেক ব্যক্তিগত অধ্যায়, পরিশীলিত, রুচিবান, বিদগ্ধ ও সংগ্রামশীল মানসের অধিকারী ব্যক্তিত্ব স্বামী সুনীল বসু বা কাটুবাবু সম্পর্কে বলেছেন একান্ত দ্বিধা নিয়ে। কিন্তু সেই সামান্য বলার মধ্য দিয়ে এক অসামান্য মানুষের পরিচয় আমরা পাই। যখন তিনি ছিলেন বক্সা জেলে, সদ্য-পরিণীতা স্ত্রীর কাছে চিঠি লিখতে পারতেন সপ্তাহে দুটি, ছবি বসু তাঁকে যেসব চিঠি লিখেছিলেন সেসবের সংগ্রহ তিনি স্বামীর একান্ত কাগজপত্রের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন ১৯৮৪ সালে সুনীল বসুর মৃত্যুর পরে। সেই চিঠির সামান্য কিছু উল্লেখ আছে লেখায়, যার প্রায় সবটা জুড়েই বইয়ের কথা, কী বই তাঁকে পাঠানো হলো সেই তালিকার সঙ্গে আছে উভয়ের পঠিত বই-সম্পর্কিত মতামত। এইসব টুকরো টুকরো ভাষ্য পড়তে পড়তে মনে হবে এই দম্পতি সত্যিকারের ‘বহি পীর’, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর নাটকের পীরসাহেব বইয়ের ভাষায় কথা বলতেন বলে তাঁর ওইরকম খেতাব জুটেছিল, আর আমাদের বসু-পরিবার কারাগার ও বাইরের যোগাযোগের বাহন করেছেন বই, বই এবং বইকে এবং এভাবে অর্জন করেছেন মনের মুক্তি। সামান্য উদ্ধৃতি এখানে টানা হলো বইয়ের এই ব্যাপ্তি বোঝাবার জন্য। ছবি বসু লিখেছেন এইসব চিঠি রাজবন্দি স্বামী সুনীল বসুকে:
‘Van Gough-এর যে সিরিজ আগে পাঠিয়েছি, সেই সিরিজের Degas পাঠালাম। Phaidon Press-এর Rodin আপাতত পাওয়া যাচ্ছে না। পেলে অবশ্যই পাঠাব।’
‘Louis Aragon-র Passengers of Destiny পড়ছি। পড়া হয়ে গেলে বক্সার passenger-কে পাঠাব। Norman Mailer-এর Naked and the Dead-এর Massess and Mainstream দারুণ প্রশংসা করেছে। এটা এখনই পাঠাচ্ছি। আমি আমার ভাইয়ের কপিটা পড়ে নেব। Simonov-এর ‘Waiting for Me’ আমার বিশেষ প্রিয় কবিতা। তবে তার ওপর ছবিটা আমার মনে ধরেনি।’
‘Lord Sinha Road মারফৎ একটি ফরাসি পত্রিকা পাঠাচ্ছি, নাম — Je veux connaitre la question atomique। যেসব বই বাইরে থেকে এনেছি তা একে একে পাঠাচ্ছি।’
‘Howard Fast-এর Literature and Reality, Dyson Carter-এর Sin and Science, Will Durant-এর Story of Mankind, Bel Aini, Une Vie, Complete Short Stories of Maupassant। Masses and Mainstream George Lukas-এর বইটির খুবই তারিফ করেছে। কিনব ঠিক করেছি।’
‘আমি এখন Belinsky পড়ছি। আর Puskin পড়া হল।’
‘Balzac-এর তো অনেক উপন্যাসই পড়া। Lost Illusion পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কিনেছি, পড়ে পাঠাব। Stephen Zweig-এর Balzac-এর জীবনী অসাধারণ লেগেছে।’
ছবি বসুর স্মৃতিভাষ্যের প্রতি আমার মুগ্ধতার সঙ্গে এবার একটি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করতে চাই। সালটা বোধকরি ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর, মস্কোর আন্তর্জাতিক বইমেলায় আমি যোগ দিয়েছি। সোভিয়েতনীতিতে কিছুটা পরিবর্তনের প্রকাশ হিসেবে সেবার তারা ভারত থেকে ন্যাশনাল বুক এজেন্সীকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তিনি এসেছিলেন মস্কোতে, তবে মেলার ভিড়ে দেখা-সাক্ষাৎ কিংবা আলাপের অবকাশ বিশেষ ছিল না। এক সকালে হোটেল থেকে বের হয়ে কাছাকাছি রেড স্কোয়ারে হাঁটতে গেছি। তখনই আকস্মিকভাবে পরিচয় এন বি এ-র সুনীল বসুর সঙ্গে। আমরা হেঁটে বেরিয়ে গল্প করেছি, খুব বেশি সময়ের জন্য নয়, তবে ফিরে এসে নিকটজনদের বলেছিলাম, এমন ‘অভিজাত’ কমিউনিস্ট আমি আগে কখনো দেখিনি। এখন ছবি বসুর স্মৃতিবক্তা পড়ে নিবিড়ভাবে জানলাম মানুষটিকে, বুঝলাম তাঁকে জানার মধ্যে আমার কোনো ভুল ছিল না। তাঁর স্মৃতির প্রতি সালাম জানাই। বিনয়াবনত হই ছবি বসুর প্রতি।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.