‘বিমল দাঁড়িয়ে আছে, অমল বাড়িয়ে আছে মুখ’
-প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়
ÒDo not go gentle into that good night.
Rage, rage against the dying of the light.
– Dylan Thomasতাঁর কবিতা সত্তর-দশকের প্রতিনিধিস্থানীয়, ত্রিদিব দস্তিদারের শেষতম কাব্যগ্রন্থের আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছিলাম আমি। তিনি সর্বাংশে একমত হতে পারেননি, তাঁর স্বভাবসুলভ মৃদুকণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তবু অদ্যাবধি আমার ওই বিচার অনেকাংশে ঠিক বলে মনে হয় – যে-আন্তরিক সরলতা, অমিত বিশ্বাস ও আশাবাদ, সর্বোপরি অসংকোচ গীতিময়তা সত্তর-দশকের কবিতার চরিত্রলক্ষণ, ত্রিদিব দস্তিদার ছিলেন তার অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি।
কবিতার বিচারে দশকওয়ারী বিভেদ কখনোই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়, তবু বিভিন্ন কারণে বিগত শতাব্দীর সত্তর-দশকের পূর্ববঙ্গীয় কবিতার কিছু সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার কারণ যতখানি সাহিত্যিক সম্ভবত ততোধিক সামাজিক-ঐতিহাসিক। ১৯৪৭-এর দেশভাগের সঙ্গে তদানীন্তন পূর্ববঙ্গীয় মুসলমান মধ্যবিত্তের শ্রেণিগত উচ্চাকাক্সক্ষা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল : ওই শ্রেণির আশা ছিল যে, উচ্চবর্ণ হিন্দু ভূস্বামী-শ্রেণির শাসন থেকে মুক্তির মাধ্যমে নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে তাদের পূর্ণ অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে তাদের সে-আকাক্সক্ষা আদৌ বাস্তবায়িত হয়নি। বরঞ্চ ১৯৫০-এর দশকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি তাদের আদৌ কোনো বিকাশের সুযোগ দিতে প্রস্তুত নয়। ফলত পূর্ব পাকিস্তানি মধ্যবিত্ত শ্রেণি অনিবার্যভাবেই তাদের নিজস্ব পৃথক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ-অনুসন্ধান শুরু করে, ১৯৫২-র ভাষা-আন্দোলন ছিল যে-অনুসন্ধানের প্রথম পর্যায়। কিন্তু নিজস্ব পৃথক অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থান-অধিকারের পূর্বে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়-পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করে। অর্থাৎ ১৯৪০-এর লাহোর-প্রস্তাবের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিচয়ের পরিবর্তে তারা ক্রমশ তাদের নিজস্ব ভাষাগত পরিচয়ের ওপরে গুরুত্ব-আরোপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। কিন্তু ১৯৪০-এর লাহোর-প্রস্তাবের সঙ্গে সম্পর্কিত ওই শ্রেণিগত পরিচয়, যা ১৯৪৬-এর নির্বাচনের মাধ্যমে দৃঢ় ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার যে-কোনো মৌলিক পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল। ফলত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানি মুসলমান মধ্যবিত্তের ভাষাগত পরিচয়-প্রাধান্য পেতে প্রায় দেড় দশক সময়ের প্রয়োজন হয়; মধ্য-ষাট ও ১৯৬০-এর দশকের শেষার্ধে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানি মুসলমান মধ্যবিত্তের ভাষাগত পরিচয়ই প্রধান হয়ে ওঠে।
ভাষাগত জাতীয়তা-প্রসঙ্গে ওই সচেতনতার সঙ্গে অবশ্যম্ভাবীরূপেই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অধিকার-প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি জড়িত ছিল। ফলে ১৯৬০-এর দশকের শেষার্ধে এই ভূখণ্ডের একটি পৃথক রাজনৈতিক পরিচয়-লাভের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই সম্ভাবনার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্তের লক্ষণীয় শ্রেণিগত ও সাংস্কৃতিক উচ্চাভিলাষ জড়িত ছিল। জীবনানন্দ দাশের ঋণ স্বীকার করে বলা যায়, গভীর হাওয়ার রাত ছিল সেটি; পূর্ববঙ্গীয় মধ্যবিত্তের এত সরল সুসময় আর কখনো আসেনি। অমিত সম্ভাবনার ওই সময় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তার যৌক্তিক পরিণতি লাভ করে। ডিসেম্বর, ১৯৭১-এর বিজয় ছিল পূর্ববঙ্গীয় মধ্যবিত্তের জন্য একটি অভাবনীয় অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অর্জন। স্বাভাবিকভাবেই অন্তত স্বাধীনতাপরবর্তী প্রথম অর্ধদশকে সদ্য স্বাধীন দেশে পূর্ববঙ্গীয় মধ্যবিত্তের সকল সরল স্বপ্ন, তাদের সকল উচ্চাভিলাষ সজীব, সক্রিয় থাকে। পরবর্তীকালে এই ভূখণ্ডের শাসকশ্রেণির কিছু লক্ষণীয় কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য পূর্ববঙ্গীয় মধ্যবিত্তের আশাবাদ অন্য রূপ ধারণ করে যা আজ আর আদৌ তিন দশক পূর্বের সরলরূপে সক্রিয় নয়।কিন্তু উপরোক্ত সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সঙ্গে পরলোকগত ত্রিদিব দস্তিদারের কাব্যপ্রয়াস সুনির্দিষ্টরূপে কী অর্থে সম্পর্কিত? সম্পর্কিত এই জন্যে যে, বিগত শতাব্দীর শেষ ষাট ও প্রথম সত্তরের পূর্ববঙ্গীয় মধ্যবিত্তের সকল গুণ ও কিছু দোষ তিনি তাঁর কবিতায় সফলভাবে ধারণ করেছিলেন। নির্মোহ নতুন শতাব্দীর দৃঢ় অবস্থান থেকে তিন দশক পূর্বের পূর্ববঙ্গীয় কবিতার যে-সকল চরিত্রলক্ষণ পশ্চাৎদৃষ্টিতে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে : সরলরৈখিক সামাজিক প্রগতিতে নির্ভার বিশ্বাস, দৃঢ় ভাষাগত চেতনা, অমিত, সম্ভবত অর্থহীন আশাবাদ, সরল রোমান্টিক প্রেমে আস্থা, সর্বোপরি সার্বিক চঞ্চলতার এক আপাত অর্থহীন বোধ – তার সকলি ত্রিদিব দস্তিদার তাঁর প্রকাশিত পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ এবং গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত অসংখ্য কবিতায় ধারণ করে আছেন। শুধু তাঁর কবিতায় নয়, তাঁর জীবনযাপনেও তাঁর অন্তত আংশিকরূপে ভিত্তিহীন আশাবাদের চিহ্ন ছিল সুস্পষ্ট : এই বিরূপ গ্রহে অর্ধ শতাব্দীকালের অনিশ্চিত জীবনযাপন তাঁর সর্বব্যাপী আশাবাদকে আদৌ ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। তিনি এবং তাঁর কবিতা, উভয়ই ছিল বিশ বছরের তরুণের মতো সরল আবেগ দ্বারা আচ্ছন্ন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে-সরলতা সাধারণত দুর্লভ হয়ে ওঠে। সর্বোপরি, নারী-প্রসঙ্গে তাঁর চিন্তা ও তার বহিঃপ্রকাশ, উভয়ই ছিল তারুণ্যসুলভ গভীর আবেগ দ্বারা চিহ্নিত, যাকে তিন দশকের অভিজ্ঞতা আদৌ বিবর্ণ করতে সক্ষম হয়নি। ওই সকলি বিগত শতাব্দীর সত্তর-দশকের পূর্ববঙ্গীয় কবিতার সুনির্দিষ্ট চরিত্রলক্ষণ। অর্থাৎ ত্রিদিব দস্তিদার ছিলেন প্রকৃত অর্থে সত্তর-দশকের একজন সৎ সন্তান। কিন্তু ওই সরল, নিঃসংকোচ আশাবাদের সময়ের পরে ইতোমধ্যে তিন দশক অতিবাহিত হয়েছে। সময় আজ অকল্পনীয়রূপে জটিল। যাঁরা আজও তাঁদের জরাজীর্ণ দেহে সত্তর-দশকের অমিত আশাবাদকে ধারণ করে আছেন, ত্রিদিব দস্তিদারের প্রস্থান তাঁদের জন্য প্রথম ঘণ্টাধ্বনি নয় কি? দীর্ঘ পথের সকল বাঁকই সম্ভবত অতিক্রান্ত। শেষ গন্তব্য স্পষ্টতই দৃশ্যমান। ত্রিদিব দস্তিদারের আত্মা শান্তি লাভ করুক।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.