অনুবাদ : সম্পদ বড়ুয়া
প্রথমবার তাদের যাত্রাপথে তেমন কোনো কিছু ঘটেনি। সেটা ছিল যুদ্ধের প্রস্তুতির প্রাথমিক উন্মাদনার তেজি সেই দিনগুলো, যখন হাজার হাজার যুবককে (মাঝে মাঝে মহিলারাও ছিল) সামরিক বাহিনীর তালিকাভুক্তির কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতিদিন ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। কারণ তাদের অনেকেই তখন নতুন রাষ্ট্র গঠনের সমর্থনে অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রস্তুত থাকার তীব্র আবেগ নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছে।
দ্বিতীয়বার তারা যেখানে থামল সেটা আওকার চেক পয়েন্ট। তখন সবেমাত্র যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং দূরবর্তী উত্তরের সেক্টর থেকে তা ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভদ্রলোক অনিতশা থেকে এনুগোর পথে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে; তার একটু তাড়াও ছিল। পথে যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা আসে, বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেচনায় আদ্যোপান্ত তল্লাশি করার কথাই সে অনুমোদন করবে। তবে সত্যিই যখন তাকে কখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, আবেগের বশবর্তী হয়ে বরাবরই সে বিরক্তি প্রকাশ করে থাকে। সাধারণ মানুষ মনে করে, যদি তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদের ভেতর দিয়ে যেতে হয় তাহলে সত্যিকার অর্থে তুমি বড় কেউকেটাদের পর্যায়ে পড়ো না, তাদের সমগোত্রীয়ও নও। এরকম ধারণা স্বীকার না করে তার উপায় নেই। সাধারণত তল্লাশি বা জিজ্ঞাসাবাদের সময় সে এ-কাজটি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য গভীর কর্তৃত্বপরায়ণ কণ্ঠে উচ্চারণ করে – ‘রেজিন্যাল্ড নোয়ানকো, বিচার মন্ত্রণালয়।’ একৌশলটি প্রায়শই কাজে আসে। তবে মাঝে মাঝে অজ্ঞতা কিংবা নিছক একগুঁয়েমির কারণে চেক পয়েন্টের লোকজন তাকে খুশি মনে গ্রহণ করতে পারে না, যা এবার আওকাতে ঘটল। আসল তল্লাশির কাজটি স্থানীয় পাহারা কমিটির সদস্যদের কাছে ছেড়ে দিয়ে ভারী মার্ক-৪ রাইফেল বহনকারী দুজন কনস্টেবল রাস্তা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করছিল।
‘আমার তাড়া আছে’ – ভদ্রলোক গাড়ির কাছে আসা কর্তব্যরত মেয়েটিকে বলল, ‘আমার নাম রেজিন্যাল্ড নোয়ানকো, বিচার মন্ত্রণালয়।’
‘শুভ অপরাহ্ণ স্যার, আমি আপনার কারের পেছনে মালপত্র রাখার জায়গাটা দেখতে চাই।’
‘হায় যিশু! ওখানে কী আছে বলে আপনি ভাবছেন?’
‘আমি জানি না স্যার।’
চাপা রাগ নিয়ে লোকটা গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো, শান্ত অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে পেছনে হেঁটে এসে মালপত্র রাখার জায়গাটার ঢাকনা খুলল, তারপর বাম হাতে ঢাকনাটা ধরে রেখে ডান হাতটা এমনভাবে নামাল যেন বলছে : ঠিক আছে তো!
‘আপনি খুশি তো?’ ভদ্রলোক জানতে চাইলো।
‘হ্যাঁ স্যার, আমি কি আপনার গাড়িতে চিঠি রাখার স্থানটা দেখতে পারি?’
‘ওহ, সর্বশক্তিমান যিশু!’
‘আপনাকে দেরি করিয়ে দেওয়ার জন্য দুঃখিত স্যার, তবে আপনারাই আমাদের এসব কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছেন।’
‘কোনো অসুবিধা নেই, আপনি সঠিক কাজ করেছেন। আমার শুধু একটু তাড়া ছিল। কিছু মনে করবেন না, এখানেই গাড়ির ড্যাশবোর্ডের খুপরিটা আছে। সেখানে কিছুই নেই, আপনি দেখতে পারেন।’
‘ঠিক আছে স্যার, ওটা বন্ধ করে ফেলুন।’ এরপর মেয়েটি গাড়ির পেছনের দরজা খুলল আর আসনের নিচে তল্লাশি করার জন্য একটু নিচু হলো। তখনই ভদ্রলোক প্রথমবারের মতো তার দিকে ভালোভাবে তাকাল – পেছন দিক থেকে দেখা শুরু করল। মেয়েটা বেশ সুন্দরী, সুডৌল স্তন নিয়ে নীল জার্সিতে ওকে বেশ রূপসী মনে হচ্ছে, পরনে খাকি জিনস আর পায়ে ক্যানভাস জুতো। নতুন স্টাইলে চুলের বিনুনি করা যা তাকে একটা স্পর্ধিত চেহারা দিয়েছে। তারা একে তাদের নিজেদের কারণেই বলে – ‘বিমানবাহিনী বেস’। মেয়েটাকে তার আবছা পরিচিত মনে হচ্ছে।
‘আমি ঠিক আছি স্যার’, সব শেষে মেয়েটা বলল যার অর্থ দাঁড়ায় সে তার কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে। ‘আপনি আমাকে চিনতে পারেননি?’
‘না তো। চেনার কথা নাকি?’
‘যখন আমি মিলিশিয়াতে যোগ দেব বলে স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলাম তখন আপনি আমাকে এনুগো পর্যন্ত গাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলেন।’
‘ওহ, তাই তো, তুমি তো সেই মেয়ে। আমি তোমাকে বলেছিলাম স্কুলে ফিরে যেতে কারণ মিলিশিয়ায় মেয়েদের প্রয়োজন হবে না, বলিনি আমি? কী হয়েছিল তখন?’
‘ওরা আমাকে স্কুলে ফিরে যেতে বলেছিল, আর না হয় রেড ক্রসে যোগ দিতে।’
‘দেখো আমার কথাই ঠিক ছিল। তা তুমি এখন কী করছ?’
‘সিভিল ডিফেন্সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছি।’
‘ভালো, তোমার জন্য শুভ কামনা রইল। বিশ্বাস করো, তুমি একজন চমৎকার মেয়ে।’
সেদিনই ভদ্রলোকের মনে শেষ পর্যন্ত এ-বিশ্বাস জন্মালো যে, তাদের এই আলাপচারিতায় অবশ্যই বিপ্লবের কিছু না কিছু আছে। সে দেখেছে, এর আগেও বিপুলসংখ্যক মেয়ে আর নারী কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে গেছে কিংবা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। তবে যে-কোনো কারণেই হোক, এ-বিষয়ে সে বেশি চিন্তাভাবনা করতে সমর্থ হয়নি। তার মনে কোনো সন্দেহ নেই, মেয়েরা এবং মহিলারা এ-বিষয়গুলো খুব গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করে থাকে, তারা স্পষ্টত তাই করেছে। ছোট ছেলেমেয়েরাও একই কাজ করেছে। ওরা ড্রিল করার সময় রাস্তার এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত কুচকাওয়াজ করেছে, তাদের হাতে লাঠি শোভা পাচ্ছে। তাদের মায়েদের সাবানের বাটিকে মাথায় স্টিলের হেলমেট হিসেবে পরেছে। স্থানীয় মাধ্যমিক স্কুলের মেয়েদের একটা বড় দল ‘আমরা দুর্জয়’ লেখা একটা ব্যানার সামনে রেখে কুচাকাওয়াজ করছে – এটাই ছিল সে-সময় তার বন্ধুদের মধ্যে প্রধান হাস্যরসের বিষয়।
আওকা চেক পয়েন্টে সেই সাক্ষাতের পর ভদ্রলোক মেয়েদের নিয়ে কিংবা বিপ্লব ঘিরে কথাবার্তাকে কখনো আর অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখেনি। সোজাসুজি বলতে গেলে, সে এই যুবতী মেয়েটির মধ্যে সেই চেতনা সক্রিয় দেখেছে যেখানে মেয়েটার কর্মানুরাগ আর ন্যায়-নীতির প্রশ্নে তার নিরহঙ্কার বোধ মোটাদাগে লোকটার চপলতাকেই দোষী সাব্যস্ত করেছে। তার কথাগুলো কেমন ছিল? – ‘আপনারা আমাদের যা করতে বলেছেন তাই করছি।’ এ-কাজে মেয়েটির কোনো ব্যত্যয় হওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি এমন একজন লোককেও সে ছাড়েনি যে একবার তার উপকার করেছিল। ভদ্রলোক নিশ্চিত যে, মেয়েটা তার নিজের পিতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের শক্ত তল্লাশি চালাবে।
এ-ঘটনার নিদেনপক্ষে আঠারো মাস পরে যখন তাদের পথচলা তৃতীয় ধাপ অতিক্রম করলো তখন চারদিকের অবস্থা খুবই খারাপের দিকে চলে গেছে। শুরুর দিনগুলোতে যে একটা তেজি উন্মাদনার ভাব ছিল, দীর্ঘ সময়ের মৃত্যু আর অনাহার সেটাকে তাড়া করে ফিরছে। কিছু কিছু জায়গায় অলিখিত আত্মসমর্পণ, আবার কোথাও প্রস্তরখণ্ডের মতো শক্ত কঠিন আত্মহননের মতো অবাধ্যতা প্রকাশ পাচ্ছে। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সে-সময় অনেকেই ভালো যা কিছু চলছিল সেসব এড়িয়ে যতটুকু সম্ভব ইচ্ছামতো সব ভোগ করা ছাড়া আর কোনো কিছুতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এসব লোকের জন্য পৃথিবীতে এক অদ্ভুত স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে। সব সন্ত্রস্ত তল্লাশি স্থান অদৃশ্য হয়ে গেল। মেয়েরা আর একবার মেয়েই হয়ে গেল, ছেলেরা ছেলে। এটা ছিল একটা টানটান শক্ত অবরুদ্ধ বেপরোয়া
পৃথিবী; তথাপি এ-পৃথিবীতে কিছু ভালো, কিছু খারাপ আর অনেক বীরোচিত বিষয় আছে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ-গল্পে নিম্ন-পর্যায়ের মানুষের বেলায় ঘটেছে, যারা দূরে নির্জন রিফিউজি ক্যাম্পে স্যাঁতসেঁতে, ভেজা, ছিন্ন বস্ত্রপরিহিত অবস্থায় ক্ষুধায় কাতর হয়েও বন্দুকের আক্রমণের মুখে খালি হাতে সাহসীপূর্ণ কাজ করছে।
রেজিন্যাল্ড নোয়ানকো ওয়েরিতে থাকে। তবে সেদিন সে ত্রাণের সন্ধানে এনকেওরিতে গিয়েছিল। ওয়েরির কারিতাস থেকে সে কিছু স্টকফিশের মাথা, কিছু টিনভর্তি মাংস আর নীরস আমেরিকান কিছু দ্রব্য – যাকে ফর্মুলা-২ নামে ডাকা হয় – সেসব পেয়েছে। তার নিশ্চিত ধারণা, আমেরিকান এসব খাবার পশুপ্রাণীদের খাবার জাতীয় কিছু হবে। তবে তার মনে সবসময় একটা ধোঁয়াটে সন্দেহ রয়েছে, সে নিজে ক্যাথলিক না হওয়ায় তাকে কারিতাসের অসুবিধার বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হচ্ছে। আর তাই সে এনকেওরিতে এক পুরনো বন্ধুকে দেখতে গেল। বন্ধুটা সেখানে ডব্লিউসিসি ডিপো পরিচালনা করছে। ওখান থেকেই সে সংগ্রহ করবে অন্য জিনিসপত্র যেমন – চাল, শিম আর খাদ্যশস্য থেকে তৈরি চমৎকার সব খাবার যাকে সাধারণভাবে ‘গেবন গারি’ বলে ডাকা হয়।
ছয়টার সময় সে ওয়েরি থেকে যাত্রা শুরু করে যাতে সময়মতো ডিপোতে তার বন্ধুকে ধরতে পারে। ওখানের সবাই জানে, তার বন্ধুটা বিমান আক্রমণের ভয়ে কখনো রাত সাড়ে ৮টার পর অবস্থান করে না। সেদিন নোয়ানকোর ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। আগের দিন নতুন দ্রব্যসামগ্রীর একটা বড় চালান ডিপোতে জমা পড়েছে। মূলত আগের কয়েক রাতে অস্বাভাবিক সংখ্যক বিমান নামার কারণেই এটা হয়েছে। গাড়ির চালক যখন টিন, ব্যাগ আর কার্টনগুলো গাড়িতে তুলছিল তখন ত্রাণকেন্দ্রের চারপাশে অন্তহীনভাবে ঘোরাফেরা করা অনাহারী জনতা অভদ্র, অসৌজন্যমূলক মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছে – ‘যুদ্ধ চলতে পারে’, যার ইংরেজি করলে দাঁড়ায় ডব্লিউসিসি! কেউ একজন চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘আমি বিদ্রোহ করব।’ তার বন্ধুরা তখন উত্তর দেয়, ‘হায়রে অভাগা!’
‘আমি বিদ্রোহ করব!’
‘হায়রে অভাগা!’
‘তুমি কি তাদের সঙ্গে খাও?’
‘হায়রে অভাগা!’
‘তুমি কি তাদের সঙ্গে খাও?’
‘না!’
নোয়ানকো খুবই বিব্রতবোধ করে। এই কাকতাড়ুয়ার মতো বিশৃঙ্খল জনতার হইহুল্লোড় আর ভাসমান পাঁজরসদৃশ লোকজনের হাসিঠাট্টার জন্য এরকম বোধ করেনি, বরং লোকগুলোর বিধ্বস্ত শরীর আর কোটরাগত চোখের স্বতন্ত্র অনুযোগের কারণেই এরকম মনে হয়েছে। আসলে তারা যদি কোনো কিছুই না বলতো আর গাড়ির পেছনের জায়গাটায় দুধ, পাউডারমাখা ডিম, ওটস, টিনভর্তি মাংস আর স্টকফিশে ভরে ওঠার সময় শুধু নীরবে তাকিয়ে থাকতো, তাহলে তার মন হয়তো আরো বেশি কষ্ট পেতো। এই সর্বজনীন বিষণ্নতার মধ্যে এতসব ত্রাণসামগ্রী প্রাপ্তির অনন্য ভাগ্যগুণ অবশ্যই তাকে বিব্রত করবে। কিন্তু একজন মানুষ কী করতে পারে? তার স্ত্রী আর চার সন্তান রয়েছে; তারা অগবুর একটি প্রত্যন্ত গ্রামে থাকে। তার সংগৃহীত ত্রাণসামগ্রীর যেটুকু সে তাদের কাছে পাঠায় তার ওপরই তারা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আছে। কোয়াশিয়োকরে সে তাদের ফেলে রাখতে পারেনি। যে-কাজটা সে ভালোভাবে করতে পারে – এবং সত্যিকার অর্থে তাই করেছে – এখনকার মতো যা কিছু ত্রাণ সহায়তা সে পেয়েছে তার থেকে কিছু অংশ তার ড্রাইভার জনসনের জন্য তুলে রেখেছে। ওর স্ত্রী আর ছয় কিংবা সাত সন্তান আছে। যখন বাজারে প্রতি
সিগারেট-কাপ সিরিয়ালের দাম এক পাউন্ডে লাফিয়ে উঠছে, তখন তার বেতন মাসে মাত্র দশ পাউন্ড। এ-অবস্থায় একজন মানুষের পক্ষে ভিড়ের মধ্যে থাকা লোকজনের জন্য আদৌ কিছু করার থাকে না। সেক্ষেত্রে নিদেনপক্ষে নিকট প্রতিবেশীর কাজে আসে এমন কোনো কিছুর চেষ্টা সে করতে পারে। এটুকুই।
ওয়েরি ফেরার পথে একজন সুদর্শনা মেয়ে গাড়িতে ওঠার জন্য হাত নাড়ল। নোয়ানকো ড্রাইভারকে বলল গাড়ি থামাতে। অনেক পথচারী ধুলায় ধূসরিত আর ক্লান্ত হয়ে নানা দিক থেকে গাড়িটার দিকে হঠাৎ হামলে পড়ে। তাদের মধ্যে কিছু সামরিক কিছু বেসামরিক লোকও আছে।
‘না, না, না’, নোয়ানকো দৃঢ়কণ্ঠে বলে ওঠে – ‘ওই যুবতী মেয়েটার জন্য আমি থেমেছি। গাড়ির একটা টায়ারের অবস্থা ভালো নয়। শুধু একজন লোককে ওঠানো যাবে, দুঃখিত।’
‘বাছা আমার, একটু দয়া করো’, একরাশ হতাশা নিয়ে এক বয়স্ক মহিলা গাড়ির দরজার হাতল শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে।
‘বুড়িমা, আপনি কি মরতে চান?’ ড্রাইভার ঝাঁকি মেরে তার হাত সরিয়ে দিলো। নোয়ানকো ইতোমধ্যে একটা বই খুলে তাতেই চোখ নিবদ্ধ করে রাখে। প্রায় এক মাইল পথ সে মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি যতক্ষণ না মেয়েটা হয়তো ভাবছে গাড়ির ভেতর নীরবতা বড্ড ভারি হয়ে উঠেছে। মেয়েটা তাই বলল, ‘আপনি আজ আমাকে বাঁচালেন, ধন্যবাদ।’
‘আদৌ তা নয়, কোথায় যাচ্ছেন?’
‘ওয়েরি, আপনি কি আমাকে চিনতে পারেননি?’
‘ওহ, তাই তো, অবশ্যই চিনেছি। আমি কি বোকা … আপনি হচ্ছেন …।’
‘আমি গ্লেডিস।’
‘ঠিক তাই, মিলিশিয়া মেয়ে। তুমি বদলে গেছো, গ্লেডিস। তুমি অবশ্যই সবসময় সুন্দরী ছিলে, তবে তুমি এখন সৌন্দর্যের রানি। এখন তুমি কী করছ?’
‘আমি জ¦ালানি পরিদপ্তরে কাজ করছি।’
‘চমৎকার।’
সে ভাবল এটা চমৎকার বটে, তবে এটা আরো বেশি মর্মান্তিক। গ্লেডিসের মাথায় গাঢ়-রঞ্জিত পরচুলা, পরনে দামি স্কার্ট আর গলা দেখা যায় এমন ব্লাউজ। তার জুতো অবশ্যই গেবন থেকে কেনা, বেশ দামি বলতে হবে। সংক্ষেপে বললে, নোয়ানকো ভাবল, এ-মেয়েটি হোমরা-চোমরা কোনো ভদ্রলোকের কব্জায় রয়েছে, যারা যুদ্ধের কথা বলে অর্থের পাহাড় গড়ছে।
‘আজ আমি আমার নিয়ম ভঙ্গ করে তোমাকে গাড়িতে তুলেছি। এ-সময় আমি কাউকে লিফট দিই না।’
‘কেন?’
‘তুমি কতজন লোককে তুলতে পারবে? তার চেয়ে ভালো এ-কাজে কোনো চেষ্টাই না করা। সেই বৃদ্ধা মহিলাকে দেখো।’
‘আমি ভেবেছিলাম, আপনি তাকে তুলে নেবেন।’
নোয়ানকো এ-ব্যাপারে কিছুই বলল না। আবার একটা সময় নীরবতায় আচ্ছন্ন হলে গ্লেডিস ভাবে, ভদ্রলোক মনে হয় কষ্ট পেয়েছে। তাই সে আবার বলল, ‘আমার বেলায় নিয়ম ভঙ্গ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’ গ্লেডিস তার মুখটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে এবং একপর্যায়ে চোখটা সরিয়ে নেয়। ভদ্রলোক মুচকি হেসে একটু সরে এসে মেয়েটার কোলে মৃদু টোকা মারল।
‘ওয়েরিতে তুমি কী করতে যাচ্ছো?’
‘আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করবো।’
‘বান্ধবী? ঠিক তো?’
‘কেন নয়? … যদি আমাকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দেন আপনি নিজেই তাকে দেখতে পাবেন। আমি শুধু বিধাতার কাছে প্রার্থনা করছি সে যেন আজ সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে কোথাও না যায়, গেলে সমস্যা হয়ে যাবে।’
‘কেন?’
‘কারণ সে যদি বাড়িতে না থাকে, আমাকে আজ রাস্তায় ঘুমাতে হবে।’
‘আমি প্রার্থনা করি, সে যেন বাড়িতে না থাকে।’
‘কেন?’
‘সে বাড়িতে না থাকলে আমি তোমাকে থাকা এবং প্রাতরাশের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারি। … ওটা কী হলো?’ সে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল যখন ও গাড়িটাকে একটা উঁচু খাড়া জায়গায় এসে থামিয়ে দিলো। উত্তর জানার আর কোনো প্রয়োজন হলো না। সামনে ছোটখাটো লোকজনের ভিড় যারা ওপরের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনজনই হামাগুড়ি দিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে আর টলতে টলতে পাশে ঝোপের দিকে এগিয়ে যায়, ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে আকাশে কী যেন খুঁজতে থাকে! আসলে সতর্কবার্তাটা ভুল ছিল। আকাশ একেবারে নীরব আর পরিষ্কার। শুধু দুটো শকুন অনেক ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে একজন রসিক লোক শকুন দুটোকে ফাইটার আর বোম্বার বলে ডাক দিলো আর সবাই স্বস্তিতে হাসতে লাগল। ওরা তিনজনই আবার গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু করল।
‘আক্রমণ করার জন্য এ-সময়টা বড্ড আগে হয়ে যাবে’, নোয়ানকো গ্লেডিসকে লক্ষ করে বলল। মেয়েটার হাতের দুটো তালুই বুকের মধ্যে ধরা যেন দুম দুম করা হৃদপিণ্ডকে শান্ত করছে। ‘১০টার আগে তারা সচরাচর আসে না।’
ভয় পেয়ে মেয়েটা একেবারে চুপ হয়ে আছে। নোয়ানকো তৎক্ষণাৎ এই সুযোগটা নিল।
‘তোমার বান্ধবী কোথায় থাকে?’
‘২৫০ ডগলাস রোড।’
‘ওহ! ওটা তো একেবারে শহরের প্রাণকেন্দ্রে – একটা ভয়ানক জায়গা। বাংকার নেই, কিছু নেই। আমি তোমাকে সন্ধে ৬টার আগে সেখানে যেতে পরামর্শ দেবো না; স্থানটা নিরাপদ নয়। যদি কিছু মনে না করো, তোমাকে আমার ওখানে নিয়ে যেতে পারি, সেখানে একটা ভালো বাংকার আছে। তারপর ৬টার দিকে যখন সবকিছু নিরাপদ মনে হবে, আমি গাড়ি নিয়ে তোমার বান্ধবীর কাছে দিয়ে আসবো। প্রস্তাবটা কেমন হলো বলো?’
‘ঠিক আছে’, নিষ্প্রাণ কণ্ঠে সে বলল, ‘আসলে এসবের কারণে এতো ভয় পেয়েছি। এজন্যেই ওয়েরিতে কাজের প্রস্তাব আমি প্রত্যাখ্যান করেছি। আজকে আমাকে কে যে বের হতে বলেছিল সেটাই আমি জানি না।’
‘তুমি ভালোই থাকবে। আমরা এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’
‘কিন্তু আপনার পরিবার কি আপনার সঙ্গে থাকে?’
‘না’, সে বলল, ‘কেউ সেখানে পরিবার রাখে না। আমরা বলি, এয়ার রেইডের কারণে এটা হয়েছে, তবে আমি তোমাকে আশ্বস্ত করছি, সেখানে আরো ভালো কিছু আছে। ওয়েরি সত্যিই একটা প্রাণবন্ত শহর আর আমরা সেখানে উচ্ছ্বল অবিবাহিত পুরুষের জীবন যাপন করছি।’
‘এটাই আমি শুনেছি।’
‘শুধু শুনবে কেন, আজ দেখবে। আমি তোমাকে একটা সত্যিকারের বিনোদন পার্টিতে নিয়ে যাবো। আমার এক বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল, তার একটা জন্মদিনের পার্টি আছে। সে-পার্টিতে সাউন্ড স্ম্যাশারকে ভাড়া করেছে। আমি নিশ্চিত তোমার ভালো লাগবে।’
কথা বলার পরপরই নিজের কাছে অতিশয় লজ্জা পেল। পার্টি আর বিনোদনের নামে ছ্যাবলামি বরাবরই সে ঘৃণা করে, অথচ তার বন্ধুরা জলে ডোবা মানুষের মতো এসবকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। তবে এসবের প্রতি এত জোরে সমর্থন দেওয়ার কারণ সে একটা মেয়েকে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যেতে চায়! আর এই মেয়েটারও একসময় যুদ্ধের ওপর চমৎকার বিশ্বাস ছিল এবং পরে তার মতো কিছু মানুষের দ্বারা সে প্রতারিত হয়েছিল
(এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই)। মন খারাপ করে সে মাথা ঝাঁকাল।
‘কী হলো?’ গ্লেডিস জিজ্ঞেস করে।
‘কিছু না, শুধু ভাবছিলাম।’
ওয়েরি যাওয়ার বাকি পথটাতে তারা মূলত নীরবতাই পালন করল। বাড়িতে পৌঁছে গ্লেডিস খুব দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিল, যেন সে এই ভদ্রলোকের নিয়মিত বান্ধবী। কাপড় বদলিয়ে ঘরের পোশাক পরে লালচে বাদামি পরচুলাটা যথাস্থানে রেখে দিলো।
‘তোমার মাথার চুল তো দেখতে বেশ। কেন তুমি পরচুলায় তা ঢেকে রাখো?’
‘ধন্যবাদ’, গ্লেডিস বলল। তবে কিছুক্ষণের জন্য লোকটির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, ‘মানুষ হচ্ছে কৌতুকপ্রিয়।’
‘তুমি এ-কথা বললে কেন?’
‘তুমি এখন একজন সৌন্দর্যের রানি’, মেয়েটা তামাশা করে তার কথাই নকল করল।
‘ওহ, তাই! আমি কথাটার প্রতিটি শব্দই কিন্তু বিশ্বাস করি।’ লোকটা এবার মেয়েটাকে তার কাছে টেনে নিয়ে চুমু খেল। মেয়েটা বাধা দিলো না, পুরোপুরি আত্মসমর্পণও করেনি। অবশ্য কোনো কিছুর শুরুতে এ-ধরনের আচরণকে নোয়ানকো পছন্দ করে। এরকম দিনগুলোতে অনেক মেয়ে সহজেই খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কেউ কেউ একে নাম দিয়েছে যুদ্ধকাতরতা।
কিছুক্ষণ পর নোয়ানকো গাড়ি চালিয়ে অল্পসময়ের জন্য অফিসে চলে যায়। গ্লেডিস রান্নাঘরে ছেলেটাকে মধ্যাহ্নভোজ প্রস্তুতির কাজে সহায়তা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আক্ষরিক অর্থেই অফিসে অল্প সময়ের জন্য মানে আধা ঘণ্টার মধ্যে সে ফিরে এলো। হাত দুটো কচলাতে কচলাতে বলল, তার সুন্দরী রানিকে দূরে রেখে সে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না।
দুপুরে খেতে বসলে গ্লেডিস বলল, ‘আপনার ফ্রিজে তো কিছুই নেই।’
‘কী রকম?’ কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়ে সে জানতে চাইল।
‘যেমন মাংস’, মেয়েটা নির্ভয়ে উত্তর দিলো।
‘তুমি কি এখনো মাংস খাও?’ তার কণ্ঠে কিছুটা তেজি ভাব।
‘আমি কেন? আপনার মতো বড় বড় লোক তো খায়।’
‘বড় লোক বলতে তোমার ধারণায় কারা আছে জানি না। তবে তারা আমার মতো নয়। আমি শত্রুর সঙ্গে ব্যবসা করে কিংবা ত্রাণসামগ্রী বিক্রি করে টাকা বানাই না কিংবা …’
‘অগাস্টার ছেলেবন্ধুটাও ও-কাজ করে না, সে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা হাতিয়ে নেয়।’
‘সে পায় কীভাবে? সরকারের সঙ্গে নিশ্চয়ই সে জোচ্চুরি করে – এভাবেই সে বৈদেশিক মুদ্রা পায়, এভাবেই করে – সে যেই হোক। প্রসঙ্গক্রমে বলছি, অগাস্টা কে?’
‘আমার বান্ধবী।’
‘তাই বলো।’
‘শেষবার সে আমাকে তিন ডলার দিয়েছিল। আমি সেটা ভাঙিয়ে পঁয়তাল্লিশ পাউন্ড পেয়েছি। তার কাছে আসা লোকটা তাকে পঞ্চাশ ডলার দিয়েছিল।’
‘ভালো, প্রিয় বালিকা আমার। আমি বিদেশি মুদ্রার ব্যবসা করি না আর ফ্রিজে আমার মাংসও থাকে না। আমরা একটা যুদ্ধে লিপ্ত আছি। আমি জানতে পেরেছি, কিছু কম বয়সী ছেলে রণক্ষেত্রে প্রতি তিনদিনে একবার খাবার আর পানি পাচ্ছে।’
‘এটা সত্য’, মেয়েটা সহজভাবে বলল। ‘কেউ খেটে মরবে আর অন্যজন লাভবান হবে।’
‘এটা শুধু তা নয়, এর চেয়েও খারাপ।’ নোয়ানকো বলল, তার গলা কাঁপতে শুরু করেছে, ‘প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। আমরা এখন কথা বলছি আর এ-সময়ে কেউ একজন মরছে।’
‘এটা ঠিক বলেছেন’, মেয়েটা আবার বলল।
‘প্লেন!’ রান্নাঘর থেকে ছেলেটা চিৎকার করে ওঠে।
‘মাগো!’ গ্লেডিস চিৎকার দিলো। মাথা হাত দিয়ে ঢেকে তারা যখন কিছুটা নিচু হয়ে তালগাছের খুঁটি আর লাল মাটির তৈরি বাংকারে দ্রুত দৌড়াচ্ছিল তখন জেট বিমান আর দেশে তৈরি অ্যান্টি-এয়ারক্র্যাফট রকেটের বিকট শব্দে পুরো আকাশ বিদীর্ণ হচ্ছিল।
বিমানটা চলে গেলে দেরিতে শুরু হওয়া বন্দুকগুলোর শব্দ শেষকালে আবার নিস্তেজ হওয়ার পরও গ্লেডিস বাংকারের ভেতর নোয়ানকোকে দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরে রাখল।
‘ওটা শুধু অতিক্রম করে যাচ্ছে’ – সে মেয়েটিকে বলল, তার গলা একটু কাঁপছে। ‘প্লেনটা কোনো কিছু নিচে ফেলেনি, ওটার গতিপথ দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। সম্ভবত আমাদের লোকজন তাদের চাপে রাখছে। তারা সবসময় তাই করে। যখনই আমাদের ছেলেরা তাদের চাপ দেয় তারা রাশিয়ান আর মিশরীয়দের প্লেন নিয়ে আসার জন্য এসওএস পাঠায়।’ এবার সে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিল।
মেয়েটা কিছুই বলল না, শুধু নোয়ানকোকে জড়িয়ে ধরে রাখল। তারা শুনতে পাচ্ছে বাড়ির ছেলেটা পাশের বাড়ির চাকরটাকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলছে – আকাশে দুটো প্লেন ছিল। একটা এভাবে অন্যটা ওইভাবে শূন্যে ডুব দিলো।
‘আমি তাদের পরিষ্কার দেখতে পেয়েছি’ – অন্যজন একই উত্তেজনা নিয়ে বলল। ‘আমি দেখিনি বললে তারা না দেখার জন্য মানুষকে মেরে ফেলতে পারে, হায় বিধাতা!’
‘চিন্তা করো!’ অবশেষে গ্লেডিসের গলা শোনা গেল। নোয়ানকো ভাবলো মেয়েটা কিছু শব্দ বা শুধু একটি শব্দ দিয়ে কোনো বিষয় বোঝানোর সব স্তর পার করেছে। এখন তাৎক্ষণিকভাবে তার বিস্ময় প্রকাশ আর একই সঙ্গে কোনোরূপ শ্রদ্ধাবোধ দেখানোর অনিচ্ছার কারণে সম্ভবত এই লোকগুলোর প্রতি তিরস্কার প্রকাশ পাচ্ছে, যারা মৃত্যুকে ডেকে আনা লোকদের কত হালকাভাবে নিয়েছে।
‘এত ভয় পেয়ো না,’ লোকটা বলল। মেয়েটা এবার তার আরো কাছে ঘেঁষে আসলে সে তাকে চুমু খেতে শুরু করে আর স্তন দুটোকে ঠেসে ধরে থাকে। মেয়েটাও ধীরে ধীরে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করে। বাংকারটি ছিল অন্ধকার, ঝাড়ু দেওয়া হয়নি আর সেটা নিশ্চয়ই বুকে ভর দিয়ে চলা পোকামাকড়দের আবাসস্থল। মূল বাড়ি থেকে একটা মাদুর আনার কথা সে ভেবেছিল; কিন্তু শেষে অনীহার কারণে সে-সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। আরেকটা প্লেন উড়ে গেল আর এতে কোনো একজন প্রতিবেশী কিংবা কোনো পথচারীর ওপর তা আছড়ে পড়তে পারে। তবে এ-ধরনের প্লেনের আগমন অন্য যে-কোনো এয়ার-রেইডের চেয়ে কিছুটা স্বস্তিদায়ক, কারণ এয়ার রেইডের ফলে এক ভদ্রলোককে দিনের আলোয় পুরোপুরি নগ্ন অবস্থায় শোবার ঘর থেকে বাংকারের দিকে দৌড়ে যেতে দেখা গেছে আর তাকে এক মহিলা একই অবস্থায় একইভাবে অনুসরণ করেছে!
গ্লেডিসের যে-ভয়টা ছিল তাই হলো, তার বান্ধবী শহরে নেই। মনে হচ্ছে, ওই বান্ধবীর প্রভাবশালী পুরুষবন্ধু চাতুরী খাটিয়ে কেনাকাটার জন্য তাকে লিব্রেভিল যাওয়ার ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। মহিলার প্রতিবেশীরা এরকম ধারণাই পোষণ করে।
‘চমৎকার!’ তারা যখন গাড়িতে ফিরছিল, তখন নোয়ানকো বলে উঠল। ‘যুদ্ধাস্ত্রের প্লেনে আপনার বান্ধবীটা ফিরে আসবে যেখানে ভরা থাকবে জুতো, পরচুলা, প্যান্ট, ব্রা, কসমেটিকস – এ-ধরনের জিনিস যা মেয়েটা বিক্রি করে দেবে আর হাজার হাজার পাউন্ড আয় করবে। তোমরা মেয়েরা সত্যিই যুদ্ধে আছো, তাই না?’
গ্লেডিস কিছুই বলল না। নোয়ানকো ভাবলো, শেষ পর্যন্ত সে মেয়েটার কাছে পৌঁছাতে পেরেছে। হঠাৎ মেয়েটা বলে ওঠে, ‘আপনারা পুরুষরা তো চান যে, এটাই যেন আমরা করি।’
‘ঠিক আছে’, লোকটা বলল, ‘এখানে একজন পুরুষ আছে যে তোমাকে সে-কাজটা করতে দিতে চায় না। তোমার কি খাকি জিনস পরা সেই মেয়েটাকে মনে পড়ে, যে চেক পয়েন্টে কোনোরূপ করুণা না দেখিয়ে আমাকে তল্লাশি করেছিল?’
মেয়েটি হাসতে শুরু করে।
‘সেই মেয়েকে আমি আবার তোমার মধ্যে দেখতে চাই। তার কথা তোমার মনে আছে? কোনো পরচুলা নেই। তার কানে কোনো রিং ছিল কি না আমার মনে পড়ে না …।’
‘হায় কী বলবো … আমার কানে রিং ছিল।’
‘ঠিক আছে। তবে তুমি জানো আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি।’
‘ওই সময় পার হয়ে গেছে। এখন প্রত্যেকেই চায় টিকে থাকতে। তারা এটাকে বলে নম্বর-৬। তুমি তোমার নম্বর-৬ রাখো, আমি আমারটা রাখছি। সবকিছু ঠিক আছে।’
লেফটেন্যান্ট কর্নেলের পার্টিটা একসময় অনেকটা অপ্রত্যাশিত রূপ ধারণ করল। এর আগে সবকিছু ভালোভাবেই চলছিল। খাসির মাংস, কিছু মুরগির মাংস, ভাত, ঘরে বানানো প্রচুর কড়া মদ পরিবেশন করা হয়েছে। শুধু ‘ট্রেসার’ উপনামে একটা উত্তেজক ব্র্যান্ড আছে যেটা গলা দিয়ে নামার সময় আগুনের হলকা পাঠায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওই ব্র্যান্ডের বোতলটার দিকে তাকালে ওটার কমলা রঙের পানীয়ের মতো একটা নিষ্পাপ চেহারা ফুটে ওঠে। তবে যে-জিনিসটা সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ছড়াবে সেটা হচ্ছে রুটি – প্রত্যেকের জন্য একটা ছোট রোল! এটার আকার গলফ খেলার বলের মতো, এর সঙ্গে পূর্বাপর মিলও রয়েছে! তবে এটা সত্যিকার অর্থেই একটা রুটি। গানের যে দলটা এসেছে সেটাও ভালো, সেখানে অনেক মেয়ে আছে। পুরো অনুষ্ঠানকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য দুজন শ্বেতাঙ্গ রেড ক্রসের লোক এক বোতল কোরভইসার আর এক বোতল স্কচ নিয়ে দ্রুত হাজির হলো। পার্টি তাদের দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করল এবং তার পরপরই ওসবের এক ফোঁটা পাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে দিলো। এ অবস্থায় শ্বেতাঙ্গ একজন তার সাধারণ আচরণকে দূরে ঠেলে দিলো; সম্ভবত সে ইতোমধ্যে অনেক বেশি পান করে ফেলেছে। এর কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, সে এমন একজন পাইলটকে ভালো করেই চিনত যে গত রাতে এয়ারপোর্টে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ত্রাণসামগ্রীর একটা বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছে। তখন পর্যন্ত পার্টিতে খুব কম লোকই প্লেন দুর্ঘটনার খবরটা শুনেছে। সুতরাং সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে বাতাস বেদনায় ভারি হতে শুরু করেছে। নৃত্যরত কিছু যুগল পেছনে ফিরে গিয়ে সিটে বসে পড়ল, ব্যান্ড সংগীতও থেমে গেল। তারপর কোনো এক অদ্ভুত কারণে সেই মাতাল রেড ক্রসের লোকটা হঠাৎ তীব্র আবেগে ফেটে পড়ে।
‘কেন একজন লোক, একজন ভদ্রলোক তার জীবন বিসর্জন দেয়? কোনো কারণ ছাড়া! চার্লির মরে যাওয়ার কথা ছিল না। এই তীব্র কটু গন্ধময় স্থানের জন্য নয়। হ্যাঁ, প্রত্যেক কিছু এখানে গন্ধ ছড়ায়। এমনকি এসব মেয়ে, যারা এখানে এসেছে, সবাই সযত্নে সাজপোশাক পরেছে আর হাসছে, তাদের মূল্য কী! আমি কি জানি না? স্টকফিশের একটা মাথা, সেটাই সব কিংবা আমেরিকান এক ডলার আর এর জন্য তারা হুড়মুড় করে বিছানায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।’
এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পর ভীতিজনক নীরবতার মধ্যে যুবক কর্মকর্তাদের একজন হেঁটে রেড ক্রস লোকটার কাছে গিয়ে তাকে তিনটা বজ্রতুল্য চপেটাঘাত মারল – ডান! বাঁ! ডান – চেয়ার থেকে তাকে টেনে তুলল (সেখানে পরিবেশটা তার চোখের জলের মতো) আর জোরে ধাক্কা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলো। তার বন্ধু, যে তাকে কথা থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল, সে তাকে অনুসরণ করে বাইরে চলে এলো। নীরব পার্টি শুনল তারা দুজনই গাড়ি চালিয়ে নিষ্ক্রান্ত হয়েছে। এ-কাজ যে করেছে সেই যুবক অফিসার হাতের ধুলো ঝেড়ে পার্টিতে ফিরে এলো।
‘জানোয়ার কোথাকার’ – সম্মোহিত নিরুত্তাপ কণ্ঠে অফিসারটি বলল। পার্টির সব মেয়ে তার দিকে এমনভাবে চোখ রাখল যেন তারা তাকে একজন সত্যিকারের পুরুষ আর বীর বলে গণ্য করেছে।
‘আপনি কি ওই অফিসারকে চেনেন?’ গ্লেডিস জিজ্ঞেস করে নোয়ানকোকে।
সে কোনো উত্তর দিলো না। তার পরিবর্তে সে সাধারণভাবে পার্টিকে অবহিত করলো, ‘লোকটি নিশ্চিতভাবে একজন মদ্যপ।’
‘আমি এসব তোয়াক্কা করি না’, অফিসারটি বললো, ‘যখন একজন লোক মদে ডুবে যায়, তখন তার মনে যা আছে সেটাই সে বলে।’
‘সুতরাং তার মনে যেটা ছিল সেটার জন্য তুমি তাকে মেরেছ’, পার্টি যে দিয়েছে সে মন্তব্য করল, ‘সেটাই হচ্ছে মনের চালিকাশক্তি, ঠিক তো, জো।’
‘ধন্যবাদ স্যার’, স্যালুট করে জো বলল।
‘তার নাম জো’ – গ্লেডিস আর তার বাঁ পাশে বসা মেয়েটা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে একসঙ্গে বলে ওঠে।
একই সময়ে নোয়ানকো এবং তার অপর পাশে থাকা তার এক বন্ধু খুব শান্তভাবে ধীরলয়ে বলল, যদিও রেড ক্রসের লোকটির ব্যবহার অমার্জিত আর আক্রমণাত্মক ছিল তথাপি মেয়েদের সম্পর্কে সে যা বলেছে দুঃখজনক হলেও তা তিক্ত সত্য। তবে এ-কথা বলার জন্য সে ছিল একজন ভুল লোক।
যখন আবার নাচ শুরু হলো ক্যাপ্টেন জো নাচার জন্য গ্লেডিসের কাছে চলে এলো। লোকটার মুখ থেকে কথা বের হওয়ার আগেই মেয়েটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো। তখনি তার মনে পড়ে যাওয়ায় সে নোয়ানকোর অনুমতির জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। ক্যাপ্টেনও একই সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন।’
‘চালিয়ে যাও’, তাদের দুজনের মাঝখানে কোথাও একটা জায়গায় তাকিয়ে নোয়ানকো বলল।
এটা ছিল একটা দীর্ঘ নাচ এবং সে নিজে অংশগ্রহণ না করে চোখ দিয়ে তাদের অনুসরণ করতে থাকে।
হঠাৎ একটা ত্রাণসামগ্রী বহনকারী প্লেন মাথার ওপর দিয়ে পার হচ্ছিল আর কেউ একজন তাৎক্ষণিকভাবে সব আলো নিভিয়ে দিলো। বলল, এটা অনুপ্রবেশকারী হতে পারে। তবে অন্ধকারে নাচা এবং মেয়েদের ফিকফিকিয়ে হাসানোর জন্য এটা একটা ছুতো হতে পারে, কারণ অনুপ্রবেশকারী বিমানের শব্দ সবার কাছেই পরিচিত।
গ্লেডিস এবার বেশ আত্মসচেতনতার ভাব নিয়ে ফিরে এসে নোয়ানকোকে তার সঙ্গে নাচার প্রস্তাব করল। কিন্তু সে নাচতে রাজি নয়। ‘আমাকে এ ব্যাপারে বিরক্ত করো না’ – সে বলল, ‘আমি এখানে বসে তোমাদের নাচ ভালোই উপভোগ করছি।’
‘তাহলে চলুন ফিরে যাই,’ মেয়েটা বলল, ‘আপনি যখন নাচতে চাইছেন না।’
‘কিন্তু আমি তো কখনো নাচি না, বিশ্বাস করো, তুমি তোমার মতো করে আনন্দ করো।’
গ্লেডিস এরপর লেফটেন্যান্ট কর্নেলের সঙ্গে নাচল এবং আবার নাচল ক্যাপ্টেন জো’র সঙ্গে। তারপর নোয়ানকো তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে রাজি হলো।
‘আমি দুঃখিত, আমি নাচ করি না’, গাড়িতে যেতে যেতে সে বলল। ‘তবে আমি প্রতিজ্ঞা করছি, যতদিন এ যুদ্ধ চলবে ততদিন আমি নাচব না।’
মেয়েটা কোনো কিছু বলল না।
‘গত রাতে মারা যাওয়া পাইলট লোকটার মতো মানুষের কথা ভাবছি। আজকের ঝগড়ার মধ্যে যাই হোক তার তো কোনো হাত ছিল না। তার সব চিন্তা ছিল আমাদের জন্য খাবার আনা …।’
‘আমার মনে হয় পাইলটের বন্ধুটা তার মতো হয়নি’, গ্লেডিস বলল।
‘বন্ধুর মৃত্যুতে লোকটা বেশ বিপর্যস্ত হয়েছিল। তবে আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, তার মতো লোকজন মারা যাচ্ছে আর আমাদের ছেলেরা কষ্ট পাচ্ছে, যুদ্ধের মাঠে প্রাণ দিচ্ছে। আমি বুঝি না কেন আমরা পার্টি আর নাচের আয়োজন করে চারপাশে গোল হয়ে বসে থাকি।’
‘আপনি আমাকে সেখানে নিয়ে গেছেন’, চূড়ান্ত প্রতিরোধ হিসেবে মেয়েটি বলল। ‘তারা আপনার বন্ধু। আমি তাদের আগে চিনতাম না।’
‘দেখো প্রিয়ে, আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। আমি শুধু বলছি কেন আমি ব্যক্তিগতভাবে নাচতে ইচ্ছুক নই। যাই হোক, এখন আমরা বিষয় পরিবর্তন করি … তুমি কি এখনো বলো যে আগামীকাল তুমি ফিরে যেতে চাও? আমার ড্রাইভার সোমবার সকালে একটু আগেভাগে তোমাকে কাজে যাওয়ার জন্য নিয়ে যেতে পারে। না? ঠিক আছে; তোমার যা ইচ্ছে। তুমি হচ্ছো আমার বস।’
মহিলা তার উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে লোকটাকে একটা ভালোই ধাক্কা দিলো যার মাধ্যমে এবং কথাবার্তায় সে লোকটাকে বিছানা পর্যন্ত অনুসরণ করলো। ‘তুমি কামানের গোলাবর্ষণ করতে চাও?’ মেয়েটা জিজ্ঞেস করে আর উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই বলল, ‘এগিয়ে যাও, তবে সৈন্যবাহিনী ঢেলে দিও না।’ লোকটাও তার সৈন্যদলকে ঢেলে দিতে চায় না, আর তাই সব ঠিকঠাক মতোই হয়েছে। তবে মেয়েটা এ-বিষয়ে দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি চায়, যা সে তাকে দেখালো।
অনেকগুলো কৌশলগত মিতব্যয়িতার মধ্যে একটা জিনিস যুদ্ধ শিখিয়েছে আর সেটা হচ্ছে, রাবার কনডম বারবার ব্যবহার করা। সেক্ষেত্রে আপনাকে যা করতে হবে, ওটাকে ভালো করে ধুয়ে ফেলা, শুকিয়ে ওর ওপর আচ্ছা করে ট্যালকম পাউডার ঝেড়ে দেওয়া, যাতে আটার মতো লেগে না থাকে। তখন এটাকে বেশ নতুনের মতো মনে হবে। এটা নিশ্চয়ই আসল ব্রিটিশের তৈরি যদিও মাঝে মাঝে তারা লিসবন থেকে সস্তা ধরনের কনডম কেনে, যা হারমাটান ঋতুতে শুকনো কোকোয়াম পাতার মতো প্রায় শক্ত হয়ে যায়।
লোকটা শারীরিক সুখ গ্রহণ করলেও মেয়েটাকে বাতিলের খাতায় তুলে রাখে। সে ভাবে, একজন যৌনকর্মীর সঙ্গে সে শুয়েছে। এখন তার কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার, সে কোনো একজন আর্মি অফিসারের রক্ষিতা। মাত্র দু-বছরের কম সময়ের মধ্যে কী ভয়ানক পরিবর্তন!
এটা কি আসলেই একটা অলৌকিক ব্যাপার নয় যে, মেয়েটা এখনো অন্য জীবনের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে, যেখানে সে কি তার নিজের নাম মনে রাখতে পেরেছে? যদি সেই মদ্যপ রেড ক্রস লোকটার ঘটনা আবার এখন ঘটত, নোয়ানকো নিজেকেই বলল, সেক্ষেত্রে সে ওই লোকটার পাশে গিয়ে দাঁড়াতো এবং পার্টিতে বলতো, এখানে একজন সত্যবাদী লোক আছে। একটা পুরো প্রজন্মের ওপর কী ভয়ানক ভাগ্যলিখন নেমে এসেছে! আগামীদিনের মায়েদের ওপর!
সকালবেলা নোয়ানকো ভাবছে নিজের বিচারবুদ্ধিতে সে বেশ উদারতার পরিচয় দিয়েছে, আগের চেয়ে একটু ভালো বোধ করছে। সে ভাবে, গ্লেডিস হচ্ছে একটা আয়না যেখানে সমাজের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে – সেই সমাজ যা পুরোপুরি পচে গেছে আর এর কেন্দ্রে ভর করেছে কীট। আয়নাটা ঠিকই আছে, তবে সেখানে অনেক নোংরা দাগ। আর কিছু না, এখন যা দরকার তা হলো একটা পরিষ্কার ডাস্টার বা ঝাড়ন। ‘মেয়েটার প্রতি আমার একটা দায়িত্ব আছে’ – সে নিজেকেই কথাগুলো বলল, ‘মেয়েটা একসময় আমার কাছে আমাদের চারপাশের পরিস্থিতির কথা প্রকাশ করেছিল। এখন কিছু মারাত্মক প্রভাবের কারণে সে বিপদে আছে।’
নোয়ানকো এই প্রাণঘাতী প্রভাবের একেবারে তলা পর্যন্ত অনুসন্ধান করতে চায়। অগাস্টা কিংবা তার নাম যাই হোক না কেন, সে তার সুসময়ের বান্ধবী নয়। পুরো ঘটনার মাঝখানে কোনো একজন লোক আছে, সম্ভবত এসব হৃদয়হীন যুদ্ধব্যবসায়ী লোকদের একজন যে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের কাজে লিপ্ত হয়ে শত শত হাজার হাজার টাকা বানাচ্ছে, শত্রুরেখার পেছনে সিগারেটের বিনিময়ে লুণ্ঠিত মালামাল বেচাকেনা করতে ঝুঁকি নিয়ে যুবকদের বাজে কাজে পাঠাচ্ছে। কিংবা কোনো এক কনট্রাক্টর সেনাসদস্যদের কিছুই সরবরাহ না করে প্রতিদিন খাবারের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নিচ্ছে। আরো বলতে গেলে কিছু বিশ্রী আর ভীতু সামরিক অফিসার আছে যারা ব্যারাকে নোংরা অশ্লীল কথাবার্তা বলে আর বীরত্বের কাল্পনিক গল্প ফাঁদে। সে ঠিক করল, এ-বিষয়টি খুঁজে বের করবে। গত রাতে সে ভেবেছিল মেয়েটাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য তার ড্রাইভারকে একা পাঠাবে। কিন্তু না, সে নিজেই যাবে আর নিজের চোখে দেখবে মেয়েটা কোথায় থাকে। কিছু একটা বের হয়ে আসবেই আসবে। এমন কিছু উঠে আসবে যার ওপর সে তার বাকি করণীয় নির্ধারণ করতে পারবে। সে যখন এ-যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন মেয়েটার প্রতি তার মনোভাব প্রতি মুহূর্তে সদয় হয়ে আসছে। যেসব খাবার আগের দিন ত্রাণকেন্দ্র থেকে গ্রহণ করেছে সেগুলোর অর্ধেক খাবার সে মেয়েটার জন্য জড়ো করে রেখেছে। ব্যাপারটা বেশ কঠিন। সে ভাবলো, মেয়েটার যেহেতু খাবার দরকার, তাই তাকে ছাড় দেওয়া যায়। তবে পুরোপুরি না। ডব্লিউসিসিতে সে তার বন্ধুর সঙ্গে একটা ব্যবস্থা রাখবে যাতে প্রতি পাক্ষিকে মেয়েটার কাছে কিছু ত্রাণ পাঠানো হয়।
উপহারসামগ্রী দেখে গ্লেডিসের চোখে পানি নেমে এলো। নোয়ানকোর কাছে তেমন ক্যাশ টাকা ছিল না, তবে যা ছিল সব জড়ো করে বিশ পাউন্ড সে মেয়েটার হাতে তুলে দিলো।
‘আমার কোনো বিদেশি মুদ্রা নেই, আর আমি জানি এটা দিয়ে আদৌ বেশি দূর টেকা যাবে না, তথাপি …।’
মেয়েটা এসে নিজেকে নোয়ানকোর কাছে সমর্পণ করল, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। লোকটা তার ঠোঁট আর চোখে চুমু খেল আর গোটা পরিস্থিতির যারা শিকার, তাদের বিষয়ে অস্পষ্টভাবে কিছু বলল, যা মেয়েটার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে। তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে মেয়েটা তার কড়া রঙের পরচুলা খুলে ব্যাগের ভেতর রেখে দিলো।
‘আমি চাই, আমাকে তোমার কথা দিতে হবে’ – নোয়ানকো বলল।
‘কী?’
‘কামানের গোলাবর্ষণ ছোড়ার সেই অভিব্যক্তি আর কখনো ব্যবহার করবে না।’
মেয়েটা হাসল, তার চোখে জল ‘আপনি তা পছন্দ করেননি? সব মেয়েই ওটা বলে থাকে।’
‘ভালো, তবে তুমি সব মেয়ের মধ্যে আলাদা। কথা দিচ্ছ তো?’
‘তাই হবে।’
স্বাভাবিকভাবে তাদের বিদায়ের সময় খানিকটা বিলম্বিত হলো। গাড়ির ভেতর বসার পর ইঞ্জিন বেঁকে বসলো। ওটার চারপাশ ঘাঁটাঘাঁটি করে ড্রাইভার জানতে পারল ব্যাটারি নিস্তেজ হয়ে গেছে। নোয়ানকো ভয় পেয়ে গেল।
গেল সপ্তাহেই মেশিনের দুটো বৈদ্যুতিক সেল পরিবর্তনের জন্য সে চৌত্রিশ পাউন্ড খরচ করেছে। মেশিনের কাজটা যে করেছে সে ছয় মাসের সার্ভিসের নিশ্চয়তা দিয়েছে। একটা নতুন ব্যাটারি যার তখনকার দাম আড়াইশো পাউন্ড সেটা লাগানোর কথাই আসেনি। ড্রাইভার নিশ্চয়ই অন্য কোনো কারণে অমনোযোগী ছিল – সে ভাবল।
‘গত রাতের কারণেই এটা হয়েছে’, ড্রাইভার বলে ওঠে।
‘গত রাতে কী ঘটেছিল?’ নোয়ানকো স্পষ্টভাবে জানতে চাইল। অবাক হয়ে ভাবলো, এ-কাজে কারো কোনো রকম ধৃষ্টতা রয়েছে কি না। তবে তেমন কারো উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া গেল না।
‘কারণ আমরা হেডলাইট ব্যবহার করেছিলাম।’
‘আমার কি তখন আলো জ্বালানোর কথা ছিল না? যাও, দেখো গাড়ি ঠেলার জন্য কিছু লোক পাওয়া যায় কি না।’ নোয়ানকো গ্লেডিসকে নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো, তারপর বাড়ি ফিরে গেল। ড্রাইভার লোক খোঁজার জন্য প্রতিবেশী বাড়িগুলোতে চলে গেল।
প্রায় আধঘণ্টা গাড়িটাকে সামনে-পেছনে ধাক্কা মারা আর যারা ঠেলছে তাদের চিৎকারের সঙ্গে উপদেশ শোনার পর শেষ পর্যন্ত ফুত ফুত শব্দ করে গাড়িটার প্রাণ ফিরে এলো; ইঞ্জিনের নির্গমন পথ দিয়ে একরাশ কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী সবেগে বেরিয়ে আসছে।
যখন তারা রওনা দিলো ঘড়িতে তখন সাড়ে আটটা বাজে। কয়েক মাইল যাওয়ার পর একজন বিকলাঙ্গ সৈনিক গাড়িতে ওঠার জন্য হাত বাড়াল।
‘থামো।’ নোয়ানকো চিৎকার করে ওঠে। ড্রাইভার ব্রেকে পা ঠেসে ধরে আর হতভম্ব হয়ে মালিকের দিকে ঘুরে তাকায়।
‘তুমি দেখতে পাচ্ছো না সৈনিকটা হাত নাড়ছে? পেছনে যাও আর তাকে তুলে নাও।’
‘দুঃখিত স্যার’, ড্রাইভার বলল, ‘আমি জানি না যে মালিক তাকে তুলে নেবেন।’
‘তুমি জানো না তো জিজ্ঞেস করতে। পেছনে যাও।’
সৈনিকটা একটা কমবয়সী ছেলে, পরনে নোংরা খাকি পোশাক ঘামে ভিজে গেছে। হাঁটুর নিচ থেকে ডান পা’টা নেই। একটা গাড়ি তার জন্য এসে থেমে গেছে এজন্য সে শুধু কৃতজ্ঞ নয়, যারপরনাই অত্যন্ত অবাক হয়েছে। সে প্রথম তার স্থূল কাঠের ক্র্যাচ দুটো বাড়িয়ে দিলো। ড্রাইভার সেটা সামনের দুই সিটের মাঝখানে রেখে দিলো। তারপর সে কষ্ট করে শরীরের ভার সামলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
‘ধন্যবাদ স্যার’, পেছনে তাকানোর জন্য ঘাড় ঘুরিয়ে সে বলল। তার নিশ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। ‘আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি ম্যাডাম, ধন্যবাদ।’
‘আমাদের আনন্দ’, নোয়ানকো বললো, ‘আঘাতটা কোথায় পেয়েছিলে?’
‘আজুমিনি, স্যার। ১০ই জানুয়ারি।’
‘মন খারাপ করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা তোমার মতো ছেলেদের নিয়ে গর্ব করি আর আমরা নিশ্চিত যখন সবকিছু থেমে যাবে তোমরা তোমাদের ন্যায্য পুরস্কার পাবে।’
‘বিধাতার কাছে প্রার্থনা করি, স্যার।’
তারপর প্রায় আধা ঘণ্টা নীরবতার মধ্যে গাড়িটা চলতে থাকে।
একটা ব্রিজের দিকে গাড়িটা যাওয়ার সময় একটু ঢালু জায়গায় যখন নামতে যাবে, কেউ একজন জোরে চিৎকার করে ওঠে – সম্ভবত ড্রাইভার কিংবা সৈনিকটা হবে – ‘তারা এসে গেছে।’ ব্রেকের ক্যাচ ক্যাচ শব্দ ওই চিৎকার এবং ওপরের আকাশ ভেঙে চুরমার হওয়ার শব্দের সঙ্গে মিশে একাকার। গাড়িটা থামার আগেই দরজাগুলো খুলে গেছে আর তারা অন্ধের মতো ঝোপঝাড়ের দিকে দৌড়ে পালাতে থাকে। গ্লেডিস নোয়ানকোর একটু সামনে ছিল যখন পতনোন্মুখ তুমুল কোলাহলের ভেতর সৈনিকটার কান্নার শব্দ তাদের কানে এলো – ‘দয়া করে আসুন আর আমার জন্য দরজাটা খুলুন।’ নোয়ানকো আবছা দেখল গ্লেডিস দাঁড়িয়ে গেছে; সে তাকে লক্ষ করে জোরে চিৎকার করল, একই সঙ্গে তাকে ফিরে আসার জন্য বলল। তখনই চারদিকে তীব্র হইচইয়ের মধ্যে অনেকটা বর্শার মতো একটা উঁচুস্বরে হুইসেলের শব্দে নিচে নেমে এলো। বিকট আওয়াজ আর দ্রুতগতিতে ওটা বিস্ফোরিত হয়ে সবকিছু ভেঙে চুরমার করে ফেলে। নোয়ানকো যে-গাছটাকে জড়িয়ে ধরেছিল সেটা তাকে ঝোপঝাড়ের মধ্যে অনেক দূরে ছুড়ে ফেলে দিলো। আর একটা হুইসেলের শব্দ উচ্চনাদে বাজতে শুরু করে, যা পৃথিবীর পর্বতপ্রমাণ ধ্বংসের ভেতর দিয়ে শেষ হলো। এরপর আরেকটা শব্দ – নোয়ানকো আর কিছু শুনতে পায়নি। মানুষের হইচইয়ের শব্দ, কান্নাকাটি শুনে আর পুড়ে কালো হওয়া এক পৃথিবীর ধোঁয়ার গন্ধ তার নাকে এলে নোয়ানকোর জ্ঞান ফিরে আসে।
সে নিজেকে টেনে উঠে দাঁড়ায় আর শব্দগুলোর উৎসের দিকে টলমলভাবে হাঁটতে থাকে।
দূর থেকে সে দেখতে পায় ড্রাইভার তার দিকে দৌড়ে আসছে। চোখে জল, শরীরে রক্তের দাগ। সে দেখল তার গাড়ির অবশিষ্টাংশ থেকে ধোঁয়া উঠছে, মেয়েটা আর সৈনিকের জটপাকানো শরীরের অবশিষ্টাংশ পড়ে আছে। একটা হৃদয়বিদীর্ণ চিৎকার করে সে আবার নিস্তেজ হয়ে যায়।
চিনুয়া আচেবে : নাইজেরিয়ান ঔপন্যাসিক, কবি, গল্পকার চিনুয়া আচেবের জন্ম ১৯৩০ সালের ১৬ই নভেম্বর। নাইজেরিয়ার ইগবো শহরে তাঁর শৈশব কেটেছে। ইবাদান কলেজ যেটা পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে, সেখানে তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশোনা করেছেন। গ্র্যাজুয়েশনের পর তিনি লাগোস চলে যান এবং Nigerian Broadcasting Service (NBS)-এ কাজ করেছেন। আচেবে নাইজেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়র্কের Bard University, Rhode Island-Gi Brown University-তে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
আচেবের প্রথম উপন্যাস Things Fall Apart (1958) আফ্রিকার সাহিত্যজগতে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। তাঁর উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে – No Longer at Ease (1960), Arrwo of God (1964), A Man of the People (1966), Anthills of the Savannah (1987)। কবিতার বই – ঈড়ষষবপঃবফ চড়বসং (২০০৪), গল্পগ্রন্থ The Sacrificial Egg and Other Stories (1962), Girls at War and Other Stories (1972)। ২০০৭ সালে তিনি Man Booker International Priæe-এ ভূষিত হন।
আচেবে পশ্চিমাদের কাছে আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের জনক হিসেবে পরিচিত। মূলত আফ্রিকান সাহিত্যে যে ঔপনিবেশিক প্রভাব বিস্তার করে আছে তা থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছেন এ-লেখক। ইগবো লোকদের ঐতিহ্য, ক্রিশ্চিয়ান প্রভাব আর পশ্চিমা ও আফ্রিকান মূল্যবোধের মধ্যে বিরোধ থেকে অনন্য আফ্রিকান কণ্ঠস্বর সৃষ্টির চেষ্টাই তিনি সারাজীবন করে গেছেন তাঁর রচনায়। ২০১৩ সালের ২১শে মার্চ ৮৩ বছর বয়সে চিনুয়া আচিবে মৃত্যুবরণ করেন।‘মেয়েরা যুদ্ধে আছে’ গল্পটি আচেবের ‘Girls at War’ গল্পের বাংলা অনুবাদ।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.