ওরা জেগে আছে 

গভীর রাতের নিগূঢ় স্তব্ধ অন্ধকারে অন্তহীন কালচে আকাশে অগণিত গ্রহতারা মিটমিট করছে। নিগূঢ় স্তব্ধতাকে কখনো অতল মনে হতে পারে আবার কখনো অগভীরও মনে হতে পারে। চোখের জ্যোতি অন্ধকার দেওয়াল ভেদ করে দিগন্ত লাগোয়া হাওরের দূরের গ্রামগুলোকে দেখতে পারে না। কেবল চেনা আলপথটুকু সামান্য দেখা যায়, এই আলপথ ধরেই হাঁটার সময় হানিফ আকাশের দিকে তাকিয়ে আদমসুরত দেখে রাতের সময় নির্ণয় করার চেষ্টা করে এবং অনুমান করে – ভোর হয় হয়। আবছা ও কালচে আকাশ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে ঝিম ধরে হাঁটছে রাখাল গায়েন। রাখাল গায়েন আজ ঘোরের মধ্যে আছে। আসরের গানে আজ ওর জয়জয়কার, মানুষের প্রশংসায় ভেসে গেছে এবং এজন্যই ফুরফুরে মনে যেন অপার্থিব কোনো কিছু প্রাপ্তির আমেজের মতো ঘোরের মধ্যে আছে। ওর প্রাপ্তি বলতে তো এমন কিছু হলেই হয়। আর কী চাওয়া রাখালের! সারা পথেই মাঝে মাঝে গুনগুন করে ঘোরভাঙা গান গেয়ে আসছে। সে তো এমনই। মনের ভেতরে সব সময়ই গানের গুনগুনানি সুর, সুর ভাঁজে আর যখন গানের ভাব আসে তখন গান লেখে। এখন কোনো গানের কথা মনে আসছে কি না কে জানে? হানিফ ভাবনায় পড়ে। ওর গানের কথা যদি আবার অন্য কোনো চিন্তায় হারিয়ে যায় তবে হানিফ বেশ কষ্ট পায়। সব সময় সব গানের কথা লিখতে পারে না। তখন হানিফ যত আফসোস করে তত আফসোস করে না রাখাল গায়েন। বড় খেয়ালি উদাসী মানুষ রাখাল গায়েন। তা না হলে কি শিল্পী হওয়া যায়! হানিফ বোঝে, রাখালের প্রতিভা অন্যরকম। একদিন তার গানও বাউল শাহ আবদুল করিমের মতোই নাম করবে – এই বিশ্বাস অন্তরে দৃঢ়ভাবে গ্রথিত।  

আজকের পথ অনেক দূরের। দূর কি আসলেই, নাকি ক্লান্তির জন্য এই দূরত্ব – এ কথা মেলাতে পারে না হানিফ। রাখাল গুনগুন গান করছে। ‘আমি কার ঘরে করি বাস, কে করে আমার সর্বনাশ …’ মনে হয় নতুন গানের কলি। এই গান আর কখনো শোনেনি হানিফ। এখনো সুরের তাল মিলছে না। অন্ধকারে পথ চলতে চলতে সুর ভাঁজছে সে। হয়তো বাড়ি ফিরে গানটা লিখতে হবে, হানিফ ভাবে।

হাওরের পথ আর পাহাড়ের পথ একই রকম। মনে হয় ওই যে গ্রাম আর হাঁটতে হাঁটতে শেষ হয় না। রাখাল বলল, আর কত দূর রে হানিফ?

– এই তো।

ক্লান্তিতে কাদা হানিফের কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। দায়সারা জবাব দিয়ে সে হাই তোলে। মনে হচ্ছে, এখানেই যদি কোথাও একটু ঘুমানোর জায়গা পাওয়া যেত তাহলে ঘুমিয়ে ক্লান্তি দূর করতে পারত। হানিফের চেয়ে রাখাল আরো বেশি ক্লান্ত। হানিফ যেমন তাগড়া ঠিক বিপরীতে রাখালের শরীর তেমন দুর্বল। বেশি পরিশ্রম করতে পারে না। এরপরও রাত বারোটা পর্যন্ত গান গেয়ে সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এবং এরপর দু-তিন ঘণ্টা হেঁটে এত পথ পাড়ি দিয়ে এখন যেন পা চলে না।

অন্ধকার ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করেছে। 

রাখাল বলল, হিড়ালি নতুন কথা বলা শুরু করেছে, তুই কি হুনছোস?

– না। কী কথা?

– হিলে ফসিল নষ্ট করছে পাপের লাইগ্যা। গানবাজনা করলে নাহি পাপ অয়।

শ্লেষের হাসি হেসে হানিফ বলল, ফালতু কথায় কান দিবি না। 

বাউলশিল্পী রাখাল যদিও কারো কথায় কখনো কান দেয় না, সে চলে নিজের মতো করে। কিন্তু তবু ইদানীং পরিস্থিতিটা কেমন যেন গোলমেলে ঠেকছে। ফেসবুকে নানা রকম খবর আসছে। কোথাও কোথাও শিল্পীদের ওপর অত্যাচারও হচ্ছে। যদিও মনে মাঝে মাঝে ভয়ের উদ্রেক হয়, তবু গানের মাঝেই সে ডুবে থাকতে চায়। গানই তো তার জীবনের তৃষ্ণা, অস্তিত্ব। ভরসার একমাত্র মানুষ হানিফ। ওর একান্ত সহচর ও ভক্ত হানিফ বলতে গেলে প্রায় সব সময়ই অতন্দ্র প্রহরীর মতো সঙ্গে সঙ্গে থাকে। সেই শৈশব থেকে ওদের বন্ধুত্ব, গাঁয়ের লোকেরা বলে – ওরা নিজের বাড়িতে ভাত খেয়ে কুলি ফেলে আরেকজনের বাড়িতে। একজনের সঙ্গে অন্যজনের মুহূর্তকাল দেখা না হলেই অস্থির হয়ে যায়। হানিফ গান গাইতে পারে না, কিন্তু গানের পাগল। এমন কোনো নজির নেই যে, রাখাল গায়েন হানিফকে ছাড়া একা একা গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও গান গাইতে গিয়েছে বা বায়না করেছে। গানের বায়না করার সময়ই সে বলে রাখে, আমার লগে আমার দোস্ত যাইবো। খাওয়ার ব্যবস্থা দুইজনের। 

হানিফ গান গাইতে না পারলেও সে হাডুডু কাবাডি কুস্তি খেলে। কয়েক বছর ধরে ‘হানিফ মাল’ নাম ছড়িয়ে পড়েছে। কুস্তিগীরকে এই জনপদে ‘মাল’ বলে। সেই এককালে তাড়াইলের সিরাজ মালের নাম শুনলে মানুষ যেমন পুলকিত হতো, ঠিক তেমনই এখন হানিফ মালের নাম শুনলে পুলকিত হয়। হানিফ যদি কোথাও খেলতে যায় রাখাল সঙ্গে যাবে আর রাখাল কোথাও গান করতে গেলে হানিফ সঙ্গে যাবে – এ যেন এক অলিখিত চুক্তি। শীতের রাতে বাউল গানের বায়না হয়। রাত বারোটা পর্যন্ত গান গেয়ে তারপর হাঁটতে হাঁটতে চার ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে। আরো দুই ঘণ্টা পর চামড়ার ঘাটে। সেখান থেকে হেঁটে অলিপুর গ্রামে দশটার আগে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

গানপাগল হানিফ অনেকটা সংসার বিরাগী। পৈতৃক সম্পত্তি যা কিছু আছে তা দিয়ে সারা বছর চলে না, কার্তিক ও চৈত্র মাসে খোরাকির টান পড়ে। এসব অভাব সে কখনো আমলেও আনে না। খেলা আর গান তার জীবনের স্পন্দন। এজন্য রাখালের ডাক পড়লে সে সংসার ফেলে যেকোনো জায়গায় চলে যায়। আর রাখাল গায়েন? অলিপুর গ্রামে সনাতন ধর্মের কয়েকটি পরিবার, তাদের একজন রাখাল গায়েন। যুদ্ধের সময় মা-বাবাকে হারিয়ে এখন চালচুলোহীন বাউলশিল্পী। গ্রামের মাঝামাঝিতে একটি বাড়ি, দুটি ঘর। একটি ঘরে সে একা থাকে, অন্যটিতে সাধনা করে। সমঝদাররা এলে সেই ঘরেই বসে। গোয়াল নেই, গরু নেই, জমি নেই – আছে কেবল গানের গলা আর কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র।

চামড়াঘাট থেকেই অলিপুর গ্রামে আসতে আসতে ওদের  সকাল দশটা বেজে যায়। হানিফ বলল, আমার বাড়িত চল। তুই একলা মানুষ, কোন সোমায় রানবি আর কোন সোমায় খাইবি?

রাখাল ইতস্তত করে। হানিফের বউ আবার কিছু মনে করে কি না। যদিও আজকেই নতুন ওদের বাড়িতে যাওয়া বা খাওয়া নয়, তবু আজকে কেন সংকোচ লাগছে রাখালও বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ নীরবতায় কেটে যাওয়ার পর হানিফ আবার জিজ্ঞেস করল, কিছু কইলি না যে?

রাখালের সংকোচ দূর হয় এবং বলল, চল। ঘুমে কাতর অইয়া গেছি। নিজে রাইন্ধা খাওয়ার শক্তিও নাই।

ওরা দুজন হানিফের বাড়িতে গিয়ে ঢোকে।

দুই

অলিপুর গ্রামে কানাঘুষা হচ্ছে, কোনো গানবাজনা করতে কাউকে দেওয়া হবে না। কানাঘুষার সূত্রপাত হঠাৎ করেই হয়নি। গত বছর শিলাবৃষ্টিতে হাওরের ধান প্রায় অর্ধেক মাটির সঙ্গে মিশে যায় এবং দুই দফা পাহাড়ি ঢলে আরো ব্যাপক ফসলের ক্ষতি হয়। উজান গাঁওয়ের এক হিড়ালি শিলাবৃষ্টি থামানোর জন্য হাওরের মাঝখানে দিগম্বর হয়ে মন্ত্র পড়ে, নৃত্য করে এবং আরো কী কী যেন করেছে, তা রাতের অন্ধকারে অলিপুরসহ আশপাশে আরো দু-চারটি গ্রামের মানুষ জানে না। তবে হিড়ালি শিলাবৃষ্টি থেকে প্রাণে বেঁচেছে – এটিই তাদের বড় কথা। মানুষের ধারণা, অনেক কেরামতি জানে হিড়ালি। না-হয় গত বিশ বছরের রেকর্ড ভাঙা ভয়াবহ শিলাবৃষ্টি থেকে কেরামতি ছাড়া একজন সাধারণ মানুষ কোনোমতেই বাঁচতে পারে না – এই বিশ্বাসও তাদের মধ্যে জন্মেছে। গ্রামের মানুষ ভাবছিল, ঝড়বৃষ্টি থামলে হিড়ালির লাশ আনতে হবে, অথচ সেই ব্যক্তি সশরীরে গ্রামে গিয়ে হাজির। শুধু হাজির হলেও মেনে নেওয়া যেত। তার গায়ের কাপড়-চোপড়ে এক ফোঁটা বৃষ্টির পানিও লাগেনি। এসবই কেরামতির কথা! হাওর থেকে ফিরেই হিড়ালি ফতোয়া জারি করল, এই এলাহা পাপে ছায়া গ্যাছে গা। মানুষ যদি নিষ্পাপী না অয়, তয় পরতি বছরই হিলে (শিলাবৃষ্টিতে) ফসিল শেষ অইয়া যাইবো। হিড়ালির কথা মানুষের হৃদয়ে গেঁথে গেছে এবং মুরুব্বিরা ভাবতে শুরু করেছে এলাকার যুবকরা কোন কোন পাপে লিপ্ত হতে পারে। জুয়া খেলা হতে পারে, গঞ্জ থেকে হাওরে যৌনকর্মী এনে পাপকর্ম করতে পারে এবং মদ খেতে পারে। এছাড়া বেগানা নারীর সঙ্গে অবৈধ মেলামেশাও করতে পারে। এসবই অনুমানের কথা, যা কেউ কেউ বিশ্বাস করেছে আবার অনেকেই বিশ্বাস করেনি। কিছু মানুষ এসব গালগল্পকে কানে নেয়নি এবং তারা হিড়ালির কথা বিশ্বাসও করেনি। দু-একজন কলেজপড়ুয়া প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা দিলে কিছু মাদরাসাপড়ুয়া ছেলে আবার পাপের ঘটনাই বলে হিড়ালির পক্ষ নেয় এবং কোথায় পাপ হচ্ছে অনুসন্ধান করতে শুরু করে। শুধু হিড়ালির কথাতে মানুষ হয়তো পাপের অনুসন্ধান করতে থাকত; কিন্তু ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয় যেদিন কোনো এলাকার একজন ধর্মীয় গুরু এসে ফতোয়া দিয়ে যায় যে, পাপ, পাপে ছেয়ে গেছে এই এলাকা। মানুষ অনেক পাপ করে। তার মধ্যে গানবাজনা হারাম। গানবাজনা বন্ধ না করলে ইহকাল ও পরকালের শাস্তি এই এলাকার সব মানুষকেই পাইতে হইবে। তার এই ফতোয়া মানুষের মনে দাগ কেটেছে এবং গানবাজনা বন্ধ করার জন্য কানাঘুষা শুরু করেছে। গানবাজনা কে করে? একজনই আছে দশ গ্রামে – সে রাখাল গায়েন। কিন্তু রাখাল গায়েন গান করলে পাপ হয়, তবে যে শাহ আবদুল করিম, উকিল মুনশি, বারী সিদ্দিকী প্রমুখ গান করতেন, তখন কি পাপ হতো না? তখন কেন এসব কথা ওঠেনি? এমন কথাও কেউ কেউ বলতে শুরু করেছে। নাকি রাখাল গায়েন হিন্দু বলে এখন এসব কথা উঠছে? নাকি চালচুলো নেই বলে? অলিপুর গ্রামের কিছু মানুষ রাখাল গায়েনের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে নানা রকম যুক্তি দিয়েছে। কেউ কেউ পক্ষ নিয়ে বলছে, অলিপুর গ্রামের যে মর্যাদা বাড়িয়েছে রাখাল গায়েন তাকে কেন এই দোষে দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে? দু-একজন বলছে, হাওরের ফসলের চেয়ে রাখালের গানবাজনা বেশি দরকারি না। মানুষ বাঁচানো বড় কর্তব্য। গ্রামের মানুষের এসব কথা রাখাল ও হানিফের কানে গিয়েছে। রাখাল মনঃক্ষুণ্ন হয়ে গানবাজনা ছেড়ে দেবে – এই কথা জানানোর পর হানিফ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং বলে, আমার জীবন থাকতে তুই গান ছাড়তে পারবি না। আমার মিত্যুর ফরে তুই গান ছাড়বি।

হানিফের কথায় রাখাল গায়েন বলল, গান ছাড়তে পারবো না রে হানিফ। আমি গেরাম ছাইড়্যা চইল্যা যাই। শহরে গিয়া গান গাইব।

হানিফ বলল, তাও আমার মিত্যুর ফরে। এই গেরামের মাডি ছাইড়া যাওয়া সম্ভাব না।

হানিফের সঙ্গে এলাকার অনেক যুবকই রাখাল গায়েনের পক্ষে দাঁড়ায় এবং স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়, হিড়ালির কথা আমরা বিশ^াস করি না। তার কথা মানি না। রাখাল গায়েনের গানবাজনা চলবে।

তিন

– তাইলে তোর কানেও কথাটা গ্যাছে? জানতে চাইলো হানিফ।

– কথা কি আর চাপা থাহে রে হানিফ? বলল রাখাল গায়েন। বাতাসে কথা ভাসতে থাহে। সব কথাই ভাসতে থাহে। কোনো না কোনো সোমায় মানুষের কানে যায়।

শ্লেষ ও তাচ্ছিল্য করে হানিফ বলল, এই সব পোলাপাইনের নাকেত তো অহনো মায়ের দুধের গন্ধ যায় নাই। নাকের মধ্যে চিপা দিলে মায়ের বুকের দুধ বাইর অইবো। হেরা যদি তর কিছু করে তয় ঠ্যাঙ্গের নলি ছুডায়ালবাম। তুই মনে রাহিস, হানিফ কেউরে ডরায়া মাডিত ভাত খায় না। মরণ একদিন আছে, হুম। 

হানিফের দৃঢ় কথায় রাখাল গায়েন একটু ভরসা পেলেও মনের ভেতরে খচখচানি যায়নি। অনেক মানুষ হিংস্র হয়ে উঠেছে ইদানীং। বড় হিংস্র আচরণ করে। সেদিন বাজারে তাকে একটা হাঁটুর বয়সী ছেলে ধমক দিয়ে বলে দিয়েছে গানবাজনা না করার জন্য। এই কথা হানিফকে বললে হয়তো বিবাদ লাগত। নিজের মানমর্যাদা ও আত্মরক্ষার জন্য রাখাল সেদিনের হাটের ওই ছেলেটার বেয়াদবির কথা বলেনি হানিফকে। মনের ভেতরে পুষে রেখেছে।

রাখাল বলল, কাইজ্যাকীত্তন কইর‌্যা কি গেরামে থাহন যাইবো?

– তাইলে কি গান ছাইড়্যা দিবি? হানিফ জিজ্ঞেস করল।

– তো কী আর করা? আগে জান, তার পরে গান। আক্ষেপের স্বরে রাখাল গায়েন বলল।

– এত সহালে হাইর‌্যা যাইবি আমি ভাবতে পারি নাই রে রাখাল। গান ছাড়া কি তুই বাঁচবি?

হানিফের আবেগমিশ্রিত কথায় রাখালও ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে এবং গানই যে তার জীবন সে-কথা ভাবতে গিয়েই বুকের ভেতরে এক প্রকার কষ্ট অনুভব করে। কিছুক্ষণ নিরেট নীরবতায় থেকে হঠাৎ করেই হুহু করে কেঁদে ওঠে রাখাল, গান ছাড়া কী করে বাঁচবাম? গান ছাড়া আমি বাঁচতাম না রে হানিফ।  

রাখালের কান্নায় হানিফেরও চোখ ভিজে যায়। সে চোখ মুছে বলল, আমার জান থাকতে তোর কিছ্ছু অইতে দিমু না রে রাখাল। যা, অহন তুই বাড়িত যা।

বাড়ি থেকে একটু দূরে একটি উঁচু জাঙ্গালে বসে ওরা কথা বলছিল রাতের গভীরে। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে, বিস্তৃত মাঠে ধবল জোছনা থইথই করছে। রাখালকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে হানিফ নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই আবু তালেবের সঙ্গে দেখা হলে সে বলল, তোরে বিছরাইতাছি। কই গেছিলি?

– ওই তো ওইহানে। রাহালের বোহালে।

– আইজ রাহালের বাড়িত হামলা করব ছমির শেখ। ওরা রেডি অইতাছে।

– কী কছ?

– হুম। কথা ঠিক। ছমির শেখ কইলো এই গেরামে গানবাজনা চলতো না। রাহালের বাড়ি পুইড়া ফালাইবো।

চিন্তিত হানিফ বলল, তো অহন কী করা?

আবু তালেব বলল, চিন্তায় আছি, যদি রাহাল রে মারে?

– হুম, চিন্তার বিষয়। তুই আরো কয়েকজন লইয়া রাহালের বাড়িত আয়। আমি হের বাড়িত যাই।

হানিফ ত্রস্ত হয়ে রাখাল গায়েনের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়। হানিফকে দেখে রাখাল বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, আবার আইলি যে? কোনো দুস্সম্বাদ আছে?

হানিফ বলল, ভেজাল আছে। তোর বাদ্যযন্ত্র সব সরায়া ফ্যাল।

রাখালের হাত-পা কাঁপতে থাকে। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। রাখাল গায়েনের অবস্থা বুঝতে পেরে হানিফই ঘর থেকে বাদ্যযন্ত্র সরিয়ে একটি গাছের আড়ালে রেখে সে দাঁড়িয়ে থাকে ঘরের সামনে। হানিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এই ছমির শেখ কয় দিন আগে চুরির মামলায় জেল খাইটা আইছে, অহন হে গানবাজনা বন্ধ করতে চায়? হায় রে পাপ! হারামজাদা তুই চুরি করলে পাপ অয় না? মনে মনে গজগজ করতে থাকে হানিফ।

আবু তালেব আরো কয়েকজনকে নিয়ে এসে বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় ওঁৎ পেতে থাকে। যদি ছমির শেখ হামলা করে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার মতো দেশীয় অস্ত্রও ওরা হাতে করে নিয়ে আসে। রাত ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে। মাঝে মাঝে দু-একটা নিশাচর পাখির ডাক জমাট নৈঃশব্দ্যে তরঙ্গ তোলে। পাশের বাড়ি থেকে একটি কুকুর হঠাৎ হঠাৎ ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। আর তখনই দূরে শিয়ালের হুক্কা হুয়া শব্দ একনাগাড়ে কতক্ষণ বাতাসে তরঙ্গ তোলে। বড় ভয়ঙ্কর মনে হয় এই রাতকে। হানিফ ও আবু তালেবের দলের লোকদের মধ্যে প্রবল সাহস থাকলেও রাখাল অসহায় মানুষের মতো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর হানিফ মাঝে মাঝে সান্ত্বনা দেয়। মাঝে মাঝে বিড়ি ফুঁকে দুজনে মিলে। 

রাখাল গায়েনকে আক্রমণ করলে আবু তালেবের লোকজন ও হানিফ প্রতিহত করবে – এই খবর ছমির শেখের কানে পৌঁছে যায় এবং তখন ছমির শেখ নিজেকে গুটিয়ে নেয়। তবে রাখাল গায়েন ও তার সঙ্গীরা সারারাতই উৎকণ্ঠায় কাটাতে থাকে। রাতের জোছনা একসময় মিলিয়ে যেতে থাকে। আবছা অন্ধকারে ঢেকে যায় অলিপুর গ্রাম। হয়তো ছমির শেখ এবং তার লোকজন ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়তো আবার কোনো দিন জাগতে পারে, অথবা নাও জাগতে পারে। হানিফ ও আবু তালেবরা আজ জেগে আছে সারা রাত। ওরা হয়তো আরো জেগে থাকবে ছমির শেখের হাত থেকে রাখাল গায়েনকে বাঁচানোর জন্য। ওরা হয়তো আরো জেগে থাকবে রাখাল গায়েনের কণ্ঠে গান বাঁচিয়ে রাখার জন্য। ওরা জেগে থাকবে …।