ইসমাইল মার্চেন্টের শিল্পযাত্রা
নাসিমা হক
My Passage from India
Ismail Merchant
Penguin
New York, 2003
US $ 35.00
বোম্বাইয়ের (তৎকালীন বোম্বে) এক কিশোর খ্যাতনামা-অভিনেত্রীর সান্নিধ্যে এসে স্বপ্ন দেখেছিল, একদিন সে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে, চলচ্চিত্র-জগতের একজন হবে। কী বিপুল অধ্যবসায়, বুদ্ধির দীপ্তি সাহস ও উদ্যম নিয়ে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করে জগত্খ্যাত চলচ্চিত্র-নির্মাতা হওয়া সম্ভবপর হলো — সে-কথাই সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন গ্রন্থকার ইসমাইল মার্চেন্ট। এই কিশোর কেমন করে নিজেকে একজন বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র-প্রযোজক ও চলচ্চিত্র-স্রষ্টা হিসেবে গড়ে তুলেছে, এ-যেন এক কিংবদন্তি-উপাখ্যান। সংগ্রাম, সাহস ও হয়ে-ওঠার এক অসামান্য দর্পণ। মাই প্যাসেজ ফ্রম ইন্ডিয়া — ইসমাইল মার্চেন্টের সেই নিরন্তর শিল্পযাত্রার বিবরণ। স্বপ্নের মতো মনে হলেও এ-কাহিনী স্বপ্ন নয়, একান্তই বাস্তব। এই স্বপ্নপূরণ হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর যে-সংগ্রাম ও সাধনা, সে-কথা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন এই গ্রন্থে। চলচ্চিত্রের জন্য তাঁর ভেতরে যে-কৌতূহল ও উদ্দীপন-বিভাজ কিশোর বয়সে সৃষ্টি করেছিলেন এক অভিনেত্রী, সে-কথা তিনি লিখেছেন সরল ও সহজ গদ্যে। চলচ্চিত্র নির্মাণ করার জন্যে শিল্পসৌন্দর্য, কারিগরি কৌশল আয়ত্ত করেছেন তিনি অনেক কষ্টে। এতো আর একদিনে সম্ভব হয়নি। একজন সাধারণ মানুষ থেকে ভুবনখ্যাত স্রষ্টা হয়ে-ওঠার জন্যে কত যে সাধনা ও সংগ্রাম কাজ করেছে, সে-কথারই বিচ্ছুরণ রয়েছে এ-গ্রন্থে। নির্মাণ ও সৃষ্টির নিমগ্নধ্যানে একজন সত্যিকারের অর্থে সৃষ্টিশীল মানুষ হয়ে-ওঠার পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ নয়, তাকেও যে পেরিয়ে যেতে হয় অন্তহীন পথ, সে-কথা নতুন করে অনুধাবন করা গেল এই স্মৃতিকথাটি পাঠ করে।
চলচ্চিত্রের কৌশল রপ্ত করবার ও সিনেমা শিল্পের স্রষ্টা হয়ে-ওঠার জন্য তাঁর অসম্ভব জেদ ছিল। সেজন্য কতভাবে যে তাঁকে পরিশ্রম করতে হয়েছে সে-কথাই বিধৃত হয়েছে তাঁর চমৎকার লেখনীতে। তাঁর বর্ণনা সরল, ইংরেজি গদ্য সাবলীল। খুব সহজেই পড়ে ফেলা যায়।
আত্মজৈবনিক গ্রন্থ হলেও এই সৃষ্টি-আলেখ্য উপন্যাসের মতো আকর্ষণীয়। বর্ণনা এমনই কৌতূহলোদ্দীপক যে, এক নিশ্বাসে গ্রন্থটি শেষ করতে যে-কোনো পাঠক উদ্বুদ্ধ হবেন। নানা ঘটনা তিনি প্রাঞ্জলভাবে বলে গেছেন। চলচ্চিত্রে যাঁদের অনুরাগ আছে কিংবা চলচ্চিত্র-নির্মাণের স্বপ্ন যাঁরা দেখেন, তাঁদের জন্য অনুপ্রেরণাসঞ্চারী এই বই।
মাই প্যাসেজ ফ্রম ইন্ডিয়া একজন চলচ্চিত্র-স্রষ্টার নিরন্তর পথচলার, বিপরীত স্রোতকে জয় করার স্মৃতিলেখ। একই সঙ্গে তাঁর জীবন ও মননে চলচ্চিত্র-কর্মী হয়ে-ওঠার সাধনারও কাহিনী। এই স্মৃতিকথায় তাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডল, বাবা-মায়ের কথা, জীবনাচরণ, সংস্কৃতি ও প্রত্যয়ের বৃত্তান্তও নিপুণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সামর্থ্য ছিল না এতটুকু, কিন্তু সাধ ছিল আকাশচুম্বী। বিপুল সাধনা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অতি সাধারণ অবস্থা থেকে ইসমাইল মার্চেন্ট শুধু প্রত্যয়, একাগ্র সাধনা ও উদ্যম দ্বারা অসাধ্য সাধন করেছেন। বহু কষ্টে অর্থ সংগ্রহ করে চলচ্চিত্র-নির্মাণ শুরু করেন তিনি। ছবি নির্মাণ করে নিজের সৃষ্টির যাত্রাকে লোকচক্ষুতে নিয়ে এলেন। এছাড়া চলচ্চিত্রসৃষ্টির ভুবনেও তাঁর ভিন্নতর নির্মাণশৈলীর কারণে আদৃত হলেন। সেই যে যাত্রা শুরু হলো তারপর তাঁকে একদিনের জন্যও আর থেমে যেতে হয়নি। তাঁর শিল্পিত অভিজ্ঞতা দিনে দিনে পরিণতি অর্জন করেছে। একটি ছবি নির্মাণ করে যে-খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তাকে পাথেয় করে পথচলায় ব্রতী হয়েছেন। তিনি তাঁর সৃষ্টি ও যোগ্যতা দিয়ে নিজের জায়গা করে নিলেন। পরবর্তীতে সৃষ্টির প্রভাবময় সাফল্যে বলীয়ান হয়ে এবং তাঁর সৃষ্টি তাৎপর্যময় হয়ে-ওঠায় অস্কার-বিজয়ী চলচ্চিত্র-নির্মাতাতেও পরিণত হয়েছিলেন।
কিশোর বয়সে ভারতের তৎকালীন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র-তারকা নিম্মির সংস্পর্শে আসেন। চলচ্চিত্র-তারকা ও চলচ্চিত্র-জগতের প্রতি তাঁর মুগ্ধতা ও অনুরাগ জন্মেছিল। তাঁর সান্নিধ্যে এসে স্বপ্ন দেখেছিলেন একদিন নিজেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন।
স্কুলশিক্ষা শেষ করে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময় থেকে কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-আয়োজনে নিজেকে সর্বক্ষণ ব্যাপৃত রেখেছিলেন। এই সময়েই তাঁর সাংস্কৃতিক রুচি গড়ে উঠেছে। খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন সৃষ্টির জগতের খ্যাতনামা সব অভিনেতা আর অভিনেত্রীকে, চলচ্চিত্র-জগতের সেরা সব মানুষকে। প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী, সুরকারদের তিনি এসব অনুষ্ঠানে আনতে পেরেছিলেন। প্রতিটি অনুষ্ঠান ছিল অত্যন্ত রুচিস্নিগ্ধ ও সফল। শিল্পীদের মধ্যে যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে শঙ্কর, জয়কৃষ্ণ, মোহাম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর, মান্না দে-র নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এমনকি কলেজের সেই অনুষ্ঠানে সেকালের আশি জন বাদকের একটি অর্কেস্ট্রা দলকে ডেকেছিলেন অনুষ্ঠানের জন্যে। সেরা অভিনেত্রী নার্গিসকে প্রধান অতিথি করে এনেছিলেন। অভিনেত্রী নার্গিস সেকালে বেশকিছু বাণিজ্যসফল ছবিতে অভিনয় করে সর্বভারতে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
পরবর্তীকালে যখন কলেজ শেষ করে ইসমাইল নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন তখন তাঁর যাত্রার পাথেয় ও অন্যান্য খরচ জোগাতে তাঁর হিতৈষী, শুভার্থী ও বন্ধুরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠান থেকে সংগৃহীত অর্থ তাঁর হাতে তুলে দেন। এভাবেই অধ্যয়নের জন্য তাঁর নিউ ইয়র্ক যাত্রা। গ্রন্থে সেকথা তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। বিদেশে গিয়েও অধ্যয়ন চালালেও তাঁর ধ্যান-জ্ঞান হলো কী করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। সে-সময় তাঁকে প্রচণ্ড সংগ্রাম করতে হয়েছে। গ্রাসচ্ছাদনের জন্য নানারকম কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করে সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে আসা ভারতীয় ডেলিগেটের গাইডের চাকরি পান। এই কাজের সুযোগে তাদের হোটেলের লবিতে বসে তিনি সর্বক্ষণ চেষ্টা করেছেন তাঁর ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্রের জন্যে অর্থের যোগানদাতা পাওয়ার। এই সময়ে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান স্বপ্ন ছিল চলচ্চিত্র-নির্মাণ। এ-লক্ষ্যে নানা ধরনের ধনাঢ্য ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে তাদের চলচ্চিত্র-নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। স্বপ্নপূরণে চেষ্টার কোনো ত্রুটি তিনি করেননি।
এভাবেই তিনি তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য নয় হাজার ডলার সংগ্রহ করেন। শুরু করেন প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ক্রিয়েশন অব উইমেন’। বিপুল অধ্যবসায় নিয়ে লেগে থেকে তিনি ‘ক্রিয়েশন অব উইমেন’-কে অ্যাকাডেমি পুরস্কার-প্রতিযোগিতার জন্য তালিকাভুক্ত করেন। ছবিটি লাইভ অ্যাকশন শর্টফিল্ম ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত হয়। প্রথম থেকেই তাঁর লক্ষ্য ছিল ভারতীয় বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র-নির্মাণ ও তা বিশ্বের দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তাঁর ভেতর যে-ভারতবোধ সক্রিয় ছিল সেই চেতনাকেই তিনি তাঁর সৃজনকর্মে অত্যন্ত সফলভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।
একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছিলেন আরেকজন। তিনি ওরেগনবাসী এক আমেরিকান, জেমস আইভরি। ইসমাইল মার্চেন্ট ‘ক্রিয়েশন অব উইমেন’ ছবির প্রদর্শন-উপলক্ষে কান চলচ্চিত্র-উৎসবের যাবার পথে নিউ ইয়র্কে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে জেমস আইভরির ‘দ্য সোর্ড অ্যান্ড দ্য ফ্লুট’ চলচ্চিত্র দেখার আমন্ত্রণ পান। একজন বন্ধুর মাধ্যমে জেমস আইভরির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ভারতের মিনিয়েচার চিত্র কলা নিয়ে আইভরির অসাধারণ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। জেমস আইভরির এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র-নির্মাণশৈলী ও ভারতীয় সমৃদ্ধ মিনিয়েচার চিত্রকলার এক দলিলও বটে। ভারতীয় মিনিয়েচার চিত্রকলার আন্তরসৌন্দর্যের পরিচয়বহ এ-ছবি। ভারতীয় মিনিয়েচার কত যে সমৃদ্ধ ও হৃদয়গ্রাহী—বিশ্বচিত্রশৈলীর পরিপ্রেক্ষিতে এ-স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে তা ধরা পড়েছে। আইভরির সৃজন-কুশলতার স্পর্শে অসামান্য হিরকখণ্ড হয়ে উঠেছে এই ছবি।
ম্যাডিসন স্কয়ারের একটি রেস্তোরাঁয় বসে ইসমাইল মার্চেন্ট আর আইভরি পরিকল্পনা করেন, বিশ্বের দর্শকদের জন্য ভারতীয় বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র করবেন। এভাবেই শুরু হয় মার্চেন্ট-আইভরি প্রোডাকশনসের। বিশ্বের চলচ্চিত্রের এ-ছিল এক মাইলফলক। মার্চেন্ট-আইভরি প্রোডাকশনস তাদের ২৫ বছর পূর্তি-উৎসব উদযাপন করেছে কয়েক বছর আগে।
তাদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কাহিনীকার ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন রুথ প্রাওয়ার জাবভালা। তারপর এই প্রোডাকশনসের অধিকাংশ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করেছেন রুথ। ইসমাইল, জেমস ও রুথের এই ত্রয়ী-বন্ধুত্ব আজও অটুট। একদিনের জন্য ও ম্লান হয়নি বা বন্ধুত্বায় চিড় ধরেনি। আজও তাঁরা একের পর এক চলচ্চিত্র-নির্মাণ করে চলেছেন। বিষয়-বৈচিত্র্যে, জীবন-ভাবনায়, রোমান্টিক কল্পনায় নবমাত্রা সঞ্চার করেছে তাঁদের প্রযত্নে নির্মিত চলচ্চিত্র। জীবনের নানা দিক-উন্মোচনে এইসব ছবি শিল্পিত কুশলতার পরিচয় দিয়েছে এবং বাণিজ্যিকভাবেও সফলতা অর্জন করেছে। এই প্রোডাকশনসের চলচ্চিত্রসমূহ বিশ্বের চলচ্চিত্র-অনুরাগী দর্শকদের হৃদয়ে নানাবিধ কারণে স্থায়ী আসন করে নিতে সক্ষম হয়েছে। এই সফলতা মার্চেন্ট-আইভরি প্রোডাকশনসকে বিশ্ব চলচ্চিত্র-ভুবনে ভিন্ন আসন করে দিয়েছে।
ম্যাডিসন স্কয়ারের যে-রেস্তোরাঁয় বসে তাঁরা চলচ্চিত্র-প্রযোজনা-সংস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন সেখান থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছিল মার্চেন্ট-আইভরি প্রোডাকশনসের। সম্প্রতি সেই স্থানটি স্মরণীয় করে রাখতে সেখানে একটি ফলক লাগানো হয়েছে।
ইসমাইল মার্চেন্ট একাগ্র সাধনায় বিপুল উদ্যমে পথ চলেছেন। চলচ্চিত্র-নির্মাণের জন্যে ব্রতী হওয়া খুব সহজ ছিল না। অসাধ্য সাধন করতে করতে নির্মাণ করেছেন প্রায় চল্লিশটি চলচ্চিত্র। নানা ঘাত-প্রতিঘাত এবং চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে তাঁর শিল্পযাত্রা। এইসব ছবিতে বিশ্বখ্যাত চিত্রতারকারা অভিনয় করেছেন।
ইসমাইল মার্চেন্ট প্রচণ্ড দুঃসাহসী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও আত্মবিশ্বাসী এক মানুষ। তাঁর লক্ষ্য ছিল perfection। লক্ষ্যের পথে কোনো বাধাকেই তিনি বাধা মনে করেননি। একটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা যাক, নিউ ইয়র্কে যাবার পর ইসমাইল ব্রডওয়েতে প্রখ্যাত অভিনেতা পল নিউম্যান অভিনীত থিয়েটার দেখতে যান। অভিনয়ের পর দারোয়ানকে খুব করে বোঝালেন তিনি সুদূর বোম্বে থেকে নিউম্যানের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। নিউম্যান তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছেন। এভাবেই তিনি গ্রিনরুমে নিউম্যানের কাছে হাজির হলেন। নিউম্যান অবশ্য আগন্তুককে দেখে খুবই বিস্মিত। ইসমাইল মার্চেন্ট তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, তিনি সুদূর ভারত থেকে চলচ্চিত্র-নির্মাণ শিখতে এসেছেন। একদিন হয়তো নিউম্যান তাঁর চলচ্চিত্রে অভিনয় করবেন। নিউম্যান অবশ্য এই তরুণটির সঙ্গে চমৎকার ব্যবহার করলেন। বিদায় নিয়ে ইসমাইল বেরিয়ে এলেন। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। ইসমাইল এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন। নিউম্যান তা দেখে তাঁকে নিজের বাইকের পেছনে করে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন। দীর্ঘ আটাশ বছর পর ইসমাইলের কলেজ-জীবনের স্বপ্নের নায়ক পল নিউম্যান তাঁর প্রোডাকশনসের ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ব্রিজ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ইসমাইল মার্চেন্টের বার্তা জীবন এরকম অসংখ্য ঘটনায় পরিপূর্ণ। নবীন নির্মাতা হয়েও শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের তিনি অভিনয়ের প্রস্তাব দেন প্রত্যাখ্যাত হবার ঝুঁকি নিয়েই। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর দুঃসাহসের জয় হয়েছে।
তাঁর চলচ্চিত্রে আরো যে-তারকারা অভিনয় করেছেন তাঁদের মধ্যে এন্থনি হপকিন্স, ভানেসা রেড গ্রেভ, ভিভিয়েন লি, হেলেনা বনহাম কার্টার, এমা টমসন ও ব্যাকুয়েল ওয়েলশের নাম উল্লেখযোগ্য। এ-গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এত অধিকসংখ্যক নাম যে, সব বলেও শেষ করা যাবে না।
প্রথম চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘হিট অ্যান্ড ডাস্ট’, ‘এ রুম উইথ এ ভিউ’, ‘হাওয়ার্ডস এন্ড’ এবং ‘রিমেইনস অব দ্য ডে’-র মতো অসাধারণ মাস্টার-পিস চলচ্চিত্র। মার্চেন্ট-আইভরি প্রোডাকশনস গত তেতাল্লিশ বছরে চল্লিশটি চলচ্চিত্রের মধ্যে একত্রিশটি ক্যাটাগরিতে অস্কার নমিনেশন পেয়েছে। কয়েকটি চলচ্চিত্র অস্কার পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছে।
মার্চেন্ট-আইভরির ছবিগুলো সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। শুটিংয়ে শুরু করলেও এখন ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে মার্চেন্ট-আইভরি প্রোডাকশনসের অফিস রয়েছে।
বিশ্বের দর্শকদের প্রশংসাধন্য ইসমাইল মার্চেন্টকে আত্মজীবনী লেখার প্রস্তাব দেয় ভাইকিং প্রকাশনা সংস্থা। ইসমাইল মার্চেন্ট বেশ কয়েকটি গ্রন্থের লেখক। এর মধ্যে ইসমাইল মার্চেন্ট’স ফ্লোরেন্স, দ্য প্রোপাইটর, দ্য প্রিন্ট গ্রে অ্যান্ড দ্য স্টোরি হাউস দ্য ফিল্ম, ইসমাইল মার্চেন্ট’স প্যারিস এবং তাঁর বেস্ট সেলিং রান্নার বই প্যাশনেট মিলস ফর ফিয়ারলেস কুকস অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চারাস ইটারস উল্লেখযোগ্য। এখানে বলা দরকার, জীবনশিল্পী ইসমাইল মার্চেন্ট একজন অসাধারণ রন্ধনশিল্পীও বটে। মাই প্যাসেজ ফ্রম ইন্ডিয়া যখন শেষ পর্যায়ে তখন ইসমাইল জানতে পারলেন ব্রিটিশ একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ২০০২ সালে ইসমাইল, রুথ ও জেমস আইভরিকে ফেলোশিপ অর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করা একজন ভারতীয়র জন্যে কম গৌরবের বিষয় নয়।
এছাড়া তিনি চলচ্চিত্র-নির্মাণের জন্য ফ্রান্সে Commandre d’ Order des Artes et Lettres for Cinema সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এত এত আন্তর্জাতিক সম্মানের পর ২০০২ সালে ইসমাইল মার্চেন্ট ভারতে পদ্মভূষণ পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছেন। ইসমাইল মার্চেন্টের কাছে এ-এক বিরাট সম্মান। কারণ সারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ালেও তিনি আসলে আদোপান্ত ভারতীয়। এই ভারত থেকেই তাঁর শিল্পসৃষ্টির পথে যাত্রা এবং এখানেই তিনি বারবার ফিরে আসেন। এই যাত্রা তাঁর আজও অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো বহু চলচ্চিত্র-নির্মাণ করতে চান।
বিশ্বনাগরিক ইসমাইল মার্চেন্ট বর্তমানে খ্যাতি ও বিপ্রীতভবের অধিকারী হলেও তাঁর দেশচেতনা ও ভারতীয়বোধ যে-কোনো মানুষকে উদ্দীপিত না করে পারে না। দেশে একবার হলেও চলে আসেন এবং সময় পেলে অবশ্যই চলে যান আজমির শরিফ। কারণ মায়ের ইচ্ছাপূরণ করতে ইসমাইল আজমির শরিফের খাদেম হন। খাদেমের দায়িত্ব পালন করতে প্রতিবছর একবার তাঁকে আজমির শরিফে আসতে হয়। খাদেমের দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি পালন করেন। ইসমাইলের মায়ের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আজমির শরিফে খাজা বাবার দরবারে দোয়া করার পর পাঁচ কন্যার পর একমাত্র পুত্র ইসমাইলকে তিনি পেয়েছেন। আজমির শরিফের সঙ্গে তাঁর পরিবারের বহু বছরের যোগাযোগ।
এই আজমিরেই তাঁদের পরিবারের সঙ্গে নিম্মির পরিবারের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। এ-থেকেই বন্ধুত্বের শুরু। তখনই নিম্মির সংস্পর্শে আসেন ইসমাইল। নিম্মি স্টুডিও থেকে কখন ফিরবে, সে-অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার বাড়ির দরজায় অপেক্ষা করত কিশোর ইসমাইল।
নিম্মি ইসমাইলকে তাঁর চলচ্চিত্র শুটিংয়ের সময় সঙ্গে নিয়ে যেতেন। শুটিং না থাকলে দুজনে যেতেন সিনেমা হলে হলিউডের প্রখ্যাত তারকাদের অভিনীত অসাধারণ সফল সব চলচ্চিত্র দেখতে। এভাবেই সিনেমা তাঁর জীবনে একটি বড় জায়গা করে নেয়। ইসমাইলের বাবা নুর মোহাম্মদ মার্চেন্টের স্বপ্ন ছিল ছেলে ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার হবে। কিন্তু বাবার সে-স্বপ্ন পূরণ হয়নি, ইসমাইল চলচ্চিত্র-নির্মাণকেই তাঁর জীবনের ব্রত করে নিলেন। সেজন্য বাবার মনে প্রথমদিকে বেশ দুঃখ-দুর্ভাবনা ছিল। পরে অবশ্য ছেলের সাফল্যে তিনি গর্বিত হয়েছিলেন।
নুর মোহাম্মদ মার্চেন্ট ছিলেন তৎকালীন বোম্বে মুসলিম লীগের সভাপতি। ১৯৪৭ সালে ভারত-বিভাগকালে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করেছিলেন বালক ইসমাইল। ভয়াবহ নিষ্ঠুর সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাঁর মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। সেই স্মৃতি এখনো তাঁকে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে ফেরে। দাঙ্গার ভয়াবহ পরিস্থিতি সত্ত্বেও ইসমাইলের পরিবার দেশত্যাগ না করার ও বোম্বেতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ইসমাইল যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে খ্যাতি অর্জন করেছেন ও পাশ্চাত্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তখনো তাঁর বাবা-মা কখনোই পশ্চিমে যেতে রাজি হননি। তাই বাবা-মাকে দেখতে প্রতিবছর ইসমাইলকেই ভারতে ছুটে যেতে হয়েছে।
শিল্পে দীক্ষিত ইসমাইল মার্চেন্ট আন্তর্জাতিক অঙ্গনের চলচ্চিত্র-অনুরাগীদের হৃদয়ে এবং তাঁর নির্মাণ বহুমুখী হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের মধ্যেও ভিন্ন আসন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
তাঁর এই আত্ম-আলেখ্যে তিনি বর্ণনা করেছেন বহু নামী-দামী সহযাত্রী, বান্ধব ও আত্মজনের কথা। ভারতের তথা বিশ্বের গৌরব প্রখ্যাত চলচ্চিত্র-স্রষ্টা সত্যজিৎ রায়কে গভীর শ্রদ্ধা করতেন মার্চেন্ট। চলচ্চিত্র-নির্মাণের নানা কাজের সূত্র ধরে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁদের গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। সত্যজিৎ রায়ের মতামত ও পরামর্শকে ইসমাইল ও জেমস আইভরি দুজনেই গভীর মর্যাদা দিতেন।
প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য হাউস হোল্ডারের নির্মাণের সময় জেমস আইভরি চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্রকে পাওয়ার জন্যে সত্যজিৎ রায়ের অনুমতি চেয়ে চিঠি লেখেন। সত্যজিৎ রায় এ-ব্যাপারে সুব্রতকে বলে দিলে সুব্রত মিত্র তাঁর পুরো টিম নিয়ে হাউস হোল্ডার ছবির চিত্রগ্রহণের দায়িত্ব নেন।
ছবি-নির্মাণ ও এডিটিং শেষ হওয়ার পর জিম পরামর্শের জন্যে ছবিটি সত্যজিৎকে দেখাতে চাইলেন। কলকাতায় সত্যজিৎকে তা দেখানো হলো। তিনি জানালেন, ছবিটি তাঁর ভালো লেগেছে। কিন্তু তাঁর মতে আরো ভালো সম্পাদনা করতে পারলে ছবিটি আরো ভালো হবে। সত্যজিৎ নিজেই সম্পাদনার দায়িত্ব নিলেন। সত্যজিতের নির্দেশে ছবিটি দুলাল দত্ত সম্পাদনা করলেন। শুধু তা-ই নয়, সত্যজিৎ সুরসৃষ্টির ও রেকর্ডিং তত্ত্বাবধানের দায়িত্বও পালন করলেন। এ-সবই সত্যজিৎ করলেন বন্ধুত্ব ও চলচ্চিত্রের জন্যে বন্ধুত্বের খাতিরে। এই সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব চিরকাল বজায় ছিল। পরে এই প্রোডাকশনসের অন্য কয়েকটি চলচ্চিত্রে সুরকারের দায়িত্বও সত্যজিৎ রায় গ্রহণ করেছিলেন। কোনো চলচ্চিত্র-নির্মাণশেষে সত্যজিতের প্রশংসা পেলে তা ছিল তাঁদের কাছে বিরাট পাওয়া। বিশেষ করে, এ রুম উইথ এ ভিউ দেখে সত্যজিৎ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন।
পরে সত্যজিৎ যখন রোগশয্যায় তখন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র-স্রষ্টাকে তাঁর সারাজীবনের কাজের সৃষ্টিস্বরূপ অস্কার পুরস্কারে সম্মানিত করার ব্যাপারে ইসমাইল মার্চেন্টের ভূমিকা ছিল। তিনিই অ্যাকাডেমি কমিটির কাছে প্রথম এ-ব্যাপারে প্রস্তাব রাখেন ও কমিটির সদস্যদের মধ্যে লবি করেন। সদস্যরা সবাই প্রস্তাবের পক্ষে বিপুল ইতিবাচক সাড়া দেন। মৃত্যুর আগে রোগশয্যায় শুয়ে সত্যজিৎ এ-পুরস্কার গ্রহণ করেন। এই বিরাট সম্মানে সত্যজিৎ আনন্দিত হলে তা ইসমাইল মার্চেন্টকে আরো বেশি আনন্দিত ও অভিভূত করেছে। এভাবেই বিশ্বখ্যাত অমর চলচ্চিত্র-স্রষ্টা সত্যজিৎ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর ও ঋণ-পরিশোধের কিছুটা সুযোগ পেয়েছিলেন আরেক চলচ্চিত্র-নির্মাতা ইসমাইল মার্চেন্ট। দুজনেই মনেপ্রাণে ভারতীয়, কিন্তু বিশ্ব-নাগরিক। দুজনেরই প্রথম প্রেম চলচ্চিত্র।
অথচ আশ্চর্যজনক নির্মোহ এক ভঙ্গিকে আশ্রয় করে ইসমাইল মার্চেন্ট বলে গেছেন তাঁর পথচলার কাহিনী। নিজেকে জাহির করেননি কোথাও। সেজন্য তাঁর এই স্মৃতিরচনা একজন সৃষ্টিউন্মুখ ধ্যানী শিল্পীর জীবন-আলেখ্য ও সংগ্রামের কাহিনী হয়ে উঠেছে। নানাদিক থেকে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাব একটি সৃষ্টিশীল মানুষের প্রাপ্তি ও মনোভিকাশেরও ছবি হয়ে থাকল এই গ্রন্থ। গ্রন্থটি পাঠ করবার পর বোঝা যায় তাঁর হৃদয়ের ঔদার্য ও বহু সৃষ্টিশীল মানুষের সান্নিধ্যে আসার পর তাঁর অর্জন কত অতলস্পর্শী।
রূপকথার মতো মনে হয় তাঁর জীবনের সাফল্য। বিস্ময়কর বলে প্রতীয়মান হয় তাঁর শিল্পযাত্রা। উদ্যম, অধ্যবসায় ও সাফল্যের কাহিনী না পাঠ করলে বোঝা যেত না, একজন মানুষ শূন্যহাতে শুধু অধ্যবসায় ও সাধনার মধ্য দিয়ে কত উঁচুদামে যেতে পারেন। পাঠকের কাছে শুধু বর্ণনা দিয়ে এই অসাধ্য সাধনের কাহিনী তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাঁর নিজের জবানিতেই এ-কাহিনী পাঠ করতে হবে। অসাধারণ এই শিল্পস্রষ্টা আরো বহু অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন — এই গ্রন্থটি পাঠ করার পর আমাদের হৃদয়ে এরকমই প্রত্যাশা জাগে।
ইসমাইল মার্চেন্টের শিল্পযাত্রা
Published :

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.