জরি গ্রাহাম ও আমেরিকার নতুন কবিতা

জরি গ্রাহাম আমার সমবয়সী। তাঁরও জন্ম ১৯৫০ সালে। নিউইয়র্ক সিটিতে জন্মালেও বড় হয়েছেন ইতালিতে। পরে চলে আসেন আমেরিকায়; নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন; আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান এম এফ এ ডিগ্রি। আয়ওয়ার বিখ্যাত Writers’ Workshop -এর শিক্ষক হিসেবে বিপুল খ্যাতির অধিকারী হন। সেখান থেকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্তি পান Boylston Professor of Rhetoric and Oratory পদে। গত পঁচিশ বছর ধরে জরি গ্রাহাম লিখে চলেছেন চমৎকৃত হবার মতো কবিতা, প্রকাশ করেছেন ছয়টি কাব্যগ্রন্থ, সম্পাদনা করেছেন বেশকিছু এন্থলজি। তাঁর নির্বাচিত কবিতা, যেটি The Dream of the Unified Field নামে বেরোয়, ১৯৯৬ সালে পুলিৎজার পুরস্কার জিতে নেয়। এ-মুহূর্তে আমেরিকার সবচেয়ে নাম করা কবিদের একজন জরি গ্রাহাম। শুধু কবি হিসেবে নয়, শিক্ষক হিসেবেও তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়; আয়ওয়া রাইটার্স প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা তাঁকে স্মরণ করে, শুধু উজ্জ্বল কবি হিসেবে নয়, একজন তুখোড় শিক্ষক এবং শিক্ষানেত্রী হিসেবেও।

কিন্তু এতসব পরিচিতিমূলক কথা কেন বলছি? বলছি আমার এক মুগ্ধবোধ-স্মৃতির উত্তাপে। ২০০২ সালের গ্রীষ্মে আমার আমেরিকা সফরের সময় যে-দুজন কবিকে বলতে গেলে আবিষ্কারই করেছিলাম, তাঁদের একজন এই জরি গ্রাহাম (Jorie Graham), অন্যজন প্রয়াত আগা শাহিদ আলী। উত্তীর্ণ-পঞ্চাশ কিন্তু আকর্ষণীয় জরিকে আমি দেখেছি শিকাগোয়, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে, যেখানে সৌভাগ্যক্রমে প্রবেশাধিকার জুটেছিল আমার। অবিস্মরণীয় তাঁর বক্তৃতা, অসামান্য তাঁর কবিতাপাঠ শুনে যে-মুগ্ধতা চারিত হয়েছিল মনে, তার মধুস্বাদ বহুকাল রয়ে যাবে বলেই মনে হয়। আমার আবিষ্কারের অপেক্ষায় ছিলেন না অবশ্যই ওই মনোহারিণী কবি, তবে আমার দিক থেকে তো আবিষ্কারই বটে – কর্টেজের মতো নতুন ভূমিরেখা নয়নগ্রাহ্য করা, বস্তুত পুনরাবিষ্কার করা একটি কন্টিনেন্ট, তার কুহকিনী সার্সির গীতধ্বনিসহ।

আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত জীবিত কবি জন অ্যাশ্বেরি জরি গ্রাহামকে সংবর্ধিত করেছেন ‘one of the finest poets writing today’ বলে; অন্যদিকে কবি জেম্স টেট্ তাঁকে বলেছেন, ‘a poet of staggering intelligence’। টেট্ আরো মন্তব্য করেছেন – ‘জরি গ্রাহামের কবিতা সর্বদা আক্রমণোদ্যত। আমাদের পুরো ইতিহাস তাঁর লক্ষ্যবস্তু, তিনি মিথকে দিচ্ছেন নতুন অবয়ব, যাতে আমরা যা হতে প্রত্যাশা করি তার সবকিছুকে নতুন করে জানতে ও বুঝতে বাধ্য হতে হয়।’ বর্তমান নিবন্ধে আমরা জরি গ্রাহামের কাব্যকৃতির একটি রূপবন্ধ রচনা করতে চাইব তাঁর একটি সাক্ষাৎকার এবং কিছু কবিতার অনুবাদের আলোকে।

জরি গ্রাহামের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো : Never (2002); Swarm (2000), The Errancy (1999); The Dream of the Unified Field : Selected Poems 1974-1994 (পুলিৎজারপ্রাপ্ত); Materialism (1993); Region of Unlikeness (1991); The End of Beauty (1987); Erosion (1983); এবং Hybrids of Plants and of Ghosts (1980)। এছাড়া সম্পাদনা করেছেন দুটি সংকলনগ্রন্থ : Earth Took of Earth : 100 Great Poems of the English Language (1996) এবং Earth Took of Earth : 100 Great Poems of the English Language (1996) ।

জরি গ্রাহাম কবি মার্ক ভুন্ডারলিখকে (Mark Wunderlich) যে-সাক্ষাৎকারটি দেন, যেটি American Poet -এর হেমন্ত ১৯৯৬ সংখ্যায় বেরোয়, তা থেকে তাঁর কাব্যবিষয়ক চিন্তাধারা যেমন স্পষ্ট করে জানা যায়, তেমনি বোঝা যায় আজকের তরুণ প্রজন্মের মার্কিনি কবিরা কোন পথে হাঁটছেন তা-ও। মার্কিনি কবিতার পঞ্চাশ ও ষাটের দশক শাসন করেছে কনফেশনাল অর্থাৎ স্বীকারোক্তিপ্রবণ কবিরা, যাঁদের গুরু রবার্ট লাওয়েল, এবং যাঁদের মধ্যে প্রখ্যাতরা হলেন জন বেরিম্যান, সিলভিয়া প্লাথ, অ্যান সেক্সটন (এঁরা তিনজনই আত্মঘাতী হয়েছেন), থিওডর র‌্যথকে প্রমুখ। পাশাপাশি ছিলেন তথাকথিত বিট্নিক্রা, অ্যালেন গ্রিন্সবার্গ, লরেন্স ফালিংঘেটি এবং তাঁদের শিষ্যবর্গ। সত্তর আর আশির দশকে তুমুল ছিল জেন্ডার এবং এথনিক আইডেন্টিটির প্রশ্নে সমাকুল রাজনৈতিক কবিতা, যার সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ন্যারেটিভ মিশেল। আশির দশকেরই কবি জরি গ্রাহাম, কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বরটি আশ্চর্যরকম আলাদা এবং তাজা – এর পেছনের কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি বড় হয়েছেন আমেরিকায় নয়, ইউরোপে। ইতালি এবং ফ্রান্সের স্কুলে পড়েছেন; সরবোর্নে পাঠ নিয়েছেন দর্শনশাস্ত্রের। মধ্য-কুড়ি বয়সে নিউইয়র্কে এসে প্রথমে কোর্স করেন চলচ্চিত্রনির্মাণের, তারও পরে ইংরেজি সাহিত্যে। তাঁর কবিতার তরতাজা স্বাদ এবং চনমনে ছন্দ সবাইকে কেমন নাড়া দিয়েছিল তার স্বীকারোক্তি আছে ভি. লার নামের এক সমালোচকের বয়ানে, ‘I was struck by the freshness of the three of her poems in the American Poetry Review, and I thought, whats happening here? Its like hearing a nwe sound, like hearing Shostakovich after Chaikovsï.’

অন্যকথায় যাবার আগে জরির একটি কবিতার ঝটিতি অনুবাদ পেশ করি –

সান সাপোলক্রো

এই নীল আলোয়

আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারি সেখানে,

তুষার আমাকে যেখানে বানিয়ে দিয়েছে

একটি হাড়ের জগৎ

যার ভেতর দিয়ে দেখা যায়। এই

আমার ঘর।

এই আমার এট্রুসকান দেয়াল

আমার প্রতিবেশীর

নেবুগাছ, এবং ছোট গির্জার ঠিক নিচে

উড়োজাহাজ-কারখানা।

একটি মোরগ

সারাদিন ডাকে দেয়ালের বাইরের

কুয়াশার মধ্য থেকে।

বাতাসে ভাসছে দুধ

নেবুর তেলতেলে চামড়ায় বরফ

কেমন তক্তকে মনটা।

পবিত্র সমাধি। এই যে মেয়েটি,

পিয়েরো দেলা ফ্রান্চেস্কার আঁকা,

বোতাম খুলছে তার

নীলরঙ পিরানের,

তার শীতের আলখাল্লাটা,

প্রসবে যাবার আগে। এসো, আমরা ভেতরে যাই।

এখনো জন্ম হয়নি

দেবতার। এখনো কেউ

  জেগে উঠেনি

জাদুঘরে কিংবা উড়োজাহাজের

এসেম্ব্লি লাইনে –

শরীর আর পাখার খোলাবাতাসের

মুক্তবাজারে। এতো তাই

যা জীবিতরা করে : ভেতরে যাও।

বহুদূর পথ এ।

আর পোশাকটি খুলছে তো খুলছেই

অনন্তকাল থেকে

ব্যক্তিগত গোপনে, হৃদয়ে তার

ট্রাজেডি, বর্তমান মুহূর্তটি

চিরকাল মৃতজন্মা শিশু,

কিন্তু চলছে তবু, প্রতিটি নিশ্বাস

একটি বোতাম

খুলছে একে-একে, খুব দ্রুত আঙুলের কেউ যেন

খুঁজে নিচ্ছে সবগুলো বোতামঘর ঠিক্ঠাক্।

দুই

ইতিহাস ও দর্শন জরি গ্রাহামের কবিতার দুই প্রধান প্রেরণা। সেই সঙ্গে প্রকৃতি বিশেষ করে উদ্ভিদ এবং প্রাণিজগতের বিশাল উৎস থেকে তার উপমা-রূপক আহৃত। ইংরেজি কবিতা-ঐতিহ্যের মধ্যে তাঁর পূর্বসূরি উইলিয়াম ব্লেক এবং ডি এইচ লরেন্স। অধিকতর সাম্প্রতিক কবিদের মধ্যে টেড হিউজের জান্তব জগতের প্রচ্ছায়াও লক্ষযোগ্য জরি গ্রাহামের কবিতায়। ‘The Geese,I watched a snake, Salmon’, প্রভৃতি কবিতায় জন্ত-রূপকের ব্যবহার এ-প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে ইতিহাস ও দর্শনের অভিনিবেশ ঘটেছে, বিশেষ করে, এসব কবিতায় : ‘A feather for Voltaire, The Age of Reason, ‘Reading Plato, History, Short History of the West, The Phase after History, Soul says, Notes on the Reality of the Self’ ইত্যাদি। এ-তালিকা দেখে মনে হতে পারে যে, জরি গ্রাহাম নীরস দার্শনিক কবিতা লিখেছেন। মোটেই তা নয়; তাঁর কবিতা বহুমাত্রিক, গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, সেই সঙ্গে ধাবমান অশ্বের মতো তাঁর ভাষার দ্রুতি ও গতি এবং তাঁর কবিতা গীতিময় ও ছন্দপ্রধান। Nwe York Times Book Review-i মতামতের উদ্ধৃতি দিই : ‘Jorie Grahams poems are philosophically and historically alert, and their acts of thought arise with almost instinctual urgency from an astonished responsiveness that in itself becomes part of what she names the vivid performance of the present… Reaching with quickened sensitiity for poetrys supply of the associative, sonic and formal properties rustling beyond mere denotation, she also develops a genius for apprehending and scrutini“ing human perceptions, reflections, and desires.’

এক্ষণে তাঁর দুটি কবিতার অনুবাদ উপস্থাপন করছি। প্রথমটি ডি এইচ লরেন্সের বিখ্যাত ঝহধশব কবিতাকে মনে পড়াবে। তৃষ্ণার্ত এক গোক্ষুরকে চৌবাচ্চায় জল খেতে দেখেছিলেন লরেন্স; জরি গ্রাহাম দেখছেন একটি সাপকে বাগানের ঘাসের মধ্যে প্রজাপতি, ঘাসফড়িং ধরে ধরে খাচ্ছে। একবার ঘাসের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে, আবার বেরিয়ে আসছে। যেন সেলাই করছে অস্তিত্বের চিরকালীন এক নকশিকাঁথা। জীবনানন্দ যেমন থুত্থুড়ে অন্ধ পেঁচা আর ‘অন্ধকার সংঘারামে’ বেঁচে থাকা মাছি, উড়ন্ত রোদের মধ্যে দুরন্ত কীটের খেলা দেখে জীবনের দুর্দমনীয়তাকে বুঝেছিলেন, জরি তেমনি চিত্রিত সর্পের দৃশ্য ও অদৃশ্যের মধ্যে দোলাচলকে দেখছেন জীবন-মৃত্যুর তরঙ্গভঙ্গ হিসেবে। দ্বিতীয় কবিতাটির নাম ‘ইতিহাস’ – মনে পড়াবে সিলভিয়া প্লাথের বিখ্যাত ‘উধফফু’ কবিতার নাৎসী-প্রসঙ্গকে।

সাপ

আমি দেখলাম একটি সাপ

খুব ব্যস্ত বাড়ির পেছনটায়

শুকনো ঘাসের মধ্যে

ফড়িং ধরতে। বারবার সে

হারাচ্ছিল।

আর যদিও আমি জানতাম, এর

কিছু যোগ আছে

কামনার সাথে, আজ মনে হলো

কাজের সাথে সেই যোগ। প্রায়

আধাঘণ্টা লাগল ওর বাগানটির

মোটামুটি দশ ফুট পাড়ি দিতে,

এত ধীরে

ঘাসের ডগার মধ্য দিয়ে যে, তুমি

বুঝবে না সে যাচ্ছে। আমি দেখলাম

ঘাসের মধ্যে ওর শরীরের পথ যেতে যেতে

হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল

আবার দেখা দিল সামান্য কিছু দূরে

কালো গিট্টুমাথা তুলল, চোখ তার

একটি প্রজাপতির ওপর।

এ এমন নির্ভুল যাত্রা যখন

চলাকে মনে হয়

অদৃশ্য হওয়া, দৃশ্যমানকে শুধরে নেয়া

অদৃশ্যকে দিয়ে – ঠিক যেমনটি আমরা

সেলাই করি ধরিত্রীকে।

আমার মনে হয়, যতবার মরি,

নিচে যাই, আবার উঠে আসি –

সবচেয়ে সহজ এই ফোঁড়, এই

যাওয়া-আসা, ফেলে যাওয়া

এমন নকশা, যা খুব অসুন্দরও নয়।

কিন্তু ক্ষুধার কারণে এই যাওয়া –

ছোট ছোট বস্তুর ক্ষুধা যেমন, মাছি, কথা –

যাওয়া, কেননা মানুষের শরীর

যায়। আর এই অস্বস্তিকর প্রাণীটির

ছোট্ট ক্ষুধা, যা

এমনকি বুনো কাঁটা গাছকেও দিচ্ছে না চাপ,

শুধু ধরে আনছে প্রয়োজনের নীল-কৃষ্ণ

গঙ্গাফড়িং

যেটি এইমাত্র উড়ে বসল শুঁটির ওপর …

কামনা হলো শরীরের সৎ কর্ম,

তার ইঞ্জিন, তার হাওয়া।

তারও নিশ্চিত আছে পাল – তার পাখা

এই ছোট মুখের ভেতর, মানব-হৃৎপিণ্ডের

ভাল্ব, অর্থ, যেন পালতোলা নৌকা

ভেসে যাচ্ছে

মনের ওপর দিয়ে। আবেগ হলো সেই কর্ম

যা আমাদের জন্য খুঁজে আনে

হারানো ফোঁড়গুলো। সে বানায়

আমাদের প্যাটার্ন, বাঁধে আমাদের শক্ততর বস্তুর সাথে,

সন্দেহ নেই।

ইতিহাস

ইতিহাস হলো তাই যার কানে বলা হয় কৃতকর্ম। একমাত্র

শ্রোতা সে। তাই আমি বিশ্বাস করতাম

সবকিছু মনে পড়বে তার, গুঞ্জনরত বৃক্ষ,

রোদের অত্যুগ্র উৎসাহ, তার গভীর অমসৃণতা। কারণ ইতিহাস

হচ্ছে চোখের বিপরীত

যার জন্য উদাহরণত, শত শত খণ্ডে

টুকরো করা ষাটলক্ষ শরীর

আর হঠাৎ বাতাসে ভেসে যাওয়া ফুলের টব

একই অর্থ ধরে। সত্য ছাড়া

আর কী আছে সেখানে?

“দশ হাজার ডলার দেবো যদি কেউ প্রমাণ

দিতে পারে, হলোকস্ট সত্যি ঘটেছিল” –

উনিশশ আশিতে সানফ্রান্সিস্কোয়

এমনটি বলেছিল ক্লান্ত নির্জনতা।

একটা রঙচটা ফোটোগ্রাফ –

দূরে, বনভূমির মধ্যে ১৯৪২-এ

একটি মানুষ, তার মুখে ঢোকানো তারই শিশ্ন

চামচ-কাঁটা দিয়ে মুখমণ্ডলে করা কয়েকশ ধীর গর্ত,

সুন্দর হয়ে উঠছে। শৈবাল আর গভীর জঙ্গলের

লিলিগুলো আঁকড়ে রয়েছে তার চোখ। জীর্ণ

য়ুনিফর্ম পরা তিনটি বন্দুকঅলা মানুষ

নার্ভাসভাবে হাসছে। তারা ওই লোকটির সাথে

ভাগ করে নিয়েছে দিনটি। একটি ব্লুবার্ড

গাইছে কোথাও। ছায়ার পালক ছুঁয়েছে তাদের

প্রতি ইঞ্চি ত্বক – হাতে ধরা স্পর্শকাতর বন্দুক,

হাত রাখা স্পর্শকাতর কোমরের ওপর।

আর আকাশ দৃশ্যমান লোকগুলোর ভেতর দিয়ে।

বৃক্ষগুলোর ভেতর দিয়ে একটি নীল আত্মা

ঘিরে রেখেছে সবকিছু। গল্পের শেষভাগে

উত্তর ইতালিতে একটি লোক শীতের লাকড়ির জন্য

কাটছে কিছু গাছ। সন্ধ্যার কাগজে পড়লাম সে

খবর। একদিন গভীর রাত্রে লোকটি দেখল,

আগুন জ্বলছে কাঠে, রং পাল্টাচ্ছে কাঠ, আর

একটি হ্যান্ডগ্রেনেড

ওই তরুণ গাছটির মণ্ডের ভেতর, যার চারদিকে

বেড়ে উঠেছিল গাছটি, বিস্ফোরিত হলো, অন্ধ হলো

লোকটি, নিহত হলো তার স্ত্রী। এখন তবে

তার সন্তানদের কে শোনাবে রূপকথা? সেইসব

গল্প যেখানে বনভূমির পাটাতনের ওপর

সরল কিছু ঝরাপাতা আমাদের এগিয়ে দেয়

আমাদের দুয়ার অব্দি?

জরি গ্রাহামের কবিতা গড়ে উঠেছে তীব্র মনন এবং আবেগের সঙ্গমে। তাঁর কবিতায় কিছু দুর্মর প্রশ্ন প্রাণ পেয়ে উঠে : অস্তিত্বের রহস্য কী, কোথায় সত্তার সীমানা অথবা ‘অর্থে’র প্রকৃতিই বা কী? এই অস্তিত্ববাদী প্রশ্নগুলো কোনো অধিজাগতিক বৃক্ষকে অবলম্বন করে পেঁচিয়ে উঠেনি : জরির উপাত্ত তাঁর ইন্দ্রিয়ের ভাষা, ‘Lee Simmons -এর কথায়, “A restless desire to see, a hunger for understanding, is reflected in images of excavation, of penetrating the beautiful in search of the true, even when the search is known to be hopeless.”

কিন্তু তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা কোনো মীমাংসিত সূত্রের সারণীতে পৌঁছায় না; তাঁর যাত্রা অসমাপিকা, সমাধান অপ্রাপ্য; গ্রিক মিথ-কথার প্রোষিতভর্তৃকা পেনিলোপির মতো সেলাই করছেন অর্থের নকশা, আবার নিজেই খুলছেন। তাঁর কবিতা তাই সরল অর্থবোধকতাকে নিরুদ্ধ করে, এবং ফলত জাগিয়ে রাখে প্রয়োজনীয় সাহসিকতার মৃদু আলো, যেন উপলব্ধির দ্বিধাথরথরচূড়ে ভর করে থাকে একটি উড়ুক্কু প্রজাপতি।

তবে একদিক দিয়ে জরি গ্রাহাম প্রবল ব্যতিক্রম এই পোস্টমডার্নিজমের যুগে। সকল ইতিবাচকতাকে, সকল সদর্থকতাকে যখন দুয়ার দেখিয়ে বিদেয় করা হয়েছে কবিতা থেকে, সে-সময় জরির কবিতা শুভার্থী ও সুশীল : অলজ্জভাবে তিনি স্বীকার করেন যে, কবিতার নৈতিক ও আত্মিক দায় আছে; কবিতা হলো আবিষ্কার ও জাগরণের হাতিয়ার। The Best American Poetry 1990 -এর ভূমিকায় লেখেন তিনি, ‘Each poem is an act of the mind that tries-via precision of seeing, feeling, and thinking to clean the language of its current lies, to make it capable of connecting us to the world.’

তিন

এবারমার্ক ভুন্ডালিখের সঙ্গে জরি গ্রাহামের সাক্ষাৎকারের কিছু নির্বাচিত অংশ, যেখানে সাম্প্রতিক মার্কিনি কবিতার চালচিত্রটি ফুটে উঠেছে। সেইসঙ্গে আয়ওয়া রাইটার্স প্রোগ্রামের নানা আকর্ষক দিকও।

মার্ক ভুন্ডারলিখ : রাইটার্স ওয়ার্কশপে অনেক তরুণ ও প্রতিভাবান লেখকের সঙ্গে আপনার পরিচয় ঘটে। কোনো বিশেষ প্রবণতা কি আমেরিকার নতুন প্রজন্মের কবিদের মধ্যে বেড়ে উঠছে বলে আপনি মনে করেন? এই নতুন প্রজন্ম আপনার প্রজন্মের কিংবা তারও আগের কবিদের থেকে কোন দিক দিয়ে আলাদা হবে?

জরি গ্রাহাম : সম্ভবত এরা অধিকতর প্রভাবিত এবং ব্যস্ত – য়ুটোপিয় চিন্তা এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত আকাক্সক্ষাসমূহের ব্যর্থতা নিয়ে। স্বাতিক্রমণের সম্ভাবনা সম্পর্কেও তাদের বিশ্বাস কম। তাদের কবিতার স্বরপ্রসঙ্গ প্রায়শ একটি ছোট পরিসর তথা আয়রনি এবং সপ্রতিভ হতাশার মাঝখানে সীমায়িত থাকে। দেখা যাক… সম্ভবত তারা মন্ময়তাকে সাধারণভাবে বেশি প্রশ্ন করছে, মন্ময় অভিজ্ঞতার রূপায়ণ নিয়ে তারা একটু বেশি আত্মসচেতন। এতটুকু বলার পর, বলতে হয়, তারা তাদের কাজের আদর্শগত আপ্তধারণাগুলোর স্বকীয়বোধকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার অনুমতি পেতে আকুল। মনে হয় তারা সাধারণ এমনকী আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতাকে কবিতায় পুনঃপ্রবেশ করানোর অনুমতি চায়। শেষত, আমি মনে করি, তারা তাদের আগের প্রজন্মের অনেক নন্দনতাত্ত্বিক কৌশলগুলোর একটা সিন্থেসিস ঘটাতে চাইছে। আমি পেয়েছি এমন ছাত্র, যারা একই সঙ্গে Susan Howe এবং Sharon Olds দ্বারা অথবা তাঁদের প্রকরণের নানা দিক দ্বারা প্রভাবিত। এদের কাছে ওই দুই কবি দুটি মেরুদূর-উদ্দেশ্য বা প্রতীতির আধার নন। আমি উদ্দীপ্ত হই, শঙ্কিত হই এবং আনন্দিত হই – বিশেষত আমি যেহেতু বিবিধ নন্দনতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এত তীব্র বৈরিতা দেখেছি – যখন দেখি তারা মেশাচ্ছে, উৎকলন করছে নানা কৌশল, ওই কৌশলগুলো জন্ম দিয়েছে যেসব বিশ্বাস, তাদের প্রতি দায়স্বীকার না করেই। মনে হয়, কোনো বিশেষ যুগের শৈলীকে ভাঙতে চাওয়া শিল্পমাধ্যমের ইতিহাসে সর্বদা এমনটিই ঘটে থাকে।

মার্ক : মার্কিনি কবিতায় এই সময়ে এমন কোনো শৈলীগত ধারা কি আপনি দেখছেন, যেটি আপনার জন্য খুব উত্তেজনাকর অথবা যে-ধরনের কাজ আপনি আরো বেশি দেখতে চান? অথবা আরো কম?

জরি : সম্ভবত এ-প্রশ্নের উত্তর আমি ইতোমধ্যে দিয়েছি। আমি মনে করি, মন্ময়তা নিয়ে প্রশ্নাবলি রোমান্টিক পূর্ণতার জন্য আকাক্সক্ষার এখনো চলমান উত্তরাধিকার, এবং এ-ধরনের আকাক্সক্ষা সম্পর্কে অবিশ্বাসের সঙ্গে এর সংঘর্ষ (এই অবিশ্বাস শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার যাথার্থ্য নিয়ে নয়, বরং ওইরকম অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সক্ষম এমন কোনো সার-সত্তা সম্পর্কে অবিশ্বাস) – আজকে যা ঘটতে দেখছি তার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। যে-‘আমি’ স্বীকারেক্তিমূলক ‘sincerity’ থেকে নিজের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে এবং যে-‘আমি’ কর্তৃত্ব গ্রহণ করে তার নিজের সামাজিকভাবে নির্মিত প্রকৃতি থেকে। তাদের মাঝখানে আরো একটি ‘আমি’ আছে, যে-আমি প্রেমে পড়ে, প্রেম ছাড়ে, জন্ম দেয়, প্রিয়মানুষকে হারায়, সুরভিত গোলাপকুঞ্জের পাশ দিয়ে যাবার সময় বুক ভরে শ্বাস নেয় – সেই ‘আমি’-র কোনো গত্যন্তর নেই মরণশীলতা ছাড়া। সেই ‘আমি’ (এলিয়ট যাকে হয়তো বলতেন ব্যক্তিগত তবু যৌথ) বেরিয়ে আসছে গত দশকের বিশাল দার্শনিক দ্বন্দ্ব থেকে, ব্যক্তিগততার রহস্যের প্রতি নতুন শ্রদ্ধা নিয়ে। সেইসঙ্গে ব্যক্তিগততার যুগপৎ অধরা এবং মূল প্রকৃতি সম্পর্কে অধিকতর সমৃদ্ধ বোধ নিয়ে। আমার একটিই কামনা। শরীরের (হৃদয়ের) জ্ঞানকে আবার বিশ্বাস করা হোক, শরীর নিয়ে ভয় – এই এইড্সের যুগ এবং তাৎক্ষণিক তথ্যপ্রযুক্তির প্লেগসুলভ প্রাবল্যের কালে এই ভয় হয়তো বোধগম্য – কমে যাক, কবিতায় ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার হোক আবার, চাই সত্যিকার রূপকল্প অনুভূত, লিখিত হোক, এবং সবচেয়ে বড় কথা তাদের বোঝা হোক তারা যে-জ্ঞান ধারণ করে আছে তার নিরিখে।

মার্ক : অনেক মার্কিনি শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে মনে হয় এমন ধারণা রয়েছে যে, কবিতা ক্রমাগত কমসংখ্যক লোক পড়ে, এবং পাবলিক কালচারের খুব ছোট এলাকাই কবিতার দখলে। তবু ক্রমশ বেশি বেশি লোক ক্রিয়েটিভ রাইটিং প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করছে, অথবা এই শিল্পমাধ্যমে আসার জন্য আগ্রহী। সারাদেশে কবিতাপাঠের অনুষ্ঠান ক্রমেই বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে, কবিতার বই প্রকাশিত হচ্ছে এদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক সংখ্যক। কিন্তু তবু জনগণের perception হলো কবিতা শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রান্তিক। এই স্পষ্ট বৈপরীত্য সম্পর্কে আপনার কী অভিমত?

জরি : কবিতা প্রান্তিক নয়, শুধু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ছাড়া। এবং সেটি বাস্তবতার খুব জরুরি স্তর নয়, যদিও বাহ্যত খুব প্রভাবশালী স্তর। সম্ভবত, যে-প্রশ্নটি লোকের করা উচিত নিজেদেরকে, কেন এত লোকজন – বিশেষত তরুণরা দলবেঁধে, সত্যি-সত্যি হাজারে হাজারে – এমনসব কেন্দ্রে – তাকে ওয়ার্কশপই বলুন – ভিড় জমাচ্ছে যেখানে কবিতা পড়া এবং লেখা হয়? এবং কেন এরা জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার আঙ্গিক হিসেবে কবিতার দিকে মুখ ফেরাচ্ছেন, নিজেদের জীবনকে যাপন করার জন্যে? এখানে কয়েকটি আলাদা আলাদা ইস্যু কাজ করছে।

প্রথমত, সেইসব ছাত্ররা ক্রিয়েটিভ রাইটিং প্রোগ্রামে আসছে, যারা সত্যিকার টেক্সটের সঙ্গে সরাসরি পরিচয়ের মাধ্যমে সাহিত্য পড়তে চায় – ছুঁতে চায় রাজনৈতিকভাবে ফ্যাশনেব্ল নয় এমন ‘মহৎ’ সাহিত্যকর্মগুলো। কারণ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগগুলো – বিশেষত যারা গত আট বছরে নতুন নতুন অধ্যাপক ‘হায়ার’ করতে পেরেছে – তাদের কারিকুলামে সাহিত্যতত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আমরা আশ্চর্যজনক সংখ্যার পিএইচ ডি ছাত্রের আবেদন পাচ্ছি – যারা আমাদের সাহিত্য-সেমিনারগুলোতে অংশ নিতে চায়। যেসব সাহিত্যটেক্সট পড়ে তারা প্রথমত সাহিত্যের প্রেমে পড়েছিল, সেগুলোর সরাসরি সংস্পর্শে আসতে চায় তারা। কিন্তু রাইটিং প্রোগ্রামে কী ঘটে সে-সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা আশ্চর্যজনকভাবে ভুলতথ্যনির্ভর এবং অবাকরকম কাল্পনিক।

আয়ওয়াতে অনেক সাহিত্য – সাহিত্য ঐতিহ্যের অনেকটা – পড়ানো হয়। ছন্দশাস্ত্রের ওপর, কবিতার আঙ্গিকের ওপর এবং ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক ইস্যুগুলোর ওপর সেমিনার হয়ে থাকে প্রতি সেমিস্টারে। রাইটার্স ওয়ার্কশপ হলো শতাব্দীর পর শতাব্দী যে-ধরনের শিল্পগ্রামে আর্টিস্টরা একত্রিত হয়েছেন – লন্ডনে, প্যারিসে, বার্সেলোনা কিংবা নিউইয়র্কে – সে-রকম একটি ব্যাপার। ওইসব শিল্পগ্রামে তারা ভাববিনিময় করেছেন, তাদের প্রকল্পিত বিপ্লবের গন্তব্য নিয়ে আঁক কষেছেন। চিত্রী, কবি, চলচ্চিত্র-নির্মাতা, আলোকচিত্রী, দার্শনিক গভীর রাত পর্যন্ত বারে বসে একটি নতুন পৃথিবী

কল্পনা করতে চেয়েছেন – পুরানো সংকটগুলোর জন্য খুঁজেছেন নতুন

কোনো সমাধান।

দুবছর ধরে তারা পড়াশুনো করে, আলোচনা করে – মানবিক ও নান্দনিক ক্রসপরাগায়ণ ঘটে। কেউ হয়তো L = A = N = G = U = A = G = E নন্দনতত্ত্ব-অনুযায়ী কবিতা লিখতে চাচ্ছে। অন্য কেউ হয়তো এইমাত্র শেষ করল একগুচ্ছ সনেট। তারা তর্ক করে স্পেনসার নিয়ে। অথবা পাউন্ড এবং দেরিদা এবং ব্লেইক। এবং ডারউইন। শেল্ফ থেকে বই টেনে নিয়ে একে অন্যকে পড়ে শোনায়। তারা তর্ক করে act of representation নিয়ে; গভীর রাত পর্যন্ত মদ্যপান করে, বন্ধু চিত্রশিল্পীর স্টুডিওতে যায় তার নতুন কাজ দেখার জন্য। ‘যৌথ প্রচেষ্টার কোশেশ হয়। আবেগ জ্বলে ওঠে। আইডিয়ার ছড়াছড়ি। কখনো কখনো সত্যি-সত্যি আইডিয়ার উন্নতি ঘটে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চিত্রশিল্পীরা প্রতিটি মহাদেশে যা করেছে তা থেকে কী করে পৃথক এটি? অথবা অন্তত আমাদের ভেতরকার সেই আকাক্সক্ষা যাকে আমরা ‘আর্ট’ বলি, সেটি যখন বুর্জোয়া পৃথিবীর মুখোমুখি হয়েছে তখন থেকে? ভাবুন তো ভেরোচ্চিওর স্টুডিওর কথা, তরুণ লেনার্দো ঢুকছেন সেখানে – তাঁর ডানে ডোনাতেল্লো, বাঁয়ে আরেকজন, যার নাম আমরা ভুলে গেছি। আমাদের কবিরা – দুবছর পর তারা আমেরিকি জীবনের ফরধংঢ়ড়ৎধ-র মধ্যে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে পুনরায় এবং বাজারে জীবিকা-অর্জনের সংগ্রামে অথবা তাদের আত্মা এবং স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধে। ব্যাপারটা কী অবাক করা, তাই না, যে-পৃথিবীর উন্নততম পুঁজিবাদী সমাজের এতগুলো সন্তান ঝুঁকে পড়ছে এমন একটি শিল্পমাধ্যমের দিকে, যেটি তাদেরকে রাখবে অতিশ্রমে ক্লান্ত এবং দেবে সবচেয়ে কম পয়সা? এমনকী হতে পারে এরা বুঝেছে যে, কবিতা তাদেরকে দিতে পারে কিছু প্রয়োজনীয় রহস্য, অথবা মূল্যবোধ (অথবা মূল্যবোধের সমষ্টি) অথবা বাস্তবচেতনা, যা থেকে এই নেশাবিস্তারী সভ্যতা তাদেরকে বঞ্চিত রেখেছিল? হয়তো তারা শুধু চায় জেগে উঠতে। আর এত লোক কেন লিখতে চায়, কেন আসে কাব্যপাঠের অনুুষ্ঠানে ইত্যাদি – কারণ সেই একই।

মার্ক : কোনো কোনো পণ্ডিত বলছেন যে, কবিতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শেষ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে এবং হয়ে পড়েছে আত্যন্তিক অ্যাকাডেমিক। আমেরিকান কবিরা শুধু কবিদের জন্যেই লেখেন। মার্কিনি কবিতার পাঠক সম্পর্কে আপনার কী ধারণা? আপনি কি মনে করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিকরভাবে কবিতার ওপর খবরদারি করছে?

জরি : কবিরা চিরকালই কবিতা লিখেছে সমাজের মানুষের জন্যে, যারা কবিতা পড়ে এবং তাদের জন্য যারা ভবিষ্যতে কবিতা পড়বে। ইংরেজিভাষী জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি লোক আজকাল কবিতা পড়ছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি। অংশত, সাক্ষরতা-হারের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে, এবং অংশত, ওই যে অসচেতন প্রয়োজনের কথা আগে বলেছি, তার সঙ্গে।

আমাদের বর্তমান শিক্ষাদর্শনগুলো এতটা চরমভাবে স্পেশালাইজ্ড, এতটা goal-oriented যে, আমরা ভুলে গেছি আমরা যখন শিশুদের পড়াই, আমরা বিষয়বস্তু পড়াই না, অথবা এমনকী ‘শিক্ষা-পদ্ধতি’ও নয়। বরং আমরা শিশুকে সাহায্য করি তার সজ্ঞা এবং আবেগ যাতে তার ধারণাগত মেধা-উসকে দেওয়া কৌতূহলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে। যে-কোনো বিষয়ের মাধ্যমে আপনি এটি করতে পারেন। আপনি ওই সংশ্লেষণটি করতে পারেন বিভিন্ন মাত্রায়, ওই জাগরণটিও, বিভিন্ন শিক্ষাক্রম এবং শিশুকে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে। আপনি যখন একটি শিশুকে কবিতা পড়তে দেবেন (মনে রাখবেন, কবিতা শেষ হওয়ার পর এ-প্রশ্ন নয় : ‘কবিতাটির অর্থ কী?’ বরং এ-প্রশ্ন : ‘তুমি কী বোধ করলে? তুমি কী দেখলে?’) তখন আপনি খুলে দিচ্ছেন তার পঠনযন্ত্রের এমন সব অংশ যা ফিক্শন বা নাটক বা জার্নালিজম খুলে দেয় না। বস্তুত, বর্তমানে, শুধু কিছু ধরনের প্রাগ্রসর বিজ্ঞান – যেমন পার্টিকেল ফিজিক্স – তরুণ মনকে প্যারাডক্স, দ্ব্যর্থকতা, অযৌক্তিক চিন্তা, সহবেদনমূলক উল্লম্ফনে উৎসাহিত করে, যেমনটি করে থাকে যে-কোনো ভালো কবিতা। কবিতা মস্তিষ্কের ওইসব synapse -কে খুলে দেয়; চিরদিনই দিয়েছে। আর একবার খুলে গেলে ওইসব মন যে-কোনো বিষয়ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে সক্ষম হয়।

এই ব্যাপারটি আমাদের সমাজ ছাড়া এই গ্রহের অন্য কোনো সমাজ ভুলে যায়নি। য়ুরোপে হোক বা এশিয়ায় বা মধ্যপ্রাচ্যে বা আফ্রিকায়, প্রতিটি সমাজ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শেখায় কবিতা, কবিতার মাধ্যমে নিজের ঐতিহ্যকে। মনকে শিক্ষিত করার, সমাজের যে-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সাহায্যে সমাজ টিকে থাকে সেগুলোকে বহমান রাখার এটি একটি উপায়।

কবিতার এই ক্ষমতা বুঝলেই সহজে বোঝা যায়, কেন স্বৈরশাসকরা প্রথমেই কবিদের নিস্তব্ধ করতে চায় – অথবা ‘রাষ্ট্র-সমর্থিত, কবিতার মাধ্যমে মগজধোলাই করতে চায়। তবে মগজধোলাইয়ের হাতিয়ার হিসেবে কবিতা যে কত অসফল তা থেকেই কিন্তু বোঝা যায় কবিতা-মাধ্যমটি কত শক্তিশালী। এরচেয়ে অনেক সফলভাবে কাজে লাগানো চলে, উদাহরণস্বরূপ, সংগীতকে।

মার্ক ভুন্ডারলিখ : এই যে মিডিয়াতে সারাক্ষণ আক্রমণ করা হচ্ছে এ-কথা বলে যে, বেশির ভাগ মার্কিন কবিতা অতি-হালকা অথবা উদ্ভাসহীন – এ-ব্যাপারে আপনার কী ধারণা?

জরি গ্রাহাম : কবিতার অবস্থা নিয়ে এইসব গণঅভিযোগ শোনা কিছুটা ক্লান্তিকর। মিডিয়া এই অভিযোগগুলোকে উৎসাহ দেয়, যাতে কবিতা-মাধ্যমের দিকে মিডিয়ার চোখ-বুজে থাকার পাপটা যাতে ঢাকা পড়ে। কারণ, আমার ধারণা, কবিতার মতো মাধ্যমের স্বতঃপরিবর্তমান ভাষাকে নখদর্পণে রাখতে হলে প্রচুর পড়তে হয়, যে-খাটুনি অনেকের পোষায় না। আর জনসাধারণের অভিযোগের উভয় প্রান্ত (‘কবিতা খুব চটুল’, ‘কবিতা খুব দুর্বোধ্য’) সম্পর্কে আমার দুধরনের অনুভূতি রয়েছে। একটি হলো, কোনো বিশেষ সময়ে বিভিন্নরকমের কবিতা লেখা হয়, যাকে আমি মাঝে মাঝে বলি, রেডিওর অগ ব্যান্ড বা ঋগ ব্যান্ড – আর কালচারে এ-ধরনের বিবিধতার প্রয়োজন রয়েছে। কিছু কবি সহজ-শ্রবণসুভগ কবিতা লিখেছেন – যা আমাকে খুব আকৃষ্ট করে না, কিন্তু বিপুলসংখ্যক পাঠকের তা ভালো লাগে। এতে তারা আন্দোলিত হয়। ওই কবিতাকে সবসময়ে অন্যসব কবিতার সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয় যাদের ভিন্নতর লক্ষ্য, ভিন্নতর উচ্চাশা আছে। রক্ মিউজিকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করে না, সে কেন জ্যাজ্ কিংবা অপেরা হলো না।আর এই যে এত ব্যর্থ, মাঝারিমানের অথবা ফরমুলাজাত পদ্যের ¯তূপ জমা হচ্ছে, সেটিকেও আমার মনে হয় একটি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়া। একটি পিরামিডের বেশির ভাগ পাথরখণ্ডই কিন্তু ভেতরের দিকে থাকে, সেগুলো মসৃণও নয়, নিখুঁতও নয়। শুধু কিছু, অল্প কিছু পাথর সুমসৃণ ও নিখুঁত, যেগুলো বাইরের দিকে দৃশ্যমান, যাদের দিয়েই আমরা পিরামিডকে পিরামিড বলে জানি। কবিতায় আমরা অনেকেই পিরামিডের ভেতরটা বানাচ্ছি। আমাদের উদ্দেশ্য ওই গৌরবময় স্থাপত্যনির্মাণ, আর আপনি যদি এই ভাষার ইতিহাসের যে-কোনো পর্বের দিকে তাকান, দেখবেন খুব কম কবিই আছেন – এক জেনারেশনে দুই কী তিনজন – যাদের রচনা স্থায়িত্ব পেয়েছে। কিন্তু তবু এইসব ‘দরিদ্রতর’ লেখাগুলো চিরকালই লেখা হয়েছে, যেগুলো অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলোকে সম্ভব করে তুলেছে। অনেক সময়েই তো আমরা দেখি কোনো মহৎ কবির উপর প্রভাব পড়েছে এমন একজন কবির যিনি তথাকথিত ‘মাইনর’ কবি; কে জানে আমরা কবিরা পরস্পরকে কী দিচ্ছি বা কার থেকে কী নিচ্ছি? এটি এমন একটি রহস্যময় প্রক্রিয়া। তবু প্রত্যেকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নির্মিত হচ্ছে আমাদের পিরামিডগুলো।