জসীম উদ্দীনের কবিমানস

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮)-পরবর্তী সময়ে বাংলা কবিতায় বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে দেশে দেশে ঘটে গেছে সামাজিক বিপর্যয়। এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবে এসে পড়েছে আমাদের শিল্পে ও সাহিত্যে। সে-সময় তরুণ কবিরা সমকালীন বিশ্বপরিবেশকে তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে প্রমুখ এই ধারার উল্লেখযোগ্য কবি। কবিতার পালাবদলের সেই কালপর্বে কাব্যাঙ্গনে জসীম উদদ্ীনের পদচারণা শুরু।

কবিতায় নাগরিকতার বদলে তিনি গ্রামবাংলার রূপকে তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। পল্লিপ্রকৃতি ও পল্লির আবহমান সংস্কৃতিকে কবিতার উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মধ্যে ছিল স্বাজাত্যবোধের অহং।

সে-সময় এটা ছিল এক চমক সৃষ্টিকারী ঘটনা। গ্রামীণ মানুষের চিরচেনা পৃথিবীর রূপ, তাদের হাসিকান্না, সুখদুঃখের প্রতিমূর্তি নির্মাণে নিবিষ্ট হন জসীম উদ্দীন। তখন কুমুদরঞ্জন মল্লিক, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, কালিদাস রায়, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ও পল্লিপ্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। কিন্তু প্রকাশকলায় তাঁরা ছিলেন রবীন্দ্রানুসারী। পল্লীপ্রকৃতির স্বভাবধর্মের যথার্থ প্রতিফলন তাঁদের কাব্যভাষায় ছিল অনেকটা অনুপস্থিত। তাঁদের সঙ্গে জসীম উদ্দীনের পার্থক্য এইখানে। জসীম উদ্দীন উপলব্ধি করেছিলেন – পল্লিপ্রকৃতির গভীরেই বাঙালিসত্তা ও সংস্কৃতির শিকড় প্রোথিত। লোকজীবনের যথার্থ চিত্র রূপায়ণে জসীম উদ্দীনের কবিতা তাই মানুষের মনকে অনেক বেশি ছুঁয়ে যেতে পেরেছিল। প্রসঙ্গক্রমে, একই সময়ের আরেকজন ভিন্নকণ্ঠের কবির উল্লেখ আবশ্যক। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলও সে-সময়ের প্রচলিত স্রোতে অবগাহন না-করে উচ্চারণ করেছিলেন বিদ্রোহের সুর, গেয়েছিলেন মানবতার জয়গান। সমকালে এই দুই ব্যতিক্রম কণ্ঠ মানুষের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করেছিল। 

তিরিশের নবীন কবির দল রবীন্দ্রকাব্যপ্রভাব থেকে সরে আসার সাধনায় যেভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে কবিতার
পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্রতী হয়েছিলেন, নতুন বিষয় ও বাণীভঙ্গির জন্য বিশ্বসাহিত্যের পাঠ নিয়েছিলেন – জসীম উদ্দীন, নজরুল সে-পথে যাননি। তাঁরা স্বতন্ত্র পন্থায় কাব্যচর্চা করেছেন। নজরুল প্রতিবাদী কণ্ঠ হয়েছিলেন আর জসীম উদ্দীন দৃষ্টি দিয়েছিলেন পল্লিপ্রকৃতি ও বাংলার বিশাল ঐতিহ্যের দিকে। তাঁর কাব্যভাবনা ছিল লোকসংস্কৃতি ও লোকজীবন আশ্রিত। সমকালের কবি জীবনানন্দ দাশ কিংবা বিষ্ণু দে থেকে মেজাজ ও উপলব্ধিতে জসীম উদ্দীনের অবস্থান যোজন দূরত্বে। যদিও লোকজীবনের প্রভাব তাঁদের কবিতায়ও প্রতিভাত হয়েছিল। জীবনানন্দ দাশ ছিলেন ইতিহাস-সচেতন আধুনিক মননের কবি। গ্রামীণ প্রকৃতি, লোকবাংলার রূপ জীবনানন্দের কবিতায় নতুন রূপে ও চিত্রকল্পে উদ্ভাসিত হয়েছে। আর বিষ্ণু দে লোকজীবনে দেখতে পেয়েছিলেন বাস্তবজীবনের অপরাজেয় জীবনীশক্তি। সমকালের আরো কারো কারো মধ্যে এই প্রবণতা ছিল। কিন্তু জসীম উদ্দীনই সচেতনভাবে লোকজীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তার ভাব-ভাষাকে কবিতায় তুলে এনেছিলেন সুচারুরূপে।

গত শতাব্দীর তিরিশের তরুণ কবিদের আশ্রয়স্থল ও মুখপত্র ছিল কল্লোল পত্রিকা। এটির মাধ্যমে সূচিত হয় আধুনিক
সাহিত্য-আন্দোলন। দীনেশরঞ্জন দাশ ও গোকূলচন্দ্র নাগের সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে। কল্লোলগোষ্ঠীর তরুণ কবিরা প্রচলিত কাব্যধারার বিপরীতে নতুন ধারা তৈরিতে উদ্যোগী হন। এঁরা ছিলেন নতুন জীবনবোধে উজ্জীবিত ভিন্নকণ্ঠের সৈনিক; প্রকাশে ও বিকাশে নতুনত্বের ধারক। সেই একই সময়ে আবির্ভূত জসীম উদ্দীন নিমগ্ন হয়েছিলেন প্রচলিত লোকশব্দ ব্যবহারে, এমনকি গ্রামীণ জীবনে ব্যবহৃত ভাষাভঙ্গিও তাঁর কবিতায় স্থান পেয়েছে। কবিতার বিষয় কিংবা বাকভঙ্গি গতানুগতিক হওয়া সত্ত্বেও জসীম উদ্দীনের কবিতার পথে কখনো কোনো বড় বাধা আসেনি। বিদ্বৎ সমাজেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তিনি আদায় করে নিয়েছিলেন। এমনকি ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। কল্লোল পত্রিকায় তাঁর কবিতাও প্রকাশিত হতো এবং সকলের কাছে সমাদৃত হয়েছিল। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ, তাদের হাসিকান্না, সুখদুঃখ, প্রেমবিরহ ও প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ জসীম উদ্দীন নতুন রূপে জনসমক্ষে তুলে আনতে পেরেছিলেন। কবিতায় সুচারু রূপে ছন্দ ও অলংকার ব্যবহার করতে পারাটাও ছিল তাঁর এক বিশেষ দিক। কাহিনি নির্মাণে অবলম্বন করেছিলেন উপন্যাসের গঠনকৌশল, যা কাহিনিতে গতি আনতে সহায়ক হয়েছিল। কবির দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাব্যে যথাকৌশল অবলম্বনের দক্ষতার কারণে জসীম উদ্দীনের কবিতা সময়কে অতিক্রম করে যাওয়ার বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।

জসীম উদ্দীনের প্রথম কাব্য রাখালী প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। গ্রন্থের নাম-কবিতা ‘রাখালী’র দুটি চরণ পাঠ করলে কবির মানসলোক উপলব্ধি করা যাবে। কবি লিখলেন –

এই গাঁয়েতে একটি মেয়ে চুলগুলি তার কালো কালো,

মাঝে সোনার মুখটি হাসে আঁধারেতে চাঁদের আলো।

কালো চুলের আড়ালে-দেখা মুখখানিকে চাঁদের আলোর সমীপবর্তী করে দেখতে পারাটা যথার্থ আধুনিক উপমার প্রয়োগকৌশল। জসীম উদ্দীনের অন্য বৈশিষ্ট্য হলো কবিতার পঙ্ক্তিতে বিভিন্ন অলংকারের সফল প্রয়োগ। বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতাটিও রাখালী কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত। কবিতাটি লেখা হয়েছে বিরহগাথা হিসেবে। এতে পল্লিমানুষের মুখের ভাষা ও আবেগ ব্যবহৃত হয়েছে, যার হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা বিষাদময় পরিবেশ সৃষ্টিতে ও বাস্তবে পাঠকের মনে দাগ কাটতে সমর্থ। কাহিনির শুরু এভাবে –

এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে,

তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।

নাতির কাছে দাদুর প্রিয়জন হারানোর বেদনাবহ কাহিনি বর্ণনায় মনের যে-আর্তি ফুটে উঠেছে, তা যে-কারো হৃদয় ছুঁয়ে যেতে সক্ষম। কবিতার সমাপ্তিও প্রচলিত লোকাচারের অনুষঙ্গ টেনে –

জোড়হাত দাদু মোনাজাত কর, আয় খোদা! রহমান,

ভেস্ত নসীব করিও সকল মৃত্যুব্যথিত প্রাণ।

কবিতাটির সাফল্য এখানে যে, কাহিনিবর্ণনায় জনবিশ্বাস, লোকাচার ও স্থান-কাল-পরিবেশকে ছাপিয়ে তা সর্বপাঠকের হৃদয়ে বেদনাসৃষ্টির অনুষঙ্গ হয়েছে। আমাদের পল্লিসমাজে মানুষ পুঁথিসাহিত্যপাঠে যেভাবে আকৃষ্ট হয়, জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতা তার চেয়েও বেশি আকৃষ্ট করে পাঠকের মনোযোগ। বর্ণনা এমন হৃদয়গ্রাহী যে, আধুনিক চেতনাবাহী কল্লোল পত্রিকার সম্পাদক কবিতাটি প্রকাশের জন্য মনোনীত করেছিলেন, এবং পত্রিকার ১৩৩২ আষাঢ় (১৯২৫ সালের জুন) সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলেন। বিষয়ের সর্বজনীনতাই এখানে বিবেচনার বিষয় হয়েছিল।

‘কবর’ কবিতাটি তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান দীনেশচন্দ্র সেনের চোখে পড়েছিল। তা পড়ে তিনি এতই মোহিত হন যে, কবিতাটি তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিক পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করে দেন। আত্মশ্লাঘা অনুভব করে এও বলেছিলেন, ‘আমার গৌরব যে আমি কবি জসীম উদ্দীনের শিক্ষক হতে পেরেছি। তাঁর কবিতা আমার কাছে শেলি, কিটস, বায়রন এমনকি ওয়াডর্সওয়ার্থের কবিতার চেয়ে ভাল লাগে। কারণ তাঁর কবিতায় আমি আমার বহুকাল আগে ছেড়ে-আসা

আম-কাঁঠালের ছায়ায় ঘেরা পল্লী মায়ের শীতল স্পর্শ পাই।’ কল্লোলের পক্ষ থেকে আশ্বিন, ১৩৩৫ সংখ্যায় বলা হয়েছে, ‘‘কল্লোলের পাঠকবর্গ শুনিয়া সুখী হইবেন পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ কবিতাটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সিলেকসনে পুস্তকে সংকলিত হইয়াছে। আমাদের সকলেরই ইহা আনন্দের বিষয়।’’

শুধু ‘কবর’ নয়, জসীম উদ্দীনের অন্য আখ্যানকাব্যগুলিও সর্বজনীন আবেদন সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে, পাঠকের মন ছুঁয়ে যেতে পেরেছে। সেখানেও আখ্যান-বর্ণনার চাতুর্য, উপমা-রূপক-উৎপ্রেক্ষা প্রয়োগের যথার্থতা, নাটকীয় আবহ তৈরির দক্ষতা লক্ষণীয়। এটা সম্ভব হয়েছে এজন্য যে, জসীম উদ্দীন উচ্চশিক্ষিত ও আধুনিক পরিমণ্ডলের মানুষ ছিলেন। শিল্পের বিষয়-আশয়, নাটক-উপন্যাসের গঠনশৈলী, কবিতার ছন্দ, অলংকার ইত্যাদি তাঁর আয়ত্তে ছিল। সচেতনভাবেই লোকজ বিষয়-আশয়কে কবিতার উপাদান হিসেবে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন তিনি। কবির কৃতিত্ব হলো, গ্রামবাংলাকে তিনি কখনো খণ্ডিতরূপে দেখেননি, দেখেছেন পরিপূর্ণ বিশ্বরূপে।

জসীম উদ্দীনের কবিমানস সর্বদা মাটি, গণমানুষ ও লোকসংস্কৃতির রূপমুখী ছিল, যেখানে গ্রাম হয়ে উঠেছিল নকশি কাঁথার সুতোয় বোনা ভিন্ন এক জগৎ। তাঁর চিন্তার ভিত বৃহত্তর পল্লির আবহ ও রূপের ভুবনে বাঁধা ছিল। তাই তাঁর কাব্যসাধনা এগিয়ে গেছে এবং তা আধুনিক চৈতন্যের সমগামী হতে পেরেছে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে দীনেশচন্দ্র সেনের গবেষণা সহকারী হিসেবে পল্লিগীতি সংগ্রহের কাজে জসীম উদ্দীন গ্রামে-গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছেন, মিশেছেন সহজ-সরল মানুষের সঙ্গে, দেখেছেন তাদের জীবনাচরণ, পেয়েছেন গ্রামবাংলার স্বর্ণভাণ্ডারের খোঁজ – যা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। পল্লিগান, ভাটিয়ালী, জারি-সারি, মুর্শিদীর সুর তিনি ছোটবেলায় লোকমুখে শুনে-শুনে বড় হয়েছেন। এভাবেই তাঁর মানসভুবন গড়ে উঠেছিল।

জসীম উদ্দীনের নক্সী কাঁথার মাঠ কাহিনিকাব্য প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। এর নায়ক শক্তিমান গ্রামীণ-কিশোর সর্বকর্মে পারদর্শী ‘রূপাই’ আর নায়িকা গ্রামের সুন্দরী বালিকা ‘সাজু’। রূপাই ও সাজুর প্রেম-বিচ্ছেদ-বিরহের কাহিনি মানুষের চিরকালীন ট্র্যাজিক ভাবনার এক চিরন্তন প্রকাশ। লোকগাথার ঐতিহ্যকে আধুনিক আখ্যানের সঙ্গে মিলিয়ে এ এক অনন্য সৃষ্টি। গ্রন্থটির ভূমিকায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন – ‘আমি এটিকে আদরের চোখে দেখেছি, কেননা এই লেখার মধ্য দিয়ে বাংলার পল্লী-জীবন আমার কাছে চমৎকার একটি মাধুর্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে। এই কারণে আমি নক্সী-কাঁথার কবিকে এই বইখানি সাধারণের দরবারে হাজির করে দিতে উৎসাহ দিচ্ছি।’ গ্রন্থে লোকসাহিত্যের বিভিন্ন অনুষঙ্গ : যেমন – লোককাহিনি, লোকপ্রবাদ, লোকছড়া, বারোমাসি ইত্যাদির ব্যবহার প্রাণ ছুঁয়ে যায়। গতি কোথাও শ্লথ হয়নি। কবি লিখেছেন –

আজিকে রূপার কোন কাজ নাই, ঘুম হতে যেন জাগি,

শিয়রে দেখিছে রাজার কুমারী তাহারই ব্যথার ভাগী।

সাজুও দেখিছে কোথাকার যেন রাজার কুমার আজি,

ঘুম হতে তারে সবে জাগায়েছে অরুণ-আলোয় সাজি।

বর্ণনায় পল্লীকিশোরী সাজুকে রাজার কুমারী এবং নায়ক পল্লীকিশোর রূপাইকে রূপকথার আবহে রাজার কুমারের সঙ্গে তুলনা যেন কবির মহত্বের প্রকাশ। আধুনিক মানুষ হলেও গ্রামীণ মানসিকতায় নিবিষ্ট ছিলেন কবি, মন ছিল অনেক বড়। লোকজীবনের আহ্বানকে অস্বীকার করা তাই জসীম উদ্দীনের পক্ষে সম্ভব ছিল না। গ্রামের প্রতিই ছিল তাঁর স্বাভাবিক নাড়ির টান। কবি যখন বলেন –

এই গাঁয়ে এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল,

কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল।

এও জীবনের এক বাস্তব অনুষঙ্গ। চাষার ছেলে রূপাইয়ের রূপ বর্ণনায় তার মুখের কালো তিলের সৌন্দর্যকে রঙিন ফুলের চাইতে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলে ধরা অনন্যসাধারণ প্রকাশ। এটা আধুনিক উপমার অনুষঙ্গ। উপমা প্রয়োগে বরাবরই জসীম সহজ দক্ষতা লক্ষণীয়। যে-কারণে তিরিশের সেই প্রবল পাশ্চাত্য-প্রভাবের বেড়ি ডিঙিয়ে তাঁর উচ্চারণ সময়োত্তীর্ণ হয়েছে।

জসীম উদ্দীন বাঙালি পাঠকের মনে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন চিরকাল এজন্য যে, তিনি গণমানুষের ভাব-ভাষা-কল্পনাপ্রবণতা ও মেজাজকে যথার্থভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি যে আধুনিক ছিল তার প্রমাণ মেলে যথাকাব্যালংকার ব্যবহারের মধ্যে। কাহিনিকে সফলভাবে এগিয়ে নিতে পারার কৃতিত্বও আছে তাঁর। এ-কথার স্বীকৃতি মেলে আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও সৈয়দ আলী আহসানের বক্তব্যে। আবু হেনা মোস্তফা কামাল লিখেছেন, ‘‘নক্সী-কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এর কাহিনী বিন্যাসের মূলে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র অনুসৃতি অস্পষ্ট নয় – কিন্তু এখানে কবির লিরিক অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হলো নিবিড় নাটকীয়তা।’ অন্য ভাষ্যে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, ‘গ্রাম্য জীবন এবং গ্রাম্য পরিবেশ তাঁর কাব্যের উপাদান জুগিয়েছে এবং কবিতার কলাকৌশলের মধ্যেও গ্রাম্য আবহকে আমরা মূর্ত হতে দেখি। কিন্তু তাই বলে তিনি পরিপূর্ণভাবে গ্রাম্য কবি নন। তার কারণ উপমা রূপক প্রয়োগে তিনি যথেষ্ট অনুশীলনের পরিচয় দিয়েছেন এবং কাব্যকাহিনী নির্মাণে উপন্যাসের গঠন প্রকৃতিকে অবলম্বন করেছেন।’’

জসীম উদ্দীন চিন্তায় ও চেতনায় তিরিশের কবিদের সঙ্গে একাকার না-হয়ে দৃষ্টি দিয়েছেন নিজস্ব জগতের দিকে, দ্বারস্থ হয়েছেন লোক-ঐতিহ্যের কাছে। তাই বাংলার লোকাচার ও লোকমানস বিভিন্ন অনুষঙ্গে তাঁর কবিতায় প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হৃদয়ের আর্তি। পৃথিবীর উন্নত দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় থাকলেও জসীম উদ্দীন নিজ দেশের মাটির গন্ধকে প্রত্যয়ের সঙ্গে গায়ে মেখেছেন। কবিতায় তিনি যে-শাশ্বত বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে এনেছিলেন, তাতে ধ্বনিত হয়েছে গণমানুষের শাশ্বত অনুভব।

১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয় জসীম উদ্দীনের আরেক কাহিনিকাব্য ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’। এখানে কবি দুই ভিন্ন ধর্মের
নায়ক-নায়িকার প্রেম ও পরিণতি দেখাতে গিয়ে সমাজ বাস্তবতার প্রকৃত রূপ তুলে ধরার প্রয়াসী হয়েছিলেন এবং তার যথার্থ ক্রমপরিণতি দেখাতে পেরেছিলেন। আরো যে-বিষয়টা বড় করে দেখা গেছে তা হলো, গ্রামের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষকে গুরুত্বসহকারে সাহিত্যে স্থান দেওয়ার মানসিকতা। অন্ত্যজ শ্রেণিভুক্ত গদাই-নমুর মেয়ে ‘দুলী’ এখানে কাহিনির প্রধান নারী
চরিত্র –

ইতল বেতল ফুলের বনে ফুল ঝুরঝুর করেরে ভাই

ফুল ঝুর ঝুর করে;

দেখে এলাম কালো-মেয়ে গদাই নমুর ঘরে।

ধানের আগায় ধানের ছড়া, তাহার পরে টিয়া,

নমুর মেয়ের গায়ের ঝলক সেইনা রঙ নিয়া।

কবির দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতাই এখানে মুখ্য। কবিতার চরিত্রের চাইতেও এখানে অধিক সত্যে রূপায়িত হয়েছে জীবনের সত্য। সৎ সাহিত্যে লৌকিক প্রবণতাকে কখনো অস্বীকার করা যায় না। দেশে-দেশে এই লৌকিক আবহের মধ্যে নির্মিত হয়েছে জাতীয় সাহিত্যের স্বরূপ। জসীম উদ্দীনও লোকজীবনপ্রবাহকে পরিমার্জিত রূপে আধুনিক সাহিত্যের উপজীব্য করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি এখনো আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক।

১৯৩০ সালে জসীম উদ্দীনের বালুচর কাব্য প্রকাশিত হয়। গ্রন্থে গ্রামীণ পরিবেশের সার্বিক রূপ ফুটে উঠেছে। গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোচরীভূত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ কাব্যবিষয়ে তরুণ কবিকে গঠনমূলক কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বালুচর কাব্য থেকে ‘উড়ানীর চর’ কবিতাটি ‘বাংলা কবিতা-সংকলনে’ অন্তর্ভুক্ত করেন। আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলা ‘কাব্যপরিচয় (১৯৩৮)’ সম্পাদনা করেন, তখন জসীম উদ্দীনের প্রতিনিধিত্ব বিবেচনা করে যে-কবিতাটি তিনি সংকলনের জন্যে বেছে নিয়েছিলেন, তা বালুচর গ্রন্থভুক্ত ‘উড়ানীর চর’। কবিতাটিতে অবশ্য নিসর্গ বর্ণনা মুখ্য, কিন্তু কৃষাণ-কৃষাণীর গৌণ বৃত্তান্ত তার সঙ্গে মিলেমিশে আছে।’’ কাব্যে অকৃত্রিম লোকপরিবেশ নির্মাণে জসীম উদ্দীন মানুষের আবেগকে সবক্ষেত্রে ছুঁয়ে যেতে পেরেছেন। তাঁর সব রচনার বেলায় একথা খাটে। সাহিত্যজীবনের শুরুতে ‘কবর’ কবিতায় নাতির কাছে মৃত-পরিজনের আখ্যান বর্ণনায় বিরহের যে-আবহ তিনি তৈরি করতে পেরেছিলেন, তা সর্বপাঠকের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। আজো বাঙালির মনে জসীম উদ্দীন স্মরণীয় হয়ে আছেন লোকমানসকে যথার্থভাবে বুঝতে পেরেছিলেন বলে। কাব্যের ভাষাভঙ্গির ঐতিহ্য-সংরক্ষণে তাঁর যে বিশেষ লক্ষ্য ছিল, তা কবির স্বীকারোক্তিতেই মেলে। ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ গ্রন্থের নিবেদনে জসীম উদ্দীন লিখেছেন – ‘গ্রন্থের চরিত্রগুলির ভিতরে কথোপকথন জুড়িতে আমি যতদূর পারিয়াছি, তাহা গ্রাম্য রাখিতে চেষ্টা করিয়াছি। এই জন্য আমি প্রাচীন পল্লী-কবিদের অনেক পদ কোন কোন চরিত্রের কথোপকথনে জুড়িয়া দিয়াছি।’ বিষয়টি এখানে পরিষ্কার যে, সচেতনভাবেই কবি লোকজ আবহ ধরে রাখতে লোকভাষাকে সংহত করার প্রয়াসী হয়েছিলেন। তাঁর কাব্যপ্রয়াসে সর্বত্র তাই বৃহত্তর লোকসমাজের প্রতি মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে।

লোকসমাজ এবং লোকজ বিষয় ও ঐতিহ্যকে মানুষ অস্বীকার করতে পারে না। এই সম্পর্ক যেন মানুষের নাড়ির সম্পর্ক। প্রাচীন লোকগাথা, রূপকথা, প্রবাদ ইত্যাদির মধ্যে রয়েছে চিরকালীন সাহিত্যের ভিত্তি। যে-কোনো জাতির জন্য তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বড় সম্পদ। জসীম উদ্দীনের কবিমানসে লোকঐতিহ্য কোনো কিছুর প্রতিক্রিয়ার ফল নয়, বরং তা বৃহত্তর বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ পরিচয়ের ফসল। মানুষের হাসিকান্না, সময়-সমাজের রূপ তুলে ধরতে পেরেছিলেন বলেই জসীম উদ্দীন সমকালে সুধীসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এজন্য কবি হিসেবে তিনি কালোত্তীর্ণ হয়েছেন। সর্বজনবিদিত ‘পল্লীকবি’ অভিধাটি জসীম উদ্দীনের জন্য যথার্থ নয়। ‘পল্লীকবি’ বলতে যাঁদের বোঝানো হয়ে থাকে, তাঁকে তাঁদের গোত্রভুক্ত করা সঠিক বিবেচনা নয়। সব দেশে সব কালে সাহিত্যে ও শিল্পে নতুনতর ধারা সর্বজনের মান্যতা পায়। নতুন করে বলতে পারাটাও আধুনিক ভাবনার প্রকাশ বটে। এই অর্থে জসীম উদ্দীন আধুনিক মননের কবি, সমাজমনস্ক কবি।