জসীমউদ্দীনের নাটক : লোকজ সংস্কৃতির রূপায়ণ

জসীমউদ্দীন বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তিনি উপনিবেশের স্রোতে গা না ভাসিয়ে মাটির কাছাকাছি

থাকা সাধারণ মানুষের জীবনবোধকে সাহিত্যের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শুধু কবিতায় নয়, নাট্যসাহিত্যেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য এবং স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন বাংলা নাটকে ছিল শহরকেন্দ্রিক নাগরিক জটিলতা, আধুনিকতার নামে পাশ্চাত্যরীতির অন্ধ অনুকরণ, তখন জসীমউদ্দীন কলম ধরেছিলেন বাংলার গ্রামীণ পটভূমি ও ঐতিহ্যের সাহিত্য রূপায়ণে। তাঁর রচিত নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম – পদ্মাপার (১৯৫০), বেদের মেয়ে (১৯৫১), মধুমালা (১৯৫১), পল্লীবধূ (১৯৫৬), গ্রামের মেয়ে (১৯৫৯), ওগো পুষ্পধনু (১৯৬৮), আসমান সিংহ (১৯৮৬) প্রভৃতি। নাটকগুলোতে তিনি গ্রামীণ জীবন-সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতিকে সংযুক্ত করতে চেয়েছেন।

পালা, পাঁচালি, জারি, যাত্রা, কথকতা, কীর্তন, কেচ্ছা, হাস্তর প্রভৃতি আবহমান বাংলা অঞ্চলের

নাট্য-সংস্কৃতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী এসব পরিবেশনাই বাঙালির শিল্পতৃষ্ণা মিটিয়েছে। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপীয় শাসনে ইউরোপীয় রীতির প্রবর্তন ঘটে। উপনিবেশের দীর্ঘ শাসনে তা জনপ্রিয়তাও লাভ করে। কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে ছিল বাংলার নিজস্ব রীতি। জসিমউদ্দীন তাঁর রচিত কবিতা-গানের মতো নাটকের ক্ষেত্রেও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকেই আশ্রয় করেছিলেন। তাঁর নাট্য-রচনার বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে চরিত্র, ভাষা, পরিবেশ ও উপস্থাপনরীতির সামগ্রিকতায় আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবন-সংস্কৃতিকেই ধারণ করেছিলেন। 

জসীমউদ্দীন-রচিত প্রথম নাটক পদ্মাপার। নাটকটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির মুর্শিদী, বাউল, গাজীর গান কিংবা পাঁচালির অনবদ্যতায় উপস্থাপিত। ১৯৫০ সালে নাটকটি রচনা করেন তিনি। নদীমাতৃক ভূমিতে বাঙালি যে-নমনীয় ভাবমুখর সাধকপন্থী, তা-ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এ-নাটকে। মনসামঙ্গলে যেমন নদীর বাঁকে বাঁকে জীবনাভিজ্ঞতা খোঁজা হয়েছে, এ-নাটকে রূপকাশ্রিতভাবে সাধনার পথকেই নির্দেশ করেছে। পদ্মতীরবর্তী গ্রামীণ জীবনের

ভাব-বেদনা-হাসি-কান্না ও জীবনসংস্কৃতি ফুটে উঠেছে। এটি ভাববাদী গীতিনাট্য। নাটকের দৃশ্যে –

(মোনাই সওদাগরের প্রবেশ ও গান)

নাও আনরে ভাই, নাও আনরে,

রজনী প্রভাত হইল ভাই! নাও আনরে।

নৌকাখানি খোল মাঝি ভাই তোল বাদামখানি,

হাইলের ধরিয়া কণা কান্দে গাঙের পানি

রে ভাই। নাও আনরে। …

১ম মাঝি। আমার নায় আসুন কর্তা! আমার নায় আসুন।

২য় মাঝি। আরে কর্তা। আমার নায় আসুন! আমি বাহাত্তর বচ্ছরের পাড়ি এক দণ্ডে নিয়ে যামু।

মোনাই। তোমার নৌকা কেমন? কেমন তার গঠন-গাঠন-কেমন তার চলন-চালন?

১ম মাঝি। রূপসী নদীর উপর দিয়া আমি রূপের দেশে যাই, সুন্দরী কন্যার ঘাটে তরণী ভিড়াই।

মোনাই। তোমার নৌকায় আমি চড়ুম না ভাই!

২য় মাঝি। তা ত আগেই জানতাম। এসব বড় লোক। এরা রূপের দ্যাশের চায়া রূপার দ্যাশ ভালবাসে। আসুন কর্তা আমার নায় আসুন।

গান

নদীর কূল নাই কিনারা নাইরে –

আমি কোন কূল হৈতে কোন কূলে যাব,

কাহারে শুধাইরে।

ওপারে মেঘের ঘটা

কনক বিজলী ছটা

মাঝে নদী বহে সাঁই সাঁইরে। …

অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাইরে,

আমায় ভাসাইলিরে, আমায় ডুবাইলিরে,

অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাইরে।

কূল নাই কিনার নাই, নাইকা দইরার পাড়ি।

                            [পদ্মাপার, দৃশ্য-১]

জসীমউদ্দীনের সাহিত্য-সাধনা শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে। নাটক রচনা শুরু করেছিলেন এর প্রায় ২২ বছর পর। যদিও তাঁর জীবনস্মৃতি গ্রন্থে কবিগান দেখা, কলকাতায় কবিগানের প্রদর্শন ও থিয়েটার দেখার প্রতি আশৈশব ঝোঁক থাকার নানা তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু নাটকগুলো তাঁর পূর্ণাঙ্গ পর্যায়ের রচনা। ততদিনে সাহিত্যজগতে তার রাখালী (১৯২৭), নক্সী কাঁথার মাঠ (১৯২৯), বালুচর (১৯৩০), সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩) বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। আর কবিতায় বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে উঠেছেন গ্রামীণ জীবন-সংস্কৃতির নিখুঁত চিত্রকর হিসেবে। নাটকেও সেই ধারা লক্ষণীয়। তাঁর প্রথম নাটক পদ্মাপারে

গান-অভিনয়-কাহিনি সবমিলে একাকার। লোকায়ত সংগীত ও জীবন সাধনা-সংস্কৃতিই তাঁর আরাধ্য। এমনকি পদ্মাপার নাটকের গানগুলো এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, তা গান হিসেবে আলাদাভাবেও প্রকাশিত হয়েছে। এ-গানগুলো সমকালেও জনপ্রিয়। ভাটিয়ালি ঢঙে এই গানের বিস্তার।

বেদের মেয়ে জসীমউদ্দীন-রচিত দ্বিতীয় নাটক।  এটিও গীতিনাট্যের মতোই। জানা যায়, ১৯৫১ সালে কবির এক বন্ধু পাঠোয়ারী সাহেব চাঁদপুরের মতলব থানায় পূর্ববঙ্গের বেদে নিয়ে একটি কনফারেন্সের আয়োজন করেছিলেন। এ-আয়োজন উপলক্ষে জসীমউদ্দীন বেদের মেয়ে নাটকটি রচনা করেন। পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরি গ্রন্থাকারে তা প্রকাশ করে। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে নাটকটির ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং বহুল প্রযোজনা লক্ষ করা যায়। বাংলার বেদেদের জীবনচিত্র, আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ এবং নাটকীয় বৈচিত্র্যে অনবদ্য হয়ে উঠেছে নাটকটি। নাটকটি তিনটি অঙ্ক এবং এগারোটি দৃশ্যসংবলিত। থিয়েটারে প্রথম অভিনয়  হয় ১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫ সালে ঢাকায়। অভিনয় করেন – আবদুল মতিন, আবদুল করিম, নূরুল আনাম খান, বিনয় বিশ্বাস, ওসমান খান, সোহরাব হোসেন, টি করিম, গোলাম মোস্তফা, শেখ মোহিদুল হক, মিস পিয়ারী বেগম, মিস গীতা দত্ত, মিসেস বিলকিস বারী, মিসেস বুলবুল ইসলাম, বেলা, ফেরদৌসী বেগম, রাবেয়া এবং চম্পাবতী চরিত্রে মিসেস পূর্ণিমা সেনগুপ্তা। পরিচালনায় ছিলেন আবদুল করিম।

বেদের মেয়ে নাটকের কাহিনি  এক বেদে দম্পতিকে ঘিরে; যাদের নাম চম্পাবতী ও গয়া। একদিন এক গ্রামে সাপ খেলা দেখাতে গিয়ে চম্পাবতী মোড়লের কুদৃষ্টিতে পড়ে। ধীরে ধীরে চম্পা জড়িয়ে যায় মোড়লের চক্রান্তের জালে। নিজের বেদেজাতি রক্ষার্থে নারীত্ব-স্বামী-সংসার বিসর্জন দিতে ক্রমশ মোড়লের বাধ্য হয়ে ওঠে চম্পা। চম্পাকে অসতী মনে করে গয়া। একসময় তাকে পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায় গয়া এবং বেদেবহরের আরেক বেদেকন্যা আসমানীকে বিয়ে করে। কিন্তু আসমানীকে বিয়ে করলেও গয়া মনে মনে সারাক্ষণ চম্পাকেই খুঁজে বেড়ায়। একসময় মোড়লের স্ত্রীর সহায়তায় চম্পা মুক্তি পায় – ‘পক্ষী উইড়া যাও তোমার স্বজনদের কাছে।’ বন্দিমুক্ত পাখি চম্পা উড়ে যেতে থাকে গয়া বেদের সন্ধানে। কিন্তু কোথাও খুঁজে পায় না। একদিন এক সাপ খেলায় গয়া বেদেকে বিষধর সাপ দংশন করে। গয়া বেদের মৃত্যু যখন সন্নিকটে তখন শেষবারের মতো চম্পাকে একবার দেখতে চায়। তখনই কাকতালীয়ভাবে গয়াকে খুঁজতে খুঁজতে হাজির হয় চম্পা। গয়া বেদের এমন বিষযন্ত্রণা দেখে উন্মাদিনী হয়ে ওঠে চম্পা। গয়াকে বাঁচাতে চম্পাবতী তার শরীরের বিষ নিজের শরীরে শুষে নেয়। সে জানত এতে তার মৃত্যু হবে।

বেদেজীবন নিয়ে বাংলা ভাষায় পূর্ণাঙ্গ নাটক বোধ হয় এটিই প্রথম। যদিও ত্রিশের দশকে কাজী নজরুল

ইসলাম সাপুড়ে নামে একটি চলচ্চিত্রের কাহিনি লিখেছিলেন। সে-সময় জসীমউদ্দীন-রচিত বেদের মেয়ে বাংলা নাটকের প্রচলিত ধারায় এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে। তখন দর্শক বিদেশি নাট্যকার ও কলকাতার গণনাট্যের বিজন ভট্টাচার্য, তুলসী লাহিড়ী, উৎপল দত্ত প্রমুখ দ্বারা বাঙালি আচ্ছন্ন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও বেদের মেয়ে যাত্রা ও পালানাট্যের মিশ্রিত ঢঙে বাংলার আনাচে-কানাচে প্রদর্শিত হতে থাকে। নাটকটি জনপ্রিয়তার এত শীর্ষে ছিল যে, সে-সময় অনেকেই এর বিরূপ সমালোচনা করেছেন। 

উল্লিখিত নাটকটি নানা মাধ্যমে নানাভাবে অভিনীত হয়েছে। এজন্য বেশ কয়েকবার জসীমউদ্দীন নাটকটি পরিবর্ধনও করেছেন। সে-সম্পর্কে জসীমউদ্দীন বলেন, ‘গ্রাম্য যাত্রার ঢঙে নূতন করিয়া লিখিলাম। তাই পাত্র-পাত্রীদের মুখে কতকগুলি নূতন গান জুড়িয়া দিতে হইল। … যাঁহারা থিয়েটার রূপে এই নাটক অভিনয় করিবেন তাঁহারা ইচ্ছা করিলে ঐ নতুন গানগুলি বাদ দিতে পারেন। কোন গ্রাম্য যাত্রার দল যদি এই নাটক অভিনয় করেন, তাহারা ইচ্ছা করিলে পাত্র-পাত্রীদের মুখে প্রয়োজন অনুসারে আরও নতুন গান জুড়িয়া দিতে পারেন। কেহ কেহ এই কাহিনীকে নৃত্য নাট্যে রূপ দিতে চাহিয়াছেন। সেই জন্য ইহার বহুস্থানে নৃত্যের ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে। … বাংলা এবং উর্দুতে বহুবার এই নাটকের অভিনয় হইয়াছে। গ্রাম দেশের বহুস্থানে আমার জানা অজানা বহু নাটুকে দল এই নাটকের অভিনয় করিয়াছে। গ্রামদেশে বহু নাটুকে দল রূপবান যাত্রা অভিনয় করিয়া অপূর্ব নাট্য কৌশলের পরিচয় দিয়াছেন। তাঁহারা যদি এই নাটকের অভিনয় করেন আমি সব চাইতে গৌরব বোধ করিব।’ (বেদের মেয়ে নাট্যগ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা)

জসীমউদ্দীন বেদে নারী, জীবন ও বাস্তবতার প্রাধান্যে নাটকটির নামকরণ করেছেন বেদের মেয়ে। গীতনির্ভর এ-নাটকে চরিত্রের উক্তি-প্রত্যুক্তি বা সংলাপ অনেকাংশে আবেগপ্রাধান্যে বিশ্লেষণধর্মী। ভাষার ক্ষেত্রে বেদের মেয়ে সম্পূর্ণ গ্রামীণ। এ-নাটকে বেদে নারী ও জীবনের দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও হৃদয়ক্ষরণই প্রধান। বেদেরা ইসলাম ধর্মীয় বিশ্বাস আশ্রিত। অধিকাংশ সংলাপেই ‘আল্লাহ’ ‘রাসুল’সহ ইত্যাদি শব্দ আছে। এতে বাংলার ফকিরি ও বৈষ্ণবের দৃশ্য আছে। এ-নাটকে চম্পাবতীর বিয়োগান্ত পরিণতি দর্শকের দর্শক-হৃদয় স্পর্শ করে।

অন্যদিকে জসীমউদ্দীন মধুমালা নাটকটি আবহমান বাংলার পালা নাট্যরীতির আধুনিক রূপ। প্রচলিত পালানাট্যের পরিবেশনায় যেমন একক অভিনেতা বা পালাকার থাকে, এ-নাটকে পালাকারের বর্ণনা ও সংগীতের সঙ্গে আধুনিক থিয়েটারে অভিনয়-উপযোগী চরিত্রচলন আছে। জসীমউদ্দীন এ-নাটকটিকে বিশেষিত করেছেন ‘লোকনাট্য’ শিরোনামে। বাংলার গ্রামগঞ্জে প্রচলিত রূপকথার ওপর এর কাহিনিবিন্যাস। এ-নাটকের বিষয়বস্তু যেমন বাংলার মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনি, তেমনি জসীমউদ্দীন রচনারীতির দিক থেকে পালারীতি অনুসরণে অঙ্ক বিভাজন রাখেননি। বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যবিভাজন করেছেন। রাজার কাহিনি হলেও

ভাষা-বাণী-বর্ণনায় পুরোপুরি বাংলার গ্রামীণ জীবন ও

প্রকৃতি অনুষঙ্গে। নাটকটির প্রথম থেকেই গায়েন একই সঙ্গে  কাহিনি  বর্ণনা  করেন,  গান  করেন  আর তার  পরম্পরায়

চরিত্র-সংলাপে কাহিনিকে গতিবান করেন। আবার রয়েছে চরিত্রের সংলাপ –

গায়েন : দশ হাজার লোক লোস্কর মদনকুমার করিল গমন বিরাজমান জঙলার কিনারে যেয়ে দিলো দরশন।

কোটালপুত্র : ওই হরিণ পালাল।

২য় জন : ওই বোরা যায়।

৩য় জন : আরে বাঘ – বাঘ। – লাঠি আনরে – সরকী আনরে – ধর – ধর – ধর – ধর

কোটালপুত্র : সর্বনাশ। রাজপুত্র হাতি হতে নেমে গেছে – সিংহের ঝুঁটি ধরে টেনে আনছে। ওই দেখ – সিংহের দাঁতগুলো রাজপুত্র এক থাপ্পড়ে ভেঙ্গে ফেলল।

প্রতিটি দৃশ্যের শুরুতেই গায়েন গান দিয়ে কাহিনি শুরু করেন। এমনকি চরিত্র ও কাহিনি বর্ণনায় গায়েনেরই ভূমিকা কখনো কখনো প্রধান হয়ে ওঠে। সমকালীন পালাগানের কাহিনি বর্ণনামূলক গানের মতো গানও আছে –

সাজিল সাজিল নৌকা সাজে নানা রঙের

নৌকা সাজিল রে।

প্রথমে সাজিলরে নৌকা নামে হুড়মুড়

ধপদল কেটে নৌকা করে দেয় চুর।

তারপরে সাজিল নৌকা নামেতে মাঝারি

আগা নায়ে হাট বাজার পাছা নায়ে কাঁছারি।

তারপরে সাজিল নৌকা নামেতে খরান

সেই নৌকায় রাখছে সাধু কেতাব কোরান। … ইত্যাদি

আবহমান বাংলার নাট্য-সংস্কৃতি ছিল

নৃত্য-গীত-অভিনয় নির্ভর। এই মধুমালা নাটকেও এ রূপ স্পষ্ট। মধুমালা ও মদনকুমারের পরিচয়ের সূত্রও গানে গানে –

মধুমালা : কোথায় বাড়ি কোথায় ঘর

       কী নাম তোমার মাতা পিতার, কে কুমার।

       ও তুমি বল বল কী নামটি তোমার হে।

মদন : উজানী নগরে ঘর, নামে রাজা দণ্ডধর হে কন্যা।

     ও আমি তার পুত্র নামে মদনকুমার হে।

জসীমউদ্দীন গান রচনায় যে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছেন তা বাংলা সংস্কৃতিতে বিরল। তিনি

জারি-সারি-ভাটিয়ালি-মুর্শিদি নানা আঙ্গিক ও অনুষঙ্গের গ্রামীণ সাংকেতিক অনুভূতির অনবদ্য রূপকার। তার প্রায় প্রতিটি গানই গ্রামীণ জীবনে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

জসীমউদ্দীনের পল্লীবধূ নাট্যগ্রন্থটির প্রতিটি নাটকই গ্রামবাংলার মানুষের জীবনের গভীরতর সংকটের চিত্ররূপ। এতে তিনটি নাটক আছে – পল্লীবধূ, বদল বাঁশী ও করিম খাঁর বাড়ি। গ্রন্থের ভূমিকায় জসীমউদ্দীন উল্লেখ করেছেন পল্লীবধূ নাটকটির প্লট স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে দিয়েছিলেন। নাটকটি দুটো অঙ্কে, ১১টি দৃশ্যে রচিত। প্রথম অঙ্কে চারটি দৃশ্য ও দ্বিতীয় অঙ্কে পাঁচটি দৃশ্য আছে। এ-নাটকটিও গ্রামীণ সমাজ ও জীবন অনুষঙ্গে নৃত্য-গীত-অভিনয় সহযোগে উপস্থাপিত। গ্রামের মাতব্বর ছদন মিয়ার ছেলে আজীম যখন শহর থেকে এমএ পাশ করে গ্রামে আসে তখন থেকে নাটকের আখ্যানভাগ শুরু। পিতা পুত্রের শিক্ষায় গর্বিত। গ্রামের মোড়লপনা এ-নাটকে অনবদ্য –

ছদন : আজীম! আলিম মাতবরের সঙ্গে আইজহ পাকা কথা অয়া গ্যাল।

আজীম : কিসের পাকা কথা?

ছদন : এই তোর বিয়ার। আলিম মাতবরের ম্যায়া হাসিনারে ত তুই দেখছাসই। তার লগে তোর বিয়া অবি।

আজীম : আমার বিয়ে – তার পাকা কথা হয়ে গেল। অথচ আমি এর বিন্দু-বিসর্গও জানিনে?

ছদন : তোমার জানতি অবি যেদিন তুই কলমা পড়বি। আমরা এদিকে সব ঠিকঠাক করি যেদিন তোরে পাল্কীতে উঠায়া নিয়া যাব, হে দিন অনেক উছাই আনন্দের মন্দি জানবি। আজ ঢোল নাই, বাজনা নাই, এমন দিনি তোরে তা জানাব ক্যান।

জসীমউদ্দীনের পল্লীবধূ নাটকে শহর ও গ্রামীণ জীবনের দ্বন্দ্ব যেমন আছে, তেমনি গ্রামীণ জীবনের প্রেম-ভালোবাসার দ্বন্দ্ব-রোমান্সও অনবদ্যভাবে চিত্রিত। গ্রামের মোড়লদের আধিপত্য, পণপ্রথা, বাল্যবিবাহ, কিতাবপাঠ, গ্রামীণ কাইজ্যা, গ্রামীণ মানুষের সাধ-স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষা-সংস্কৃতি অনবদ্যভাবে প্রতিভাত। নাটকের চরিত্রগুলো হলো – গ্রাম্য মোড়ল ছদন, তার এমএ পাশ করা পুত্র আজীম, ছদন মোড়লের স্ত্রী রহিমা, অন্য আরেক মোড়ল আলীম, আলীম মোড়লের কন্যা হাসিনা প্রমুখ। তাছাড়া অন্য যেসব চরিত্র পাওয়া যায় – আজহার, বছির, তমিজ, বচন মোল্লা, গৈজঞী ভূঞা, লাঠিয়াল নিজাম, ছটু প্রমুখ। এ-নাটকেও গ্রামীণ পরিবেশনারীতি স্পষ্ট।

বদল বাঁশী নাটকটি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার মতোই মুখর। এটি একাঙ্কিকা। এটিতেও পূর্বের পল্লীবধূরও প্রচ্ছদ সম্প্রসারিত ভাব লক্ষ করা যায়। পল্লী বালিকার ব্যর্থ প্রেমের আকুতি বিদ্যমান।

গীত-অভিনয়নির্ভর এ-নাটক। এটি একটি অঙ্কে ছয়টি দৃশ্যে সমাপ্ত। নাটকের মূল চরিত্র বছির ও ষোড়শী কন্যা বড়ু। মাত্র পাঁচটি চরিত্রের গ্রামীণ প্রেম-রোমান্টিকতা নির্ভর গীত-নাট্যাভিনয়।

করিম খাঁর বাড়ি একাঙ্ক নাটকেও গ্রামীণজীবন অনবদ্যভাবে চিত্রিত। এখানে গ্রামীণ জীবনের ধর্মগত বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। মাতবর, মৌলভী ও মেয়ে – তিনটি চরিত্রের পরিবেশনা এটি।

আসমান সিংহ নাটকটি জসীমউদ্দীনের মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছে। এটি প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃত নাট্যরীতির নান্দীপাঠের মতো প্রথমে নট-নটীর কথোপকথন দিয়ে শুরু। তারপর পালা আঙ্গিকের মতো বর্ণনা-বন্দনা দিয়ে নাট্যবস্তু আবর্তিত। এটি আবহমান বাংলার পালানাট্যের আধুনিক রূপ। এর মূল পালাটি ১৯২৬ সালের দিকে ফরিদপুর জেলার শিবরামপুর পোস্ট অফিসের অধীনে চাঁদপুর গ্রামের নিমাই মল্লিকের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন জসীমউদ্দীন। পরে তা থেকে ঐতিহ্যবাহী রীতির আধুনিক নাট্যনির্মাণে প্রয়াসী হন। নাটকের শুরুটা এরকম –

ওগো সখি।

ও গো সখা বলেন না শুনি।

সভার লোকে কোন কথা বলেছে?

কুন কথা বইলাছেন?

তুমি নাচ পিছ কইরাই শোধ দিয়া যাচ্ছ?

তবে আমার কি করা কর্তব্য?

তোমার আল্লা রসুলের নামে একখানা বন্দনা করা কর্তব্য।

ওগো সখা। তবে আমি তাই বলছি। (বন্দনা শুরু হয়)

আসমান সিংহ নাটকটিকে বলা যেতে পারে ঐতিহ্যবাহী পালারীতির আধুনিক নাট্যের নিরীক্ষা। এ-নাটকের চরিত্রগুলো হলো – নাটকের নায়ক আসমান সিংহ, নায়িকা হিন্দু মেয়ে দুর্গা, দুর্গার পিতা শীতল, ঘটক, ঠাকুর, নাপিত, সাহেব, খোদাই নেওয়াজ, গুরুমহাশয়, চৌকিদার, দারোগা, পিওন, জজ, নজির, জল্লাদ প্রমুখ।

জসীমউদ্দীন যে সমাজ ও সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি নাট্যরচনাতে করেছিলেন সেই গ্রামীণ জীবন-সংস্কৃতি। সে-সময়ের ঔপনিবেশিক শাসনের আধুনিক শব্দের প্রচণ্ড দাপটেও নিজের

সংস্কৃতি থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হননি। তাঁর নাটকগুলোতে নাগরিক কৃত্রিমতা ছাপিয়ে গ্রামীণ জনপদের

সহজ-সরল জীবনসংগ্রাম, প্রেম এবং গ্রামীণ কাহিনির যে সংমিশ্রণ ঘটেছে, তা বাংলা নাট্যসাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে। হাজার বছরের বাঙালির যে নাট্যপরম্পরা, তা জসীমউদ্দীনের নাট্য চেতনায় লক্ষণীয়। বাংলার গ্রামীণ জীবন, লোকবিশ্বাস,

প্রেম-বিচ্ছেদ, লোককথা, লোকসংস্কৃতি প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর নাটকগুলো গীতি-নাট্যধর্মী, গ্রামবাংলার জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি।

জসীমউদ্দীনের গান ও কবিতার মতো তাঁর নাটকের ভাষাও নমনীয়, আঞ্চলিক, শ্রুতিমধুর ও ব্যঞ্জনাধৃত। লোকজ উপাদানের ব্যবহার – বিশেষত লোকগীতি, পালাগীতি, জারি-সারি, বাউল,

লোক-পুরাণের ব্যবহার অনবদ্য। কৃত্রিম ভাষার পরিবর্তে কথ্য বাংলা ও গ্রামের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ব্যবহার করেছেন। সামাজিক নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রও ফুটে উঠেছে – মাঝি, বেদে, তাঁতি, নাপিত, জেলে, মোড়ল, কৃষক প্রভৃতি। বাংলার মাটির গন্ধ, লোকজীবনের সরলতা, বাংলার প্রকৃতি ও

নৃত্য-গীত-অভিনয়নির্ভর ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা

সংস্কৃতি এমনভাবে মিশে গেছে, তা বাঙালির দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পমাত্রাকেই চিহ্নিত করে। তাঁর কবিতার মতোই বাংলা সংস্কৃতির আত্মপরিচয়ে তাঁর নাটকগুলো দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। জসীমউদ্দীনের নাট্যচিন্তা কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, বরং তা ছিল আবহমান বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যকেই নাগরিক সমাজ বা বিশ্বের দরবারে উপস্থাপনের একটি প্রয়াস।