জুনের শেষের এক দুপুরে হঠাৎ হাজির হলাম ধানমন্ডির ৪ নম্বর সড়কে সফিউদ্দীন শিল্পালয়ে। এখানে চলছে চিত্রশিল্পী মাসুদুর রহমানের চতুর্থ একক চিত্রকলা প্রদর্শনী ‘অন্তরে অন্তরীক্ষে’।
শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমদের ১০৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শিল্পী মাসুদুর রহমানের এক সপ্তাহব্যাপী একক শিল্পপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে শিল্পগুরুর স্মৃতি, সৃজনঋণ এবং শিল্পঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের এক আন্তরিক প্রয়াস হিসেবে।
কথাপ্রসঙ্গে শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমদ চত্বরের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ নজীর জানালেন, বাংলাদেশে ছাপচিত্রকলার অগ্রদূত এবং আধুনিক চারুশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ সফিউদ্দিন আহমদের শিল্পকর্মে যেমন মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির গভীর অন্বেষণ প্রতিফলিত হয়েছে, তেমনি তা সময়, সমাজ ও ইতিহাসের এক সংবেদনশীল দলিল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। এই ধারাবাহিকতার উত্তরসূরি হিসেবে মাসুদুর রহমানের একক প্রদর্শনী সমকালীন শিল্পচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
প্রদর্শণীতে চিত্রশিল্পী মাসুদুর রহমানের শিল্পভাবনা ও মাধ্যমের মূল উপজীব্য হলো মানবদেহ, প্রকৃতি এবং মহাজাগতিক চেতনার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তাঁর শিল্পভাষায় ব্যক্তিগত অনুভব ও জীবন-অভিজ্ঞতা এক গভীর দার্শনিক বোধের সঙ্গে মিশে নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে এখানে।
গ্যালারি ঘুরে দেখতে দেখতে শিল্পী এলেন। কিন্তু বুঝিনি তিনিই শিল্পী। অনেক গল্পের পথ ধরে জানলাম তাঁকে। গল্পে গল্পে টের পেলাম কবি জীবনানন্দ দাশের ভূমি বরিশালে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর সৃষ্টিজগতের গভীরে এক অসাধারণ সংবেদনশীল, নির্মল এবং অন্তর্মুখী শিল্পসত্তা ফুটে আছে। তাঁর শিল্পচর্চায় কেবল রং, রেখা কিংবা দৃশ্যমান প্রকৃতির অনুকরণ নয়; তাঁর ক্যানভাসে যেন সময়ের প্রবাহ, অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা, সৃষ্টি ও বিনাশের চিরন্তন চক্র, এবং মানবমনের অন্তর্দ্বন্দ্ব স্বতন্ত্র নন্দনভাষায় রূপ পেয়েছে। রঙের বিভিন্ন স্তরের ভেতর থেকে মানুষের শরীর, মুখ বা অস্তিত্বের নানা ইঙ্গিত এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। এখানে প্রকৃতি এবং মহাবিশ্বকে একীভূত করে মানুষের অন্তর্লোকের এক গভীর দর্শন নির্মাণের প্রয়াসে তিনি মগ্ন। তাঁর ক্যানভাসে মহাবিশ্ব ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অসীম বিস্তারকে অতিক্রম করে মানবচেতনার এক অনন্ত পরিসরে রূপ নিয়েছে।
আবেগে স্নাত হয়ে তাঁর কাছে প্রকাশ করলাম আমার ভাবনা। চমকিত হবার পালা তাঁর। তখন জানালেন এভাবে, ‘‘আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন পৃথিবী একদিকে অভূতপূর্বভাবে
পরস্পর-সংযুক্ত, অন্যদিকে গভীরভাবে বিচ্ছিন্ন। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল বাস্তবতা, জলবায়ু সংকট, যুদ্ধ, অভিবাসন, স্মৃতির বিচ্ছিন্নতা এবং পরিচয়ের পুনর্গঠন – সব মিলিয়ে সমকালীন মানবজীবন আজ এক জটিল মহাজাগতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে। এই সময়ে মানুষ যেমন মহাবিশ্বের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করেছে, তেমনি বাধ্য হয়েছে নিজের অন্তর্লোকের অন্ধকার ও অসীমতার মুখোমুখি হতে। ‘অন্তরে অন্তরীক্ষে ‘Within and Beyond’ সেই আত্মমুখী অভিযাত্রারই এক শিল্পভাষ্য।
আমি যখন ক্যানভাসে কাজ করি, তখন সেটি আমার কাছে হয়ে ওঠে সময়ের এক দৃশ্য, যেখানে সময়ের স্তর জমা হয়, ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, আবার নতুনভাবে জন্ম নেয়। রঙের প্রতিটি স্তর যেন সময়ের ভূতাত্ত্বিক চিহ্ন, প্রতিটি তুলির আঁচড় যেন একটি নক্ষত্রের গতিপথ, আর মুছে ফেলা প্রতিটি অংশ যেন বিস্মৃত ইতিহাসের এক নীরব খণ্ডচিত্র।”
তাঁর কথার খেই ধরে একটা একটা করে শিল্পীর আঁকা ছবিগুলো দেখছি। নাম গুলো এমন স্মৃতির নোঙর, অঝোরধারা, লূপান্তর, স্মৃতির প্রত্নতত্ব, স্মৃতির মেঘদল, রক্তিম বৃষ্টি, বিস্মৃতির অবশেষ, মেঘমল্লার, অস্তরাগের গান, ভালোবাসার নদী এবং অন্তরীক্ষের অশ্রুধারা। সবগুলো নামই কাব্যিক গঠনে করা। এক সময়ে জানলাম কবিতার প্রতি তাঁর আজন্ম প্রেম। তাঁর শিল্প জীবনের শুরু কবিতায়। থিতু হয়েছেন চিত্রকলায়।
দুই
প্রথাগত ব্যবহারের বদলে হাত এবং আঙুলের ছোঁয়ায় ভিন্নধর্মী টেক্সচার ও গভীরতা তৈরি করেছেন। সেইসব কাজের ওপর যতবার চোখ বুলালাম, ততবার দেয়ালে ঝোলানো চিত্রকলায় আমার মন যেনো স্পর্শ করতে শুরু করলো মহাবিশ্ব! আমরা যে দূর নক্ষত্রের জন্ম, মৃত্যু কিংবা নীরব গ্যালাক্সির অনন্ত যাত্রা নিয়ে ভাবি, শিল্পীর কাছে শুধু সেগুলো মহাকাশের ঘটনা নয়; এগুলোর প্রতিধ্বনি মানুষের স্মৃতি, স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, প্রেম, ভয়, নিঃসঙ্গতা এবং আত্মঅন্বেষণের ভেতরেও সমানভাবে অনুরণিত হয়। মনে হলো, তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষ নিজেই একটি চলমান মহাবিশ্ব, যেখানে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি ও বিনাশ, আলো ও অন্ধকার, স্মৃতি ও বিস্মৃতি, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যের এক অন্তহীন সহাবস্থান ঘটছে। সেই উপলব্ধি থেকেই তাঁর শিল্পভাষা গড়ে উঠেছে।
পুরো আয়োজন দেখতে দেখতে মনে হলো, ‘অন্তরে অন্তরীক্ষে’ কেবল মহাশূন্যের কোনো দৃশ্যপট বা নাক্ষত্রিক মানচিত্র নয়; এটি এই শিল্পধারায় মহাবিশ্বের অপরিমেয় শূন্যতা ও নীরবতা কখনো ভয় নয়, বরং আত্মপরিচয়ের এক বিস্তৃত পরিসর। সেই নীরবতার ভেতরেই তিনি সৃষ্টি, প্রেম, জীবন এবং অস্তিত্বের সবচেয়ে সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে আবিষ্কার করে চলেছেন। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের প্রকৃত সত্তা এই অনন্ত আবর্তেরই অংশ; যেখানে ব্যক্তিগত জীবন, মহাকালের প্রবাহ এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অসীমতা এক অবিচ্ছিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ।
স্বভাবতই একটি প্রশ্ন মনে এলো। কতদিন ধরে তাঁর ভেতর এই দর্শনের স্বাভাবিক সম্প্রসারণ ঘটেছে? জানলাম সে অনেক বছর ধরে তাঁর ভাবনায় এই প্রকৃতি প্রবেশ করেছে। এই ‘অন্তরে অন্তরীক্ষে’ চিত্র সিরিজের আগেও মহাবিশ্ব নিয়ে CosMic এধফবহপব (কসমিক গ্যাডেন্স) এবং সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে ঢাকার ফরাসি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আলিয়ঁস ফ্রসেঁসের গ্যালারিতে Journey of the Cosmos (জার্নি অব দ্য কসমস) প্রদর্শন হয়েছে। বইপত্র ঘেঁটে পেলাম কসমিক গ্যাডেন্স চিত্র প্রদর্শনীতে বলা তাঁর কথা। লিখেছেন, “আমার কাছে আঁকাআঁকি এক মহাজাগতিক অভিযাত্রা, আর রেখাই আমার মহাকাশযান। তাই শিল্পসৃষ্টি আমার কাছে মহাবিশ্বের নিজস্ব তত্ত্ব ও ছন্দ অনুসরণ করে। এই কারণেই শিল্প আমাকে এনে দেয় এক রহস্যময় গভীরতার অনুভব। এটাই আমার জীবনের আনন্দ, আমার অস্তিত্বের উল্লাস।
আমি আমার শিল্পের মধ্য দিয়েই মহাবিশ্বকে অনুভব করি।
আমার কাছে মানব-অবয়বই মহাবিশ্বের কেন্দ্র, – সে একইসঙ্গে মহাবিশ্ব, আবার সবকিছু এবং কিছুই নয়। যেমন মহাবিশ্ব শূন্য থেকে পূর্ণতার দিকে, আবার পূর্ণতা থেকে শূন্যের দিকে নিরন্তর রূপান্তরিত হয়, তেমনি শিল্পও সেই একই চিরন্তন রূপান্তরের অংশ। এই দর্শনই আমি, এই দর্শনই আমার শিল্প।
আমার শিল্পচর্চার প্রেরণা এসেছে প্রাচীন ভারতীয় শিল্পধারা এবং রেনেসাঁ যুগের শিল্পকলা থেকে।”
তিন
এমন ভাবনার পথ ধরে দুজনে একটা সিদ্ধান্তে এলাম – তা হলো চিত্রপ্রদর্শনীর শেষ দিনে চিত্রকলা ও কবিতার মিল ও আবেশ মিলিয়ে – ‘মানবদেহে শূন্যের নন্দনতত্ত্ব : মহাজাগতিক গতিসীমায় চিত্রকলা ও কবিতার যুথবদ্ধতা’ বিষয়ের ওপর আমার একক
বক্তৃতার আয়োজন হবে। ৩ জুলাই, শিল্পগুরু সফিউদ্দীন শিল্পালয়েই আয়োজিত হলো ব্যতিক্রমী সে-অনুষ্ঠান। সভাপতিত্ব করলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যে পড়া অশীতিপর তরুণ জাহিরুল রাঙাদা।
আমি বক্তৃতায় বললাম, শূন্য হয়তো একটা একান্তই বোধ। সেজন্যে এর কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই। সেই বোধে মানব জীবনের পুরো যাত্রাই দ্বান্দ্বিকতায় ভরা। একজন মানুষ নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার আর অস্বীকারের মধ্যে দিয়ে প্রতিনিয়ত যাত্রা করে এবং এখানেই কবি উপলব্ধি করে তাঁর বোধের বৃত্তে আঁকা শূন্যের মাঝে নানা ব্যাপ্তি। এমন করে একইভাবে শিল্পী মাসুদুর রহমান অনন্তের সঙ্গে তাঁর অন্তর্জগতের এক অবিরাম ও গভীর সংলাপ তুলির আঁচরে সৃষ্টি করেছেন দ্বান্দ্বিকতা ভাষা। আমি যেমন কবিতার জন্যে বুঝে যাই আকাশের অসীম বিস্তার, নদীর নিরন্তর প্রবাহে ভাঙন, কিংবা দূর দিগন্তের রহস্যঘেরা নীরব আহ্বান, অথবা অরণ্যের গাঢ় নিবিড় সবুজে শতবর্ষী বৃক্ষের স্থিতধী উপস্থিতি; তেমনি করে তিনিও এসবের মধ্যে যেন নিজের অস্তিত্বের প্রতিধ্বনি খুঁজে পান। আমাদের কবিদের বৃষ্টির জলে তৈরি কবিতার খাতায় লেখার মতো করে তিনিও তাঁর ক্যানভাসে প্রকৃতিকে শুধু কোনো বাহ্যিক বিষয় হিসেবে পাননি, বরং মনে হয় এখানে প্রকৃতিই যেনো শিল্পীর রং-তুলিকে মাধ্যম করে নিজেকে নতুন করে প্রকাশ করছে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.